অষ্টাদশ অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

আঠারো

বুড়ো ম্যারেজ-রেজিস্ট্রার দেখিয়ে দেয়, বাথরুম ওই দিকে। ললিত দৌড়ে যায়। বেসিনের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে।

বেসিনের ওপর দেয়ালে আয়না। বমি করার পর মুখ তুলে ললিত দেখে তার জলে ভেজা মুখখানা ফ্যাকাসে। মোটাসোটা লক্ষ্মীকান্তর পাশে তাকে এতটুকুন দেখাচ্ছে। কালো বিশাল হাতখানা দিয়ে তার কপাল ধরে রেখেছে লক্ষ্মীকান্ত, যাতে দুর্বল মাথা টলে না পড়ে যায়। ফরসা কপালের ওপর কালো আঙুল।

এখন একজন আধমরা লোককে কাঁধে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে ললিত। এ শরীর আর তার নয়। তার যে শরীর ছিল এটা কখনও আলাদাভাবে টের পায়নি ললিত। এখন সে তার হালকা ছিপছিপে শরীরটাকে সমস্ত অন্তর দিয়ে অনুভব করে।

লক্ষ্মীকান্ত মায়া-মমতার চোখে তার দিকে তাকায়। ভেজা হাতে কানের পিঠে আর ঘাড় ভিজিয়ে দেয়, এইবার একটু ভাল লাগছে না দাদা, অ্যাঁ?

ভাল। বেশ ভাল।

লক্ষ্মীকান্তর হাত ছাড়িয়ে একা হাঁটার চেষ্টা করে ললিত। পৃথিবী টলে যায়।

বাথরুমের দরজায় সঞ্জয় দাঁড়িয়ে ছিল। ললিত মুখোমুখি হতেই সঞ্জয় হাত বাড়িয়ে বলল, আয়। এখন কেমন লাগছে?

এক হাত থেকে আর এক হাতে চলে গেল শরীর। সঞ্জয় বগলের তলায় কাঁধ দিয়ে জড়িয়ে ধরল তাকে ললিত হঠাৎ লক্ষ করে যে সঞ্জয়ের চেয়ে সে লম্বা। অন্তত ইঞ্চিখানেক। কিন্তু এখন আর তাতে কিছু আসে যায় না। বরং এক ইঞ্চি লম্বা হয়েও তার লজ্জা করছিল। একজন মানুষের পক্ষে যুবাবয়সে এর চেয়ে বেশি আর কী লজ্জার থাকতে পারে যে, সে আর একজনের কাধেঁ ভর দিয়ে হাঁটছে?

সঞ্জয় চাপা গলায় বলে, ব্যাপারটা কীরকম বুঝছিস? মেয়েটা কি কেটেই পড়ল! প্রেস্টিজ-ফ্রেস্টিজ আর…কী ব্যাপার বল তো!

ঘরে ঢুকতেই বুড়ো ম্যারেজ-রেজিষ্ট্রার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসে, আপনার কী হয়েছে বলুন তো! আমি ডাক্তার।

ডাক্তার! ঘরে ধারে অথচ ডাক্তারির চিহ্ন নেই। ওষুধের কোনও গন্ধও না। স্টেথস্কোপটাই বা কোথায়! হঠাৎ ললিত দেখতে পেল টেবিলের ওপর জার্নালের স্তূপ। ডাক্তারই হবে।

হয়তো প্র্যাক্টিস বেশি নেই। কিন্তু ললিত কিছুতেই এখন লোকটাকে ম্যারেজ-রেজিষ্ট্রার ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছে না। ধুতির ওপর ঝোলানো শার্ট, ফুলহাতার লিঙ্ক বোতাম, বুকপকেটে ঠাসা কাগজপত্র আর ছোট ডায়েরি। তোবড়ানো শুকনো মুখ, যে-মুখ মনে থাকে না। চশমা জোড়াই যেন লোকটার চোখ, আলাদা চোখ নেই।

ললিত দুর্বল হাতখানা বাড়িয়ে ধরে। লোকটা লাজুক মিনমিনে গলায় বলে, আমি অবশ্য চোখের ডাক্তার, কিন্তু জেনারেল রোগ-টোগ বুঝতে পারি।

চোখ বুজে, ঘাড় হেলিয়ে মন দিয়ে অনেকক্ষণ নাড়ি দেখে জিজ্ঞেস করল, কোনও অসুখবিসুখ আছে? অম্বল-টম্বল?

