শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
সিগারেটটা তখনও শেষ হয়নি, মোড় পেরিয়ে আদিত্যকে আসতে দেখল ললিত। ব্যাটা অফিস কেটে এসেছে। ওর পিছনে কালো মতো একটা মেয়ে আসছিল। প্রথমে ললিত ভেবেছিল যে পথ-চলতি মেয়ে। কিন্তু কাছে আসতে বোঝা গেল সে আদিত্যর সঙ্গে আসছে।
এই যে লোলিটা। বলে হাসল আদিত্য। রোগা-ফরসা আদিত্য, ঝাঁকড়া চুল— মোটা ঠোঁটের আদিত্য, বেঠিক পোশাকের আদিত্য। কলকাতার বনেদি ঘুঘু ওদের বরিবার, বাগবাজারে ওদের প্রকাণ্ড একটা বাড়ি আছে যার ভিতর-মহলে যাওয়া এখনও বারণ, আর ওর বাবার এখনও একজন রক্ষিতা আছে শোভাবাজারে, যাকে আদিত্য এবং তার ভাইরা রাঙা-মা না কী-যেন-মা বলে ডাকে। বাইরের চাকরি-বাকরি, আড্ডা সেরে বাড়িতে ঢুকলেই ওরা দেড়শো বছরের পুরনো একটা জগতের মধ্যে চলে যায়, যেখানে এখনও রয়েছে দেড়শো বছরের পুরনো বাসন-কোসন, বিছানা, সেজবাতি, আলমারি, পুতুল এবং আচরণ।
আয়। বলে একটু বিব্রত মুখে হাসল ললিত, বলল, ঘরে এক দঙ্গল বুড়ির ভিড়। কোথায় যে তাদের বসাব!
আদিত্য মেয়েটার দিকে ফিরে বলল, এই হচ্ছে ললিত। কাঠ বাঙাল। তারপর ললিতের দিকে ফিরে বলল, বুঝলি লোলিটা, সতীর এক মেসোমশাইয়ের ক্যান্সার হয়েছিল। অপারেশনের পর বেঁচে গেছে!
ললিত হাসল, তাই নাকি!
মেয়েটিকে এক পলকেই দেখে নিল ললিত। সম্ভবত আদিত্যর প্রেমিকা। কালোর মধ্যে মিষ্টি মুখখানা, সুন্দর বড় একজোড়া চোখ। দেখে মনে হয় প্রাণে দয়ামায়া আছে, হৃদয় আছে। চালু নয় খুব। কিন্তু রোগা নরম ধরনের শরীরটিতে মা-মা ভাব। একনজরেই ভাল লাগে। আদিত্যর কপাল ভালই। কিন্তু মেয়েটার?
ললিত মৃদু গলায় বলল, চলুন, আপনাকে আমার মা’র কাছে নিয়ে যাই। আমরা দুই বন্ধু গলিতে দাঁড়িয়ে গল্প করব।
আদিত্য বাধা দিল, তুই ওকে লজ্জা পাস না ললিত। মাইরি, তোর যা লজ্জা! পরিচয় করে নে, এ হচ্ছে শাশ্বতী ব্যানার্জি, আমি সংক্ষেপে সতী বলে ডাকি। আমাদের শিগগিরই বিয়ে হবে। কালীনাথের কাছে তোর ফোনের খবর পেয়েই কলেজে গিয়ে ওকে ধরলুম। তোর কথা ওকে অনেক বলেছি, তাই বললুম, চলো দেখে আসবে, আর তোমার মেসোমশাইয়ের গল্পটাও শুনিয়ে দিয়ে আসবে ওকে। ব্যাটা সাহস পাবে তা হলে।
ললিত আবার মেয়েটিকে বলল, ঘরে চলুন।
মেয়েটি দ্বিধায় পড়ে বলল, থাক না, আমি বরং এইখানেই দাঁড়িয়ে গল্প করি।
আদিত্য বলল, সেই ভাল। মাসিমা একা থাকলে কথা ছিল না। কিন্তু পাড়ার বুড়িদের চোখ কটকট করবে। মাসিমাকে পরে বাঁকা বাঁকা কথা শোনাবে হয়তো। থাকগে। ললিত মাইরি তুই হাসপাতালে থেকে একটু লালটু হয়েছিস।
তুই তো এক দিনও যাসনি দেখতে হাসপাতালে!
মাইরি, তুই রাগ করেছিস? আমার ভাই কোনওকালে হাসপাতাল-টাতাল সহ্য হয় না, ওষুধের গন্ধ, মড়া-ফড়া, রোগের জীবাণু সব মিলিয়ে কেমন গা গুলোয়, বমি পায়, মাথা ধরে। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হয় কেমন একটা ভয় ঢুকে যায় মাইরি, মনে হয় আমিও মরে যাব। রাতে ঘুম হয় না। আমাদের সাতপুরুষের কেউ হাসপাতালে যায়নি, বাড়ির বাঁধা ডাক্তারের হাতে মরেছে। তুই তো জানিস।
ললিত হাসল, ঠিক আছে, তোকে ফাঁড়া কাটাতে হবে না। ললিত মেয়েটিকে বলল, আপনারা একটু দাঁড়ান, আমি গায়ে একটা জামা দিয়ে আসি। পাড়ায় একটা চায়ের দোকান আছে। বাজে দোকান। সেখানে বসেই একটু গল্প করা যাবে। কেমন!
মেয়েটি ঘাড় নাড়ল।
ঘরে ঢুকে যখন জামা নিচ্ছিল ললিত তখন মা বলল, বেরোচ্ছিস?
না। চায়ের দোকানে যাচ্ছি।
কেবল চা আর চা।
বেরিয়ে এল ললিত।
গণেশের দোকান। বাইরের দিকে কাচের বাক্সে ছানার মিষ্টি সাজিয়ে রাখে, ভিতরে ঘিঞ্জি জায়গায় একখানা বেঞ্চি আর লম্বা একটা টেবিল, অনেকটা স্কুলের হাইডেস্কের মতো। সকাল বিকেল পাড়ার বখাটে ছেলেরা আড্ডা দেয় এখানে। দুপুর বলে কেউ নেই। গণেশ তার শিয়রে কাঠের ক্যাশ বাক্স তার মুখের ওপর মাছির জন্য আধময়লা গামছা ফেলে রেখে ঘুমোচ্ছিল। ডাকতে যাচ্ছিল ললিত, আদিত্য বাধা দিয়ে বলল, দে না ঘুমোতে বেচারাকে। আমরা নিরিবিলিতে গল্পগাছা করি, ও যখন উঠবে, উঠবে।
শাশ্বতী মৃদু গলায় বলল, সেই ভাল।
তিনজনে পাশাপাশি বসল। মাঝখানে আদিত্য; দু’ পাশে শাশ্বতী আর ললিত।
আদিত্য বলল, দ্যাখ, মাইরি, আমি বড় মুশকিলে পড়ে গেছি। জীবনে একটা মাত্র প্রেম করলুম, তাও বাঙাল মেয়ের সঙ্গে।
বাঙাল! ললিত ঝুঁকে শাশ্বতীর দিকে তাকাল, কোথায় বাড়ি ছিল আপনাদের?
যশোরে, কপোতাক্ষতীরে।
কপোতাক্ষতীরে!
শাশ্বতী হাসল, সাগরদাঁড়ি থেকে আমাদের গ্রাম খুব দূরে ছিল না। আমি অবশ্য দেশ দেখিনি, আমার জন্ম কলকাতায়, দেশ ভাগের পরে। তবু লোককে বলার সময়ে বলি আমরা মাইকেল মধুসূদনের প্রতিবেশী ছিলাম।
আদিত্য করুণ মুখে বলল, হ্যাঁ দ্যাখ, শাশ্বতী পুরোপুরি বাঙালও নয়, কলকাতার লোকেদের চেয়েও ভাল কলকাতার কথা বলে, ওর বাড়ির লোকেরাও তাই, কিন্তু আমার বাড়ির লোকেরা কিছু বুঝবে না। বাঙালের গন্ধ পেলেই কুরুক্ষেত্র লেগে যাবে। মাইরি দ্যাখ, আমার বেশির ভাগ বন্ধু বাঙাল, তুই, তুলসী, সঞ্জয় আরও অনেক, নিজের পাড়ায় আমার বন্ধু নেই, তবু দ্যাখ বিয়ের সময়ে বাড়ি থেকে ঠিক করবে আর-এক ঘূণধরা বনেদি পরিবারের মেয়ে— যার গায়ে রোদ লাগেনি।
কী করবি এখন! হেসে ললিত বলে।
আমি আলাদা হয়ে যাচ্ছি বাড়ি থেকে। বলে আদিত্য শাশ্বতীর দিকে তাকিয়ে হাসল, বুঝলি লোলিটা, সতী বলেছে যে, ও আমাদের পরিবারে ঢুকে একটা বিপ্লব ঘটাবে। মা’কে ট্যাক্সি করে নিয়ে সিনেমায় যাবে। বাবাকে ষোলো ইঞ্চি ঘেরের প্যান্ট আর টি-শার্ট পরিয়ে নিয়ে যাবে বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলনে। মাইরি, সতী, তোমার আয়ুটা গণৎকার দিয়ে দেখানো উচিত। আমি ও-সব রিস্ক-এর মধ্যে নেই। আমি আলাদা বাস করছি।
ললিতের ইচ্ছে হল একবার জিজ্ঞেস করে যে, তা হলে কী করে ওদের চলবে! আদিত্য চাকরি করে সরকারের, বড় কেরানি। তবু ললিত জানে চাকরিটা ওর কিছু নয়, ওর আসল অস্তিত্ব ওর বাগবাজারের বাড়ি আর বাবার ব্যবসা। নিজের বাড়িকে যতই গাল দিক আদিত্য, তবু ললিত জানে ওই বাড়ি আছে বলেই আদিত্যকে অনেক কিছুই সইতে হচ্ছে না, ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলে বাইরের পৃথিবীর নানা রকমের মার সে সইতে পারবে কি! ভাবল ললিত, কিন্তু মুখে কিছু বলল না। সুখী ছেলে আদিত্য, খুব পুরু বিছানায় শোয়, কেওড়া দেওয়া জল খায়, শ্বেতপাথরের ওপর হাঁটে।
আদিত্য শাশ্বতীকে বলছিল, আমার বাবা এক্কেবারে খ্যাপা, বুঝলে! বাবা না মাইরি, একটা লোককে কামড়ে দিয়েছিল। বলে ফিরে ললিতের দিকে চেয়ে বলল, তুই তো জানিস! সেই শরিকের ঝগড়া, বাবার জ্যাঠতুতো ভাই আমাদের অস্তুকাকুকে বাবা দিনেদুপুরে কামড়ে দিল…
গল্প বলার এমনই একটা বৈঠকি চাল আছে আদিত্যর যে, যে-কোনও গল্পকেই সে সকলের শোনার মতো করে তোলে। আর-একটা গুণ— ও নিজের কিছুই গোপন রাখে না। সব বলে দেয়, মনে যা আসে সব।
গল্পটা বলতেই যাচ্ছিল আদিত্য, শাশ্বতী নিচু গলায় ওকে কিছু বলল। আদিত্য— ও হ্যাঁ হ্যাঁ, বলে ললিতের দিকে চেয়ে বলল, দ্যাখ মাইরি নিজের সমস্যা নিয়ে এমন মেতে আছি, তোর খোঁজই নেওয়া হচ্ছে না।
ললিত জিজ্ঞেস করল, তোরা কবে বিয়ে করছিস?
দেখি। শিগগিরই করব। তুই একটা বাসা খোঁজ— বলেই আবার সামলে গেল আদিত্য, তোর তো আবার অসুখ! শালা, এ-বয়সে কোথা থেকে বাগালি রোগটাকে! মাইরি, পারিস তুই মানুষকে চমকে দিতে! তারপর গলা নিচু করে বলল, হ্যাঁরে লোলিটা, মরে-ফরে যাবি না তো! মাইরি, মরিস না, ভীষণ ভেঙে পড়ব রে, শালা আর বাঁচতেই ইচ্ছে করবে না। কথা দে—
কী কথা?
মরবি না।
ললিত হাসল প্রাণ খুলে। তারপর বলল, এখন আর কিছু দিতেই আপত্তি নেই। যা, দিলাম তোকে কথা।
দিলি! তা হলে মরবি না। বরং সতীর কাছে ওর মেসোমশাইয়ের গল্পটা শুনে নে।
শাশ্বতী ঝুঁকে ললিতের দিকে চেয়ে বলল, আমার মেসোমশাইয়ের গল্পটা কিন্তু সত্যি। উনি এখনও বেঁচে আছেন, চাকরি করছেন।
তাই নাকি! ললিত হাসল।
শাশ্বতী গলায় যথেষ্ট দৃঢ়তা আনার চেষ্টা করে বলল, দেখবেন, আপনি সেরে যাবেন।
হঠাৎ ললিত খুব নিষ্ঠুরের মতো শাশ্বতীকে ধূলিসাৎ করে দিয়ে হেসে বলল, আপনারা তাড়াতাড়ি বিয়েটা করে ফেলুন। আমি যেন দেখে যেতে পারি।
বলেই দেখল শাশ্বতীর মুখ ম্লান হয়ে গেল। আদিত্য তাকে একটা ঠেলা দিয়ে বলল শালা যমের জান লিয়ে লিব, দেখে লিস।
বিকেলের মুখে মুখে ওরা উঠল। তুলসী আর সঞ্জয় আসবে, কিন্তু সে-খবর আদিত্যকে দিল না ললিত। তা হলে আদিত্য থাকতে চাইবে। না, ওরা বরং এখন ময়দান বা গঙ্গার ধারে বা দোকানে গিয়ে বসুক, কিংবা হাঁটুক রাস্তার সুন্দর দোকানের আলোগুলোর ভিতর দিয়ে। কথা বলুক। শাশ্বতীকে তার কাছে এনে ভাল করেনি আদিত্য। সুন্দর মেয়েটা এমন একজনকে দেখে গেল, যে আর কিছুদিন পরে মারা যাবে। হয়তো এখন নানা দিনের মধ্যে মাঝে মাঝে সে দুঃখিতচিত্তে ললিতের কথা ভাববে। সভয়ে প্রতীক্ষা করবে আদিত্যর কাছে একদিন তার মৃত্যুসংবাদ শোনার। ললিত বোধ হয় আজ মেয়েটার বিকেল মাটি করে দিল, হয়ে রইল রাতে ওর মাথা ধরার বা কম খাওয়ার কারণ।
যশোরে কপোতাক্ষের তীরে ছিল ওর বাড়ি। সাগরদাঁড়ি থেকে খুব দূরে নয়। গলির মুখে দাঁড়িয়ে আর-একটা সিগারেট ধরিয়ে সে কবিতাখানা মনে আনবার চেষ্টা করছিল— দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি তব বঙ্গে…কবিতাটা কতবার ক্লাসে পড়িয়েছে ললিত। আশ্চর্য, তবু মুখস্থ হয়নি!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন