শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
সেদিনের পর শাশ্বতী বেশ কয়েক দিন কলেজে গেল না। সে মায়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘরের কাজ করল, কোমরে আঁচল বেঁধে বাবার জমি কোপাল, বাচুর সঙ্গে ইচ্ছে করে করল ঝগড়া। প্রতি মুহুর্তেই তার ভয় হচ্ছিল, যে-কোনও দিন আদিত্য এসে হাজির হবে।
কিন্তু আদিত্য এল না। তিন দিন পর একদিন সন্ধেবেলা কালীনাথ অফিস থেকে ফিরে তাকে জিজ্ঞেস করল, হ্যাঁরে, আদিত্যর সঙ্গে তোর দেখা হয়?
না।
কী হল, ক’দিন আফিসে আসছে না!
খবরটা শুনে বুকটা একটু ধক করল শাশ্বতীর। কী জানি, যদি সুইসাইড বা এ-রকম কোনও পাগলামি করে থাকে আদিত্য! ও কি অতখানি ভালবেসেছিল শাশ্বতীকে! কে জানে! যদি ও-রকম কিছু করে থাকে তবে চেনা লোকেরা এখন শাশ্বতীকে দেখিয়ে বলবে, এই বাজে মেয়েটাই যত নষ্টের গোড়। শাশ্বতী তাই সারাক্ষণ মনে মনে বলে, আমি খুব সাধারণ বোকা মেয়ে একটি। আমার জন্য কেউ যেন আত্মহত্যা না করে, কেউ যেন বিবাগী না হয়—হে ভগবান!
কলেজে যাচ্ছে না বলে কেউ কোনও প্রশ্ন করে না। তাদের বাড়ি থেকে শাসন উঠে গেছে, কমে গেছে কৌতুহল। এখন যে যা খুশি করে, অন্যেরা দেখে নিস্পৃহভাবে। কেবল মাঝে মাঝে হৈমন্তী তাকে খোঁচায়, কী রে, ঝগড়া-টগড়া করেছিস নাকি!
না।
হৈমন্তী জিজ্ঞেস করে, তাদের তো দেখা হচ্ছে না কয়েক দিন।
শাশ্বতী উত্তর দেয় না।
হৈমন্তী কখনও কখনও আরও কৌতূহল দেখায়। বলে, তোরা যে রেজিস্ট্রি করবি বলেছিলি, তার কী হল?
শাশ্বতী মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অন্যমনস্কতার ভান করে।
একদিন বিকেলে কলেজ ফেরত সবুজ হেরাল্ড গাড়িখানা নিয়ে রাকা এসে হাজির। সঙ্গে তার দাদা সুমন্ত ছিল না, বাড়ির ড্রাইভার গাড়ি চালিয়ে এনেছে।
গাড়িওয়ালা লোক এ-বাড়িতে কখনও আসেনি। তাই একটু চাপা উত্তেজনা দেখা দিল বাড়িতে। বাচ্চু গায়ে জামা দিয়ে মিষ্টি আনতে গেল দোকান থেকে।
অবশ্য খাবারের প্লেট রাকা ছুঁলও না। তার মুখখানা খুব গম্ভীর, বিষণ্ণ। সাধারণত হাসি-খুশি থাকে বলে বিষণ্ণ রাকাকে বড় অচেনা লাগছিল। এবং সেজন্য মনে মনে ভয়-পাওয়া হরিণের মতো চঞ্চল, অস্থির বোধ করছিল শাশ্বতী।
যাওয়ার সময় বাগানের আগলটার কাছে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রাকা বলল, তুই যে এনগেজ্ড তা তো কই আমাকে বলিসনি! কলেজের অনেকেই জানে দেখলাম, কেবল আমি ছাড়া। শুনলাম ভদ্রলোকের নাম আদিত্য রায়, কলেজে এসে প্রায়ই দেখা করেন তোর সঙ্গে!
