শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
রায়বাবুর শ্রাদ্ধের দিন ভিতরের উঠোনে কীর্তন দিল অবনীশ। নিমন্ত্রণ পেয়েই রমেন লাফিয়ে উঠে বলল, আমি যাব।
সন্ধেবেলা ললিতকেও জোর করে নিয়ে গেল রমেন।
কয়েকজন রোগা চেহারার কালো লোক খোলে চাঁটি দিয়ে মিনমিন করে ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম’ করছিল। ভিতরের বারান্দায় ভিড় করে বসেছে পাড়ার বুড়ো-বুড়ি আর কচিকাচারা। শম্ভুদের দলটা ঘোরাফেরা করছে। তারা শ্মশানবন্ধু।
রমেন হঠাৎ ফিসফিস করে বলল, একে কি ছাই কীর্তন বলে!
তারপর একসময়ে নিঃশব্দে নেমে গেল রমেন। দেখা গেল সে কীর্তনীয়াদের মাঝখানে। তার শরীর দুলছে। কেঁপে উঠছে। তারপরই হুংকার দিয়ে লাফিয়ে উঠল সে, ‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ..কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে’…
পলকেই পালটে যায় আসরের চেহারা। বিদ্যুতের মতো কী যেন একটা সবাইকে স্পর্শ করে। কেঁপে ওঠে ললিত। দূরাগত বজ্রের মতো গুরুগুরু করে ওঠে খোল।
এমনিতেই চমৎকার গলা রমেনের। সুন্দর গান গায়। তার সঙ্গে এখন এক দুরন্ত ঝড় এসে যোগ দেয়। মানুষজন দুলে ওঠে। থির থির করে কাঁপে পায়ের তলার মাটি। রোগা কালো কীর্তনীয়ারা লাফিয়ে ওঠে রমেনের চারধারে। এ-রকম একজনের অভাবেই যেন এতক্ষণ বৃথা হচ্ছিল তাদের গান। শম্ভু-সুবলেরা এতক্ষণ কোথায় ডুব দিচ্ছিল মাঝে মাঝে, এখন তারা আসর ঘিরে দাঁড়ায়। চিত্রার্পিত হয়ে থাকে।
শূন্যে লাফিয়ে ওঠে রমেন। হুংকার দিয়ে মুহুর্মুহু বলে, হরে কৃষ্ণ হরে রাম… কীর্তনীয়াদের পা হরিণের পায়ের মতো দ্রুত বৃষ্টিপাতের মতো মাটি ছুঁয়ে যায়।
কী করে কী করে এত লোকের সামনে নাচছে রমেন, গান গাইছে? ওর লজ্জা করছে না? ললিতের শরীর কেমন ঝিম মেরে আসে।
কখন যেন শম্ভুর পেশিবহুল চেহারাটা কীর্তনীয়াদের দলে ভিড়ে যায়। সে গায়ের জামা খুলে ফেলেছে। পরনে প্যান্ট, গলায় খোল।
মানুষ বাস্তবতা ভুলে যেতে থাকে। কীর্তনের উদ্দণ্ড ঢেউ আঙুলের মতো তাদের ভিতরে স্নায়ুগুলোকে যন্ত্রের তারের মতো বাজাতে থাকে।
দেখা যায় রমেন কাঁদছে।
বুড়িরা ফুঁপিয়ে উঠে চোখে আঁচল চাপে
হঠাৎ ললিত দেখে তার সামনে রমেন। চোখ জ্বলছে। দু’হাত বাড়িয়ে হঠাৎ তাকে টেনে নেয় রমেন।
ললিত চেঁচিয়ে ওঠে, কী করছিস?
পরমুহুর্তেই সে দেখতে পায় যে, সে আসরের মাঝখানে। তার চারদিকে পাগল লোকগুলো চোখ বুজে নাচছে, গায়ে ঢলে পড়ছে। বিনি মদের মাতাল।
ললিত স্থিরভাবে দাঁড়াতে চেষ্টা করে। পারে না। রমেন তাকে এক পাক ঘুরিয়ে ছেড়ে দেয়। ললিত টলে পড়ে যেতে যেতে সামলায়। সুবল তাকে টেনে নিয়ে কী যেন বলে। দু হাত তুলে নাচে আর হাসে।
কীর্তনীয়ালের গানের বোল এখন আর স্পষ্ট বোঝা যায় না। কেবল ‘জয়… জয়’ ধ্বনি শোনা যায়। কার জয়? কীসের জয়? বুঝবার চেষ্টা করে ললিত। এর ওর ধাক্কা খায়। টলে পড়ে যেতে গেলে কেউ একজন ধরে আবার দাঁড় করিয়ে নেয়। তুলসীতলায় বাবা একা কীর্তন করত। কাঁদত। বাবার হাতে থাকত ছোট করতাল। বিষয়বুদ্ধিহীন বাবা কীর্তনের মধ্যে ভুলে থাকত তার বাস্তব জীবনের ব্যর্থতা। সেই দৃশ্য মনে পড়ে ললিতের। মনে পড়ে ছেলেবেলার হরির লুট। মনে পড়ে কীর্তন তার রক্তে রয়েছে। অথচ সে কখনও কীর্তন করেনি।
জয়-জয়-জয় গর্জন করে তার চারদিকের পাগল লোকেরা। মুহুর্মুহু শঙ্খধ্বনি হয়, উলুর শব্দ বন্যার মতো ভেসে আসে। আকুল কান্নার শব্দ শোনা যায়। হৃৎপিণ্ড ঢিপঢিপ করে লাফিয়ে ওঠে।
‘জয় জয়’ ধ্বনিটা ধরে ললিত। তারপর ফিসফিস করে বলে, জয়-জয়। সংকোচ লজ্জা ভয় ক্রমে কেটে যায়। এত ভিড়ের মধ্যে কে আর তাকে আলাদা করে দেখবে?
তারপর ললিতের আর কিছু খেয়াল থাকে না। সে শুধু মাঝে মাঝে দেখে তার চারধারে অবাস্তব ছায়ার মতো লোক দুরে সরে যাচ্ছে, কাছে আসছে। মাঝে মাঝে কে যেন বুকে টেনে নিচ্ছে তাকে, ছেড়ে দিচ্ছে।
‘জয়-জয়’ বলে দু’হাত তুলে নাচতে থাকে ললিত।
কে জানে কখন শেষ হয়েছিল কীর্তন। ললিত শুধু শেষে টের পায় তার গায় এক অদ্ভুত উত্তেজনায় কদমফুলি কাঁটা দিয়েছে। কার জয়ধ্বনি সে এতক্ষণ দিয়েছে কে জানে। তবু, জয় হোক—তার জয় হোক।
রমেনকে ঘিরে ভিড়। সবাই জানতে চাইছে রমেন আসলে কে।
প্রায় দিনই সকাল বিকেলে দু’-চারজন করে রমেনের প্রজারা আসে। হাতে করে নিয়ে আসে লাউ, শাকপাতা, ফল, কিবা নগদ টাকা।
ললিত মাঝে মাঝে ধমক দেয়, এ-সব তুই নিস কেন?
রমেন হাসে। নিতে হয়। মানুষে ভালবেসে দিলে নিতে দোষ নেই। মানুষের দান গ্রহণ করা এককালে ব্রাহ্মণের প্রাফেশন ছিল।
কেন সেরকম প্রফেশন থাকবে?
রমেন একটু ভাবে। তারপর আস্তে আস্তে বলে, ললিত, আমার পূর্বপুরুষেরা মানুষের অনেক উপকার করেছিল। মানুষ কৃতজ্ঞ হয়ে সেই ঋণ শোধ করত। ক্রমে ক্রমে ওইভাবেই আমাদের জমিদারি তৈরি হয়েছিল। আবার আমার আমলে চলে গেল জমিদারি। আমি আবার ব্রাহ্মণের পুরনো প্রফেশনে ফিরে এসেছি। ওরা আমাকে ভালবেসে দেয়, আমি নিই।
কেন দেয়? তুই ওদের জন্য কী করিস!
রমেন অন্যমনস্ক হয়ে যায়। আস্তে আস্তে বলে, কী দিই তা ওরা জানে। আমার তো টাকা পয়সা নেই। তাই আমি গিয়ে কেবল ওদের পাশে পাঁড়াই। দেশ ছাড়ার পর ওদের আর কোনও মানসিক আশ্রয় নেই। এককালে শোকে-দুঃখে ওরা আমাদের বাড়িতে ছুটে যেত। এখন তাই ওরা আমাকে দেখলে খুশি হয়। ছুটে আসে। দুঃখের কথা বলে আমাকে। আমি ওদের দাওয়ায় বসি, ছেলেপুলেদের সঙ্গে কথা বলি, কারও বাসায় গিয়ে কীর্তন গাই, লোকগুলো আবার ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। ওদের মধ্যে কেউ কেউ এখন পয়সা করেছে। কেউ বা ডুবে গেছে। ওদের মধ্যে একটা সমতা আনার চেষ্টা করি। এর ওর কাছ থেকে চেয়ে এনে দিই। একে অন্যকে দেখার কথা বলি। কিন্তু এইটুকু তো মাত্র নয়। ওরা আমার কাছ থেকে টাকা পয়সার সাহায্য তেমন চায় না। ওরা এটুকু ভেবেই খুশি যে, আমি ওদের পাশে আছি। ছোটকর্তাকে ওদের দরকার একটা প্রতিমার মতো, যার মধ্যে বুড়োকর্তার ছাপ আছে। কাজেই আমি ওদের স্বার্থ, আমাকে বাঁচিয়ে রাখা ওদের দায়িত্ব।
ললিত তবু গুনগুন করে আপত্তি করে। রমেনের কথাগুলো সাম্যের বিরোধী। কেন একজন দেবতার মতো হয়ে উঠবে?
রমেন মৃদু হেসে বলে, এককালে তোকে দেখতাম রাত জেগে পোস্টার লিখছিস. ঘুরে ঘুরে পার্টির চাঁদা তুলছিস, মিটিং করছিস, মিছিল সামলাচ্ছিস। নিজের দিকে তোর খেয়ালই থাকত না। তখন তোর মনে একটা প্রকাণ্ড আদর্শ কাজ করছে, সকলের ভাল করার আদর্শ। তুই হয়তো টেরও পোতস না যে, সকলের ভাল করার চেষ্টা করছিস বলে তোকে বাঁচিয়ে রাখা সকলের কর্তব্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমি দেখতাম কেউ নিজে থেকেই তোর ঠোঁটে সিগারেট গুঁজে ধরিয়ে দিচ্ছে, তে এনে দিচ্ছে চা, রাত বারোটা তোর জন্য দোকান খুলিয়ে নিয়ে আসছে ‘পাউরুটি। তুই সে-সব টেরও পাচ্ছিস না। এক মনে কাজ করে যাচ্ছিস। আমার ব্যাপারটাও অনেকটা তেমনি। লোকের স্বার্থ হয়ে ওঠা। আমি কেন নিজের পেটের ধান্দায় ঘুরব, আমার পেটের ধান্দায় ঘুরবে অন্যেরা। কারণ, আমি তো তাদের ধান্দাতেই ঘুরছি।
কিন্তু এই প্রফেশন মহৎ নয়। এর মধ্যে ভিখিরিপনা আছে।
তবে কী করল। চাকরি? সে তো বাঁধা মাইনের ব্যাপার। মাইনের টাকা হাতে পেয়ে তার মাপে মাপে নিজেকে ছোট করে ফেলব, খরচ কমাব, জমাতে শিখব।…দ্যাখ না, সেদিন সঞ্জয়ের কাছে গেলাম, পুরনো দিনের কথা হচ্ছে, তার মাঝখানে হঠাৎ ও খুব অসহায় ভাবে লাজুক মুখে বলল, তুই আমার কাছে দু’-তিন হাজার টাকা পাস, কিন্তু সেটা এক্ষুনি দিতে পারছি না রে। সদ্য গাড়িটা কিনেছি, ওভারহল করতে অনেক খরচ গেছে। বিজনেসেও লস দিলাম অনেক… এইসব কথা। ওর এয়ারকন্ডিশনড় করা অফিসঘরে বসে আমার হঠাৎ মনে হয়েছিল, সত্যিই সঞ্জয়টা গরিব, ঠিক আগে যেমন গরিব ছিল। কী করে টাকা দেবে ও? ওর যে টাকার বড় দরকার। অথচ ও আমাকে বারবার বলছিল যে ও সন্ন্যাসী হতে চায়, আর কয়েক বছর পরেই ও সন্ন্যাসী হয়ে যাবে।
বলে রমেন হাসে। ললিত চুপ করে থাকে।
কোনও দিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে ললিত দেখে, রমেন বসে আছে। জানালার দিকে মুখ। কোলের ওপর জড়ো করা দুটি হাত। নিস্তব্ধ। জানালা দিয়ে বাইরের আকাশের একটা ফিকে আলো আসছে, সেই আলোতে ললিত দেখে রমেনের দু’ চোখ দিয়ে জলের দুটি ধারা নেমে এসেছে।
দূরে কোথাও একটা কুকুর কাঁদছে। মশারির ও-পাশে জানালা। তার ও-পাশে ধূলিকণার ঝড়ের মতো নক্ষত্রে আকীর্ণ আকাশ। ধোঁয়াটে চাঁদ আকাশে। অপার্থিব মূর্তির মতো রমেন বসে আছে। ললিত বুঝতে পারে, রমেনের চেতনা নেই। সে ধ্যান করছে।
নিশুত রাতে কুকুরের কান্না, অস্পষ্ট আকাশ, ধ্যানস্থ রমেন—সব মিলেমিশে এমন এক স্বপ্নের মতো দেখে ললিত—যেন তা সত্য নয়, অথচ হঠাৎ বুকের ভিতর হু হু বাতাস বয়। কেন যে, ললিত জানে না। জানালা দিয়ে ঝরে পড়ছে তারার গুঁড়ো, জ্যোৎস্নার মোম। কুকুর কাঁদছে শূন্যতার দিকে চেয়ে। আদিগন্ত ছায়াপথ পড়ে আছে হিম আকাশে। মানুষ হঠাৎ ঘুম ভেঙে চোখ চেয়ে দেখে। মূক হয়ে যায়। বিশ্বজগতের কোন রহস্যের সঙ্গে নিবিড় হয়ে আছে মগ্ন রমেন! ললিত তা কোনও দিনই জানবে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন