একাদশ অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

এগারো

ললিতের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দু’জনে অনেকক্ষণ চুপচাপ হেঁটেছিল। আদিত্য আর শাশ্বতী। বড় রাস্তার কাছে এসে আদিত্য হঠাৎ আপন মনে হেসে বলল, এই হচ্ছে ললিত, বুঝলে সতী, এই হচ্ছে ললিত!

শাশ্বতী বুঝল, আদিত্য কোনও গভীর ভাবনার মধ্যে আছে। হয়তো কলেজ-জীবনের স্মৃতি কিংবা অন্য অনেক তুচ্ছ সুন্দর সব ঘটনার কথা। ‘এই হচ্ছে ললিত’ এই কথাটা দিয়ে শাশ্বতীকে কিছুই বোঝাতে চায়নি আদিত্য, সে নিজের মনেই ললিতের ছবি দেখছে, আর মনের সেই ছবিটাকেই দেখাতে চাইছে শাশ্বতীকে। শাশ্বতী লক্ষ করল, আদিত্যর চোখ অন্যমনস্ক। ট্রামলাইন পেরোবার আগে হঠাৎ পকেটে হাত দিয়ে ফিরে দাঁড়াল, আমার সিগারেট!

বিপজ্জনক রাস্তার মাঝখান থেকে শাশ্বতী তার জামার হাত ধরে টেনে সরিয়ে আনল। হাসল আদিত্য।

রাস্তা পেরিয়ে আদিত্য বলল, আমার সিগারেটের প্যাকেটটা বোধ হয় চায়ের দোকানেই ফেলে এসেছি। নিয়ে আসব? তুমি একটু দাঁড়াও, আমি নিয়ে আসি…

শাশ্বতী ভ্ৰূ কোঁচকায়, ক’টা সিগারেট ছিল প্যাকেটে?

গোটা চার-পাঁচ হবে বোধ হয়।

দূর! ওর জন্য এতটা রাস্তা যাবে! বরং এক প্যাকেট কিনে নাও।

নেব?

নাও।

আদিত্য সিগারেট কিনতে গেল কয়েক পা দূরের দোকানটায়। শাশ্বতী ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল আদিত্য দোকানের আয়নায় মুখ দেখছে। চোখের কোল টেনে ধরে দেখল চোখের রং, গালের একটা ব্রণ টিপল একটু, মুখটা সামান্য বেঁকিয়ে বোধ হয় নিজেকে ভেঙাল, ধৈর্যশীল দোকানদারটি ততক্ষণ সিগারেটের প্যাকেটটা তার দিকে বাড়িয়ে ধরে রইল। আদিত্য হাসল একটু, তারপর সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে হাত নেড়ে কী কথা বলতে লাগল দোকানির সঙ্গে। অনেকক্ষণ সময় নিয়ে প্যাকেট খুলল, সিগারেট বের করে দড়ির আগুনে ধরিয়ে নিল। এবং এতক্ষণ সময় সে একবারও শাশ্বতীর দিকে ফিরে তাকাল না। যেন তার সঙ্গে যে শাশ্বতী আছে এ কথা সে ভুলেই গেছে। শাশ্বতীর মনে হয় এখন যদি সে চুপে চুপে ট্রামে উঠে সরে পড়ে তা হলেও আদিত্য হয়তো ব্যাপারটা ঠিক খেয়াল করবে না। অন্যমনস্কভাবে এসে পরের ট্রামে উঠে কোথাও চলে যাবে। অনেকক্ষণ পরে হয়তো খেয়াল হবে তার যে শাশ্বতী তার সঙ্গে ছিল। তখন যে-অবস্থায় থাক লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে উঠে ট্রাম বাস বা ট্যাক্সি ধরে শাশ্বতীর খোঁজ নিতে ছুটবে। একদিন তারা দু’জনে সিনেমা ‘হল’ থেকে দুপুরের শো দেখে বেরিয়ে ভিড়ের মধ্যে আলাদা হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ভিড়ের মধ্যেও লম্বা আদিত্যকে দেখতে পাচ্ছিল শাশ্বতী। আদিত্য এক বারও মুখ ফিরিয়ে তাকে খুঁজল না। সোজা এগিয়ে গেল রাস্তায়, ভিড়ের জন্য আস্তে যাচ্ছিল একটা বাস, সোজা তার পাদানিতে উঠে গেল। ব্যাপারটা কী হল বুঝতে অনেক সময় লেগেছিল শাশ্বতীর। তারপর সারা বিকেল আর সন্ধে শাশ্বতীর কেবল কান্না পেয়েছিল বারবার। রাত আটটা নাগাদ তাদের বাড়িতে এসে আদিত্য হাজির। খুব অনুতপ্ত তার চোখমুখ। তাকে আড়ালে ডেকে বলল, ছিঃ ছিঃ…আমার কী যে হয়েছিল…ইস…মাইরি, আমি একটা পাগল! আসলে..বুঝলে সতী, ছবিটা ছিল ভীষণ অ্যাবজরবিং, আমি ওই ছবিটার কথা ভাবতে ভাবতেই কেমন যেন হয়ে গিয়েছিলাম…মাইরি দেখো, ভুলের জন্য হাতে সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়ে রেখেছি…পানিশমেন্ট…আর ভুল হবে না। শাশ্বতী দেখেছিল আদিত্যর বাঁ হাতে উলটো পিঠে সদ্য-পড়া একটা ফোস্কা, তখনও চারধারটার চামড়া লালচে হয়ে আছে। আদিত্যর অনুতাপে কোনও ভান ছিল না, শাশ্বতী জানে। এখন তার কেবল এইটুকুই মনে হয় যে, সে এমন একটা লোককে আঁচলে বাঁধছে যে-লোকটা খানিকটা পাগল-খ্যাপা, খানিকটা উদাসীন, যার মধ্যে ক্ষুধা-তৃষ্ণা-ভালবাসার বোধ অনেকটা ভোঁতা হয়ে গেছে। এখন একটু দূর থেকে আদিত্যকে দেখছিল শাশ্বতী। লম্বা ঢ্যাঙা রোগা ফরসা একটা লোক এলোমেলো এক ঝাঁকড়া চুল মাথায়, শার্টের ভাঁজ ঠিক নেই— দেখলেই বোঝা যায় বড় অস্থির স্বভাবের লোক। অত্যধিক কথা বলে আদিত্য, কথা বলার সময়ে তার চোখ নাচে, মুখের চামড়া কাঁপে, হাত-পা নড়ে। বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যায় না যে, বাগবাজারে সাত-আট কিংবা দশ পুরুষের প্রকাণ্ড একখানা দেড় বিঘার বাড়িতে সে থাকে— যেখানে শ্বেতপাথরের মেঝে, আর ঝাড়লণ্ঠন রয়েছে। আদিত্যর মুখেই শুনেছে শাশ্বতী যে, যদিও বাড়িটা শরিকে শরিকে কিছুটা ভাগ হয়ে গেছে, তবু আদিত্যরা এখনও দুটো মহল নিয়ে থাকে, যে-মহলে এখনও চোরা গুপ্ত-কুঠুরি আছে। আর আছে মাটির নীচে ঘর, সে-ঘরের কোনওটায় থাকে নগদ টাকা আর গয়না, কোনওটায় বেলেমাটির প্রকাণ্ড জালায় রাখা হয় গ্রীষ্মকালের ঠান্ডা জল, কোনও কোনও ঘর আছে যা এক সময়ে ছিল এ-মহলের ও-মহলের মধ্যে সুড়ঙ্গ-পথ। ভাবলেই ভয় করে শাশ্বতীর। ওই বাড়ির মধ্যে যদি কোনও দিন তাকে বউ হয়ে যেতে হয় (যদিও শাশ্বতীর সন্দেহ আছে, তাকে কোনও দিন আদিত্যর মা-বাবা বাড়ির বউ হিসেবে নেবে কি না!) তা হলে কত রকমের ভয়-ভাবনার মধ্যে গিয়ে পড়বে সে! সে সে-বাড়ির আচার-ব্যবহার-সহবত জানে না, সঠিক ভাষা কিংবা সভ্যতা জানে না, ওখানে চোরা গুপ্ত সব কুঠুরির মধ্যে প্রাচীন প্রেতাত্মারা ঘুরে বেড়ায়, কাঁকড়াবছে লুকিয়ে থাকে, রাত্রিবেলা ডেকে ওঠে তক্ষক, সেখানে শ্যাওলা-ধরা ছাদের ফাটল দিয়ে গজিয়ে উঠছে অশ্বত্থ গাছ। কত দূরে কোন অচেনা রাজ্যে চলে যেতে হবে তাকে। যদিও বাইরে থেকে অনেকটা জমিদারের মতোই দেখায় আদিত্যদের, কিন্তু আসলে তারা জমিদার নয়। কোনওকালে ছিলও না। তাদের বংশ বেনের। চিরকাল তারা ব্যবসা করেই এসেছে। কখনও বা তাদের ব্যবসা লোহার, কখনও তেজারতির। তাদের প্রজা নেই, গ্রামে সম্পত্তি নেই। আদিত্যদের ধারণা জমিদারদের তুলনায় তারা অনেক সৎ, অনেক কম অহংকারী। আমরা কখনও প্রজার রক্ত শুষে খাইনি, বুঝেছ, সতী! আদিত্য বলে, মানুষের মাথায় পা রেখে চলিনি আমরা, প্রজার সেলাম নিইনি। আমার বাবা চিরকাল খদ্দেরদের ‘বাবু’ বলে ডেকেছে। অমুকবাবু-তমুকবাবু নয়, শুধু ‘বাবু’। উঁচুদরের খদ্দেরকে বলেছে ‘হুজুর’। বলতে বলতে হাসে আদিত্য, আমরা বিনয়ী লোক। আর রমেনটা ছিল জমিদার। পূর্ব বাংলায় কোথায় কোন ময়মনসিংহে জমিদারি ছিল ব্যাটার, চিরকাল সেই জমিদারির দাপট খাটিয়ে গেছে। পাটিশানের পরে কলকাতাতেও দেখেছি ওর সব আগেকার প্রজাদের। একবার বাসে ওকে দেখে একটা বেশ ভদ্র চেহারার লোক তাড়াহুড়ো করে সিট ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, বসুন, ছোটবাবু, বসুন। বলেই সিটটা হাত দিয়ে একটু ঝেড়েও দিল। অথচ তখন আর লোকটা রমেনদের প্রজা নয়, রমেনও নয় আর জমিদার। তবু তখনও প্রজা-জমিদার স্বত্বের সম্পর্কটা রয়ে গেছে। না, আমরা ও-রকম নই, মানুষের আত্মা আমরা কিনে নিইনি। আমরা লাভ করেছি, এই পর্যন্ত, ব্যস! শাশ্বতী ঠাট্টা করে জিজ্ঞেস করেছে, তুমি তোমার বাবার খদ্দেরদের কী বলে ডাকো? বাবু? আদিত্য লজ্জা পেয়ে ঠোঁট উলটেছে, দূর! তাদের সঙ্গে আমার সম্পর্কই নেই। শাশ্বতী হাসে, লুকোচ্ছ কেন? বলো না! আদিত্য হাসে, বললে তুমি আর আমাকে ভালবাসবে না। বাঙালি মেয়েরা ভীষণ অহংকারী। তবু শেষ পর্যন্ত আদিত্য কিছুই লুকোতে পারে না, বলে দেয়। লাজুক হেসে বলেছে, ছেলেবেলায় আমিও খদ্দেরদের ‘বাবু’ বলে ডাকতুম। ব্যাপারটা যে অস্বাভাবিক তা বুঝতে পারতুম না। কলেজে ললিত রমেনদের পাল্লায় পড়ে আমার প্রথম লজ্জা হল। যখন আমি আমাদের খদ্দের দেখলে সম্মান করি, ‘বাবু’ ডাকি, তখন ও-দিকে রামেনকে দেখে বাসের সিট ছেড়ে দেয় ওর প্রজা। দেখেশুনে ঠিক করলুম আমি ব্যবসায় আর নেই। চাকরি করব। দেখো, তাই করছি। এখন আর বাবার খদ্দেরদের আমি চিনিই না। শাশ্বতী হাসে, এ মাঃ, তুমি কাউকে কোনও দিন ‘বাবু’ ডেকেছ ভাবতেই পারি না। আদিত্য মাথা নাড়ে, এখন আমি দুটোই অপছন্দ করি। কেউ আমাকে ‘বাবু’ ডাকুক, সেটাও। কাউকে আমি বাবু’ ডাকি, সেটাও। স্বার্থই মানুষকে ও-রকম ডাকায়। স্বার্থই মানুষকে ছোট কিংবা বড় করে দেখায়। নইলে দেখো রমেন আর আমি একবয়সি, একই ক্লাসে পড়তুম, তবু অনেক দিন পর্যন্ত রমেনকে আমার হিংসে হয়েছে। অথচ হওয়ার কোনও কারণ ছিল না। রমেনটা চমৎকার দৌড়োত, ভাল ফুটবল খেলত, গান গাইত, লম্বা চওড়া চেহারা ছিল, নায়কের মতো মুখশ্রী। সে-সব কিছুই আমার ছিল না। তবু কখনও ওর খেলাধুলো, গান বা চেহারার জন্য ওকে হিংসে হয়নি। কিন্তু যখনই মনে পড়ত বাসে একজন রীতিমতো ভদ্রলোক ওকে ‘ছোটবাবু’ বলে ডেকে সিট ছেড়ে দিয়েছিল, তখনই আমার বংশানুক্রমিক একটা স্বার্থে ঘা লাগত। আমি ব্যাপারটা সহ্য করতে পারতুম না। সবসময়ে রমেনের সঙ্গে নিজের তুলনা করে দেখতুম কে বড়, কে ছোট। তাই রমেনের বন্ধু হতে আমার অনেক সময় লেগেছিল। ললিত বা তুলসীর কোনও কমপ্লেক্স ছিল না, ওদের সময় লাগেনি। রমেন মাঝে মাঝে ওদের ঢাউস পুরনো মোটর গাড়িটা নিয়ে কলেজে আসত, আমরা চার-পাঁচজন সেই গাড়িতে চড়ে বেড়াতে যেতাম। গঙ্গার ধার দিয়েই সাধারণত গাড়ি নিয়ে যেত রমেন। অনেক দূর গিয়ে নির্জন কোনও জায়গায় গাড়ি থামিয়ে বলত, নাম। তারপর জামা-কাপড় খুলে আন্ডারওয়্যার পরে জলে ঝাঁপ দিত, চেঁচিয়ে ডাকত আমাদের, আয়রে। কেউ কেউ নামত জলে, আমি সাঁতার জানতাম না বলে নামিনি। রমেন একদিন জোর করে ধরে নামাল। ডায়মন্ডহারবারের কাছে উথাল পাথাল গঙ্গা, সেইখানে স্রোতের মুখে আমাকে টেনে নিয়ে গেল দূরে। আমি ওর কোমর জড়িয়ে ধরে ভয়ে চেঁচাচ্ছিলাম, ও মুখ ঘুরিয়ে বলল, চেঁচাস না, শালা। লোকে আমাকে সন্দেহ করবে। এখন তুই-আমি মিলেমিশে এক হয়ে গেছি, তুই ডুবলে আমিও ডুবব, ভয় নেই। বুঝলে সতী, রমেনটা কিছু ভেবেটেবে ও-কথা বলেনি। কিন্তু হঠাৎ আমার চেঁচানি বন্ধ হয়ে গেল। কেমন যেন সাহস পেয়ে গেলাম। আমি ডুবলে রমেন ও ডুববে— এই কথাটা বলার মধ্যে এমন একটা কিছু ছিল যা হঠাৎ ভীষণ একটা আনন্দ দিয়েছিল আমাকে। চারধারে বিপুল জলস্রোত, আমি সাঁতার জানি না, রমেন—একমাত্র রমেন ছাড়া তখন আর আমার কোনও অবলম্বনই নেই। ঠিক সে সময়ে ওই কথা কোনও ভরসার কথা নয়, তব আমি ভরসা পেলাম। মনের ভয় কেটে গেল। ও না-ভেবেই বলেছিল, তুই-আমি মিলেমিশে এক হয়ে গেছি। জলের মধ্যে আমি ওর কোমর ধরে ছিলাম বলেই বোধ হয় ও এই কথা বলেছিল। কিন্তু কথাটা যত বার পরে ভেবে দেখেছি তত বারই মনে হয়েছে ওই রমেন শাল মস্ত জ্ঞানীর মতো বলেছিল কথাটা। জলে হোক, ডাঙায় হোক, সুখে হোক, দুঃখে হোক, কোথাও-না-কোথাও একবার না একবার আমাদের মিলেমিশে এক হওয়ার কথা। কিন্তু আমরা তা হচ্ছি না। বুঝলে সতী, তারপর থেকেই আমি মনে মনে ছোট-বড়র ভাবটা আস্তে আস্তে তুলে ফেলার চেষ্টা করছি। ইচ্ছে করেই আমি বাবার ব্যবসাতে নামিনি, বাবা কত রাগারাগি করেছে। এতদিন কোন ঘুন-ধরা বনেদি পরিবারের মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু আমি তা করিনি। আদিত্যর এ-সব কথার মধ্যে খানিকটা সত্য ছিল, খানিকটা ছিলও না। শাশ্বতী জানে, আদিত্য সুখী ছেলে। আদরে মানুষ। সে এখনও তেমন কষ্টসহিষ্ণু নয়, কোনও দিন নিজে হাতে বাজারও করেনি। সবচেয়ে বড় কথা, এখনও নিজেদের ব্যবসা নিয়ে তার একটু অহংকার আছে, আর এখনও সে তার সেই বন্ধু রমেনকে একটু হলেও হিংসে করে। বাড়ি ছেড়ে এসে আদিত্য তাকে বিয়ে করবে, এটা ভাবতেও শাশ্বতীর ভাল লাগে না।

একটু দূর থেকে আদিত্যকে দেখছিল শাশ্বতী। অনেকক্ষণ দেখল। তারপর হঠাৎ একটু শ্বাস ছেড়ে আপন মনে বলল, পাগল!

সিগারেট ধরিয়ে তার পাশে এসে দাঁড়াতেই শাশ্বতী আদিত্যকে জিজ্ঞেস করল, দোকানদারের সঙ্গে কী অত কথা বলছিলে?

আদিত্য হাসল, সে অনেক কথা। প্রথমে জিজ্ঞেস করলাম, এখান দিয়ে চার নম্বর বাস কতক্ষণ পর পর যায়। তারপর ওর কাচ্চা-বাচ্চা, কারবার, দেশ-গাঁওয়ের কথা জিজ্ঞেস করলাম। খুব খাতির করল…

শাশ্বতী রাগ করে, আর আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম ঠায় এতক্ষণ! তুমি এক বার ফিরেও তাকালে না!

আদিত্য চুপচাপ সিগারেট টেনে গেল, তারপর অনেক ভেবেচিন্তে বলল, আমার মন ভাল নেই, তাই অন্যমনস্ক থাকার চেষ্টা করছিলাম।

শাশ্বতী চুপ করে অন্য দিকে চেয়ে থাকে।

আদিত্য হঠাৎ হাসে, ললিতকে কেমন দেখলে?

শাশ্বতী বলল, কেমন মানে?

আদিত্য ধীর চোখে অনেকক্ষণ শাশ্বতীকে দেখে, তারপর বলে, তোমার কি মনে হয় ও ব্যাটা টিকে যাবে?

শাশ্বতী ভ্রূ কোঁচকায়, ও-সব কী কথা! আমি কী করে জানব?

আদিত্য বলে, তোমার মেলোমশাইয়ের চেহারা অসুখের পর কীরকম হয়েছিল? খুব সুন্দর?

শাশ্বতী ইতস্তত করে, অত মনে নেই।

আদিত্য মাথা নাড়ে, আজ ললিতের যে-চেহারাটা আমি দেখলাম সেটা ওর আসল চেহারাই নয়। ও দেখতে অনেক সুন্দর হয়েছে। অনেক ব্রাইট। কিন্তু আমি বলছি সতী, এটা ওর চেহারাই নয়। অমন ঝলমলে চোখ ছিল না ওর। আসলে এটাই ওর শেষ চেহারা।

শাশ্বতী ধমক দেয়, ট্রাম আসছে। সরে এসো।

আদিত্য শাশ্বতীর দিকে তাকায়। বলে, লোকে মরে যাওয়ার আগে সুন্দর হয়।

শাশ্বতী বলে, সবাই হয় না।

আদিত্য একটু চিন্তা করে, সবাই হয় না, কিন্তু কেউ কেউ তো হয়। ধরো যারা পাপ-টাপ খুব একটা করেনি, যারা মোটামুটি সৎ পবিত্র জীবন যাপন করেছে, তাদের হয়তো ভগবান শেষ কয়েকটা দিন সুখের করে দেন। তখন ব্যাধি থাকে না, চেহারা সুন্দর হয়ে ওঠে, চোখ উজ্জ্বল হয়, পৃথিবীর ওপর আরও মায়া হতে থাকে। আর ঠিক এই অবস্থাতেই তারা হঠাৎ চলে যায়।

একটু চুপ করে থাকে আদিত্য, তারপর হঠাৎ বলে, মাইরি সতী, ললিতটা বরাবরই কেমন একটু পবিত্র ছিল। খুব পরোপকারী আর তেজি। তাই ওর চেহারার এই উজ্জ্বলতাটা ভাল নয়।

রাস্তায় ধুলো উড়ছে খুব। চারপাশে ভিড়। নাকে রুমাল চাপা দিয়ে শাশ্বতী একটু পিছিয়ে দাঁড়ায়, তারপর বলে, ট্রামে উঠবে না?

দাঁড়াও, সিগারেটটা শেষ করে নিই। অবশেষে ওরা উঠল একটা ভিড়ের ট্রামে। শাশ্বতী মেয়েদের সিটে বসবার জায়গা পেল। আদিত্য দাঁড়িয়ে রইল।

শাশ্বতী দেখল, আদিত্যকে খুব অন্যমনস্ক লেখাচ্ছে। একগাদা লোকের ভিড়ে দাঁড়িয়ে আছে আদিত্য, তার চোখে চোখ পড়তেই একটু ম্লান হাসল। তারপর দীর্ঘ শরীরটা অল্প একটু নুইয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগল। হয়তো বন্ধু ললিতের জন্য ওর মন খারাপ। কিংবা হয়তো এখন নিজের পরিবারের গোঁড়ামি, এবং শাশ্বতীকে বিয়ে করার অনিশ্চয়তার কথা ভেবে এর মন ভাল নয়। কে বলবে কোনটা ঠিক? কিন্তু শাশ্বতী জানে আদিত্যর মন একটা গানে ঢাল জায়গা, সেখানে জল দাঁড়ায় না। মাঝে মাঝে কেবল সুখ দুঃখ বিষতা কিংবা তীব্র কোনও অনুভূতি প্লাবনের মতো এলে চলে যায়। আদিত্য কখনও কখনও তাকে ভীষণ ভালবাসে, কখনও কখনও তার কথা ভুলে যায়। শাশ্বতীর ভয় করে।

শাশ্বতী তার এই বয়সের মধ্যে খুব বেশি পুরুষ দেখেনি। তাদের পরিবারে এক ধরনের অনুশাসন ছিল। বরাবর বাইরের ঘরে পরুষমানুষ এলে তারা ভিতরের ঘরে থেকেছে। রাস্তায় কখনও কারও সঙ্গে কথা বলেনি। হোটেল-রেস্টুরেন্ট বা সিনেমায় যায়নি অভিভাবক ছাড়া। উপহার নেয়নি অনাত্মীয় পুরুষের কাছ থেকে। বাইরে থেকে ফিরতে সন্ধে হলে বরাবর তাদের কৈফিয়ত দিতে হয়েছে। এই রকম অনুশাসনের মধ্যে থেকেও তার দিদি লীলাবতীর জীবনে একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। কী ভাবে তা হয়েছিল তা শাশ্বতী জানে না। শুধু জানে, একদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে লীলাবতীকে কয়েকজন শয়তান লোক গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। সারা রাত তারা লীলাবতীকে ব্যবহার করে খুব ভোরে ক্যালকাটা ফুটবল মাঠের বেড়ার কাছে ফেলে রেখে যায়, পৌষের শীত আর ঘাসের শিশিরের মধ্যে। লীলাবতীর জ্ঞান ছিল না, যখন তাকে কুড়িয়ে আনা হয়। তার তখন গা-ভরা জ্বর। মাস দেড়েক নিউমোনিয়া আর এক ধরনের আচ্ছন্নতার অসুখে ভুগে উঠবার পর সে যখন মাস দেড়েকের গর্ভবতী তখন সমীর সান্যাল নামে একজন উদার পুরুষ তাকে সব জেনে বিয়ে করে নিয়ে যায়। তাদের পরিবারে সেই প্রথম রেজিষ্ট্রি করে বিয়ে হল, এবং সেই বিয়েতে কোনও নিমন্ত্রণও হয়নি। বরাবর রেজিষ্ট্রি বিয়ের বিরোধী তার বাবা সেই বিয়েতে সাক্ষী দিয়েছিল, আর সাক্ষী দিয়েছিল তার দাদা কালীনাথ। তারপর গত আট-দশ বছর আর লীলাবতীর কোনও খবর রাখে না তারা। সমীর সান্যাল বা লীলাবতী তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে তাদের বিপদে ফেলেনি। কোথায় কীভাবে আছে তারা কে জানে! কিন্তু সেই ঘটনার পর থেকেই তাদের পরিবারের অনুশাসন অনেকটা ঢিলে হয়ে গেল। লীলাবতীর বিয়ে হয়ে গেলে বাবা এক দিন খুব গম্ভীরভাবে তাদের উঠোনে একটা গর্ত খুঁড়তে লাগল। প্রকাণ্ড গর্ত। তার ওপর লতাপাতা বাঁখারি দিয়ে একটা ছাউনি দিল। তারপর এক দিন তার মধ্যে ঢুকে জামা-কাপড় ছেড়ে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে বসে রইল। পাড়ার লোকেরা ভিড় করে এল সেই দৃশ্য দেখতে। বাবা তার সেই গুহার মধ্যে বসে লোকের সঙ্গে কথা বলত, নানা প্রশ্নের উত্তর দিত। বলত, দেখো, উদ্ভিদ জগৎ কত নির্বিকার, দেখো প্রকৃতির মধ্যে কোনও সমাজ নেই। আমি এইরকম নির্বিকার হতে চাই। কখনও বলত, দেখো, আমার ব্রহ্মতালু ভেদ করে একটা আমলকী গাছ গজিয়ে উঠবে। আমি ওইভাবেই আবার জন্ম নেব। তখন শাশ্বতীর বয়স আট কি নয়। বাবার সেই গুহার সামনে লজ্জায় কেউ যেতে পারত না বলে মা মাঝে মাঝে তাকে পাঠাত সেই গর্তের মুখ পাহারা দিতে। এক্কাদোক্কা কিংবা গুটি-খেলা ফেলে শাশ্বতী ঠায় দাঁড়িয়ে থাকত সেই গুহার সামনে। কেউ উঁকি মারতে এলে দু’হাত ছড়িয়ে পথ আটকাত, যাবেন না। যদি কেউ প্রশ্ন করত কেন? অমনি ফিক করে হেসে ফেলত সে, বাবা যে ন্যাংটো!

সেই সময়ে তার গুহাবাসী বাবার সম্পর্কে কিছু কুসংস্কারাচ্ছন্ন লোক রটনা করেছিল যে, তিনি তন্ত্রসিদ্ধ মহাপুরুষ, তাঁর মুখের কথা বিফলে যায় না। অনেকে আসত রেসের ঘোড়ার নম্বর বা লটারির টিকিটের ফলাফল জানতে। কিছু কিছু হয়তো বা মিলেও গিয়েছিল। তাই বাবাকে নিয়ে তখন বেশ হইচই চলছে পাড়ায়। অন্য দিকে ভেঙে যাচ্ছে তাদের পরিবার। তখন তার মা তাদের দুই ভাই আর দুই বোনকে নিয়ে দিশেহারা পাগল-পাগল। বি-এ পড়া ছেড়ে কষ্টেসৃষ্টে চাকরিতে ঢুকল কালীনাথ। বাবার আমল থেকে তারা চলে এল দাদার আমলে। অনেক গরিব হয়ে গেল তারা। হই চই করা আমোদপ্রিয় তার দাদা কালীনাথ, যাকে কোনও দিন সঠিক দাদার সম্মান দেয়নি শাশ্বতী, সেই কালীনাথ মাত্র বাইশ বছর বয়সেই হয়ে গেল তাদের অভিভাবক। চোখে রোল্ডগোল্ড ফ্রেমের চশমা, মুখখানা গম্ভীর, সারাদিন চাকরি আর টিউশানি আর রাতের কলেজে বি এ পড়তে পড়তে কালীনাথ হঠাৎ বুড়ো হয়ে গেল। তখন থেকেই কালীনাথ না-ছোড় একটা অম্বলের অসুখেও ভুগে আসছে। বাবা তার গুহায় বাস করল প্রায় বছরখানেক। তারপর সমতলে উঠে এল। বুজিয়ে দেওয়া হল সেই গর্ত! বাবা জামা-কাপড় পরতে লাগল। তবু, বাবা কোনও দিন আর পুরোপুরি ভাল হয়নি। চার-পাঁচ-ছয় মাস একরকম ভালই থাকে, তারপর আবার পাগলামি দেখা দেয়।

যদিও তাদের পরিবারটি ছিল নিরীহ শান্ত ভালমানুষদের পরিবার, তবু লীলাবতীর ঘটনার পর থেকেই তাদের পরিবারের অখ্যাতি রটে যায়। এই অখ্যাতি প্রবল সমস্যা হয়ে দেখা দেয় শাশ্বতীর মেজদি হৈমন্তীর বিয়ে দেওয়ার চেষ্টার সময়। যত বার হৈমন্তীর সম্বন্ধ এনেছে কালীনাথ তত বারই পাত্রপক্ষের কাছে বেনামা চিঠি গেছে, নয়তো কেউ-না-কেউ তাদের লীলাবতীর ঘটনার কথা জানিয়ে দিয়েছে, আরও জানিয়ে দিয়েছে যে, হৈমন্ত্রীর বাবা পাগল। পাত্রপক্ষ পিছিয়ে গেছে। ক্রমে বোঝা যাচ্ছিল যে, সম্বন্ধ করে স্বাভাবিকভাবে হৈমন্তীর বিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। অন্তত যত দিন লোকে লীলাবতীর কথা একেবারে ভুলে না যায়। তাই দাদা এবং মা ভেবেছিল, যদি কেউ পছন্দ করে বা ভালবেসে বিয়ে করে, একমাত্র তবেই হৈমন্তীর বিয়ে সম্ভব। কাজেই তাদের পরিবারে মেয়েদের ওপর যে দীর্ঘকাল একটা অনুশাসন ছিল সেটা হঠাৎ আলগা হয়ে গেল। দাদা তার বন্ধুদের নিয়ে আসত বাসায়, আলাপ করিয়ে দিত হৈমন্তীর সঙ্গে, মোটামুটি ভাল ছেলে দেখে হৈমন্তীর প্রাইভেট পড়ানোর কাজে বহাল করা হল কয়েক বার, কলকাতার বাইরে আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতেও বেড়াতে পাঠানো হল তাকে। হৈমন্তীর চেহারা ভাল ছিল না। সামনের দাঁত উঁচু, রং খুব কালো। প্রথম প্রথম স্বজাতি ব্রাহ্মণ ছেলেই জোগাড় করার চেষ্টা করছিল কালীনাথ। তারপর হাল ছেড়ে দিয়ে অন্য জাতেও হাত বাড়িয়েছিল। হৈমন্তীকে উপলক্ষ করেই তাই একদিন সহকর্মী আদিত্যকে বাসায় নিয়ে এল কালীনাথ। তাকে পরোটা আর অমলেট খাওয়াল। সে চলে গেলে মাকে ডেকে বলল, জাত-ফাত আর দেখো না। এ বিরাট বড়লোকের ছেলে। খুব সৎ। তা ছাড়া ওদের টাইটেলটাও খুব গোলমেলে— ওরা রায়। ব্রাহ্মণ না কি অন্য কিছু তা চট করে বোঝাও যাবে না। মা কোনও উত্তর দেয়নি, অসহায়ভাবে চুপ করে ছিল।

এ-কথা ঠিক যে, তাদের পরিবারে যখন এ-সব ঘাটছিল তখন তাকে, শাশ্বতীকে, কেউ লক্ষই করেনি। তার ওপর কোনও শাসন ছিল না। তবু শাশ্বতী ধরা দিল নিজের স্বভাবে।

নদীর কাছাকাছি ঘাস-ঢাকা মাটিতে যেমন একটা ভেজা ভাব থাকে তেমনই এক ভেজা-ভাব আছে তার শরীরে। অথচ তার শরীরের অনুভূতিগুলি খুব প্রখর। ছেলেবেলা থেকেই যদি কেউ তাকে আচমকা ছোঁয়, কিংবা গায়ে হাত দেয়, অমনি আপনা থেকেই তার শরীর কেঁপে ওঠে, গায়ে কাঁটা দেয়। শাশ্বতী জানে যে, তার শরীরে একটা শুদ্ধতা কিংবা পবিত্রতার ভাব রয়েছে, যেটা কোনও দিন নষ্ট করতে তার খুব কষ্ট হবে। তার তিনটে ডাক নাম আছে, মলু, ঠান্ডু আর সতী। গায়ের রং ময়লা বলে এক সময়ে বাবা তার নাম রেখেছিল মলিনা। সেই থেকে মলু। স্বভাবে ঠান্ডা বলে তার মা তাকে ডাকে ঠান্ডু। আর সকলে ডাকে, সতী। তার শরীর কিংবা স্বভাবের সঙ্গে তিনটে নামেরই কিছু মিল রয়েছে। সে স্বভাবে ঠান্ডা, লাজুক। যে-কোনও স্পর্শেই তার শরীর কেঁপে ওঠে। সম্ভবত সে-কারণেই, স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও সে পুরুষদের কাছাকাছি গেছে খুব কম। তার উপযুক্ত পুরুষ কে বা কেমন, এ-সব ভাবনা চিন্তা সে খুব কমই করেছে। কারণ সে বরাবর তার শরীর ও মনের ওই সহজাত পবিত্রতা বা শুদ্ধতাটুকুকে ভালবেসেছে, সে-শুদ্ধতা কোনও পুরুষের কাছে নষ্ট করতে তার খুব কষ্ট হবে। পাড়ার বখাটে ছেলেরা তার ওই পবিত্রতার ভাব লক্ষ করেই বোধ হয় সে হেঁটে গেলে ‘সিস্টার নিবেদিতা! সিস্টার নিবেদিতা!’ বলে চেঁচায়।

তার এই পবিত্রতার ভাবটুকু প্রথম নষ্ট করার চেষ্টা করে বোকা অভিজিৎ। তার প্রাইভেট টিউটর। অঙ্কে কাঁচা ছিল বলে স্কুল-ফাইন্যাল পরীক্ষার আগে কালীনাথ তার জন্য বি এস সি অভিজিৎকে ঠিক করে দিয়েছিল। অভিজিৎ অঙ্কে তুখোড় ছিল, আর সব বিষয়ে বোকা। কিছুদিন পড়ানোর পরই সে শাশ্বতীর প্রেমে পড়ে গেল। সপ্তাহে তিন দিন তার পড়ানোর কথা, লজ্জার মাথা খেয়ে সে আসত চারদিন কি পাঁচদিন। মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করত, তুমি দুপুরে ঘুমোও, না? তারপর দুঃখের ভান করে বলত, একজন সারা দিন রোদে রোদে ঘোরে, খেটে মরে, আর একজন ঘুমোয়! কখনও বা অঙ্ক না-মিললে সে শাশ্বতীকে মার দেওয়ার ভান করত, কানের লতি আলগোছে ধরে মাথায় ঠুস করে একটু থাপ্পড়। কখনও বা হঠাৎ চোখ ঘোলা করে বলত, দেখো তো আমার জ্বর হয়েছে কি না! কাল সারা বিকেল বৃষ্টিতে ভিজলাম! এ-সব বোকামির ফলে শাশ্বতীর ভালবাসা বেড়েছিল। অভিজিতের প্রতি নয়, তার নিজের শুদ্ধতার প্রতি। কারণ অভিজিৎ-এর কাছাকাছি সে তার শুদ্ধতাকে সবচেয়ে বেশি টের পেত।

তারপর অনেককাল আর পুরুষ ছিল না তার জীবনে। তার মেজদি হৈমন্তীকে উপলক্ষ করে যে-সব পুরুষ আসত তাদের কৌতূহলভরে দেখত শাশ্বতী। এদের মধ্যে কোন জন তার মেজদিকে পছন্দ করবে? ওই রকম কৌতূহল নিয়েই সে আদিত্যকে দেখেছিল। দূর থেকে, খুব বিষন্ন মুখে পরোটা আর অমলেট খাচ্ছিল আদিত্য। মাকে বলল, মাসিমা, আমার মন ভাল নেই। বাবার সঙ্গে ঝগড়া চলছে চার-পাঁচদিন ধরে। প্রথম দেখে আর কথা শুনে শাশ্বতী বুঝেছিল, আদিতা খুব সরল, তার মনে কথা থাকে না। আদিত্যকে তার মোটেই পছন্দ হয়নি। হৈমন্তী তার সঙ্গে অনেক কথা বলল, কিন্তু আদিত্য হৈমন্তীর সাজগোজ লক্ষ করল না, চোখে তেমন করে চোখ রাখল না। তারপরও সে অনেকবার গেছে শাশ্বতীদের বাড়িতে, কিন্তু কোনও দিনই সে বোধ হয় বুঝতে পারেনি কেন কালীনাথ তাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল। হয়তো আজও জানে না। তবে আদিত্য মিশুক ছিল, কথা বলত খুব। মাঝে মাঝে যেত তাদের বাড়ি, সবাইকে হাসিয়ে আসত কিছুক্ষণ। কখনও সে তার কৃপণ বাবার গল্প বলত, কখনও নকল করে দেখাত কীভাবে কালীনাথ অফিসে তার পেটের রোগের গল্প করে। বলার ভঙ্গিতে কত দিন তাদের সঙ্গে মা’ও হেসে গড়িয়ে পড়েছে। আদিত্য চলে যাওয়ার সময় তারা দুই বোন বারান্দায় বেরিয়ে আসত, চেঁচিয়ে বলত, আবার আসবেন। একদিন এই ‘আবার আসবেন’ শুনে আদিত্য থমকে দাঁড়িয়ে ইশারায় তাকে ডাকল। কাছে গেলে গলা নামিয়ে বলল, এসে কোনও লাভ আছে? যদি ভরসা দাও তবেই আসি। খামোকা এসে লাভ কী? যদিও পুরুষমানুষ খুব বেশি দেখেনি শাশ্বতী, তবু আদিত্যর কথাটা সে একপলকেই বুঝেছিল। তারপরেই একদিন আদিত্য একা তার সঙ্গে দেখা করল কলেজের সামনে, রাস্তায়…হৈমন্তীর আপত্তির কিছু ছিল না। একদিন বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে সে গুনগুন করে আদিত্যর ব্যাপারটা বলে দিল হৈমন্তীকে। হৈমন্তী একটুও আপত্তি করল না, অনেক পুরুষ দেখে সে তখন খানিকটা হকচকিয়ে আছে। কোনজন যে তাকে নেবে তা বুঝতে পারছিল না। কাজেই বিশেষ কারও ওপর তার পক্ষপাত থাকার কথা নয়।

এই আদিত্য। কখনও তাকে ছোঁয় না, খুব ঘেঁষাঘেঁষি করে কাছে আসার চেষ্টা করে না, মাঝে মাঝে তার কথা ভুলে যায়। মন্দ লাগে না শাশ্বতীর। সে এই প্রথম পুরুষ দেখছে বোকা অভিজিতের পর। মাঝে মাঝে তার শরীরের সেই অমোঘ পবিত্রতাটুকুর কথা ভেবে তার মন খারাপ হয়ে যায়। আসলে বয়স। বয়সের দোষ। পাড়ার ছেলেরা তাকে ‘সিস্টার নিবেদিতা’ বলে ভেঙায়। কিন্তু সত্যিই তো আর সে সে-রকম কেউ নয়! শাশ্বতীদের কি নিবেদিতা হলে চলে! তাই সে সুন্দর পবিত্রতার কথা আজকাল ভুলে যায় শাশ্বতী। ট্রাম-বাসের ভিড়ে লোকজন গা ঘেঁষে দাঁড়ায়, শাশ্বতী আর তেমন শিউরে ওঠে না। সে অনেকটাই ভুলে গেছে। ভুলে যাবে।

শাশ্বতী লক্ষ করল, রাসবিহারীর মোড়ের কাছে এসে গেছে তাদের ট্রাম, তবু বে-খেয়ালে অন্য মনে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আদিত্য। সে দাঁড়িয়ে আদিত্যকে বলল, নামবে না?

নামব। বলে হাসল আদিত্য।

নেমে বলল, কোন দিকে যাওয়া যায়?

আমি বাড়ি যাব। শাশ্বতী বলে।

বাড়িতে কে আছে তোমার?

কে নেই?

যে-ই থাক, আমি তো নেই!

আদিত্য হাত উঁচু করল একটা ট্যাক্সিকে। সেটা থামল না। ‘শালা…’ গাল দিল আদিত্য।

ট্যাক্সির কী দরকার! পয়সা কামড়াচ্ছে? শাশ্বতী বলে।

এখন বাসে-ট্রামে ভিড়।

চলো হেঁটে যাই। কোথায় যাবে?

লেক।

এইটুকু তো মোটে!

আদিত্য মাথা নাড়ে, দূর! অনেকটা রাস্তা।

দ্বিতীয় খালি ট্যাক্সিটা ধরল আদিত্য। পাশাপাশি বসে সিগারেট ধরাল। বলল, ললিতকে কেমন দেখলে?

তুমি এতক্ষণ ললিতের কথা ভাবছিলে?

আদিত্য হাসে, মাইরি সতী, ললিতটাকে আমি বড় ভালবাসতুম। বলে আদিত্য কী একটু চিন্তা করে, বলে, কিন্তু কীরকম ওর চেহারাটা দেখাল বলো তো আজ? ঠিক যেন ভগবানের বাচ্চা। ডিরেক্ট ভগবানের। তুমি লক্ষ করোনি?

আমি কি ভদ্রলোককে আগে আর দেখেছি নাকি?

আজ কেমন দেখলে?

ভগবানের বাচ্চা কেমন হয় জানি না তো!

ঠিক! আদিত্য হাসে, ওটা একমাত্র আমিই জানি।

তারপর চুপ করে থাকে।

কাছাকাছি কেউ সিগারেট খেলে গন্ধে শাশ্বতীর গা গুলোয়।

শাশ্বতী বলল, একটু সরে বসো। বাইরের দিকে মুখ করো।

আদিত্য ভ্রূ কুঁচকে তার দিকে তাকায়, আমার চেহারাটা কেমন? জিরাফের মতো?

এতক্ষণে শাশ্বতা হাসল। বলল, গায়ে মাংস লাগলে তোমাকে খারাপ দেখাবে না।

এখন দেখায়?

শাশ্বতী হাসে, কী জানি! চেহারা দেখি নাকি!

কী দেখো তবে?

চেহারা ছাড়াও অনেক কিছু থাকে।

দূর! আর কী দেখার আছে? মেয়েরা ছেলেদের আর কী দেখে? চেহারা কিংবা টাকা-পয়সা ছাড়া?

শাশ্বতী কপাল তোলে, দেখে না?

না। মাথা নাড়ে আদিত্য, বরং পুরুষরা দেখে। আজ আমি ললিতের চেহারায় যা দেখলুম, তুমি তা দেখোনি।

শাশ্বতী রেগে যায়। ঝেঁঝে ওঠে, থাকগে। আমার দেখার দরকার নেই।

আদিত্য হাসতে থাকে। তারপর আচমকা দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো গলা নিচু করে বলে, তুমি দেখোনি। কিন্তু আমি দেখেছি। তোমাকে ওর খুব পছন্দ হয়েছে।

শাশ্বতী কোনও উত্তর দেয় না। কিন্তু চমকে ওঠে। তার শরীর ঠিক আগের মতো এক অসহনীয় স্পর্শকাতরতায় কেঁপে যায়। কিন্তু ততক্ষণ ললিতের কথা তার সঠিক মনে ছিল না। কিন্তু চমকে উঠেই তার মনে পড়ল মুখখানা। তীক্ষ্ণ মুখ, চোখের দৃষ্টি গভীর মায়া-মমতায় জড়ানো। হয়তো আদিত্য ঠিকই বলেছে, মৃত্যুর আগে মানুষ সুন্দর হয়। ললিতকে আগে কখনও দেখেনি শাশ্বতী। কিন্তু এখন মনে পড়ল, মানুষটাকে সে সুন্দর দেখেছিল। কিন্তু এও ঠিক যে চেহারার সৌন্দর্য বলতে যা বোঝায় ললিতের তা নেই। বরং বিষঘ্নতা আছে, আর আছে খুব দূরের কোনও চিন্তা। কাছেপিঠের লোকজন বা স্থানকে লোকটা ভাল করে দেখে না। আদিত্যর ও-পাশে বসে মাথা ঝুঁকিয়ে কথা বলছিল ললিত। কয়টাই বা কথা। আদিত্যর শরীরের আড়ালে মুখখানা খুব ভাল করে দেখেওনি শাশ্বতী। তবু এখন মনে পড়ল সে-মুখে সাধু-সন্তের মতো কোনও সৌন্দর্য ছিল। শাশ্বতী চমকে উঠল। কিন্তু ভেবে দেখল, আদিত্য দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো কথা বলছে। শাশ্বতীকে অত অল্প সময়ে ললিত কতটুকু দেখেছে? শাশ্বতী জানে যে তার চেহারায় হঠাৎ দেখে পছন্দ হওয়ার মতো কিছু নেই।

কথাটা শুনে সে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে আদিত্যর মুখের দিকে চেয়ে রইল।

আদিত্য তখনও হাসছিল, বলল, তুমি যখন বলছিলে যে তোমার বাড়ি মাইকেল মধুসূদনের বাড়ির কাছেই ছিল, যশোরে সাগরদাঁড়ি কপোতাক্ষতীরে তখন হঠাৎ ওর মুখ-চোখ কেমন হয়ে যাচ্ছিল। বিহ্বল …হ্যাঁ, বিহ্বল কথাটাই ঠিক খাটে।

শাশ্বতী চুপ করে চেয়ে রইল।

খাপছাড়াভাবে আদিত্য বলল, ও শালা কবি।

একটু চুপ করে থেকে মাথা নাড়ল আদিত্য, শালা মরে যাবে।

আদিত্য ঝুঁকে শাশ্বতীর একখানা হাত ধরার চেষ্টা করে। তারপর আবার হাত টেনে নিয়ে শাশ্বতীর মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ পিট পিট করে বলে, মাইরি, সতী, তুমি রাগ করলে না তো! আমি যা দেখেছি তাই বলছি। অন্যায় হল?

শাশ্বতী আস্তে মাথা নাড়ে, তুমি ভুল দেখেছ।

সিগারেটের ধোঁয়া গলায় রেখে আদিতা অস্পষ্ট স্বরে বলল, ললিতকে আমি চিনি। আমরা যখন একসময়ে মেয়েছেলে নিয়ে আলোচনা করতুম, কার কীরকম মেয়ে পছন্দ, তখন প্রায়ই ললিত শ্যামলা রঙের মেয়ের কথা বলত। বলত, বাঙালি মেয়ের খুব ফরসা সাহেবি রং ওর পছন্দ নয়। আর বলত, সে মেয়ের সুন্দর চোখ আর অনেক চুল থাকবে।

আদিত্য মিটমিট করে শাশ্বতীর দিকে তাকায়, তোমার সঙ্গে মিলে যায়।

শাশ্বতীর বুক কাঁপে হঠাৎ। কেমন ভয় করে ওঠে। বলে, কী সব যা-তা বলছ!

সামান্য বিস্বাদ মুখ করে আদিত্য, মৃদু গলায় বলে, যা-তা কেন? এর মধ্যে তো কোনও দোষ নেই। তুমি যখন বলছিলে ‘আপনি ভাল হয়ে যাবেন’ তখন ওর মুখ-চোখ ঝলমল করে উঠল।

দূর!

আদিত্য হাসে, অন্যমনস্কভাবে বলে, দোষ কী সতী? ওর যা চেহারা দেখলাম আজকে—একটা টপ চেহারা—এই চেহারা নিয়ে বেশি দিন টেকে না কেউ। ওর দিন শেষ। তোমাকে দেখে ও যদি আনন্দ পেয়ে থাকে, তাতে দোষ কী? বরং আমি তোমাকে ওর কাছে নিয়ে যাব…

ট্যাক্সিটা থামিয়ে হঠাৎ মুখ ফেরায় ট্যাক্সিওয়ালা। সে মুখটায় বসন্তের দাগ, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখে কালো রোদ চশমা— রুক্ষ মুখখানা ফিরিয়ে বলল, কোথায় যাব?

সোজা। বলল আদিত্য। ট্যাক্সিওয়ালা সামান্য হাসে, সোজা আর কোথায়? রেল লাইনের ও-পাশে ট্যাক্সি যাবে না।

শাশ্বতী দেখল কথায় কথায় তারা বালিগঞ্জ স্টেশনে এসে পৌঁছে গেছে। তাদের যাওয়ার কথা লেকের দিকে, গড়িয়াহাটা হয়ে। গড়িয়াহাটা কখন পেরিয়ে গেছে!

আদিত্য ঠান্ডা গলায় ট্যাক্সিওয়ালাকে বলল, সোজাই যাব, রেললাইনের ও-পাশে। চলুন।

শাশ্বতী আদিত্যকে খানিকটা চেনে। ওই যে ট্যাক্সিওয়ালা বলল যে রেল লাইনের ও-পাশে যাবে না, তাইতেই জেদ চেপে গেছে আদিত্যর। কাজ থাক বা না-থাক সে এখন রেললাইনের ও-পাশেই যাবে।

শাশ্বতী মৃদু ধমক দিল আদিত্যকে, কী হচ্ছে?

তারপর ট্যাক্সিওয়ালার রূঢ় মুখখানার দিকে চেয়ে নরম গলায় বলল, আপনি গাড়ি ঘুরিয়ে নিন। গড়িয়াহাটায় আমরা ট্যাক্সি ছেড়ে দেব।

আদিত্য হঠাৎ বিড়বিড় করে ওঠে, না। গেলে তুমি গড়িয়াহাটায় যাও। আমি সোজা যাব।

কেন?

এমনিই।

ট্যাক্সিওয়ালা শাশ্বতীর দিকেই চেয়ে ছিল। শাশ্বতীর মুখ-চোখ ঝাঁ-ঝাঁ করে উঠল অপমানে।

ট্যাক্সিওয়ালা বলল, আপনারা ঠিক করে নিন কোথায় যাবেন। আমি গড়িয়াহাটায় পৌঁছে দিতে পারি, কিন্তু রেললাইনের ও-পারে যাব না।

কেন? আমি পয়সা দেব না? আদিত্য চেঁচিয়ে বলে।

দিলেই কী! ট্যাক্সিওয়ালা ঝেঁকে ওঠে, ও-পাশে ঘিঞ্জি রাস্তা, ভিড়, রাস্তা খারাপ, আমাদের ঝামেলা পোয়াতে হয়। গাড়িতে চোট হয়ে গেলে সে পয়সা আপনি দেবেন?

চেঁচামেচি শুনে দু’-একজন লোক ট্যাক্সির জানালায় উঁকি মারে। অসহায়ভাবে চেয়ে থাকে শাশ্বতী। তার ভয় করে। অভিমানে ঠোঁট কাঁপে তার। চোখে জল আসি-আসি করে। টলমলে চোখে সে দেখতে পায়, আদিত্য সামনের সিটের গায়ে থাপ্পড় মেরে বলছে, যেতে হবে, যেতে হবে। আর ট্যাক্সিওয়ালা মাথা নেড়ে বলছে, আমি যাব না। যা খুশি করুন।

যা কখনও করে না শাশ্বতী, তাই করল হঠাৎ। ঝুঁকে আদিত্যর উগ্র হাতখানা ধরল। শরীর কেঁপে উঠল তার, উত্তেজনার মধ্যেও। কাঁপা গলায় বলল, কী করছ তুমি? গাড়ি ঘোরাতে বলো।

আদিত্য একটুক্ষণ চুপ করে তার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। তারপর শান্তভাবে ট্যাক্সিওয়ালার দিকে চেয়ে হেসে বলে, ঠিক আছে, গাড়ি ঘুরিয়ে নিন।

ট্যাক্সিওয়ালা গাড়ি ঘুরিয়ে নেয়।

গড়িয়াহাটায় ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে লেকের দিকে হাঁটতে হাঁটতে আদিত্য হঠাৎ বলল, সতী, তুমি অত ভিতু কেন? ও শালাকে আমি ঠিক নিয়ে যেতুম রেললাইনের ও-পাশে কসবায়, কিংবা যেখানে খুশি।

তখনও শাশ্বতীর বুকে চাপ বেঁধে কণ্ঠরোধ করে আছে একটা অসহায় কান্নার ভাব। সে নাক টেনে স্খলিত গলায় বলল, সেটা খুব বাহাদুরি হত, না?

আদিত্য হাসে, বাহাদুরি নয়। কিন্তু ও যাবে না কেন?

অসুবিধে আছে বলেই যাবে না।

আবার চিড়বিড়িয়ে ওঠে আদিত্য, অসুবিধে ঘোড়ার ডিম।

রাগে লাল হয়ে যায় আদিত্যর ফরসা মুখ। শাশ্বতী লক্ষ করে। কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটে তারা। একসময়ে হঠাৎ আবার হেসে ওঠে আদিত্য। বলে, বিপদে পড়লে তোমাকে খুব অদ্ভুত দেখায়। আজ দেখলাম।

শাশ্বতী উত্তর দেয় না।

আদিত্য আপন মনে বলে, খুব প্যাশনেট। কিন্তু এমনিতেই তুমি ভীষণ ঠান্ডা। তোমার উত্তেজনা নেই। না?

শাশ্বতী উত্তর দেয় না। কিন্তু তার সামান্য লজ্জা করে।

আদিত্য বলল, আজ আমি মানুষজনকে কেমন উলটোপালটা দেখছি। ললিতকে কেমন দেখলাম। হঠাৎ তোমাকেও! তোমার এত প্যাশন কোনও দিন দেখিনি!

অনেকক্ষণ ধরেই আদিত্য কী একটা কথা তাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতে চাইছে, শাশ্বতী বুঝতে পারছে না। ললিতের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার পর থেকেই আদিত্য অন্য এক রকমের ব্যবহার করছে তার সঙ্গে। অকারণ ঝগড়া করল ট্যাক্সিওয়ালার সঙ্গে, তাকে বোঝাবার চেষ্টা করল ললিতের তাকে খুব পছন্দ, বারবার জিজ্ঞেস করল ললিতকে সে কেমন দেখল। আদিত্যর সঙ্গে তার সম্পর্কটা মাত্র ছ’-সাত মাসের পুরনো। এই অল্প সময়ে সে আদিত্যকে খানিকটা চিনেছে, খানিকটা চেনেওনি। আজ, এখন আদিত্যকে তার খুব অচেনা লাগছিল। তার রহস্যময় কথাবার্তা ভালও লাগছিল না তার। আদিত্য আবার ঘুরে ফিরে ললিতের কথা উল্লেখ করায় সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।

রাস্তায় ভিড়। অন্ধের মতো এলোপাথাড়ি হাঁটছে লোকজন, গায়ে ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে। তবু ফুটপাথের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে শাশ্বতী বলল, তুমি কী বলতে চাও, স্পষ্ট করে বলো।

আদিত্য থতমত খেয়ে যায়। বলে, কী স্পষ্ট করে বলব?

তুমি একটা কিছু বলতে চাইছ, আমি বুঝতে পারছি না।

দূর! বলে হাসল আদিত্য। তারপর বলল, চলো।

হাঁটতে হাঁটতে আবার হাসিঠাট্টার ছলে আদিত্য বলে, দেখো, সতী, দেখো বিবেকানন্দের মূর্তি আর ওই দেখো রামকৃষ্ণ মিশন। ওই বাড়িটার ভিতরে কখনও গেছ তুমি? গেলে তোমার মনে হবে ঠিক আমেরিকার কোনও বড়লোকের বাড়িতে ঢুকেছ…

শাশ্বতী আদিত্যর মুখ একপলক দেখে পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছিল।

আদিত্য কিছুক্ষণ আবোল-তাবোল বকে গেল। তারপর হঠাৎ ওপর দিকে হাত ছুড়ে বলল, দূর ছাই! তুমি এত চালাক কেন?

শাশ্বতী আদিত্যর মুখ একপলক দেখে নিল। আদিত্য ভ্রূ কুঁচকে আছে।

লেকের পারে ঘাস-জমিতে বসে আদিত্য বলল, ঠিক সতী, আমি তোমাকে একটা কিছু বলতে চাইছি।

কী সেটা? মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করে শাশ্বতী।

ললিতকে তুমি কেমন দেখলে?

সেই পুরনো প্রশ্ন? এ পর্যন্ত কয়েক বার জিজ্ঞেস করল আদিত্য।

শাশ্বতী অবাক হয়। বলে, আবার সেই এক কথা?

আদিত্য লজ্জা পেয়ে মুখ নামায়। শাশ্বতী দেখে আস্তে আস্তে ওর মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে।

মুখ নিচু করেই আদিত্য বলল, সতী, আমি ভীষণ হিংসুক। ছেলেবেলা থেকেই। আমি ব্যবসাদারের ছেলে, আমার মনে এতটুকুও মহত্ত্ব নেই।

শাশ্বতী সঠিক বুঝল না। তবু বলল, কী-সব বলছ?

স্নান হাসে আদিত্য। তারপর বলে, সতী, আমাদের পরিবারে কোনও কালচার নেই, বাপ-দাদাদের মধ্যে আমিই প্রথম গ্র্যাজুয়েট। জোর করে পড়েছিলুম, নইলে ম্যাট্রিক ক্লাসের আগেই আমার ব্যবসাতে নেমে পড়ার

তাতে কী?

তাতে অনেক কিছু সতী। কিছুতেই আমার নিজেকে তোমার সমান বলে মনে হয় না। ফাঁক থেকে যাচ্ছে। কেবল মনে হয়, তোমার মধ্যে বংশানুক্রমিক একটা কিছু আছে যা আমি ধরতে পারছি না! তোমার সঙ্গে আমার জাত মেলে না।

শাশ্বতী স্তম্ভিতভাবে আদিত্যর ম্লান মুখ দেখে। তারপর আকুল হয়ে বলে, ছিঃ। এ-সব কী কথা? জাত আবার কেউ মানে নাকি আজকাল?

আদিত্য মাথা নাড়ে, সে-জাত নয়। কিন্তু মানুষের স্বভাব অনুযায়ী তো এক-একটা জাত থাকে। সেই জাত মিলছে না।

শাশ্বতী গম্ভীর হয়ে বলে, হঠাৎ একথা কেন?

কমপ্লেকস। আদিত্য উত্তর দেয়। একটু চুপ করে থেকে বলে, তুমি আর ললিত চায়ের দোকানে আমার দু’পাশে বসে ছিলে। খুব অল্পই কথা হয়েছে তোমাদের। যা কথা বলার আমিই বললুম, হাসিঠাট্টা করলুম। কিন্তু তোমরা দু’জনে আমার দু’পাশে বসতেই আমার মনে হয়েছিল তোমরা দু’জন এক জাতের। আমি তোমাদের সমান নই। আর তক্ষুনি আমার মনে হচ্ছিল, তোমরা, তুমি আর ললিত, পরস্পর নিঃশব্দে কথা বলছ। সে-কথা চোখ-মুখের কোনও ইঙ্গিতে নয়। সেটা হচ্ছিল আরও রহস্যময় সাংকেতিক কোনও সূত্রে, যা আমি বুঝতেই পারলুম না। সেটা বোঝার সাধ্যই আমার নেই, আমার জাত একদম আলাদা। অথচ তোমাদের মধ্যে তেমন কোনও কথাবার্তাই হয়নি, এমনকী তোমরা কেউ কাউকে খুব ভাল করে দেখোওনি। একবার তুমি কেবল ব্যাকুল হয়ে বলেছিলে, দেখবেন, আপনি ভাল হয়ে যাবেন, আর-একবার ললিত তোমার বাড়ি যশোরে শুনে আগ্রহ দেখিয়েছিল। ব্যস, এইটুকু। তবু আমার মনে হচ্ছিল, আমাকে মাঝখানে রেখে অনেক কথা নিঃশব্দে চালাচালি হয়ে গেল তোমাদের। আমি স্বার্থপর, ব্যবসাদারের বাচ্চা, ফালতু পার্টি, মাঝখানে বোকার মতো বসে রইলুম। সে-সব কথা ধরতেই পারলাম না। আমার সেই সূক্ষ্ম অনুভুতিই নেই। যা ললিতের আছে। তোমারও আছে। কিন্তু আমার নেই।

শাশ্বতীর গলা আটকে ছিল। কথা বলতে পারছিল না সে। আদিত্যর লাল আভার লাজুক মুখখানা গভীর তৃষ্ণা এবং বিতৃষ্ণায় দেখতে দেখতে তার চোখে জল এসে গেল। কিন্তু চোখের জল টের পেল না সে।

খুব কষ্টের সঙ্গে সে বলল, ও-রকম কিছুই হয়নি।

জানি। আদিত্য নরম সুরে বলল, কিন্তু আমার সন্দেহ হয়েছিল।

সিগারেট ধরায় আদিত্য। তারপর বলে, ললিতকে আজ অসম্ভব সুন্দর দেখেছিলাম আমি। তোমাকে সে কথা বারবার বললাম, কিন্তু তুমি স্পষ্ট স্বীকার করলে না। আমার সন্দেহ বেড়ে গেল। মনে হল, তুমিও ওর ওই অসম্ভব সুন্দর চেহারাটা ঠিকই দেখেছ, কিন্তু মুখে বলছ না। বলছ না কারণ সেটা তোমার গোপন কথা। তোমরা একে অন্যকে বুঝেছ, কিন্তু আমাকে সেটা বুঝতে দিতে চাও না।

শাশ্বতী কিছু বলতে চেষ্টা করে। পারে না।

আমি একটা ছোটলোক। আদিত্য বলে, আমি হিংসুক। কিন্তু সত্যি বলো সতী, ললিতকে তুমি কেমন দেখলে?

শাশ্বতী শিউরে ওঠে।

আদিত্য! হায় আদিত্য! আদিত্য এতক্ষণ ধরে না খুঁচিয়ে তুললে ললিতের মুখ শাশ্বতীর মনেই পড়ত না। আকুল হয়ে মাথা নিচু করে কাঁদে শাশ্বতী।

আদিত্যর গলা ভারী হয়ে এসেছিল। সে আস্তে আস্তে বলল, আমি ভীষণ নোংরামি করছি সতী। তবু তুমি বলো ললিতকে তুমি কেমন দেখলে আজ?

বলতে বলতে একটা হাত তার দিকে বাড়িয়ে দেয় আদিত্য, আমাকে ছুঁয়ে বলো, সতী!

শাশ্বতী মুখ তুলল। তার দিকে বাড়ানো আদিত্যর হাতখানা দেখেই হঠাৎ শিউরে উঠল তার শরীর। তার সেই জন্মগত এক অদ্ভুত পবিত্রতা ও শুদ্ধতার দিকে বাড়ানো পুরুষের হাত। একটু থমকে যায় শাশ্বতী।

তারপর হঠাৎ আদিত্যর হাতখানা আকুল হয়ে চেপে ধরে দু’হাতে। শরীর ভয়ংকর কেঁপে ওঠে তার, চমকে ওঠে মন। দুরদুর করে কাঁপে পায়ের তলার মাটি।…ঠিক, এ-কথা ঠিক… ললিতকে সে সুন্দর দেখেছিল…সন্ত যোগীর মতো সুন্দর…

তবু শাশ্বতী ফিসফিস করে বলে, ললিতকে আমি একটুও সুন্দর দেখিনি। বিশ্বাস করো।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%