গ্যাসট্রিক কারসিনোমা।

কী?

ক্যানসার।

একটা শ্বাস ফেলার শব্দ হয়। অতি সম্মানের সঙ্গে ধীরে ধীরে তার হাতখানা নামিয়ে দেয় লোকটা।

হতাশ লাগে ললিতের।

সাবধানে থাকবেন।

ললিত সোফায় গা ছেড়ে একটু হাসে।

ম্যারেজ-রেজিস্ট্রার লক্ষ্মীকান্তর দিকে ফিরে বলে, কী, তোমার পার্টি কই?

দেখে আসি। লক্ষ্মীকান্ত ব্যস্তসমস্ত হয়ে বেরিয়ে যায়।

আদিত্য সোফার পিছনে মাথা রেখে দু’ হাতে মুখ ঢেকে আছে। কপাল চকচক করছে ঘামে। মাথার চুল একটু আগে পাট করা ছিল, এখন আবার এলোমেলো।

সঞ্জয় সিগারেট ধরায়। পায়ে পায়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়।

অনেকক্ষণ পর লক্ষ্মীকান্ত ফিরে আসে, নাঃ, ধারে কাছে নেই!

বুড়ো লোকটা গম্ভীর হয়ে ঘড়ি দেখে, এক ঘণ্টা হয়ে গেল।

ললিত দেখছিল, সবুজ দেয়ালে রং চটে গেছে। একটা ভেজা নোনা ধরার গন্ধ। মাথার ওপর দুই ব্লেডের একটা পাখা চলছে, পুরনো আমলের পাখা, কিচকিচ শব্দ হয়। জানালা দরজার সবুজ পরদাগুলো ময়লা বিবর্ণ হয়ে গেছে। পুরনো আমলের ডেস্কে, কুমিরের গায়ের মতো খসখসে সোফার ঢাকনায়, চট বেরিয়ে আসা মেঝের লিনোলিয়ামে—সব জায়গাতেই ধুলো জমে আছে বলে মনে হয়। কিংবা ঘরটা অন্ধকার বলে ও-রকম ধুলোটে দেখায়।

এই ঘরে বিয়ে হয়। বর এসেছে বলে ঠেলাঠেলি পড়ে যায় না, শাঁখ না, উলু না, কিংবা নেই রোমাঞ্চকর চোখে-চোখে শুভদৃষ্টি। তবু বিয়ে হয়। হয়ে যায়। এই ধুলোটে জায়গায়। আধো অন্ধকার কৃত্রিম গোধুলিতে। চোরের মতন। ‘রেজিষ্ট্রিই ভাল’—চিরকাল এই কথা বলে এসেছে ললিত। তবু এখন তার মন সায় দেয় না। একটু আগে শাশ্বতী বসে ছিল এই ঘরে। কেঁদেছিল। হায়, তার কড়ি খেলা হল না, আর একজন কুড়িয়ে দেবে বলে সে মাদুরের ওপর ঘট উপুড় করে ছড়িয়ে দিল না চাল, তাকে সম্প্রদান করল না কেউ, সে নিজে হেঁটে এল। এই ঘরে বড় বেমানান লাগছিল শাশ্বতীকে। যশোরে কপোতাক্ষতীরে ওর দেশ। কলকাতায় জন্মেছিল শাশ্বতী? হবেও বা। তবু বাংলার গভীর হৃদয়ে লুকোনো ছিল ওর মায়াবী গ্রাম, মধুসূদনের বাড়ি থেকে খুব দূরে নয়। যশোরের কপোতাক্ষতীরে।

সে কেন আসবে—এখানে রুগি দেখা ঘরে, লজ্জাহীনার মতো সে কেন বলবে, ‘আমরা বিয়ে করতে এসেছি। বিয়ে দাও!’ বাংলাদেশে কে কবে শুনেছে এই কথা? ‘বিয়ে করলাম।’ এই কথা বলে রেস্তরাঁয় খেয়ে বিছানায় চলে যায় বর-বউ? কোনজন শুনি না হাসিবে এই কথা? এখানে হয় না বিয়ে, কিছুতেই হয় না। পালাও শাশ্বতী, আমি একদিন সুন্দর বিয়ে দেব তোমার। ওই কি সাজ? হাতে কলেজ-ফেরত বইখাতা, পরনে সুতির শাড়ি, পায়ে চপ্পল? তমি, কপালে সিঁথিমৌর, হাতে গাছকৌটো নিয়ে সেজে এসো। অনেক দূর থেকে নৌকোয় কারে আসবে তোমার বর। কপোতাক্ষ বেয়ে, গভীর বাংলাদেশে মায়াবী এক গ্রাম জুড়ে বেজে উঠবে শাঁখ, উলুধ্বনি। কড়ি খেলার শব্দ হবে।

লক্ষ্মীকান্ত, আবার ঘুরে আসে, দুঃখের সঙ্গে মাথা নেড়ে বলে, নাঃ।

দেয়ালের গোল ঘড়িটায় পাঁচটা বেজে পাঁচ মিনিট।

ম্যারেজ-রেজিস্ট্রারের চশমা ঝিকিমিকিয়ে ওঠে, সে কী? সব জায়গায় দেখেছিলে? কাছাকাছি রেস্তরাঁয়? পার্কে?

সব। লক্ষ্মীকান্ত হাঁফায়।

সঞ্জয় আদিত্যের কাঁধে হাত রেখে বলে, জেগে থাক।

আদিত্য মুখের ওপর থেকে মুখটাকা হাত সরিয়ে নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে একটু চেয়ে রইল সঞ্জয়ের দিকে। তারপর চার দিকে তাকিয়ে কাকে খুঁজল। আবার সঞ্জয়ের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল, কেন?

ওর বোকা মুখখানার দিকে চেয়ে লোভ সামলাতে পারল না সঞ্জয়, বলল, ঘুমোচ্ছিলি? ঘুমোস না। ঘুমোলে সে এসে যদি ফিরে যায়? জেগে থাক রে, আশা রাখ।

খানিকক্ষণ সঞ্জয়ের মুখের দিকে চেয়ে থেকে হঠাৎ ঠাট্টাটা ধরতে পারল আদিত্য। মুহূর্তে লাল, ভীষণ লাল হয়ে যায় আদিত্যর মুখ। চাপা গলায় সে বলল, ওই শালা—ওই ললিতের সব দোষ—আমার প্রেস্টিজ—আমার প্রেস্টিজ—

ললিত অবাক চোখে দেখছিল, আদিত্যর এলোমেলো চুল হাওয়ায় উড়ছে, রোগা ফরসা শরীরে তামার রঙের মতো একটা আভা। তার দিকে চেয়ে কী যেন বলছে আদিত্য! তারপরই লাফিয়ে এগিয়ে এল।

আদিত্যকে এগিয়ে আসতে দেখেও কিছুই ভাল করে বুঝতে পারছিল না ললিত। সে হয়তো তখন খুব তুচ্ছ কোনও কিছু ভাবছিল। তাই সে নিজের গালে আদিত্যর লম্বা আঙুলের চড় মারার চটাস শব্দটা শুনতেই পেল না। নরম সোফার ওপর তার দুর্বল শরীরটা একবার দুলে উঠেই গড়িয়ে পড়ল।

সঞ্জয় দৌড়ে এসে আদিত্যকে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে, কী হচ্ছে? আদিত্য ঘুরে দাঁড়ায়। তারপর আচমকা হাঁটু ভেঙে বুকের কাছে পা তুলে সঞ্জয়ের তলপেটে একটা লাথি মারল সে। সঞ্জয় ‘আঃক’ শব্দ করে দু’ ভাঁজ হয়ে মাটিতে পড়ে গেল।

লক্ষ্মীকান্ত আদিত্যর হাত ধরে টেনে বলে, কী করেন দাদা, কী করেন? এঃ হেঃ—

উদ্ভ্রান্তের মতো দাঁড়ায় আদিত্য। খ্যাপা চোখে চারদিকে চায়। হাওয়ায় উড়ছে ওর রুক্ষ চুল। গায়ের ফরসা রং তামার রঙের মতো হয়ে গেছে।

তারপর কোনও দিকে না তাকিয়ে বেরিয়ে যায়। কেউ ওকে আটকায় না।

বুড়ো ম্যারেজ-রেজিস্ট্রারের চশমা থেকে আলো ঠিকরে পড়ে, কী হচ্ছে এ-সব—অ্যাঁ? কী হচ্ছে, লক্ষ্মীকান্ত?

লক্ষ্মীকান্ত ললিতকে ধরে বসায়, খুব লেগেছে, দাদা?

না। ললিত মাথা নাড়ে। উঠে বসে। কষ্টে একটু হাসে ললিত, আমি ঠিক আছি লক্ষ্মীকান্ত।

শরীরে কয়েক বার ঝাঁকুনি দিয়ে উঠবার চেষ্টা করে, তারপর আস্তে আস্তে দাঁড়ায় সঞ্জয়। কুঁজো হয়ে পেটটা চেপে ধরে ব্যথা-বেদনার ‘ইঃ’ শব্দ করে। তারপর সোফায় বসে একটু হাঁফায়।

আশেপাশে অনেক কুঠুরি-অফিস রয়েছে। সেসব জায়গা থেকে ছুটে এসেছিল কিছু লোক। তারা উত্তেজিতভাবে ঘরের মধ্যে চলাফেরা করছে, জিজ্ঞেস করছে, ‘কী হয়েছে দাদা,’ ‘কী ব্যাপার দাদা।’ তাদের ছায়ার মতো দেখতে পায় ললিত। লক্ষ্মীকান্ত তাদের ঘরের বাইরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টায় দু’ হাত ছড়িয়ে বলছে, ‘কিছু না, কিছু না, মানুষে মানুষে কত রকমের হয়। আপনারা বাইরে চলুন, হাওয়ার রাস্তা দিন।’ এর মধ্যে কোনও মেয়েকে না দেখে হতাশ হয়ে কালো বেঁটে একটা লোক চেঁচিয়ে বলল, ‘বিষহরীটি কোথায়—অ্যাঁ? কাকে নিয়ে গড়াচ্ছে এত দূর? না কি কেবল পুরুষে পুরুষে!’

ললিত চারদিকে দেখে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করে। সঞ্জয়ের মুখ লাল, কিন্তু সে ললিতের চোখে চোখে পড়তেই ক্লিষ্ট একটু হাসে। মাথা নেড়ে জানায় যে, সে ঠিক আছে। কিছু হয়নি।

কিছু হয়নি। খুব সাঙ্ঘাতিক কিছুই না! সব ঠিক আছে।

কিছুক্ষণ পর তারা সরু কাঠের সিঁড়িটা বেয়ে আস্তে আস্তে নেমে যাচ্ছিল। সামনে রেলিঙে হাতের ভর রেখে পেট চেপে কুঁজো হয়ে সঞ্জয়, পিছনে লক্ষ্মীকান্তর কাঁধে শরীরের ভার ছেড়ে ললিত।

সঞ্জয়ের গাড়িতে ললিত সামনের সিটে, সঞ্জয় পাশে বসল। পিছনে লক্ষ্মীকান্ত। সিগারেট ধরিয়ে প্যাকেটটা ললিতের দিকে বাড়িয়ে দেয় সঞ্জয়। ললিত মাথা তে বলে, থাক।

স্টিয়ারিঙে হাত রেখে একটু ইতস্তত করল সঞ্জয়। তারপর ললিতের দিকে বিব্রত চোখে তাকিয়ে একটু হাসল। কোনও প্রশ্ন করল না সঞ্জয়, কিন্তু ললিত বুঝতে পারে এবার সে ললিতের কাছ থেকে কিছু জানতে চাইছে। কেন এ-রকম হল! কী ব্যাপার!

বুক দুরদুর করে ওঠে ললিতের। সঠিক সেও তো জানে না কী ব্যাপার। জিজ্ঞেস করলে সে কী উত্তর দেবে ওদের?

কিন্তু সঞ্জয় ইচ্ছে করেই কিছু জিজ্ঞেস করল না। হয়তো ললিতের অসহায় মুখখানা দেখে তার মায়া হল একটু। হয়তো সে কিছু একটা আন্দাজ করে নিল। প্রশ্ন করল না। মাথার ওপরের ছোট্ট আয়নাটা ঘুরিয়ে সে নিজের মুখটা একটু দেখল। আপনমনে বলল, শালার এখনও মায়া দয়া আছে, বুঝলি! লাথিটা জোরে মারলে এতক্ষণে আমি হাসপাতালে, কিংবা লাথিটা তলপেটে না হয়ে আর-একটু নীচে লাগলে—মাইরি—

কথাটা শেষ করল না সে। গিয়ার দিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিল।

ওয়েলেসলি দিয়ে বিকেলের ভিড় ঠেলে ধীরে ধীরে যাচ্ছে সঞ্জয়ের গাড়ি। মন্থর ট্রামের জানালায় উদাসী মানুষদের বিষন্ন মুখ। ধুলোময়লা মাখা কলকাতার রাস্তায় হাঁটছে জীর্ণ মানুষেরা, মুখে রাগ, বিরক্তি, হতাশা, থুথু ফেলে চলে যাচ্ছে, সিনেমা হলের সামনে সঙ্গিনীর জন্য অপেক্ষা করছে একটি ছেলে, তার হাঁটুর কাছে মুখ তুলে একটা বাচ্চা ভিখিরির ছেলে, সে লক্ষ করছে না, ট্রাফিকের পুলিশ হাত বাড়িয়ে কার অদৃশ্য চুলের মুঠি ধরল, হঠাৎ থেমে দুলতে থাকে গাড়ি—

সঞ্জয় তার দিকে তাকিয়ে বলে, শরীর কেমন?

ললিত মাথা নাড়ে, ভাল। বেশ ভাল।

শালা বেজম্মা মেরে গেল। ধরতে পারলে শালাকে…

ললিত চুপ করে থাকে। দুরদুর করে বুক, পাখির মতো।

কিন্তু সঞ্জয় কথা ঘুরিয়ে নিল। চাপা গলায় বলল, অনেক দিন মারধর খাইনি, বুঝলি? পেটে চর্বি জমে গেছে, লাথিটা লাগতেই দম আটকে গেল। মনে হল, মরে যাচ্ছি। আসলে বয়স—বুঝলি! এই বয়সে চোট-ফোট লাগলে ভড়কে যাই…

সরে যাচ্ছে ট্রাফিক-পুলিশের হাত। গিয়ার বদলের শব্দ হয়। সঞ্জয় হাসে, বলে, লাথিটা লেগে দম আটকে যেতেই মনটা হায় হায় করে উঠল। কত কিছু বাকি রয়ে গেল জীবনে, কত রকমভাবে বাঁচা যেত! তখন আমি তাড়াতাড়ি ভেবে দেখছিলাম কোন কাজটা সবচেয়ে জরুরি যেটা আমি বাকি রেখে যাচ্ছি! হঠাৎ মাইরি আমার ভেতর থেকে একটা চ্যাঁচানি বেরিয়ে আসছিল, চার হাজার টাকা—চার হাজার টাকার চেকটা কোথায় গেল!

ললিত অবাক হয়ে বলে, কীসের চার হাজার টাকা?

সঞ্জয় চাপা গলায় বলে, তখন কি আমিই জানি কীসের চার হাজার টাকা! কিন্তু মাটিতে পড়ে ছটফট করতে করতে আমি কেবল ওই চার হাজার টাকার কথা ভাবছি। তখন আমার পিকলুর মুখ মনে পড়েনি, রিনির কথাও না, কেবল ওই চার হাজার টাকার কথা। অথচ বুঝতে পারছি না কীসের টাকা। তারপর আস্তে আস্তে মনে পড়ে গেল। …কী হয়েছিল জানিস?

হঠাৎ গলা খুব নিচু করে সঞ্জয়, প্রায় ফিসফিস করে বলল, আমার যে ছোট্ট কোম্পানিটা আছে তার একটা বকেয়া পেমেন্টের জন্য পরশুদিন দাদার হাতে একটা চার হাজারি বেয়ারার চেক দিয়েছিলাম। জয়েন্ট অ্যাকাউন্টের চেক, দাদার আর আমার সই থাকে। আজ বেলা এগারোটা নাগাদ ফোন করে দাদা জানাল যে, পরশুদিন চেকটা দাদার পকেটমার হয়ে গেছে। বুকপকেটে রেখেছিল টের পায়নি। আজ ব্যাঙ্ক খোলার ঘন্টাখানেক পরে টের পেয়ে ছুটে গিয়েছিল ব্যাঙ্কে, কিন্তু চেকটা ক্যাশ হয়ে গেছে। এক ঘণ্টার মধ্যেই। শুনে সঙ্গে সঙ্গে ব্যাঙ্কে ফোন করলাম। এজেন্ট আমার চেনা লোক, তক্ষুনি ক্যাশ থেকে লোক ডেকে পাঠাল। আমি তাকে চেক-এর নম্বর দিয়ে বললাম যে, যে-লোকটা আজ চেকটা ক্যাশ করেছে তার চেহারাটা মনে আছে কি না। লোকটা স্পষ্ট কিছু বলতে পারল না, কিন্তু আবছাভাবে যা বলল তাতে চেহারাটা একজনের সঙ্গে মিলে যায়। যদি সেই লোকটাই চেক ক্যাশ করে থাকে তবে এটা নিশ্চিত যে, চেকটা দাদার পকেটমার হয়নি— বুঝলি! তা ছাড়া দাদা আবার সব জিনিসই তার মানিব্যাগে রাখে, এমনকী দেশলাইটা পর্যন্ত, তবে চেকটা বুকপকেটে রাখতে গেল কেন? তাই সারা দিন আমি মনে মনে চেকটা ট্রেস করার চেষ্টা করছিলাম, কোথা থেকে কীভাবে কার মারফত গিয়েছিল চেকটা, কীভাবে ধরা যাবে ব্যাপারটা। আর, যখন হঠাৎ আদিত্যর লাথি খেয়ে মরে যাচ্ছি তখন আমার সমস্ত মনপ্রাণ ওই চেকটার জন্য কেঁদে উঠল। কিন্তু বিশ্বাস কর, টাকাটার জন্য নয়, আমার মাসের রোজগার ওর চেয়েও বেশি। কিন্তু তখন মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে চার চারটে হাজার টাকা আমার ঠকা রয়ে গেল, জিত হল না। আমার হাতের নাগালের বাইরে রয়ে গেল একটা অঙ্ক, যার উত্তরটা আমি মনে মনে মিলিয়ে ফেলেছি, অথচ পরীক্ষার শেষ ঘন্টা পড়ে গেল, খাতা টেনে নিচ্ছে গার্ড। চেঁচিয়ে বলছি, আর-একটু সময় দাও, আর-একটু, এই চার হাজার টাকার চেকটা ট্রেস করেই আমি চলে যাব—আর কিছু না—। মাইরি, এখন হাসি পাচ্ছে—শালা, অন্তিম মুহূর্ত এসে গেল, পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছি, অথচ কোনও ভালবাসার মানুষের কথা মনে পড়ল না? ওই চেকটার মধ্যে এমন কী রস ছিল যে, পিকলুর কথা, রিনির কথা মনে পড়ল না?

পার্ক স্ট্রিটে গাড়ি ঘুরিয়ে থামিয়ে ফেলেছিল সঞ্জয়। বলল, নামবি? একটু সেলিব্রেট করে যাই চল।

কীসের সেলিব্রেট?

আদিত্যর লাথিটার।

ললিত ম্লান হেসে মাথা নাড়ে, না। আমার ও-সব বারণ।

ঠিক তো! ভুলে গিয়েছিলাম। বলে জিভে আফসোসের চুক চুক শব্দ করে সঞ্জয়। গাড়ি ছেড়ে বলে, তা হলে চল তোকে পৌঁছে দিয়ে আসি। আজ একটু লোড করতেই হবে। বডি পড়ে যাচ্ছে মাইরি!

বাসায় এসে ললিত শুনল তুলসী এসে ফিরে গেছে।

ওকে ধরে রাখলে না কেন মা?

অনেকক্ষণ বসে ছিল তো। সিনেমার টিকিট কাটা ছিল বলে চলে গেল। খুব খুশি ছিল আজ, বলল কোথাকার ফুটবল খেলায় ও গোল দিয়েছে।

গোল! কীসের গোল?

কী জানি।

তলপেটটা ফুলে ঢিবি হয়ে আছে। ভারী। যেন ন’ মাসের বাচ্চা রয়েছে পেটে। দাঁতে দাঁতে টিপে হাসল সঞ্জয়।

লক্ষ্মীকান্তকে ছেড়ে দিল রাসবিহারীর মোড়ে।

গাড়ির স্টিয়ারিং ধরা এক হাতে, অন্য হাতে আবার ছোট আয়নাটা ঘুরিয়ে মুখ দেখে সঞ্জয়, বলে, কী মিস্টার সেন, খুব এক পেট হয়ে গেল তো? বুড়ো বয়সের চোট হে, সারতে সময় লাগবে। চাই কি প্রোস্টেস্ট গ্র্যান্ড পর্যন্ত গড়াতে পারে। সুখে নেই হে তুমি, যতই গাড়ি বাড়ি বউ ছেলে আগলাও, কোথা থেকে যে সংসারের লাথিটা আসবে, টেরই পারে না।

দাঁত চেপে হাসে সঞ্জয়। গাড়ি চালায়। পার্ক স্ট্রিটের দিকে।

সামান্য মাতাল হয়ে ফেরার পথে একজায়গায় গড়িয়াহাটার কাছে অন্ধকারে গাড়ি দাঁড় করায় সঞ্জয়। সিগারেট ধরায়। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, তার ভালবাসার লোকজন বোধ হয় খুব কমই আছে পৃথিবীতে। যখন সে ভাবছিল এই তার শেষ মুহূর্ত—মরে যাচ্ছে সে—তখন তার রিনি কিংবা পিকলুর কথা মনে পড়তে পারত—কিংবা অনীতা—তার অন্ধ বোনটার কথা—হাতড়ে হাতড়ে কাছে এসে চুপ করে পাশ ঘেঁষে বসে থাকে—কিংবা মা—কিংবা যে-কেউ—কিন্তু মনে পড়েনি। কেবল একটা চার হাজারি চেকের কথা মনে পড়েছিল। আশ্চর্য। তবে পৃথিবীতে তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কী? অ্যাঁ? কী? সেটা কি টাকা? একটু শিউরে উঠে মৃদু হাসে সঞ্জয়। ঠিক আছে। তবে তাই হোক। আমেন।

রোজই ভুল হয়ে যায়। এখনও কেনা হয়নি রিনির রোজি ড্রিম আর পিকলুর বিলিতি ফিডার। আজ কিনে নিল সঞ্জয় গড়িয়াহাটার প্রকাণ্ড দোকান থেকে।

বাসায় ফিরে দেখল বাইরের ঘরে গম্ভীর মুখে দাদা অজয় বসে আছে। সামনের টেবিলে খালি চায়ের কাপ, আর কাগজ-চাপার তলায় একটা নতুন চেক।

কী ব্যাপার!

অপরাধী মুখে দাদা বলে, এটা সই করে দে। পেমেন্টটা আটকে আছে।

এই লোকটা—অজয়—তার দাদা এক সময়ে ব্যাঙ্কের পিয়ন ছিল, খাকি পোশাক পরা লোকটা সাহেবদের সেলাম দিয়েছে অনেক। অনেক দিন আগে এ-লোকটাই তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল প্রায় অকারণে। সেই থেকে দরিদ্র সঞ্জয় আলাদা হয়ে গেল, এখনও আলাদা রয়েছে তাদের পরিবার। এখন লোকটার চোখে অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেমের চকচকে চশমা, গায়ে নীল টেরিলিন, গাল কামানো, মাথায় অভিজাত গোলাপি রঙের টাক। তবু ব্যাঙ্কের পিয়ন ছিল, আর তাকে একবার বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল বলে অজয়কে খাতির করে না সঞ্জয়, তার সামনেই সিগারেট খায়, মদের গন্ধ লুকোতে চেষ্টা করে না।

সঞ্জয় উত্তর দিল না। ধীরেসুস্থে জামা প্যান্ট ছেড়ে বাথরুম ঘুরে ডাইনিং টেবিলে এসে চায়ের সামনে বসল। অনেকটা সময় নিল সে।

তারপর বাইরের ঘরে এসে দেখল অজয় স্থিরভাবে বসে আছে। তাকে দেখে একটু নড়ল।

নিঃশব্দে চেকটা সই করে দিল সঞ্জয়।

একবার ইচ্ছে হল বলে যে, যে-লোকটা চেক ভাঙিয়েছিল তাকে চিনতে পেরেছে ব্যাঙ্কের ক্যাশ-ক্লার্ক। শুনে অজয় চমকে উঠে সাদা মুখে তাকাবে। কিংবা সঞ্জয় ইচ্ছে করলে বলতে পারে, উত্তরপাড়ায় বউদির নামে জমি কিনেছ, আমি কি জানি না?

জানে। সঞ্জয় সব জানে। অজয় বড় বোকার মতো ঠকিয়েছে তাকে। এত বোকার মতো যে হাসি পায়। ঝগড়া করতে ইচ্ছে হয় না। অজয়কে নিরাপদে চলে যেতে দেয় সে।

তলপেট ভারী হয়ে আছে। কত দূর গড়াবে কে জানে। একদিন আমি সব ছেড়েছুড়ে দেব। বুঝলে রিনি। সব ছেড়েছুড়ে—তারপর সাধু হয়ে যাব রমেনের মতো। না, রমেনের মতো নয়। রমেন সবকিছুর মাঝখান থেকে হঠাৎ খেলা ভেঙে উঠে গিয়েছিল। আমি তত দূর পারব না। আগে কোম্পানিটা ট্রান্সফার করব অনীতার নামে—আহা, অঙ্ক বোনটি—টাকা ছাড়া কে আর ওকে পথ দেখাবে? তোমার আর পিকলুর জন্য ব্যাঙ্কে রাখব কয়েক লাখ টাকা। তারপর—হ্যাঁ, তারপর সাধু হয়ে যাওয়া যায়। তারপর সাধু হওয়া শক্ত নয়।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%