বিংশ অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

কুড়ি

রাত্রে ঘুমের মধ্যে অস্পষ্ট কথা বলে পাশ ফিরল শাশ্বতী। মৃদু একটু হাসল স্বপ্নের ভিতরে।

হৈমন্তীর গায়ের ওপর তার পা। হৈমন্তী ঠেলা দিয়ে বলল, এই, ঠিক হয়ে শো। আমার গায়ে ঠ্যাং তুলে দিচ্ছিস।

শাশ্বতী ঘুমের মধ্যেই তাকায়, তারপর বিড়বিড় করে অস্পষ্ট কথা বলে একটু। বোধ হয় বলে, তোমরা সবাই শাশ্বতীকে ক্ষমা কোরো। আমি কি ছাই বুঝি আমার মন! তোমাদের কাউকে যদি দুঃখ দিয়ে থাকি, ক্ষমা কোরো।

শাশ্বতী ভেবে রেখেছে, খুব শিগগিরই সে একদিন ললিতের সঙ্গে দেখা করবে। জিজ্ঞেস করবে, এতে আপনার কী স্বার্থ ছিল? কেন আপনি এমন কাজ করতে গিয়েছিলেন?

ললিতের সঙ্গে ঝগড়া করার মতো অনেক কথা শাশ্বতীর মনে পড়ে। কেন আমাকে মন বোঝার সময় দিল না! কেন ধরে-বেঁধে নিয়ে গেল ম্যারেজ-রেজিস্ট্রারের কাছে! কী স্বার্থ তোমার ললিত! না, অত পুরুষমানস মিলে জোর করে কোথাও ধরে নিয়ে যেয়ো না শাশ্বতীকে। বরং তাকে আর একটু সময় দিয়ো। আর-একটু মায়া কোরো শাশ্বতীকে। শাশ্বতী কি ছাই বোঝে তার মন! আর তুমি! শুনেছি, আজ টেলিফোন ডিরেক্টরির পাতা ওলটাতে তোমার হাত কেঁপেছিল। তুমি দু’ আঙুলে সিগারেট ধরে রাখতে পারছিল না! আমার ওপর কীসের প্রতিশোধ তোমার! তুমি তো জানতেও না তুমি কী করে ফেলতে যাচ্ছ! তবু তুমি জোর করে কেন ঘটাতে চাইছিলে ওই অঘটন! তোমার মায়া দয়া নেই!

অনেক রাত পর্যন্ত জেগে ছিল সঞ্জয়। সামনে একটা গ্রিল দেওয়া ছোট বারান্দা আছে। সেখানে ইজিচেয়ারটা টেনে নিয়ে পাশে খুদে টেবিলে হুইস্কি নিয়ে বসে ছিল। গরম লাগছিল খুব, শুতে ইচ্ছে করছিল না। তা ছাড়া তলপেটের ব্যথাটা কেমন একটা টানা দপদপানিতে দাঁড়িয়ে গেল। নড়তে-চড়তে লাগে। এ-রকম ব্যথা নিয়ে ঘুমোনো যায় না। তা ছাড়া ঘুম সামান্য একটু কমে গেছে সঞ্জয়ের। স্বাভাবিকভাবে বড় একটা ঘুম আসতে চায় না, কেবল হাই ওঠে, শরীর ম্যাজ ম্যাজ করে। চিন্তায় ভার হয়ে যায় মাথা। ঘুম এলেও অস্বাভাবিক সব স্বপ্ন দেখা দেয়। তার চেয়ে হুইস্কিই ভাল। শরীরে ব্যথা বেদনা আস্তে আস্তে মৃদু ঝিমঝিমির মধ্যে ডুবে যেতে থাকে। গাঢ় চুম্বনের মতো আঠা হয়ে লেগে আসে চোখের পাতা। আঃ, শান্তি। ঠিক বটে যে সেটা আসলে চুম নয়, অজ্ঞান হয়ে থাকা। কারণ, সকালে উঠে কখনও ঠিক ঘুমিয়ে ওঠার তৃপ্তি টের পায় না সে। মনে হয়, অজ্ঞান অবস্থা থেকে জ্ঞান ফিরল। সারা দিন আবার হুইস্কির জন্য শরীর সাপের মতো ফোঁসে, ছোবলায়।

বারান্দায় হাওয়া ছিল। স্নান এবং সামান্য একটু রুটি মাংসের পর হুইস্কির স্বাদই আলাদা। ধীরে ধীরে সময় নিয়ে খাচ্ছিল সঞ্জয়। রিনি আগে ধমকাত, কাঁদত, আজকাল গা করে না। শুধু বলে, বাথরুমে সাবধানে যেয়ো, আমার কাচের তলমারির গায়ে পাতো না। রাতে বিনি, পিকলু ঘুমোবার পর কয়েক মুহুর্তের জন্য এসে বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল। বলল, কী আজ কতক্ষণ চলবে?

শোওয়ার সময়েও রিনির ঠোঁটে লিপস্টিক। সঞ্জয়ের ইচ্ছে হল বলে, ঠোঁট ধোও না কেন? সবসময়ে লিপস্টিক মেখে থাকলে রঙের তলায় ঠোঁটের চামড়া সাদা হয়ে যাবে! কুষ্ট-ফুষ্ট কত কী হতে পারে, আজকালকার কেমিকালে বিশ্বাস কী

কিন্তু সঞ্জয় কিছু বলল না। উত্তরে রিনি তা হলে অনেক কথা বলবে, মদটদ খাওয়া নিয়ে, তার অতীত জীবন নিয়ে— ঝগড়াই লেগে যাবে হয়তো। দরকার কী? ও ওর মনে থাক। একটু লিপস্টিক বই তো নয়। মা সারা দিন পান খায়, তাই সকালে মুখটুখ ধোয়ার পর ঠোঁটের দু’পাশের কষে সাদা দাগ দেখা দেয়। ঘেন্না করে সঞ্জয়ের। রিনির লিপস্টিক থেকেও ও-রকম কিছু দাগ-ফাগ হওয়া বিচিত্র নয়।

ছিপছিপে শরীর, আঁট করে খুন-খারাপি রঙের শাড়ি পরেছিল রিনি, শরীরটা ওর এত সতেজ যে যেন চারপাশটাকে আক্রমণ করছে। চলায়-ফেরায় একটা ধনুকের মতো ছিটকে ওঠার ভাব আছে। আট-ন’মাস আগে ও যখন পোয়াতি ছিল তখনও ওর সতেজ ভাবখানা ছিল লক্ষ করার মতো। এখনও বোঝা যায় না যে বাচ্চা হয়েছে। কপালে লিপস্টিকেরই একটা গোল ফোঁটা দেয় রিনি, চুলের মধ্যে কোন অতল অরণ্যে ক্ষুদ্র একটু সিঁদুরের বিন্দু ছোঁয়ায়, বাইরে থেকে বোঝা যায় না। মাঝে মাঝে কত কসমেটিক আনতে বলে সঞ্জয়কে, কখনও বলে না, সিঁদুর এলো। একদিন সঞ্জয় ঠাট্টা করে বলেছিল, আমার একটা খরচ বেঁচে গেছে, বাবা৷ সিঁদুরের। শুনে রিনি ম্লান মুখে বলেছিল, তুমি মেয়েদের ব্যাপারে কেন মাথা গলাও? স্বামীকে সিঁদুরের কথা বলতে নেই জানো? বিয়ের পর বছরে বোধ হয় সেরখানেক সিঁদুর লাগত রিনির। মাথা এ-ফোঁড়, ও-ফোঁড় করে কুড়ুলের কোপের মতো জমে থাকত সিঁদুর, সুন্দর টিকলো নাকের ওপর গুঁড়ো ঝরে পড়ত। আমি আর কুমারী নই, তোমরা কেউ আর আমাকে যাচ্ঞা কোরো না—এই কথা ঘোষণা করত সগর্বে। এখন আবার অনেকটা কুমারী হয়ে গেছে রিনি, সিঁদুর লুকোয়।

জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, কারও প্রেমে পড়োনি তো? তোমাকে গিটার শেখাতে এক মাস্টার আসে না ছোকরা মতো? তাকে আমি দেখিইনি। রেডিয়োতে হিন্দি কিংবা রবীন্দ্রসংগীত বাজায় বলে শুনেছি। দেখতে কেমন? উম্যান-ইটার! দুপুরবেলায় আসে তো, না?

টিজ করতে ইচ্ছে করে। টিজ তবু কিছুই করেনি সঞ্জয়। তলপেটে আদিত্যর লাথিটা তখনও জমে আছে। কেন যে শালা বেড়েছিল লাথিটা কে বলবে! রোগা আধমরা ললিতটাকে চড়টা কষিয়েছিল জুতমতোই। কেন যে তা কে জানে? কী যেন নাম সেই কালো কালো মেয়েটার? শাশ্বতী না কী যেন, এমন কিছু সুন্দর নয় সে, বিয়ের বাজারে চালাতে গেলে নগদ দু’-তিন হাজারের ধাক্কা, তবু তার জন্যই খেপে গেল পাগল আদিটা। দুর শালা। রিনিকে বরং দেখে যা। দেখে যা উঁচু-নিচু কাকে বলে! কী রকম মোলায়েম ফরসা চামড়ায় বাঁধানো আমার বউ, দেখে যা। ওই কালো মেয়েটার জন্য কি খুব বেশি হুজ্জুত করা যায়! তবু মাইরি তুই কতকালের সব পুরনো দোস্তদের না-হক মাস্তানি দেখিয়ে গেলি! কোনও মানে হয়? ললিত বাগড়া দিচ্ছে? তো দিয়ে দে না ওই আধমরা ছেলেটাকে ওই কালো মেয়েটা! দু’-চারদিন ভোগ করে নিক। তারপর তো মরেই যাচ্ছে ও। ও মরে গেলে, মানুষের তো তখন আর কোনও স্বত্ব থাকে না, তখন ওর স্থাবর অস্থাবর আমরাই তো পাব রে! একটু উদার হলে দ্যাখ, কত ঝগড়া কাজিয়া এড়ানো যায়। তোরা কী রে!

রিনি এগিয়ে গিয়ে গ্রিল ধরে কিছুক্ষণ রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল। ফাঁকা রাস্তা। হিন্দুস্থান পার্কে এ সময়টায় ভূত নামে। কেবল ও-ধারে একটা গ্যারাজের সামনে খাটিয়া পেতেছে এক বুড়ো দারোয়ান, নিশুত রাত চিরে পাতকুড়ুনিদের অপার্থিব চিৎকার ভেসে আসে, মা গো—।

রিনি মুখ ফিরিয়ে বলে, শুনছ?

কী?

ওই যে চিৎকার! বড্ড ভয় করে।

রিনি অপ্রস্তুত হাসি হাসে। তারপর বোধ হয় একটু চালাক হওয়ার চেষ্টা করে বলে, কী রকম যেন শাপ-শাপান্তের মতো শুনতে লাগে। এমন বিচ্ছিরি গলা করে ডাকে যেন সর্বস্ব চলে গেছে—

খামোখাই দামি লিপস্টিক মাখে রিনি। বাজে খরচ! সঞ্জয় জানে গিটার শেখানোর মাস্টারের সঙ্গে রিনি প্রেম করে না। আঙুলে আঙুলে ছুঁয়ে গেলে সতীত্বের ভয়ে কুঁকড়ে যায়। ধুস।

সঞ্জয় সামান্য হেসে বলল, আমি এক সময়ে ওদের কাছাকাছি থাকতাম। কত রাত চিৎপুরের ফুটপাথে শুয়ে কেটেছে বইয়ের দোকানের তক্তার তলায়। দুই-এক বার অনেকটা ভিক্ষের মতো করে লোকের কাছে হাত পেতেছি। ওর একটা মজা আছে।

কী মজা?

আছে। এখন আর সেটা বোঝাতে পারি না। তবে সর্বস্ব চলে যাওয়া একটা আনন্দ আছে।

রিনি চুড়ির ঝনন শব্দ করে রাস্তায় মুখ ফেরাল। তারপর হঠাৎ বলল, আবার ও-রকম হতে পারো?

সঞ্জয় মাথা নাড়ল, না।

রিনি মৃদু হাসি-মুখ ফিরিয়ে বলে, পারো না? তবে যে বলো মজা আছে! আমাকে খ্যাপানো অত সোজা, না?

সঞ্জয় বলল, এখন পারি না তার কারণ অন্য। এখন যদি লুঙ্গি পরে খালি গায়ে গিয়ে ফুটপাথে মাদুর পেতে শুয়ে থাকি, তবু মনে হবে, রাতে চোর এসে আমার কী একটা চুরি করে নেবে। কী একটা যেন খোয়া যাবে আমার। কিছু খোয়া না গেলেও ওই রকম মনে হবে। স্বস্তি পাব না। কিন্তু যদি কোনও দিন সত্যিই সর্বস্ব চলে যায়, তা হলে—

রিনি হাই তুলল। তারপর পরিপূর্ণ শরীরখানা একটু আলসেমি জড়ানো ভঙ্গিতে মুচড়ে সঞ্জয়ের সামনে এসে দাঁড়াল। ঘরে একখানা ড্রিম-ল্যাম্প জ্বলছে। তার আলো পড়ল ওর গায়ে। সাধু সন্ন্যাসীর মতো পবিত্র মুখ করল সঞ্জয়। বলল, তোমার গিটারটা একটু বাজাও না, শুনি! নতুন কী শিখেছ?

ঘুম পাচ্ছে।

ওঃ! তা হলে বরং গিয়ে ঘুমোও।

সঙ্গে সঙ্গে বেঁঝে ওঠে রিনি, আহা, আমি ঘুমোতে চাইলাম, আর উনি ঘুমোতে দিলেন। কেন, হুকুম করতে পারো না—না, আমি এক্ষুনি গিটার শুনতে চাই, নিয়ে এসো গিটার, আমার পায়ের কাছে বসে বাজাও—

সঞ্জয় হাত তুলে বলল, আস্তে। এ সময়ে জোরালো শব্দ শুনলে নেশা কেটে যায়।

অভিমানী মুখ করে রিনি বলে, যাও, বাজাব না।

শান্ত গলায় সঞ্জয় বলল, গিটারটা আনো।

সামান্য একটু আদর-কাড়া ঝগড়া করল রিনি। কিন্তু এতকাল পরে এই প্রথম তার বাজনা শুনতে চেয়েছে বলে সে চাপা আনন্দে একটু ঝলমলে মুখে সত্যিই গিটার নিয়ে সঞ্জয়ের পায়ের কাছে বসল। পিকলুকে যেমন কোলে নেয় রিনি তেমনই কোল দিল যন্ত্রখানাকে।

কী বাজাব?

দেহাতি গান জানো?

রিনি হাসে, গাঁইয়া কোথাকার।

তা হলে যা খুশি বাজাও।

একটু টুংটাং করে রিনি সত্যিই বাজাতে লাগল। বিভোর হয়ে।

একটু আশ্চর্য হয়ে সঞ্জয় শুনছিল। সেই ওঠা-পড়াহীন বিষণ্ণ মেয়ে-কান্নার সুরে গান, ঠিক যেমন দেহাতি গান হয়। রিনি তাই বাজাচ্ছে। সঞ্জয় গানটা একটুও ধরতে পারল না। কিন্তু পড়ন্ত বেলায় এক পাহাড়ি নদী পার হয়ে রংচঙে কাপড় পরে মানুষ মেলায় যাচ্ছে। সাজপরা গোরু টেনে নিয়ে যাচ্ছে রঙিন গাড়ি। এ-রকম দৃশ্য তার চোখে ভেসে উঠছিল।

রিনি থামলে জিজ্ঞেস করল, এটা কি হিন্দি ছবির গান?

দূর!

তবে?

ছেলেবেলায় গানটা শুনেছিলাম। সেবার দেওঘরে বেড়াতে গিয়ে। সুরটা মনে ছিল, সেই থেকে বাজালাম।

কথাগুলো কী বলো তো।

রিনি হাসল।

গার্ডবাবু, গার্ডবাবু, সিটি না বাজা না, ঝান্ডি না দিখানা, পিলাটফারম ম রহ গৈল গাঁটারিয়া… গুনগুন করে গাইল রিনি।

হাসতে হাসতে সঞ্জয় টের পাচ্ছিল পেটের নীচে একটা ভারী বস্তু ঝুলছে। তলপেটটা। প্ল্যাটফর্মে গাঁটরি পড়ে রইল—হায় ঈশ্বর, গাড়ি ছেড়ে দিচ্ছে! হে গার্ডবাবু, তোমার পায়ে পড়ি, সর্বস্ব পড়ে আছে আমার প্ল্যাটফর্মে—

রিনি!

উঁ।

আজা, আর কিছু বাজিয়ো না। শুনতে ভাল লাগবে না। তুমি খুব সুন্দর শিখেছ, খুব সুন্দর—

রিনি হঠাৎ গলা বাড়িয়ে বলল, তবে প্রাইজ দাও।

প্রাইজ দিতেই যাচ্ছিল সঞ্জয়, হঠাৎ রিনি মুখ আচমকা সরিয়ে নিয়ে বলল, ইস ছাইপাঁশের গন্ধ! কী স্বাদে যে খাও—

রিনি উঠে চলে গেলে একা একা একটা ডিঙি নৌকোর মতো চেতনা ছেড়ে অচেতনতার দিকে ভেসে গিয়েছিল সঞ্জয়। কাল রাতে।

রাত প্রায় একটা পর্যন্ত বিমান গীতা পড়েছে। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা তার কাছে। পড়তে পড়তে হুঁশ হল যখন মাথার পিছন দিকে একটা তীব্র যন্ত্রণা দেখা দিল হঠাৎ। চোখের ডিম দুটো টনটন করে উঠল। তখন বই রেখে বাতি নিবিয়ে দিল বিমান। কিন্তু শুতে গিয়ে বুঝল ঘুম আসবে না। ঘুম সম্পূর্ণ অসম্ভব একটা ব্যাপার এখন। মাথার ব্যান্ডেজটার ওপর দিয়ে সে একটা রুমাল শক্ত কটকটে করে বেঁধে গিঁট দিল। তারপর খোলা হাওয়ায় ঘুরবে বলে দরজায় তালা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

বট গাছের তলায় কতগুলো ছেলেছোকরা বসে আছে। তাদের পরনে সরু প্যান্ট, গায়ে রংচঙে শার্ট, মুখে সিগারেট আর হাতে মাটির ভাঁড়। রাস্তার আবছা আলোয় তাদের দেখা যায়। চা খাওয়ার মতো করে চুমুক দিচ্ছে ভাঁড়ে। একটু চা খেতে বিমানেরও ইচ্ছে করছিল। কিন্তু সে কাছাকাছি কোনও চায়ের দোকান দেখতে পেল না। অল্প দূরে একটা পানের দোকান খোলা আছে কেবল। সে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা বুঝবার চেষ্টা করছিল অমনি একটা ছেলে উঠে এসে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল, কী চাই!

বিমান একটু ইতস্তত করে বলল, একটু চা কোথায় পাওয়া যায়!

ছেলেটা খুব অবাক হয়ে বলল, চা!

পিছন থেকে কে একজন জিজ্ঞেস করল, কে রে?

ছেলেটা মুখ ফিরিয়ে বলল, চা চাইছে।

খ্যা-অ্যা-অ্যা করে একটা হাসির শব্দ হল। আর একজন বলল, নিয়ে আয়, চা খাইয়ে দিচ্ছি।

আর একজন বলল, হ্যাঁ, খাওয়াও আর কী! এমন পয়সার মাল কোথাকার কোন মড়াকে—

যাঃ, মদ কাউকে রিফিউজ করতে নেই, পাপ হয়। শচে, নিয়ে আয় ভদ্রলোককে—

মাথার মধ্যে তখন এমন একটা দপদপ রক্ত বওয়ার শব্দ হচ্ছে, আর এমন টনটন করছে দুটো চোখ যে বিমান ব্যাপারটা খুব ভাল বুঝতে পারল না। এরা তাকে মদ খাওয়াতে চাইছে। সে কখনও খায়নি। কিন্তু মাথা আর চোখের এই অসহ্য যন্ত্রণায় কিছু একটা করা দরকার। যদি খুব নেশা হয় তা হলে সে হয়তো ঘুমিয়ে পড়বে।

ছেলেগুলো খুব খারাপ নয়, সে এগোতেই বাঁধানো বেদির ওপর একটু সরে বসে তার জন্য জায়গা করে দিল। বসার পর বিমান দেখলে এদের দলে, কী আশ্চর্য, একটা মেয়েও রয়েছে। মেয়েটার মুখ অন্য দিকে ফেরানো, তবু এক পলক দেখলেই বোঝা যায় মেয়েটা একেবারে রদ্দি। মুখে অতিরিক্ত পাউডার, খুব সস্তা ঝলমলে একটা শাড়ি। ছেলেগুলো ওর দিকে তাকাচ্ছেও না, খুব সম্ভবত আসর গরম করার জন্য ওকে নিয়ে এসেছে ভাড়া করে, তারপর সবাই ঠান্ডা মেরে গেছে। বিমান চোখ ফিরিয়ে নিল।

ভাঁড়ে প্রথম চুমুকটা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার সমস্ত শরীর পেট থেকে জিব পর্যন্ত যেন নিঃশব্দে চেঁচিয়ে উঠল, না না, এ-জিনিস আমরা নেব না, এ-জিনিস আমাদের সঙ্গে খাপ খায় না। বিমান মুখের মধ্যে ঢোঁকটাকে রেখে বসে রইল, গিলতে পারল না। ফেলতেও না।

তার পাশ ঘেঁষে বসে আছে সেই সমবেদনাশীল ছেলেটা, যে তাকে ডেকে বসিয়েছে এইখানে। সে ছেলেটা তেমনই আদর করার মতো গলায় জিজ্ঞেস করল, কেমন লাগছে?

বিমান ঢোঁকটা গিলে ফেলল। কাশির দমকে চোখে জল এসে গেল তার। অস্ফুটভাবে বলল, ভীষণ ঝাঁঝ আর তেতো-তেতো। এতে কী আছে?

কী জানি! শালারা কত কিছু মেশায়। কারবাইড থাকতে পারে কিংবা যে-কোনও পয়জন। কিন্তু ও-সব সয়ে যায়, ইম্যুনিটি ফর্ম করে গেলে কিছুই আর হয় না। আমি তো বিলিতি জিনিস কত খেয়েছি কিন্তু বাংলা মালের তুলনা হয় না। আহা, বাংলার মাটির জিনিস, বাঙালির হাতে তৈরি—

বলতে বলতে ছেলেটা কথা থামিয়ে গুনগুন করে গাইতে লাগল, বঙ্গ আমার জননী আমার ধাত্রী আমার, আমার—

ও আমার সোনার বাংলা, আর-একজন আধ-চেতন সুরে গায়, তারপর হেসে ওঠে।

সেই সমবেদনাশীল ছেলেটা নিচু গলায় জিজ্ঞেস করে, কোথায় বেরিয়েছিলেন?

আমার বড্ড মাথা ধরেছিল।

খেয়ে নিন। মাথা যে আছে টেরই পাবে না।…কোথায় থাকেন?

কাছেই।

একা?

হুঁ।

ছেলেটা হাসল। তারপর কানের কাছে মুখ এনে বলল, তা হলে আপনার জন্য আরও ফাস্ট ক্লাস বন্দোবস্ত করতে পারি। ওই যে মেয়েটা, ওকে ঘরে নিয়ে যান। ও আপনার মাথা টিপে দেবে, পদসেবা করবে, ঘুম পাড়াবে। দারুণ এক্সপার্ট মেয়ে, নেবেন সঙ্গে? ভয় নেই, ওকে কিছু দিতে হবে না। টাকা-পয়সা যা দেওয়ার আমরা দিয়ে রেখেছি।

মেয়ে! মেয়ে দিয়ে বিমান কী করবে! শুনে সে ভীষণ চমকে ওঠে, ভয় পেয়ে বলে, না, না, তার দরকার নেই।

শুনে ছেলেটা ভীষণ হতাশ হয়। বলে, নিল না। মেয়েদের যা যা থাকে ওর সব আছে, বয়সও এমন কিছু বেশি হয়নি। কেবল আমাদের কাছে একটু পুরনো হয়ে গেছে। রোজ আসে তো, তাই। কিন্তু আপনার কাছে বেশ নতুন লাগবে। নিয়ে যান। বলে ছেলেটা মুখ ফিরিয়ে মেয়েটাকে ডেকে বলে, পারুল, এই ভদ্রলোকের সঙ্গে যাবে? যাও না, খুব ভাল লোক।

মেয়েটা ফিরেও দেখে না। আর বিমানের ভীষণ ভয় করে। সেই ছেলেটা বলে, নিন না। আপনার ভালর জন্যই বলছি।

বেদিটাকে ঘিরে আরও সাত-আটজন বসে দাঁড়িয়ে ছিল। অন্ধকারে তাদের কারও মুখই ভাল দেখা যায় না। তাদের মধ্যে কেউ একজন চেঁচিয়ে বলল, কে নেবে পারুলকে? কোন শালা? আজ পাল আমার।

এই কথা বলে ছেলেটা ও-পাশ থেকে উঠে পারুলের সামনে দাঁড়ায়। খস করে দেশলাইয়ের কাঠি জ্বেলে এক হাতে ধরে অন্য হাতে মেয়েটার থুতনি তুলে ধরে মুখ দেখার চেষ্টা করে। বলে, তুমি আমার নও?

মেয়েটা ঝটকা মেরে ছেলেটার হাত সরিয়ে দেয়। ছেলেটা তখন দেশলাইয়ের কাঠি ফেলে দু’ হাত বাড়িয়ে খিমচে ধরে মেয়েটাকে। রে-রে করে হাসে মেয়েটা ডানা ঝাপটানোর মতো শব্দ করে।

প্রকাশ্যে, একটু আধো-অন্ধকারে ব্যাপারটা চলতে থাকে। এ-পাড়াটায় ভদ্রলোক কেউ থাকে না, বটগাছের উলটো দিকে একটা পোড়ো মাঠ, তার ও-পাশে বস্তি। আশেপাশে দু’-একটা গরিব-গুরবোর দীন-দরিদ্র বাসা রয়েছে। কিন্তু কোনওখান থেকেই কোনও প্রতিবাদ আসে না, দূর থেকে ছুটে আসে না লোক। হয়তো ওই সব বাসায় যারা থাকে তারা অন্ধকারে জানালায় খড়খড়ি খুলে দৃশ্যটা দেখার চেষ্টা করছে নিঃশব্দে, হয়তো বউকে ফিসফিস করে বলছে, কী কাণ্ড হচ্ছে দেখেছ, সেই বদ ছেলেগুলো গো—একটা মেয়েকে। বউ হয়তো চাপা রাগের স্বরে বলছে, তা তোমার ওখানে দরকার কী? দিনকাল ভাল না, জানালা বন্ধ করে চলে এসো…

এবার ভাঁড়ের তরল পদার্থটার কোনও তেতো-কটু স্বাদ পেল না বিমান। ঢকঢক করে জলের মতো খেয়ে নিল। কিন্তু সমস্ত শরীরে বিদ্যুৎ চমকে মেঘ ডেকে উঠল যেন। কান মুখ চোখে ঝমঝম বাজনা বেজে উঠল। মনে পড়ে গেল বিকেলে সে একটা মেয়েকে বাঁচিয়েছে। সরল শিশুর মতো একটি মেয়েকে। মেয়েটা কাঁদছিল। সব মেয়েই কাঁদে। কেননা, মানুষের জন্মের রহস্য বাঁধা থাকে তারই আঁচলে। সে জানে, তাকেই সন্তানের ভার বহন করতে হবে, বহু কষ্টে জন্ম দিতে হবে। তবে সে কেন বহন করবে যেমন তেমন সন্তান? সে কেন চাইবে যে খুশি সন্তান দিয়ে যাক তার গর্ভে? বরং সে মনে মনে অপেক্ষা করে শ্রেষ্ঠ একজন পুরুষের, যাকে সে হয়তো কখনও পায়, কখনও পায় না, কিন্তু অপেক্ষা করে থাকে। যদি শত পুরুষেও তার দেহ ছিঁড়ে খায় তবু সে স্বভাবে থাকে একগামী, যাকে সে হয়তো কখনওই দেখেনি সেই শ্রেষ্ঠ একজন পুরুষ তার অন্তরে স্বামী হয়ে থাকে। তাই মেয়েমানুষকে না চিনলে তাকে কখনও ছুঁতে নেই। কিন্তু মূর্খ চাষার মতো বহুগামী পুরুষ মাটি না-চিনে বীজ ছড়িয়ে যায়। পৃথিবীতে কত মানুষ তাদের বিবাহিতা স্ত্রীদের বলাৎকার করে যায় নিজের অজান্তে। কখনও বোঝে না একটি প্রতিক্রিয়া কত দূর সর্বনাশ নিয়ে আসে।

বট গাছ ছাড়িয়ে একটু দুরেই অন্ধকারে বাতি নেবানো একটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে। ট্যাক্সিটা বোধ হয় এদেরই। ছেলেটা পারুলকে সেই দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। অনিচ্ছায় যাচ্ছে পারুল, তাকে যেতে হবে বলে। সে টাকা নিয়েছে। অন্য ছেলেগুলো চুপচাপ বসে থাকে।

মাথার মধ্যে তীব্র যন্ত্রণায় হঠাৎ কেমন ভোঁতা হয়ে আসে। এক ডেলা মাটির মতো অর্থহীন লাগে মাথাটাকে। বিমানের হাত-পা অবশ হয়ে আসে। মাথা ঝিমঝিম করে। সে হঠাৎ পাশের ছেলেটাকে ফিসফিস করে বলে, আমি ওকে, ওই পারুলকে নিয়ে যাব।

ছেলেটা হেসে ওঠে। চেঁচিয়ে বলে, গদা, পারুলকে ছেড়ে দে, এই ভদ্রলোক রাজি আছেন।

ছেলেটা বলে, ফোট, শালা। আজ পারুল আমার। আমার হাত কামড়ে দিয়েছে পারুল, খিমচে দিয়েছে গালে, তবু আমি ভালবাসায় জ্বলে যাচ্ছি।

শুনলেন তো, ও ছাড়বে না। আপনি যান, না, ওর সঙ্গে লড়ে কেড়ে নিন পারুলকে। যদি পারেন তবে আমরা সবাই ক্ল্যাপ দেব। যান না!

ছেলেটা তাকে ঠেলে তুলে দেয়।

বিমান উঠে দাঁড়ায়, কিন্তু ঠিকমতো দাঁড়াতে পারে না। পা অবশ হয়ে আসে। সে আবার পড়তে পড়তে সামলে নেয়। এমন অশালীন, কুৎসিত একটা দৃশ্য সে আর কখনও দেখেনি। বহু পুরুষের মধ্যে একটি মেয়েকে নিয়ে টানাটানি। আজ বিকেলে সে একটি মেয়েকে বাঁচিয়েছে। যে-মেয়েটা বাঁচতে চেয়েছিল। কিন্তু হায় ঈশ্বর, এই নষ্ট মেয়েটা যে জানেও না সময়মতো কেঁদে উঠতে। একটু পরেই ওর জোর নষ্ট হয়ে যাবে, আর তারপর—

হঠাৎ দু’হাত ওপরে তুলে বিমান চেঁচিয়ে উঠল, বাঁচাও—বাঁচাও—

কিন্তু কিছু হল না। গলার স্বর ফুটল না তেমন। হতাশভাবে ভীত চোখে বিমান দেখল অন্ধকারে ছেলেগুলো সবাই তার দিকে মুখ ফিরিয়েছে। তাদের সিগারেট জ্বলছে।

কিন্তু কেউ কিছু করার আগেই বিমান খুব ক্লান্তভাবে মাটিতে পড়ে গেল। চোখ বোজার আগের মুহূর্তে তার মনে হল, সে একা বড় অসহায়। বিপক্ষের শত্রুদল বড় প্রবল। এখন খুব শক্তিমান, খুব প্রকাণ্ড কেউ যদি তার পাশে থাকত!

তারপর আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়েছিল বিমান।

খুব ভোরে তার ঘুম ভাঙল, সূর্যের প্রথম আলোটি চোখে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে। দ্বিগুণ বেগে দপদপ করছে মাথার শিরা। ভাল করে চোখ খুলতে সময় লাগল অনেক। চেয়ে দেখল সে গাছতলায় পড়ে আছে। তার চারদিকে ভাঙা মাটির ভাঁড়, শালপাতা, কয়েকটা দেশি মদের বোতল, ধুলোয় জুতোর ছাপ। দু’-একজন কৌতূহলী লোক পথ চলতি না-থেমে তাকে দেখতে দেখতে চলে যাছে।

ঘরে ফিরে তালা খুলে ভিতরে ঢুকতেই সে একটা জিনিস টের পেল। বহুকাল বাদে তার মাথার ভিতরটা আবার ফাঁকা লাগছে। সে মাথা ঝাঁকাল, কিন্তু স্পষ্ট টের পেল মাথার ভিতরে আকাশের একটা অংশ ঢুকে আছে। বেরোচ্ছে না। আস্তে আস্তে বেলা বাড়তে লাগল, আর সে টের পেতে লাগল কোন সুদূর থেকে আকাশের শূন্যতা তুষারপাতের মতো নিঃশব্দে তার মাথার ভিতরে খসে পড়ছে।

খুব বিষন্ন গেল বিমান। আর মাত্র কয়েকটা দিন। তারপরেই সে আবার কিছু দিনের জন্য পাগল হয়ে যাবে। পাগল হয়ে যাওয়ার আগে এই লক্ষণগুলো তার খুব চেনা। এখন পরিচিত সবাইকে এই খবরটা তার জানিয়ে দিতে হবে। তোমরা সবাই সাবধান থেকো, আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%