শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
নিজের ওপর মাঝে মাঝে আজকাল বড় রেগে যায় শাশ্বতী। ক্যান্সারের ওষুধটার কথা সে যে কোথায় পড়েছিল, কোন কাগজে, কবে, তা তার কিছুতেই মনে পড়ছে না। অনেক ভেবেছে সে।
একদিন ডাঁই করা পুরনো খবরের কাগজ মেঝেতে নামিয়ে ধুলো ঝেড়ে বহু সময় ধরে খুঁজেছে। মা এসে অবাক, ও কী রে ঠান্ডু, সারা দিন কাগজ গড়ায়, খুলেও দেখিস না, এখন পুরনো কাগজ পেড়ে ঘর নোংরা করে কী দেখছিস?
কী দেখছে তা কি কাউকে বলতে পারে শাশ্বতী? কে বুঝবে! তাই সে রেগে বলে, ঘর ঝেঁটিয়ে দেব। এখন যাও তো।
একদিন কালীনাথকেও জিজ্ঞেস করেছিল শাশ্বতী, দাদা, তোর মনে আছে—একদিন কাগজে বেরিয়েছিল না যে ক্যান্সারের কী একটা ওষুধ বেরিয়েছে!
ক্যান্সারের ওষুধ! কালীনাথ অনেকটা ভাবে। মাথা নেড়ে বলে, কোথায়, নজরে পড়েনি তো! বেরিয়েছে নাকি!
হুঁ। আমি নিজে দেখেছি।
কালীনাথ একটু ভেবে বলে, তা হলে খুঁজে দেখিস তো। কাগজে পেলে বলিস। অফিসে সবাইকে খবরটা দেব। খুব সেনসেশেন্যাল খবর। কেউ বলেনি তো!
শুনে রেগে যায় শাশ্বতী। খবরটা কি কেউ দেখেনি! তবে কি বেরোয়নি ও-রকম খবর? না কি সে উড়ো শুনেছে কোথাও।
খুব সন্দেহ হয় তার। কিন্তু হাল ছাড়ে না।
পাড়ার মহিম ডাক্তারকে শাশ্বতী কাকা বলে ডাকে। তার ডিসপেন্সারিতে সবসময়ে ভিড়। এক দুপুরেই যা একটু ফাঁকা। তখন মহিমকাকু কল-এ বেরোয়, আর মদন কম্পাউন্ডার বসে বসে ঝিমোয়। সেই সময়েই একদিন সেখানে হানা দিল শাশ্বতী, মদনদা, একটা খবর জানেন? ক্যান্সারের ওষুধ কোথায় করে বেরিয়েছে!
মদন বুড়ো মাথা নেড়ে বলে, বেরোল আর কোথায়! তবে বেরোব-বেরোব করছে। দু’চার দশ বছরের মধ্যে বেরিয়ে যাবে।
মদন জানে না, জানলে আর কম্পাউন্ডার হয়! শাশ্বতী তখন মহিম ডাক্তারের টেবিলের ওপর রাজ্যের মেডিকাল জার্নাল বসে বসে ঘাঁটে। সব বুঝতে পারে না, কিন্তু মন দিয়ে প্রাণ দিয়ে খোঁজে, কোথাও ক্যান্সারের সম্বন্ধে কিছু লেখা আছে কি না।
মদন কম্পাউন্ডার জিজ্ঞেস করে, কার ক্যান্সার?
কারও না। এক বন্ধুর সঙ্গে বাজি ধরেছি।
অ। বলে মদন হাই তোলে।
কলেজের লাইব্রেরিতে কোনও ডাক্তারি বই নেই। তবু শাশ্বতী ক্যাটালগ খুঁজে ফিজিওলজির গোটাকয় বই নিল। পড়ে কিছুই বুঝতে পারল না। নিজের বোধবুদ্ধির ওপরও তার ভয়ংকর রাগ হতে লাগল।
হাসপাতালে কদাচিৎ গেছে শাশ্বতী। যেতে ভয় করে। অনেক দিন আগে তার বড়দি লীলাবতী কিছু দিন ছিল মেডিক্যাল কলেজে। তখন, খুব ছোটবেলায় সে দু’-একবার সেখানে গেছে। সে জানে দু’নম্বর বাস মেডিক্যাল কলেজের পাশ দিয়ে যায়। সেই স্মৃতির ওপর নির্ভর করে, খুব সাহস করে একদিন কলেজে বেরিয়ে, কলেজে না গিয়ে সে দু’ নম্বর বাসে চাপল। ভয়ে বুক ঢিবঢিব করছিল তার, তবু যেতেই হবে বলে গেল।
ক্যান্সার ইউনিট খুঁজে পেতে দেরি হল না। ছোটখাটো একটা বাড়ি। লোকজনের ভিড় কম। সে গেটের কাছে একজন বেয়ারাকে বলল, আমি একজন ডাক্তারের সঙ্গে একটু কথা বলব।
লোকটা তাকে একটা ফাঁকা অফিস-ঘরের মতো ঘর দেখিয়ে দেয়।
সেখানে বাচ্চা এক ডাক্তার বসে আছে। রোগা, ফরসা, চোখে চশমা, মিষ্টি মুখখানি। কথা বলতেই বোঝা গেল, একটু তোতলা। সুন্দর ব্যবহার তার। শাশ্বতীকে বসতে বলল।
কার ক্যান্সার?
একজনের। আমার চেনা একজন।
কোথায় হয়েছে?
পেটে?
লোকটা হাসে। বলে, পেটে তো অনেক কিছু আছে। পেটের কোথায়?
শাশ্বতী যত দূর জানে বলল। লোকটা ভেবে বলল, তা হলে গ্যাসট্রিক কারসিনোমা। অপারেশন হয়েছে বললেন?
হয়েছে।
লোকটা ঠোঁট ওলটায়। বলে, লাভ নেই অবশ্য।
শাশ্বতীর ভয়ংকর বুক কেঁপে ওঠে। কান-মুখ ঝাঁ ঝাঁ করতে থাকে। সে কাঁপা গলায় বলে, আর ট্রিটমেন্ট নেই?
লোকটা মিষ্টি হেসে বলে, গ্যাসট্রিক কারসিনোমা পাঁচ বছর পর্যন্ত টিকলে আমরা কিওর বলে ধরি। কিন্তু পাঁচ বছরই ম্যাক্সিমাম।
তার পর কী হবে?
কালো কফির রঙের বমি হবে। বাঁ কাঁধের দিকে কতগুলো লাম্প দেখা যাবে। খিদে থাকবে না। বমির সঙ্গে রক্তও থাকতে পারে।
কিন্তু শাশ্বতী সে-সব শুনতে পায় না। না শোনার জন্যই বলে, আমি শুনেছি রে দিলে ভাল হয়ে যায়! আমাকে আপনাদের যন্ত্রপাতিগুলো দেখাবেন?
আসুন। বলে লোকটা মিষ্টি হেসে উঠে দাঁড়ায়। সে নতুন ডাক্তার। এই কচি সুন্দর মেয়েটাকে সে নিজের কৃতিত্ব দেখাতে আপত্তি করে না।
নিঃশব্দ, ঠান্ডা ঘরে প্রকাণ্ড যন্ত্রগুলো ভীত চোখে দেখে শাশ্বতী। এই বিশাল যন্ত্রেও ওইটুকু রোগ ভাল হয় না!
লোকটা তাকে দূর থেকে যন্ত্রের কলাকৌশল বুঝিয়ে দিতে থাকে। শাশ্বতী শোনেও না। কেবল চেয়ে থাকে। বলে, কিন্তু আমি শুনেছিলাম, এর, ওষুধ বেরিয়েছে।
ওষুধ! অনেক ওষুধ বেরিয়েছে। কিন্তু কোনওটাই অমোঘ নয়।
কিন্তু কথাটা মনে রাখে না সে।
মানুষ এতকাল ধরে করেছে কী! কী করেছে তারা! শাশ্বতী ভেবে দেখে, এই একটু ছোট্ট ঘটনার কাছে পৃথিবীর সব আবিষ্কার ব্যর্থ হয়ে আছে! সে মানুষের ওপর বড় রেগে যায়। কেন অকাজের কাজ করে মানুষ! কেন খামোখা প্লেন বানাচ্ছে! রকেট ছুড়ছে! তৈরি করছে বোমা! এ তো ছেলেখেলা শুধু শুধু। তারা সব ছেড়ে দিক। তারা এক্ষুনি বসে যাক সেই অমোঘ ওষুধটা বানাতে। শাশ্বতী তাদের পাঁচ বছর সময় দেবে। না, অত নয়। এক বছর— এক বছরের মধ্যে যদি বানাতে পারে ভাল। নইলে—নইলে—হায়, নইলে অসহায় শাশ্বতী কী শাস্তি দেবে তাদের তা ভেবে পায় না।
তাদের ঝি ইন্দু মাঝে মাঝে ঠাকুরপুকুরের এক তান্ত্রিকের কথা বলত। সে রোগ সারায়, প্রাণবিনিময় করে দেয়। ইন্দুকে একদিন জিজ্ঞেস করল শাশ্বতী, হ্যাঁগো ইন্দুদি, সেই তান্ত্রিক ক্যান্সার সারাতে পারে?
ইন্দু ঘাড় হেলিয়ে বলে, সব। আমার ননদাইয়ের অমন বাতব্যাধি সেরে গেল!
ইন্দুর কাছ থেকে তান্ত্রিকের ঠিকানাটা রেখে দেয় শাশ্বতী।
কয়েক দিনের মধ্যেই এ-রকম অনেক ঠিকানা এসে যায় তার হাতে। সে ভেবে কূল পায় না, কার কাছে যাবে।
মাঝে মাঝে সকালের রোদে বাবা বাগানে আগাছা নিড়োয়, ফুলগাছের গোড়া খুঁড়ে দেয়। তখন বাবার কাছে গিয়ে চুপ করে বসে শাশ্বতী। বাবা কথা বলে না, কিন্তু কদাচিৎ কখনও উদাসীন চোখে তার দিকে একপলক তাকায়।
শাশ্বতী ডাকে, বাবা।
উত্তর নেই।
কী করলে ক্যান্সার সারে?
উত্তর নেই।
কেন মানুষ ওষুধ বের করছে না এক্ষুনি?
মানুষের কাজে বড় হেলাফেলা। শাশ্বতী ভাবে।
ললিতের বাসায় সেই যে গিয়েছিল শাশ্বতী তারপর প্রায় এক মাস কেটে গেছে। প্রায় এক মাস পর একদিন রবিবারের কাগজে একজন কবিরাজের প্রবন্ধ বেরোল। হিমালয়ের গাছগাছড়ার কথা বলতে গিয়ে এক জায়গায় এক দুর্লভ গাছের নাম করে বলেছেন যে, এর থেকে একদিন দুরারোগ্য ক্যান্সারের প্রতিষেধক বেরোতে পারে।
কালীনাথকে লুকিয়ে প্রবন্ধের পাতাটা ভাঁজ করে ব্যাগে ভরল শাশ্বতী। অল্প একটু সাজগোজ করে বন্ধুর বাসায় যাচ্ছে বলে বেরিয়ে পড়ল।
ললিতের ঘরের দরজা ভেজানো ছিল। কড়া নাড়তেই দরজা খুলে সামনে দাঁড়াল খুব লম্বা, ফরসা একজন লোক। গায়ে হাফহাতা পাঞ্জাবি, পরনে খাটো ধুতি।
ললিতবাবু নেই?
আছে। আসুন। লোকটি বড় সুন্দর হাসে। শাশ্বতী লক্ষ করে।
আধশোয়া থেকে উঠে বসল ললিত। দরজাটা আড়াল করে দাঁড়িয়েছিল রমেন, সে সরে যেতেই শাশ্বতীকে দেখে সে প্রথমে কথা বলতে পারল না। কেমন যেন বুক-কঁপা, কথা-গুলিয়ে-যাওয়া, আবেগসর্বস্ব এক অনুভূতি টের পায় সে।
তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
এতক্ষণ শাশ্বতী কেবল আসছিল ললিতের কাছে। একটা ব্যগ্র প্রয়োজনের কথাই তার মন জুড়ে ছিল। কিন্তু এখন, ললিতের মুখোমুখি সে হঠাৎ টের পায়, এতটা করার মধ্যে সে সকলের কাছেই ধরা পড়ে গেছে। সবাই বুঝতে পারছে এখন, কেন শাশ্বতী এত দূর এসেছে।
বুঝুকগে। শাশ্বতীর কিছু আর যায় আসে না।
আসুন। ভিতরে আসুন। রমেন ডাকে।
শাশ্বতী ভিতরে এসে তার শুষ্ক, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখে একটু হাসে। বলে, কেমন আছেন দেখতে এলাম।
তারপরেই মাথা নিচু করে সে।
শাশ্বতীকে বসিয়ে মাকে ডেকে আনে ললিত রান্নাঘর থেকে।
এতক্ষণ মনে মনে বোধহয় শাশ্বতীকেই প্রার্থনা করছিল মা। গতকাল ওই সন্ন্যাসী ছেলেটা আসার পর থেকেই। ও কোনও তুক করার আগেই যেন শাশ্বতী আসে।
একগাল হেসে কাছে বসে শাশ্বতীকে প্রায় কোলে টেনে নেয় মা। বলে, মুখ শুকিয়ে গেছে যে! রোদে রোদে ঘোরো বুঝি! তারপরেই আর দেরি না করে জিজ্ঞেস করে, তোমরা বাঁড়ুজ্যে না! শাণ্ডিল্য গোত্র তো!
ললিতের কান-মুখ ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে। বলে, উঃ মা, কী হচ্ছে!
হায় মা! মায়ের জন্য বড় কষ্ট হয় ললিতের। মিতুর অপমান মনে পড়ে। মনে পড়ে আর কিছুদিন বাদে এই ঘরে কেমন একা হয়ে যাবে মা। মা জানে না, ললিত—তার একমাত্র ললিত থাকবে না। ধমক দিতে ললিতের কষ্ট হয়। চোখ ছলছল করে। মা আর শাশ্বতীর ও-রকম কাছ ঘেঁষে আপনজনের মতো বসে থাকা সে দেখতে পারে না। সে চোখ ফিরিয়ে নেয়।
শাশ্বতীকে তাদের কাছে না-রেখে রান্নাঘরের দরজায় টেনে নিয়ে গিয়ে বসাল মা। মায়ের মুখে আজ হাসি ধরছে না। এই গরিবের সংসারে লক্ষ্মীমন্ত মেয়েটা কি আসতে রাজি হবে! হয় যদি! আহা, যদি হয়!
শাশ্বতীকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য রমেন আর ললিত একসঙ্গে বেরিয়েছিল।
আনোয়ার শা রোড ধরে কিছুক্ষণ হাঁটার পর ললিত একটু হাঁফিয়ে গেল। বেশ রোদ এখন। সেও আবেগবশত জোরে হেঁটেছে। লক্ষ করে শাশ্বতী বলল, আপনারা ফিরে যান। আমি তো রাস্তা চিনি। যেতে পারব।
রমেন ললিতকে ফিরিয়ে দেয়, তুই চলে যা। আমি এগিয়ে দিয়ে আসি।
ক্লিষ্ট একটু হেসে ললিত দাঁড়িয়ে গেল। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ফিরে এল আস্তে আস্তে। এসে শাশ্বতীর রেখে-যাওয়া পত্রিকার প্রবন্ধের পাতাটা খুলল সে। খুলে হাসল।
পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে একসময়ে রমেন হাত ধরে শাশ্বতীকে রাস্তার ধারে সরিয়ে আনল। পিছনে অনেকক্ষণ ধরে হর্ন দিচ্ছিল একটা গাড়ি, শাশ্বতী শুনতে পায়নি। সে একটু লাজুক হাসল। যতক্ষণ ললিত সামনে ছিল ততক্ষণ লোকটাকে ভাল করে লক্ষ করেনি শাশ্বতী। এখন লক্ষ করে দেখল লোকটা একটা থামের মতো বড়। গায়ের ফরসা রং থেকে রোদ ঠিকরে আসছে, সুন্দর চেহারা, কিন্তু পোশাকের কোনও যত্ন নেই। পরনে একটা হাফ-হাতা পাঞ্জাবি আর ধুতি। লোকটা বোধ হয় কখনও খেয়াল করে না যে সে কতখানি সুন্দর। শাশ্বতীর ভাল লাগল যে সে রাস্তার মাঝখান দিয়ে অসাবধানে হাঁটছিল বলে লোকটা তাকে একটুও ধমক দিল না, উপদেশও দিল না। শুধু হাত ধরে সরিয়ে এনে আবার নির্বিকারভাবে হাঁটছে। যেন দরকার হলে আবার হাত ধরে সরিয়ে আনবে, ধমক বা উপদেশ দেবে না।
শাশ্বতী জিজ্ঞেস করল, বললেন না তো আপনি সন্ন্যাসী কি না!
রমেন শান্তভাবে বলল, না।
শাশ্বতী তার দাঁতে ঠোঁট টেপা সুন্দর হাসিটা হাসল। বলল, কিন্তু আপনি সন্ন্যাসী হলে খুব ভাল হত।
কেন?
সন্ন্যাসীদের তো অনেক তুকতাক তন্ত্র-মন্ত্র জানা থাকে। আমি আপনার কাছ থেকে ক্যান্সারের ওসুধ জেনে নিতাম।
রমেন একটু হাসল।
শাশ্বতী চিন্তিত মুখে বলল, কিন্তু যত দূর মনে হয় আমি কাগজে দেখেছি ক্যাসারের ওষুধ বেরিয়েছে। তাই না?
রমেন মাথা নাড়ল, হ্যাঁ, বেরিয়েছে।
শাশ্বতীর মুখ সামান্য উজ্জ্বল দেখাল। বলল, আপনিও দেখেছেন, না?
রমেন একটু চিন্তা করে বলল, দেখেছি বোধ হয়।
বেরিয়েছে। শাশ্বতী হঠাৎ নিশ্চিন্তির শ্বাস ফেলে বলল, আমি জানি।
রমেন একটুও হাসল না। খুব গম্ভীরভাবে বলল, আমি অবশ্য একটা টোটকা ওষুধের কথা জানি।
কী সেটা?
হাঁটতে হাঁটতে বাস-রাস্তায় এসে গিয়েছিল তারা। রমেন বলল, আর-একদিন বলা যাবে। ওই আপনার বাস-স্টপ।
না, আপনি বলুন। অধৈর্যের স্বরে বলল শাশ্বতী। এদিক ওদিক একটু দেখে নিয়ে বলল, ওইখানে একটা রেস্টুরেন্ট দেখা যাচ্ছে। চলুন, একটু বসি।
রমেন একটু ইতস্তত করে বলল, আমি রেস্টুরেন্টে কিছু খাই না।
আচ্ছা, আমি চা খাব। আপনি বসবেন। চলুন।
সকাল সাড়ে দশটায় রেস্টুরেন্টটা খুব ফাঁকা ছিল না। কয়েকজন ইতর ধরনের ছেলে ছোকরা এদিক ওদিক বসে আছে। কেউ জোরালো শিস দিচ্ছে, তার সঙ্গে টেবিলে আঙুল ঠুকে তবলা বাজানোর শব্দ। দেখেশুনে মুখ শুকোল শাশ্বতীর। বলল, এখানে হবে না। বড় বাজে জায়গা।
সব জায়গাই এ-রকম। আসুন, কোনও ভয় নেই।
ভিতরটা নোংরা অন্ধকার। ছেলেছোকরারা লম্বা একটা টেবিল দখল করে রেখেছে, বাদবাকি রেস্টুরেন্টটা ফাঁকা। এরা আড্ডা দেয় বলেই বোধহয় এখানে তেমন খদ্দের আসে না। যে-দোকানে একবার এ-ধরনের আড্ডা বসে সে-দোকান আস্তে আস্তে মিইয়ে যায়, টিম টিম করে চলে।
ইস, কী অসভ্যের মতো তাকাচ্ছে! ফিস ফিস করে শাশ্বতী বলল।
আপনিও তাকান। ভয় পাবেন না।
যাঃ।
রমেন তার সরল সুন্দর চোখে তাকিয়ে ছিল ছেলেগুলোর দিকে। প্রায় নিস্পলকভাবে।
শাশ্বতী ফিসফিস করে বলল, কী করছেন! ওরা ভীষণ বাজে।
সে-কথায় কান দিল না রমেন। তাকিয়েই রইল। ব্যাপারটা খুব আস্তে আস্তে ঘটতে লাগল। কালোকোলো, রংচঙে জামা প্যান্ট পরা ছেলেগুলো ঘন ঘন তাকাচ্ছিল তাদের দিকে। হাসছিল, গা টেপাটেপি করে নিচু স্বরে কথা বলছিল। তারা কিছুক্ষণ রমেনকে লক্ষ করল, তার চোখের দৃষ্টি ফেরত দিল সমানে সমানে। একজন বলল, মাইরি, আমাদের ভসসো করে ফেলবে। তারপর আস্তে আস্তে ঠান্ডা লড়াইটায় তারা হারতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা আর কেউ তাকাচ্ছিল না, নিজেদের আড্ডায় ডুবে গেল।
রমেন শাশ্বতীর দিকে মুখ ফিরিয়ে একটু হাসল। তারপর বলল, চোখের একটা কোনও শক্তি আছে। আপনি যদি কখনও এ-সব ছেলের চোখে সাহস করে চোখ রাখেন তবে দেখবেন এরা সেটা সহ্য করতে পারে না। তবে খুব সরলভাবে তাকাতে হয়, রেগে গিয়েও নয় আবার ভয়ে ভয়েও না।
কিন্তু ওষুধের কথাটা!
রমেন মাথা নাড়ল, হ্যাঁ। সেটাও চোখেরই একটা ব্যাপার। আমাদের পরিবারে একটা পুরনো চোখের অসুখ ছিল। আমার ঠাকুরদার বাবা ছিলেন প্রায় অন্ধ মানুষ। দাদু সেই অসুখটা জন্মসূত্রে পেয়েছিলেন। যৌবনকাল থেকেই তাঁকে চশমার সঙ্গে আতসকাচ কিংবা দূরবিন ব্যবহার করতে হত। আবার দাদুর দুই ছেলে, আমার বাবা আর জ্যাঠামশাই, আর এক মেয়ে, আমার পিসিমা—এদের বয়স তিরিশ পেরোনোর আগেই চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হতে শুরু করল। আর চল্লিশের আগেই সকলের অন্ধ হয়ে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল। সেই সময়ে সমস্যা দেখা দিয়েছিল আমাদের বিরাট বিষয়-সম্পত্তি, বাড়ি, বাগান, খাজনার হিসেব এ-সবের দেখাশোনা নিয়ে। কে এ-সব দেখে? আমার ঠাকুমা বরাবর ভিতর-বাড়িতে থাকতেন, বাইরে বেরোতেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন বাবার চোখ খারাপ হতে শুরু করল তখন ঠাকুমাকে বেরোতে হল। আর, আশ্চর্যের বিষয় যে, ঠাকুমা খুব অল্পদিনেই সব বুঝেসুঝে নিলেন। খুব নিখুঁতভাবে, এমনকী দাদুর চেয়েও ভালভাবে তিনি জমিদারি চালাতেন। আমাদের বিরাট বাড়ি, বাগান-সম্পত্তি, সবকিছুর ওপর তাঁর তীক্ষ্ণ চোখ ছিল। সকলের দেখা তিনি একা দেখতেন। তাই এত তীক্ষ্ণ হয়েছিল তাঁর চোখ যে বাগানের একটা ফুল কেউ তুললে তিনি টের পেতেন, গাছের একটা পাতা পড়ে গেলেও তাঁর চোখ এড়াত না। প্রতিটি প্রজার মুখ তাঁর মনে থাকত। আমাদের বাসায় অজস্র সিন্দুক, আলমারি আর বাক্স প্যাঁটরা ছিল, ঠাকুমা সেগুলোর তালা একবার চাবি ঢুকিয়ে খুলতে, কখনও কোন তালার কোন চাবি তা ভুল করতেন না। এইভাবে সাৱা দিন চোখ ব্যবহার করতে করতে তাঁর চোখ ভয়ংকর তীক্ষ্ণ হয়ে যায়, আর বিষয়সম্পত্তির ওপর তাঁর ভয়ংকর একটা ভালবাসা চলে আসে। এর পর ঠাকুমা যখন মারা যান তখন একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছিল। তাঁর উদুরি হয়েছিল। তার ওপর গায়ে জল এসেছিল। একটা পা গ্যাংগ্রিন হয়ে পচে গোড়ালির হাড় বেরিয়ে পড়েছিল। ডাক্তাররা জবাব দিয়ে গেল। কিন্তু ঠাকুমা মরছিলেন না। একদিন দু’দিন করে এক মাস দু’মাস বেঁচে রইলেন। ওই ফোলা পচাগলা শরীরের মধ্যে একমাত্র তাঁর চোখ দুটোই ছিল দেখবার মতো। সেই বড় বড় চোখ, সেই উজ্জ্বল তীক্ষ্ণ দৃষ্টি একই রকম ছিল, রোগের যন্ত্রণা সেগুলিকে একটুও ছোঁয়নি। কেবল বলতেন, আমি মরে গেলে এত সব কে দেখবে? বোধহয় সেই কারণেই ভীষণ ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি বেঁচে রইলেন আরও সাত-আট মাস। সেই বেঁচে থাকাটা দেখার মতো ছিল। তারপর একদিন দুপুরবেলা আমার জেঠিমা ঠাকুমার শিয়রের দিকের আলমারি খুলে কী যেন বের করতে গেছেন, ঠাকুমা ঘাড় উলটে সেদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, বড়বউ, কী নিচ্ছ? ব্যস ওই অবস্থায় তাঁর প্রাণ বেরিয়ে গেল। আমরা চেঁচামেচি শুনে দৌড়ে গিয়ে দেখি অদ্ভুত দৃশ্য। ঘাড় উলটে ঠাকুমা এত বড় বড় চোখে আলমারিটার দিকে চেয়ে আছেন। একেবারে জীবন্ত মানুষের মতো খোলা চোখ, কেবল হাঁ-করা মুখের মধ্যে এলিয়ে থাকা জিবটা দেখে বোঝা যায়, ঠাকুমা বেঁচে নেই। সেই খোলা চোখ বন্ধ করতে আমাদের বেশ কষ্ট করতে হয়েছিল। যত বার বুজিয়ে দেওয়া হয় তত বারই আস্তে আস্তে চোখের পাতা খুলে যায়, আর ঠাকুমা তাকিয়ে থাকেন।
আহা। স্বভাবত কোমল মন শাশ্বতীর। তার চোখ ছলছল করে।
ওষুধের কথাটা কী জানেন? ঠাকুমা মরে যাওয়ার পর আমি অনেক ভেবে দেখেছি ঠাকুমার যে মরতে অত সময় লেগেছিল তার একটা কারণ হচ্ছে ওই বিষয়-সম্পত্তির প্রতি ভালবাসা। বিষয়-সম্পত্তির প্রতি বেশি টান ভালবাসা আমরা ভারতীয়েরা পছন্দ করি না, কিন্তু তবু বিষয়-সম্পত্তির মতো খারাপ জিনিসের প্রতি ওই ভালবাসাও ঠাকুমার আয়ু বাড়িয়ে দিয়েছিল। তা হলে দেখুন, ভাল কিছু সৎ কিছুর প্রতি যদি মানুষের ও-রকম তীব্র ভালবাসা হয়, আর তাকে রক্ষা করার জন্য যদি মানুষ সজাগ হয়ে ওঠে তা হলে তার আয়ু বেড়ে যাবে না? শুধু আয়ু নয়, তার চোখের দৃষ্টি বেড়ে যাবে, বাড়বে শ্রবণক্ষমতা, বেড়ে যাবে স্মৃতিশক্তি কিংবা ভবিষ্যৎ-দৃষ্টি। তখন আর পাঁচজন যা দেখে না, যা শোনে না তার সব সে দেখতে বা শুনতে পাবে। তাই না?
অনেকখানি ঘাড় হেলাল শাশ্বতী। বলল, ঠিক।
তারপর একটু ইতস্তত করে বলল, তা হলে আপনি বলছেন, আপনার বন্ধুর অসুখটা সেরে যাবে?
মিটমিট করে একটু হাসল রমেন। বলল, আপনার কী মনে হয়?
গূঢ় প্রশ্ন। শাশ্বতী এর উত্তর জানে না। ললিতের উজ্জ্বল চোখ মুখখানা সে মনশ্চক্ষে দেখতে পায়। মৃত্যুর মুখোমুখি একা একটা লোক। রোগী। শাশ্বতীকে ভালবাসে, কিন্তু সেটাকে স্বীকার করতে চাইবে না, এমন অহংকারী! রমেনের সুন্দর সবল মুখখানার দিকে চেয়ে শাশ্বতীর ঠোঁট একটু কেঁপে ওঠে। রমেনের প্রশ্নটার কোনও উত্তর দেয় না শাশ্বতী, কিন্তু হঠাৎ স্খলিত গলায় বলে, আপনি ওকে বাঁচিয়ে দিন।
এই থামের মতো প্রকাণ্ড লোকটার সামনে কথাটা বলতে একটুও লজ্জা করে না শাশ্বতীর।
রমেন একটা নিশ্বাস ফেলল।
এক কাপ চা সামনে জুড়িয়ে যাচ্ছিল। শাশ্বতী তাতে দু’-একবার ঠোঁট ছুঁইয়ে উঠে পড়ল। বলল, অনেক বেলা হয়ে গেছে।
রাস্তায় এসে শাশ্বতী বলল, আপনি একটা কথা কাউকে বলবেন না।
কী কথা!
আমি ওকে ভালবাসি।
রমেন মাথা নাড়ল, বলব না।
বাস-স্টপের ভিড় থেকে একটু আলগা দাঁড়াল দু’জন। শাশ্বতী হাত দিয়ে রোদ থেকে চোখ আড়াল করে মাথা উঁচু করে রমেনকে দেখল। তারপর বলল, আপনি বরং ওকে বলবেন।
কী?
শাশ্বতী লাজুক মুখ নামিয়ে বলল, বলবেন যে আমি ওকে ভালবাসি।
তারপর একটু ইতস্তত করে শাশ্বতী বিব্রত মুখে বলল, আমাকে যদি ও ভালবাসে তা হলে হয়তো, আপনি যা বললেন সে-রকম, ওর আয়ু বেড়ে যেতে পারে—
রমেন একটু হেসে মাথা নাড়ল, না। মেয়েদের ভালবাসা তো সোজা। সে-ভালবাসায় লাভ নেই। বরং মেয়েদের প্রতি অত্যধিক ভালবাসা মানুষের মধ্যে মৃত্যুপ্রেম জাগিয়ে দেয়।
সে কী?
রমেন শান্তভাবে বলল, আপনি যে-কোনও প্রেমের কবিতা পড়ে দেখবেন, কিংবা প্রেমের গল্প উপন্যাস, তাতে দেখবেন মৃত্যুর কথা কিছু না কিছু থাকবেই। যারা প্রেম-ট্রেম করে তাদের কথাবার্তা শুনে দেখবেন, তারা দু’-দশটা কথার পরেই একে অন্যকে বলছে, আমি যদি মরে যাই তা হলে তুমি কী করবে? মৃত্যুর চেতনা ছাড়া কিছুতেই প্রেমকে মহৎ করা যায় না। ও-রকম প্রেমে কি আয়ু বাড়ে?
তবে? কাকে?
রমেনের মুখে উত্তরটা এসে গিয়েছিল, কিন্তু সে উচ্চারণ করল না। ‘ঈশ্বর’ শব্দটা উচ্চারণ করার একটা বিশেষ সময় আছে, নইলে তো মানুষের মনে তরঙ্গ তোলে না। বরং শুনে মানুষ হেসে ওঠে, মুখ ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু কখনও কখনও এক-একটা বিশেষ সময় যখন মানুষ রেল লাইনের ঢালু জমিতে দাঁড়িয়ে থাকে রেলগাড়ির প্রতীক্ষায়, যখন জলপ্লাবনে ছেলে কোলে আশ্রয় খুঁজে বেড়ায়, কিংবা যখন—| তাই রমেন কথা বলে না। একটু হাসে মাত্র।
শাশ্বতী মুখ তুলে রমেনের উজ্জ্বল চোখ দু’খানা দেখল। হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, আপনার কখনও চোখের অসুখ হয়নি?
না। বলে মাথা নাড়ল রমেন, তারপর একটু চুপ করে থেকে দুষ্টু ছেলের মতো হেসে বলল, কিন্তু একবার আমি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম, কয়েক মুহূর্তের জন্য…কিন্তু ওই আপনার বাস এসে গেল।
বাসটা সামনে এসে দাঁড়াতেই কিন্তু শাশ্বতী পিছিয়ে গেল। বলল, বড্ড ভিড়।
রমেন একটু চিন্তা করে বলল, তা হলে চলুন রাসবিহারীর মোড় পর্যন্ত আপনাকে হেঁটে এগিয়ে দিয়ে আসি।
শাশ্বতীও তাই চায়। এ লোকটার সেই অন্ধ হয়ে যাওয়ার গল্পটা তাকে শুনতেই হবে। সদ্য চেনা একজন লোককে এতদূর খামোখা হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া যে কেমন বেমানান তা তার মনেও হল না। বলল, বেশ হবে। চলুন। ওখান থেকে আমি যাদবপুর যাওয়ার বাস ফাঁকা পাব।
কিছুক্ষণ তারা নিঃশব্দে হাঁটল। ফুটপাথ নেই বলে রাস্তাটা বিপজ্জনক, অবিরল গাড়ি যাচ্ছে। রাস্তার দিকটায় রমেন, রাস্তার ধার ঘেঁষে শাশ্বতী৷ খানিক দূর হেঁটে শাশ্বতী হাঁটার গতি কমিয়ে দিয়ে বলল, এবার সেই গল্পটা বলুন। সেই অন্ধ হয়ে যাওয়ার গল্পটা।
রমেন সামান্য একটু হাসল। বলল, রাস্তা একটু ফাঁকা পাই তারপর—
রেলব্রিজ পেরিয়ে যাওয়ার পর চওড়া সুন্দর রাস্তার ফুটপাথে উঠে এল দু’জন। শাশ্বতী এতক্ষণ কৌতূহল চেপে ছিল, এবার শ্বাস ফেলে বলল, এবার—
রমেন মাথা নেড়ে বলল, আমার ঠাকুমা মারা যাওয়ার পর একদিন সন্ধেবেলা খেলাধুলো সেরে ফিরছি। আমাদের বাড়ির সামনের দিকটায় বিরাট হলঘরের মতো একটা বৈঠকখানা। সেই বৈঠকখানায় সন্ধের অন্ধকারে দেখি দাদু প্রকাণ্ড পিয়ানোটার পাশে বসে আছেন। হাতের আতসকাচ দিয়ে পিয়ানোর গায়ে কী যেন দেখার চেষ্টা করছেন নিচু হয়ে। আমি তাঁকে টের পেতে না-দিয়ে পা টিপে টিপে বড় ঘরটা পেরিয়ে যাচ্ছিলাম। এমন সময়ে দাদু খুব আস্তে জিজ্ঞেস করলেন, কে? আমি দাঁড়িয়ে বললাম, আমি। দাদু একটা হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে, যেন আমাকে কোলে নেবেন, এমনভাবে বললেন, রমেন! কাছে এসো তো। কাছে যেতেই উনি আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, আমার সামনে বোসো। আমি মেঝেয় হাঁটু গেড়ে বসলাম। দাদু আমার মুখ হাতে তুলে বললেন, দেখি রমেন, তোমার মুখখানা। আমার মুখের ওপর আতসকাচ ধরে দাদু অনেকক্ষণ ধরে আমার মুখ দেখলেন। তখনও ঘরে আলো দিয়ে যায়নি, ঘরটা অন্ধকার। আবছা একটু শেষবেলার আলোয় সেই আতসকাচের ভিতর দিয়ে আমি তাঁর দুটো প্রকাণ্ড চোখ, নাকের ওপর উঁচু হাড়, ঘন ভ্রূ আর কপাল দেখতে পাচ্ছিলাম। দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে হচ্ছিল সেই চোখ জোড়া আমার ভিতরে অনেকখানি দেখে নিচ্ছে। যখন আমার বয়স দশ কি এগারো, তখন আমি আমার প্রথম বয়ঃসন্ধির খারাপ স্বপ্নটি দেখেছি, আর একদিন, দুপুরবেলা অলি নামে একটি মেয়ে চোর-চোর খেলার সময়ে মুকুন্দর ঘানিঘরে অন্ধকারে লুকিয়ে আমাকে একটা চুমু খেয়েছিল, তখন আমার গালে একটি-দু’টি ব্রণ দেখা দিচ্ছে। তাই দাদুর সেই চোখ জোড়ার দিকে চেয়ে মনে হচ্ছিল তিনি আমার সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। আমার বুক কাঁপছিল। কিন্তু দাদু সেদিন আমাকে অন্যরকমভাবে দেখলেন। অনেকণ ধরে দেখে তিনি খুব স্পষ্ট গলায় জিজ্ঞেস করলেন, রমেন, তুমি কি খুব বেশি কিছু চাও? খুব টাকা পয়সা, বড় জমিদারি, অনেক বাড়ি-গাড়ি? সে-প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো তখন আমার বয়স নয়। দাদু অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে নিজে থেকেই বললেন, তুমি কখনও খুব বেশি কিছু চেয়ো না। লোকে যেন একদিন তোমাকে ভিখিরির পোশাকেও ঐশ্বর্যবান বলে চিনতে পারে। এই বলে দাদু আতসকাচ সরিয়ে রাখলেন। জলভরা চোখ দু’হাতে মুছে নিয়ে একটু অপ্রস্তুত হাসি হেসে বললেন, চোখ বড় মায়ার সৃষ্টি করে। এই ঘটনার পরদিন দাদু দুপুরবেলা একা একা ছাদে উঠে গেলেন। তারপর আতসকাচের ভিতর দিয়ে ভরদুপুরের সূর্যের দিকে চেয়ে দেখলেন। তার দুটো চোখই একদম নষ্ট হয়ে গেল। এই ঘটনায় আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তার ওপর আমার মা মাঝে মাঝে আমাকে আড়ালে ডেকে জিজ্ঞেস করতেন আমি চোখে কীরকম দেখি। আমি ভালই দেখতাম, তবু মা’র সন্দেহ যেত না। জিজ্ঞেস করতেন, ওই যে ব্রহ্মপুত্রের ওপর দিয়ে নৌকোটা যাচ্ছে— বল তো ওটা কী নৌকো; কখনও বা জিজ্ঞেস করতেন, ওই যে ছাদে একটা টিকটিকি— ওটাকে দেখতে পাচ্ছিস? এতে আমার ভয় আরও বেড়ে যেত। তখন আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছিলাম যে একদিন আমিও আস্তে আস্তে অন্ধ হয়ে যাব। তাই তখন আমি গোপনে গোপনে একটা কাজ শুরু করলাম। গোপনে আমি চোখ বুজে হাঁটতাম, দিক ঠিক করার চেষ্টা করতাম। যদি কোনও দিন সত্যিই অন্ধ হয়ে যাই তবে যেন হঠাৎ মুশকিলে পড়তে না হয়। এই চেষ্টা আমি এমন প্রাণপণে করতাম, এমন প্রাণের টানে যে হোঁচট খেয়ে পড়লে, কিংবা কোনও কারণে ভয় পেলেও চোখ খুলতাম না। আমার এই কাজের সঙ্গী ছিল উদ্ধব নামে আমাদের এক চাকর। সে আমাকে গাড়ি করে অচেনা জায়গায় নিয়ে যেত, তারপর আমার হাত বেঁধে চোখে রুমাল জড়িয়ে ছেড়ে দিত, তারপর দূরে কোথাও লুকিয়ে থেকে একবার মৃদু একটা শিস দিয়েই চুপ করে যেত। আর আমি সেই শব্দটুকু মনে রেখে দিক নির্ণয় করে ঠিক ওকে খুঁজে বের করতাম। তারপর আস্তে আস্তে আমি এ-খেলায় এত পাকা হয়ে গেলাম যে একা একা আমাদের বাড়ির পাঁচিলের ওপর দিয়ে চোখ বুজে দ্রুত হাঁটতে পারতাম। উদ্ধব আমাদের বাড়ির বাইরের মাঠে দুরে একটা ব্ল্যাকবোর্ডে বৃত্ত এঁকে তার পিছনে দাঁড়িয়ে শিস দিত, আমি এয়ারগান দিয়ে চোখ বুজে সেইখানে ঠিকঠাক গুলি করতাম। এইভাবেই আমার যখন চোদ্দো-পনেরো বছর বয়স তখন আমি বুঝতে পারলাম যে আমার আর কোনও ভয় নেই। এবার আমি আমার অন্ধকার দিনগুলোর জন্য প্রস্তুত। সেই সময়েই একদিন ঘটনাটা ঘটল। আমি রোজ খুব ভোরে উঠে ফুটবল নিয়ে দৌড়তে যেতাম মাঠে। বলটা মাটিতে গড়িয়ে দিতাম, তারপর পায়ে পায়ে বল নিয়ে মাঠের চার দিকে চক্কর। অন্ধকার থাকতে আমার দৌড় শুরু হত, মাঠটাকে পাঁচ কি ছ’বার পাক দেওয়ার পর আলো ফুটত। রোজই এ-রকম হত। একদিন খুব ভোরে উঠে দৌড়োতে গেছি, পায়ে বল, দৌড়তে দৌড়তে পাক খাচ্ছি মাঠের চার দিকে, ক্রমে ক্রমে এক দুই করে সাত আট দশ বার মাঠটা ঘুরে এলাম। কিন্তু সেদিন ভোর হচ্ছিল না। অন্ধকার জমাট বেঁধে রইল। কিন্তু সেদিকে আমার খেয়াল ছিল না, আমি বিভোর হয়ে দৌড়তাম এবং প্রায়ই সে সময়ে আমার চোখ বন্ধ থাকত। কিন্তু হঠাৎ এক সময়ে আমার পা থেকে বলটা একটু জোরে গড়িয়ে গেল আমার আয়ত্তের বাইরে। আমি থেমে চোখ খুলে বলটাকে খুঁজতে গিয়ে দেখি চার দিকে নিরেট ঘুটঘুটি অন্ধকার। মাটির দিকে চেয়ে দেখি জমাট অন্ধকার, আকাশের দিকে চেয়ে দেখি চাঁদ তারা কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না, চার দিকে চেয়ে দেখি কোনওখানে কোনও আলো নেই, ঝাপসা গাছপালা নেই। কিছু নেই। আমি চোখের কাছে তুলে আমার সাদা হাতটাকে দেখার চেষ্টা করলাম, দেখলাম কিচ্ছু নেই। মনে পড়ল আমি মাঠটাকে অন্তত দশবার পাক দিয়েছি, তবু সেদিন ভোর হয়নি। আমি এক জায়গাতেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমি যে চোখ বুজে হাঁটতে শিখেছিলাম, কিংবা শিখেছিলাম দিকনির্ণয় করার কৌশল সে-সব কিছুই এখন আমার মনে পড়ল না। আমার সমস্ত শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল ভয়ে। আমি আর এক পাও এগোবার সাহস পেলাম না, দিকনির্ণয় করতে আমার ভয় হল, যদি ভুল পথে চলে যাই? তাই তখন আমি খুব অসহায়ভাবে আস্তে আস্তে হাঁটু গেড়ে বসলাম। আমার চোখ বেয়ে জলের ধারা নামল। খুব তুচ্ছ কারণেই তখন আমি কাঁদছিলাম। কখনও হারানো বলটির জন্য, কখনও অলি নামে মেয়েটির জন্য, কখনও বা ঘরে যাওয়ার মেঠো পথটির জন্য। আমি কি আর কখনও কিছুই দেখব না? এতকাল ধরে আমি যা-কিছু দেখেছি, কিংবা যা-কিছু আমার দেখা হয়নি আমি সেই সবকিছুর জন্য কাঁদছিলাম। এইভাবে অলীক, অসম্ভব কয়েকটি মুহূর্ত কেটে গেল। এর আগে আমি কখনও ভগবানকে ডাকিনি, ডাকার দরকার হয়নি বলে। যুদ্ধের সময়ে বন্দুক আর গাড়ি বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে বলে দশ- বারো বছর বয়সে বন্দুক চালাতে শিখোছলাম, তেরো বছর বয়সে শিখেছি গাড়ি চালাতে, পনেরো-ষোলো বছর বয়সে শিখে গেছি কী করে চোখ বুজে চলতে হয়। আমি তো সবকিছুর জন্যই নিজের ওপর নির্ভরশীল, তবে ভগবানকে আমার কী দরকার? যে নিজে নিজে চলতে পারে তার ভগবান দিয়ে কী হবে? তাই সেই অদ্ভুত সময়ে সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে মাঠের মধ্যে বসে থেকে যখন আমি ভগবানের কথা ভাবতে চেষ্টা করলাম তখন তাঁর কোনও চেহারাই আমার মনে এল না। তবু আমি আকুল হয়ে বললাম, রক্ষা করো, আমাকে রক্ষা করো, আমার চোখ ফিরিয়ে দাও। সেই আকুলতার মধ্যে বোধ হয় একটা কিছু ছিল, আমার মনশ্চক্ষে ভগবানের একটা চেহারা ভেসে উঠল। কেমন জানেন? সেই আতসকাচের ভিতর দিয়ে আমি দাদুর মুখ যে-রকম দেখেছিলাম অনেকটা সেই রকম। সে যেন দাদুর মতোই আমার প্রিয় কেউ, যে আমায় বড় ভালবাসে, সে যেন একটা আতসকাচের ভিতর দিয়ে নিবিড় ভালবাসায় শেষবারের মতো আমার মুখখানা দেখে নিচ্ছে। যেন বলছে, আহা, তুমি কি আমার রমেন! আমার রমেন! দেখি তোমার মুখখানা। অনেকটা দাদুর মতোই তার মুখ। পাহাড় পর্বত সমুদ্র আর গাছগাছালি রয়েছে, সেইখানেই রয়েছে আকাশ। এ-রকম কয়েকটা মুহূর্ত কেটে গেলে শীতের উত্তুরে হাওয়া হু হু করে বয়ে গেল, গাছপালায় চার দিকে সেই বাতাসের শব্দ হল। সেই বাতাসটাই আমার কোলের কাছে গড়িয়ে আনল আমার হারানো বল। আমি দু’ হাতে বুকে তুলে চেপে ধরলাম বলটা। চোখ চেয়ে দেখলাম চার দিকে আলোয় আলো, আর সূর্য উঠছে।
শাশ্বতীর পা কখন থেমে গিয়েছিল। সে মুখ তুলে খাস চেপে জিজ্ঞেস করল, সত্যি?
রমেন ম্লান হাসল আবার। বলল, সত্যি।
আপনি কাউকে এ-গল বললেন না?
আমি দাদুকে এই ঘটনার কথা বলেছিলাম। দাদু তখন ছিলেন সম্পূর্ণ অন্ধ, তাই আমার বিশ্বাস ছিল দাদু সেই ঘটনাটা অবিশ্বাস করবেন না। তাই সেদিন সন্ধেবেলা দাদু তাঁর আহ্নিক সেরে এসে যখন বড় ঘরটায় আরাম-কেদারায় বসেছেন তখন আমি তাঁর পাশে মেঝেতে বসে সকালের ঘটনার কথা বললাম। শুনে দাদু আমার মাথায় নীরবে অনেকক্ষণ হাত বুলিয়ে দিলেন। টের পেলাম তাঁর হাত থরথর করে কাঁপছে। সেজবাতিটা কমিয়ে দেওয়া ছিল, তবু সেই অল্প আলোতেও দেখলাম তাঁর গাল বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি আস্তে আস্তে বললেন, ভগবানের কথা ভাবতে গিয়ে তুমি কেন একজন মানুষের কথাই ভাবলে রমেন? ভগবান কি মানুষ? আমি এর উত্তর দিতে পারলাম না। কিন্তু মনে মনে ভেবে দেখলাম, সত্যিই তো, ভগবান যদি মানুষের মতোই দেখতে হয় তবে আর সে ভগবান কীসের? তবু আমি মুখে বললাম, মানুষ হলেও সে খুব প্রকাণ্ড মানুষ! ওই আকাশ পর্যন্ত তার মাথা, আর তার চোখের মধ্যে যেন পাহাড় সমুদ্র এ-সব রয়েছে! শুনে দাদু হেসে বললেন, মানুষ প্রকাণ্ড হলেই কি ভগবান হয়? প্রকাণ্ডতাই যদি ভগবানের গুণ তবে তুমি আকাশ, কিংবা পাহাড় কিংবা সমুদ্র— কিংবা এ-সব যা-কিছু মিলিয়ে যে প্রকাণ্ড চরাচর তাকে ভগবান ভাবলে না কেন? কিংবা তুমি তো ভাবতে পারতে যে তিনি এ-সবের অতীত একটা শক্তি। দাদুর এই কথা শুনে আমি ভেবে দেখলাম যে তা হয় না। পাহাড় আকাশ কিংবা সমুদ্র কী করে ভগবান হবে? তারা কি আমার কথা শুনতে পেয়েছিল? তাদের কি মন আছে যে আমার কথা বুঝবে? তা ছাড়া আমি তার যে-মুখ দেখেছিলাম তা অনেকটা দাদুর মতোই, যিনি আমাকে খুব ভালবাসেন। আমি সেই কথাই দাদুকে বললাম। তখন দাদু আর হাসলেন না, গম্ভীরভাবে চুপ করে রইলেন। তারপর এক সময়ে বললেন, রমেন, অনেকদিন আগে ভগবান বলেছিলেন যে তিনি বার বার পৃথিবীতে আসবেন। যদি সে-কথা সত্যি হয় তবে এটা ঠিক যে তিনি বার বার পৃথিবীতে আসছেন। হয়তো এখন এ মুহূর্তেও তিনি আছেন পৃথিবীতে। কিন্তু মানুষ সে-কথাটা বিশ্বাস করে না বলেই তাঁকে কখনও খুঁজে দেখে না। কিন্তু তুমি খুঁজে দেখো। তুমি তাঁর কথা মানুষকে বোলো। বোলো যে তুমি তাঁর কাছে যাবে। তা হলে কেউ-না-কেউ একদিন ঠিক তোমাকে তাঁর কাছে নিয়ে যাবে।
রুদ্ধশ্বাসে শাশ্বতী জিজ্ঞেস করল, তারপর? আপনি কি তাকে খুঁজতে বেরিয়েছিলেন?
রমেন সে-কথার উত্তর দিল না। বলল, কিন্তু আমরা কোথায় এসে পড়েছি দেখছেন?
শাশ্বতী দেখল, রাসবিহারী মোড়। তার মন খারাপ হয়ে গেল। বলল, আপনার অনেক দেরি করিয়ে দিলাম।
রমেন মৃদুস্বরে বলল, দেরি হয়নি তো?
তারপর শাশ্বতীকে একটা ডবলডেকারে তুলে দিয়ে রমেন ফিরল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন