পঞ্চদশ অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

পনেরো

পরদিনই কলেজে রাকা শাশ্বতীকে ধরল, আমার দাদাকে কেমন লাগল বল।

উদাসীন গলায় শাশ্বতী বলে, ভালই তো।

দাদা বলেছে তোর সঙ্গে একটা সিরিয়াস কথা আছে ওর। শিগগিরই এক দিন গাড়ি নিয়ে আসবে। আমরা গঙ্গার ঘাটে যাব তোকে নিয়ে। হ্যাঁরে তোদের কী কী কথা হল কাল?

শাশ্বতী কেমন ঠান্ডা বোধ করে নিজেকে। কথা বলতে ইচ্ছে হয় না।

থার্ড পিরিয়ডে ক্লাস ছিল না। শাশ্বতী কমনরুমের জানালার কাছে বসে খাতায় হিজিবিজি মুখ আঁকছিল, যেমন সে প্রায়ই আঁকে। এমন সময় শিবানী এসে ডাকল, এই।

শাশ্বতী মুখ ফিরিয়ে তাকায়।

শিবানী চোরাহাসি হেসে বলল, তোর তিনি এসে দাঁড়িয়ে আছেন গাছতলায়। শিগগির যা।

শাশ্বতী অবাক হল না। আজ আদিত্য আসবে, এমনটা সে আশা করেছিল। প্রায়ই অফিস থেকে পালিয়ে আসে।

অন্য দিনের মতো চমকে উঠে ছুটল না শাশ্বতী। খুব গড়িমসি করে খাতা বন্ধ করল, দাঁড়িয়ে ঠিকঠাক করল শাড়ি, কপাল থেকে সরাল কয়েক কুচি চুল। বুকের মধ্যে অকারণে একটু ধকধক করছে আজ। হয়তো সে আদিত্যর চোখে বেশিক্ষণ চোখ রাখতে পারবে না।

গাছের ছায়ায় আদিত্য দাঁড়িয়ে আছে। গালের দাড়ি পরিষ্কার কামানো, পাটভাঙা ধুতি আর সাদা শার্ট পরনে, চুল আঁচড়ানো। এরকম পরিচ্ছন্ন তাকে বড় একটা দেখা যায় না। যেদিন দাড়ি কামায় সেদিন ময়লা জামা পরে সে, যেদিন পরিষ্কার জামা-কাপড় পরে সেদিন চুল আঁচড়াতে ভুলে যায়। আজ সবকিছু একসঙ্গে করেছে সে। কাছে গিয়ে এমনকী পাউডারের একটু মৃদু গন্ধও পেল শাশ্বতী।

আদিত্য হাসে না, তার মুখ গম্ভীর। বলে, কাল কোথায় গিয়েছিলে?

একজন বন্ধুর সঙ্গে, রেডিয়ো স্টেশনে। শাশ্বতী চোখ নিচু করে বলে।

শুনলাম একটা গাড়িতে একটি ছেলে আর একটি মেয়ের সঙ্গে গেছ। ছেলেটি কে?

জবাবদিহি চাইবার সুরটা তার ভাল লাগে না, তবু শান্ত গলায় বলে, ও রাকার দাদা সুমন্ত।

খুব জরুরি কাজে গিয়েছিলে?

না। এমনিই, সঙ্গ দিতে।

একটু চুপ করে থাকে আদিত্য। মাথার পাট করা চুল থেকে একটা ঘুরলি আঙুলে পাকায়, তারপর হঠাৎ খুব অদ্ভুত গলায় বলে, কাল তোমার দেখা পেলে আমার একটা সর্বনাশ হত না।

শাশ্বতী চকিত চোখ তুলে আদিত্যকে দেখে। বলে, কী সর্বনাশ?

শ্বাস ফেলে আদিত্য বলে, বলব। এখানে তো বলা যাবে না। চলো কোথাও গিয়ে বসি।

শাশ্বতী ইতস্তত করে বলে, এস-বি’র ক্লাসটা রোজ কামাই হচ্ছে। ক্লাসটা করে যদি—

অধৈর্য হয়ে তাড়া দেয় আদিত্য, আঃ! বলছি জরুরি কথা আছে!

একটু কেঁপে ওঠে শাশ্বতী। আদিত্য এমন ধমকাতে পারে জানত না।

আদিত্য আবার ধমকায়, কী! যাবে?

শাশ্বতী মৃদু স্বরে বলে, চলো।

বালিগঞ্জ স্টেশনে যাওয়ার রাস্তায় বাঁ হাতি একটা রেস্টুরেন্ট আছে তাদের। প্রায়ই এখানে আসে তারা।

আদিত্য বসে অনেকক্ষণ মুখ নিচু করে রইল। শাশ্বতী প্রশ্ন করল না। কিন্তু তার বুকের ভিতরটা ধকধক করছিল ঠিকই।

আদিত্য আস্তে করে বলল, আমি চাকরি ছেড়ে দিচ্ছি সতী। বাবার ব্যবসায়ে নামব। কাল রাতে সব ঠিক হয়ে গেল।

শাশ্বতী বড় অবাক হয়। এ রকম কথা ছিল না তো! বরং শাশ্বতীর ধারণা ছিল, বাবার ব্যবসাকে ঘেন্না করে বলেই একদিন আদিত্য জোর করে চাকরি নিয়েছিল। তারপর শাশ্বতীর সঙ্গে প্রেম করার সময়েই আদিত্য বুঝতে পেরেছিল যে, কোনও দিনই শাশ্বতীকে তাদের বাড়ির লোক নেবে না। কাজেই, শাশ্বতীকে নিয়ে আলাদা ঘর বাঁধবে আদিত্য। সেইজন্যই চাকরিটা আদিত্যর খুব দরকার। এখন বাবার সঙ্গে ব্যবসায়ে নামলে পরিবার ভেঙে আলাদা হয়ে আসতে পারবে কি আদিত্য? বামুনের মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে গেলে মেনে নেবে কি ওর বাবা? না কি অত ভেবে দেখেনি আদিত্য!

শাশ্বতী এতসব প্রশ্ন করল না। একটু ধারালো গলায় বলল, ভালই তো। তোমার বাবাও এই চেয়েছিলেন। তুমিও সুবোধ ছেলের মতো কাজ করছ। এবার বাবার পছন্দমতো একটা বিয়ে করে ফেলো।

আদিত্য হঠাৎ রেগে যায়, এখনও তুমি সবটা শোনোনি। বাবার ব্যবসায়ে নামলে আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারব না ভাবছ?

শাশ্বতী আদিত্য চোখে চোখ রাখে। শান্ত গলায় বলে, আমাকে তো তোমাদের পরিবার নেবে না! বিয়ে করলে তোমাকে আলাদা থাকতে হবে। বাবার ব্যবসায়ে তুমি পরিবার ভেঙে আসবে কী করে?

আদিত্য ভীষণ অস্থিরভাবে মাথার চুল টানে, ছটফট করে বলে, সে একটা ব্যবস্থা হবেই। বাবাকে আমি বুঝিয়ে বলব। পায়ে ধরব।

শাশ্বতী হঠাৎ বিদ্রূপে হাসে, বলে, ব্যবসায়ে নামলে তুমি তোমার খদ্দেরদের ‘বাবু’ বলেও ডাকবে তো?

আদিত্য হঠাৎ সোজা হয়ে বসে বলে, ডাকব। তাতে কী? আমার বাপ-ঠাকুরদা ডাকতে পারলে আমি পারব না কেন?

শাশ্বতী হঠাৎ শ্বাস ছেড়ে বলে, তা হলে সত্যিই তোমার সঙ্গে আমার জাত মিলবে না।

শুনে বহুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে গেল আদিত্য। কয়েকবার কথা বলবার চেষ্টা করেও চুপ করে রইল। অনেকক্ষণ পর বিষণ্ণ গলায় বলল, সেইজন্যই তো বলছিলুম কাল আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে। কিন্তু কলেজে এসে কাল যদি তোমাকে পেতুম তা হলে ঠিক একটা রাস্তা খুঁজে বার করতুম।

আদিত্য করুণ মুখে বসে থাকে চুপ করে। শাশ্বতীর করুণা হয় একটু। বলে, কী হয়েছিল কাল?

আদিত্য আস্তে আস্তে বলল, পরশুদিন সেই যে একটা ভুতুড়ে কাণ্ড করলুম তোমার সঙ্গে, তারপর থেকেই নিজের ওপর গেলুম ভয়ংকর রেগে। তুমি মাইরি কাঁদছিলে সেদিন বিকেলে! আমি কী সব যা-তা বলেছিলুম তোমাকে! কিন্তু কী করব সতী, নিজেকে যে আমার ভীষণ সন্দেহ। কখনও ভুলতে পারি না আমি এমন এক বেনের ছেলে, যে পয়সার জন্য একদলের পায়ে ধরতে পারে। আবার পয়সা দিয়েই কিনে নেয় আর-এক দলকে। আমাদের গদিতে গিয়ে দেখতে পাবে বাবা ক্রীতদাসের মতো হাতজোড় করে, ‘বাবু’ ডেকে খুশি রাখছে খদ্দেরদের, চালু রাখছে লাভজনক ব্যবসা। আবার বাড়িতে গিয়ে সেই বাবাকেই দেখতে পাবে গম্ভীর হয়ে বসে আছে শ্বেতপাথরের টেবিলের সামনে জমকালো চেয়ারে, সামনে রুপোর রেকাবে দামি ফল, চাকরবাকর বাতাস করছে তাকে, তাকে খুশি করার জন্য ছোটাছুটি করছে দাস-দাসী, বন্ধকি সোনার গয়না পরে তার পায়ের কাছে বসে আছে মা। আমাদের পরিবারে কেউই বেশিদূর লেখাপড়া শেখে না, অক্ষরজ্ঞান হলেই পড়া ছেড়ে ব্যবসায়ে নেমে পড়ে। তারপর ঠিক ওইরকম ভাবেই শেখে আত্মসম্মান ভাসিয়ে, ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে রোজগার করতে, আর ঘরে এসে দেড়শো বছর আগেকার সামন্তের মতো সেই রোজগারের ফল ভোগ করতে। তুমি তো জানো না, আমার বাবার সেই পুরনো দিনের রীতি অনুযায়ী একজন রক্ষিতা আছেন শোভাবাজারের আলাদা বাড়িতে, যাকে আমরা ‘মা’ বলে ডাকি। এইসবই আমাদের পারিবারিক শিক্ষা। আমি এই রকম এক বেনের বাচ্চা। তাই সবসময়ে সন্দেহ হয় আমার মধ্যে কীসের যেন অভাব থেকে গেল। আমি বি এ এম এ পাশ করেও ললিতের মতো হতে পারলুম না, টাকা থাকা সত্ত্বেও হলুম না রমেনের মতো। ওরা ওদের পারিবারিক শিক্ষার গুণেই আমার চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। ঠিক সেই কারণেই, তোমাকে ভালবাসি কিন্তু ভয়ে ভয়ে থাকি, পাছে কোনও দিন তুমি আমার শিক্ষার অভাব ধরে ফেলো। তাই ললিতের কাছে তোমাকে নিয়ে গিয়েই আমি ভয় পেয়েছিলুম তুমি তো জানো না, কী ভীষণ স্মার্ট ছেলে ছিল ললিত! আমার মতো বেনের বাচ্চাকে ও বানিয়েছিল কমিউনিস্ট। শিখিয়েছিল নিজের পরিবারকে ঘেন্না করতে। সেই কারণেই আমি বাবার ব্যবসায়ে যেতে পারিনি কোনও দিন। এ ললিতের জন্যই। কী যে বিষ ঢুকিয়েছিল ও! সেই ভয়ংকর ললিতের কী যে আকর্ষণ তা আমি জানি। তাই বারবার তোমাকে সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলুম, ললিতকে তুমি কেমন দেখেছিলে।

হঠাৎ শাশ্বতীর বড় ভয় করতে থাকে। ছলাৎ ছল করে তার বুকের ভিতরে লাফিয়ে উঠছে হৃৎপিণ্ড, রক্তের ঝাপটা লাগছে মুখে। এ-সব টের পাচ্ছে না তো আদিত্য?

আদিত্য টের পায় না। সে নিজের কথায় ডুবে থেকেই ম্লান হাসে। বলে, যাকগে সে-সব কথা। সেদিন, অর্থাৎ পরশু, তোমার সঙ্গে ওই কাণ্ড করে যখন বাড়ি ফিরলুম তখন আমার মন-ভৱা বিষ। মনে হচ্ছিল তুমি আমাকে ভালবাসে না। ভালবাসো না, কারণ আমি ললিত বা রমেনের মতো নই, আমি এক আলাদা নিচু জাতের লোক। সেজন্য দায়ী আমার পরিবার। আমার বাবা, মা, আমাদের এই বিশাল দুর্গের মতো বাড়িটা। তাই সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে আমি সে-সবকিছুর ওপর রেগে গেলুম। বাবা তখন সদ্য রুপোর রেকারে কাটা ফল-টল নিয়ে জল খেতে বসেছে, পিছনে পাখা-হাতে চাকর, চারদিকে দাসদাসী, সেই অবস্থাতে আমি তার সামনে গিয়ে বললুম, আপনি লেখাপড়া শেখেননি কেন? শুনে লোকটা হাঁ হয়ে গেল। তারপর তুমুল কাও। পরশু রাতেই বাবা বাড়ি থেকে বের করে দিল। আমি সারা রাত ফাঁকা আস্তাবলে বসে মশা তাড়িয়ে কাল সকালে বেরিয়ে এসেছিলম। ভেবেছিলুম আর ফিরব না। কিন্তু সতী, কালই প্রথম বুঝতে পারলুম আমি বড় দুর্বল অসহায়, এত বড় কলকাতা শহরে আমি একটা যাওয়ার জায়গা ঠিক করতে পারলুম না। বন্ধুর মেসে কলাইকরা থালা দেখে খেতে পারলুম না, ওর বিছানায় শুতে গিয়ে ঘামের দাগ দেখে ঘেন্না হল। বুঝলুম আমি অভ্যাসের দাস হয়ে গেছি। ওই দুর্গের মতো বাড়ির বাইরে সর্বত্র আমি পঙ্গু, অনুপযুক্ত। তোমার কাছে এলুম দুপুরে, তখন স্নান হয়নি, খাওয়া নেই। কিন্তু তোমাকে দেখলেই আমার অনেকটা সাহস ফিরে আসত। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তুমি কাল ছিলে না। গড়িয়াহাটায় দাঁড়িয়ে যখন সন্ধে পার হয়ে গেল তখন রাতের কলকাতা বিপুল এক ভয়াবহ অচেনা জায়গা বলে মনে হয়েছিল। আমি ললিত বা তুলসীর কাছে যেতে পারতুম, কিংবা সঞ্জয়ের কাছে, কিন্তু কোথাও যেতে ইচ্ছে করল না। মনে হল ওরা সবাই এক আলাদা জাতের মানুষ, ওরা স্কুল-কলেজের বন্ধু বটে কিন্তু ওদের সঙ্গে আমার জাত মেলে না। ভেবে দেখলুম, আমি বাড়ি ছেড়ে এসে ভুল করেছি। ও-বাড়ির বাইরে আমি এক একঘরে। তাই রাতে আবার লজ্জার মাথা খেয়ে, সম্মান বিসর্জন দিয়ে ফিরে গেলুম বাড়িতে। সবাই বুকে টেনে নিল। মা শিখিয়ে দিল, বাবুর পায়ে ধরে ক্ষমা চা।

চাইলে? শাশ্বতী উগ্র আগ্রহে জিজ্ঞেস করল।

হাসল আদিত্য। বলল, সেই ছেলেবেলার পর থেকে বাবাকে কখনও আর প্রণাম করিনি। ঘেন্না করত। কাল পায়ে ধরলুম। বাবা বুকে টেনে নিল। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে গল্প করল আমার সঙ্গে। বলল, পরিবারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে কেউ শান্তি পায় না। বলল, পারিবারিক জীবিকার চেয়ে সম্মানজনক আর কিছু নেই। আমি অনেক রাত পর্যন্ত ভাবলুম। অনেক ভাবলুম আমি। দেখলুম, ও-বাড়িতে থাকতে গেলে অন্য রকম এক মানুষ হয়ে, বাইরের মানুষের মতো হয়ে থেকে লাভ নেই। তাতে আমার মনুষ্যত্বের কোনও উন্নতি হবে না, আর পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক হবে ক্রমেই বিষাক্ত। তার চেয়ে আমি বরং এখন এই পরিবারেরই একজন হয়ে উঠি। আমার একটু শিক্ষাদীক্ষা আছে, ভাল বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গ পেয়েছি আমি, কাজেই আস্তে আস্তে আমি হয়তো একদিন এই পরিবারে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পারব। ব্যবসাকে করে তুলতে পারব সম্মানজনক লেন-দেন। আমার ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখবে, নিজেদের সম্মান দিতে শিখবে, মানুষের মূল্য দিতে শিখবে। তারা কেউ বন্ধকি সোনার গয়না পরবে না, একই সঙ্গে দু’দলের সঙ্গে ‘হুজুর’ এবং চাকরের সম্পর্ক বজায় রাখবে না, তারা হবে না টাকায় কেনা মানুষ। এইরকম সব অনেক ভাবলুম আমি। শেষে অনেক রাতে বাবাকে বললুম, আমি ব্যবসায়ে নামব। সতী, আমি এই সর্বনাশটুকু করে ফেলেছি। এখন বলো, আমি ঠিক করেছি কি না!

শাশ্বতী মাথা নিচু করে ছিল। টেবিলের কাচে আঙুল দিয়ে আঁকছিল মানুষের মুখ। কথা বলল না।

অধৈর্য আদিত্য ঝুঁকে তার হাত ধরতে গেল। শাশ্বতী চট করে তুলে নিল হাত। বলল, প্রশ্নটা তো থেকেই যাচ্ছে।

কী প্রশ্ন?

আমি।

একটু চুপ করে থেকে শাশ্বতী বলল, আমাকে নিয়েই আবার তোমাদের পরিবারে গোলমাল দেখা দেবে, বাবার সঙ্গে ঝগড়া হবে তোমার। তাঁরা অসবর্ণ বিয়ে মানবেন কেন?

আদিত্য ছেলেমানুষের মতো বলল, আমি বাবাকে রাজি করাবই।

যদি রাজি না হন?

আদিত্য একবার বলতে যাচ্ছিল, তা হলে আমি চাকরি ছাড়ব না। ব্যবসা ছাড়ব। কিন্তু বলার আগে সে একটু ভাবল। ভাবতে লাগল।

ভাবতে ভাবতে কয়েক দিন কেটে গেল আদিত্যর। আবার তার চুল হয়ে গেল এলোমেলো, রুক্ষ, জামার কলার উলটে থাকে, দাড়ি কামানো হয় না। অন্যমনস্কভাবে অফিসে যায়। চেয়ারে বসে থাকতে পারে না, ঘুরে বেড়ায় এ-টেবিল ও-টেবিল। ক্যান্টিনে গিয়ে চা নিয়ে একা বসে থাকে অনেকক্ষণ। অফিস থেকে বেরিয়ে অনেক দুর হাঁটে। তিন-চারদিন সে শাশ্বতীর সঙ্গে দেখা করল না।

ওদিকে শাশ্বতী মাঝে মাঝে একা তার খাতা খুলে বসে। একটা ধারালো তীক্ষ্ণ নাকবিশিষ্ট মুখ সে কয়েক দিন ধরে আঁকার চেষ্টা করছে। পারছে না।

এ দিন ফাস্ট পিরিয়ড শেষ করে ইকনমিক্সের ক্লাসে যাচ্ছে শাশ্বতী, এমন সময়ে রাকা এসে ধরল, আজ দাদা আসবে। সাড়ে চারটেয় টাইম দিয়েছে। আজ কিন্তু আমি যাব না, তুই একা যাবি। দাদার সিরিয়াস কথা আছে তোর সঙ্গে।

খুব অবাক হল শাশ্বতী। বলল, কে আসবে বললি?

রাকা থমকে যায়, ভ্রূ তুলে বলে, ও মা, দাদাকে ভুলে গেছিস নাকি?

সত্যিই শাশ্বতী ভুলে গিয়েছিল। ওই খুব রূপবান যুবকটিকে তার একদম মনে ছিল না। বোধহয় সুমন্তর রূপের মধ্যে মনে রাখার মতো কিছু নেই। সে কেবল সুন্দরমাত্র কিন্তু তা পথ আটকে ধরে না। তার দিকে একবার তাকিয়ে চলে যাওয়া যায়। তাই শাশ্বতী ভুলে গিয়েছিল।

শাশ্বতী মুখে বলল, ওঃ। কিন্তু আজ আমার বড় কাজ আছে। আজ সময় হবে না।

সে কী! দাদা যে খুব আশা করে আসবে!

শাশ্বতী ইতস্তত করে। সে বড় নরম মেয়ে। সহজ কৌশলগুলো সে প্রয়োগ করতে জানে না। অসহায়ভাবে বলে, কী করব তা হলে?

ও-সব কাজফাজ বাদ দে। একাজটা অনেক জরুরি। আজ খুব সম্ভব দাদা তোর কাছে প্রপোজ করবে।

কেমন অবশ লাগল শাশ্বতীর। খিল ধরে এল হাত-পা।

কমনরুমে এসে সে একা একা ছটফটে মন নিয়ে বসে রইল, ইকনমিক্সের ক্লাসে গেল না। এলোমেলো ভাবনায় ভেসে যেতে লাগল সে। বুক কাঁপতে থাকল, ঘাম দিল শরীরে। এখন সে কী করবে!

দুপুরে যখন টিফিন ক্যারিয়ারটি হাতে নিয়ে বেরোতে যাচ্ছিল ললিত, ঠিক সেইসময়ে আদিত্য গিয়ে হাজির। উদ্‌ভ্রান্তের মতো চেহারা, চোখের দৃষ্টি অস্থির, মুখ শুকিয়ে গেছে।

ললিত বলল, কী রে! অফিস নেই?

আদিত্য দু’হাত বাড়িয়ে ললিতের কাধ ধরে বলল, লোলিটা, আমার কয়েকটা কথা শুনবি? খুব জরুরি কথা!

এমনিতে আদিত্য খুব হাসি-খুশি, আমুদে। তাই ওর রোগা শুকনো গম্ভীর চেহারাটা দেখে ঘাবড়ে গেল ললিত। বলল, আয়, ভিতরে আয়।

আদিত্য ভিতরে এসে প্রথমেই সটান বিছানা নিল। উপুড় হয়ে শুয়ে রইল অনেকক্ষণ। ললিত ওকে ডাকল না। অপেক্ষা করতে লাগল। তারপর ওর পাশে বসল। গায়ে হাত দিয়ে ডেকে বলল, এই, কী কথা বলবি যে!

ডাকতে গিয়েই ললিত টের পেল, আদিত্য কাঁদছে। খুব মৃদু শরীর কাঁপছে তার। মুখ ঢেকে রেখেছে। তবু কান্না ললিত চেনে।

সে বিহ্বল বোধ করে বোকার মতো বসে রইল একটুক্ষণ। তারপর আবার ডাকল, কী হয়েছে বলবি তো! এই আদিত্য—

আদিত্য উত্তর দিল না। অনেকক্ষণ ওইভাবে শুয়ে রইল।

মা ঘরে এসে চোখ কুঁচকে বলল, ওটা কে রে শুয়ে! ললিত, ও কে?

ললিত মাকে ঘর থেকে পাচার করার জন্য উঠতে যাচ্ছিল, সে সময়েই আদিত্য মুখ ফেরাল। ম্লান একটু হেসে বলল, মাসিমা, আমি আদিত্য। একটু চা খাওয়াবেন মাসিমা?

মা হাসে, তোর হয়েছে কী, শুয়ে আছিস যে! দেখে এমন চমকে গিয়েছিলুম। উঠে বোস, আমার উনুনে এখনও আঁচ আছে, চা করে দিচ্ছি।

উঠে শোকতাপা মানুষের মতো হাঁটু জড়ো করে তার ওপর মুখ রেখে বসল আদিত্য। বলল, লোলিটা, সতী আমাকে ভালবাসে না।

শুনে স্তব্ধ হয়ে রইল ললিত। এতক্ষণ তার অবচেতন মন এইটাই প্রত্যাশা করছিল।

একটু সময় নিল ললিত। তারপর বলল, কী করে বুঝলি?

আদিত্য তেমনি বসে থেকে উদাসী গলায় বলে, ওর সঙ্গে আমার জাত মিলছে না।

একটু অবাক হয়ে ললিত বলে, এত দিন প্রেম করে এখন তোর শাশ্বতী জাতের কথা তুলেছে?

না-না। ও বরং উলটোটাই বুঝিয়েছিল। আমিই প্রথম জাতের কথা তুলেছি।

ললিত মৃদুস্বরে বলে, তা হলে তই জাত মানছিস আদিত্য? কেন রে, এত দিন পর হঠাৎ জাতের চিন্তা কেন?

আদিত্য দীন ভঙ্গিতে তার হাঁটুর ভিতরে মাথা গুঁজে দিয়ে বলে, আমি বেনের বাচ্চা, আমি আমার বাপ-দাদাদের মধ্যে প্রথম গ্র্যাজুয়েট। আমার বংশের কালচারের সঙ্গে ওদের মেলে না। আমাদের জাত আলাদা।

শুনে বড় কষ্ট হল ললিতের। আদিত্যর এই দুর্বল দিকটার কথা ললিত অনেক দিন ধরে জালে। বাইরে থেকে বোঝা যায় না, কিন্তু ভিতরে ভিতরে আদিত্যর বড় দুর্বলতা রয়ে গেছে নিজের পরিবারকে নিয়ে।

ললিত স্নেহের একখানা হাত বাড়িয়ে আদিত্যর মাথায় রাখল। বলল, কী হয়েছে খুলে বল। তোদের কি ঝগড়া হয়েছে?

একটু ভেবে আদিত্য বলল, ঠিক ঝগড়া নয়, তবে অনেকটা ও-রকমই।

কী নিয়ে?

আদিত্য শ্বাস ফেলে বলল, প্রথমে শুরু হয়েছিল তোকে নিয়ে।

আমাকে! ভীষণ অবাক হয় ললিত।

তোকে নিয়েই প্রথম জাতের কথা উঠেছিল। যেদিন তোর কাছে সতীকে নিয়ে আসি সেদিনই আমি লক্ষ করেছিলুম যে তোর সঙ্গে ওর জাত মেলে। আমার সঙ্গে মেলে না।

তার মানে? ললিত ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে।

ধপ করে আবার শুয়ে পড়ে আদিত্য। বলে, কী জানি, আমি কিছুই গুছিয়ে বলতে পারি না। লোলিটা, তুই রাগ করিস না। আমার মনটা ঠিক নেই। আমি কেমন যেন হয়ে যাচ্ছি।

ললিত চুপ করে থাকে।

মা চা দিয়ে গেল। বলল, ভাত খেয়ে বেরিয়েছিস তো?

হ্যাঁ, মাসিমা।

তারপর বসে চায়ে চুমুক দিয়ে, যেন বড় স্বাদ পেয়ে, চোখ বুজল আদিত্য। বলল, কয়েক দিনে অনেক নাটুকে কাণ্ড হয়ে গেছে। আমি চাকরি ছেড়ে বাবার ব্যবসাতে নামছি। তাতেই সতীর সঙ্গে আরও গোলমাল পাকিয়ে গেছে। এবার ও নিজেই বলছে যে, ওর সঙ্গে আমার জাত মিলবে না।

আদিত্য একটু দম ধরে থেকে তারপর বলে, আরও একটা ব্যাপার আছে। মাঝখানে একদিন সতী তার এক বন্ধু আর বন্ধুর দাদার সঙ্গে রেডিয়ো স্টেশনে গিয়েছিল। কেন গিয়েছিল আমি জানি না। সেদিনই কলেজে ওকে খুঁজতে গিয়ে আমি পাইনি। কিন্তু আবছাভাবে আমার পরে মনে পড়েছে, যখন ওর কলেজের কাছে বড় রাস্তা থেকে বাঁক নিয়ে ঢুকছিলুম, তখন উলটো দিক থেকে একটা সাদা রঙের গাড়ি খুব ধীরে ধীরে আমাকে পার হয়ে গেল। তখন আমার মন খুব অস্থির ছিল, স্পষ্ট করে দেখিনি, তবু পরে আমার মনে হয়েছে, গাড়ির সামনের সিটেই ওরা তিন জন ছিল। একটি সুন্দরমতো ছেলে, তার পাশে একটি মেয়ে, আর জানলার ধারে সতী। আমার মনে হয়, সেদিন সতী আমাকে দেখতে পেয়েছিল, কিন্তু ডাকেনি। পরে সতী আমাকে নিজেই বলেছে সেদিন সে কোথায়, কার সঙ্গে গিয়েছিল। কিন্তু বলেনি যে, সেদিন গাড়ি থেকে সে দেখেছিল আমায়।

না-ও দেখতে পারে।

আদিত্য দৃঢ় মুখে মাথা নেড়ে বলে, আমি সিওর। ও আমাকে দেখেছিল। ডাকেনি।

একটু শ্বাস ছেড়ে আদিত্য বলে, আজ একটু আগেই আমি ওর কলেজে গিয়েছিলাম। বকুল গাছটার তলায় আমি রোজ দাঁড়াই ওর জন্য। সেখানে দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময়ে শিবানী নামে ওর এক বন্ধু চানাচুর কিনতে এসে আমাকে দেখে একটু হেসে এগিয়ে এল। শিবানী মেয়েটা সতীর বাসার কাছেই থাকে, একটু বেশি কথা বলে আর কী, আমার সঙ্গেও আলাপ আছে। শিবানী নিজেই যেচে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমাকে বলল, ওদের রাকা নামে কে এক বন্ধু আছে, তার দাদার সঙ্গে নাকি বিয়ের কথা চলছে সতীর। সতী রাজিও হয়েছে। রাকা নিজেই বলেছে শিবানীকে। আমার মনে হচ্ছে, এই রাকা আর রাকার দাদাই সেই গাড়িওলা পাটি। শিবানীর কাছে এ-সব শুনে আমি আর দাঁড়াতে পারলাম না। সতীর সঙ্গে দেখা না করেই সোজা চলে এসেছি তোর কাছে।

হঠাৎ ললিতের শরীরের মধ্যে বিদ্যুৎ খেলে যায়। থর থর করে কেঁপে ওঠে সে। রাগে, ঘেন্নায়, আক্রোশে। কেন এমন হবে? কেন এমন হতে থাকবে?

সে হাত বাড়িয়ে আদিত্যর হাত চেপে ধরে বলল, তুই ছাড়বি কেন? ছাড়িস না আদিত্য। হয়তো তোর ভুল হচ্ছে। আর যদি ভুল না হয়ে থাকে, তবে—

আদিত্য ক্লান্তমুখে বলে, তবে কী?

তবে তোকে আজই বিয়ে করতে হবে। রেজিষ্ট্রি।

আদিত্য অবাক চোখে চেয়ে থেকে বলে, কী বলছিস!

একটা সময়ে ললিতের মাথা যন্ত্রের মতো কাজ করত। যখন ইউনিয়নের গোলমাল, কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দাবি-আদায়ের বৈঠক কিংবা এ-রকমই কোনও কাজের চাপ পড়ত, তখন সংকটের মুখে অন্ধ-কষা যন্ত্রের মতো নির্ভুল কাজ করত তার মাথা। তার মুখে কয়েকটা নিষ্ঠুর লাইন জেগে উঠেছে, চকচক করছে উগ্ৰ চোখ। সে আদিত্যর কথার উত্তর না দিয়ে হাত বাড়িয়ে তাকে টেনে তুলল, বলল, ওঠ, এখন অনেক কাজ করতে হবে।

আদিত্য বোকার মতো উঠে দাঁড়িয়ে বলে, কীসের কাজ! তুই কী করতে চাস?

ললিত সংক্ষেপে বলল, আজই রেজিষ্ট্রি। আর দু’-তিন ঘণ্টার মধ্যে।

আদিত্য আবার বসে পড়ে, দূর! তা হয় না। সতী রাজি হবে না।

হতে হবে।

লাভ কী? ও আমাকে ভালবাসে না।

তোকে সে-কথা বলেছে?

না। কারণ, সতী সেটা নিজেও এখনও জানে না। কয়েক দিনের মধ্যেই ও টের পাবে যে ও আমাকে ভালবাসে না।

এত দিন বাসল কী করে? এটা কি ইয়ার্কি?

আদিত্য অন্যমনস্ক চোখে ললিতকে একটু দেখল। তারপর বলল, না, ইয়ার্কি নয়। ললিত, শোন একটা ছোট গল্প। আমাদের বাড়ির মেয়েদের তো জানিস, গায়ে তাদের রোদ লাগে না। সেই আমাদের বাড়ির মেয়ে, আমার খুড়তুতো বোন মান্তু একবার প্রেমে পড়েছিল কালো ন্যাংলা মতন একটা ছেলের। সে-ছেলেটা আমাদের বাড়িতে খবরের কাগজ দিত। কোনদিন কোন ভোরবেলায় বোধহয় মান্তু দোতলার চিকের ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরেছিল, আর সে সময়েই ছেলেটা সাইকেলে বসে খবরের কাগজ ছুড়তে যাচ্ছিল বারান্দায়, সেই সময়েই তারা দু’জন দু’জনকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল। তারপর রোজ ও রকম দেখা হতে লাগল তাদের। আমরা কিছু জানতুম না। শেষ পর্যন্ত সেই ন্যাংলা ছেলেটার জন্য মান্তু একদিন মাঝরাতে ছাদ থেকে দড়ি ঝুলিয়ে নেমে পালানোর চেষ্টা করেছিল। আমরা ধরে ফেললাম। কাকা তাকে জুতোপেটা করে ঘরে তালা দিয়ে রাখল। ভারী আশ্চর্য হয়েছিলুম আমরা, আমাদের মতো বাবুদের বাড়ির মেয়ে কী করে ও-রকম একটা ছেলেকে পছন্দ করে! কিন্তু এখন বুঝি সেটা পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার নয়। সেটা কেবল একটা রহস্য ভেদ করার আগ্রহ। চারদিকে যা-সব প্রেম-ট্রেম দেখি তার অধিকাংশই পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার নয়, তার মধ্যে শ্রদ্ধা ভক্তি ভালবাসা নেই, আছে ওই রহস্যভাঙা, আছে রোমহর্ষ। হাতের কাছে যাকে পাওয়া যায় তাকেই সই। বাঙালি মেয়েরা তো খুব একটা পুরুষমানুষ দেখে না! সতীও তাই। ঘরকুনো, পুরুষ দেখলে উপায়। আমিই ছিলুম ওর প্রথম পুরুষ। আমাকে নিয়েই ওর রহস্য ভেঙেছে। ও কোনও দিন ভালবাসেনি আমাকে। বাসবেই বা কেন। ওর সঙ্গে কি আমার জাত মেলে?

আদিত্য ম্লান হাসে, নিজেকে সেই হকার ছেলেটার মতো লাগছে আমার। সেই ছেলেটা হয়তো পরে রোজ এসে দূর থেকে আমাদের দোতলার বারান্দার দিকে চেয়ে থাকত। দেখত খালি বারান্দা, ভোরের বাতাসে কেবল চিকটা দুলছে।

ললিত থরথর করে কাঁপে। তার শরীর দুর্বল, পা কাঁপে, মাথা টলমল করে। প্রবল রাগে খ্যাপাটে গলায় সে বলে, নতুন বা পুরনো কোনও বর্ণাশ্রম আমি মানি না। আমি সব ভেঙে দিয়ে যাব। ওঠ।

লোলিটা, তুই খেপে গেছিস।

ললিতের দুটো চোয়াল বদ্ধমুষ্টির মতো ফুলে ওঠে। সে কেবল বলে, ওঠ। আর-একটু পরেই তোর রেজিস্ট্রেশন।

আদিত্য মাথা নিচু করে ভাবে।

ললিত তাড়া দেয়, কী হল!

ও রাজি হবে না। দেখিস।

হবে। আমি রাজি করাব।

কাজটা ঠিক হবে না।

না হোক। তবু করতেই হবে।

আস্তে আস্তে ললিতের উদ্ধত, ফণাতোলা চেহারার সামনে আদিত্য নরম হয়ে আসে। ভ্রূ কুঁচকে একটু ভাবে। গম্ভীর দেখায় তাকে। তারপর বলে, সাক্ষী কে হবে?

আমি হব। আর দু’জন জোগাড় করছি।

আর বিয়ের নোটিশ?

আমার চেনা রেজিষ্ট্রার আছে। ওটা ম্যানেজ করে দেব।

হঠাৎ যেন দমকা হাওয়ায় আদিত্যর সব বিষণ্ণতা উড়ে যায়। সে পুরনো দিনের মতো হাসে। বলে, তুই খুব ডেঞ্জারাস।

ললিত সে-কথার উত্তর দেয় না। আপন মনে কী যেন একটু বিড় বিড় করে। হয়তো নিজের ব্যর্থতাগুলির কথা নিজেকে শোনায়। হয়তো প্রতিশোধের কথা নিজেকে মনে করিয়ে দেয়।

বিমানের ঘরের দরজা খোলা ছিল। চোখের ওপর হাত চাপা দিয়ে শুয়ে ছিল সে। তাদের পায়ের শব্দে চোখ খুলে উঠে বসল, এসো। আমি সময় গুনছিলাম। খুব খিদে পেয়েছে।

ললিত আদিত্যকে দেখিয়ে বলল, একে চেনো?

একপলক আদিত্যকে দেখেই বিমান বলল, চিনি। আদিত্য রায়। বাগবাজারে তোমাদের বাড়ি, না?

আদিত্য হাসল, তুমি সব মনে রেখেছ!

আমি সবাইকেই মনে রাখি। কিন্তু আমাকে সবাই ভুলে যায়।

আদিত্য মাথা নেড়ে বলল, কিন্তু আমি ভুলিনি। ললিতকে জিজ্ঞেস করো, তোমার নাম শুনেই চিনেছি। তারপর আদিত্য বিমানের মুখে মায়ের দাগগুলো লক্ষ করে বলে, ইস্‌, ছিনতাই পার্টির লোকেরা তোমাকে খুব মেরেছে তো?

বিমান মৃদু হাসে।

আদিত্য তেজি গলায় বলে, তুমি তাদের পেটে লাথি মারলে না কেন?

মেরেছি। তৃপ্ত স্বরে বিমান বলে।

মেরেছ! সাবাস! বলে আদিত্য হাসে। বিমানের বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে চার দিকে চায়। তার গলায় হাসিঠাট্টার সুর ফিরে আসে। বলে, তুমি মাইরি জ্ঞানী লোক, কত বই তোমার!

মেঝেতে বসে একটা অ্যালুমিনিয়মের থালায় খাচ্ছিল বিমান। কাঙালের মতো বসার ভঙ্গি। তাড়াতাড়ি খাচ্ছে, স্পষ্ট বোঝা যায় ওর খুব খিদে পেয়েছে। ললিত ওকে খানিকটা খাওয়ার সময় দিল। তারপর জিজ্ঞেস করল, তোমার শরীর কেমন?

ভাল। অনেক ভাল।

চলাফেরা করতে পারছ?

বিমান মাথা নাড়ে, হ্যাঁ।

একটা কাজ করতে পারবে?

কী?

একটা বিয়ের সাক্ষী দেবে? রেজিষ্ট্রি বিয়ের?

বিয়ে! কার? বিমান অবাক চোখে তাকায়।

আদিত্য একটু হেসে বলে, আমার। মাই ম্যারেজ টু-ডে।

যাবে? ললিত আবার বিমানকে জিজ্ঞেস করে।

বিমান হাসে। ঘাড় নেড়ে বলে, যাব। কখন?

আমরা একটু পরে এসে তোমাকে ট্যাক্সিতে তুলে নিয়ে যাব।

বিমান মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়, বলে, বাঃ। আজ কপাল ভাল। বিকেলে আজ খুব খাওয়া হবে, কী বলে?

হবে। অন্যমনস্কভাবে বলে ললিত, আজ তোমার ঘরেই আমরা ফিস্ট করব। মুরগি কিনে আনব।

বিমান হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে আদিত্যকে বলল, এত সহজে বিয়ে করা যায়, আমি জানতুম না। আমার ধারণা ছিল, বিয়ে করতে অনেক সময় আর বিবেচনা লাগে।

আদিত্য মাথা নিচু করে আস্তে বলল, আমারও লেগেছে।

লেগেছে? বিমান হাসে, তবে তোমার সাক্ষীর জোগাড় নেই কেন? তা ছাড়া, রেজিষ্ট্রি বিয়ে তারাই করে যাদের সামাজিক সম্পর্কে গোলমাল আছে।

আদিত্য ভ্রূ কোঁচকায়, তুমি কি সাক্ষী দিতে ভয় পাচ্ছ?

না, না। সুন্দর কবে হাসে বিমান, কিন্তু আমি যখন বিয়ে করব তার অনেক আগে থেকে আমি নিজেকে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করব তার জন্য। আমার বিয়ের সময়ে সবকিছু প্রস্তুত থাকবে, এমনকী প্রকৃতিও।

একটু থেমে বিমান বলে, আমি একটি মেয়েকে ভালবেসে, তার জন্য পাগল হয়েই বিয়ে করতে ছুটব না। কারণ, যারা এ-রকম বিয়ে করে তাদের সত্যিকারের বিয়ে হয় না। বিয়ের কারণ ভিন্ন।

আদিত্য সামান্য লাল হয়ে বলে, তুমি কীসের জন্য বিয়ে করবে তা হলে?

বিমান খাওয়া থামিয়ে রেখে বলে, বিয়ে সমাজকে সন্তান দেয়। তাই আমি দেখব কীভাবে আমি সমাজকে সুসন্তান দিতে পারি। ব্যক্তিগত প্রেমের চেয়ে সমাজ অনেক বড়।

তুমি প্রেম মানো না?

বিমান হাসে, প্রেমটা ঠিক বোঝা যায় না। ওটা খুব ধোঁয়াটে ব্যাপার। কখনও আছে, কখনও নেই। কিন্তু প্রেম থাক বা না থাক, বিয়েতে সন্তান আছেই। প্রকৃতি আমাদের প্রেমের ধার ধারে না। সে আমাদের দিয়ে যন্ত্রের মতো তার উদ্দেশ্য সিদ্ধ করে নেয়। আমরা যতখানি প্রেমিক, তার চেয়ে ঢের বেশি প্রজনন-যন্ত্র।

চকমকে চোখে হাসে বিমান। আমাদের একটা অ্যালসেশিয়ান মাদি কুকুর ছিল। বাবা সেটাকে বাজে কুকুরদের সঙ্গে মিশতে দিত না। দরকার মতো সেটাকে নিয়ে যাওয়া হত মিত্তিরদের মদ্দা অ্যালসেশিয়ান কুকুরটার কাছে। বছর বছর চমৎকার বাচ্চা হত। তেজি, স্বাস্থ্যবান। একবার সেটা বাজে জাতের কুকুরের সঙ্গে মিশেছিল, সেবারকার বাচ্চাগুলো হয়েছিল কুচ্ছিত, ভিতু, পেটুক। জন্মবিজ্ঞানের নিয়ম রয়েছে। মানুষের ভিতরেও এ-রকম বর্ণের তফাত আছে। কিন্তু মানুষ জন্মবিজ্ঞানের কোনও নিয়ম মানে না। যেমন খুশি বিয়ে করে, সমাজে সব একাকার করে দিতে থাকে।

আদিত্য তর্কের জন্য মুখ খুলতে যাচ্ছিল। ললিত তা হতে দিল না। হাত ধরে টেনে আনল রাস্তায়, বলল, এখন ও-সব কথা থাক। আমাদের কাজ আছে অনেক।

ললিত চেঁচিয়ে বিমানকে তৈরি হতে বলে চলে এল।

ফিরে এসে আদিত্য ললিতের মাকে বলল, মাসিমা, মাই ম্যারেজ টু-ডে।

কী বললি? মা জিজ্ঞেস করে।

আদিত্য হাসে। বলছিলুম, আপনি বড় ভালমানুষ।

মা হেসে বলে, পাগল! এবার একটা বিয়ে কর।

ললিত গজগজ করে, তোমার কেবল এক কথা।

আদিত্য হো-হো করে হাসে, সেই কথাই তো বলছিলুম মাসিমা, আপনি ভালমানুষ বলে বুঝতে পারলেন না।

বারোটার মধ্যেই তারা তৈরি হয়ে ট্যাক্সি ডেকে আনল। বেরিয়ে পড়ল তিনজন। আদিত্য একটু সংশয়ের গলায় জিজ্ঞেস করে, প্রথমে কোথায় যাবে?

ললিত ওর কাঁধে হাতের একটু চাপ দিয়ে বলল, আগে তোকে একটু ভদ্র পোশাক পরাই। দাড়িটাও কামিয়ে নে। তারপর দেখা যাবে।

দূর। আদিত্য বলে, এ-পোশাকই ভাল। আমি সাজব না।

কিন্তু অবশেষে সবই করতে হল আদিত্যকে। ধুতি, রেডিমেড সিল্কের পাঞ্জাবি, গেঞ্জি, রুমাল কেনে হল। দোকানের ট্রায়ালরুমে ঢুকে সেগুলো পরে বেরিয়ে এল আদিত্য। ললিত হেসে বলল, সাবাস!

কিছু ফুল, শাশ্বতীর জন্য একটা শাড়ি কিনতে কিনতে সোয়া দুটো বেজে গেল প্রায়। একটা পেট্রল পাম্পে ট্যাক্সি থামিয়ে সঞ্জয়কে ফোন করল ললিত, অফিসে থাকিস। খুব দরকার। যাচ্ছি।

আড়াইটের পাঁচ মিনিট আগে ট্যাক্সিটা শাশ্বতীর কলেজের সামনে বড় রাস্তায় এসে থামে। আদিত্যকে ঠেলা দিয়ে ললিত বলে, নাম।

পাগল!

নামবি না?

দূর! আমাকে দেখলে হয়তো মুখ ফিরিয়ে নেবে। তুই যা!

ললিত ভ্রূ কুঁচকে বলল, অত মেয়ের ভিড়ে কি চিনতে পারব! মোটে তো একবার দেখা।

বলেই সে মনে মনে একটু চমকে ওঠে। সে কি মিথ্যে কথা বলল না? আসলে শাশ্বতীকে লক্ষ জনের ভিতরেও সে চিনতে পারবে।

আদিত্য মাথা নাড়ে, পারবি। তুই না পারলেও ও পারবে। কলেজের সামনে ওই বকুল গাছটার তলায় গিয়ে দাঁড়া। ওখানে একটা চানাচুরওয়ালা বসে, সতী ওর রোজকার খদ্দের। একটু পরেই একটা পিরিয়ড শেষ হবে।

ললিত আস্তে আস্তে হেঁটে এসে বুড়ো চানাচুরওয়ালাটার পাশে গাছের ছায়ায় দাঁড়ায়। কিন্তু হঠাৎ বড় অস্বস্তি হতে থাকে তার। কেন যেন বুক কাঁপতে থাকে। কেন যেন দুর্বল লাগে নিজেকে। মনে পড়ে শ্যামলা সুন্দর কোমল একখানা মুখ, মায়াবী চোখে চেয়ে বলছে, দেখবেন, আপনার অসুখ সেরে যাবে।

সেই কথাটাই যেন গুনগুন করে ফিরে আসছিল তার কানে।

হঠাৎ দিকবিদিক জুড়ে প্রবল ঘণ্টাধ্বনি বেজে ওঠে, যেন পাতাল থেকে উঠে আসে সেই শব্দ, আকাশ থেকে নেমে আসে।

চমকে উঠল ললিত। সিগারেটটা আঙুল থেকে খসে পড়ে গেল।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%