চতুর্থ অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

চার

রাত্রিটা খুব ছোট ছিল। খুব ছোট। ভোরের ঘুমে সে স্বপ্ন দেখছিল, চন্দনের গন্ধওলা সাবানের ফেনার মধ্যে মুখ ডুবিয়ে আছে সে। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। চোখ খুলেই সে দেখতে পেল দুধের মতো সাদা সুন্দর বুকে দুটি স্তন, সরু একটি সোনার চেন স্তনের ওপর দিয়ে ঝুলে তার কপালে লেগে আছে। রিণি, তার বউ।

সঞ্জয় হাসল। এক হাতে আলতোভাবে তার মাথা বুকে চেপে রেখে অন্য হাতে মাথার চুলের মধ্যে বিলি কাটছে রিণি। রিণি— রিন্তি— রিন্তু— তার বউ— তার সোহাগি। সঞ্জয় চোখ বোজে আবার। পাতলা একটা চাদরের তুলায় দু’জনেরই খালি গা। শরীরের ওম ঘন হয়ে আছে রিণির। শরতের সকালের মৃদু হিম থেকে তাকে ঘিরে আছে। মাথাটা আরও ভাল করে রিণির বুকে তুলে দেয় সঞ্জয়, সারা রাতে মাথা-রাখা উষ্ণ বালিশের স্বাদ একঘেয়ে হয়ে গেছে। রাতে গায়ে পাউডার মেখেছে রিণি। চন্দনের গন্ধ।

মাথাটা আবার বালিশের ওপর ঠেলে দিল রিণি, ওঠো, উঠে পড়ো।

সঞ্জয় গুনগুন করে, রিন্তু মিন্তু সিন্তু নিন্তু!

সুগন্ধ চুলের গোছা তার মুখের ওপর ফেলে নিচু হয় রিণি, হয়ে বলে, আর বাকি রইল কী? কিন্তু কিন্তু? ওঠো, উঠে পড়ো।

কখন থেকে আদর করছ আমাকে?

অনেকক্ষণ।

জাগাওনি কেন?

ঠিক সময়ে জাগিয়েছি।

দুই বালিশের ফাঁকে রাখা সঞ্জয়ের হাতঘড়ি বের করে এনে দেখে রিণি, ছ’টা দশ।

ঠিক সময়! ঠিক সময়! সঞ্জয় কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে উঁচু হল, কী করে বুঝলে ঠিক সময়! কীসের ঠিক সময়! কেন ঠিক সময়!

আঃ! অত জানি না। ছ’টা এগারো-বারো হয়ে গেল।

ঠিক সময় ছ’টা দশ! বলতে বলতে সঞ্জয় আবার বালিশে মাথা রেখে গড়ায়, ঠিক সময় ছ’টা এগারো বারো তেরো। আদরের ঠিক সময়, বিছানা ছাড়ার ঠিক ঠিক সময়, চায়ের ঠিক সময়, কাগজের ঠিক সময়…

পাগল!

পাগলামির ঠিক সময়।

সারাদিন তুমি অত কাজের, কিন্তু সকালে ভীষণ কুঁড়ে।

কুঁড়েমির আজিকে সময়… সময়! না অবসর?

দেখো, পিকলুটার বোধ হয় জ্বর।

জ্বর?

মনে হচ্ছে। সারা রাত জ্বালিয়েছে। সকালে আবার ঘুম পাড়িয়ে রেখেছি। তোমার যা ঘুম, টেরও পাওনি।

রিণির ওধারে অয়েল ক্লথের ওপর পাতা পিকলুর বিছানা। তাদের ছেলে। বয়স সাত মাস। হাতের ভর দিয়ে উঠল সঞ্জয়, রিণির শরীরের ওপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে ঘুমন্ত পিকলুর গা দেখে বলল, দূর! জ্বর কোথায়! গা ঠান্ডা।

কী জানি। মনে তো হচ্ছে। রাতে কয়েকবার কেশেছিল তো!

সঞ্জয়ের হাত গায়ে লাগতে পিকলুর ঘুমন্ত ঠোঁট ফুলল, ফোঁপানির শব্দ হল একটু। সঞ্জয় হাত সরিয়ে নিয়ে বলল, শ্রীমান ক্রন্দন। তারপর বাউল সুরে গুনগুন করল, আপনজনরে চিনলি না রে মন, বাঁচবি ক্যামোনে? বাউল সঞ্জয় বলে…

ও কী কথা! ধমক দেয় রিণি, বিশ্রী!

কেন! গান! সঞ্জয় বাউলের রচনা।

ছাই গান। রিণি পিকলুর বুকের ওপর আলতো হাত রেখে আস্তে করে বলল, ও বাঁচবে। বাঁচবার জন্যই এসেছে।

মেঝের ওপর খবরের কাগজ পড়ে ছিল। বিছানা থেকে হাত বাড়িয়ে কাগজটা তুলে আনল সঞ্জয়, রিণির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, দেখো তো প্রথম পৃষ্ঠায় কী কী খবর আছে।

তুমি দেখো।

কাগজ না দেখে, চোখ বুজেই সঞ্জয় বলতে লাগল, প্রথম হেডিং একটা ট্রেন অ্যাকসিডেন্ট, প্লেন ক্র্যাশ, খনিতে ধস, একটু ছোট হেডিং— হাঙ্গামায় চারজন খুন, বিস্ফোরণে কয়েকজন হতাহত, রাহাজানি, ডাকাতি, ভিয়েতনামে বোমার শিলাবৃষ্টি…

চুপ করো।

চোখ চেয়ে হাসল সঞ্জয়, এরপরও আশা হয় বাঁচবে?

আঃ।

বেশ শক্ত ব্যাপার। রিন্তু-মিন্তু, পিকলুর পক্ষে ব্যাপারটা বেশ শক্ত হবে। আরও খারাপ দিন আসছে।

তার কথায় কান দিল না রিণি। সে ঝুঁকে পড়ে পিকলুর কপালে নিজের গাল ঠেকিয়ে জ্বর বুঝবার চেষ্টা করছিল।

শ্ৰীমতী বাতিক। কাগজটা ফেলে দিয়ে সঞ্জয় বলল।

বলে বিছানা ছাড়ল সে। মেঝের ওপর সোজা হয়ে দাঁড়াতেই তার শরীর থেকে ঘুমের আর আলসেমির জড়তা ঝরে গেল। এটা তার অনেক দিনের অভ্যাস— বিশ্রাম বা কুঁড়েমি থেকে চট করে আবার কাজের মধ্যে চলে আসা। বিছানা ছাড়ার পরও আড়মোড়া ভেঙে, হাই তুলে বা ঘুমের আমেজকে বজায় রাখতে গিয়ে সে সময় নষ্ট করে না। সে অনেকটাই ঘড়ির অনুশাসন মেনে-চলা মানুষ। কাজের লোক। সবসময়ে নিজেকে যে-কোনও কাজের জন্য তৈরি রাখা তার প্রিয় অভ্যাস। তাতে মানুষ অহংকারী না হয়েও নিজেকে গুরুত্ব দিতে শেখে। সে শিখেছে। অবশ্য এ-ব্যাপারে সে খুব কড়াকড়ি করে না— যতটা করলে দৃষ্টিকটু দেখায় বা অন্যে অস্বস্তি বোধ করে। কাজের সঙ্গে মজাও তার প্রিয়। মন হালকা না থাকলে সে কাজ করতে পারে না। মেঘলা আকাশ, গোমড়া মুখ, গভীর চিন্তা তার অপছন্দ।

চমৎকার দিন। ঝলমল করছে রোদ। শরৎকাল। পুজো-পুজো ভাব। আপন মনে হাসল সঞ্জয়। চমৎকার দিন… বেশ দিন… হালকা দিন… উড়ে যাব… উড়ে যাই…

বাথরুমের র‍্যাক থেকে টুথব্রাশ তুলে নিয়ে সঞ্জয় দেখল ব্রাশটা পুরনো হয় গেছে। বদলাবার সময়। সে ব্রাশটার সঙ্গে কথা বলছিল— সুপ্রভাত শ্ৰীযুক্ত ব্রাশ, আপনার শরীরটা তো ভাল দেখছি না। বুড়ো হয়ে গেছেন। এটাই বিশ্রামের ঠিক সময়। বিশ্রাম? সেও কি আপনার কপালে আছে? হয় আমার জুতোর র‍্যাকে, নয়তো রিণির গয়না পরিষ্কার করার কাজে আপনাকে লাগতে হবে। জীবনটা এ-রকমই মশাই, যতক্ষণ কাজ আদায় হয় কেউ ছেড়ে দেয় না।… শ্ৰীমতী পেস্ট, আপনি একেবারে যুবতী, তবু বুড়ো ব্রাশটার ঘর করতে হচ্ছে! চিন্তা নেই, শিগগিরই আসছেন নতুন বর— ঝকঝকে নতুন…

বাথরুমের আয়নায় তার ছায়া পড়েছিল। সেদিকে চেয়ে হাসল সঞ্জয়। পুরনো বন্ধু সঞ্জয়, আহা বড় দুঃখে ছিল লোকটা। কেবল ধৈর্য অধ্যবসায় আর দুশ্চিন্তাহীন মন ছিল বলে বেঁচে গেছে এ-যাত্রা। এখন মজায় আছে।

চোখ টিপল সঞ্জয়, ফিস ফিস করে বলল, কী টু-পাইস হচ্ছে?

হচ্ছে তো। বলে হাসল। তারপরই মেঘের ছায়ার মতো একটু ম্লানতা এসে গেল তার মুখে। তার মুখের দু’পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে পেস্টের ফেনা। অমানুষের মতো দেখাচ্ছে তাকে। দাঁতে ব্রাশ ঘষতে ঘষতে সে একটু হাসল, অস্ফুট গলায় প্রশ্ন করল, ভাল আছ তো, সঞ্জয়?

বোধ হয় ভালই আছে সে। ভাল থাকা এক-এক রকমের। যদি অতীতের সঙ্গে তুলনা করা যায় তবে সে ভালই আছে। মন সে-কথা মানছে কি? না, মানছে না। তাতে কিছু আসে যায় না। যুক্তিশাস্ত্র অনুযায়ী তার ভাল থাকা উচিত। সততা, কর্মক্ষমতা আর নিষ্ঠা তিনটেই তার ছিল। যা মানুষকে সফলতা এনে দেয়। সফলতা, সুখের মৃদু উত্তাপ, নিরাপত্তা। ঝকঝকে সুন্দর বাথরুমটার নানা জায়গায় চোখ রাখল সে। আয়নার তাকের ওপর শ্যাম্পুর শিশি, ও-ডি কোলান, সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই, রুপোর মতো চকমকে র‍্যাকে পরিষ্কার তোয়ালে, দুধের মতো সাদা বেসিন, কমোড, চৌবাচ্চার পাশে তাকের ওপর রাখা শীতকালের জন্য জল গরম করার যন্ত্র। চমৎকার নয়! বছর দুয়েক আগে সে হিন্দুস্থান পার্কের এই আধুনিক ফ্ল্যাটখানা ভাড়া নিয়েছিল। দেড় ঘরের ফ্ল্যাট, তিনশো টাকা। খুব বেশি কি? বেশি না, মোটামুটি ভাল থাকার পক্ষে বেশি না মোটেই। যে কেউ স্বীকার করবে। আবার হাসল সঞ্জয়। প্রচুর ফেনায় তার ঠোঁট দুটোই ঢেকে গেছে, প্রকাণ্ড দেখাচ্ছে তার হাঁ-মুখকে। অনেকটা বাঘের মতে, না? বাঘের মুখ কি এ-রকম হয়? হবেও বা। অনেক কাল বাঘ-টাঘ আর দেখেনি সঞ্জয়।

সততা, কর্মক্ষমতা আর নিষ্ঠা। তিনটেই ছিল তার। নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে সে বাঁ হাতের দুটো আঙুল তুলে দেখাল, অস্ফুট গলায় বলল, এখন দুটো আছে! শেষ দুটো! কিংবা কে জানে শেষটাও আছে কি না! তবে দুটোই বাদ দাও হে, ধরো একটাই আছে। কর্মক্ষমতা। শেষ পর্যন্ত যদি এটাও থাকে তবে ভাগ্য ভাল… হারাধনের দশটি ছেলের যা হয়েছিল… মনে নেই।

মুখ ধুয়ে সে গুনগুন করে গান গায়, সুখে আছি, সুখে আছি…

ঠিক সাড়ে আটটায় খাবার খায় সে। সাজিয়ে দেয় রিণি। মুড়মুড়ে টোস্ট আর মাখন, ডিমসেদ্ধ, কোকো মেশানো এক গ্লাস দুধ। ব্যস। দুপুরে অফিসেও শুকনো লাঞ্চ সারে সে— রুটি মাংস কিংবা টোস্ট ডিম-সবজিসেদ্ধ-কলা-কফি। দিনে ভাত খায় না সে। অনেককালের অভ্যাস, প্রায় সেই প্রথম যৌবনের কিংবা শেষ কৈশোরের। যখন সে বোস অ্যান্ড কোম্পানিকে নিজের হাতে তৈরি করছে। নানু বোসের সেই কোম্পানি।

খাওয়ার জায়গাটা ছোট্ট। একটা মাঝারি টেবিল পাতায় জায়গাটা জুড়ে গেছে। এক পাশে গ্রিল দেওয়া, গ্রিলের ও-পাশে বাগান। নীচের তলার ফ্ল্যাট বলে ঘর থেকে বাগানের কিছু গাছপালা দেখা যায়। গ্রিল ঘেঁষে একটি গন্ধরাজের গাছ। যতক্ষণ খায় সঞ্জয় ততক্ষণ বারবার গাছপালাগুলোর দিকে চেয়ে থাকে, রোদ বৃষ্টি কিংবা কুয়াশার খেলা দেখে। আজ চমৎকার রোদ, না-ঠান্ডা না-গরম একটি দিন। আজ উড়ে যাব…উড়ে যাই…

মনের মধ্যে আজকাল মাঝে মাঝে স্লান মেঘের ছায়া আনাগোনা করে। কখনও একটু ক্লান্তি। বয়স হয়ে যাচ্ছে? দুধের গ্লাস নামিয়ে রেখে সঞ্জয় বলল, বয়স হয়ে যাচ্ছে।

সে-কথার উত্তর না দিয়ে রিণি বলল, মনে করে একটা লিপস্টিক এনো তো! আর পিকলুর জন্য একটা বিলিতি ফিডার।

লিপস্টিক, কোন শেড?

রোজি ড্রিম।

রোজি ড্রিম! রোজি ড্রিম… গোলাপি স্বপ্ন… গো লা পি স্বপ্ন… স্ব প্না লি গোলাপ…

কী হচ্ছে আবার!

নামটা একদম খাপ খায় না।

খাপ খায় না কেন?

গোলাপি স্বপ্ন একদম মেলে না আমার সঙ্গে। বাজে নাম।

হোক বাজে। আমার পছন্দ।

আচ্ছা, শ্ৰীমতী জিদ, ইচ্ছে মতো সাজো। তোমারে সাজাবো যতনে…। তোমারে, না তোমাকে? আজকাল বড় ভুল হয়ে যায়, বুঝেছ! বয়স হয়ে যাচ্ছে।

বুঝেছি, দাদামশাই।

হাসল সঞ্জয়। পিকলুকে আদর করে বলল, বিলিতি ফিডার চাই! ব্যাটা নবাবপুওুর।

আজ উড়ে যাব। চমৎকার দিন, সুন্দর দিন আজ। রিণির লিপস্টিকটার কী যেন রং! গোলাপি স্বপ্ন! গোলাপি স্বপ্নের মতো দিন। সাজতে বড় ভালবাসে রিণি, এখনও। সব কিছুই তার বিলিতি হওয়া চাই। বিলেতের ছোট জামা, বিলেতের লিপস্টিক। শোওয়ার আগে রিণি দাঁত মাজে, গায়ে পাউডার দেয়। ভুল হয় না। বিকেল-বিকেল খোঁপা বাঁধে— নতুন নতুন সব খোঁপা— তাতে বিনুনি নেই, ফিতে নেই। চোখের পাতায় ম্যাস্কারা লাগায়, ভ্রূ-তে পেনসিল। কার জন্য এত সাজগোজ, রিণি? কারও প্রেমে পড়োনি তো? দেখো ডুবিয়ো না। রমেনটার তাই হয়েছিল। বেচারা! কোথায় যে চলে গেল তারপর ময়মনসিংহের সেই জমিদারের ছেলেটা! যাকগে। আজ চমৎকার দিন রিণি, সুন্দর দিন। এই বেলা সাজগোজ করে নাও। বয়স হয়ে যাওয়ার আগে, পিকলু বড় হওয়ার আগে, পিকলুর আর সব ভাইবোনেরা এসে পড়ার আগে, তারপর ওদের দিন, পিকলুদের আর তাদের প্রণয়িনী বা স্ত্রীদের, যদি অবশ্য পিকলুরা ততদিন বাঁচে, যদি যুদ্ধটুদ্ধ আর না হয়, যদি দেশটা আরও পচে না যায়। তোমাদের আমি সুখে রেখেছি তো! রাখিনি? আমার তিনটে জিনিস ছিল— সততা, কর্মক্ষমতা আর নিষ্ঠা। প্রথম আর শেষটা পকেটমার হয়ে গেছে মনে হচ্ছে, খুঁজে পাচ্ছি না। কর্মক্ষমতাটা আছে এখনও। কিন্তু সে আর ক’দিন? বয়স হচ্ছে, বয়স হলে মানুষের কিছু সদ্‌গুণ ঝরে যায়, বদলে অভিজ্ঞতা বাড়ে। তোমাদের জন্য আমি দুটো জিনিস দিয়ে দিয়েছি।

হ্যাঁ, অনেক দিন পর্যন্ত আমার তিনটি গুণই ছিল। ছেলেবেলা থেকে। যখন আমি চায়ের দোকানের বাচ্চা বয়, কিংবা মোটরসারাইয়ের শরখানার ছোকরা কারিগর, তারপর হন্যে হয়ে ঘোরা। না, তখনও চুরি করিনি, মিথ্যে কথা বলিনি— ভয় করত। ধর্মভয়? হবেও বা। নানু বোস আমাকে তুলে নিল একদিন। নিজে নিজে তখন অর্ডার সাপ্লাইয়ের চেষ্টা করছি, নানু বোস ছিল সরকারি পারচেজ-এ, দু’হাতে পয়সা মারছে। আমাকে দু’-একটা অর্ডার দিত পয়সা না নিয়ে, দয়া করেই। তারপর একদিন আমাকে ডেকে বলল, এভাবে পারবেন না। আপনি সৎ লোক, খাটিয়ে লোক আছেন। আমার সঙ্গে হাত মেলান। কোম্পানি করছি রঙ্গিনী বোসের নামে— আমার বউ। সরকারি চাকরি, বুঝতেই পারছেন। নিজের নামে করতে পারি না। সব আপনি দেখবেন, টাকা আমার। ভাববার কিছু নেই।

ভাববার কিছু ছিল না। নানু বোসের কোম্পানি খুললুম আমি। বোস অ্যান্ড কোম্পানি। প্রথম দেড় মাস একটিও অর্ডার নেই। সারা দিন শুধু ঘোরা আর ঘোরা। নানু বোসের নিজের দেওয়া সরকারি অর্ডারগুলো বাদ দিলে বিজনেস ছিল পুরো ঝুল। মাইনে নিতে আমার লজ্জা করত। মাস ছয়েক পুরোটাই ক্ষয়ক্ষতিতে গেল। চাঁদনিতে অফিসঘর। তার ভাড়া, বেয়ারার মাইনে, ভাগের টেলিফোনের বিল, তা ছাড়া থোক টাকা আটকে ছিল স্টিলের আলমারি, টাইপরাইটার টেবিল চেয়ার ইত্যাদিতে। ভয় করত, যদি না পারি! নানু বোস ভরসা দিল, মাছের চোকলার মতো টাকা আছে আমার। আপনি চিন্তা করবেন না, চালিয়ে যান। আঃ রিণি, কী যেন তোমার লিপস্টিকটার নাম। গোলাপি স্বপ্ন, না স্বপ্নলি গোলাপ! ঠিক আছে, মনে থাকবে। তোমার চেহারাটা ভাল। যদি চেহারাটা ভাল না হত তা হলে লিপস্টিক কতদূর কী করতে পারত। ব্যবসাতেও তাই। ব্যবসা টাকায় দাঁড়ায় না ততটা, যতটা দাঁড়ায় চরিত্রে। নানু বোসের কোম্পানি তাই দাঁড়াল। আমার তিনটে জিনিস ছিল— তিনটে জিনিস— মা লক্ষ্মীর ঝাঁপি উপুড় করে কড়ির ঢল নেমে এল নানু বোসের ঘরে। সম্ভবত তার ইচ্ছে ছিল বউয়ের ব্যবসা দেখিয়ে কিছু কালো টাকা সাদা করবে, কিন্তু লাভ দেখে সে আশ্চর্য হয়ে গেল। তার মনে কৌতূহল এল, আর সন্দেহ। ইচ্ছে করলে আমি কি নানু বোসের লাল কোম্পানিকে সাদা করে দিতে পারতুম না? আজকের সুন্দর দিনটার নামে প্রতিজ্ঞা করে বলছি, মাস-মাইনে ছাড়া আমি কিছুই নিইনি। সেই আমার প্রথম যৌবনের সময়টায় আমি বোস অ্যান্ড কোম্পানির জন্য ঊর্ধ্বশ্বাস— মেয়েদের ভাল করে লক্ষ করিনি, আকাশ গাছপালা বা প্রকৃতিজগতের সৌন্দর্য দেখার জন্য দাঁড়াইনি, হাসি ঠাট্টাও কম করেছি। তাতে লাভ হয়নি। কোম্পানি বড় হয়েছে বলে নতুন কিছু লোক নিল নানু বোস, আর নতুন লোকেরা ছিল তারই আত্মীয়— একজন ভাইপো, অন্যজন শালা। তারপর ক্রমে ক্রমে…কিন্তু তাতেও খুব একটা ক্ষতি হয়নি, কী বলো রিন্তি-মিন্তি- সিন্তি-নিন্তি! বোস কোম্পানি থেকে আমাকে ছাড়িয়ে দিলেও আমার কিন্তু তিনটে জিনিস ঠিকই ছিল— তিনটে জিনিস আর হাসি-ঠাট্টা করার মতো মনের জোর। অফিস আর কোম্পানিগুলো চিনত আমাকে— এই সঞ্জয় সেন, সৎ নিষ্ঠাবান পরিশ্রমী। না, এ আমাদের কখনও ফাঁকি দেয়নি।… একটু কষ্ট হল কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে গেলুম। এবার চাকরিতে, ম্যাকগুইয়ের অ্যান্ড কোং। এক বছর পর পঞ্চাশ টাকা বেশি মাইনেয় জোহানসন অ্যান্ড দালাল— আমার এখনকার কোম্পানিতে। দু’ বছর সততা নিষ্ঠা আর উদ্যমে চাকরি করার পর আমাকে দেওয়া হল পারচেজ-এ, জুনিয়ার অফিসার। কোম্পানির জন্য মালপত্র কিনবার আংশিক ভার। অর্ডারে আমার সই থাকে। মাইনে বেশি না। কিন্তু পাকা কাঁঠালের মতো অবস্থা আমার, চারদিকে মাছি ভন ভন করে। কোম্পানি জানত পয়সা খেয়ে পারচেজের লোকেরা কোম্পানিকে বেচে দিচ্ছে। তাই আমার মতো একজন লোককে তাদের দরকার ছিল এখানে। তখনও আমার তিনটে জিনিস ঠিক ঠিক ছিল, আমি দু’ হাতে লোভ ঠেকাতে লাগলুম। আমার রিনরিন, রিন্তি-নিন্তি, এটা দ্বিতীয় বিশ্বমহাযুদ্ধ জেতার চেয়ে কিছু কম শক্ত ছিল না। ভয় পেয়ে আমি ওপরওয়ালার কাছে দরবার করলুম— আমাকে আমার পুরনো সেকশন এস্টিমেশনে ফিরিয়ে নাও। ওপরওয়ালা প্রথমে ভ্রূ কুঁচকে তাকাল, তারপর হাসল, তোমার অসুবিধেটা আমরা জানি। তবু কাজ করে যাও। আর দেখো, কোম্পানির ক্ষতি না করে তুমি যদি পয়সাওয়ালা হতে চাও হও। তাতে ক্ষতি নেই, আমরা তবু তোমাকে সৎ, নিষ্ঠাবান আর কাজের লোক বলেই জানব। আমরা জানি যে আমরা তোমাকে মাত্র চার শ’, টাকা মাইনে দিই, যা এই বাজারে একেবারেই যথেষ্ট নয়। আমরা ইনকনসিডারেট নই। ভাগ্য ফেরাবার এটাই তো বয়স, ঠিক বয়স, তোমার।

আমার সেই দার্শনিক ওপরওয়ালা আসলে আমার ওপর ডাকাতি করতে চেয়েছিল। মূল্যবান তিনটে জিনিস ছিল আমার। আঁকড়ে ধরার মতে, জীবন দেওয়ার মতো। আসলে আমার সেই ওপরওয়ালা জ্ঞানী লোকটি জানত, পারচেজে সৎ লোকের থাকাটা সেই লোকের পক্ষে বিপজ্জনক। অন্যেরা তার সম্বন্ধে অস্বস্তি আর সন্দেহ পোষণ করতে থাকবে ক্রমান্বয়ে। সেটা অনেক দূর গড়াতে পারে।

আমি টিকে গেলুম পারচেজে। দু’ বছর আগে তুমি এলে। বড় মজার ব্যাপার হয়েছিল। তোমার বাবা অর্ডার নিতে এলেন— ফরসা রোগা মানুষ, চোখা নাক আর কৌতুকে মিটমিট করছে চোখ। দূরদর্শী লোক, তিনি কোম্পানিকে জানেন, আর আমার চাকরি আর পজিশনের গুরুত্ব বুঝলেন। হয়তো ভাবলেন, ছোকরার এক-আধটা গুণ কেড়ে নিলে ধাঁ করে উন্নতি করে ফেলবে। কিন্তু সেজন্য তিনি উপদেশ দিলেন না, ভিড়িয়ে দিলেন তাঁর সুন্দর মেয়েটিকে, বিয়েরও দেরি করলেন না। এবং সম্ভবত তারপর মনে মনে হাসলেন।

আমার রিণি, এ-কথা ঠিক যে আমার টাকার দরকার ছিল। বিয়ের জন্য, বাসার জন্য, নতুন ঘরকন্নার জন্য। আমার যে অপদার্থ দাদাটা ব্যাঙ্কে পিয়নের কাজ করত তার কাছে আশ্রিত ছিল আমার বিধবা মা আর অন্ধ একটা বোন। মাস-মাইনের অনেকটাই তাদের দিতে হত। ‘আমি থাকতুম মেসে। টাকা জমাইনি বলে হঠাৎ টাকার দরকারে একটু ঘাবড়ে গেলুম। ধার করা যেত। করেওছিলুম। ধার দিল মহাজনেরা, যারা কোম্পানিকে মাল বিক্রি করত। সেই ধার আর শোধ দেওয়া হল না।…রিণি, আমার রিন্তি, আমি কাকে দায়ী করব? যদি বলি তুমি দায়ী তা হলে দায় এড়ানো হল, যুদ্ধ জেতা হল না। আমি দায় এড়াতে চাই না। আসলে বয়স। বয়স হলে মানুষের দু’-একটা সদ্‌গুণ ঝরে যায়, বদলে অভিজ্ঞতা বাড়ে। ভেবো না যে ব্যাপারটা হঠাৎ হয়ে গেল। হঠাৎ হয় না এ-সব, হলে মানুষ সামলেও যায়। আমার মন তৈরি হয়েই ছিল, কেবল একটা অভ্যাসজনিত লজ্জা বাধা হচ্ছিল এত দিন। যখন আমি ভাবছিলুম যে আমার তিনটে জিনিসই ঠিকঠাক রয়ে গেছে, তখন বস্তুত আমার ছিল মাত্র দু’টি জিনিস, আমি তা ভাবতেও ভয় পেতুম বলে ভাবতুম না। হারাধনের তিনটি ছেলে… আঃ হা, রইল বাকি দুই! না? কী যেন তোমার লিপস্টিকের নামটা! গোলাপি স্বপ্ন, না? দেখো, ঠিক মনে রেখেছি। আনব, ঠিক আনব। ভুল হবে না। আর পিকলুর জন্য বিলিতি ফিডার। আমি সব আনব একে একে— যা যা চাই। যেমন এনেছি রেফ্রিজারেটার, রেডিয়োগ্রাম, স্টিলের আলমারি। কে বলবে যে এ-সব আমার দরকার নেই? কে বলবে যে ভালভাবে থাকা উচিত নয়? কে বলবে তোমার ছেলেকে দিশি ফিডার এনে দাও, বউকে বলো যেন লিপস্টিকের বদলে পান খায়?… যতদিন আমার অটুট তিনটে জিনিস ছিল ততদিন আমি কি খুব ভাল ছিলুম? আর এখন নেই বলে খারাপ? মনের ঐশ্বর্য একে একে ত্যাগ করছি বলে আমাকে যদি সন্ন্যাসী বলা যায় তা হলে কি তুমি হাসবে? অত বড় তিন-তিনটে গুণ ঐশ্বর্যের মতো ছিল আমার, সেগুলি ছেড়ে দেওয়া কি কিছু কম ত্যাগের ব্যাপার? চমৎকার দিন আজ, সুন্দর দিন, পাখা মেলে উড়ে যাচ্ছে আমার ট্যাক্সি… উড়ে যাই। এখন চাকরি ছাড়াও আমার নিজের কোম্পানি আছে, আমার সেই অপদার্থ দাদা সেখানে আমার পার্টনার, সেই কোম্পানি থেকে অফিসার হয়ে আমি মাল কিনি…রিণি, মাঝে মাঝে বড় অবাক হতে হয় যে আমার বেচা জিনিস আমিই কিনছি। বোধ হয় জীবনের সর্বত্রই এ-রকম, না? কে জানে! সুন্দর একটি উজ্জ্বল দিনের মধ্য দিয়ে আমি উড়ে যাচ্ছি… উড়ে যাই…

অফিসে দুপুরের দিকে একটা টেলিফোন পেল সঞ্জয়। ফোন তুলে ‘হ্যালো’ বলে শুনল ও-পাশে মৃদু ভিতু ধরনের একটা গলা, বলছে, সঞ্জয়, তুই কি সঞ্জয়? আমি সঞ্জয় সেনকে চাইছি।

সঞ্জয় বলছি।

আমি ললিত।

ললিত! বলে স্তব্ধ হয়ে রইল সঞ্জয়।

হ্যাঁ। হাসপাতাল থেকে বেরিয়েছি।

সঞ্জয় সামান্য চমকে-ওঠার ভাবটা সামলে নিয়ে হাসল, উঁচু গলায় বলল, ললিত, ভাই, কেমন আছিস এখন? দ্যাখ, হাসপাতালে সেই যে একদিন তোকে দেখতে গিয়েছিলুম, তারপর আর যাওয়াই হয়নি, এমন বিশ্রী চাকরি। ইস ললিত, কবে বেৱোলি জানতেই পারলুম না, একটা খবর দিলি না কেন?

এই তো দিচ্ছি। আসল খবর হচ্ছে এখন গোনাগুনতি দিন হাতে আছে। সময় বেশি নেই। তোদার সঙ্গে একটু দেখা হওয়া ভাল।

ফালতু কথা ছাড়। কোথা থেকে ফোন করছিস?

স্কুল থেকে।

শোন, তুই স্কুলে থাক একটু, আমি অফিস থেকে কাট মারছি, ট্যাক্সি করে গিয়ে তোকে তুলে নেব।

তারপর?

তারপর হবে একটা কিছু। সেলিব্রেশন।

ললিত হাসল, তার দরকার নেই। তুই বরং বিকেলে আয়। তুলসীও আসবে। আমি বাসায় থাকব। শরীরটা খুব ভাল নেই রে।

আচ্ছা।

ফোন রেখে দিল সঞ্জয়। একটু বসে রইল চুপচাপ। হঠাৎ লক্ষ করল টেবিলের কাচের ওপর রাখা তার হাতের আঙুলগুলো সামান্য কাঁপছে।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%