শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
সেই রাত্রে আর রমেনের ফেরা হল না। বালিগঞ্জ স্টেশন থেকে যখন ট্রেনটা ছাড়ছিল তখন হতভম্ব ললিত চেঁচিয়ে তাকে বলেছিল, তুই সত্যিই চললি নাকি?
রমেন মৃদু হেসে ঘাড় নাড়তে ললিত আবার চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, কবে ফিরবি?
রমেন তার উত্তর দিতে পারেনি। আসলে সে তো কোথাও ফেরে না। যেখানেই সে যায় সেখানেই তার ফিরে যাওয়া। অন্তত ওই রকমভাবেই ভাবতে চেষ্টা করে রমেন। আশ্চর্য এই যে, ভাবতে আজকাল আর অসুবিধে হয় না। তবু ললিতের জন্য কষ্ট হচ্ছিল। রমেনকে ছাড়া আজকাল বোধ হয় ললিতের একটু একা-একা লাগে।
পলাশপুরের নতুন বাসায় পা দিতে-না-দিতে মৃদুলার মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সন্ধের মুখে পৌঁছে তারা খানিক দূর ইলেকট্রিকের আলো আর পিচের রাস্তা পেল। তারপর অন্ধকার কাঁচা রাস্তায় একটুখানি গিয়ে ফাঁকায়, প্রায় মাঠের মধ্যে অন্ধকার বাসা। তুলসীর ছাত্ররা আর কয়েকজন মাস্টার, বাড়িওয়ালা নিজে— সবাই মিলে কয়েক পলকে পুরুষালি রীতিতে যেমন-তেমন ভাবে ঘর দু’খানা সাজিয়ে ফেলতে সাহায্য করল। কিন্তু হ্যারিকেনের আলোয় যে ধোঁয়াটে অন্ধকার সৃষ্টি হয়ে থাকে তাতে অভ্যাস ছিল না বলে মৃদুলার কেবল মনে হচ্ছিল সে এক চির অন্ধকারের নির্বাসনে এসেছে। আর কোনও দিন কলকাতা আর বেহালার মুখ দেখবে না। বাড়ির ভিতরদিককার দরজা খুলে ভিতর-বারান্দায় দাঁড়াতেই প্রতিপদের চাঁদের আলোয় ভাসা উঠোন, তারপর আগাছার বেড়া, আর বহুদূর বিস্তৃত এক কুয়াশায় মেঘাচ্ছন্ন আগাছা কণ্টকিত প্রান্তর দেখে তার মনে হল সে মৃত্যুর পরের জগতে চলে এসেছে। চারদিকের এ-জগৎ বেঁচে থাকার জগৎ নয়।
চা খেয়ে সবাই বিদায় নিয়ে গেলে রইল কেবল তুলসীর লম্বা সন্ন্যাসী বন্ধুটি। এও হয়তো কাল কি পরশু চলে যাবে। ভেবে মৃদুলার কেমন কান্না পায়। এখন যে-কোনও মানুষ কাছে থাকলেই ভাল লাগবে। যে-কোনও মানুষ।
নতুন তোলা-উনুনে চালে ডালে চাপিয়ে ভাজার বেগুন কুটতে বসেছিল সে, এমন সময়ে যে-সব ভীরু মেয়েরা দরজার আড়াল থেকে তাদের মালপত্র নিয়ে আসতে দেখেছে তারা আসতে লাগল এক দুই করে। অসম্ভব তাদের কৌতূহল কলকাতার মেয়েদের প্রতি। তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই মৃদুলা বুঝতে পারছিল যে গ্রাম সুখের জায়গা নয়।
তুলসী আড়াল আবডাল থেকে হ্যারিকেনের মাজা আলোয় যতটা সম্ভব মৃদুলার মুখের ভাব লক্ষ করে যায়। তারপর নানা কথা ভেবে কেমন একটু নার্ভাস বোধ করে। এতখানি করার পর যদি মৃদুলা সুখী না হয়ে থাকে তবে তার সুখ কোথায়?
নতুন চৌকির ওপর সদ্য পাতা বিছানায় রমেনের মুখোমুখি আঁট হয়ে বসে একটা সিগারেট ধরাল তুলসী। বলল, এ-জায়গাটা খুব ডেভেলপ করবে, বুঝলি? ভাবছি কিছু জমিয়ে-টমিয়ে এ দিকেই জমি কিনব।
কথাটা বলেই তার খেয়াল হল যে, যাকে সে এই কথা বলল তার জমি-বাড়ি কিংবা পার্থিব সঞ্চয়ের প্রতি আগ্রহ না থাকারই কথা! মনে মনে একটু লজ্জা পেল তুলসী। বরাবর রমেনের কাছে নিজেকে তুচ্ছ বলে মনে হয়েছে তার, আজও হল।
সকালবেলায় উঠেই রমেনের চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু মৃদুলা একটু আপত্তি তুলল, কেন যাবেন এক্ষুনি? কোনও কাজ তো নেই! আজকের দিনটা থেকে যান না।
আসলে বালিগঞ্জ স্টেশনে বিভুকে দেখার পর থেকেই মৃদুলা ক্রমান্বয়ে অস্বস্তিতে আছে। কেবলই মনে হয় যে-কোনও সময়ে যে-কোনও দিন বিভুর আবির্ভাব ঘটবে এইখানে। তুলসীকে মৃদুলা চেনে। যদি কখনও বিভুর মুখোমুখি হয় তবে কোথায় উবে যাবে তুলসীর সাহস! বিভুর আক্রোশের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতাই তুলসীর নেই। তাই লম্বা চওড়া সাহসী রমেন কয়েকটা দিন তাদের কাছে থাক। দুটো ঘরের একটা তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
রমেন থাকল।
মৃদুলাকে বালিগঞ্জ স্টেশন থেকে চলে যেতে দেখল বিভু। ফেরার পথে ট্যাক্সিতে খুব অন্যমনস্কভাবে বসে ছিল সে। গড়িয়াহাট পেরিয়ে যাওয়ার পর লক্ষ করল সামনে আর একটা ট্যাক্সি। পিছনের কাচ দিয়ে দেখা যায়, একটি ছেলে আর একটি মেয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে আছে।
প্রথমটায় কিছু মনে হয়নি বিভুর। দৃশ্যটা উদাসীনভাবে দেখল একটু। কিন্তু ট্যাক্সিটা আগাগোড়া তার ট্যাক্সির আগে আগে চলছিল। এতে সামান্য উষ্ণতা বোধ করল সে। কেন ওই ট্যাক্সিটা আগে আগে যাবে! বিকেলের নিস্তেজ আলোয় সে লক্ষ করে, মেয়েটার মাথা ভেঙে ছেলেটার ঘাড়ে নেমে আসে। ছেলেটা একটা হাত তুলে মেয়েটার কাঁধ জড়িয়ে ধরেছে। ওদের দু’জনেরই অবস্থা একটু বেসামাল।
বিভু হাত বাড়িয়ে ট্যাক্সিওয়ালার কাঁধ ছুঁয়ে বলে, ওই ট্যাক্সিটাকে ওভারটেক করো সর্দারজি।
ট্যাক্সিওয়ালা বিভুকে খানিকটা চেনে। যারা চেনে না তারাও চিনে নেয়। ফলে সর্দারজি নিঃশব্দে ঘাড় নেড়ে হর্ন দিল।
ত্রিকোণ পার্কের কাছে দুটো ট্যাক্সির জানালা সমান্তরাল হলে বিভু মুখ বাড়িয়ে দেখে, মেয়েটার কোলে ছেলেটার হাত।
বিভু চেঁচিয়ে বলল, এই শালা, সরে বোস।
ভীষণ চমকে ছেলেটা হাত টেনে নিল। ওদের ট্যাক্সিওয়ালা ফিরে তাকাল। বিভুর চিৎকারেই বুঝি ওদের ট্যাক্সিটা টলমল করে একটু আঁকাবাঁকা হয়ে আবার সোজা হল।
ওদের পেরিয়ে এসে বিভু পিছন ফিরে দেখল, ছেলেটা আর মেয়েটা অনেক দুরে সরে বসেছে। হাসল বিভু। পরিতৃপ্তির হাসি। শালা প্রেম করবে! দেশের এই অবস্থা, আর শালারা প্রেম করবে, অ্যাঁ!
মাঝে মধ্যে আজকাল বিভুর অদ্ভুত সব খেয়াল দেখা যায়। রাস্তা দিয়ে দু’টি ছেলেমেয়ে জোড় বেঁধে যাচ্ছে, বিভু হয়তো আসছে উলটো দিক থেকে। এ-রকম অবস্থায় সে ঠিক দু’জনের মাঝখান দিয়ে সোজা হেঁটে যায়; দু’জনকে ছিন্ন করে, দূরে সরিয়ে আনন্দ পায়।
রাসবিহারীর মোড়ের কাছে, রসা রোডে একদিন এই কাণ্ড করল বিভু। এবারের ছেলেটা হলুদ গেঞ্জি গায়ে, স্বাস্থ্যবান চেহারা। ফলে ঘুরে দাঁড়িয়ে ছেলেটা বিভুর কাঁধ চেপে ধরল।
বিভু ফিরে দাঁড়ায়। আপনমনে শান্তভাবে একটু হাসে। তাই! ছোকরার গায়ে জোর আছে। প্রেমিকাকে বীরত্ব দেখাতে চায়।
কী হল এটা? ভদ্রভাবে হাঁটতে শেখোনি! ছেলেটা গরম খেয়ে বলে।
বিভু শুধু হাসে। গায়ে জোর থাকলে কী হয়, প্রেমিকরা কোনও দিনই তেমন নিষ্ঠুর হতে জানে না। তুমি কি পারো আমার মতো হৃদয়হীন হতে! পারলে তুমি হতে মাস্তান। কিন্তু তুমি তো তা নও।
বিভু কিছুমাত্র গায়ের জোর দেখাল না। কেবল অতিশয় হৃদয়হীনতায় ঠান্ডা মাথায় ডান হাতের দুটো আঙুল সাঁড়াশির মতো তুলে লঘু হাতে ছেলেটির চোখের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল।
এই হল কায়দা বুঝলে! শত রেগে গেলেও তুমি কখনও পারবে না কারও চোখে আঙুল ঢোকাতে। তোমার মায়া হবে।
ছেলেটা প্রথমে বুকফাটা চিৎকার করে দু’চোখ চেপে ধরেছিল। চশমা পরা মেয়েটা প্রথমে বুঝতে পারেনি কী হল। তারপর বুঝতে পেরে সে তাড়া করল বিভুকে হাতের সাদা ভ্যানিটি ব্যাগটা অস্ত্রের মতো তুলে ধরে।
বিভু শান্তভাবে কয়েক পা দৌড়ে গেল। ভাগ্যক্রমে পেয়ে গেল ছুটন্ত বাস।
পা-দানিতে দাঁড়িয়ে দূর থেকেই সে দেখল ছেলেটা ফুটপাথে গড়াগড়ি যাচ্ছে। বোধ হয় কাঁদছে। ভিড় জমে উঠেছে আস্তে আস্তে।
প্রেম! শালা প্রেম! দেশের লোক বোমা বন্দুক খেয়ে মরে যাচ্ছে, ফসল ফলছে না জমিতে— তোমরা শালা প্রেম করবে! প্রেমের কি এই সময়! প্রেম দিয়ে কী হয় রে শালা জীবনে, যে সর্বস্ব নিয়ে একটা মেয়ের পিছনে ল্যাং ল্যাং করে ঘুরবে একটা ছেলে!
বিভু তাই রাস্তায় জোড়া ছেলেমেয়ে দেখলে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কখনও দূর থেকে চেঁচিয়ে আওয়াজ দেয়। মুখ খারাপ করে।
বিশু মাঝে মাঝে তাকে সাবধান করে দেয়, বড় বেশি তড়পাচ্ছিস। একদিন বেমক্কা মার খেয়ে যাবি, তোর চেয়ে ঢের মাস্তান আছে।
কিন্তু বিভু বিড় বিড় করে। না, তার চেয়ে বেশি কেউ নেই।
টুপু যেদিন মৃদুলাকে তুলে দিয়ে এসেছিল তার পরদিনই ফুটপাথের দোকান থেকে একটা দেশি লোহার লম্বা চকচকে ছুরি কিনেছিল। হাতলটা কাঠের। ছুরিটা এত লম্বা যে পকেটে আঁটে না।
পরদিন শানে ঘষে ছুরিটাকে আরও তেজালো করে তুলেছিল সে। বন্ধুরা দেখে বলল, বেশ ছুরি। কী করবি এটা দিয়ে?
দেখিস।
টুপু ছেলেমানুষ। কিন্তু ঠিক ছেলেমানুষের মতো সে বলেনি কথাটা। স্টেশনে দিদির সামনে দিয়েই যখন বিভু হেঁটে গিয়েছিল তখন দিদির মুখের ভাব আর বাবার অসহায় শ্বাস টানা সে লক্ষ করেছিল। এর পর থেকেই তার নিজেকে বড় বেশি অসুখী মনে হয়েছিল। এত বিমর্ষ সে আর কখনও বোধ করেনি।
খোলা অবস্থায় ছুরিটা সে পকেটে রাখে। পকেটে হাত দিয়ে মাঝে মাঝে অনুভব করে হাতলটা। ছুরিটাকে নাড়ে, ঘোরায়। ফলে কয়েক বার তার হাত কাটল, ছুরির ডগায় ফুটো হয়ে গেল আঙুল।
রাতে মা-বাবার চোখের আড়ালে দিদির শোওয়ার ঘরে একটা পুরনো কোলবালিশ দেয়ালের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে ছুরিটার প্রথম পাঠ নিল টুপু। আশ্চর্য কোলবালিশটা ঠিক ছুরি-খাওয়া মানুষের মতোই সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে গেল। পেটের ওপর হাতলটা রইল জেগে।
কেবল টুপু জানল, এ-রকম হবে। আর-কেউ জানল না।
টুপুর সিনেমায় যাওয়া বারণ। কিন্তু পোস্টার দেখে সে দুটো মারদাঙ্গার ছবি বেছে নিল। স্কুল পালিয়ে দেখে এল দুটো ছবি। তার চোখে মুখে এবং মনে যথেষ্ট হিংস্রতার সঞ্চার হয়ে গেল। ছবি দুটোর শেষে সত্য এবং অহিংসা এবং প্রেম ইত্যাদির কথা বলা হয়েছিল। টুপু সেগুলো মনে রাখল না।
আজকাল টুপু ডিটেকটিভ বইগুলো দু’বার করে পড়ছে।
বাইরে থেকে তাকে এখন বেশ ভাবুক আর গম্ভীর দেখায়। কেউ ‘বিভুর শালা’ বলে চিৎকার করে তাকে খ্যাপালে সে ফিরেও তাকায় না।
সে এই পারিবারিক দুর্দিনের শেষ দেখতে চায়।
কয়েক দিনই গা-ঘেঁষা দূরত্বে দেখা হল বিভুর সঙ্গে। আগের মতোই রাস্তা ছেড়ে পাশে সরে দাঁড়াল টুপু। ভয় পেল। চোখে চোখ রাখল না।
টুপু নানাজনের কাছে শুনে শুনে শিখেছে যে পেটই হল সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। সেখানে হাড় নেই। ছুরিটা ঢুকিয়ে একটু আড়াআড়ি টেনে দিতে হয়। ছুরিতে খুব ধার থাকলে ব্যাপারটা মোটেই শক্ত না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন