সপ্তদশ অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

সতেরো

তাকে নীচে ফুটপাথে নিয়ে এল মাথায় ব্যান্ডেজ-বাঁধা রোগা অচেনা লোকটা। এটা কোন জায়গা ঠিক বুঝতে পারছিল না শাশ্বতী। উলটো দিকে একটা বড় পার্ক। তাতে বিশাল বিশাল পামগাছ, অনেক লোকের ভিড়, যেন কোনও মিটিং হচ্ছে। পার্কটার একটা গেটের ওপর সাইনবোর্ড—বহুবাজার ব্যায়াম সমিতি। এটা কি বউবাজার? কে জানে! শাশ্বতী কলকাতার অনেক অংশই চেনে না।

মাথায় ব্যান্ডেজ-বাঁধা লোকটা খুব উত্তেজিতভাবে গলা নামিয়ে বলল, আপনি পালিয়ে যান।

বড় সুন্দর লোকটার গলা। ভরাট, দানাদার, যেন খুব স্বাস্থ্যবান সুন্দর চেহারার পুরুষের গলা।

কিন্তু কোথায় পালিয়ে যাবে শাশ্বতী? কার কাছ থেকে?

সে মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করে, এটা কোন জায়গা?

লোকটা তার দিকে চোখ গোল করে তাকায়, জায়গাটা চেনেন না? ওই তো ওয়েলিংটন স্কোয়ার, যেখানে মিটিং হয়। আর এই ধর্মতলা স্ট্রিট।

না, শাশ্বতী চেনে না। সে আঁচলে চোখ দুটো একবার চেপে ধরে।

লোকটা তেমনি উত্তেজিত গলায় বলে, ট্যাক্সি ডেকে দেব? বেশি দেরি করবেন না। ওরা ঠিক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আপনার মন ঘুরিয়ে দেবে। আপনি তাড়াতাড়ি চলে যান।

হঠাৎ দূর স্মৃতিতে যেন শাশ্বতীর মনে পড়ে আদিত্য নামে একটা লোক, আদিত্য নামে একজন ছিল। শাশ্বতী তাকে বলেছিল ভালবাসবে। কিন্তু বাসা হয়নি, ঠিকমতো বাসা হয়নি। এখন সেই আদিত্য তিনতলার ওপর বসে আছে একটা সোফায়, তার পরনে সদ্য কেনা জামা-কাপড়, মুখে লজ্জার ভাব, হাতে ফুল। কিন্তু এখন আদিত্যকে অনেক দূরে ফেলে এসেছে শাশ্বতী। শাশ্বতী ফিসফিস করে ধরা গলায় বলে, একা একা ট্যাক্সিতে চড়তে আমার ভয় করে। তা ছাড়া আমার কাছে পয়সাও নেই।

আমার কাছেও নেই। বলে হাসল বিমান। তারপর বলল, তা হলে বাসে যান। ওই যে বাস-স্টপ।

শাশ্বতী ব্যাপারটা তখনও সঠিক বুঝতে পারছিল না। অগোছালো ঘরের মতো হয়ে আছে তার মন। সে বিমানের দিকে ভ্রূ কুঁচকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে বলে, আমি একা যেতে পারব না। আমার শরীর কেমন করছে!

বিমান ওপরের ব্যালকনিটা দেখছিল। সেখানে সঞ্জয় দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে সিগারেট, খুব অন্যমনস্ক চোখে দূরে দেখছে। বিমান শাশ্বতীকে চোখের ইঙ্গিত করে চাপা গলায় বলল, সরে চলুন। সঞ্জয় দেখতে পাবে।

খানিক দূর ভিড় ঠেলে হাঁটল তারা। নিঃশব্দে। বিমান খোঁড়াতে খোঁড়াতে আগে আগে। শাশ্বতী পিছনে। শাশ্বতী হাঁফিয়ে গেল অল্পেই। ফুটপাথের ধারে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল, আমার পা ব্যথা করছে।

বিমান মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করে, বসবেন?

শাশ্বতী মাথা নেড়ে জানায়, বসবে।

বিমান বলে, তবে একটু চলুন। কাছেই।

ধর্মতলা স্ট্রিট ধরে ধীরে হেঁটে তারা চাঁদনির কাছে চলে এল। গলিঘুঁজির মধ্যে একটু ঢুকে একটা চায়ের দোকান। বিমান তাকে নিয়ে সেই খুপরি দোকানে ঢুকে একটা কাঠের সরু সিঁড়ি দিয়ে ওপরে নিয়ে গেল। জায়গাটা গুদামঘরের মতো বদ্ধ। কিন্তু নির্জন, নিঃশব্দ। শাশ্বতী বোধহীন চোখে দেখছিল। কোথা থেকে কোথায় এসেছে সে, সঙ্গের এই অদ্ভুত লোকটাই বা আসলে কে কিছুই বুঝতে পারছিল না। কিন্তু শাশ্বতীর আলাদা ইচ্ছে বলে কিছুই নেই এখন। তার একটু ঘুম পাচ্ছে, একটু তেষ্টা পাচ্ছে, খুব ক্লান্ত লাগছে—এই কয়েকটা শারীরিক অনুভূতি ছাড়া আর কিছুই টের পাচ্ছিল না সে। এখন কেউ একন তাকে চালিয়ে নিয়ে যাক।

একটা ছোট টেবিল, আর দু’খানা চেয়ার তার দু’দিকে ছাড়া আর কোনও আসবাব নেই ঘরটায়। এক ধারে দড়িতে ঝোলানো ময়লা জামা-কাপড় আর গামছা, মেঝেতে গোটানো কয়েকটা সরু পাতলা বিছানা দেখে মনে হয় এখানে গরিবদুঃখী লোকেরা থাকে, এটা তাদের শোয়ার একটা আস্তানা। ঘরের কোণে বস্তা, তেলের টিন, ঝুড়িভরতি আলু আর আনাজ। দোকানের ভাঁড়ার। বোঝা যায় এ-ঘরটা বাইরের খদ্দেরদের জন্য নয়। ঘরটা নিচু, এক পাশে কেবল একটা জানালা। বিকেলের এক ফালি লাল রোদ এসে শাশ্বতীর পা ছুঁয়ে রইল।

মুখোমুখি বিমান বসল। এইবার শাশ্বতী লক্ষ করে দেখল বিমানকে। বিমানের চোখে-মুখে তীব্র উত্তেজনা জ্বলজ্বল করছে, ঠোঁটে টেপা একটু হাসি, যে-হাসিটা চেপে রাখতে বিমানের কষ্ট হচ্ছে, ওর মুখখানা লাল, টেবিলের ওপর রাখা হাতখানা কাঁপছে। জ্বলজ্বলে চোখে তার দিকে একটু তাকিয়ে থাকে বিমান। তারপর হঠাৎ ঝুঁকে চাপা গলায় বলে, জীবনে এই প্রথম—না, না, এই দ্বিতীয়বার আমি একটা কিছু করলাম, জানেন? একটা ভাল কিছু। আমার ভিতরটা ফেটে যেতে চাইছে।

বলে বিমান আপনমনে আনন্দে বিভোর হয়ে হাসে। ওর সমস্ত শরীর রি-রি করে কাঁপতে থাকে।

যেন ডাকাতদলের হাত থেকে শাশ্বতীকে উদ্ধার করে এনেছে একজন সাহসী গোয়েন্দার মতো, এ-রকমই হয়তো নিজেকে মনে হচ্ছিল বিমানের।

আস্তে আস্তে শাশ্বতীর অবোধ অবুঝ ভাবটা কেটে যেতে থাকে। সে পরম ক্লান্তিতে ঘাড় হেলিয়ে একটু চোখ বুজে থাকে। হঠাৎ তার নাক-মুখ ঝাঁ-ঝাঁ করে ওঠে লজ্জায়, ভয়ে। শিউরে কেঁপে ওঠে সে। হঠাৎ সে সোজা হয়ে বসে জিজ্ঞেস করে, আমি কি সই করেছি?

কোথায়?

ওইসব কাগজে? তখন আমার কিছু ঠিক ছিল না মাথার। কী করেছি মনে নেই।

বিমান ঝকঝকে চোখে হয়ে হাসে। মাথা নেড়ে বলে, না। কিন্তু আপনি খুব কমজোরি, আর-একটু থাকলে ওরা আপনাকে দিয়ে সই করিয়ে নিত।

শাশ্বতী জিঞ্জেস করে, কেন?

বিমান উত্তেজিতভাবে কিছু একটা বলার চেষ্টা করে। কিন্তু বেশি উত্তেজনায় তার কথা আটকে যায়। বলে, মানুষ অনেক সময়ে মানুষের ভালটাই ভাবে, কিন্তু করতে গেলে উলটো করে ফেলে।

শাশ্বতী একটা শ্বাস ফেলে চুপ করে থাকে।

সদ্য ঘুম থেকে ওঠা একটা বাচ্চা বয় খালি গায়ে হাই তুলতে তুলতে এসে টেবিলের সামনে দাঁড়ায়। বিমান জিজ্ঞেস করে, কী খাবেন?

কিছু না। শাশ্বতী উত্তর দেয়।

একটু চা?

না। মাথা নাড়ে শাশ্বতী, আমার বমি হয়ে যাবে। আমি শুধু একটু জল খাব।

জল। বিমান উত্তেজিত ভরে ছেলেটাকে বলে, এক গ্লাস জল— শিগগির!

ছেলেটা বোকা চোখে তাকিয়ে থেকে মন্থর পায়ে চলে যায়। বিমান ছেলেটার যাওয়ার ভঙ্গিটা চেয়ে দেখে, তারপর হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে শাশ্বতীকে বলে, কী মজা! ওরা আমাদের কোথাও খুঁজে পাবে না।

বলে আপনমনে একটু হাসে।

শাশ্বতী হাসে না। তার খুব ক্লান্তি আর হতাশা বোধ হয়। সে জানে, আজ হোক কাল হোক আদিত্য তাকে খুঁজে বের করবে। ম্যারেজ-রেজিস্ট্রার আর তিনজন সাক্ষীর সামনে তাকে বোকার মতো বসিয়ে রেখে এসেছে সে। সে আর ফিরে যাবে না। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে থাকবে আদিত্য। অপমানে লজ্জায় লাল হয়ে উঠবে, চিড়বিড় করবে রাগে। তারপর আজ হোক কাল হোক, হয় বাসায় নয় তো রাস্তায়-ঘাটে কোথাও কিংবা কলেজের সামনে ওত পেতে থেকে শাশ্বতীকে ধরবে আদিত্য। তখন কী হবে শাশ্বতী জানে না। কিন্তু আদিত্য খুঁজে বের করবেই তাকে। করবেই। সহজে ছেড়ে দেবে না। শাশ্বতী জানে।

জল খেয়ে শাশ্বতী বলল, এবার যাব।

চলুন। বলে বিমান উঠে দাঁড়ায়।

শাশ্বতী ইতস্তত করে বলে, চা খেলেন না? এতক্ষণ আমরা এখানে বিনিপয়সায় বসলাম! একটা কিছু খাওয়া উচিত ছিল।

না, না। বিমান বলে, এ আমার অনেক কালের চেনা লোকান। কলেজে পড়ার সময়ে এখানে আমি আর রমেন আসতাম। এই ঘরটা তখন থেকেই আমাদের জন্য আছে। আপনার ওই চেয়ারটায় রমেন বসত। আমরা অনেকক্ষণ এখানে কাটিয়ে যেতাম। আমি এখনও প্রায় আসি।

ও। শাশ্বতী বলে।

কাঠের সরু সিঁড়ি দিয়ে সাবধানে নেমে আসে তারা। বড় রাস্তায় এসে শাশ্বতী বলে, আপনার কথা ওর কাছে কোনও দিন শুনিনি তো! আপনি ওঁদের কীরকম বন্ধু?

বিমান মাথা নাড়ল, আমি ওদের বন্ধু নই। এক সময়ে এক ক্লাসে পড়তাম, মুখ-চেনা ছিল।

শাশ্বতীর জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে যে, তা হলে সে এদের দলে জুটল কী করে! লজ্জায় জিজ্ঞেস করল না।

কিন্তু বিমান নিজের থেকেই বলল, আজ হঠাৎ অনেক বছর বাদে আদিত্যর সঙ্গে প্রথম দেখা। ললিত ওকে আমার কাছে নিয়ে গিয়েছিল। আদিত্যকে আজ এত দিন বাদে প্রথম দেখার দিনেই ললিত ওর বিয়েতে সাক্ষী দিতে বলল আমাকে। আসলে আমার মনে হয়, ললিতের ধারণা ছিল, এই গোলমেলে বিয়েতে আমার মতো একটা পাগল-টাগল নিরীহ গোবেচারাকে সাক্ষী দিতে ডাকাই নিরাপদ। সেয়ানা বন্ধুরা সাক্ষী দেওয়ার আগে অনেক প্রশ্ন করবে, সব ব্যাপার জানতে চাইবে, এবং গোলমাল দেখলে পিছিয়ে যাবে।

শাশ্বতী অনেকক্ষণ বাদে এইবার হাসল। জিজ্ঞেস করল, আপনি কি পাগল?

হ্যাঁ। বিমান গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ে, মাঝে মাঝে আমার মাথার গোলমাল হয়।

কেন?

বিমান আঙুল তুলে শাশ্বতীকে আকাশটা দেখিয়ে বলল, আমার মাথায় আকাশ ঢুকে যায়। তখন মাথার মধ্যে খুব যন্ত্রণা হয়। আমি পাগল হয়ে যাই। কিন্তু সবসময় আমার পাগলামি থাকে না।

শাশ্বতীর দিকে চেয়ে একটু বুঝদারের মতো হাসল বিমান। বলল, এখন আমি পাগল নই। আমি জানি মেয়েরা পাগলদের ভয় পায়। কিন্তু আপনার কোনও ভয় নেই। একটু আগেই আমি সুস্থ মানুষের মতো একটা কাজ করেছি, আপনাকে নিয়ে এসেছি ওদের কাছ থেকে। আদিত্য এক পাত্র বিষ খেতে যাচ্ছিল, আমি ওকে বাঁচিয়ে দিয়েছি। কিন্তু সেটাও আজ বুঝবে না। দেখা হলে ও আমার সঙ্গে ভীষণ ঝগড়া করবে।

শাশ্বতী আবার হাসে। বলে, আমি কি বিষ?

না। মাথা নাড়ে বিমান, এমনিতে আপনি বিষ নন। ঘি আর মধু আলাদা আলাদাভাবে বিষ নয়, কিন্তু মেশালে বিষ। ঠিক সেই রকম। ভালবাসা-টাসা আমি খুব ভাল বুঝি না। কিন্তু এইটুকু বুঝি যেমন তেমন বিয়ে হওয়া ভাল নয়। কিন্তু এখন কি আপনি বাসে উঠবেন? বাসে খুব ভিড়। অফিস ভাঙার সময়।

মন্থরগতিতে বোঝাই বাস-ট্রাম চলেছে। সামনেই চৌরাস্তায় ধীরে ধীরে সৃষ্টি হচ্ছে একটা ট্র্যাফিক-জ্যাম।

শাশ্বতী উদ্বিগ্ন চোখে দেখল। বলল, ওঠা যাবে না।

তা হলে?

শাশ্বতী হাসল, এখন হঠাৎ আমার খিদে পাচ্ছে আবার।

বিমান বলল, তবে চলুন ওই দোকানটায় ফিরে যাই। ওখানে বললে কইলে বাকিতে খাওয়া যাবে। কিন্তু খাবার খুব বাজে। আমি ওখানে আসি কেবল নিরিবিলিতে বসার জন্য, আর পয়সা না থাকলে বাকিতে খাওয়ার জন্য। যাবেন?

না। শাশ্বতী মাথা নাড়ে, ওই গুদাম ঘরে আমার দম আটকে আসছিল। তা ছাড়া ওটা তো আসলে একটা শোয়ার ঘর, পুরুষেরা শোয়। আমার ভাল লাগে না।

বিমান তার বাঁ পকেট থেকে ছেঁড়া পুরনো মানিব্যাগটা বার করে পয়সা হিসেব করে বলল, তিরানব্বই পয়সা আছে মোটে।

শাশ্বতী বলল, আমার কাছে এক টাকার মতো।

বিমান একটু ভেবে বলল, তা হলে কোনও মাদ্রাজি দোকানে চলুন। সস্তায় খাওয়া হবে।

একটা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত সিনেমা হল পেরিয়ে যাচ্ছিল তারা। হলঘরের সামনের ফুটপাথে ঠান্ডা হয়ে আছে। শীতে কেঁপে উঠল শাশ্বতী। তারপর বলল, বড় রাস্তা দিয়ে যেতে ভয় করছে। ওরা যদি গাড়িতে এই রাস্তাতেই ফেরে।

ঠিক। বিমান দাঁড়িয়ে পড়ল।

তারপর বড় রাস্তা ছেড়ে গলিঘুঁজির মধ্যে হাঁটতে লাগল তারা। পৃথিবীময় অচেনা মানুষ, অন্ধের মতো গায়ে ধাক্কা দিয়ে উলটোপালটা হেঁটে যাচ্ছে নাম-পরিচয়হীন মানুষেরা। অচেনা রাস্তাঘাট, চোরাগলি, শাশ্বতী কোনও দিন এই সব জায়গা দেখেনি। এই অচেনা জায়গায় ভিড়ের মধ্যে সে একজন অজানা পুরুষমানুষের সঙ্গে কোথায় কোন রেস্টুরেন্টে চলেছে! কিন্তু তার একটুও ভয় করে না। পথ-চলতি লোকেরা মাথায় ব্যান্ডেজ-বাঁধা বিমান, আর তার সঙ্গে তাকে যেতে দেখে কৌতূহলে তাকাচ্ছে। কিন্তু শাশ্বতীর খুব একটা লজ্জা করে না। বরং তার মন এখন ঝরঝরে পরিষ্কার, বন্ধনহীন। জ্বর সেরে গেলে শরীর যেমন দুর্বল আর শীতল মনে হয়, তেমনি লাগছে তার। একটু হয়তো বা দুর্বল। কিন্তু জ্বর নেই। জ্বর আর একটুও নেই। তার খুব ভাল লাগছে, সে যেন এখন সেই ফ্রক-পরা ঝুঁটি-বাঁধা শাশ্বতী, বাবার সঙ্গে পুজোর জামা কিনতে বেরিয়েছে।

আবার কাঠের সিঁড়ি, আবার দোতলা। তবে এ-রেস্টুরেন্টটা অনেক বড়, আর লোকজনের খুব ভিড়। টেবিলের সামনে লোকে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে জায়গা খালি হলে বসবে। সমস্ত ঘরটায় একটা টক গন্ধ, আর বাসনকোসন ধোয়ার খুব শব্দ হচ্ছে।

বিমান নিচু গলায় বলে, ভয় নেই। কম পয়সায় লোকে খায় বলে এত ভিড়। এখানে কেবিন আছে। অনেকক্ষণ বসা যায়।

একটু অপেক্ষা করে কেবিন পাওয়া গেল। দুটো দোসা আনতে বলল বিমান। তারপর শাশ্বতীর দিকে চেয়ে হাসল। বাচ্চা ছেলের মতো অহংকার তার মুখে। শাশ্বতীকে আশ্বস্ত করার জন্য বলল, আপনার কোনও ভয় নেই। আমি এখন পাগল নই। পাগলামি আসার আগেই আমি টের পেয়ে যাই। তখন আমার কাছাকাছি যারা থাকে তাদের সাবধান করে দিই যে, আমি আর কয়েক দিনের মধ্যেই পাগল হয়ে যাব।

শাশ্বতী বাচ্চা মেয়ের মতো একটু হাসে। পরমুহূর্তেই বিষণ্ণ হয়ে গিয়ে বলে, আমার বাবাও মাঝে মাঝে পাগল হয়ে যায়।

পাগল? খুব অবাক হয় বিমান, কী রকম?

শাশ্বতী আস্তে আস্তে বলতে লাগল তার বাবার কথা। বলতে তার ভাল লাগছিল, মন মুক্ত হয়ে যাচ্ছিল তার। সে কখনও চোখের জল মুছল, কখনও হাসল।

বিমানকে খুব উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। হাত কাঁপছিল তার। প্রথমে কিছুক্ষণ সে কথা বলার চেষ্টা করেও পারল না। তারপর কষ্টে সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, আমরা যারা পাগল তারা কী রকম তা ঠিক বোঝানো যায় না। আমরা সকলেই এক রকমের পাগল নই, বুঝলেন! আমরা যে যার নিজের মতো করে পাগল। না, আমি ভবিষ্যৎ কিছু দেখতে পাই না, কিন্তু যখন আমার মাথায় আকাশ ঢুকতে থাকে আর মাথার যন্ত্রণায় আমি কষ্ট পেয়ে কাতরাই তখন মাঝে মধ্যে আমি একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখি। প্রকাণ্ড একটা জায়গা— সেই জায়গাটা ঘুটঘুটে অন্ধকার, সুর্য চাঁদ তারা কিছু নেই, সেইখানে বিরাট খোলা জায়গায় হাজার হাজার মানুষ। অন্ধকারে অসম্ভব গোলমাল করে তারা, চিৎকার করে, এর সঙ্গে ওর ঠোকাঠুকি হয়ে যায়। আছড়ে পড়ে মানুষ, আবার উঠে দাঁড়ায়। রাস্তা খুঁজে না পেয়ে হাতড়ে চলে, কোথায় চলেছে জানে না। কখনও তারা চেঁচিয়ে বাবা মা ভাই বন্ধুর নাম ধরে ডাকে, কাঁদে, আবার কখনও কেউ পা মাড়িয়ে দিয়েছে বলে ঝগড়া করে। মারপিট ধস্তাধস্তির শব্দ শোনা যায়। দাঁত ঘষার শব্দ, গালাগালের শব্দ! অন্ধকারের মধ্যে এইসব ঘটতে থাকে। কিন্তু তখন আমার মাথায় আকাশ ঢুকছে বলে যন্ত্রণায় আমি বেশি কিছু বুঝতে পারি না। চোখ খুলে ঘোর অন্ধকার দেখি। আর দেখতে পাই আমার গায়ের ওপর দিয়ে মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। কিন্তু তারা আসলে কোথাও যায় না, ঘুরে-ফিরে অন্ধকারে আবার একই জায়গায় ফিরে আসে, তারপর ভুল এবং নিরর্থক পরিশ্রম বুঝতে পেরে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকে! হাঁফায়। ককিয়ে কেঁদে ওঠে। খুব মজার সেই দৃশ্য।

শাশ্বতী আস্তে করে হেসে ওঠে, মুখে রুমাল চাপা দেয়।

বিমান হাসে না। গম্ভীরভাবে বলে, যুদ্ধের সময়ে যখন হাতিবাগানে বোমা পড়ল তখন আমরা কলকাতা ছেড়ে পূর্ব বাংলায় পালিয়ে গিয়েছিলাম। গোয়ালন্দের স্টিমার পার হয়ে রাত্রিবেলা ট্রেনে ওঠার সময়ে অন্ধকারে ঠিক ওই রকমই একটা ধাক্কাধাকি, গোলমাল আর দিশেহারা অবস্থায় পড়েছিলাম আমরা। মা আমাকে নিয়ে ছেঁচড়ে একটা কামরায় উঠেছিল, আমাদের মেঝেয় ফেলে গায়ের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে উঠেছিল মানুষ, থেঁতলে দিয়ে গিয়েছিল আমাদের। তার ওপর বাবা দাদা আর আমার ছোট বোনটা যে কোথায় গিয়েছিল ছিটকে তা কে জানে! সেই আতঙ্ক আর ভয়, আর সেই অন্ধকার এখনও আমার মধ্যে রয়ে গেছে। এক-একবার মনে হয়েছে আমার পাগলামির সময়ে আমি সেই দৃশ্যটাই দেখি। কিন্তু তারপর ভেবে দেখেছি যে, আসলে তা নয়। গোয়ালন্দের যাত্রীদের একটা উদ্দেশ্য ছিল, তারা ট্রেনে উঠে যে যার নির্দিষ্ট জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু এই অন্ধকার জায়গায় লোকগুলোর আসলে কোনও উদ্দেশ্য নেই, এরা জানেই না কোথায় গেলে কী হবে, এত হাঁটাচলা, এত পরিশ্রমের অর্থ কী। তাই আমি এর একটা অর্থ করলাম যে, আসলে এই যে মানুষ জন্মাচ্ছে পৃথিবীতে, বেঁচে থাকছে, কাম-ক্রোধ-লোভের হাত ধরে চলেছে, এরা তো আসলে জানে না কেন জন্ম, কেন এই জীবন, মৃত্যুই বা কেন! তাই পৃথিবীতে সবসময়েই রয়েছে এক ঘোর অন্ধকার, কিন্তু মানুষ সেটা বুঝতেই পারে না। তাদেরই মন থেকে অন্ধকার ছড়িয়ে যাচ্ছে পৃথিবীতে। তাই রেলগাড়ির হ্যান্ডেল ধরে যেতে যেতে ঝুলন্ত মানুষ দেখতে পায় না তার মাথা লক্ষ্য করে ষাট মাইল বেগে ছুটে আসছে ইলেকট্রিকের পোস্ট, দেখতে পায় না রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ কখন ট্রাফিকের লাল বাতি সবুজ হয়ে যায়। বুঝতে পারে না, লম্বা ঘাসের ভিতরে চিকন-শরীর সাপ চলে আসছে কাছাকাছি, তারা কখনও দেখে না চারপাশের জীবাণু-জগৎ, শরীরে উঠে আসছে কষ্টকর রোগ। যতটুকু দেখে মানুষ ততটুকু আসলে কিছু নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু আছে, যা সে দেখতে পায় না। তাই আমার পাগলামির সময়কার ওই দৃশ্যে সূর্য নেই, চাঁদ নেই, তারা নেই। ওই দৃশ্যে আমি এক অদ্ভুত সত্যকে দেখতে পাই, যা আর কেউ দেখে না। ঘোর অন্ধকার একটা পৃথিবীতে জন্মান্ধ মানুষেরা হাঁটছে।

বিমান শাশ্বতীর চোখ দেখে হঠাৎ হেসে বলল, না, না, আমি এখন ঠিক আছি। কোনও ভয় নেই। আপনার বাবা এক রকমের পাগল, আমি আর-এক রকমের। কিন্তু কিছু কিছু পাগল আছে যারা সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি কিছু দেখতে পায়। হয়তো সেইসব পাগলদের কিছু কিছু অনুভূতি প্রখর হয়ে ওঠে, অন্য অনুভূতিগুলো ম্লান হয়ে যায়।

বিমান উৎসুক চোখে শাশ্বতীর মুখের দিকে চেয়ে রইল। তারপর ছেলেমানুষের মতো সরল হাসি হাসল, এই যে একটু আগে আদিত্য আপনাকে আইনের প্যাঁচে বিয়ে করার চেষ্টা করছিল, ওটাও এক রকমের অন্ধকারে হাঁটা। ও কেবল বোঝে ওর প্রবল ভালবাসা আছে। কিন্তু সেই ভালবাসা কত দূর সাহায্য করে মানুষকে বিয়ে কি কেবল ভালবাসারই একটা ঘটনা? তার আগে-পরে কিছু নেই? ও হঠাৎ আজ দুপুরে এসে দু’-একটা কথাবার্তা বলেই বলল, আমার বিয়েতে সাক্ষী দেবে চলো। মনে মনে আমি চমকে উঠলাম। বিয়ে করা কি এতই সহজ, এত দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ। সাক্ষীরও ঠিক নেই, প্রস্তুতি না হঠাৎ বিয়ে! মনে মনে আমি তখনি ঠিক করলাম আমি সাক্ষী নতে রাজি হব। সঙ্গে থাকর ওদের। দরকার যদি হয়, যদি বুঝি জোড় মিলছে না তা হল শেষ সময়ে গোলমাল করে দেব।

বলে বিমান উজ্জ্বল মুখে হাসল, আমি গোলমাল করে দিয়েছি। না? আপনাকে রাজি করানোর অছিলায় বের করে না-আনলে ওরা ঠিক আপনাকে দিয়ে সই করিতে নিত। তাই না?

শাশ্বতী ভীত মুখে চেয়ে মাথা নাড়ল, হ্যাঁ।

বিমান শব্দ করে হাসল। তাদের সামনে সদ্য রেখে যাওয়া প্লেটে দোসা ঠান্ডা হতে লাগল। বিমান বলল, বিয়েটা আসলে কী তা আমি আদিত্যকে একটু বোঝাবার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তখন ও ভালবাসায় এত ঠাস-ভরাট যে, ওর মধ্যে কথটা ঠিক ঢুকল না। ওর পক্ষে তখন এটা বোঝা সম্ভবই ছিল না যে, প্রকৃতি আমাদের কাছ থেকে সন্তান চায়, সমাজ চায় প্রকৃত মানুষ। একটা বিয়ে মানেই মানুষের একটা ধারা, আবহমানকালের একটা মনুষ্যস্রোত। তাই না? প্রতিটি স্বামী-স্ত্রীই এ-রকম একটা স্রোতের উৎস। সেই স্রোতটার কথা খেয়াল রাখতে হয়, কেবল ক-এর সঙ্গে খ-এর দেখা হয়ে গেল— তারপর ভালবাসা—গভীর ভালবাসা—বিয়ে—এ-রকমভাবে হয় না। চাষাও জানে কোন জমিতে কী রকম চাষ, সে জানে ভাল জমিতে খারাপ বীজ জ্বলে যায়, ফসল হয় না। কিংবা রুগ্ণ ফসল হয়। আপনি কি চান এ-রকম সন্তান, যে আপনার চেয়েও নিকৃষ্ট স্তরের মানুষ, যে আরও অন্ধ, পৃথিবী যার কাছে আরও ঘোরতর অন্ধকার?

শাশ্বতী লজ্জা পায়। তার মুখে রক্ত ছুটে আসে। চোখ নামিয়ে নেয় সে।

বিমান সামনে ঝুঁকে তার একখানা হাত স্পর্শ করেই হাত সরিয়ে নেয়। বলে, লজ্জা পাবেন না। বরং মনে করে নিন আপনি অবুঝ একটি মেয়ে, আর আমি আপনার বাবার মতোই একজন কেউ। আমি আপনাকে শেখাচ্ছি কীভাবে হাঁটতে হয় অন্ধকারে। দেখুন, আমি চাই আমার সন্তান আমার চেয়ে চক্ষুষ্মান হোক, পৃথিবীর এই অন্ধকার যেন তাকে দিশাহারা না করে। তাই না? কিন্তু একটি মেয়েকে গভীর ভালবেসে বিয়ে করলেই কি সে-রকম সন্তান পাওয়া যাবে? না। কারণ, প্রকৃতির নিয়ম মানুষের ভালবাসার ধার ধারে না। ঠিক বীজ ঠিক জমিতে না পড়লে বীজ জ্বলে যায়। আমরা অকর্মণ্য, বিশ্বাসঘাতক, ভ্যাবলা, অলস, চোর মানুষ নিয়ে আসি পৃথিবীতে। সমাজ টলমল করে। তাই না? ওই দোকানটায় যে বাচ্চা ছেলেটা ছিল তাকে লক্ষ করেছেন? আমি ওকে প্রায়ই লক্ষ করি। মানুষকে আড়াল থেকে লক্ষ করা আমার প্রিয় স্বভাব। ছেলেটাকে দেখি একটা কথা বললে বুঝতে অনেক সময় নেয়, গজের মাঝখানে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়ে, চুরি করে খায়, মালিক মারলে ঠিক জন্তুর মতো চেঁচায়, আবার পরমুহুর্তেই মারের কথা ভুলে যায়। আমি ওকে দেখেছি ওই ঘরের এক কোণে বসে গায়ের ওপর পড়া একটা টিকটিকিকে ধরে তার শরীর থেকে ল্যাজটাকে খুব অন্যমনস্কভাবে টেনে ছিঁড়ে ফেলছে। তারপর সেই টিকটিকিটাকে হাতে কচলে ডেলা পাকিয়ে ফেলে দিল এক ধারে, হাতের রস রক্ত মাথায় মুছে নিল। কী করছে তা ভাল করে খেয়ালই করল না। আমি কখনও মুরগির মাংস খাইয়েছি, কখনও ক্যাডবেরির চকোলেট, জিজ্ঞেস করেছি, কেমন রে? ও উত্তর দিয়েছে, ভাল। আবার ও যখন পাউরুটির গুঁড়ো আর গুড় দিয়ে জলখাবার খায় তখনও জিজ্ঞেস করেছি, কেমন রে! ঠিক একই রকমভাবে বলেছে, ভাল। খাওয়ার সময়ে ওকে দেখবেন, ও স্বাদ বুঝতে পারে না। খেয়ে যায়। আমি রেগে গিয়ে ওকে বলি, হয় তুই সিদ্ধপুরুষ, নয় তো গোবর। আজ আপনার জন্য জল এনে ও গ্লাসটা ধরে দাঁড়িয়েই ছিল, আপনি হাত বাড়িয়ে গ্লাসটা না নিলে ও দাঁড়িয়েই থাকত। ওটা টেবিলের ওপর রেখে যে ওর সরে যাওয়া উচিত সেটা ও বোঝেই না। আমি জানি ওর মাথার মধ্যে বোধ নেই, বুদ্ধি নেই, কেবল কুয়াশার মতো একটা ধোঁয়াটে ব্যাপার আছে। এই জীবনের মাথামুন্ডু ও কিছুই বোঝে না, এক অদ্ভুত অচেনা রহস্যময় জগতে ও আন্দাজে আন্দাজে চলেছে। ঘোর অন্ধকার পৃথিবীতে জন্মান্ধ মানুষ। উনুনের ধারে ওর নোংরা বিছানায় বেড়ালের থাবার নীচে ও ঘুমিয়ে থাকে, খিদে পেলে চুরি করে খায়, কখনও সততার অর্থ বোঝে না।

বিমানের মুখ আঠাঘামে চকচক করে। দ্রুত কথা বলে সে হাঁফিয়ে পড়ছে, তবু থামতে চায় না, ঝুঁকে বলে, কোথা থেকে আসছে এইসব অন্ধ মানুষেরা? কোথা থেকে? এরা ভুল বিয়ের মন্দ উৎপাদন নয়?

বিমান আপনমনে একটু হাসে, মাথা নেড়ে বলে, ওর মা-বাবা দূরদর্শী ছিল না। দূরদর্শী হলে তারা তাদের অতীতের বংশধারার দিকে লক্ষ রাখত, ভবিষং সমাজের কথা ভাবত, চট করে বিয়ে করত না। কিন্তু বস্তুত তারাও ছিল অন্ধ মানুষ, ঘোর অন্ধকার পৃথিবীতে আন্দাজে-আন্দাজে তারা জীবন কাটিয়ে দিয়েছে, খিদে পেলে খেয়েছে, তৃপ্ত হয়েছে রতিক্রিয়ায়, কোনওটারই অর্থ বোঝেনি। আমি মাঝে মাঝে কাগজে দেখি রেসের ঘোড়ার বংশগতি ছাপা হয়, যাতে রেসুড়ে মানুষ বুঝতে পারে কোন ঘোড়ার কী জাত। ভাল কুকুর, ভাল গোরুর জন্যও আছে এক রকমের পদ্ধতি। সেখানে শ্রেণীভেদ মানা হয়, ভালবাসা নামে কিছু নেই। কেবল মানুষেরই আছে ভালবাসা, আজ দুপুরে আদিত্যর মুখে-চোখে আমি এইরকম একটা অন্ধ উন্মত্ত ভাব দেখেছি। অন্ধের মতো ও যাচ্ছে, আর একজন অন্ধ ললিত ওকে পথ দেখাচ্ছে।

বিমান একটু চুপ করে থাকে, তারপর দুঃখিতভাবে মাথা নেড়ে বলে, কারখানায় একটা স্ক্রু তৈরি করতেও কত যত্ন লাগে, কত সতর্কতা। অত যত্নে খুব কম মানুষই উৎপাদিত হয়। তাই না?

শাশ্বতী লাজুক হেসে বলল, আপনি খেয়ে নিন।

বিমান কোমল চোখে শাশ্বতীর দিকে চেয়ে একটু হাসে। তারপর দোসার টুকরো ভেঙে মুখে দেয়। ধীর গলায় বলে, আমরা যারা পাগল, তাদের মধ্যে কেউ কেউ কখনও-সখনও এমন কিছু দেখি, যা আর কেউ দেখে না। ঠিক বলছি না?

শাশ্বতী মাথা নাড়ে, ঠিক।

গভীর তৃপ্তিতে হাসল বিমান। নিজের মুখটা শাশ্বতীকে দেখিয়ে বলল, কয়েক দিন আগে আমাকে দুটো লোক খুব মেরেছিল। বলতে গেলে সেই মার খাওয়াটাই আমার জীবনের প্রথম সাহসের কাজ। আর, দ্বিতীয় সাহসের কাজ আজকেরটা। এই প্রথম আমি একটা কিছু করতে শুরু করেছি। নিজেকে আমার খুব ভাল লাগছে আজকাল। খুব ভাল।

যখন দোকান থেকে বেরিয়ে এল ওরা তখন সন্ধে হয়ে গেছে। এসপ্ল্যানেডের আকাশে মরা আলো। শাশ্বতীর পাশে পাশে খুঁড়িয়ে কষ্টে হাঁটে বিমান। কৌতূহলী লোকজন তাদের দেখে।

বিমান হঠাৎ নরম গলায় জিজ্ঞেস করে, ললিতের সঙ্গে আপনার কত দিনের আলাপ?

শুনে শাশ্বতী সামান্য কেঁপে ওঠে। তারপর নিচু গলায় বলে, মাত্র এক দিনের আলাপ।

এক দিনের! সামান্য অবাক হয় বিমান। তারপর মাথা নেড়ে বলে, কিন্তু দেখলাম টেলিফোন ডিরেক্টরির পাতা ওলটাতে ওর হাত কাঁপছে, দু’আঙুলে সিগারেট ধরে রাখতে পারছে না। খুব অস্থির দেখাচ্ছিল ওকে। আমি ভেবেছিলাম, ও আপনাকে গভীরভাবে চেনে। হয়তো কোনও কারণে আপনার ওপর প্রতিশোধ নিতে চায়।

হঠাৎ থেমে আসে শাশ্বতীর পা। বুক কেঁপে ওঠে। তারপরেই আবার সে স্বাভাবিক হাঁটতে থাকে। কোনও কথা বলে না।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%