শাশ্বতী আঙুলে আঁচল জড়ায়, মুখ নিচু করে থাকে। উত্তর দেয় না।
রাকা দুঃখিত গলায় বলে, দাদা শুনে খুব দুঃখ পেয়েছে। বলছিল, তুই নাকি ওকে কিছু ঠিক করে বলিসনি! রাকা উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে অনেকক্ষণ, তারপর মৃদুস্বরে বলে, কয়েক বছর আগে ওকে আর-একজন মেয়ে রিফিউজ করেছিল— তারপর খুব ড্রিঙ্ক করত দাদা, ষাট-সওর মাইল স্পিডে গাড়ি চালাত। একদিন সইতে না-পেরে ঘুমের ওষুধ খেয়েছিল। স্বাস্থ্য ভাল বলে বেঁচে যায়। কিন্তু এবার ও খুব সিওর ছিল। প্রথমেই জেনে নিয়েছিল, তুই এনগেজ্ড কি না। এখন নতুন ধাক্কা খেয়ে ওর আবার কী হবে কে জানে! কয়েক দিন খুব অন্যমনস্ক দেখছি ওকে—
শাশ্বতী উত্তর দেয় না। কিন্তু তার ঠোঁট কাঁপে। বড় মায়া হতে থাকে তার সেইসব পুরুষের জন্য যাদের সে ভালবাসেনি। কেন ওরা তাকে অবহেলা করেনি! তোমরা কেমন পুরুষ! পৃথিবীতে কত কাজ আছে পুরুষের, কত রহস্যমোচন, কত আবিষ্কার, কত আদর্শ-প্রচার— তবু কেন একটি মেয়ের। জন্য— সামান্য, কালো, সাধারণ একটি মেয়ের জন্য সব দিয়ে দাও! এবং উদাসীন থেকো তোমরা, উদাসীন থেকো, মন বুঝতে সময় দিয়ো।
পাঁচ-ছ’ দিন কেটে গেলে একদিন শিবানী এসে বলল, আজও কলেজে যাবি না! এস-বির ক্লাসে আজ পলিটিক্সের নোট দেবে।
একটু ইতস্তত করল শাশ্বতী। বাইরে যেতে এখন বড় ভয় করে তার। মনে হয়, অনেক রাগী, প্রতিশোধকামী পুরুষ তার অপেক্ষায় চারদিকে ওঁত পেতে আছে।
একটু চিন্তা করে শাশ্বতী বলল, চল যাই।
তারপর অনিচ্ছায় সে তৈরি হয়ে নিল।
বাসে বসে শিবানী জিজ্ঞেস করল, তুই তো রোজ কলেজ থেকে কাটিস, খুব সিনেমা-রেস্টুরেন্টে যাস, না?
শাশ্বতী উত্তর দেয় না।
খুব উড়ছিস! শিবানী দুঃখ করল। নিশ্বাস ফেলে বলল, আর দ্যাখ, অলক যে সেই চাকরি করতে গৌহাটি গেল, একটা চিঠি পর্যন্ত দিল না। পুরুষমানুষদের বিশ্বাস নেই।
শাশ্বতী চুপ করে রইল।
কলেজের স্টপেজ এসে গেল। নামবার জন্য বাসের পা-দানিতে নেমে একটু মুখ বাড়াতেই শাশ্বতী দেখতে পেল, কলেজের সামনে বড় রাস্তায় কৃষ্ণচূড়া গাছটার তলায় লম্বা রোগামতো একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সেদিন ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে আদিত্য অপেক্ষা করছিল।
ওই লম্বা লোকটা কি আদিতা? দূর থেকে ঠিক বোঝা যায় না। আদিত্য হওয়া অসম্ভব নয়। তার হাত-পা অবশ হয়ে গেল, বুক কাঁপল ভীষণ।
শাশ্বতী পিছিয়ে আসে। বলে, আমি নামব না।
সে কী!
না। শাশ্বতী মাথা নাড়ে, আমি একটু অন্য জায়গায় যাব। কাজ আছে। কোথায়?
কোথায় তা শাশ্বতী তাড়াতাড়িতে ঠিক করতে পারল না। বলল, আছে।… তুই পলিটিক্সের নোটটা আমাকে দিস, আমি টুকে নেব।
আবার বাসের মধ্যে ফিরে এসে বসল শাশ্বতী। পয়সা বের করে কন্ডক্টরকে বলল, আমি রাসবিহারীর মোড়ে নামব।
মনে মনে ঠিক করল শাশ্বতী যে, রাসবিহারীর মোড় থেকে ফিরতি বাস ধরে বাড়িতে ফিরে যাবে। কিন্তু রাসবিহারীর মোড়ে এসে তার খেয়াল হল, এখান থেকে দক্ষিণমুখো কিছুটা গেলেই ললিতের বাসা। ঠিকানা জানে না শাশ্বতী, কিন্তু বাসাটা তার মনে আছে। সেদিন থেকেই ললিতের ওপর একটা রাগ তার রয়ে গেছে। সেই রাগটা থাকতে থাকতেই বোঝাপড়াটা মিটিয়ে আসবে নাকি শাশ্বতী! বেশি দেরি করার দরকার কী? বেশি দেরি করলে শাশ্বতীর রাগ থাকে না, সাহস কমে যায়।
কী করছে তার বিচার করল না সে। দক্ষিণ দিকে উনত্রিশ নম্বর ট্রাম ফাঁকা যাচ্ছে। শাশ্বতী উঠে পড়ল।
ললিতের জন্য বড় ভয় করে ললিতের মায়ের। দিন দিন কেমন ঘরছাড়া বিবাগীর মতো হয়ে যাচ্ছে ওর ভাবখানা। এক দিকে তাকিয়ে থাকে তো তাকিয়েই থাকে, বেলা বয়ে যায়।
সেই কবে একটা মাস্টারির চাকরি জুটিয়েছিল ললিত, এখনও তাতেই রয়ে গেল। উন্নতির কোনও চেষ্টা নেই। শুয়ে বসে সময় কাটায়, চায়ের দোকানে গিয়ে আদ্দেক দিন কাটিয়ে আসে। এই বয়স—এখন উদ্যোগী হয়ে, ছোটাছুটি করে কত কিছু করে ফেলে মানুষ! তা করবে না। কিছু বললেই বলে, আমরা তো দু’জন, ঠিক চলে যাবে দেখো। বাপের স্বভাব। ওর বাপ সারাটা জীবন খেলা-খেলা করে পাগল ছিল, বাড়ির মানুষকে চিনতেই পারত না। সে-লোকটা সারাটা জীবন কেবল আপ্তবাক্য বলে গেল।— পয়সাকড়ি দিয়ে কী হয়! ছুঁচের ফুটো দিয়ে বরং হাতি গলে যায়, তবু কোনও বড়লোক স্বর্গে যায় না। বাপ ছেলে দু’জনেরই ধারণা যে বড়লোক হওয়াটার মধ্যে কিছু নেই। তার চেয়ে এই ভাল, যেভাবে চলছে চলুক। ললিতের বন্ধুরা কিন্তু ওর মতো বোকা নয়। তারা সময় থাকতে যে যারটা গুছিয়ে নিচ্ছে। কেমন গাড়ি করে ফেলল সঞ্জয়, বিয়ে করল তুলসী! ললিতটাই মুখচোরা। কোথাও গিয়ে নিজের জন্য দাঁড়াতে পারে না, কেড়ে-কুড়ে আনতে পারে না নিজের ভাগেরটা। অথচ খুব অহংকারী। দেশের বাড়িতে যখন হরির লুঠ পড়ত, তখন ললিত দাঁড়িয়ে থাকত দূরে। ওর চোখের সামনে অন্য সব ছেলেমেয়ে মাটিতে পড়ে কাড়াকাড়ি করে বাতাসা কুড়োত। ও পারত না। কিন্তু দূরে দাঁড়িয়ে এমন ভাবখানা করত যেন ও-সব ছোটলোকির মধ্যে নেই।
কেন ওর লোভ-টোভ এত কম! টাকাকড়ির দিকে ঝোঁক নেই কেন? রাস্তায়, গলিতে কত বয়সের মেয়ে হেঁটে যায়, ললিত চোখ তুলে তাকায় না। কিন্তু এ-বয়সে ও-রকম হওয়া কি ভাল! তরতাজা বয়স, এ-বয়সে বয়সের গুণ থাকবে না!
এইসব সারা দিন ভাবে ললিতের মা। বড় ভয় করে তার। আপনমনে বিড়বিড় করে।
শোওয়ার ঘরে হলুদের গুঁড়ো খুঁজতে এসেছিল মা। এমন সময়ে খুট খুট করে খুব ভয়ে ভয়ে কে যেন কড়া নাড়ল।
দরজা খুলতেই দেখা গেল ভিতু জড়সড় এক মেয়ে। হাতে বইখাতা, পরনে চমৎকার একখানা জয়পুরি ছাপা শাড়ি। শ্যামলা রং, সুন্দর মুখখানা। প্রায় ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, ললিত…ললিতবাবু এইখানে থাকেন?
আহা, ললিতের সঙ্গে বড় মানায়। ভাবে ললিতের মা।
তুমি কোত্থেকে আসছ?
মেয়েটি লাজুক মুখে বলল, যাদবপুর। ললিতবাবু নেই?
এই বেরোল। তুমি ঘরে এসে একটু বোসো। ডেকে পাঠাচ্ছি। বেশি দূরে যায়নি।
চপ্পল জোড়া বাইরে ছেড়ে ঘরে এল শাশ্বতী। ললিতের মায়ের ছোট্ট চৌকিটার একধারে এতটুকু হয়ে বসল। বাস-স্টপ থেকে অনেকটা হেঁটে আসতে হয়েছে রোদে, শাশ্বতী ছোট্ট দলা পাকানো রুমালে কপালের ঘাম মুছছিল।
ললিতের মা আদরের গলায় জিজ্ঞেস করল, গরম লাগছে?
লজ্জায় মাথা নাড়ল শাশ্বতী, না।
ললিতের মা একটু হেসে পাখাটা খুলে দেয়।
ললিতের মা দেখল, এখন যেখানে মেয়েটি বসে আছে ঠিক সেইখানে অনেক দিন আগে একদিন দুপুরে মিতু বসেছিল। ললিতের বড় পছন্দ ছিল তাকে। কিন্তু ওইখানে বসে মিতু কেঁদেকেটে অস্বীকার করে গেল। ললিতকে বিয়ে করতে রাজি হল না। এই ঢৌকিটা যেখানে মেয়েটি এখন বসে আছে, ওটা অলক্ষুণে চৌকি।
ললিতের মা বলল, তুমি এখানটায় ললিতের চৌকিতে এসে বোসো। এখানে বেশি হাওয়া লাগবে।
শাশ্বতী বাধ্য মেয়ের মতো উঠে ললিতের চৌকিতে গিয়ে বসল।
ললিতের মা মনে মনে বলল, ঠাকুর, ঠাকুর, দেখো এ যেন সেই হয় যাকে ললিত বিয়ে করবে। আহা, বড় লক্ষ্মীমন্ত মুখখানি। ললিতটা বড় মুখচোরা। কই, এত দিন বলেনি তো এমন একটা মেয়ের সঙ্গে তার ভাবসাব, চেনা-জানা হয়েছে? বোকা ছেলে, তুই কাউকে পছন্দ করলে আমি কি রাগ করব? তোর পছন্দ জেনেই তো মিতুকে আমি ডেকে এনেছিলাম। মিতু রাজি হল না, আমাকে কত অপমান করে গেল! কিন্তু তাতে আমি দুঃখ পাইনি। তোর বুকের ভিতরটা যে পুড়ে গিয়েছিল, তার চেয়ে কি ওইটুকু অপমান বেশি? আহা, ললিত এবার বেশ পছন্দ করেছিল। মিতু সুন্দর ছিল কিন্তু এর মতো লক্ষ্মীমন্ত ছিল না। বেশ রে ললিত, বেশ!
একটু চা খাও মা, সঙ্গে আর কী খাবে—দুটো চিঁড়ে ভেজে দিই!
না, না। লজ্জায় মাথা নাড়ে শাশ্বতী। কানের মাকড়ি ঝিকিয়ে ওঠে, কপালের ওপর এক থোকা চুল দোল খায়।
ছেলেমানুষ! কচি। মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকে ললিতের মা।
শাশ্বতী এই ছোট্ট ঘরখানা দেখছিল। নির্জন সুন্দর ঘরখানা, বাইরের কোনও শব্দ আসে না। জানালার ওপর ঝুঁকে আছে সবুজ, সতেজ একটা পেয়ারার ডাল। পাখি ডাকছে। ভিতরে ছোট্ট একটু উঠোন, এক পাশে তুলসীমঞ্চ। ঘরে আসবাবপত্র বেশি নেই। যা আছে তাতে বোঝা যায় এদের অবস্থা অনেকটা শাশ্বতীদের মতোই। তাই এই ঘরে বসতে খুব একটা অস্বস্তি হয় না। সমান অবস্থার মানুষের সঙ্গে মিশতেই স্বস্তি বোধ করে সে। এ-কথা ঠিক, শাশ্বতী কোনও দিন খুব বড়লোকের ঘরে বউ হয়ে যেতে চায়নি। বিশাল ঘরদোর, অনেক অদেখা আসবাব, বেশি চাকর-বাকর, এ-সব কোনও দিন ভাবতে ভাল লাগে না তার। মন খারাপ হয়ে যায়। কোনও দিন বড়লোকের ঘরে গেলে শাশ্বতী হাঁফিয়ে উঠবে। সেখানে অনেক চকচকে জিনিসপত্রে চোখ ধাঁধিয়ে যায়, মানুষগুলোকে পুতুলের মতো লাগে। যে-ঘরে আসবাবপত্র কম সেইখানে মানুষগুলোর ওপর বেশি করে চোখ পড়ে, সহজ লাগে।
ওপর দিকে চেয়ে শাশ্বতী দেখল বুড়োর মাথার মতো নড়বড়ে ফ্যানটা দুলছে। ওটার নভা দেখে একটু হাসল শাশ্বতী। ভুলে গেল যে সে ঝগড়া করতে এসেছে।
একটা বাচ্চা ছেলে দৌড়ে এসে গণেশের দোকানের দরজায় মুখ বাড়িয়ে বলল, ললিতদা, মাসিমা ডাকছে, একজন বসে আছে আপনার জন্য।
ললিত উঠল, বোধ হয় তুলসী-ফুলসী কেউ এসেছে।
ঘরের দরজায় পা দিয়েই শাশ্বতীকে দেখতে পেল ললিত। লাফিয়ে মোচড় দিয়ে উঠল বুক ধড়াস শব্দ হল শরীরের মধ্যে। হঠাৎ যেন বন্ধ হয়ে গেল বাতাস। পায়ের নীচে দুরদুর করে কেঁপে উঠল মাটি।
আপনি!
শাশ্বতী উঠে দাঁড়িয়েছিল। ললিতের ধারালো উজ্জ্বল মুখখানা একপলক দেখেই চোখ নামিয়ে নিল শাশ্বতী। কোনও রকমে বলল, আমি… আমি একটু এলাম।
তারপরেই সে অবাক হয়ে টের পেল তার আর কোনও কথা বলার নেই। কথা শেষ।
আস্তে আস্তে নিজেকে সামলে নিল ললিত। ঘরে এসে সন্তর্পণে মায়ের চৌকিটাতে বসল।
শাশ্বতীর খুব ঝগড়া করার কথা। সে বলতে এসেছিল, কেন আপনি ওই কাণ্ড করতে গেলেন? তাতে আপনার কী স্বার্থ ছিল?
কিন্তু সে-কথা না বলে সম্পূর্ণ অন্য কথা বলল শাশ্বতী। বলল, সেদিন আমি ওখান থেকে চলে গিয়েছিলাম। আপনি তাতে রাগ করেননি তো!
উত্তরে ললিতের বলার কথা, কেন আপনি ও-রকম করলেন? ছিঃ ছিঃ, আদিত্য খেপে গিয়ে সঞ্জয়ের পেটে লাথি মেরেছে, আমাকে চড় মেরেছে। কেন আপনি আমাদের ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের সামনে বে-ইজ্জত করলেন?
কিন্তু সে-কথা বলল না ললিত। বরং অপরাধীর মতো মুখ নামিয়ে বলল, না, আপনি ঠিকই করেছিলেন।…
শাশ্বতী হাসল। তার সাদা ছোট ছোট দাঁতে সকালের সতেজ রোদ আর পেয়ারা পাতার সবুজ রঙের একটা আভা ঝিকমিক করে গেল।
চায়ের কাপ আর চিঁড়ে ভাজার প্লেট হাতে মা ঘরে ঢুকল। মায়ের মুখে চোরা হাসি। বলল, ললিত, তুই একটু চা খাবি? করে দেব?
ললিত বলল, দাও।
মা শাশ্বতীকে চা-টা দেয়। বলে, একটু খাও। এবাড়িতে প্রথম এলে। খাও।
চা রেখেই ললিতের মা তাড়াতাড়ি চলে যায়। মনে মনে বলে, ঠাকুর, ঠাকুর…
মুখ নিচু করে বসে ছিল শাশ্বতী। হঠাৎ মুখখানা তুলে বলল, দেখবেন, আপনার অসুখ সেরে যাবে। আমার মেসোমশাইয়ের একদম সেরে গেছে…
যাবে! সেরে যাবে! হঠাৎ যেন বুকের মধ্যে জল ছলছলিয়ে ওঠে ললিতের। আহা, যদি সত্যিই সেরে যায়!
শাশ্বতীর ছেলেমানুষের মতো সতেজ মুখখানা আত্মবিশ্বাসে কঠিন হয়ে যায়। সে বলে, দেখবেন…
ও-রকমভাবে যদি কেউ চায়, ও-রকমভাবে যদি কেউ বলে তা হলে কীভাবে মরবে ললিত? কীভাবে?
ঠোঁট কেঁপে ওঠে ললিতের। চোখে জল এসে যায়। দুর্বলতা! কই, এতকাল তো এ রকম দুর্বল লাগেনি নিজেকে?
নিজেকে সামলে নেয় ললিত। একটু চোরা-হাসি হেসে বলে, শুনলাম আপনার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে!
শাশ্বতী ভ্রূ তোলে, আমার! সে কী?
শুনেছি। ললিত শ্বাস ছাড়ে। মৃদুস্বরে বলে, খুব আনন্দের খবর।
শাশ্বতী বুঝতে না পেরে বলে, কার কাছে শুনলেন? কার সঙ্গে ঠিক হল আমার বিয়ে?
ললিত একটু সন্দেহের গলায় বলে, আদিত্য বলছিল, আপনার কে এক বন্ধু, রাকা না কী যেন নাম, তার দাদার সঙ্গে।
শাশ্বতী থমকে যায়। সুমন্তর কথা তার মনেই ছিল না। কিন্তু সে-কথা কী করে আদিত্য জেনেছিল! সে-কথা কেন এল ললিতের কানে!
বড় লজ্জা করল শাশ্বতীর। সুমন্তর সঙ্গে সে একা গিয়েছিল গঙ্গার ঘাটের রেস্তরাঁয়, কথা বলেছিল অনেক। প্রশ্রয় দিয়েছিল। কিন্তু এ-কথা সে কাকে বোঝাবে যে দু’ দিন আগেও সে ছিল বড় ছেলেমানুষ! সে কি ছাই বুঝতে পেরেছিল তার মন? এখন মনে মনে শাশ্বতী ক্ষমা চাইল, তোমাদের কাউকে যদি দুঃখ দিয়ে থাকি, তবে ক্ষমা কোরো। আমি বড় বোকা মেয়ে। আমাকে ক্ষমা কোরো।
মুখ নিচু করে শাশ্বতী বলল, ওটা ভুল খবর। ওই ভদ্রলোক চেয়েছিলেন, কিন্তু আমি চাইনি।
কে জানে কেন, কথাটা শুনে হঠাৎ বুক হালকা লাগে ললিতের। এক দুর্বোধ্য আবেগে বুক ভেসে যেতে থাকে। সে অপলক চোখে তার সামনে জীবন্ত, তরতাজা এক দৃশ্য দেখে। ঘন চুলের ভিতর থেকে ঝিকমিক করছে কানের রিং, পরনে কালো-হলুদে মেশানো সুন্দর একখানা জয়পুরি শাড়ি, নিকোনো উঠোনের মতো পরিষ্কার ব্রণহীন মুখখানা। এখন যদি ললিত ওকে ভালবাসার কথা বলে! তবে কি ও লাজুক মুখ নামিয়ে সম্মতির হাসি হাসবে?
আত্মবিস্মৃত ললিত মুহূর্তকাল পরে নিজের সংবিতে ফিরে এল। শোষ-কাগজের মতো এক বিষাদ হঠাৎ শুষে নিল তার হৃদয়। সে চোখ ফিরিয়ে নিল।
শাশ্বতী মৃদুস্বরে বলল, শুনুন, আমার একটু কথা আছে।
কী
শাশ্বতী ইতস্তত করে বলে, আপনার বন্ধুকে আমি অনেক দুঃখ দিয়েছি। ওকে একটু বুঝিয়ে বলবেন, আমি কোনও দিন ওকে ভালবাসিনি।
ও জানত। অন্য দিকে চোখ রেখে ললিত বলে।
শাশ্বতী একটু চুপ করে থেকে হঠাৎ প্রায় ফিসফিস করে বলল, আমি খুব অন্যায় করেছি, না?
ললিত মাথা নাড়ল। না।
শাশ্বতী বিষন্ন গলায় বলে, ও হয়তো রেগে যাবে। শোধ নেবে। কিন্তু আমার যে কিছু উপায় ছিল না।
কথাটায় ললিত একটু বিচলিত হয়। তারপর সোজা তাকায় শাশ্বতীর দিকে। বলে, আপনি ঠিকই করেছিলেন।
শাশ্বতী মৃদুস্বরে বলে, ওকে একটু বুঝিয়ে বলবেন, ও যেন কোনও পাগলামি না করে। আমার দাদার কাছে শুনেছি, দু’ দিন ও অফিসে আসছে না। বড় ভয় করেছিল শুনে। যদি ও সুইসাইড বা ও-রকম কিছু করে—
ললিত হাসে। মাথা নেড়ে বলে, করবে না। ওকে আমি চিনি। আমি ওর বাড়িতে খবর নিয়েছি। ও কলকাতায় নেই। কিছুদিনের জন্য বেড়াতে গেছে।
শাশ্বতী ছলছলে চোখে বলে, যদি কিছু করে! তা হলে লোকে আমাকে দেখিয়ে বলবে, ওই বাজে মেয়েটাই যত নষ্টের গোড়া। এ-রকমই তো হয়, লোকে না জেনে নিন্দে করে। ওকে বলবেন, আমি খুব সাধারণ একটি মেয়ে, আমার মতো তুচ্ছ একজনের জন্য পাগল হওয়ার মানে হয় না। ও অনেক ভাল মেয়ে পাবে।
ললিত সরল, বোকা মেয়েটির দিকে তাকায়। তারপর বলে, সেদিনকার ব্যাপারটার জন্য আমিই দায়ী। আপনি কোনও বন্ধুর দাদাকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন শুনে আমি রেগে গিয়েছিলাম।
শাশ্বতী একপলক ললিতের মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিয়ে হাসল। বলল, হ্যাঁ, সেদিন আপনাকে খুব ভয়ংকর দেখাচ্ছিল। মাথার চুল উড়ছে, লাল টকটক করছে মুখ, চোখ জ্বলছে— আপনাকেই আমি সবচেয়ে ভয় পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, রেগে গেলে আপনি ভয়ংকর কাণ্ড করতে পারেন। সেই ভয়ে আর-একটু হলে আমি হয়তো সই করে ফেলতুম।
ললিত লাজুক মুখে হাসল। বলল, মানুষ তো নিজের মুখ দেখতে পায় না, সেদিন আমাকে কীরকম দেখাচ্ছিল কে জানে! কিন্তু আমি চেয়েছিলাম বলেই আপনি সই করতেন? আপনার নিজের ইচ্ছের জোর নেই?
শাশ্বতী মৃদুস্বরে বলে, অতগুলো পুরুষ ঘিরে ধরলে ভয় লাগে না! কেমন অচেনা পরিবেশ, রাগী সব মানুষ, আর ওই বিশ্রী দম-আটকানো ঘর! এ-সব থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য হয়তো শেষ পর্যন্ত আপনারা যা বলতেন, তাই করতাম। আমার মাথা গুলিয়ে গিয়েছিল। আপনাদের সেই ব্যান্ডেজ বাঁধা বন্ধু বের করে আনার পরও অনেকক্ষণ আমি বুঝতে পারিনি আমি সত্যিই সই করে এসেছি কি না।
বড় মায়া হয় ললিতের। সে একটু চিন্তা করে আস্তে আস্তে বলল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমিও চাইনি যে, আপনাদের বিয়েটা ওইভাবে থোক। আপনি চলে যাওয়ার পর আমি চেয়েছিলাম যেন আপনি আর ফিরে না আসেন।
বলেই একটু ইতস্তত করল ললিত। বলল, কিন্তু আপনি কি আমাকে বিশ্বাস করছেন?
শাশ্বতী হাসছিল। মৃদু চিকমিকে হাসি। মাথা নেড়ে বলল, বিশ্বাস করেছি। তারপর আচমকা বলল, কিন্তু কেন তা চেয়েছিলেন?
সত্যিই তো! সে কেন চেয়েছিল! তার তাতে কী লাভ? তবু তার মন চায়নি বিয়েটা হোক। বিশেষত ওইভাবে, ধুলোটে এক অফিসঘরে, সরকারি ভাষায় আধুনিক মন্ত্রপাঠ করে। সে চায়নি এই কাটাকাটা মুখের, শ্যামলা মেয়েটির বিয়ে হয়ে যাক। কিন্তু কেন? কী লাভ তার?
ললিত মিনমিন করে শুধু বলল, আমি ভেবেছিলাম, আপনি অন্য কাউকে ভালবাসেন।
সেকথার উত্তর দিল না শাশ্বতী। ব্যাগ আর কলেজের খাতা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল, বলল, এবার আমি যাব।
বিদায়ের সময়ে কেউই জিজ্ঞেস করল না আবার দেখা হবে কি না। কিংবা কবে দেখা হবে!
ফেরার সময়ে বাসে একা একটি মন নিয়ে বসে ছিল শাশ্বতী। কত ভাবল সে। সে শুনেছে, ক্যানসার হলেও কেউ বেঁচে যায়, যেমন তার মেলোমশাই বেঁচে আছেন। ললিত তা হলে কেন মরে যাবে? মৃত্যুর মুখোমুখি ললিত কি এখন বড় একা! একা বলেই মাঝে মাঝে রেগে যায় নিজের ওপর! সেদিন ওকে লক্ষ করেছে শাশ্বতী। একদম পাগলের মতো দেখাচ্ছিল ওকে। ওর মন চাইছিল না, তবু জোর করে শাশ্বতীকে ছুড়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কেন ওর এত অহংকার? কেন শাশ্বতীকে অবহেলা করেছিল? মরে যাবে বলে? মৃত্যুরও কি অহংকার হয়! কিন্তু শাশ্বতীর আর ওর ওপর একটুও রাগ নেই। এখন পুরুষমানুষকে অনায়াসে বুঝতে পারে শাশ্বতী। সেদিন অতসব গন্ডগোলের মধ্যেও ললিতকে সে বুঝে গিয়েছিল।
মাঝে মাঝে শাশ্বতীর ভিতরটা ধক করে ওঠে আজকাল। ও কি মরে যাবে! কেন মরে যাবে! ক্যানসারের তো ওষুধ বেরিয়েছে, শাশ্বতী পড়েছে কাগজে! বেরোয়নি? হ্যাঁ, নিশ্চয়ই বেরিয়েছে। তার মন বলছে। সে জানে।
দুপুরেই ললিতের মা গেল প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি। বুড়িদের আড্ডায় বিন্তি কিংবা লুডো খেলতে খেলতে বলল, কেমন সুন্দর লক্ষ্মীমন্ত একটা মেয়ে এসেছিল আজ তাদের গরিবের ঘরে। ওই মেয়েই হয়তো আসছে একদিন বউ হয়ে।
সারা ঘর খুঁজে দেখে ললিত। শাশ্বতী কিছু কি ফেলে গেছে! যার জন্য সে আবার কখনও ফিরে আসবে এই ঘরে! না, কিছুই না। ললিত স্থির হয়ে দাঁড়ায়। বিড়বিড় করে প্রশ্ন করে, কোনও দিন আসবে না আর!
তারপর সংবিৎ ফিরে পায়। বিন্দু বিন্দু জলের মতো এইসব পার্থিব দুর্বলতা লেগে আছে তার গায়ে। সে একদিক, সব জলকণা ঝেড়ে ফেলে মায়াবি হাঁসের মতো উড়ে যাবে।
উড়ে যাবে! ফিরবে না আর! দেখবে না অপরাহ্নের উঠোনে সেই অদ্ভুত হলুদ আলোটি! সতেজ পেয়ারাপাতায় শিশুর মুখের ছবি! মানুষের মুক্তির কথা ভাববে না আর। ভালবাসবে না!
কেবলই কি জড়বস্তু থেকে জন্ম নিয়ে জড়ে ফিরে যাওয়া! কিছু নেই আর! হায়, তবু কেন যে কেবলই মনে হয় ললিতের, এখনও তার জীবন অপরিমেয় বাকি রয়ে গেছে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন