ষড়বিংশ অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

ছাব্বিশ

রমেনের জীবনে দুঃখ তাড়াতাড়ি এসেছিল, যেমন ছিল তার দাদুর আশীর্বাদ।

মাঝে মাঝে একটা বুড়ো ময়ূর আর একটা পুরনো মোটর গাড়ির কথা রমেনের মনে পড়ে। তাদের বারবাড়ির উঠোন ছিল কচ্ছপের পিঠের মতো ঢালু। সেই সবুজ ঢালু মাঠে ধূসর রঙের ময়ুরটা এক বোঝা পেখম টেনে আস্তে আস্তে চরে বেড়াচ্ছে। কিংবা লজঝড়ে, পুরনো, ক্যাম্বিসের হুডওয়ালা তাদের গাড়িটা বৃষ্টির দিনে পাম গাছের তলায় দাঁড়িয়ে ভিজছে। কখনও বা মনে পড়ে, প্রকাণ্ড ভাঙা পিয়ানোর ওপর ধুলোর আস্তরণ, তার ওপর আঙুল দিয়ে রমেন তার নাম লিখছে, রায় রমেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী। কিংবা মনে পড়ে, তাদের ভূতগ্রস্ত, প্রকাণ্ড বাড়িটার পশ্চিমের ভিতের কাছে একটা আতসকাচ হাতে দাদু বসে আছে। চোখাচোখি হলে দাদু হেসে বলতেন, দেখো রমেন, পিঁপড়ে কেমন মাটি তুলেছে! তারপর চিন্তিতমুখে মাথা নেড়ে বলতেন তিনি, দেখো, পশ্চিমের ভিত থেকেই বাড়িটার ভাঙন শুরু হবে। এই দিক থেকেই বাড়িটা গাঁথা শুরু হয়েছিল, আমার মনে আছে।

রমেন অবাক হয়ে বলেছে, সে তো একশো বছর আগেকার কথা! তুমি তখন কোথায়?

তখন দাদু বিব্রত মুখে আতসকাচখানা রেখে দু’হাতে চোখ মুছে নিয়েছেন। অপ্রতিভ হাসিমুখে বলেছেন, আমার মনে হয় আমি তখনও ছিলাম। এইখানেই। আমি দেখেছি এ-বাড়ির ভিত গাঁথা হতে।

কী করে?

পশ্চিমের নির্জন চত্বরে তারা দু’জন— রমেন আর তার প্রায়-অন্ধ দাদু দু’টি শিশুর মতো বসেছে পা ঝুলিয়ে। দাদু বলছে, তখন আমি আসতাম ব্রহ্মপুত্রের ও-পার থেকে, নৌকোয় পার হয়ে। আমার ছিল মাটিমজুরের কাজ। এখন যেখানে মুকুন্দর মাটি ফেলেছি এই ভিত গাঁথার সময়ে—এ-রকম আমার মনে পড়ে। তখন মাঝে মাঝে আমার ইচ্ছে হত যে, এইখানে যে বড় বাড়িটা একদিন তৈরি হবে আমি যেন সেই বাড়িতে একদিন জন্মাই।

সত্যি? রমেন ব্যগ্র হয়ে জিজ্ঞেস করেছে।

দাদু হেসে বলেছেন, কী জানি! আমার এ-রকম মনে হয়।

দাদুর চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেলে রমেন তাঁকে হাত ধরে নিয়ে যেত পুবের দালানের বারান্দায়, খুব ভোরবেলা সূর্য প্রণাম করতে। কখনও নিয়ে যেত ছাদে, সন্ধেবেলায় খোলা আকাশের নীচে। দাদু কখনও ক্কচিৎ চারদিকের পরিদৃশ্যমান জগতের কথা তার কাছে জানতে চাইতেন। কিন্তু দাদুকে অন্ধ বলে কখনও মনে হত না রমেনের। বরং মনে হত খুব গভীর ধ্যানস্থ মানুষটি চারপাশের দৃশ্যমানতার অনেক গভীরে ডুবে আছেন তাই তাঁর অন্যমনস্ক হাত তামাকের নলটা খুঁজে পাচ্ছে না।

একদিন সন্ধেবেলা দাদু হাতড়ে তার মাথাটা খুঁজে নিয়ে ডান হাতখানা মাথায় রেখে জিজ্ঞেস করলেন, রমেন, খুব ছেলেবেলার কোনও কথা তোমার মনে পড়ে?

রমেনের বয়স তখন বারো কি তেরো। সে একটু ভেবে বলল, পড়ে।

কী রকম?

রমেনের মনে পড়েছিল তার বাবার মৃত্যুর কথা। বয়ড়ার আবাদ থেকে ফেরার পথে ঘোড়াসুদ্ধ বাবাকে ধরেছিল কানাওলায়। বড় হয়ে রমেন জেনেছে কানাওলা আসলে ভূত নয়, এক ধরনের আবল্যি, মানুষের বোধবুদ্ধি কিছুক্ষণের জন্য নষ্ট করে দেয়। বয়ড়া থেকে ফেরার পথে কালীজয়দের বৈঠকখানায় কিছুক্ষণ পাশা খেলে রাতে ফিরছিল বাবা। ঘোড়া ছুটেছিল, কিন্তু কোথাও পৌঁছুতে পারছিল না। তখন যুদ্ধের সময় মাঠে মাঠে কাটা হয়েছে আঁকাবাঁকা দীর্ঘ ট্রেঞ্চ, রাস্তার আলো নেই। ঘোড়া রাস্তা চিনত। ক্ষীণদৃষ্টি বাবা ঘোড়ার ভরসায় সওয়ার হয়ে বসে ছিল, কোনও দিকে ঘোড়াকে চালানোর চেষ্টা করেনি। কিন্তু ঘোড়াটা রাস্তা ঠিক করতে পারছিল না। তাকে ধরেছিল কানাওলা। কেউ কেউ দেখেছে মেজোকৰ্তার ঘোড়া সে-রাতে বড় রাস্তা ছেড়ে কেওটখালির মাঠে নেমে যাচ্ছে। তারা চিৎকার করে ডেকেছে বাবাকে। দূর মাঠ থেকে বাবা উত্তর দিয়েছে। কিন্তু অন্ধকারে তাকে আর দেখা যায়নি। বাবা চেঁচিয়ে বলেছিল যে রাস্তা ঠিক করতে পারছে না। যারা দেখেছিল মেজোকর্তাকে তাদের কেউ এসে খবর দিয়েছিল বাড়িতে। মুহূর্তে বাড়িতে শোরগোল পড়ে গেল, কানাওলা কানাওলা। রমেনের মনে পড়ে, সে তখন খুব ছোট, কাছারি বাড়ির উঁচু বারান্দায় উদ্ধবের হাত ধরে দাঁড়িয়ে দেখছে ব্রহ্মপুত্রের ঢালু পার দিয়ে মুকুন্দের ঘানিঘরের পিছনের মাঠ দিয়ে অনেক হ্যারিকেন দুলতে দুলতে যাচ্ছে বাবাকে খুঁজে বের করতে। বিশাল চরাচর জুড়ে অন্ধকারে অসহায় টিমটিমে হ্যারিকেনগুলো চলে যাচ্ছে দূরে। দূরাগত মানুষের কণ্ঠস্বর হাহাকারের মতো ডাকছে, মেজোকর্তা—আ—। বাবাকে পাওয়া গিয়েছিল একটি অগভীর ট্রেঞ্চের মধ্যে, ঘোড়াটা দাঁড়িয়ে ছিল ট্রেঞ্চের ধারে। বাবার মৃতদেহ কীরকম দেখেছিল তা রমেনের মনে নেই, কিন্তু মনে আছে পরদিন সকালবেলায় সে দেখেছিল সেই অপরাধী ঘোড়াটাকে, সকালের আলোয় যখন তাকে বাইরের উঠোনে হাঁটিয়ে আনা হল। কী লজ্জিত বিমর্ষ ছিল তার চলার ভঙ্গি।

দাদুকে সে সেই ঘটনার কথা বলতেই দাদু তামাকের নল টেনে অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, তখন তোমার বয়স পাঁচ কি ছয়। ও-বয়সের অনেক কথাই মানুষের মনে থাকে। তোমার আরও ছেলেবেলার কথা মনে নেই!

রামেন আবার ভেবেছিল।

তখন সে কত ছোট কে জানে, তবে একবার অনেক ছোট বয়সে, তার মনে পড়েছিল ভীষণ জ্বরের ঘোরে সে শুয়ে আছে। চারপাশটা আবছা দেখাচ্ছিল। কেউ একজন তার জিবের তলায় থার্মোমিটার গুঁজে দিয়েছিল, আর সে কড়মড় করে চিবিয়ে ফেলেছিল সেটা। তারপর তাকে উপুড় করে বমি করানো হয়েছিল।

সেই ঘটনার কথা শুনে দাদু প্রসন্ন হাসলেন, হ্যাঁ, তখন তোমার বয়স তিন। বাঃ রমেন, তোমার স্মৃতিশক্তি সুন্দর। কিন্তু আরও ছেলেবেলার কথা তোমার মনে পড়ে কি?

এরপর রমেনকে প্রাণপণ চেষ্টা করতে হয়েছিল। আরও ছেলেবেলা! আরও ছোট বয়সের কথা!

তারপর তার হঠাৎ মনে পড়েছিল খুব ছেলেবেলায় হয়তো স্মৃতি, হয়তো বা কল্পনা, কিন্তু বহুদিন আগে সে যেন তার মায়ের হাতে একটা নীল রঙের কেটলি দেখেছিল।

শুনে দাদু নড়ে-চড়ে বসলেন। তামাকের নল নামিয়ে রেখে উত্তেজিত গলায় বললেন, তোমার দু’ বছর বয়সে সেই কেটলিটা ভেঙে যায়। কিন্তু সেটা কল্পনা নয়, সত্যিই একটা নীল রঙের কেটলি আমাদের ছিল রমেন, তোমার ভুল হয়নি। কিন্তু তুমি আর-একটু চেষ্টা করো, দেখো তো আরও ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে কি না!

রামেন আবার প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল। চোখ বুজে দাঁতে দাঁত চেপে, হাত শক্ত মুঠো করে। সে দেখতে পেয়েছিল সেই ছেলেবেলা যেন এক কুয়াশার জগৎ, আবছায়ার মায়ারাজ্য। কিছুই মনে পড়ে না, কিন্তু কেমন যেন আভাস পাওয়া যায়।

দাদু উগ্র আগ্রহে তার মুখের দিকে ঝুঁকে ছিলেন। জিজ্ঞেস করছিলেন, মনে পড়ে না রমেন। কিছুই মনে পড়ে না?

রমেন মাথা নেড়ে হেসে বলল, না।

খুব তুচ্ছ সামান্য কিছুও না?

রমেন বলল, না তো।

দাদু মৃদু হাসলেন। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, আমি আজকাল এই খেলাটা খেলি। এই মনে পড়ার খেলা।

তোমার কত ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে?

দাদু একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, অনেক দূর পর্যন্ত মনে পড়ে।

কত দূর।

দাদু একটু দ্বিধা করলেন, তারপর আস্তে আস্তে বললেন, অনেক দূর। রমেন, মানুষ চেষ্টা করলে জন্ম-মুহূর্তটিও মনে করতে পারে।

তোমার মনে আছে?

দাদু হেসে চুপ করে রইলেন।

কেমন ছিল তোমার জন্ম-মুহূর্ত?

দাদু ধীর গম্ভীর গলায় বললেন, অন্য রকম। সেই মুহূর্তটি অন্য সব দিনের মতো নয়।

শুনে গায়ে কাঁটা দিয়েছিল রমেনের।

তবু বলো।

দাদু মাথা নেড়ে বললেন, বললে তুমি ঠিক বুঝবে না রমেন, কিন্তু তুমি নিজে কোনও দিন সেই মুহূর্তটির কথা মনে করার চেষ্টা কোরো। তুমি নিরন্তর স্মৃতিব্যক্ত থেকো, তা হলে কোনও দিন না কোনও দিন তোমার ঠিক মনে পড়বে। তোমার মন যদি স্বচ্ছ থাকে, যদি তুমি কখনও পাপবোধে কষ্ট না পাও, যদি তোমার মন কখনও কারও অনিষ্টচিন্তা না করে, যদি তুমি অসদাচরণ না করো, তা হলে সেই পবিত্র মুহূর্তটি একদিন ঠিক তোমার কাছে ধরা পড়বে।

বহুকাল ধরে সেই চেষ্টা করেছিল রমেন। বহু বার। যখন নদীতে সাঁতার দিত, বল নিয়ে দৌড়ত, গান গাইত, কিংবা চালাত মোটর গাড়ি, যখন একা থাকত কিংবা ঘর অন্ধকার করে বসত মাঝে মাঝে তখন কত বার এই খেলা খেলেছে রমেন। তারপর আপনমনে হেসে উঠেছে। কখনও তার ফাঁকা মাথার ভিতর দিয়ে গড়িয়ে গেছে ছেলেবেলায় হারানো তিনটে মার্বেল, মনে পড়েছে ছেলেবেলায় কিশোরীদের প্রিয় মুখগুলি যাদের সঙ্গে ফের দেখা হয়নি।

তার বাবার নামে দাদু একটা স্কুল খুলেছিলেন ব্রহ্মপুত্রের ধার ঘেঁষে। নরেন্দ্রনারায়ণ মেমোরিয়াল স্কুল। সেই স্কুলের বেয়ারার চাকরির জন্য দাদুর পায়ে এসে পড়ল একটা জাত-ভিখিরি। সঙ্গে কালো একটা রোগা বউ, রোগা রোগা গোটা দুই ছেলেমেয়ে, তাদের বগলে ন্যাকড়ার পুঁটুলি। বড় মেয়েটার বয়স বছর দশেক। লোকটা কবুল করল যে, সে হচ্ছে সেই অশ্বিনী যে জাতে ছোট হয়েও কুলীন কায়স্থের বিধবাকে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল বয়রার গ্রাম থেকে। এক বছর বাদে গ্রামে ফিরে আসার পর পণ্ডিতেরা খড়ম পেটা করে গ্রাম-ছাড়া করে। গত দশ বছর সে সেই কায়স্থের বিধবাকে বয়ে বেড়াচ্ছে। এখন তাদের গুটি দুই ছেলেমেয়ে। বুড়ো কর্তার জমিদারির বাইরে পৃথিবীটা নরক। সে এই স্বর্গরাজ্য ছাড়তে চায় না।

দাদুর মন তখন দূরে নিবদ্ধ। ব্রহ্মপুত্রের ও-পারের দিকে চোখ। কিন্তু দৃষ্টি আরও দূরপ্রসারী, কেননা সেই চোখ জোড়া তখন কোনও বস্তুকেই সঠিক দেখে না। নরেন্দ্রনারায়ণ মরে যাওয়ার পর দাদুর ও-রকমই হয়েছিল। মাঝে মাঝে অন্ধকারে বসে-থাকা দাদুর মাথার পিছনে হঠাৎ কখনও রমেন সাদা আলোর মতো কিছু দপদপিয়ে উঠতে দেখেছে।

অশ্বিনীর উপুড়-হওয়া শরীরের তলা থেকে পা টেনে নিয়ে দাদু বললেন, তোমার ছেলেমেয়েরা বর্ণসংকর। ওদের কী গতি হবে? আমার এলাকায় তোমরা পতিত। স্বজাতের বিধবাকে বিয়ে করলে আমি তোমায় চাকরি দিতাম, জমিও দিতাম। তুমি তোমার চেয়েও নিচু জাতের মেয়ে বিয়ে করলে সমাজের উপকার হত। কিন্তু এ যে প্রতিলোম।

অশ্বিনী অশিক্ষিত মানুষ, এত সব কথা বুঝল না। কিন্তু সে যে ভয়ংকর পাপ করেছে তা বুঝতে পেরে কাঁদতে লাগল। দাদু তখন ওর বউকে ডাকলেন। সে কাছে এসে আড়ষ্টভাবে আলগা প্রণাম করল, পা ছুঁল না। দাদু তাকে বললেন, এই যে অশ্বিনী, এর প্রতি তোমার কোনও শ্রদ্ধা আছে?

মেয়েটা চুপ করে থাকে।

এর প্রতি তোমার কীসের আকর্ষণ? বিয়ে করার ইচ্ছে হলে আমাকে এসে বলোনি কেন? আমি তোমার বিয়ে দিতাম। দরকার হলে ব্রাহ্মণের সাথেও।

মেয়েটি হঠাৎ বলল, তাতে কী হয়েছে?

দাদু উত্তর শুনে একটু চুপ করে থাকলেন। তারপর আস্তে আস্তে বললেন, তোমার গলার স্বর শুনে মনে হয় তুমি স্বাধীনচেতা। আমার এলাকায় মেয়েরা ততখানি স্বাধীন যতখানি মেয়েদের পক্ষে হওয়া সম্ভব। তারা পুরুষের মতো স্বাধীন নয়। আমি তোমার মুখ দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু তোমার পুরুষালি স্বর শুনে মনে হয় তোমার চরিত্রও পুরুষের মতো। তুমি মেয়ে হয়ে তোমার বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে পারোনি, তাই তুমি অসহিষ্ণু, অসুখী।

মেয়েটা মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইল।

দাদু ধীর অনুত্তেজিত স্বরে বললেন, বিয়ের উদ্দেশ্য প্রজাবৃদ্ধি। তাই প্রজাপতি বিয়ের দেবতা। বিয়ের একটা অনুশাসন আছে। যাঁরা মনুষ্য-বিজ্ঞান জানতেন তাঁরা এই নিয়ম তৈরি করেছিলেন। তুমি সেই নিয়ম ভেঙে জাতিনষ্টকারী পাপ করেছ।

মেয়েটি সামান্য বিদ্রোহের ভঙ্গিতে বলল, আমি জাত বিচার করিনি। মানুষ দেখেছিলাম।

দাদু সামান্য হাসলেন, তুমি বিচার করার কে? মানুষের তুমি কতটুকু জানো? মানুষের বিচার হয় তার বংশগতি তার বর্ণবৈশিষ্ট্যের ওপর। তোমরা আমার এলাকায় থাকতে পারো, কিন্তু স্বামী-স্ত্রী হয়ে নয়। আমি তোমাদের সম্পর্ক ভেঙে দিলাম। তোমরা আলাদা-থাকবে, অনাত্মীয়ের মতো। আর, তোমার ছেলেমেয়েরা কোনও দিন বিয়ে করতে পারবে না। তাদের প্রজাবৃদ্ধির অধিকার নেই।

মেয়েটি অপমানিত মুখে চুপ করেই ছিল।

দাদু তার নীরবতার মধ্যে কোনও একটি প্রশ্ন আন্দাজ করে বললেন, নিম্নবর্ণের মেয়ের উচ্চবর্ণের পুরুষের সঙ্গে বিয়ে হলে জাতি উন্নত হয়, আর উচ্চবর্ণের মেয়ের নিম্নবর্ণের পুরুষের সঙ্গে বিয়েতে জাতি অধঃপতিত হয়। তুমি নিম্ন সহবাস করেছ। তোমার ছেলেমেয়েরা বর্ণসংকর। আমি তাদের প্রতি নিষ্ঠুর নই, কিন্তু সকলের ভালর জন্য আমি তাদের বিচ্ছিন্ন করে রাখতে চাই। তাতে ওদের হয়তো একটু কষ্ট হবে, কিন্তু বৃহত্তর কারণে ওরা সে কষ্টুটুকু মেনে নেবে।

এরপর নরেন্দ্রনারায়ণ মেমোরিয়াল স্কুলে ঠুনঠুন করে ঘণ্টা বাজাত অশ্বিনী। একা থাকত স্কুলঘরের পিছনের দিকে খুপরিতে। বউ বা ছেলেমেয়ের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু তাতে তাকে অসুখী মনে হত না। বরং কায়স্থের বিধবাকে নষ্ট করার জন্য যে পাপবোধে সে কষ্ট পাচ্ছিল তা থেকে বেঁচে যাওয়ায় সে বুড়োকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করত।

সেই কায়স্থ বিধবাটি বাড়ির পিছন দিকে যে ছোট্ট দাতব্য ডিসপেনসারিটি ছিল তার শিশি বোতল ধোয়ার কাজ করত। মাঝে মাঝে সে বাড়ির ঝি-দাসীদের কাছে তার বীভৎস বিতাড়িত জীবনের গল্প করত।

তাদের দুই ছেলেমেয়ের মধ্যে ছেলেটি ছোট। মেয়েটি বড়, বছর দশেক বয়স তখন তার। তারা সারা বাড়িতে ঘুরঘুর করত। জল বা খাবার ছোঁয়া তাদের বারণ ছিল। বারণ বাইরে যাওয়া। রমেনের মাঝে মাঝে চোখে পড়ত মেয়েটি তার পড়ার ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে তাকে দেখছে। কখনও বা নীচের বারান্দা ঝাঁট দিতে দিতে হঠাৎ থেমে হাঁ করে চেয়ে থেকেছে। পিছনের ঘেরা পাঁচিলের দিকে যার ওপর দিয়ে দু’ হাত দু’ দিকে ছড়িয়ে টালমাটাল হাঁটছে রমেন।

উদ্ধব মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে বলত, ওই মেয়েটা ছোটকর্তার দিকে চেয়ে থাকে কেন! ওই রে মেয়েটা, এই হটে যা—

কিন্তু মেয়েটা ছিল স্বভাবে বাধ্য। রমেন যা করতে বলত তা তৎক্ষণাৎ করত, তার মুখে খুশির আভা দেখা যেত। ক্রমে সে রমেনের পোষা কুকুরের মতো হয়ে গেল। যেখানে রমেন সেখানেই ইরাবতী। পায়ে পায়ে ফিরত সে। তার করুণ কৃশ, শ্যামলা এবং সুন্দর মুখখানায় রমেনের প্রতি একটা কাঙাল ভাব ফুটে থাকত। ড্যাঙভাঙে রোগা হাত-পা আর মস্ত খোঁপায় তাকে একই সঙ্গে ছেলেমানুষ আর বয়স্ক দেখাত। আর তার দু’ চোখে সব সময়েই বাস করত একটা হরিণের মতো সন্ত্রস্তভাব।

দাদু মাঝে মাঝে পায়ের শব্দ পেয়ে ডেকে জিজ্ঞেস করতেন, রমেন, তোমার সঙ্গে কে?

ইরা।

দাদু ভ্রূ কুঁচকে চুপ করে থাকতেন।

মুখ-বেঁকা লৰ ছিল রমেনের খাস চাকর। তার ছিল নাড়ী-জ্ঞান, আর জানা ছিল হোমিওপ্যাথি। সে ইরাকে প্রায়ই রমেনের কাছ থেকে সরিয়ে দিয়ে বলত, বামন হয়ে চাঁদ ধরার মতলব, অ্যাঁ? কেন তুমি পায়ে পায়ে ঘোরো?

একা খুব সুখেই ছিল অশ্বিনী। সে বউ ছেলেমেয়ের নামও করত না। ছুটির পর ব্রহ্মপুত্রের দিকে চেয়ে বসে থাকত। মাঝে মাঝে গভীর রাত্রে তার তাড়ি-খাওয়া মেজাজি গানের রেশ শুনতে পাওয়া যেত। ইরার মা’র সঙ্গে কখনও দেখা হলে দূর থেকে হাতজোড় করে নমস্কার করত সে। রমেন তার কাছে সাঁতার শিখেছিল।

মাঝেমধ্যে ইরার মা’র সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেলে কখনও-সখনও চমকে উঠত রমেন। মনে হত এই মহিলার চোখ কথা বলে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ বছরে দাদু মারা গেলেন। খুব শান্তভাবে। সন্ধ্যাবেলা ঠাকুরঘর থেকে বেরিয়ে খড়মের শব্দ তুলে দরদালানের ভিতর দিয়ে চলে গেলেন শোওয়ার ঘরে। তারপর শুয়ে পড়লেন। খুব অল্পক্ষণের মধ্যেই মারা গেলেন তিনি। সেই সময়ে রমেন বাবার সাদা ঘোড়াটায় চড়ে কেওটখালির মাঠে ট্রেঞ্চের গর্তগুলো লাফিয়ে পার হওয়ার চেষ্টা করছিল।

যুদ্ধের পর বিশাল পরিবর্তন এসেছিল পৃথিবীতে।

বাবার মৃত্যুর পর থেকে মা মাঝে মাঝে ভূত দেখতেন। ওই দেখাটা তাঁর নেশার মতো ছিল। সাতচল্লিশ সালের শেষ দিকে যখন রমেন কাশীপুরে আসে তখন মাকে জোর করে নিয়ে আসতে হয়েছিল। তার ধারণা ছিল কলকাতায় গেলে বাবার আত্মা আর তাকে দেখা দেবেন না।

নিঃসন্তান জ্যাঠামশাই মারা গিয়েছিলেন বাবারও আগে। জ্যাঠাইমা চলে গেলেন গোবরদিতে তাঁর বাপের বাড়িতে। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল মা ছাড়া রমেনের আর কোনও আত্মীয় নেই। তখন তার দু’ধারে দাঁড়াল প্রাচীন গাছের মতো দু’জন লোক৷ উদ্ধব আর লব। চারা গাছটিকে তারা বেড়ার মতো ঘিরে রাখার চেষ্টা করছিল। পারেনি।

অশ্বিনী থেকে গিয়েছিল। নরেন্দ্রনারায়ণ মেমোরিয়াল স্কুলের পিছনের খুপরিতে বসে ব্রহ্মপুত্র দেখার নেশা তাকে ছাড়েনি। একা সে তখন সুখী ছিল। বড়কর্তার দয়ার কথা লোককে বলত। ইরার মা তার দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে চলে এসেছিল। কাশীপুরের বাড়ির রান্নাঘরের পাশে তাদের জন্য টিনের ঘর তুলে দিয়েছিল উদ্ধব আর লব, শাসিয়ে দিয়েছিল যেন তারা ভিতর-বাড়িতে না আসে। কিন্তু ইরা আসত। মাঝে মাঝে ইরার মা থানকাপড়ের ঘোমটার ভিতর থেকে অতীব তীব্র চোখে দেখত রমেশকে। তার ছেলেমেয়েকে বুড়োকর্তা সকলের সামনে বর্ণসংকর বলে আলাদা করে দিয়েছিল, নিষেধ করেছিল বিয়ে দিতে। সেই অপমান বোধ হয় সে ভোলেনি।

তখন কলেজে পড়ে রমেন। ম্যাগাজিনে ললিত ভট্টাচার্য নামে একজনের প্রবন্ধ বেরোল— ভারতে সাম্যবাদ এবং কয়েকটি অসুবিধা। সেই প্রবন্ধে খুব জোরালো যুক্তিতে দেখানো হয়েছিল কীভাবে প্রাচীন আর্যরা অর্থনৈতিক কারণে মানুষকে বর্ণাশ্রমে ভাগ করেছিল। আপাতদৃষ্টিতে বর্ণাশ্রমকে বিজ্ঞানসম্মত বলে মনে হতে পারে। কিন্তু আসলে তা নয়। এ ছিল শোষণের দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থা। যে-ব্যবস্থা আজও কার্যকরী রয়েছে ভারতবর্ষে। ইত্যাদি।

তখন ইরার বয়স বোধ হয় যোলো-সতেরো। স্নিগ্ধ শরীর। শ্যামলা নরম রং। মায়ের কাছে বসে দুপুরে ফ্রেমে আঁটা সাদা কাপড়ে গোলাপ ফুলের নকশা তোলে। রমেনের পায়ের শব্দ পেলে নিঃসাড়ে উঠে আসে। জামা-জুতো ঠিক করে দেয়। রমেনের মাঝে মাঝে তাকে দয়া করতে ইচ্ছে হত। মাঝে মাঝে ভালবাসতেও। তাই ললিত ভট্টাচার্যের সেই প্রবন্ধটা বড় ভাল লেগেছিল রমেনের। সে তখন নিজের সমর্থনে একটা যুক্তি দাঁড় করাতে চাইছিল। আলাপ হওয়ার পর ললিত নামে সেই ছেলেটি আবেগতপ্ত স্বরে মানুষের মুক্তির কথা বলত। সেগুলো বিশ্বাস করেছিল রমেন। ক্রমে সে নিজেও মানুষের মুক্তির কথা বলতে শুরু করে।

বছর দুয়েক বাদে পাকিস্তান থেকে চলে এল অশ্বিনী। সে খুব একা বোধ করছিল সেখানে, তা ছাড়া বুড়ো বয়সের চিন্তাও ধরেছিল তাকে। সে কাশীপুরের বাড়িতে কয়েক দিন থেকে তারপর যাদবপুরের দক্ষিণে কোথায় খানিকটা জমি পেয়ে গেল, তুলে ফেলল দু’খানা ঘর। একদিন উদ্ধব চেঁচিয়ে রমেনের কাছে নালিশ করল, অশ্বিনী লুকিয়ে ইরার মা’র সঙ্গে দেখা করে, তাকে নিয়ে যেতে চায়। বুড়োকর্তার নিষেধ মানছে না অশ্বিনী, তার নাকি একা একা লাগে, বউ ছেলেমেয়ের জন্য প্রাণ কাঁদে। ইরার মাও পালাবার তালে আছে।

তখন মানুষের মুক্তির কথা ভাবে রমেন। তাই উদারভাবে বলল, ওর বউ ছেলেমেয়ে, ওর তো নেওয়াই উচিত। যদি যেতে চায়, তবে ইরার মাকে ছেড়ে দিয়ো।

তখন রমেন আর ছোট নয়। বিশাল লম্বা তার চেহারা, গলার স্বর গুরুগম্ভীর। উদ্ধব আর লব তাকে তখন সমীহ করতে শুরু করেছে। তারা দু’-একবার বুড়োকর্তার দোহাই দিল, কিন্তু তারপর একদিন অশ্বিনী তাদের চোখের সামনে দিয়েই নিয়ে গেল ইরার মাকে তার দুই ছেলেমেয়েসহ।

তখন প্রজারা আসত রমেনের কাছে। রমেন তাদের চেয়ারে বসতে বললে বসত না, উবু হয়ে মাটিতে কিংবা পিঁড়িতে বসে কথা বলত। তারা রমেনকে সম্মান করতে ভালবাসত। রমেন অনেক দিন ভেবেছে ওটা অন্তর্নিহিত দাসত্ব না সত্যিই ভালবাসা! প্রজারা আসত হাজার সমস্যা নিয়ে। কখনও জমি কিনবার আগে সেই জমি কেনা উচিত কি না তা জানতে, কখনও মেয়ের বিয়ে ঠিক করার সময়ে পরামর্শ চাইতে। অসুখে ডাক্তারের যে প্রেসক্রিপশন তা ঠিক হয়েছে কি না তাও দেখাতে আসত কেউ কেউ। এ ছাড়া টাকার সাহায্য, ছেলের চাকরি কিংবা নিছক পেটের কিছু না-জুটলে খাদ্যপ্রার্থী প্রজারা আসতই। দাদু বেঁচে ছিল বলে এতকাল প্রজাদের সঙ্গে সরাসরি দেখা হয়নি রমেনের। কিন্তু রমেন দেখেছে তাদের দেশের বাড়িতে প্রজাদের নিরন্তর আনাগোনা। তারা কত বিষয়-সমস্যা নিয়ে আসত দাদুর কাছে। দাদু তাদের বরাবর সঠিক পরামর্শ দিয়েছে। পাকিস্তান হওয়ার পরও কাশীপুরের বাড়িতে প্রজাদের আনাগোনা দেখে সে অবাক হয়েছিল। কিন্তু সে বুঝতে পারত যে প্রজারা তাদের পুরনো অভ্যাস মতো আসে, বুড়ো কর্তার জায়গায় ঠিক ওইরকম একজন সর্বজ্ঞ লোক চায় যে সঠিক পথ বলে দেবে। দাদু কখনও ভুল পরামর্শ দিতেন না। তবে কি দাদু সর্বজ্ঞ ছিলেন? না, তা নয়। দাদু তাঁর পূর্বপুরুষের কাছ থেকে প্রজাপালন শিখেছিলেন। ফলে যুবাবয়স থেকেই তিনি প্রজাদের সংস্পর্শে আসতে শুরু করেন। প্রজাদের যা সমস্যা তা তিনি জানতে শুরু করেন। আর সব কিছুর সমাধানের জন্য তিনি শিখেছিলেন চিকিৎসাবিদ্যা, চাষবাস, কামার কুমোরের কাজ, তাঁত চালানো, তিনি জানতেন মাছের গতিবিধি, তা ছাড়া জানতেন ফৌজদারি আইন, সর্বোপরি মনু পাতঞ্জল, গীতা ভাগবত, তাঁর প্রায় মুখস্থ ছিল বছরকার পাঁজি। আরও বোধ হয় অনেক কিছুই জানতেন দাদু, তাঁর না-জানা বিষয় ছিলই না। প্রজাদের মঙ্গলের জন্য দাদু অতখানি শিখেছিলেন, তাই প্রজাদের কাছে তিনি ছিলেন অপরিহার্য। এখন প্রজারা সেই অপরিহার্য বুড়োকার্তার খোঁজে রমেনের কাছে আসতে লাগল। রমেন প্রথমে দিশেহারা বোধ করত খুব। কিন্তু সে সবাইকেই সৎ এবং আন্তরিক পরামর্শ দিতে চেষ্টা করত। কিন্তু দেখতে পেত তার সাংসারিক জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা বড় কম। তা ছাড়া প্রজাদের সমস্যা হাজার রকমের। জমিদারি না পেলেও একটা বিপুল সংখ্যক প্রজাকে সে পেয়েছিল, আর পেয়েছিল দায়িত্বের উত্তরাধিকার। মানুষগুলোকে সে ফিরিয়ে দিতে পারত না, বরং সে দেখতে চাইত দাদুর কাছে এই বিপুল সংখ্যক মানুষ কী পেয়েছিল, এবং সে সেটা দিতে পারে কি না। ফলে অবসর সময়ে বা ছুটির দিনে রমেন গাঁ-গ্রামে ঘুরতে শুরু করে, প্রজাদের বাড়ি বাড়ি যেতে থাকে, জমি চেনে, রাত জেগে লবের কাছে শেখে হোমিওপ্যাথি, পড়ে আইনের বই। আর প্রতি সকালে-বিকালে কারও-না-কারও কোনও-না-কোনও সমস্যার সমাধান তাকে দিতে হয়। প্রজারা প্রায়ই আনত তরিতরকারি, প্রণামী দিত টাকা, এক নিঃসন্তান বুড়ো তার বিঘা তিনেক জমি উইল করে দিয়ে গেল মরার আগে। যাদবপুরের দক্ষিণে একটা জায়গায় রমেনদের প্রজারা বেশি জোট বেঁধে ছিল। সেখানে রমেন গিয়ে দাঁড়ালে একটা হইচই পড়ে যেত। এই অভিভাবকত্ব আস্তে আস্তে ভাল লাগতে শুরু করে রমেনের। প্রজাদের দুঃখ দুর্দশা দৈন্যের বিরুদ্ধে সে নিজেকে তৈরি করতে থাকে। এই সময়ে কলেজ ইউনিয়নের চোখা চালাক জেনারেল সেক্রেটারি ললিত আসত তাদের বাড়িতে। তাকে দেখত ঘুরে ফিরে, দেখত আসবাব, শুনত পিয়ানো বাজিয়ে রমেনের গান, তারপর মৃদু হেসে বলত, তোমার গা থেকে এখনও গন্ধ গেল না। এখনও তোমাকে সবাই ছোটকর্তা ডাকে।

রমেন লজ্জা পেত। অন্য দিকে রমেন তখন সাম্যবাদের ইশতেহার পড়েছে, কলেজ ইলেকশনে পোস্টার এঁকেছে রাত জেগে, চেঁচিয়ে বক্তৃতা করেছে, জিতিয়ে দিয়েছে ললিতকে। সে তখন মানুষের সাম্যের কথা, মুক্তি ও স্বাধীনতার কথা ভাবে, তর্ক উঠলে কথায় কথায় ললিতের মতো বলে, রাশিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখো।

এই দুই রকম বোধ তাকে কিছুদিন খুব দোলাচলে রাখল। এক দিকে তার মধ্যে ক্রমে ক্রমে বুড়োকর্তার ছাপ পড়েছে, অন্য দিকে ললিতের। দুটোকে মেলাবার একটা চেষ্টা করছিল সে। পারছিল না।

ঠিক এ-রকম সময়ে এক দিন হারু দত্ত নামে এক প্রজা এসে জানাল যে অশ্বিনীর মেয়ে ইরাবতী তাদের পাড়ার ছেলেগুলোর মাথা খাচ্ছে। তার ছেলে পরাণ ধরেছে ইরাকে বিয়ে করবে। অশ্বিনী আর সেই কায়স্থের বিধবাও সেই তালে আছে, মেয়েকে কারও ঘাড়ে গছাতে চায়। অথচ বুড়োকর্তার নিধেষ ছিল। ওদের জন্মের দোষ…

শুনে হঠাৎ রেগে গেল রামেন। ‘জন্মের দোষ’ কথাটা সে সহ্য করতে পারল না। এই লোকগুলো সেই কবেকার কথা মনে রেখেছে। বুড়োকর্তার কথা, তাই এরা ভুলতে পারছে না।

সেই মুহূর্তে রমেনের মন দাদুর দিক থেকে সরে এসেছিল। সে ভেবেছিল মানুষ জন্মমাত্রই স্বাধীন, মুক্ত, তার আবার শ্রেণীভাগ কীসের! তার মন দুলছিল। কতগুলো বিষয়ে সে দাদুকে স্বীকার করতে পারছিল না। ইরার মায়ের প্রতি দাদুর নিষ্ঠুর আদেশ এবং কয়েক বছর আগের সেই সন্ধ্যায় মেয়েটির ম্লান মুখখানা তার মনে পড়ছিল।

হঠাৎ একটা আবেগবশত সে হারু দত্তকে বলল, তোমরা কি ওদের ঘেন্না করো? কিন্তু আমি যদি ইরাবতীকে বিয়ে করি?

হারু সঙ্গে সঙ্গে হাতজোড় করে বলল, কর্তা, আপনি বিষ খেলেও কিছু হবে না। পাপ আপনাদের ছোঁয় না। কিন্তু আমরা কি তা পারি!

শুনে সামান্য একটু অহংকার বোধ করেছিল রমেন।

তারপর একদিন সে সোজা গিয়ে হাজির হল অশ্বিনীর বাড়িতে। তখন দুপুরবেলা। রমেনকে দেখেই অশ্বিনী গা ঢাকা দেওয়ার জন্য পিছ-দরজা দিয়ে পুকুর-ঘাটের দিকে রওনা হয়েছিল। রমেন প্রচণ্ড হাঁক মেরে ডাকল তাকে। সে বশংবদভাবে সামনে দাঁড়াতেই বলল, আমি তোমার মেয়েকে বিয়ে করব।

কপাটের আড়াল থেকে লালপেড়ে শাড়ির ঘোমটায় ঢাকা একখানা মুখ খুব উদগ্রীবভাবে কথাটা শুনল, তার চুড়িপরা হাতের একটা ঝনাৎ শব্দ শোনা গেল শুধু।

কেন যেন তখনই রমেনের মনে হয়েছিল সে কাজটা ভাল করল না।

বিয়েটা খুব সহজ হল না। রমেনের মায়ের ভূতরোগ থেকে তখন মাথায় ছিট দেখা দিচ্ছে। তবু মা শুনে কেঁদেকেটে একশা করলেন। লব গম্ভীর হয়ে বলল, তোমার সঙ্গে বুড়োকর্তার তফাত এই যে, তুমি বেশি দূর দেখতে পাও না, বুড়োকর্তা অনেক দূর দেখতে পেতেন।

প্রজারাও শুনে খুশি হল না কেউ। কেবল তাদের ছেলেদের মধ্যে যারা কলেজটলেজে পড়ছিল তাদের মধ্যে কেউ কেউ রমেনকে খুব বাহবা দিল।

উদ্ধব খুব বিষন্ন মুখে জিজ্ঞেস করল, অশনা তা হলে তোমার শ্বশুর হচ্ছে! দেখো, পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম কোরো না যেন।

সকলেরই অসন্তোষের কারণ ঘটিয়ে একদিন বিনা সমারোহে ইরাকে বিয়ে করে আনল রমেন। আর সেই সঙ্গে প্রজাদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা কমে গেল অনেক। তারা দেখল, বুড়োকর্তা— যিনি অনেক দূর দেখতে পেতেন— তাঁর কথা রমেন শুনল না।

বিয়ের পরেই রমেন ইরাকে সঠিক বুঝতে পারল। এ সেই নিরীহ অবোধ কিশোরী নয়, এ অন্য রকমের। ঝাঁঝালো শরীর ছিল ইরার, যতখানি ঝাঁঝ রমেনের ছিল না। প্রথমে অমিল হল সেইখানে। আর-একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়েছিল এই যে প্রতি দিন সকালে উঠে রমেন কেমন অবসাদ বোধ করত।

রমেন একদিন ইরাকে জিজ্ঞেস করেছিল, তোমার কি কোনও অসুখ আছে?

না তো! কেন?

কী জানি! আমার কেমন দুর্বল লাগে। মনে হয় একটা সংক্রামক কিছু তোমার কাছ থেকে এসেছে। আমার এ-রকম হত না তো।

আর একটা ব্যাপার রমেন লক্ষ করত, ইরা কখনও কারও ‘মা’ ডাক সহ্য করতে পারত না। প্রজারা তখনও কিছু আসে, তারা ‘মা’ বলে ইরাকে ডাক দেয়, আর ইরা কেমন কুঁকড়ে যায়। অস্থির বোধ করে। রমেন জিজ্ঞেস করলে বলত, মা-টা শুনলে আমার কেমন যেন নিজেকে অপরাধী লাগে।

ইরার মা বুদ্ধিমতী ছিল। বিয়ের পর শাশুড়ি সেজে কখনও এ-বাড়িতে আসত না। অশ্বিনী মাঝে মাঝে চুপিচুপি এসে বাইরে দেখা করত। রমেনের সঙ্গে দেখা হলে সে মাটি ছুঁয়ে প্রণাম করে ডাকত ‘ছোটকর্তা’। সম্পর্কটা ছিল আগের মতোই। কিন্তু একটা অসম্ভব হাস্যকর সম্পর্ক। লোকে এ-নিয়ে বলাবলি করত।

ইরা সারা দিন অস্থির বোধ করত। একটু নির্বোধ ছিল সে, স্বভাব ছিল ঢিলেঢালা, কথা বুঝতে সময় নিত। কিন্তু সে কিছুতেই নিজেকে রমেনের স্ত্রী বলে বিশ্বাস করতে পারত না। সম্ভবত ছেলেবেলায় ছোটখাটো জিনিস চুরি করা অভ্যাস ছিল ইরার। একদিন উদ্ধব এসে নালিশ করল যে, ইরা গোপনে কিছু জিনিসপত্র অশ্বিনীকে দিয়েছে। তার নিজের চোখে দেখা। সে ইরাকে ধরতেই ইরা কেঁদে ফেলেছে, আর অশনা পালিয়েছে।

রমেন শান্তভাবে উদ্ধবকে বলল, তাতে কী! ও ওর নিজের জিনিস দিয়েছে।

কথাটা উদ্ধব বিশ্বাসই করতে পারল না। ঠোঁট উলটে বলল, ওঃ! নিজের জিনিস!

এক বছর এ-রকমভাবেই রইল ইরা। তখন রমেন খুব ব্যস্ত মানুষ। আইন পড়ে, আর পার্টি করে, প্রজাদের মধ্যে ঘুরে ঘুরে কমিউন তৈরির চেষ্টা করে। কখনও প্রবীণ প্রজাদের মধ্যে কেউ তার বিয়ে নিয়ে প্রশ্ন করলে সাম্যের কথা শোনায় রমেন। কিন্তু সে স্পষ্টই বুঝতে পারত তার জনপ্রিয়তা অনেক কমে গেছে। সাধারণ মানুষের বুঝেছিল যে বুড়োকর্তার মুখ থেকে যা বেরোয় তা বেদবাণী। কিন্তু রমেন বুড়োকর্তার আদেশ লঙ্ঘন করেছে।

রমেন খুবই হতাশ বোধ করত। প্রজাদের মধ্যে প্রথম নিজের নেতৃত্ব বোধ করতে শুরু করে তার নেশা লেগে গিয়েছিল। সে বুঝতে পেরেছিল তার পূর্বপুরুষদের মতো, দাদুর মতো সেও এদের সুখে-দুঃখে নেতৃত্ব দিয়ে যাবে। মাঝে মাঝে প্রজারা তাকে বলেছে, আমাদের এলাকা থেকে আপনি ইলেকশনে দাঁড়ান। আমরা জিতিয়ে দেব।

ঠিক যে সময়ে সে দাদুর আসন নিতে যাচ্ছিল সেই মুহূর্তেই ইরাকে বিয়ে করায় তার ছবি ম্লান হয়ে গেল। অথচ ওদিকে সাম্যবাদের প্রতি বিশ্বাসও তার দানা বেঁধে ওঠেনি।

তখন দাদুর ক্ষমতা আস্তে আস্তে বুঝতে পারছে রমেন। যার মুখের কথার একটু অনুশাসন ভেঙে একজন একঘরেকে উদ্ধার করতে গিয়ে তার জনপ্রিয়তা কমে গেল। সে আশ্চর্য হয়ে সেই বিশাল গাছের মতো মানুষটির কথা ভাবত, যার ডালপালায় প্রজারা নিরাপদ নীড় বেঁধে আছে। যিনি জমিদার এবং নেতা। যিনি প্রজাদের সব ভালমন্দ জানতেন। রমেন এও বুঝতে পারে যে, প্রজারা তাকে যেটুকু মানে তা তার পূর্বপুরুষদের সুকৃতির গুণে। সে নিজে থেকে কিছুই অর্জন করেনি। তাই আজ যদি সে পূর্বপুরুষদের অনুশাসন ভাঙে তবে প্রজারা আর তার কথা শুনবে না।

রমেন তাই তখন মাঝে মাঝে মধ্যরাতে ঘুম থেকে জেগে উঠত। অস্থির বোধ করত। সাধারণ মানুষের জীবন, স্ত্রীর সঙ্গে বিছানা ভাগ করে শুয়ে সন্তান পালন করে, ঘর গোছানো সংসার করে জীবন কাটানোর কথা মনে করতেই তার মন খারাপ হয়ে যেত। সে কিছুতেই ভাবতে পারত না যে সে তার পূর্বপুরুষের মতো জীবন যাপন করবে না। বরং তার মনে হত একটা বৃহত্তর জীবনই তার জন্য অপেক্ষা করছে। যে জীবন বিশাল, যে জীবনের সঙ্গে হাজার হাজার মানুষের স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে, মানুষের ভালবাসা না পেলে সে বাঁচবে না। কে তাকে সেই অসাধারণ জীবন দেবে? কে তাকে দেবে সর্বজ্ঞত্ব? রমেন মনে মনে সেইরকম একজনকে খুঁজত। দাদু তাকে খুঁজতে বলেছিল।

বিয়ের এক বছর বাদে যখন ইরা মাত্র মাস দুয়েকের গর্ভবতী তখনই একদিন সে পালিয়ে গেল। উদ্ধব খবর দিল হারু দত্তর ছেলে পরাণ মাঝে মাঝে আসত এ-বাড়িতে। ইরার সঙ্গে বসে গল্প করত অনেক। খোঁজ নিয়ে জানা গেল পরাণও নেই।

লব তার বিষন্নতা আর লজ্জা দেখে বলল, তোমার নারীজ্ঞান নেই। যে উদ্ধার পেতে চায় না তাকে জোর করে উদ্ধার করেছিলে। বুড়োকর্তা কি মিছে বলেছিলেন? তিনি জানতেন।

তিনি জানতেন। ওই কথাই ছড়িয়ে গেল চারদিকে। রমেন দেখতে পেল প্রজাদের চোখ অন্ধ করে দাদুর ছবি ঝুলছে। তিনি জানতেন।

তারপর সেই জানাটাকেই অনেকভাবে জানতে চেষ্টা করেছে রমেন।

ইরাকে কেউ খুঁজল না। সে নিজেও নয়। তেমন কোনও অস্থিরতাও প্রকাশ করল না রমেন। তখন তার মন জুড়ে দাদুর ছবি।

কেবল মাঝে মাঝে সে প্রচণ্ড জোরে তার পুরনো মোটর গাড়িখানা চালিয়ে নিয়ে যেত উদ্দেশ্যহীনভাবে। ওই সময়েই একবার সে দুর্ঘটনায় পড়ে।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%