শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
গলির মুখেই শম্ভু দাঁড়িয়ে ছিল। তুলসী বেরোতেই দেখা।
তুলসীদা, চললেন?
হুঁ।
তুলসী একটু লক্ষ করে দেখল, শম্ভুর ভোল পালটে গেছে। হাসপাতালে গিয়েছিল সাদামাটা একটা বুশ শার্ট আর সুতির প্যান্ট পরে। এখন চমৎকার একটা গাঢ় রঙের চাপা প্যান্ট তার পরনে, নীল রঙের টেরিলিনের শার্ট, হাতাদুটো অনেক দূর গোটানো— দুটো মাংসল হাত মুগুরের মতো ঝুলছে, বাঁ হাতের কবজিতে ঘড়িটাকে এতটুকু দেখাচ্ছে। মুখটা একটু ফরসা দেখাচ্ছিল শম্ভুর, সম্ভবত বিকেলে সাবান দিয়ে মুখ ধুয়েছে, একটু স্লো কিংবা পাউডারও দিয়ে থাকা সম্ভব। শম্ভুর মুখে একটা বোকা তৃপ্তির ভাব। চৌকো ভাঙাচোরা মুখ, আর মোটা দুটো ঠোঁটে একটা চাপা নৃশংসতা রয়েছে। সেটুকু তুলসীর ভুল দেখার দোষও হতে পারে। আসলে অতটা স্বাস্থ্যের জন্যই শম্ভুকে বোধহয় মাঝে মাঝে ভয়ংকর মনে হয়। শার্টের ওপর দিয়ে বুকের প্রকাণ্ড দুটো চৌকো পেশি ফুলে আছে, খুব সরু কোমর, ঘাড়টা মোষের ঘাড়ের মতো মোটা আর শক্ত। সেই তুলনায় মাথাটা ছোটই। ঘাড় পর্যন্ত লম্বা বাবরি ধরনের চুল শম্ভুর, সামনের দিকে ফাঁপিয়ে তুলে আঁচড়ানো। সাজগোজ সত্ত্বেও শম্ভুকে যতটা সুন্দর দেখাচ্ছে, তার চেয়েও বেশি মনে হচ্ছে ভয়ংকর।
আপনি তো ঢাকুরিয়ায় থাকেন, না?
তুলসী মাথা নাড়ল। শম্ভু তার সঙ্গ ধরে আস্তে আস্তে পাশাপাশি হাঁটছিল। বলল, কেমন বুঝলেন ললিতার অবস্থা?
ভালই তো। আপাতত চিন্তা নেই।
ডাক্তাররা কী বলছে?
ওই যা বলে। যদি রিলাপ্স করে তবে মাস কয়েকের মধ্যে করবে।
করবে বলে আপনার মনে হয়?
তুলসী অসহায়ের মতো বলল, কী জানি!
শম্ভু দাঁতে আর জিভে একটা চিরিক শব্দ করল, ললিতদা এই বয়সে মরে-ফরে গেলে বড় বিশ্রী।
তুলসী চুপ করে রইল। শম্ভুর পাশাপাশি হাঁটতে তার নিজেকে বড় বেমানান লাগছিল। সে রোগা, কালো আর ছোট। বিয়ের পর কয়েক দিনে সামান্য একটু চেহারা ফিরেছে তুলসীর, রংটা বোধ হয় আগের চেয়ে খানিকটা উজ্জ্বল। তবু অতিরিক্ত স্বাস্থ্যবান শম্ভুর কাছাকাছি হাঁটতে সে এক ধরনের অস্বস্তি বোধ করছিল।
গোপালের মনোহারি দোকানে হ্যাজাক জ্বলছে, কয়েকজন ছেলে-ছোকরা দাঁড়িয়ে। তুলসী শম্ভুকে বলল, দাঁড়াও, একটু সিগারেট কিনে নিই।
শম্ভু ঘাড় নেড়ে ছোকরাদের দলটার মধ্যে ভিড়ে গেল।
সিগারেট কিনতে কিনতে হঠাৎ চোখ তুলে তুলসী দেখে পাঞ্জাবি পরা রোগাটে চেহারার একটা লোক তাকে দেখছে। লোকটার মুখে-চোখে একটা অসহায়, ভয় পাওয়া বুড়োটে ভাব। সে চমকে উঠল। পরমুহূর্তেই ভুল ভেঙে গেল তার। এরা এমন বিদঘুটে জায়গায় আয়না টাঙিয়ে রাখে।
ছোকরাদের দল থেকে একটু তফাতে দাঁড়িয়ে তুলসী জিজ্ঞেস করল, শম্ভু, তুমি যাবে নাকি?
শম্ভু ভীষণ ব্যস্ত এবং উত্তেজিতভাবে কথা বলছিল। দল থেকে মাথা উঁচু করে বলল, এক মিনিট, তুলসীদা।
সম্ভবত পাড়ার কোনও গণ্ডগোল। শম্ভু এইসব ছেলেদের দলের মাথা, এটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে। তুলসী অস্বস্তির সঙ্গে একটা সিগারেট ধরাল। দাঁড়িয়ে রইল শম্ভুর জন্য।
ললিতকে ফিরিয়ে আনা গেছে, অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও, এটা ভাবতে তুলসীর ভাল লাগছিল। এরপর ললিতের ভাগ্য। যত দূর করার তুলসী করেছে। অবশ্য তুলসী না করলেও কেউ-না-কেউ করতই। না করলেও ক্ষতি ছিল না। চিকিৎসা হাসপাতাল থেকেই হচ্ছিল, সে শুধু যেত ললিতের মনের জোরটা বজায় রাখতে, যাতে সে ভেঙে না পড়ে। কিন্তু ক্রমে তুলসী বুঝতে পেরেছিল বাড়তি মনোবালের কোনও দরকার ললিতের নেই। সে একরকম করে তার অসুখের ব্যাপারটা মেনে নিয়েছিল। তাকে তাই খুব বেশি গম্ভীর বা বিষণ্ণ দেখাত না। বরং তুলসী গেলে ঠাট্টা করত ললিত, কী রে শালা, তোকে গম্ভীর দেখাচ্ছে কেন? তোর ভাবী বউটা কি কুচ্ছিত? না কি, দাদা বের করে দিয়েছে তোকে বাড়ি থেকে বিয়ে দেবে না বলে? এ—কথা ঠিক যে, তুলসী কোনও দিনই খুব একটা হাসিখুশি হতে পারে না। তুলসী জানে যে, সে স্বভাবে গম্ভীর নয়। তার আসল অসুখ হল, সে বড় অল্পেই দুশ্চিন্তায় আক্রান্ত হয়। ছোটখাটো হাজারটা দুশ্চিন্তা তুলসীর, হাজারটা ভয়। তার মন কখনও দুশ্চিন্তা থেকে ছাড় পায় না। কোনও দিন স্কুল কামাই গেলে সারা দিন তার চিন্তা হয় পরদিন হেডমাস্টার তাকে ডেকে অপমানকর কিছু বলবে কি না। এই চিন্তা এমনই পেয়ে বসে তাকে যে, সারাটা দিন সে চাপা উত্তেজনায় কাটায়, একা হলেই হেডমাস্টারের সঙ্গে একটা কল্পিত সংলাপ তৈরি করতে থাকে: ‘কাল আসেননি তুলসীবাবু!’ ‘আজ্ঞে না।’ ‘কেন!’ চাপা রাগ দেখিয়ে তুলসী বলবে, ‘কাজ ছিল!’ ‘কাজ! কাজ থাকতে পারে, কিন্তু গত তিন মাসে আপনার সাতটা ক্যাজুয়েল লিভ গেল, এর পরও তো মশাই নয় মাস রয়েছে, তখন আপনার কাজ থাকবে না? আর দেখুন, আপনি তো জানেন কম স্টাফে আমার স্কুল চালাতে হয়, এক-দু’জন করে রোজ অ্যাবসেন্ট থাকলে ক্লাসগুলো কাকে দিয়ে আমি চালাব! স্মরজিৎবাবু এসে বললেন যে, কাল সময়মতো ওঁর ভাত রান্না হয়নি বলে আসতে পারেননি, আপনি এসে আরও ধোঁয়াটে যুক্তি দিলেন— কাজ ছিল। এ-সব ছেলেমানুষি যুক্তি ছাত্রদের মুখে মানায়, আপনাদের নয়।’ তুলসী হিংস্রভাবে বলবে, ‘আমার পাওনা ছুটি আমি নিচ্ছি। আর আমার কী রকম কাজ ছিল কিংবা কাজ ছিল কি না এ-সব ব্যক্তিগত ব্যাপার। আপনারও হাজারটা দোষ রয়েছে, সেগুলোকে কে দেখে?’ ‘কী রকম?’ বলে হেডমাস্টার সামনের দিকে ঝুঁকে পড়বেন। তুলসী ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলবে, ‘আছে। গ্র্যান্টের টাকায় আপনি সায়েন্স ল্যাবরেটরি করলেন, কিন্তু আমরা সাত মাস টাকা পেলুম না, স্কুলে ছেলে নেই তবু আপনি তিনটে স্ট্রিমে স্কুল চালাচ্ছেন কারণ প্রতিটি স্ট্রিমের জন্য আপনি পঁচিশ টাকা করে অ্যালায়েন্স পান, তা ছাড়া স্কুলের শতকরা ষাট-সত্তরজন ছাত্র ডিফল্টার, তার জন্য কোনও ব্যবস্থা নেই, আপনি গার্জিয়ানদের খুশি রাখার জন্য কোনও স্টেপ নেন না…’ ইত্যাদি। বস্তুত এ-সব ভাবতে ভাবতে সে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়ে, সারাটা দিন তার তেতো হয়ে যায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে হেডমাস্টার কোনও দিনই তাকে জিজ্ঞেস করে না যে কেন সে গতকাল স্কুলে আসেনি। বড় জোর হেডমাস্টার বলে, ‘আপনি কাল আসেননি, না?’ তুলসী ভীষণ সংকুচিত হয়ে বলে, ‘আজ্ঞে না।’ হেডমাস্টার খুব অবহেলার সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নেয়, ‘ঠিক আছে।’
কিংবা কখনও তুলসী ভীষণ রকমের আজগুবি চিন্তার পাল্লায় পড়ে। একদিন সকালে দাদা-বউদির একটা ঝগড়া হয়ে গেল। দাদা গটমট করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে অফিসে বেরিয়ে যাচ্ছিল, ঘর থেকে বউদি চেঁচিয়ে বলল, ‘ফিরে এসে দেখো আমি গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছি।’ কথাটা আধোকান্নার বিকৃত গলায় এমনভাবে বলেছিল বউদি যে তুলসীর মাথায় কথাটা লেগে গিয়েছিল। সারা দিন আর ব্যাপারটা খেয়াল ছিল না তুলসীর। কিন্তু স্কুল থেকে ফেরার পথে ট্রেনে হঠাৎ মনে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে অস্থির হয়ে পড়ল তুলসী। এখন ফিরে গিয়ে যদি সত্যিই দেখে যে বউদি গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে তা হলে সে কী করবে? এ-সব অবস্থায় লোকে কী করে? সে আকাশপাতাল ভেবে দেখল, তার মুখের জল শুকিয়ে গেল, এবং অল্প সময়েই সে টের পেল যে, দুশ্চিন্তায় তার গাল বসে যাচ্ছে। হয়তো গিয়ে সে দেখবে বউদির ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ, ডাকাডাকিতে খুলছে না। তখন দরজা ভাঙার আগে তাকে পাড়া-প্রতিবেশীদের ডেকে লোক জড়ো করতে হবে। তারপর দরজা ভাঙা, দড়ি কেটে মড়া নামানো, কিংবা হয়তো মড়া নামানোর আগেই পুলিশ ডাক্তার অ্যাম্বুলেন্সে খবর দেওয়ার ঝামেলা, দাদাকে ফোন করা। মরবার পর বউদির চেহারা কেমন হবে কে জানে, সেটা দেখাও তো একটা নরক-যন্ত্রণা। বাচ্চাগুলোকে বউদি নিশ্চয়ই পাশের ঘরে বন্ধ করে রাখবে। বের করার পর ওদের কী রকম প্রতিক্রিয়া হবে ভাবতে ভাবতে তুলসী শিউরে উঠল। এরপর পোস্টমর্টেম, ডেথ সার্টিফিকেট ইত্যাদি সব ঝামেলাই তাকে করতে হবে। মড়া উঠতে উঠতে বোধহয় পরদিন রাত হয়ে যাবে। এই শীতে মড়া পুড়িয়ে স্নান করা ইত্যাদিও ভীষণ ব্যাপার। তারপর সবচেয়ে বড় সমস্যা হবে একা ঘরে শোয়া, অপঘাতে বউদির মৃত্যুর পর সেটাও একটা সমস্যা। এরপর বউ-অন্তু দাদা যদি সন্ন্যাসী হয়, কিংবা সব ছেড়েছুড়ে চলে যায় তা হলে তার গোটা তিনেক বাচ্চার ভারও সারা জীবনের জন্য পড়ল তুলসীর ঘাড়ে…। ভাবতে ভাবতে সমস্ত ব্যাপারটাকে চোখের সামনে এত সত্যের মতো দেখতে পাচ্ছিল তুলসী যে শীতেও তার ঘাম ছাড়তে লাগল। সে সেদিন অনেকক্ষণ আড্ডায় কাটাল, তারপর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াল, বাড়িতে ঢুকবার আগে অন্তত বার তিনেক বাড়ির সামনে দিয়ে হাঁটাহাঁটি করল। রাত বারোটায় চোরের মতো ঢুকে দেখল, ঘরে আলো জ্বেলে দাদা-বউদি আর দাদার বড় মেয়েটা শুকনো মুখে তুলসীর জন্য বসে আছে। তার দেরি দেখে সকলেই চিন্তিত।
বস্তুত তুলসী কখনওই সুখে থাকে না। নিশ্চিন্ত না থাকাটা তার নিয়তির মতো। হয়তো ট্রামে কিংবা বাসে জানালার ধারে প্রিয় সিটটিতে বসে সে যাচ্ছে, এমন সময় ধপ করে পাশে এসে বসল খুব কর্কশ চেহারার একটি লোক, কিংবা এমন কোনও লোক যার নাক কান চুলকোনোর মুদ্রাদোষ আছে, বা এমন কেউ যে বসেই তার পিঠের ওপর দিয়ে হাতটা সিটের পিছনে রেখে তার শরীরের দিকে হেলে বসল। সঙ্গে সঙ্গে দুশ্চিন্তা কিংবা অস্বস্তি শুরু হয়ে যায় তুলসীর!—তার পাশে-বসা লোকটা কেমন! যদি এখন এ-লোকটার সঙ্গে তার কোনও কারণে লেগে যায়! যদি লোকটা তার পকেটে হাত দেয়, কিংবা যদি তার শরীরে আরও হেলান দিয়ে বসে? তা হলে কী করবে তুলসী? অমনি তার মন দু’ ভাগ হয়ে গিয়ে পাশে বসা লোকটার সঙ্গে কী রকম কথাবার্তা হতে পারে তার একটা খসড়া তৈরি করতে লেগে যায়।
এখন ললিতের কথা ভাবলেও নানা রকমের ভাবনা একটার সঙ্গে আর-একটা জড়িয়ে আসে। তুলসী ঠিক করে রেখেছে এখন থেকেই সে ললিতের মা’র জন্য একটা আশ্রমটাশ্রম খোঁজ করে রাখবে।
সিগারেটটা শেষ হয়ে এসেছিল। শম্ভু ভিড় ছেড়ে এগিয়ে এসে বলল, চলুন তুলসীদা, আপনাকে বাসে তুলে দিয়ে আসি।
চলো।
কয়েক পা হেঁটে হঠাৎ শম্ভু বললে, মা প্রথমটায় বিশ্বাসই করতে চায়নি যে রোগটা ছোঁয়াচে নয়। মা’র ধারণা এরপর আর ও-ঘরের ভাড়াটে জুটবে না।
তুলসী অর্থটা ধরতে পারল। চুপ করে রইল সে।
শম্ভু একা একাই হাসল, মা’দের যে কী সব বাজে ধারণা থাকে!
তুলসী জানে হয়তো মাস কয়েক পর ললিতদের ঘরটা খালি হয়ে যাবে। কম ভাড়াতেই ললিতরা আছে। মাত্র পঁচিশ টাকা, বছর দশেক আগেকার ভাড়া। এখন ও-ঘরের ভাড়া অনায়াসে ষাট-সত্তর টাকা হবে। বাথরুম-টাথরুম আলাদা, কলে প্রায় সারা দিন জল। তুলসীর একবার ইচ্ছে হল শম্ভুকে জিজ্ঞেস করে, এবার তারা কত ভাড়ায় ঘরটা দেবে।
তারপরই মনে মনে সে নিজেকে ইতর বলে গাল দিয়ে সামলে গেল। ভাগ্যিস মুখ ফসকে কথাটা বেরিয়ে যায়নি! তা হলে সম্ভবত শম্ভু একটু ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলত, কেন ললিতা মরে গেলে আপনি নেবেন?
মনে মনে নিজের কাছেই একটা জবাবদিহি খাড়া করার চেষ্টায় খুব অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিল তুলসী। এমন সময়ে তাকে চমকে দিয়ে শম্ভু বলল, বাসে অত ঘুরে যাবেন কেন তুলসীদা, আনোয়ার শা রোড ধরে রিকশায় চলে যান, দু’-চার আনা বেশি লাগবে।
আনোয়ার শা রোডের মোড়ে দাঁড়িয়ে তুলসী একটু ভাবল। রিকশায় বা বাসে যেতে তার ইচ্ছে করছিল না। যদিও শরীরটা ক্লান্ত, ট্রেন বাস ট্যাক্সিতে অনেকটা ঘুরেছে সে, এবং ঘরে মৃদুলা— তার বউ— তার অপেক্ষায় আছে, তবুও তার মনে হল নিজেকে একটু শাস্তি দেওয়া দরকার। ললিতদের ঘরটা শম্ভুরা এবার কতয় ভাড়া দেবে, এ-প্রশ্নটা তার মাথায় এল কেন? সে মুখে বলেনি ঠিকই, কিন্তু মনে কথাটা এসেছিল। মনের এই অসংযমটুকুর জন্য মাইল দুই হেঁটে যাওয়ার ছোট্ট একটু শাস্তি বোধহয় তার পক্ষে চমৎকার হবে।— না শম্ভু, আমি বরং এটুকু হেঁটেই চলে যাই।
শম্ভু হাসল, হাঁটবেন! সে তো ভালই, একটু এক্সারসাইজ হবে। শরীরটা তো বড় নাড়াচাড়া করেন না।।
তুমি কোন দিকে? তুলসী জিজ্ঞেস করে।
একটু সিনেমায়-টিনেমায় যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু আর হবে না। পাড়ায় একটা গণ্ডগোল বেধে আছে, ফিরতে হবে।
কী গণ্ডগোল?
কেসটা ঠিক বুঝতে পারছি না। আমাদের পাড়ার এক ভদ্রলোককে কাল রাতে কয়েকজন এসে খুব ঠেঙিয়ে গেছে। ভদ্রলোক একা থাকতেন, পাড়ার কারও সঙ্গে মিশতেন না, তবে মাঝেসাঝে একটা মেয়ে আসত বইখাতা হাতে। মনে হচ্ছে ব্যাপারটা মেয়ে-ঘটিত। একটু দেখতে হবে। বুঝতেই পারছেন পাড়ার ইজ্জত… বাইরের লোক এসে মেরে যাবে…বলে হাসল শম্ভু। আত্মপ্রত্যয়ের হাসি।
তুলসী বলল, তা হলে চলি।
ক’দিন আগে বর্ষা গেছে খুব। ভাঙাচোরা বিশ্রী রাস্তাটায় খোঁসপাঁচড়ার রসের মতো জল জমে আছে। দু’ধারে কাঁচা ড্রেন বর্ষার জল পেয়ে পচে ফুলে আছে। মুসলমানদের বস্তি, দু’-একটা মসজিদ এবং কবর। তুলসী সাবধানে পা ফেলছিল। সন্ধে হয়ে এসেছে। মৃদুলার জন্য আগ্রহ অনুভব করছিল তুলসী।
হাঁটতে হাঁটতে তুলসী ভাবছিল, এই হেঁটে যাওয়ার শাস্তিটুকু তার পাওয়া উচিত। মৃদুলার কাছে যেতেও একটু দেরি হবে। ভাল, এইটুকু দেরি হওয়া ভালই। ললিতদের ঘরটার ভাড়া এখন কত হবে এ-কথা মনে আনা তার উচিত হয়নি। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ও-রকম বিশ্রী চিন্তা ইচ্ছে করে তুলসী করেনি। চিন্তাটা এসে গেল। তার মনের আশ্চর্য গতির কথা তুলসী ভাবছিল। নিজের মনের ওপর তার এতটুকু হাত নেই, মাঝে মাঝে সে অসহায়ের মতো টের পায় তার মন ইচ্ছেমতো জঘন্য কুৎসিত নানা রকম চিন্তা তৈরি করে যাচ্ছে। সে তখন নিজেকে প্রাণপণে বলতে চেষ্টা করে— শয়তান আহাম্মক, অন্য কথা ভাবো। কিন্তু কিছুই সে করতে পারে না। নিজের এই কুৎসিত মনটার জন্য তুলসী বড় ভয়ে ভয়ে থাকে। বুঝতে পারে তার ভিতরে এক শয়তান আহাম্মক অহংকারী আমি রয়েছে যাকে বের করে দেওয়া উচিত।
মৃদুলা একদিন তাকে বলেছিল, এত তাড়াতাড়ি আমার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল না, জানো?
তুলসী সামান্য অবাক হয়ে বলল, তা হলে হল কেন?
মৃদুলা হাসছিল। বলল, হয়ে গেল, কী আর করা যাবে!
বিছানায় শুয়ে ছিল তুলসী, উঠে বসল। বলল, এ-বিয়েতে তোমার ইচ্ছে ছিল না?
মৃদুলা হাসিমুখেই বলল, ইচ্ছে হয়তো ছিল না। কিন্তু হয়ে গিয়ে এখন ভাল লাগছে।
বলে মৃদুলা তাকে আদর করল অনেক। তুলসী গলে গেল, কিন্তু অস্বস্তিটা ছাড়ল না তাকে। পরের রাতে সে আবার কৌশলে কথাটা তুলল, তোমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তোমার বাবা বিয়ে দিলেন? জোর করে! অ্যাঁ!
মৃদুলা অবাক হয়ে বলল, জোর করে নয়তো! আমি কি সে কথা বলেছি।
তবে!
তবে কী? বাবার নিজেরও ইচ্ছে ছিল না এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়ার। গান শিখতুম, লেখাপড়া করতুম— আমার বিয়ের ব্যাপারে কেউ ভাবছিলই না। কিন্তু তবু দেখো দুম করে বিয়ে দিয়ে দিতে হল।
শুনে তুলসীর বুক ধড়ফড় করে উঠল। সে জিজ্ঞেস করল, কেন?
মৃদুলা বলল, সে অনেক ব্যাপার। শুনলে তুমি খুশি হবে না।
তবু শুনি।
না।
মৃদুলা, লক্ষ্মী মেয়ে, বলো। না বললে আমার খুব খারাপ লাগবে। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে কোনও কিছু গোপন থাকা উচিত না, তাতে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়…
তুলসীর ব্যগ্রতা প্রকাশ হয়ে গেলে মৃদুলা হেসে বলল, তোমার ভয় পাওয়ার মতো কিছু নয়। নিশ্চিন্ত থাকতে পারো।
তবু বলো, লক্ষ্মী, পায়ে পড়ি।
ছিঃ। বলে মৃদুলা একটুক্ষণ তাকে ভাল করে দেখল, হাসল, তারপর বলল, তুমি ভীষণ উইক।
অনেক কাকুতি-মিনতির পর মৃদুলা বলতে রাজি হয়েছিল।
আমার পেছনে কিছু লোক লেগেছিল। তারা ঘুরঘুর করত।
কেন? তুলসী জিজ্ঞেস করেছিল।
কেন আবার! বোঝো না! মেয়ের পিছনে ছেলেরা কেন ঘুরঘুর করে!
হ্যাঁ, তুলসী বোঝে। তবু তার মন থেকে প্রশ্নটা গেল না। কেন কিছু লোক মৃদুলার পিছনে ঘুরঘুর করত? কেন? অ্যাঁ! কী তাদের অধিকার একটা মেয়ের পিছনে ঘুরঘুর করার। ভয়ংকর অন্যায় এটা, ভীষণ অন্যায়।
তারা কারা?
পাড়ারই ছেলে সব। তাদের মধ্যে একজন ছিল বিভু। লেখাপড়া শেখেনি, বাপ দুধ বিক্রি করত, পয়সা ছিল অনেক। ছেলেটা প্রথম প্রথম আমাকে দেখে মাথা নিচু করত, অনেক দূর দিয়ে পাশ কাটিয়ে যেত। কখনও সখনও একটা সাইকেলে সাঁ করে পাশ দিয়ে বেরিয়ে যেত। কোনও দিন কথা বলার চেষ্টা করেনি। শুনেছিলুম ছেলেটা খুব ভাল সাইকেল চালায়, সাঁতার দেয়, ফুটবল খেলে। এ-সব কারণেই বোধ হয় লেখাপড়া হয়নি, শুনতুম এক নম্বরের বখা ছেলে। তাই আমাকে দেখে যখন পাশ কাটিয়ে যেত বা মাথা নিচু করত তখন আমার সন্দেহ হত যে, বোধ হয় এবার ছেলেটার মাথা ঘুরে গেছে। আর এ-সব ছেলে মেয়েদের ব্যাপারে সিরিয়াস হলে মুশকিল। তারপর শোনো, কলেজে যাতায়াতের পথে প্রায়ই দেখা হত, কোনও দিন বা বাস-স্টপে দাঁড়িয়ে থাকত, সকালসন্ধে অসংখ্যবার আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যেত। তারপর বোধ হয় একা কিছু করা যাচ্ছে না দেখে বন্ধুবান্ধবদের জুটিয়ে আনল। দেখতুম বাস-স্টপে এক দঙ্গল ছেলে দাঁড়িয়ে আছে, মাঝখানে বিভু। আমাকে দেখলেই চাপা গলায় ওর বন্ধুরা বলত, বিভু, তোরটা, তোরটা। আর কী সাহস দেখো, একদিন বাসে উঠেছি, ওমা, বাস আর ছাড়ে না, ড্রাইভার চেঁচিয়ে কাকে যেন সরে যেতে বলছিল। উঁকি দিয়ে দেখি ওই দলের একটা ছেলে রাস্তার মাঝখানে নিচু হয়ে জুতোর ফিতে বাঁধছে, মুখে বদমাইশির হাসি। কোনও কোনও দিন তিন-চারজনকে নিয়ে বাসে উঠত বিভু, কলেজ পর্যন্ত ‘ফলো’ করত। আমি ভয় পেয়ে গিয়ে মাকে বললুম, মা বলল, কী আর করবি বল, ওদের দিকে কখনও তাকাসনি। বুঝলুম মাকে বলে লাভ নেই, বাবাকেও বলতে ইচ্ছে করত না, কেন না বাবা তোমার মতোই ভিতু ভালমানুষ, এ-সব শুনে হয়তো খুব নার্ভাস হয়ে পড়বেন, আর বলা যায় না, ভিতুদের যা স্বভাব, হয়তো বলে বসবেন, ওর সঙ্গেই তোর বিয়ে দিয়ে দিই মৃদুলা। আমি বাবাকে বললুম না, কিন্তু ওদের সাহস ক্রমে বাড়ছিল। সকালে সন্ধেবেলায় আমাদের বাসার সামনে আড্ডা দিত ভিড় করে দাঁড়িয়ে। আমার ছোট ভাই বাচ্চু রাস্তায় গেলে বলত, এই বিভুর শালা, কোথায় যাচ্ছিস? বাবা সন্ধেবেলায় বাইরের ঘরে বসে মক্কেলদের সঙ্গে কথা বলতেন, একদিন একটা ছেলে ঘরের মধ্যে মুখ বাড়িয়ে বলল, মেসোমশাই, আগুনটা একটু দেবেন? এইভাবে আমাদের ভয় পাইয়ে আর ঘাবড়ে দিয়ে তারপর একদিন ওরা কয়েকজন মুরুব্বি ছেলেকে বাবার কাছে পাঠাল বিভুর সঙ্গে আমার বিয়ের কথা পাড়তে। বাবা ভীষণ ঘাবড়ে গেলেন, অবাক হয়ে বললেন, ওরা স্বজাতি নয়। ছেলেগুলো ফিরে গেল, কিন্তু তারপর একদিন বিভুর বন্ধুরা দল বেঁধে এল। বিশ্রী কালো কালো কর্কশ চেহারা, রংচঙে পোশাক, একজনও কথা বলতে জানে না। ওরা বলল, জাতফাত নিয়ে মাথা ঘামাবেন না মেসোমশাই, সব জাতই মানুষ। আর তা ছাড়া আপনি যে বামুন তার কোনও প্রমাণ আছে? পাকিস্তান থেকে এসে অনেকেই ও-রকম বামুন কপচায়। সব এফিডেভিড করা বামুন, আমরা জানি। আর শিক্ষিতা মেয়ে তো কী হয়েছে। বিভু স্পোর্টসম্যান, আজকাল স্পোর্টসম্যানদের লেখাপড়ার দরকার হয় না। তবু যদি বলেন তো বিভু আবার স্কুলে ভরতি হবে, তিন-চারটে মাস্টার রেখে ওকে আমরা পাশ করিয়ে দেব। এ-সব শুনে বাবা আর ভয়ে কথাই বলতে পারল না। পরদিনই আমাকে কলেজ-ফেরত ট্যাক্সিতে তুলে বাবা দমদমে পিসিমার বাড়িতে রেখে এল। কলেজে যাওয়া বন্ধ হল, বিয়ের জন্য তাড়াহুড়ো শুরু করলেন। শুনতুম আমাদের বাড়িতে রাতে কিংবা দুপুরে ঢিল পড়ছে, আমাদের বাইরের ঘরের সিঁড়িতে গু ঢেলে দিয়ে যাচ্ছে রাত্রিবেলা। এক মাসের মধ্যেই বাবা তোমার খবর আনলেন, বললেন, চমৎকার ছেলে, খুব সৎ আর নিষ্ঠাবান। ব্যস, বিয়ে হয়ে গেল।
মৃদুলার কাছ থেকে এ-গল্প শোনার পর তুলসী স্বস্তি পেল না। মৃদুলা দেখতে এমন কিছু সুন্দর নয়। তার গালে ব্রণর দাগ, ঠোঁট পুরু, তবে চোখ দুটো মৃদুলার সুন্দর। শ্যামবর্ণ মেয়েদের চোখ সুন্দর হলে ফরসা মেয়েদের চেয়ে তাদের আকর্ষণ বেশি হয়। সব সুন্দরই তো আর আকর্ষণ করার শক্তি রাখে না। মৃদুলা সুন্দর না হলেও সেই আকর্ষণশক্তি তার আছে বোধ হয়। তা ছাড়া মৃদুলার শরীরটাও রোগার ওপর বেশ মজবুত। উগ্র ধরনের সতেজ ভাব আছে তার শরীরে, আর মাথায় অনেক চুল। মৃদুলাকে ভাল করে লক্ষ করে বিষণ্ণভাবেই তুলসী বলেছিল, বুঝতে পারছি না তোমার পিছনে ছেলেটা এত ঘুরেছিল কেন!
সম্ভবত তুলসীর মনোভাব বুঝেই মৃদুলা উত্তর দিল, ও, আমার বুঝি কিছু নেই, না!
মৃদুলা হাসছিল। কিন্তু তুলসীর ভাল লাগেনি। সে কাঠ কাঠ গলায় বলল, সে-কথা বলছি না। তবে—
তবে কী তা তুলসী আজও জানে না। গত মাস দেড়েকে সে ভেবে বের করতে পারেনি যে, ঘটনাটুকুর মধ্যে এমন কী ছিল যাতে মাঝে মাঝে তার মৃদুলার ওপর রাগ হচ্ছে। তার এমন কথাও মনে হয়েছে যে, মৃদুলার আকর্ষণশক্তি না থাকলেই ভাল ছিল। মনে হয়েছে যে, মেয়েদের বেশি আকর্ষণশক্তি থাকা বা উগ্র সুন্দরী হওয়াটা এক ধরনের অন্যায়। এখন সেই ছেলেটা— সেই বিভু যদি মৃদুলার খোঁজ পায়, যদি তাদের ঠিকানা খুঁজে বের করে তা হলে কী হবে! এত অল্পে সে মৃদুলাকে ছেড়ে দেবে বা ভুলে যাবে এটা সম্ভব নয়। যদিও তাদের বাসা বিভুর পাড়ায় নয়, তবু বেপরোয়া এবং মরিয়া বিভু এ-পর্যন্ত হানা দিতেই পারে। দিলে, শুধু রাতে বা দুপুরে বাড়িতে ঢিল মেরে এবং সিঁড়িতে ও ঢেলেই কি বিভু নিশ্চিন্ত থাকবে! তুলসীই এখন তার সবচেয়ে বড় বাধা, কাজেই তুলসীকে সরিয়ে দেওয়ার একটা চেষ্টা কি তার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব! কাগজে রোজ ব্যর্থ প্রেমের সঙ্গে অ্যাসিড বালব্ আর ছোরামারা ইত্যাদি ঘটনার কথা চোখে পড়ে তার।
তাই আজকাল তুলসী বাড়ির বাইরে একটু অস্বস্তি বোধ করে একা, আগে পিছনে ভাল করে নজর রাখে, এবং সতর্কভাবে লোকজনকে লক্ষ করে। বস্তুত সে টের পায় মৃদুলার জন্যই তার শান্তি অনেকটা নষ্ট হয়ে গেল। আবার যখন সে ভাবে যে মৃদুলার জন্য একজন পাগল হয়েছিল, তখন আবার তার মৃদুলার প্রতি এক ধরনের পাগলাটে ভয়ংকর ভালবাসাও জেগে ওঠে।
বাড়ি ফিরে তুলসী দেখল ঘরগুলোর বাতি নেভানো, দাদা-বউদি আর বাচ্চারা বোধ হয় কেউ বাড়িতে নেই। সামনের ঘরের দরজা ঠেলতেই খুলে গেল। ঘরে ঢুকে সুইচ টিপেই সে ভয়ংকর চমকে গেল। মৃদুলা মেঝেতে দেয়ালে ঠেস দিয়ে হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফুলে ফুলে কাঁদছে।
লাফিয়ে ওঠা হৃৎপিণ্ডকে সামলে তুলসী প্রশ্ন করল, কী হয়েছে, মৃদুলা?
স্খলিত গলায় মৃদুলা বলল, তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন