শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
লক্ষ্মীপুজোর পরদিন তুলসী আর মৃদুলা চলে যাচ্ছে। সকাল থেকেই গোছগাছ করছিল মৃদুলা। মাঝে মাঝে গোছানো থামিয়ে জানালার কাছে এসে দাঁড়াচ্ছিল। বাইরে বহু দূর পর্যন্ত কলকাতার হিজিবিজি দেখা যায়, একটা স্বচ্ছ ধোঁয়ায় আবৃত। কলকাতার বেশির ভাগই মৃদুলার অচেনা। সে কেবল এতকাল ধরে চিনেছে তাদের বেহালা, তার স্কুল কলেজ, কয়েকজন আত্মীয়ের বাড়ি, বড় জোর কয়েক বার গেছে বোটানিকসে কি চিড়িয়াখানায়—বাদবাকি কলকাতা তার কাছে অচেনা, রহস্যময় এবং ভয়াবহ। ঢাকুরিয়ার বাসার জানালা দিয়ে কলকাতার কিছুই দেখা যায় না। তবু মৃদুলা নির্নিমেষ চেয়ে ছিল। কোথায় যেন নাড়ির যোগ ছিঁড়ে সে চলে যাচ্ছে। মৃদুলার চোখে জল এসে যাচ্ছিল। বিয়ের পর একবারও বাপের বাড়ি যাওয়া হয়নি। কবে যে যাওয়া হবে আর! কয়েক দিন আগে তার চিঠি পেয়ে বাবা এসেছিল টুপুকে নিয়ে। বাবার শরীর ভেঙে গেছে অনেক, শরীরের বাঁধন ঢিলে হয়ে গেছে। মুখে কেমন খড়ি-ওঠা শুকনো ভাব, মুখচোখের অবস্থা খুব ব্যথাতুর। টুপু তেমনি লাজুক, তবে আরও একটু রোগা হয়ে গেছে। তাকে নিয়ে ছাদে চলে গিয়েছিল মৃদুলা। কত কথা জিজ্ঞেস করেছিল। কয়েক দিনের অদেখাতেই দিদিকে লজ্জা পাচ্ছিল টুপু, মাথা নিচু করে, চোখে চোখ না রেখে মিহি গলায় কথা বলছিল। কিছু দিন আগেই যে জলখাবার কম হয়েছে বলে দিদিকে পাখার ডাঁট দিয়ে মেরেছিল তা এখন তাকে দেখলে বিশ্বাসই হয় না। টুপুর কাছেই মৃদুলা শুনেছে বিভু এখন নামকরা গুন্ডা। তার দাপটে পাড়া অস্থির থাকে। কোমরে ছোরা আর পকেটে পাঞ্চ, ব্লেডের টুকরো, কখনও বা হাতে সাইকেলের চেন নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। রাত্রিবেলা মদ খেয়ে ট্যাক্সিতে ফিরে ট্যাক্সিওয়ালার ওপর হামলা করে। কখনও তাদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে পা ফাঁক করে সিগারেট ফোঁকে। সপ্তমী পুজোর দিন গলির মধ্যে সে টুপুকে মুখোমুখি পেয়ে রাস্তা আটকায়। জিজ্ঞেস করে, এই শালা, তোর দিদির ঠিকানা কী রে? টুপু ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়ে সত্যি কথা বলেছে যে, সে জানে না। বিভু হেসে বলেছে, ভাবিস না, তোর দিদির ঠিকানা ঠিক খুঁজে বের করব। ঢাকুরিয়ার দিকে থাকে আমি জানি। বিশে একদিন দেখেছে কালোমতো শুটকো একটা লোকের সঙ্গে যাচ্ছে। আমি ঠিক খুঁজে বের করব। তারপর দেখিস কী হয়। শুনে মৃদুলা ঠিক আগের মতোই ভয় পেয়েছিল, তবে কেন যেন বিভুর জন্যও এই প্রথম একটু কষ্ট হচ্ছিল তার। টুপুর কাছেই আরও শুনেছে, মা’র বুকে এখন কেমন একটা ব্যথা হয়। মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে যায়। ডাক্তার দেখে বলে যায় অসুখটা আসলে মনের। মৃদুলা সেকথা বিশ্বাস করে। প্রত্যেকটা পরিবারেরই একটা করে আলাদা ধাঁচ আছে। কোনও পরিবারে রাগ বেশি, যেমন তাদের রাঙা পিসিমার বাড়ির প্রায় সবাই রাগী। সে-রকম, কোনও পরিবারে বেশি লোভ, কিংবা কম। ঠিক তেমনই তাদের পরিবারে সকলেরই একটু ভয়ের ধাঁচ আছে। অল্পেই ভয় পায় তারা। আত্মসমর্পণ করে দেয়। তাই ওইটুকুন ছেলেটা, ওই বিভুর ভয়ে তাদের পরিবারটা তছনছ হয়ে গেল। নইলে তারা গুটিকয় নিরীহ মানুষ, মা বাবা টুপু আর সে মিলে কত শান্তিতে ছিল! রাতে তারা তাড়াতাড়ি খেয়ে নিত, তারপর মা বাবা আর দুই ভাইবোনের একটা ছোট্ট আসর বসত। কী যে সুন্দর ছিল সেই আসর! বাবা বলত কোর্টকাছারির অদ্ভুত সব গল্প, কত বার বাবার মক্কেল হরিদাসের অলৌকিক ক্ষমতার কথা শুনে তারা পরস্পরের গা ঘেঁষে বসেছে। হরিদাস ছিল গুরুতর লোক, গুরুর কথায় ওঠেবসে, সারা দিন দয়াল গুরুর মহিমার কথা লোককে বলে বেড়ায়। বর্ধমানের এক গাঁয়ে একটা লোক অল্পবয়সে সান্নিপাতিকে মারা যাচ্ছিল। তার কচি বউ আর মায়ের কান্না শুনে থাকতে না পেরে হরিদাস গিয়ে বসল তার বিছানায়। হেঁকে বলল, গুরুর নামে বসলাম, আমি বলছি এ রুগি মরবে না এখন। হরিদাস বসেই রইল, রুগিও রইল ঘোর জ্বরবিকারের মধ্যে বেঁচে। হরিদাস নড়ে না, রুগিও মরে না। গাঁয়ের কবিরাজ এসে দেখে বলে, রুগি শেষ হয়ে গিয়েছে, কিন্তু প্রকৃতির বিরুদ্ধে কী করে যেন বেঁচে আছে সে। সাত দিন নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে বসে রইল হরিদাস, রুগিও রইল। তখন খবর গেল হরিদাসের গুরুর কাছে যে, হরিদাস মুমূর্ষ রুগিকে বাঁচিয়ে রেখেছে, ক্রমে রুগির চোখ গর্তে চলে যাচ্ছে, শরীর হয়ে যাচ্ছে কাঠের মতো শুকনো, তবু বেঁচে আছে। হরিদাস বিছানা ছাড়ছে না, পায়খানা পেচ্ছাবে যাওয়ার সময়ে গায়ের চাদরখানা খুলে রুগির বিছানায় রেখে যায়। শুনেটুনে হরিদাসের গুরুদেব তামাকের নল মুখ থেকে সরিয়ে বললেন, যখন চাদর রেখে যাবে তখন সেটা সরিয়ে নিন। প্রকৃতির বিরুদ্ধে যাওয়া ভাল না। তাই হয়েছিল। হরিদাসের চাদর সরিয়ে নিলে সঙ্গে সঙ্গে রোগীর মৃত্যু ঘটেছিল। আর-একবার হরিদাস গুরুর নামে উৎসর্গ করা গাছ-পাকা একটা কাঁঠালকে একমাস ঘরে রেখে দিয়েছিল। সে কেবল গাছ থেকে পাড়ার সময়ে একবার বলেছিল, তোকে গুরুর নামে উৎসর্গ করছি, যখন সময় হবে তখন পাকিস। তারপর এক মাস নানা ধান্দায় ঘুরে বেরিয়েছে সে, এক মাস জগদ্দল কঁঠালটিও ছিল একই অবস্থায়। পাকেনি! এইরকম অবিচল ভক্তিও একদিন টলে গিয়েছিল হরিদাসের। তার ক্ষমতার কথা যখন চারধারে ছড়িয়ে পড়েছিল তখন নিজেকে সে মহাশক্তিমান ভাবতে শুরু করে। বসে বসে সে ভাবত, আমি কম কী? তারপর থেকেই আস্তে আস্তে তার ক্ষমতা নিবে যেতে লাগল। এতটাই নিবে গেল যে, শেষজীবনে সে গুরুর সঙ্গে মামলায় নামে, তার গুরুর নামে উৎসর্গ করা সম্পত্তি ফেরত চায়। অল্পেই বুড়িয়ে যাওয়া হরিদাস নিজের এই পাপের গল্প বলত বাবাকে, চটি খুলে মারত নিজের গালে। গুরু তার সম্পত্তি ফিরিয়ে দিলেন, আর ফিরিয়ে নিলেন তাকে দেওয়া সেই অপার্থিব শক্তি। হরিদাস বাবাকে দুঃখ করে বলত, সাধু মানে জাদুকর নয়, বরং ত্যাগী, প্রেমী। বড় দেরিতে সেটা বুঝলাম।
তাদের সেই পারিবারিক, ছোট্ট আসরটিতে আরও কত গল্প হত! তারা পরস্পরের গা ঘেঁষে, গা শুঁকে বসত। কলেজের বন্ধুদের গল্প করত মৃদুলা, কখনও বা গান শোনাত, কখনও কারও অদ্ভুত কথা বা আচরণ নকল করে দেখিয়ে হাসাত মা-বাবাকে। বেশ ছিল তারা—ভিতু, আমুদে, পরস্পরের মধ্যে গভীর সম্পর্ক। হঠাৎ বাজপাখির মতো ছোঁ মারল বিভু। নইলে আজও মৃদুলা বেহালার সেই বাসায় সকাল-বিকেল তানপুরা নিয়ে বসত, গ্রীষ্মের বিকেলে গা ধুয়ে চলে যেত ছাদে, বাবার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে তারা আর চাঁদ আর কলকাতার আকাশরেখায় রঙিন আলো দেখে কীরকম আনন্দ পেত!
বিভু জানেও না সে মানুষের কত ক্ষতি করেছে। সে চারজন ভিতু মানুষকে করে দিয়েছে দুর্বল, অসুস্থ, তাদের আয়ু যাচ্ছে কমে। তাদের সংসারে এখন লক্ষ্মী ছেড়ে যাওয়া ছন্নছাড়া ভাব। বাড়িতে কখন বোমা পড়ে সেই চিন্তায় বাবা কোর্টে ভাল সওয়াল-জবাব করতে পারছে না। অচিরে তার পসার কমে যাবে।
জানালা দিয়ে বাইরে কলকাতার সামান্য দৃশ্যটুকু দেখে মৃদুলা, আর ভাবে, এই শহর ছেড়ে সে যে চলে যাচ্ছে তার কারণও ওই বিভু। সেদিন সিনেমা হলে অনেকটা বিভুর মতো দেখতে সেই লোকটা তাকে চিমটি কেটে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকেই তুলসী কলকাতার ওপর খেপে গেল। ভাগ্যক্রমে মৃদুলার বিয়েও হয়েছে এক ভিতু মানুষের সঙ্গে, যে কেবল পালিয়ে যেতে শিখেছে, রুখে দাঁড়াতে জানেই না। ফলে, এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পাড়ি দিচ্ছে তারা দু’জন। কেমন হবে পলাশপুর জায়গাটা? আগে খুব পলাশপুরের নিন্দে করত তুলসী। আজকাল বলে, কলকাতায় থাকা মানে পৃথিবী এবং প্রকৃতির বিরুদ্ধে যাওয়া। এখানে পচে গেলাম। মৃদুলা জানে এ-সব মন-ভোলানো কথা। পলাশপুরে নিশ্চয়ই ভরসন্ধেয় শেয়াল চলে আসে উঠোনে, রাতদুপুরে কাঁদে কুকুর, ঘাসে গা মিলিয়ে চলে বেড়ায় সাপ, আর জোঁক লাফায়। গ্রামীণ মানুষগুলোর সঙ্গেও মিলমিশ হতে সময় লাগবে অনেক। তারা কলকাতার লোক, তারা এখন কলকাতার প্রকৃতির বিরুদ্ধে যাচ্ছে। কেমন লাগবে মৃদুলার?
দুপুরবেলা বাসনের বস্তার মুখ দড়ি দিয়ে বাঁধতে বাঁধতে তুলসী তার ঘেমো পরিশ্রান্ত মুখখানা মৃদুলার কানের কাছে এগিয়ে এনে বলল, মায়ের একটা সুন্দর সাঞ্চা-হাতা ছিল। পানের মতো দেখতে। কাঁসার, আর খুব ভারী। বউদি সেটা সরিয়ে রেখেছে কোথাও, খুঁজে বার করো দেখি।
উদাসীন গলায় মৃদুলা বলে, বাদ দাও। আমরা স্টেনলেস স্টিলের জিনিস কিনে নেব।
তুলসী মুখ বিস্বাদ করে বলে, ইঃ! সে-রকম জিনিস আর হয়! মা আমাকে একবার সেই হাতাটা দিয়ে পিটিয়েছিল। আমি ভীষণ কান্নাকাটি করায় মা বলেছিল, এটা তোর বউকে দেব, কাদিস না। হাতাটার একটা সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু আছে।
ভাগ-বাঁটোয়ারা অনেক কিছুই সরিয়ে রেখেছিল তুলসীর বউদি। কিন্তু মৃদুলা তেমন গা করল না। যেমন মৃত্যুর আগে মানুষের মায়া কমে যায় তেমনি মায়া কমে যাচ্ছিল তার। সে আড়ালে আবডালে কাঁদছিল।
বাসনের বস্তা বেঁধে তুলসী যখন ছাদের সিড়ির চাতালে বসে সিগারেট ধরিয়েছে তখন মৃদুলা তার পিঠ খুঁটে দিতে দিতে বলল, আবার আমরা ফিরে আসব। তুমি কলকাতায় চাকরি খুঁজো। ওখানে গিয়ে গা ছেড়ে দিয়ো না। গা ছাড়লে তুমি চাষাভুষা হয়ে যাবে।
কলকাতায় চাকরি! শুনে তুলসী একটু চমকে ওঠে। কয়েক দিন আগে ললিত তাকে বলেছিল, তুলসী, আমি সেক্রেটারি আর হেডমাস্টারকে বলে রাখব আমার চাকরিটা যাতে তোর হয়। সেই থেকে ভিতরে ভিতরে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধেও একটা লোভ কাজ করছে। মাঝে মাঝে হঠাৎ মনে হয়, কলকাতায় ললিতের চাকরিটা পেলে মন্দ হত না। পরমুহুর্তেই সচেতন হয়ে সে নিজেকে ধিক্কার দেয়। কিন্তু ভিতরে ভিতরে একটা টানা-পোড়েন চলতে থাকে। কোথায় যেন ভিতরে ভিতরে ভাল-তুলসী আর মন্দ-তুলসীর একটা অবিরাম মল্লযুদ্ধ চলছে। কেউ কাউকে হারাতে পারছে না। তাই মৃদুলার কথা শুনে তুলসী একটু চমকে ওঠে। তারপর নিঃশব্দে সিগারেট টানতে থাকে। অনেকক্ষণ পর হঠাৎ খেয়াল করে বলে, আজ যাওয়ার সময়ে ললিতের দেওয়া শাড়িটা পরে যেয়ো।
কেন?
এমনিই। শাড়িটা ও দিয়ে যাওয়ার পর একদিনও পরোনি।
বাঃ। আমি যে নীল মুর্শিদাবাদিটা—
না। তুলসী দৃঢ়ভাবে বলে, ললিতের দেওয়াটা।
একটু থমকে যায় মৃদুলা। বলে, আচ্ছা।
তারপর খানিকক্ষণ তুলসীর পিঠে হাত বুলিয়ে বলে, ললিতবাবু তো চাকরি ছেড়েই দেবেন! তখন তোমার ওখানে হয় না?
শুনে তুলসী চট করে দাঁড়িয়ে সিঁড়ি ভেঙে নামতে থাকে। মৃদুলা পিছু পিছু নেমে আসে। বলে, কলকাতায় তো আমাদের ফিরে আসতেই হবে। আমি চিরকাল পলাশপুরে থাকতে পারব না।
তুলসী ফিরে দাঁড়িয়ে হঠাৎ হেঁকে বলে ওঠে, আমি পলাশপুরের লোক। আজ থেকে আমি চিরকাল পলাশপুরের লোক। আই ডিজওন ক্যালকাটা।
পিতু মেয়েটাকে কোনও দিনই পছন্দ করত না মৃদুলা। পিতু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বাপ-মা’র সামনেই হিন্দি গান গুনগুন করে কোমর দোলায়। ছাদের আলসে থেকে ঝুঁকে রাস্তার ছেলেদের ইশারা করে! মৃদুলার সঙ্গে তার বনে না। কিন্তু আজ পিতু সারাদিন কাঁদছে। ‘বন্ধের পর পরীক্ষা না হলে ঠিক তোমার সঙ্গে চলে যেতাম কাকিমা, অনেক দিন থেকে আসতাম তোমাদের পলাশপুরে। সংসার গুছিয়ে দিয়ে আসতাম ঠিক শাশুড়িদের মতো।’ কান্নার ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মাঝে এ-রকম ঠাট্টাও করছে পিতু।
ইস! কত কাজের মেয়ে। জল গড়িয়ে খেতে পারে না। পরীক্ষার পরে যেয়ো, দেখব কেমন।
একটু হাসিঠাট্টা করেই পিতু ‘ইস, সত্যি চলে যাচ্ছ’ বলে থমথমে মুখ করে থাকে, চোখে টসটস করে জল। সঙ্গে সঙ্গে মৃদুলাও কঁদতে বসে।
স্টেশনে খুব বেশি লোক আসবে বলে আশা করেনি তুলসী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বিদায় জানাতে অনেক লোক এসে গেল। সময়মতো এল না কেবল সঞ্জয়। কথা ছিল সে তার গাড়ি নিয়ে এসে তুলসীকে স্টেশনে পৌঁছে দেবে। সঞ্জয়ের কথার খেলাপ বড় একটা হয় না। এটা সেই অন্যতম সদ্গুণ যার ওপর সঞ্জয় বড় হয়েছে। বেলা তিনটে অবধি তার জন্য অপেক্ষা করে অবশেষে ট্যাক্সি ধরতে হল।
বালিগঞ্জ স্টেশনের ওভারব্রিজের তলায় দাড়িয়ে ছিল লম্বা রমেন, উজ্জ্বল কিংবা শেষ উজ্জ্বল চেহারার চলিত, তার বা ধারে সার্জেন্টের পোশাক পরা, কোমরে পিস্তলওলা একজন লম্বা চওড়া লোক। দূর থেকে দেখে মনে হয়েছিল, ললিত আর রমেনকে পুলিশ ধরেছে। কাছে এসে শম্ভূকে চিনতে পেরে খুব জোরে শ্বাস ছাড়ল তুলসী। বলল, হাঁরে, আমি কলকাতায় থাকতে থাকতে তুই সার্জেন্ট হলি না! তোর ভরসায় নিশ্চিন্তে রাস্তায় হাঁটতাম কয়েক দিন।
শম্ভু শুনে তৃপ্তির চওড়া বোকা-হাসি হাসল একখানা। তারপর জড়সড় মৃদুলার পাশে শাড়ী-পরা কচি চেহারার পিতুকে আড়চোখে লক্ষ করে অকারণে পিস্তলের খাপের ওপর হাতখানা রাখল সে।
দূর থেকেই বাবা আর টুপুকে প্লাটফর্মে ভিড়ের মধ্যে লক্ষ করে হাত তুলল মৃদুলা। শরীর ভাল থাকলে চেঁচিয়ে উঠত। টুপ তাকে দেখতে পেয়ে বাবাকে ডেকে আঙুল দিয়ে দিদিকে দেখিয়ে দিল। কী করুণ, কী স্নেহময় হাসি ফুটল মুখে! পিতুর হাত ছাড়িয়ে ছুটে লাইন পেরিয়ে প্লাটফর্মে উঠে গেল মৃদুলা।
মাকে আনলে না বাবা! একটু দেখতাম।
তার শরীর ভাল না রে। তা ছাড়া বাড়িটা ফাঁকা থাকবে।
তোমরা কবে যাচ্ছ পলাশপুরে, বলল। আমরা ওখানে একা, একদম মন টিকবে না। তোমরা গিয়ে এক-দুই মাস থাকবে। বলতে বলতে মৃদুলা একটু থেমে ভাবে। তারপর বলে, চলো না, কলকাতার বাসা উঠিয়ে সবাই পলাশপুরে যাই। ওখানে সবাই কাছাকাছি থাকব।
পলাশপুর সম্পর্কে কোনও ধারণাই নেই মৃদুলার, কিন্তু সে মনশ্চক্ষে দেখতে পায় সে এক স্বপ্নের দেশ—যেখানে বাস্তবের কোনও রূঢ়তা নেই, যেখানে বাইরের দুর্দৈব এসে সংসার ভেঙে দেয় না, যেখানে সবাই চিরকাল সুখে থাকে। এইরকম এক পলাশপুরের চিন্তা করে সে বড় আশান্বিত হচ্ছিল।
বাবা তার মুখখানা খুঁটিয়ে দেখছিলেন। ধীর স্বরে বললেন, ভয়ে ভয়ে থেকেই আমরা শেষ হয়ে গেলাম। ছেলেটার বড় বাড় বেড়েছে। কেউ এমন নেই যে ওকে ঠান্ডা করতে পারে। কানাঘুষো শুনছি আজকাল খুনজখম শুরু করেছে।
মৃদুলার বুকের মধ্যে ধক করে ওঠে। ব্যর্থ হয়ে জিজ্ঞেস করে, তা হলে কী হবে! মা গো! তুমি শিগগির একটা কিছু করো। পলাশপুর এমন কিছু দূর নয়, তুমি ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করতে পারবে।
বাবা স্নান শুকনো মুখে হাসলেন, তাই কি হয়! পালিয়ে যাওয়াটা ভাল দেখাবে না। বরং সহ্য করে দেখি আরও কিছু দিন, তারপর না হয় অন্য পাড়ায় বাসা নেব।
একসময়ে ফাঁক বুঝে টুপু মৃদুলার কানে কানে বলল, দিদি, আমাকে পলাশপুরে নিয়ে যাবি? আমি জামাইবাবুর স্কুলে পড়ব।
মৃদুলা আকুল চোখে অসহায়ভাবে চোদ্দো বছরের টুপুর কচি, নরম আর ভিতু মুখখানা দেখে। কী যে বলবে ভেবে পায় না।
টুপু মৃদু স্বরে বলে, বেহালায় আমার একটুও ভাল লাগে না।
কেন রে?
টুপু কী একটু ভেবে লজ্জায় লাল হয়। চোখ নামিয়ে নেয়। কী করে সে মৃদুলাকে বলবে যে, পাড়ার রাস্তা দিয়ে সে হাঁটতে পারে না। বিভুর দল এখনও তাকে দেখলেই দুর থেকে চেঁচিয়ে বলে, এই বিভুর শালা। সেই থেকে ‘বিভুর শালা’ বলে খ্যাপায়। সে দুর্বল, ভিতু, মারপিট করতে পারে না, কাউকে ভয়ও দেখাতে পারে না। লজ্জায় সে কেবল মুখ লুকোয়। মাঝে মাঝে পড়ার টেবিলে বসে লজ্জায় আর অপমানে কাঁদে।
মৃদুলা বুঝতে পারে, টুপু পালাতে চায়। নিশ্চিন্ত, নিরাপদ এবং সম্মানজনক পরিবেশে চলে যেতে চায় সে।
টুপুর পিঠে হাত রাখে মৃদুলা। নরম গলায় বলে, যত দিন মা-বাবা আছে এখানে ততদিন তাদের কাছেই থাক। তুই ছাড়া দু’জনকে দেখবে কে? তুই কাছে না থাকলে মা বাবা আরও ভেঙে পড়বে। একটু চুপ করে মৃদুলা আবার বলল, মাঝে মাঝে যখনই ইচ্ছে হবে তখনই পলাশপুরে চলে যাবি।
কেমন একটু হতাশ আর স্তিমিত হয়ে যায় টুপু। এত দিন সে মনে মনে কল্পনা করেছে, কলকাতার বাইরে অনেক দূরে মেঠো সুন্দর গ্রামখানায় সে চলে যাবে, তারপর সেইখানেই থেকে যাবে সে। দিদিকে বললেই নিয়ে যাবে দিদি। বেহালার বাসায় আর ফিরে যেতে ইচ্ছে করে না তার। বড় ভয় করে, লজ্জা লাগে।
বাবা আর দিদি কথা বলছে, টুপু একটু দূরে সরে দাঁড়াল। প্লাটফর্মের শানে একটু জুতো ঘষল। অন্যমনস্কভাবে সে ভাবছিল, খুব শিগগিরই সে একটা ব্যায়ামাগারে ভরতি হবে। সারিবাদি সালসার বিজ্ঞাপনে যে বিপুল চেহারার লোকটাকে দেখা যায় দু’হাতে প্রকাণ্ড একটা সাপকে ধরে পিষে ফেলছে, ঠিক ওইরকমই একটা শরীর বানাবে সে।
অন্যমনস্কভাবে চারদিকে চাইছিল টুপু। হঠাৎ একসময়ে চোখ তুলে কিছু দেখে সে খুব স্থির হয়ে গেল। ওভারব্রিজের ওপরে লোহার রেলিঙের ওপর ভর দিয়ে একটা বিমের ধার ঘেঁষে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। তার চাপা গাঢ় কালচে রঙের প্যান্ট আর ঘি-রঙের টেরিলিনের শার্ট স্পষ্ট চেনা যায়। চোখে গগলস, খুব নির্বিকারভাবে সিগারেট টানছে। বিকেলের আলো খুব নিস্তেজ, তবু লোকটাকে চিনতে ভুল হয় না। চোখে গগলস বলে বোঝা যায় না কোন দিকে চেয়ে আছে। তবু টুপু বোঝে যে, বিভু তাকে দেখছে না, প্লাটফর্মের হাজারটা লোকের কাউকেই। তার চোখ এক নির্দিষ্ট জায়গায় স্থির।
ভয়ে টুপুর মুখ সাদা হয়ে গেল। দিদি কিংবা বাবা কেউ লক্ষ করেনি বিভুকে। টুপু তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিয়ে নিজের জুতোর ডগার দিকে চেয়ে রইল।
জিনিসগুলো যেখানে নামিয়ে স্তুপাকার করে রাখা হয়েছে সেখানে ছোট ভাইটার হাত ধরে নিজের বাবা-মার সঙ্গে আলাদা দাড়িয়ে ছিল পিতু। প্রকাণ্ড চেহারার সার্জেন্টটা তার দিকে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে। যত বড় চেহারা লোকটার ততখানি সাহসী নয়। বরং ভিতু। চোখে চোখ পড়ল তাড়াতাড়ি সরিয়ে নিচ্ছে। অত ঘাবড়াচ্ছে কেন ছেলেটা। পিতু তো চোখ দিয়ে বলতেই চাইছে যে, তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে। সার্জেন্টদের আমি সত্যিই পছন্দ করি।
ট্রাঙ্কের ওপর রাখা বেতের ঝুড়িটাকে একটু ঠেলে দিয়ে সেখানে বসল পিতু। ছোট্ট রুমালে নাকের নীচের সামান্য ঘাম চেপে নিল। তারপর হাতে থুতনি রেখে ঝুকে বসে চেয়ে রইল লোকটার দিকে। লোকটা কাকার চেনা, নাম নেছে শম্ভু। লোকটা যদি সাহসী হত তা হলে এই স্টেশনেই লোকটার সঙ্গে আলাপ হয়ে থাকত। কাল স্কুলের বন্ধুদের সে তার সার্জেন্ট-ভক্তের কথা অহংকার করে বলতে পারত।
ওদিকে অল্প অল্প করে ঘেমে যাচ্ছিল শম্ভু। মেয়েটার চোখে চোখ রাখতে পারছিল না। কচি সতেজ শরীরে, মোম-মাখানো মসৃণ চামড়া আর লম্বাটে ধাঁচের মুখওলা কিশোরীটা তাকে ওলটপালট করে দিচ্ছে। বেশ ভাইঝিটি তুলসীদার। যদি কোনও দিন সুযোগ হয় তবে সে তার লাল মোটরসাইকেলের পাশে ছোট খোপগাড়িতে বসিয়ে নিয়ে মেয়েটিকে সারা কলকাতা দেখিয়ে বেড়াবে।
এতদিন মেয়েদের কথা ভাবতেই পারত না শম্ভু। জিমনাশিয়ামের ইনস্ট্রাকটর কড়া ব্রহ্মচর্য করে যেতে বলেছিল তাকে। স্বাস্থ্যকে বরাবর ভালবেসে এসেছে শম্ভু। তাই এতকাল মেয়েদের ভাল করে চেনেনি সে। গোরুর মতো ছোলা মুগ খেয়েছে। কাঁচা ডিম গিলেছে। কিন্তু এবার এই প্রকাণ্ড শরীরটার একটা মূল্য পেতে ইচ্ছে করে। কেউ মুগ্ধ হোক, ভালবাসুক। পাখা ঝাপটাক বুকের মধ্যে। ছোট্ট পাখির মতো একটি মেয়ে, একটি কিশোরী।
শম্ভু প্রাণপণে ভেবে বের করতে চেষ্টা করল, এটা কীসের ইঙ্গিত।
শুক্রবার দিন বিকেলে অফিসের পর নিজের গাড়িতে নাকি দিঘায় গেছে সঞ্জয়। বাড়িতে রিনিকে ফোনে জানিয়ে গেছে যে, সে দিঘায় যাচ্ছে। তারপর থেকে আর কয়েক দিন তার কোনও পাত্তা নেই। এ দিকে ললিত আর রমেনকে অনেক আগেই বলে রেখেছিল সঞ্জয়, সামনের রবিবার তোরা আমার বাসায় খাবি। রমেনকে বলেছিল, তোর টাকাটা রবিবারে নিবি। সব দিয়ে-থুয়ে এবার আমি ঋণমুক্ত হব। অথচ রবিবারে তার বাসায় গিয়ে সে নেই জেনে দু’জনেই বেকুব। রিনি অবশ্য তাদের যথাসাধ্য আপ্যায়ন করেছে। কিন্তু খাওয়ার টেবিলে হঠাৎ রিনি ভেঙে পড়েছিল। খুব কান্নাকাটি করে বলল যে, প্রায়ই নাকি বাসায় ভুতুড়ে টেলিফোন আসে। একজন লোক টেলিফোনে বলে, মিস দাশগুপ্ত নামে কে একজন মেয়ের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায় সঞ্জয়। ময়দানের অন্ধকারে গাড়ি থামিয়ে এ ওর গায়ে ঢলে পড়ে। দিঘাতেও সঞ্জয় গেছে সেই মেয়েটির সঙ্গেই।
শুনে তুলসীর মন খারাপ হয়ে গেল। সঞ্জয় তাকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আজ গাড়ি নিয়ে আসেনি। তার অর্থ, সে এখনও ফোরেনি কলকাতায়। সঞ্জয় কথার খেলাপ করেছে আজ। অথচ কোনও দিন করত না। কতকগুলো সদ্গুণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে সঞ্জয়। ধৈর্য, অধ্যবসায়, অবিচল পরিশ্রম আর নিষ্ঠা— যে-গুণগুলো তাদের আর কারও নেই। যদি সঞ্জয়ের কখনও পতন হয় তবে তুলসীর কাছে অনেকগুলো সদ্গুণের অর্থ নষ্ট হয়ে যাবে।
চারিদিকে হই-হট্টগোল শুনে বোঝা যাচ্ছিল যে, ট্রেন আসছে। উবু হয়ে বসে থাকা লোকজন মুখের বিড়ি ফেলে উঠে দাঁড়াচ্ছে।
তুলসী চেঁচিয়ে বলে, শম্ভু, তুই তো ব্যায়ামবীর, আমার মালপত্রে একটু হাত লাগা।
শুনে শম্ভু গটগট করে হেঁটে গেল। পিতুর কাছে আসতেই উঠে দাঁড়াল পিতু। নিচু হয়ে ট্রাঙ্কটা হাতলে ধরে আলগা করে ওজন দেখার সময়ে শঙ্কু বড় মিষ্টি একটা গন্ধ পায়। না, এটা স্নো-পাউডারের গন্ধ নয়। সে-গন্ধ ছাপিয়ে কিশোরী-দেহের ঘামের বোঁটকা মিষ্টি নেশারু গন্ধ পায় সে। চকিতে এক টানে ট্রাঙ্কটাকে মাটি থেকে আলগা করে ফেলে। এক হাতে। সে জানে, এভাবে গায়ের জোরটা কাউকে দেখানো এক ধরনের বোকামি। চারপাশের লোকজন তাকে হাঁ করে দেখছে। কিন্তু সে আর কী করতে পারে! শরীরের জোর ছাড়া তার আর কী আছে যা সে মেয়েটিকে দেখাতে পারে?
ট্রাঙ্কটা আবার নামিয়ে রেখে পিতুর দিকে চেয়ে হাসল শম্ভু। বলল, তেমন ভারী নয় তো!
নয়! ভারী অবাক হয় পিতু। বলে, ওর মধ্যে একগাদা কাচের বাসন আর বই আছে। খুব ভারী হওয়ার কথা।
পরিতৃপ্তির বোকা-হাসি হাসল শম্ভু।
রমেন অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ করেছে, ওভারব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে কী যেন লক্ষ করছে দুর্গাপুরের সেই ছেলেটা। খুনি-চোখ পরকলায় ঢেকে রেখেছে। খুব অন্যমনস্ক। মাঝে মাঝে হাতের আঙুলের একটা আংটির পাথর মনোযোগ দিয়ে দেখছে।
প্লাটফর্মের মাঝামাঝি হেঁটে এসে ঘাড় ঘুরিয়ে ছেলেটিকে দেখল। বড় অসহায় ছেলেটির ভঙ্গি। পৃথিবীতে বড় অনিশ্চয়তা বোধ করছে ও।
তুলসীর শালা বাচ্চা ছেলেটি জুতোর ডগা শানে ঘষতে ঘষতে হঠাৎ মুখ তুলে ওভারব্রিজের ওপর দাঁড়ানো ছেলেটিকে দেখল। তার মুখ সাদাটে। তাতে লেখা আছে ভয়। রমেন বুঝতে পারছিল না, ওভারব্রিজের ওপর থেকে দুর্গাপুরের ছেলেটা কাকে দেখছে। সে খানিকটা আন্দাজে তুলসীর শালার পাশে দাঁড়াল। তার কাঁধে হাত রেখে বলল, কী হয়েছে?
ছেলেটা ভীষণ চমকে উঠে তার দিকে তাকাল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, না, কিছু না।
কিন্তু স্বস্তি পেল না রমেন। তার মন একটি কোনও বিপদের গন্ধ পাচ্ছিল। সে দাঁড়িয়ে থাকল। দেখল ওভারব্রিজের ওপর থেকে দুর্গাপুরের ছেলেটা আস্তে আস্তে সরে আসছে সিঁড়ির দিকে। একটু পরেই ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল ছেলেটা। কালো চশমার ওপর তার কোঁচকানো ভ্রূ আর চোয়ালের দৃঢ়তা লক্ষ করে রমেন। খুব কাছ দিয়ে বুক ঘেঁষে অন্যমনস্কের মতো হেঁটে গেল সে, কিন্তু রমেনকে লক্ষ করল না। তারপরেই ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল ছেলেটা।
তুলসীর শালা গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে মৃদুলা স্থির চোখে ভিড়ের ভিতরে কী যেন দেখছে। ঠোঁট কাঁপছে তার। তুলসীর শ্বশুরের চোখ কেমন ঘোলাটে, চঞ্চল। দু’ হাতে আঙুল মটকাচ্ছেন তিনি। হাঁ করে শ্বাস টানছেন।
ঠিক এই সময়ে গাড়ির গুড়গুড় গম্ভীর শব্দ হচ্ছিল। তুলসী হেঁকে বলল, রমেন, তোর তো কোনও পিছুটান নেই, আমার সঙ্গে পলাশপুর যাবি? কয়েক দিন থেকে আসবি আমার সঙ্গে! একা এত মালপত্র নিয়ে সন্ধেবেলায় নামতে কেমন ভয় করছে।
রমেন একটুও চিন্তা না করে বলল, যাব।
বিভু মনস্থির করতে পারছিল না। সে খবর পেয়ে সঠিক পিছু নিয়ে এসেছে স্টেশনে। ওভারব্রিজ থেকে দেখেছে মৃদুলাকে এতক্ষণ। কিন্তু হায় ঈশ্বর, এ কী চেহারা হয়েছে মৃদুলার? কী রোগা হতশ্রী, শুষ্ক চেহারা! চোখের নীচে কালি, হনুর হাড় উঁচু, ঠোঁটে শুকিয়ে আছে পানের রস। কনুইয়ের চামড়ায় পড়েছে কড়া। গায়ের রং ফ্যাকাসে। হায় ঈশ্বর! এর কাছে আর কী চাওয়ার আছে বিভুর?
এতকাল বৃথাই সে ডাকপিয়নকে ভয় দেখিয়ে মা-বাবাকে লেখা মৃদুলার চিঠিগুলো পড়েছে। লোক লাগিয়ে খুঁজে বের করেছে ঠিকানা। পিছু নিয়ে এসেছে এত দূরে। ভেবেছিল, পলাশপুর পর্যন্ত যাবে। তারপর একদিন ওর স্বামী স্কুলে গেলে নির্জন দুপুরে হানা দেবে মৃদুলার দরজায়। বলবে, ওই শুটকো লোকটার চেয়ে কি আমি খারাপ ছিলাম? দেখো তোমার জন্যই আমি আজ ফেরারি, পুলিশ কেস পিছনে নিয়ে ঘুরছি। এ-বিষয়ে তোমার কী বলার আছে!
কিন্তু খুব কাছ থেকে মৃদুলাকে দেখার পর বিভু ভিড় ঠেলে অনেক দূর এগিয়ে গেল। ফিরে এসে আর-একবার মৃদুলাকে দেখতে ইচ্ছে করল না। প্লাটফর্মের শেষ প্রান্তটা নির্জন। সেখানে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরাল সে। গাড়ি এসে গেলে সে উদাসীন চোখে লক্ষ করল, ঢেউয়ের মতো হাজার হাজার মানুষ আছড়ে পড়ছে গাড়িতে। তার উঠতে ইচ্ছে করল না।
গাড়ি ছেড়ে গেল। আস্তে আস্তে ট্রেনের কোনও একটা জানালায় কবেকার দেখা একটা আধ-চেনা লোকের মুখ লক্ষ করে হঠাৎ সে চমকে ওঠে। বড় সুন্দর মুখখানা। কবে, কোথায় যেন দেখেছে। ঠিক মনে পড়ল না। ভ্রূ কুঁচকে ভাবতে ভাবতে ফিরে যেতে লাগল বিভু।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন