শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
ইরা চলে গেলে রমেন বাইরে বেরোনো প্রায় বন্ধ করে দিল। বন্ধুরা মাঝে মধ্যে আসত, রমেন তাদের দেখে ভয় পেত, পাছে তারা ইরার কথা জিজ্ঞেস করে। চেনা মানুষ দেখলে ভয় পেত রমেন, একা থাকতে ভালবাসত। পুরনো ভাঙা পিয়ানোটার তখন ঠিকমতো আওয়াজ হয় না, তবু রমেন সেটা বাজাত মাঝে মাঝে, গাইত পূর্ব বাংলার মাল্লাদের গান। কখনও গাড়িখানা নিয়ে চলে যেত দূরে। গঙ্গার ধার ঘেঁষে দাঁড় করাত গাড়ি, জামা খুলে ঝাঁপ দিত জলে। অনেক দূর সাঁতরে আসত। প্রজাদের আনাগোনা কমে গিয়েছিল অনেক। সারাটা দিন ফাঁকা পড়ে থাকত রমেনের। হাতে কোনও কাজ ছিল না। রমেন এম এ পরীক্ষা দিলই না। নিতান্ত অনিচ্ছায় দিল আইনের দ্বিতীয় পরীক্ষা, পাশ করতে পারল না। কোনও দুঃখই সে বোধ করল না তার জন্য। মাঝে মাঝে খুব ভোরবেলা উঠত রমেন। বল নিয়ে সে আর আগের মতো দৌড়ত না। সে খেলা ছেড়ে দিয়েছিল। তবু ভোরবেলা উঠে সে মাঝে মাঝে বাইরে আসত। কাশীপুরের বাড়ির সামনের দিকে একটু ছাড়া জমি ছিল বাগান করার জন্য। বাগান হয়নি, লব আর উদ্ধবের তখন বয়স হয়েছে, গাছের শখ কারও ছিল না, কে বাগান করবে। সেই ছাড়া জমিতে কিছু আগাছা আর লম্বা ঘাস জন্মেছিল, একটা বেল গাছ থেকে মাঝে মাঝে তক্ষকের ডাক শোনা যেত। সেই ফাঁকা জমির ওপর দিয়ে রমেন খামোখা চক্কর দিয়ে ঘুরত। মাঝে মাঝে হাঁটতে হাঁটতে চোখ বুজত সে, ছেলেবেলায় ফেরার চেষ্টা করত। নির্জন রাস্তায় পায়ের শব্দ পাওয়া যেত স্নানার্থীর। তারা গঙ্গার দিকে চলে যেত। রমেনের হঠাৎ মনে পড়ত ছেলেবেলার মতো পুবের দালানে দাদুর পাশে দাঁড়িয়ে যেমন সূর্য প্রণাম করত সে, তেমন অনেককাল করে না। এক-আধদিন প্রণাম করার চেষ্টা করেছিল সে। কিন্তু কোনও রোমাঞ্চ বোধ না করায় ছেড়ে দিয়েছিল। মাঝে মাঝে সে ইরার কথা ভাবত। কেন ইরা তাকে পছন্দ করল না? সে মাঝে মাঝে নিজের কথা ভাবত। সে কীরকম জীবন-যাপন করবে এরপর?
এই সময়ে দু’টি ঘটনা ঘটে পর পর।
গঙ্গার ঘাটে শেষ দুপুরের নির্জনতায় একটি বাচ্চা ছেলে জলের তোড়ে কোথা থেকে এসে ভেসে যাচ্ছিল। কিছু লোক দেখতে পেয়ে তাকে টেনে তুলেছে। রমেন গিয়ে দেখে বছর দশেকের বাচ্চা ছেলে খালি গায়ে নতুন পইতে, পরনে নেভি ব্লু প্যান্ট, হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। জলে থেকে সাদা হয়ে গেছে গা। জ্ঞান নেই। যারা তুলেছিল তারা হতবুদ্ধির মতো চেঁচাচ্ছিল, কী করতে হবে বুঝতে পারছিল না। লোকজন ছুটে আসছিল চারদিক থেকে, কিন্তু তাদের একজনও জানত না কী করতে হবে। ভিড় সরিয়ে রমেন ছেলেটাকে ধরেই বুঝতে পারল শরীরে প্রাণ আছে। সে জানত কী করে জলে-ডোবা মানুষ বাঁচাতে হয়। যা করতে হয় সে তাই করছিল। ছেলেটাকে ঠিকমতো শুইয়ে হাঁটুর চাপ দিয়ে ধরে লঘু দ্রুত হাতে মালিশ করে দিচ্ছিল শরীর। নিঃশব্দে ভিড়ের অত লোক তাকে দেখছিল সে একটা ছেলের প্রাণ ফিরিয়ে আনছে। কাজেই সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করছিল রমেন। বাইরের জ্ঞান ছিল না। একজন চেঁচিয়ে বলল, জল বেরোচ্ছে, বেঁচে যাবে! একজন শান্ত প্রকৃতির লোক উবু হয়ে পাশে বসে দেখছিল, সে গায়ে হাত দিয়ে দেখে বলে ওঠে, গা গরম লাগছে যেন একটু। অনেকক্ষণ ধরে ডুবে ছিল ছেলেটা, গভীর অজ্ঞানতার মধ্যে চলে গিয়েছিল। সময় লাগছিল অনেক। অনভ্যাসে রমেনের হাত টাটিয়ে গেল, ঘাম দিচ্ছিল তার শরীরে, উত্তেজনায় মুখে-চোখে গরম রক্তের আঁচ। অতগুলো লোকের সামনে একজনকে বাঁচিয়ে তোলার একটা তীব্র উত্তেজনায় সে থামছিল না। ভিড়ের মধ্যে কেউ একজন রমেনকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারেনি। সে ডেকে এনেছিল ডাক্তার। হঠাৎ রমেন শুনতে পেল ‘ও কী করছেন।’ এই প্রশ্নে মুখ তুলে দেখল হাতে ব্যাগ, স্টেথসকোপওলা ডাক্তারকে, প্রবীণ মুখ। হতবুদ্ধির মতো চেয়ে থেকে রমেন বলল, কী করব! ডাক্তার আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল, ওভাবে নয়। ওকে চিত করে শোওয়ান, তারপর মালিশ। একপলকের জন্য রমেনের মনে হল, ডাক্তার ভুল বলছে। সে জানে, সে দেখেছে জলে-ডোবা মানুষ বাঁচাতে। তবু কেমন দিশেহারা বোধ করল রমেন। এতগুলো লোক সাক্ষী, যদি ডাক্তারের কথা সে না-শোনে, আর যদি তার হাতেই ছেলেটা মারা যায়? ভুল হয়েছিল। ডাক্তারের কথামতো ছেলেটাকে নতুন করে শোওয়াল রমেন, পনেরো মিনিটের মধ্যেই তার হাত টের পেল ছেলেটার কচি শরীর শক্ত হয়ে আসছে। সে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে তার বিব্রত মুখ দেখল, মাথা নেড়ে মৃদু স্বরে বলল, ঠিক হচ্ছে না। ডাক্তার ঝুঁকে ছেলেটার নাড়ি দেখলেন, ইতস্তত করে বললেন, তা হলে আবার আগের মতো করুন তো দেখি। কী জানি, বোধ হয়…। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। একদম কাঠের মতো হয়ে গেল ছেলেটার শরীর। অনেকক্ষণ সেই মৃতদেহটা দু’হাতে আকুলভাবে খুঁজে দেখল রমেন।
ডাক্তার ভুল বলেছিল। অতগুলো লোকের সামনে সে ডাক্তার, তাকে একটা কিছু করতে হয়। নইলে তার সম্মান থাকে না। ডাক্তার জানত না কী করে জলে-ডোবা মানুষ বাঁচাতে হয়। হয়তো পড়েছিল কোনও দিন, কাজে লাগেনি বলে ভুলে গেছে। আর রমেন ঠিকই জানত কী করে বাঁচাতে হয়, তবু সে পারল না। একা একা ঘুরে বেড়াত রমেন আর মাঝে মাঝে চমকে উঠত ভয়ে। ভুল জেনেও সে কেন ভুল করেছিল! অত মানুষ সামনে ছিল বলে সে কি এই ভয় পেয়েছিল যে, ছেলেটা মারা গেলে অত মানুষ তাকে দুয়ো দেবে, না কি সে ভেবেছিল ডাক্তার, যেহেতু ডাক্তার সেইহেতু তার চেয়ে ভাল জানে? না কি সে অন্তরে বিশ্বাস করেনি যে সে সত্যিই ছেলেটাকে বাঁচাতে পারে। এ কেমন যে সে তার অধীত বিদ্যা প্রয়োগ করতে পারছে না? কেন ওইরকম টানা-পোড়েন মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল হল তার?
এই সময় একদিন মুনির বুড়ো বাপ এসে বলল, ছোটকর্তা, এক মুসলমানের জমি নিচ্ছি। শরিকি জমি, একটু গন্ডগোল আছে, তার ওপর পাকিস্তানের জমির সঙ্গে বদল করছি। কাগজপত্রগুলো একটু দেখে দেন।
মুনির বুড়ো বাপ দলিল-টলিল দেখতে দিল। অনেকক্ষণ ধরে দেখল রমেন। জমির কাগজ তার ছেলেবেলা থেকে চেনা। যে মুসলমান লোকটি মুনির বাপের সঙ্গে এসেছিল তার সঙ্গেও কথাবার্তা বলল রমেন। বুঝল জমিতে গন্ডগোল নেই। সব ভাই এককাট্টা হয়ে জমি ছেড়ে দিচ্ছে। কিন্তু তবু রমেন অনেকক্ষণ ভাবল। দলিলটার দিকে চেয়ে রইল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, আমার যদি ভুল হয়। তুমি কোনও উকিলকে দেখাও।
আপনি তো উকিলের বাবা।
তবু রমেন মাথা নাড়ল, না হে, যদি আমার ভুল হয়ে থাকে?
মুনির বাপ অনেকক্ষণ চেয়ে রইল রমেনের দিকে। বুড়োকর্তার নাতির মুখ থেকে কথাটা বেরোল না! তবে সে কার কাছে ভরসা করে যাবে?
একদিন একটা বার-এর সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে সামান্য একটু হুইস্কি খেয়েছিল রমেন। তখন মাঝে মাঝে খেত। সঙ্গে ছিল সঞ্জয়। সেই রাত্রে সঞ্জয় হুইস্কির গ্লাস সামনে রেখে তাকে বুঝিয়েছিল যে, সে একটা মোটর-সারাইয়ের কারখানা খুলতে চায়। তার টাকা নেই, রমেন টাকা দিলে সে অংশীদারিতে ব্যবসা করবে। রমেন ব্যবসা করতে রাজি হয়নি। কিন্তু বলেছিল, তুই ব্যবসা কর আমি বরং কিছু ধার দেব।
সঞ্জয় হেসে বলল, তোর জীবন-সংগ্রাম বলে কিছু নেই। দূর, তুই একটা মরা মানুষ।
সেই রাতের কথা স্পষ্ট মনে আছে রমেনের। সঞ্জয়কে একটা চেক লিখে দিয়েছিল রমেন, এবং খুব সহজ বোধ করেছিল নিজের মধ্যে। অনেক রাতে একা গাড়ি চালিয়ে ফেরার সময়েও সেই মহত্ত্বের বোধ কাজ করছিল তার মধ্যে। সে গুনগুন করে ভাবছিল তার একটি প্রিয় ফরাসি গান—ও-লাল-লা- ও-লা-লা…। ঝরঝর ছড়ছড় করে শব্দ করছিল অবিরল পুরনো মোটরগাড়ি। গভীর রাত্রের প্রাঞ্জল রাস্তা-ঘাট দিয়ে ঘুরে ঘুরে যাচ্ছিল সে। খুব সামান্য নেশা হয়েছিল তার। সে ডালহৌসি স্কোয়ারের ভিতর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে সেই নির্জনতায় অনুভব করেছিল তার চারপাশে প্রকাণ্ড সব গাছের অরণ্য। তার ভিতর দিয়ে ঝরনার মতো ঝরঝর করে বয়ে যাচ্ছে তার গাড়ি। তার মাঝে মাঝে শৈশবের কথা মনে পড়ছিল। তার ফাঁকা মাথার ভিতর দিয়ে নিঃশব্দে গড়িয়ে গেল কবেকার হারানো তিনটে মার্বেল। যে-মার্বেলগুলো কখনও খুঁজে পায়নি বলে তার মনে রয়ে গেছে। মনে পড়েছিল ছেলেবেলার কিশোরীদের মুখ। সেই মুখগুলি তার প্রিয় ছিল, কেননা ফের দেখা হয়নি। কখনও বা মনে পড়েছিল একঢল সবুজ মাঠের ওপর দিয়ে পেখমের বোঝা টেনে চরে বেড়াচ্ছে ধূসর রঙের ময়ুর। আর পাম গাছের ছায়ায় বাড়ির পশ্চিমের ভিতের কাছে আতসকাচ হাতে বসে আছে তার জ্ঞানী দাদু। মনে পড়েছিল মুকুন্দর ঘানিঘরের পিছনের মাঠটায় এক অন্ধকার সকালে সে হাঁটু গেড়ে বসে কাঁদছে। কাঁদছে হয়তো বা হারানো বলটির জন্য, হয়তো বা ঘরে ফেরার পথটির জন্য, কিংবা অলি নামে যে-মেয়েটি তাকে চুমু খেয়েছিল তার জন্য, হয়তো বা গাছপালা আকাশ এবং মায়ের মুখের জন্য। এইভাবেই টেরিটিবাজার ছাড়িয়ে গেল তার গাড়ি। শৈশব চিন্তায় অন্যমনস্ক রমেন এক বার লক্ষ করল পুরনো মোটর গাড়িটা গর্জন করছে অস্থিরভাবে, অভিভাবকের মতো বলছে, ঠিক মতো চালাও। নইলে বিপদ। আপনমনে হাসল রমেন। কী হয়, যদি সে এখন সেই শৈশবের মতো একবার চোখ বুজে দিক নির্ণয়ের খেলা খেলে? সেই চোখ-বুজে চলার খেলা সে বহু কষ্টে শিখেছিল, এ তার অধীত বিদ্যা, তবু একবার এক অন্ধকার ভোরে সেই খেলা সে ভুলে গিয়েছিল। ভুলে গিয়ে কেঁদেছিল মর্তের মানুষের মতো। এখন আর-এক বার তার পরীক্ষা করে দেখার সাধ হল। একবার সাবধানে চোখের পলক একটু বেশিক্ষণের জন্য ফেলল রমেন। তার গাড়ি কেঁপে উঠে সাবধান করে দিল তাকে। কোন দূরে পাখা ঝাপটাল একটা ময়ূর। দাদু পিঁপড়ের সারি থেকে চোখ তুলে তাকাল যেন। হাসল রমেন। আবার চোখ বন্ধ করে দিল। মনে মনে বলল, খুলব না। গাড়ি টাল খেল। কখনও ডান দিকে কখনও বাঁয়ে দুলতে লাগল। চোখ বন্ধ করে রইল রমেন। প্রাণপণে। সে মনে মনে এই কথা বলেছিল, আমি আর-এক বার ফিরে যাব সেই পাম গাছের ছায়ায় যেখানে চরে বেড়াচ্ছে ধূসর ময়ূর, ইজিচেয়ারে বসে-থাকা দাদুর পায়ের কাছে আমি বসব। তিনি অন্ধ চোখে আমার দিকে চেয়ে বলবেন, রমেন চোখ বড় মায়ার সৃষ্টি করে। রমেন বিড়বিড় করে বলল, শৈশবেই আমি ভাল ছিলাম। আমি জীবন-সংগ্রাম চাই না। আমি আর-এক বার জন্ম নিতে চাই। আমি শিশু হয়ে আসব, আবার খুব বড় হওয়ার আগেই আমি ফিরে যাব মায়ের জঠরে। ফিরে যাই। আমি জীবন-সংগ্রাম চাই না।
হঠাৎ যেন একমুখী স্রোতের নদী থেমে গেল, তারপর স্রোত বইতে লাগল উলটো দিকে। পশ্চাৎগামী এক রেল গাড়ির মতো ফিরে যেতে লাগল রমেন। মনে মনে তীব্র ইচ্ছাশক্তির বলে বন্ধ করে রইল চোখ। অলীক কয়েকটি মুহূর্তে সে সত্যিই ফিরে গিয়েছিল শৈশবে। আলো-আঁধারির এক ঝুঁঝকো বেলা, নিস্তব্ধ পৃথিবী শ্বাস বন্ধ করে প্রত্যক্ষ করছে এক শিশুর জন্ম। রমেন জন্মাচ্ছে। এক অব্যক্ত জগৎ থেকে ব্যক্ত জগতে চলে আসছে সে। টের পাচ্ছে ক্ষুধাতৃষ্ণা, শীত, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং মৃত্যু। টের পেয়ে শিশু রমেন কাঁদছে। জন্মমুহূর্ত! ওই তার জন্মমুহূর্ত।
গাড়িটা হঠাৎ লাফিয়ে উঠল, যেমন বিপদ দেখলে সওয়ারিকে অন্যমনস্ক টের পেলে লাফিয়ে উঠে সাবধান করে দিত তার প্রিয় সাদা ঘোড়াটা। রমেন চোখ চেয়ে দেখল বাঁকের মুখে তার গাড়ি, সামনে গাছ, ফুটপাথ, ঘুমন্ত মানুষ, দেয়াল। প্রচণ্ড জোরে ব্রেক চেপে ধরেছিল রমেন। স্টিয়ারিঙের সঙ্গে লেগে মট করে ভেঙে গেল তার পাঁজরের একখানা হাড়। রমেন অস্ফুট স্বরে গাল দিল, ইডিয়েট। হেডলাইটের আলোয় আর গাড়ির শব্দে ঘুম ভেঙে ফুটপাথে তাদের ছেঁড়া বিছানায় উঠে বসেছিল কয়েকজন ভিখিরি মানুষ। তারা অসহায়ভাবে নিয়তিকে প্রত্যক্ষ করল একবার, তারপর হাই তুলে আবার শুয়ে পড়ল।
বুকে প্লাস্টার নিয়ে শুয়ে থাকত রমেন, মাঝে মাঝে আপনমনে বলত, ইডিয়েট!
সে বছর মা লবকে ডেকে বলল, দেশ ছাড়ার পর আমরা আর দুর্গার পুজো দিইনি। সে জন্যেই এতসব অমঙ্গল ঘটছে। এ বার আমি পুজো দেব। তোমরা ব্যবস্থা করো।
সেবার পুজোয় খুব ধুম লেগেছিল। দেশ ছাড়ার পর এই প্রথম বড়বাড়ির পুজো। প্রজারা এসেছিল জোট বেঁধে দিগ্বিদিক থেকে। অষ্টমী পুজোর দিন কাশীপুরের বাড়ি ফেটে পড়ছিল ঢাকের আওয়াজে আর লোকজনে।
মায়ের ছিল হার্টের অসুখ। মহাত্মা গান্ধী গডসের গুলিতে মারা গেলে সেই সংবাদ যখন চোঙায় প্রচার করা হয়েছিল, তখন মা অজ্ঞান হয়ে যায়, যদিও মা জানত না, গান্ধী আসলে কে ছিলেন। দাদু মারা যাওয়ার পরও বহু দিনের জন্য শয্যা নিয়েছিল মা। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই মায়ের হার্টের অসুখের সৃষ্টি হয়। তারপর রমেনের অদ্ভুত বিয়ের সময়, ইরা যখন পালিয়ে যায়, আর রমেন যখন দুর্ঘটনায় পড়ে তখনও মায়ের শয্যাশায়ী অবস্থা হয়েছিল। রমেন মাঝে মাঝে রাতে ঘুম ভেঙে শুনত পাশের ঘরে মা একা একা কথা বলছে গুনগুন করে। মার ধারণা ছিল বাবার আত্মা তার কাছে আসে।
অষ্টমী পুজোর দিন দুপুরবেলা মা গোপনে গিয়েছিল মণ্ডপে প্রতিমাকে বুকের রক্ত নিবেদন করতে। রমেনের জন্য তার মানত ছিল। ছোট্ট একটা ব্লেডের টুকরো ডান হাতের আঙুলে ধরে বুকে সামান্য টান দিয়েছিল মা, তার আগে থেকেই তার মুখ-চোখ সাদা দেখাচ্ছিল। দু’ ফোঁটা রক্ত নেমে সেমিজে পড়তেই মা মুখ নিচু করে তা দেখেছিল। তারপরই ঢলে পড়ল মা। পুরুতঠাকুর সতীশ ভরদ্বাজ আসনের ওপর দাঁড়িয়ে পরিত্রাহি চেঁচাচ্ছিল, তার আসনের কাছেই পড়েছিল মা’র ঘোমটায় ঢাকা মাথাটা। তখন রমেনের প্লাস্টার করা বুক, তবু সে মাকে দু’ হাতে তুলে নিয়েছিল কোলে, কিন্তু স্পর্শমাত্র বুঝতে পেরেছিল সারা দিনের উপবাসী তৃষ্ণার্ত সেই রোগা দেহখানায় প্রাণ নেই।
এখন উৎসবের কলকাতা। মা’র মৃতদেহের অনুগমন করেছিল রমেন। ভিড়ের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময়ে তার মনে হয়েছিল যে সে অসম্ভব এক নির্জনতার ভিতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। কয়েকজন পথ-চলতি মানুষ মৃতদেহ দেখে সংস্কারবশত জোড়হাতে নমস্কার করেছিল মাকে। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতায় রমেনের চোখে জল এল। সেদিন মর্মান্তিক পথ কীর্তন করেছিল রমণীমোহন, যে ছিল দাঙ্গাবাজ, জেলে-চাষা, করুণ কান্নার সুরে তার ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম’ শুনে কত লোক থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
ভিতরে বাইরে সম্পূর্ণ একা হয়ে গেল রমেন। মাঝ রাত্রে ঘুম ভাঙত রোজ। মা মারা যাওয়ার পর থেকেই লব রোজ শুত রমেনের ঘরের দরজায়। শোওয়ার আগে সে রোজ মন্ত্র পড়ে বাড়ি-বন্ধন করে আসত। লবের দাঁত ছিল না, মুখখানাও ছিল বাঁকা, তাই ঘুমের মধ্যে অদ্ভুত শব্দ করত সে। ঘুম ভেঙে সেই শব্দ শুনত রমেন। শব্দটা ছিল এমনিতে বিরক্তিকর, কিন্তু সেই একাকিত্বের মধ্যে লব কাছেই আছে জেনে তার ভাল লাগত। কখনও সে শুনত দেয়াল ঘড়ির চলমানতার প্রবল শব্দ, কখনও শুনত টুং টাং আওয়াজ করে ইঁদুর তাদের প্রকাণ্ড গ্র্যান্ডপিয়ানোর তার কাটছে। সেই সময়েই পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে একজন কচি উদ্বাস্তু মেয়েকে বিয়ে করে লজ্জাবশত আলাদা হয়ে গেল উদ্ধব। আর লব আরও বুড়ো হয়ে গেল একদিন। তার কাছে রমেনের কোষ্ঠীটা জমা ছিল। বুড়ো-চোখে নিবিষ্ট মনে সে সেইটে দেখত সারা দিন। দেখতে দেখতে চিট হয়ে গিয়েছিল লম্বা কাগজখানা। লব মাথা নেড়ে বলত, কোষ্ঠীতে আছে তুমি ভাল গুরু পাবে। তোমার শনি প্রবল।
রমেন পড়ত বই। কখনও রাজনীতির। কখনও ধর্মের। দুটোকে মেলাতে চেষ্টা করত। সে সময়ে একবার ললিত এসে বলল, চলো, একটু গ্রামের দিকে যাই। আমরা বড় বেশি থিওরিটিক্যাল হয়ে যাচ্ছি, একটু জন-সংযোগ দরকার।
রমেন আনন্দে রাজি হয়ে কয়েক দিন ঘুরল ললিতের সঙ্গে। ললিত গ্রামে লোক জড়ো করে বক্তৃতা করত। কয়েক দিন ধরে রমেন শুনে বুঝতে পারল, ললিত সেই একই কথা বলছে যা সে কলকাতায় মাঝে মাঝে স্ট্রিটকর্নার করার সময়ে বলেছিল, কিংবা যা বলেছে কলেজের নির্বাচনে, লোকে শুনত। বুঝবার চেষ্টা করত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করত না। তাই একদিন সে ললিতকে বলল, তুই যা বলিস তার ওপর তোর নিজেরই গভীর বিশ্বাস নেই।
ললিত অবাক হয়ে বলল, নেই? কী করে বুঝলি?
রমেন মাথা নেড়ে বলল, যে প্রকৃত বিশ্বাসী তার একটা হাত নাড়ার ভিতর দিয়েও সেটা বোঝা যায়, তাকে অত বলতে হয় না।
ললিত থমকে গিয়ে বলল, সেটা কী রকম?
একটু ইতস্তত করে রমেন উত্তর দিল, আমার দাদুকে দেখেছি যখন তামাকের নলটি বাঁ হাতে টেনে নিতেন তখন তাঁর সেই ভঙ্গির মধ্যেও কোথায় যেন একটা প্রবল ভালবাসার ভঙ্গি ফুটে উঠত, আর বোঝা যেত লোকটির মন বড় স্থির।
ললিত হাসল, তোর সেই জমিদার-দাদু!
রমেন হাসেনি। একটু ভেবে বলেছিল, যদি দাদু জমিদারি ছেড়ে দিতেন এবং প্রজাদের বলতেন তোমরা তোমাদের জমিদার নির্বাচন করে নাও— আমার মনে হয়, দাদুকে তারা বিপুল ভোটে আবার জিতিয়ে দিত। তিনি ছিলেন গণতান্ত্রিক নেতা, প্রজারা তাঁর কথাকে বেদবাক্য বলে মানত।
ললিত হেসেছে। মানুষের দেবতা হওয়ার কত অসুবিধে তা বুঝিয়েছে রমেনকে।
রমেন বোঝেনি। কারণ ইতিমধ্যে সে নিজের ভিতরে দেখেছে দাদুর ছায়া। প্রজারা চাইছে তার মধ্যে তাদের জ্ঞানী বুড়োকর্তাকে দেখতে।
একদিন দুপুরে মেডিক্যাল কলেজের সামনের ফুটপাথে একটা বুড়ো লোককে পড়ে থাকতে দেখল রমেন। এ-রকম হামেশা কলকাতায় দেখা যায়। লোকটার গায়ে চিট ময়লা, খোলা মুখের কাছে মাছি উড়ছে, বিজবিজ করছে সাদা কালো দাড়ি। মাথার কাছে উপুড় করা একটা অ্যালুমিনিয়ামের তোবড়ানো বাটি। বোঝা যায় ওই বাটির ওপর মাথা রেখে শুয়ে ছিল, কোনও কারণে বাটি সরে গিয়ে মাথাটা ফুটপাথে পড়ে গেছে। বে-খেয়াল লোকটাকে পেরিয়ে যেতে যেতে দাঁড়িয়ে পড়ল। ফিরে এল একটু, আবার হেঁটে গেল খানিক দূর। তার ইচ্ছে হচ্ছিল একবার লোকটার নাড়ি ধরে দেখে লোকটা মরে গেছে কি না। ফিরে এল রমেন। লোকটার নিজের পায়খানা পেচ্ছাপের ওপর শুয়ে আছে। হাতে পায়ে লেগে শুকিয়ে আছে সেই সব। গালের পাশে চাপ হয়ে আছে বাসি বমি। দীনতম ভিখিরি একটা, দুরারোগ্য অসুখে ভুগে হয়তো মারা গেছে। রমেন উবু হয়ে বসল তার কাছে, তারপর প্রশ্ন করল নিজেকে, আমি কি এই লোকটাকে ভালবাসতে পারি? সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারল যে সে তা পারে না। বরং প্রবল ঘৃণা এবং উদাসীনতা বোধ করল সে। উঠে চলে যেতে ইচ্ছে হল। তবু নিজের ওপর জোর খাটাল রমেন। শরীরের ভিতর থেকে বমির ভাব উঠে আসছিল, ঘেন্নায় কাঁপছিল শরীর, তবু সে লোকটার পড়ে থাকা বাঁ হাতখানা তুলে নিয়ে নাড়ি দেখল। আশ্চর্য এই যে, লোকটা বেঁচে ছিল। লক্ষ করে লোকটার ছেঁড়া জামার তলায় বুকের ওঠা- নামাও লক্ষ করল রমেন। তারপরই প্রবল ভয় তাকে পেয়ে বসল। এখন সে কী করবে? লোকটা মরে গিয়ে থাকলে তার কোনও দায়িত্ব ছিল না, কিন্তু এখন যখন লোকটা বেঁচেই আছে তখন তার কিছু করা দরকার। অন্তত উচিত একে তুলে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু ততক্ষণে সমস্ত শরীরে ঘাম দিয়ে দুর্বল বোধ করছে রমেন, বমি আসছে। সে চোখ তুলে দেখতে পেল কিছু কৌতূহলী লোক তার চার ধারে দাঁড়িয়ে গেছে। তারা দেখছে বিশাল সুন্দর চেহারার এক দয়ালু পুরুষ বসে আছে রাস্তার ভিখিরির পাশে। মহান দৃশ্য। তারা দেখতে চায় সেই দয়ালু মানুষটি কী করেন ভিখিরির জন্য। সবাই অপেক্ষা করছে। তারা পথ-চলতি মানুষ, নিজের কাজে যেতে যেতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে হঠাৎ জেগে উঠেছে মানুষের প্রতি সহানুভূতি। রমেন তাদের চোখে এইসব দেখতে পেল। কিন্তু প্রবল ভয়ে কাঠ হয়ে গেল তার হাত-পা। না, সে এদের সামনে কোনও উদাহরণ স্থাপন করতে পারল না, কেননা সে তত দূর শক্তিমান নয়।
কে একজন জিজ্ঞেস করল, কী বুঝলেন দাদা, বেঁচে আছে?
রমেন নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। না। উঠে ভিড় ঠেলে বেরিয়ে সে পালিয়ে এল।
ডান হাতখানা অনেক বার ধুয়েছিল রমেন, কিন্তু তবু বহু দিন ধরে তাতে একটা শিরশিরানি অনুভূতি থেকে গিয়েছিল; মনে হত মানুষকে ভালবাসা কত কঠিন।
আর-একবার রমেন প্রবল ভিড়ের ট্রামে যেতে যেতে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছিল। একটা স্টপে বেঁধেছে ট্রাম, রমেন দেখছে একদল স্কুল-ফেরতা বাচ্চা মেয়ে বিকেলের ভিড়ের ট্রামটায় উঠতে চেষ্টা করছে। তাদের মুখ দেখলে বোঝা যায় অনেকক্ষণ তারা দাঁড়িয়ে ছিল গ্রীষ্মের রৌদ্রে, তাদের চুল ধুলোয় ধূসর, মুখ লালচে, চোখে উৎকণ্ঠা। তারা অনেকক্ষণ খায়নি, তারা শিশু তাই বাড়িতে যেতে চাইছে তাড়াতাড়ি, অনেকক্ষণ মাকে দেখেনি। কিন্তু সেই ভিড়ে তারা কেউ উঠতে পারল না। ট্রাম ছেড়ে দিলে একটা বছর সাতেকের মেয়ে তবু প্রাণপণে দৌড়ে আসছিল। সে হোঁচট খেল, হাত বাড়িয়ে ধরার চেষ্টা করল হ্যান্ডেল। তারপর ট্রামটা হু-হু করে তাকে ছাড়িয়ে গেল দেখে সে রাগ করে কান্নামুখে চেঁচিয়ে বলল, আমরা কি আজ বাড়ি যাব না?
‘রোখ্কে’ বলে উঠে পড়ল রমেন। ভিড় ঠেলে পরের স্টপে সে নেমে পড়ল ট্রাম থেকে, আবেগবশত। কিন্তু নেমেই বুঝতে পারল যে বোকার মতো একটা কাজ করেছে। এত সামান্য কারণে ট্রাম থেকে নেমে পড়ার কোনও কারণ নেই। সে আবার নিজেকে গাল দিল, ইডিয়েট।
তখন কখনও-সখনও ইরার কথা মনে পড়ে রমেনের। ইরা গর্ভবতী অবস্থায় চলে গিয়েছিল। যদি গর্ভপাত না করে থাকে তবে এত দিনে রমেনের সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। সেই সন্তান হয়তো কোনও দিনই জানবে না যে রমেন তার বাবা। ইরা তাকে সেই কথা বলবে না কখনও। সে হয়তো ছেলেবেলা থেকে হারুর ছেলেকে ডাকবে ‘বাবা’ বলে। এইসব কথা ভেবে মাঝে মাঝে অস্থির হত রমেন।
মাঝে মাঝে ছাদে শুয়ে থেকে সে দেখত আকাশ জুড়ে পড়ে আছে আকীর্ণ ধুলারাশির মতো ছায়াপথ। দেখে সে মুগ্ধ হয়ে যেত। মনে হত এই পথ গেছে তার পূর্বপুরুষদের কাছে।
তখন রমেন বড় বেশি স্পর্শকাতর। ঠিক বুঝতে পারে না, তবে মাঝে মাঝে মনে হয় খুব সাধারণ জীবন যাপনের জন্য সে জন্মায়নি। তার জন্মের একটা কোনও উদ্দেশ্য আছে। এক-একদিন সে মাঝরাতে উঠে দরজা খুলে লবের ঘুমন্ত দেহ পার হয়ে যেত। কিন্তু চলে যেতে পারত না। ঘর ও বাইরের মধ্যে কী এক অদৃশ্য বাধা আছে যা মনে মনে পেরোতে পারত না সে। কখনও বা সে চোখ বুজে দিকনির্ণয়ের খেলা খেলত আপনমনে, ঘুরে বেড়াত একা একা, চোখ বুজে ঘর থেকে ঘরে ফিরে যেত শৈশবে।
তারপর একদিন সে বুঝতে পারল যে, যেতে হবে।
হাওড়া স্টেশনে তাকে ট্রেনে তুলে দিতে গিয়েছিল লব। বিদায়ের মুহূর্তে খুব জ্ঞানী পুরুষের মতো সে বলেছিল, একেবারে চলে যেয়ো না। একদিন ফিরে এসো। আমাদের তো আর কেউ নেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন