শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
সারা সকাল মৃদুলাকে একা পাওয়া গেল না। বাইরের ঘরে বাচ্চাদের পড়াচ্ছে একটি অল্প বয়সের কলেজের ছাত্রী। মাঝখানের ঘরটাতে বিছানায় খবরের কাগজ বিছিয়ে সারা সকাল দাদা বসে আছে। ভিতরের ছোট্ট বারান্দায় রান্নার জায়গা— সেখানে বউদি। বাসাটা জুড়েই দাদার সংসার। সে আর মৃদুলা দুটো ফালতু লোক বাস করছে এখানে— এ-রকমই মনে হয় তুলসীর।
বারান্দার কোণে বসে চা খাচ্ছিল তুলসী, আর একটা চোর-বেড়ালের মতো আড়চোখে চেয়ে দেখছিল, ধপধপে সাদা পরিষ্কার একটা লালপাড়ের শাড়ি পরে মৃদুলা খুব নরম হয়ে বসে পিতলের গামলা কাত করে চাল-ধোয়া জল হাতের আঁজলায় ছেঁকে নিচ্ছে। সকালে চুল আঁচড়ে সিঁদুর পরেছে সে, নোয়ানো মাথায় লাল ধুলোর পথের মতো অনেক দূর চলে গেছে, রেখাটি, শান্ত শরীর মায়ের মতো নিষ্কাম হয়ে আছে সকালের আলোয়।
সকালের দিকেই সুন্দর সুন্দর কথা মনে আসে তুলসীর। কিন্তু মৃদুলাকে বলা হয় না। সারা দিন পর যখন রাতে মৃদুলাকে একা পায়, তখন তুলসীর মাথার ভিতরটা হিজিবিজি হয়ে যায়, একটাও তেমন সুন্দর কথা মনে পড়ে না। তখন মনে হয় সারা দিন ধরে জরাজীর্ণ এক পৃথিবীর ধুলো-ময়লা গায়ে মেখে সে বিছানায় এসে বসেছে। তখন কেবল ব্যর্থতা আর অপমানগুলি মনে পড়ে— হেডমাস্টার কেমন অবহেলার সঙ্গে কথা বলেছিল, শিবকালী ঘোষ করেছিল বদ একটা রসিকতা, ক্লাস টেন-এর লম্বা কালো মতো একটা ছেলে সারা ক্লাস ‘বেঞ্চে ছারপোকা সার’ এই কথা বলে আর ইয়ারকি দিয়ে তাকে জ্বালিয়েছিল; কিংবা মনে পড়ে, ট্রেনে একটা অচেনা লোক ভিড়ের মধ্যে তার দিকে কেমন স্থির দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল। তাই তখন সুন্দর কথাগুলি মনে পড়ে না কিছুতেই। কেবল সকালবেলাতে তার মন স্মৃতিশূন্য থাকে, ফাঁকা ঘরে পাখির মতো উড়ে আসে চমৎকার সব কথা। কিন্তু মৃদুলাকে একা পাওয়া যায় না।
সকালবেলার সুন্দর কথাগুলো মৃদুলাকে বলা হয় না। ওদিকে বয়স বেড়ে যায়।
দাদার সংসারে অনেককাল থাকা হয়ে গেল তার। চুয়াল্লিশ সালে বাবা মারা গেল, তার সাড়ে তিন বছর পর মা, তারপর থেকে দিন শেষে বাসায় ফেরার সময়ে কোনও দিন তার মনে হয়নি, বাসায় ফিরছি। এখন মাঝে মাঝে তার নিজের বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করে। নিজের বাসা। যেখানে সকালবেলা সুন্দর কথাগুলো সে অনর্গল শোনাবে মৃদুলাকে, সেখানে সকালে মাস্টারনি এসে বাচ্চাদের পড়াবে বলে তাড়াতাড়ি বাইরের ঘরের বিছানা ছাড়তে হবে না, যতক্ষণ খুশি উদোম হয়ে শুয়ে থাকবে তুলসী, ইচ্ছে হলে সারা ঘর ঘুরে চোর-চোর খেলবে মৃদুলার সঙ্গে, কিংবা চেঁচিয়ে বলবে, আমি তোমাকে ভালবাসি।
কত কিছুই ইচ্ছে করে তুলসীর। হয় না। চা শেষ করে একটু বিষণ্ণ অন্যমনস্ক মনে তুলসী বাজারে বেরোল। কয়েক দিন আগে স্কুলে বেরোবার সময়ে মৃদুলাকে একটু একা পেয়েছিল সে। মৃদুলা বাইরের ঘরে মাস্টারনির এঁটো চায়ের কাপ নিতে এসেছিল, সেই সময়ে দরজার আড়ালে টেনে নিয়ে এক পলকে মৃদুলাকে একটা চুমু খেয়েছিল সে। আর, ঠিক সেই মুহূর্তেই দু’ ঘরের মাঝখানের দরজার পরদা সরিয়ে বড় ভাইঝিটা ব্যাপার-স্যাপার দেখে ফেলল। বাপারটা হঠাৎ হয়ে-যাওয়া কিনা কে জানে! বড় ভাইঝি পিতু বারো বছর বয়সেই ঝানু পেকে গেছে। ফ্রকের তলা থেকে ঠেলে উঠছে বুক, চোখে চিকন কাজ দেখা যাচ্ছে তার, ছাদ থেকে পশ্চিমে ঘোষালদের যে ছাড়া জমিটা দেখা যায় সেখানে এক দঙ্গল ছেলের আড্ডা। তারা ঘুড়ি ওড়ায়, সিগারেট ফোঁকে, বদ মতলবে ভাঙা ইটের টুকরো জড়ো করে। ছাদের আলসে থেকে পশ্চিমে পিতুকে অনেকবার সন্ধেবেলায় ঝুঁকে থাকতে দেখেছে তুলসী। তা ছাড়া মৃদুলার কাছে শুনেছে যে, পিতু গোপনে মৃদুলার সুটকেস হাঁটকায়, খুঁজে দেখে কাকা কাকিমাকে গোপনে কিছু শাড়ি-টাড়ি দিল কি না। তা ছাড়া মৃদুলাকে মাঝে মাঝে নিরীহ মুখে জিজ্ঞেস করে, রাত্রিবেলা তোমাদের ঘরে অত শব্দ হয় কেন? কাজেই পিতুর মতো পাকা মেয়ে সেদিন, সেই চুমু খাওয়ার দিন যে কাকা-কাকিমার ব্যাপারটা দেখার জন্য ওত পেতে ছিল না, তা কে বলতে পারে!
যেদিন ললিতকে হাসপাতাল থেকে বাসায় পৌঁছে দিল তুলসী সেদিন হঠাৎ তার শম্ভুকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়েছিল, এবার ললিতরা না থাকলে ওদের বাসাটা শম্ভুরা কতয় ভাড়া দেবে। এ-রকম নৃশংস চিন্তা কেন তার মাথায় এসেছিল তা সে বুঝতে পারেনি তখন। পরে ভেবেছে যে, আসলে সেটা ছিল তার অবচেতন মনেরই ব্যাপার। আর খুবই আশ্চর্যের বিষয় যে, সেদিনই বাসায় ফিরে সে দেখল, দাদা বউদি বাচ্চারা কেউ বাসায় নেই, অন্ধকার বাসায় বাইরের ঘরের মেঝেয় বসে মৃদুলা কাঁদছে। তুলসী রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার? মৃদুলা বলল, তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে। তুলসী জিজ্ঞেস করল, কী কথা? মৃদুলা বলল, তুমি আলাদা বাসা করো। আমি এখানে থাকব না। ভীষণ চমকে গেল তুলসী, বাসা। বাসা কেন? মৃদুলা গলায় ঝাঁঝ দিয়ে বলল, এখানে আমি মানিয়ে গুছিয়ে থাকতে পারছি না। আমি চিরকাল লেখাপড়া শিখেছি, গান গেয়েছি, তাই ঘরের কাজ শিখিনি, সেটা কি খুব দোষের? আমার হাতে রুটি ফোলে না, পিরিচ ভাঙে, ঘর ঝাঁট দিলে কোন কোনায় ময়লা থেকে যায়— তাই আমি অলক্ষ্মী? দরকার হলে দিদি শিখিয়ে নিক, বড়রা নেয় না? তা না করে দিদি সকলের কাছে আমার অকাজের কথা বলে বেড়ায়। আবার দেখো, দ্বিরাগমনে বাপের বাড়ি না গিয়ে পিসির বাড়ি গিয়েছিলাম বলেও কথা উঠেছে। দিদির কোন এক ভাই যেন আমাদের পাড়ায় থাকে, সে বোধ হয় বিভুর ব্যাপারটা কিছু বলেছে দিদিকে, তাই দিদি আজকাল শুনিয়ে শুনিয়ে বলে, আজকালকার মেয়েদের ফ্রক না ছাড়তেই ভালবাসা, পিরিতের কাপ্তানরা সব রাস্তায় ঘাটে বসে থাকে, এখন বাপের বাড়ি যাওয়ার পথ বন্ধ, লজ্জায় মরে যাই। এই সব নোংরা কথা। তুমিই বলো, আমার দোষ ছিল? তা ছাড়া দিদির নিজের মেয়ে কী? ওই পিতু! স্কুল-রাস্তায় পিতুর জন্য কাপ্তানরা দাঁড়িয়ে থাকে না? ওর বইয়ের বাক্স খুঁজলে চিঠি পাওয়া যাবে না? অত বড় মেয়ে ফ্রক পরে বুক দেখিয়ে বেড়ায়, হুট হাট সিনেমায় যাচ্ছে, ফাংশন দেখে রাত করে ফিরছে, দিদি দেখেও দেখে না। তারপর দেখো পরশুদিন দুপুরে খাওয়ার পর বাথরুমে গিয়ে বমি করেছি সন্ধেবেলা সেটা দাদাকে শুনিয়ে দিদি বলল, দেখো বিয়ের মাস থেকেই বেঁধে গেল, একটুও আঁট নেই, বেহায়া আর কাকে বলে! কেন বলবে ও-কথা? আমি কি আঁটকুড়ি যে আমার বাচ্চা হবে না? আজ আমার বাবা এসেছিল, দিদি তাঁকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল, মেয়েদের গান-বাজনা, লেখাপড়া শেষ পর্যন্ত কাজে লাগে না; ও-সব বড়লোকে বড়লোকে চলে। আমাদের সাধারণ ঘরে লক্ষ্মীরই কদর বেশি, সরস্বতীর তেমন নয়। ঘুরিয়ে বলা, কিন্তু বাবা তো বোকা নয়, তাই আমাকে আড়ালে ডেকে বকে গেল, কাজকর্ম করবি। তুলসীর বাবা-মা নেই, দাদা-বউদিই ওর বাপ-মার মতো। ওঁরা যেমন চালায় তেমনই চলবি। আমি বাবাকে কিছু বললুম না, কিন্তু বলো, দুঃখ হয় না? বাবা কোনও দিন আমাকে বকে না, জানো? তাই আজ বিকেল থেকে আমি কাঁদছি। তা ছাড়া দেখো, আজকাল দিদি আমাকে একা রেখে দুপুরে বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে বেড়াতে চলে যায়, বলে, এতকাল আমি ঘর আগলে থেকেছি, এবার তুমি আগলাও, আমি একটু হাঁফ ছেড়ে আসি। তুমিই বলো, এ বয়সের নতুন বউকে একা রেখে যাওয়া কি ঠিক? দুপুরের কলকাতা ডেঞ্জারাস নয়? কত ঠগ, জোচ্চোর, খুনে এখানে ফিরিওয়ালার সাজ পরে আসে, ইলেকট্রিক মিস্ত্রি সেজে আসে, ডাকপিয়ন হয়ে এসে দরজায় ধাক্কা দেয়। তা ছাড়া কে জানে বিভুর দলবল এখনও তক্কে তক্কে আছে কি না! তুমি সন্ধের আগে ফেরো না, কখনও বা বন্ধুর অসুখ দেখতে যাও, একা একা আমার ভয় করে। আমি এখানে থাকব না। তুমি বাসা না করলে ঠিক বাপের বাড়ি চলে যাব। বাবা আজ বলে গেল, এখনও বিভুর দলবল বাসায় ঢিল ছোড়ে, বেয়ারিং ডাকে বেনামা চিঠি দিয়ে শাসায়, গেলে হয়তো অ্যাসিড বালব ছুড়বে, ছোরা বসাবে, বোমা মারবে, কিংবা জোর করে টেনে নিয়ে যাবে…
অত কথা একসঙ্গে সঠিক বুঝতে পারেনি তুলসী। বুঝবার দরকারও ছিল না তুলসী জানে বাংলাদেশে সেই পুরনো আমল আর নেই, যখন দুটো আহ্লাদি বেড়ালের মতো দাঁত নখ লুকিয়ে মা আর জেঠিমা এক পাতে গন্ধলেবুর পাতা দিয়ে মেখে পান্তাভাত খেতে বসত। মেয়েতে মেয়েতে কোনও দিনই ঠিক ঠিক ভাব হয় না, পুরুষদের যেমন হয়। তবু কী করে যেন মা আর জেঠিমা কেউ কাউকে সহ্য না করেও বিশ বছর একসঙ্গে ছিল। তবু বাংলাদেশে সেই পুরনো আমল আর নেই, মানুষের সহ্যশক্তি অনেক কমে গেছে। তুলসী অন্য কথা ভাবে। স্কুল থেকে সে নিয়মিত বেতন পায় না, ছাত্ররা গ্রামের গেরস্থ কিংবা চাষার ছেলে, নিয়মিত মাইনে দেয় না, যা দেয় তাই তারা সবাই ভাগ করে নেয়— কোনও মাসে পঞ্চাশ, কোনও মাসে ষাট। ন’ মাসে ছ’ মাসে সরকারি সাহায্যের টাকা আসে। তাই তার অভাবের মাসগুলো দাদাই চালিয়ে নেয়। আলাদা বাসা করলে কীভাবে চলবে? তা ছাড়া মৃদুলাকে আলাদা বাসায় ফেলে রেখে কী করে অত দূরে যাবে তুলসী! যখন দুপুরের কলকাতা ভয়ংকর! যখন বিভুর দলবল হাল ছাড়েনি।
শান্ত মনে সকালের ঠান্ডা বাতাসের মধ্যে বাজারে যাচ্ছিল তুলসী। মাথার মধ্যে এ-সব হিজিবিজি চিন্তা ঘুলিয়ে উঠতে লাগল।
সকালে প্রায়দিনই বাজারে একটা মোটাসোটা আধবুড়ো লোককে ঘুরে বেড়াতে দেখে তুলসী। বড় নিরীহ, ভিতু-চেহারা, দেখলেই মায়া হয়। লোকটা বিষণ্ণ চোখে চারদিকে দেখতে দেখতে যায়, এ-দোকান সে-দোকানে একটু দরদস্তুর করে, কেনে খুব অল্পই, কিন্তু বাজারের চত্বরে অনেকক্ষণ তাকে থাকতে দেখেছে তুলসী। কোনও দিনই খুব খেয়াল করে দেখে না। আজ দেখল, নাকফুল কানফুলের মতো ছোট ছোট ফুলকপি নিয়ে যে বেচুনি মেয়েছেলেটা অহংকারে গ্যাঁট হয়ে বসে আছে, তারই মুখোমুখি নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। কোনও দরকার ছিল না, কেবলমাত্র মাথায় হিজিবিজি চিন্তাগুলোকে তাড়ানোর জনাই তুলসী হঠাৎ এগিয়ে গিয়ে একটু হেসে লোকটাকে বলল, ফুলকপি নিলেন?
তার দিকে চেয়ে একটু ম্লান হাসল লোকটা, না। বাবার কথা ভাবছিলাম। বাবা বড় ভালবাসতেন।
ওঃ হোঃ। বলে বুঝদারের মতো হাসল তুলসী।
আমি ফুলকপি খাই না। তার পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে লোকটা লাজুক গলায় বলল, বাবা খেয়ে যেতে পারেনি। সেদিন এই ফুলকপি, মুলো দিয়ে মটরের ডাল, বেগুন ভাজা রান্না হয়েছিল দুপুরবেলায়। ছুটির দিন ছিল, সারা সকাল বিছানায় পুরনো প্রবাসী পড়েছে লোকটা, তারপর বোধ হয় ঢুলুনি এসেছিল একটু। স্নান-খাওয়ার জন্য ডাকতে এসে মা দেখল, লোকটা ঘুমোচ্ছে যেন— খোলা প্রবাসীর ওপর যত্নে রাখা চশমা-জোড়া, দু’ পায়ে আঁকড়ে-ধরা কোলবালিশ, নাকের ওপর জমে আছে সেই চিরকালের ঘামের ফোঁটা, তবু লোকটা নেই।
আহাঃ! তুলসী বলল।
বাপ মা’র মতো জন হয় না। লোকটা ধীর শান্ত গলায় বলে, আমার বাবা লোকটা ছিল গরিবজন, ছোট দোকানের দোকানদার, এক-আধদিন ভাল-মন্দ খেতে পেত। বেঁচে থাকতে কোনও দিন মান্যগণ্য করতাম না। কিন্তু এখন! এখন কেবল সেই খোলা প্রবাসীর ওপর ডাঁটি-ভাঙা চশমা-জোড়া মনে পড়ে। বড় আশায় আশায় আমার দিকে চেয়ে আছে। বলতে বলতে লোকটা তুলসীর দিকে অন্যমনে তাকায়, কিন্তু তুলসীকে বোধ হয় সঠিক দেখে না, ম্লান একটু হেসে বলে, বাবা মরে যাওয়ার অনেক পরে আমি বাপ হয়েছিলাম। একটাই ছেলে ছিল আমার অসৎ, বখা, গুন্ডা। অতি আদরে বাঁদর। সামলাতে পারতাম না। তখন বুঝতে পারতাম তেমনই এক গরিব বাপ আমি, ছোট চাকরি করে খাই, ঘরে বাইরে কেউ কোথাও পাত্তা দেয় না, লোকের নজরে পড়ি না, এমনই ছোট। তখন যেন বাবার সেই ডাঁটি-ভাঙা চশমা-জোড়াই আমার চোখে, জুল জুল করে চেয়ে থাকি, আশায় আশায়। তখন বুঝি বাপ হওয়া কেমন, বাপ কেমন জন। ছেলেটা মিশত বদ, দাঙ্গাবাজ, হারামজাদা ছেলেদের সঙ্গে। উনিশ বছর বয়সে হাতে বোমা ফেটে মারা গেল। অত বড় শরীরটার আর কিছুই ছিল না।
আঃ! তুলসী বলে।
না, আমি আর ফুলকপি, মটরের ডাল, মুলো, বেগুন খাই না, ছেলেটা ভালবাসত মাছ মাংস ডিম, ঝাল লঙ্কা, পেঁয়াজ, রসুন, এঁচোড়ের ডালনা। আমরা সে-সব ছেড়ে দিয়েছি। আমরা বুড়োবুড়ি এখন আর সত্যিই কোনও খাবারের স্বাদ পাই না। লোকটা আবার একটু ম্লান হাসে, বাজার করতে বড় ভালবাসতাম। মা-বাপ, বউ-ছেলে— এদের কার কোনটা স্বাদের জিনিস তা মনে করে, খুঁজে-পেতে, দরদস্তুর করে সেরেক-এ চার-আট আনা কমিয়ে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার মধ্যে কত আনন্দ ছিল। বাজারও ছিল অন্য রকম। এখন দেখুন বেশি দাম, কম ওজনের বাটখারা, দোকানদারদের তিরিক্ষি মেজাজ, গায়ে গায়ে ব্যস্ত খদ্দেরের ভিড়, বাজারে আর সেই আনন্দ নেই। তবু আসি। চল্লিশ বছর ধরে বাজার করে আসছি— সকালবেলায় এইখানে এই যে এক ঢল সবুজ দেখা যায়, এর বড় নেশা। তাজা তরিতরকারি, শাকপাতা, ঝকঝকে মাছ ঘুরে ঘুরে দেখি। কত কথা মনে পড়ে যায়! মাঝেমধ্যে দর করি, একটু কিনি, কিনি না। শেষ বাজারে বেছে-গুছে সেইসব জিনিস একটু করে নিয়ে যাই, যা আমার বাপ পছন্দ করত না, ছেলে খেত না।
মাছ-বাজারের সামনে লোকটার কাছ থেকে বিদায় নিল তুলসী, বলল, আবার দেখা হবে।
লোকটা একটু অপ্রস্তুত হাসি হাসে, কত কথা বলে ফেললাম! হ্যাঁ, দেখা হবে। তবে বেশিদিন আর না। চাকরির আর কয়েকটা বছর, তারপর গাঁয়ের দিকে চলে যাব। আমরা আসলে গ্রামেরই লোক মশাই, সাধারণ লোক।
লোকটা তুলসীর মুখের দিকে চেয়ে রইল একটু, তারপর ‘আচ্ছা…’ বলে উদাসীন চোখ ফিরিয়ে নিল। সবজি বাজারের ভিতর দিয়ে ভিড় ঠেলে আস্তে আস্তে চলে গেল। তুলসী দেখল, লোকটার ডান হাতে সাদা শূন্য বাজারের থলিটা হাওয়ায় লটপট করছে।
ব্যাপারটা কিছুই না, তবু বুকের মধ্যে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে একটা শান্টিং ইঞ্জিন হঠাৎ গুপ করে ধাক্কা মারে। এখনও বাপ হয়নি তুলসী, কিন্তু মৃদুলার পেটে বাচ্চা এসেছে। অন্যমনস্কভাবে কেনাকাটা করছিল তুলসী, আর দু’-তিনটি কথা তার মাথার মধ্যে মাছির মতো ঘুরেফিরে বসতে লাগল। বাপ কেমন জন…গরিব বাপ আমি সাধারণ মানুষ…আসলে আমরা গ্রামেরই লোক। কথাগুলোর মধ্যে কিছু একটা আছে, যা সে স্পষ্ট ধরতে পারছিল না। অনেকক্ষণ ধরে ভাবল তুলসী। তারপর হঠাৎ লোকটার শেষ কথাটা ভেবে তার মনে হল, গ্রাম! গ্রামে চলে গেলে কেমন হয়! ভাবতেই যথেষ্ট উত্তেজনা বোধ করে তুলসী, মাথার হিজিবিজি কেটে যায়। এতকাল গ্রামে গিয়ে বসবাস করার কথা তার মনেও হয়নি। বরং সে বৃথা তিন বছর ধরে কলকাতায় চাকরি খুঁজেছে। পায়নি। অথচ গ্রামের সেই ভাঙাচোরা স্কুলটাই এতকাল ধরে খাওয়াচ্ছে তাকে। তবে সে কেন কলকাতার কাছে ভিখিরিপনা করবে?
লোকটাকে ঈশ্বর-প্রেরিত বলেই মনে হল তুলসীর। গ্রামে গেলেই এখন সব দিক দিয়ে ভাল হয় তার। লোকটা অত কথার মধ্যে এই কথাটারই ইঙ্গিত দিয়ে গেল না? সেখানে মৃদুলা নিরাপদ, বাসাভাড়া কম, ভালই থাকবে সে। ভাবতে ভাবতে সে স্পষ্ট দেখতে পেল, সে যেন গ্রামীণ গৃহস্থ-তুলসী, চারধারে ধানের মরাই, সবজিখেত, পোষা গোরু-ছাগল।
এ-কথা ঠিক যে, কলকাতাতেই তার জান পোঁতা আছে। এখানেই চায়ের দোকানে, বন্ধুদের আড্ডায় কেটেছে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়। একটা বড় কলকাতা আছে— যার পার্ক স্ট্রিটে রেস্টুরেন্ট, ক্যামাক স্ট্রিটে বাড়ি, কিংবা গ্র্যান্ড হোটেল, সে কলকাতাকে চেনে না তুলসী। সে চেনে জগার দোকান, কফি হাউস, নাইট শোর সিনেমা, মেয়েছেলে দেখা, বেকার ঘুরে বেড়ানো কিংবা সময় নষ্ট করার কলকাতাকে। তবু কলকাতার আত্মাই তার বুকের মধ্যে ধকধক করছে। গ্রামে চাকরি করতে যায় তুলসী, গাঁয়ের লোকের সঙ্গে কথা বলে, গাঁয়ের ছেলেদের পড়ায়, আর সবসময়ে তার মনে হয় ‘আমি এদের চেয়ে উঁচুদরের লোক’। কেন মনে হয় ও রকম কথা কে জানে! হয়তো কলকাতায় বাস করলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে ও রকম অহংকার তৈরি হয়ে যায়। আর অহংকারী হওয়া মানেই নিজেকে না জানা, অন্যকেও না জানা। এখন ওই ঈশ্বর-প্রেরিত লোকটার কথারই প্রতিধ্বনি সে তার মনের মধ্যে শুনতে পায়। এক গরিব জন আমি— সাধারণ মানুষ। কোটি কোটি মানুষের একজন মাত্র। দেশ-গ্রামের সঙ্গে তার নাভির যোগ, কলকাতা সেই নাড়ির বন্ধন ছিঁড়ে রেখেছে বহুকাল ধরে। এবার গ্রামেই চলে যাবে তুলসী।
বাজার থেকে ফিরে সারা সকাল মৃদুলাকে এই কথাটা বলার সুযোগ খুঁজল তুলসী। পেল না।
স্কুলে যাওয়ার পথে রেল গাড়ির কামরায় সে মানুষজনের দিকে চেয়ে রইল। গাড়ির মেঝেয় বসে দুটো লোক পোনামাছের চারা-ভরতি-জলের হাঁড়িতে থাবড়া দিতে দিতে চলেছে, খালি ঝুড়ি নিয়ে ফিরে যাচ্ছে কয়েকজন ব্যাপারী, দুই বেঞ্চের মাঝখানে গামছা বিছিয়ে ব্রিজ খেলছে তারা, গাড়িতে উঠে হাঁকডাক শুরু করেছিল; একজন চিরুনি অন্যজন হাতকাটা তেলের ফিরিঅলা, বিক্রিবাটা মন্দা দেখে এখন তারা নিবিড় হয়ে বসে গল্প করছে। সাধারণ মানুষ সব, দুঃখী মানুষ। এদেরই একজন সে! ভাবতে ভাবতে আনন্দে শিউরে উঠল তুলসী। কলকাতায় থাকতে থাকতে এতদিন এ-কথাটা তার মনেই হয়নি। তার মনে পড়ল কতবার রাস্তায়-ঘাটে মানুষজন তার কাছ থেকে বিড়ি-সিগারেট ধরাতে আগুন চেয়ে নিয়েছে, কত লোক জিজ্ঞেস করেছে ঘড়িতে ক’টা বাজল, কত লোক দুঃখের কথা বলতে চেয়েছে তাকে। তুলসী ভাল করে তাদের মুখও দেখেনি। কলকাতায় থাকারই মুদ্রাদোষ ওটা। হ্যাঁ, এবার গ্রামীণ-গৃহস্থ হয়ে যাবে সে, খেত-খামার করবে, ও-গ্রাম সে-গ্রামের লোকেদের চিনে বেড়াবে, খালি পায়ে হাঁটবে মাটির ওপর।
স্টেশন থেকে স্কুলে যাওয়ার দুটো রাস্তা। একটা জাতীয় সড়ক, সেটা ঘুরপথ। আর একটা ধানখেতের মধ্য দিয়ে, আলপথ। আলপথেই যায় তুলসী। মাইল খানেক রাস্তা। অন্যমনস্কভাবে হাঁটছিল সে। হঠাৎ দেখতে পেল সামনে একটা পতিত জমির ওপর দিয়ে দৌড়ে এসে একটা লোক আলের ওপর দাঁড়িয়ে হাঁফাচ্ছে। হাঁটুর ওপর কাপড়, খালি গা, মাথায় গামছা জড়ানো। কাছাকাছি হতেই লোকটা তুলসীর দিকে চেয়ে হঠাৎ হাত তুলে জমিনটার দিকে দেখিয়ে বলল, ওই যে দেখেন!
তুলসী দাঁড়িয়ে পড়ল, কী?
ওই যে! লোকটা আঙুল দিয়ে দেখালে, দেখছেন?
তুলসী দেখল। এবড়ো-খেবড়ো জমি, মাটির ঢেলা, আর ঘাসের মধ্যে প্রথমটায় ভাল দেখা যায়নি, তারপরই দেখা গেল জমির ঠিক মাঝখান দিয়ে কোনাকুনি সাপটা চলে যাচ্ছে। ছাইরঙা শরীর, রোদে চকচক করছে গায়ের আঁশ— একটা বড় মাটির ঢিবি— সাপটা ঢেউ খেলে পেরিয়ে যাচ্ছে। গতি দেখলে মনে হয় একটু আগে এই আলপথটাই পার হয়ে গেছে।
গা ঘিনঘিন করে উঠল তুলসীর, বলল, কী সাপ?
লোকটা হাঁফাচ্ছিল, সাধুভাষায় বলল, বিষ ধরে মশাই, গোখরো। এটা অপরাধী সাপ, ও-চলন দেখলেই আমি চিনতে পারি। এইমাত্র কাউকে কেটে এল…ওই দেখুন, চলনটা দেখুন…দেখছেন? হুঁ, অপরাধী সাপ মশাই।
ঘাসের আড়াল থেকে বেরিয়ে আর-একটা ঘাসের আড়ালে চলে যাচ্ছিল অপরাধী সাপ। বাতাস কাটার একটা হায়-হায় শব্দ করছে। চলনটা ঠিক বুঝল না তুলসী, তবু তার মনে হল সাপটা চোরের মতো পালাচ্ছে। কোনও দিকেই ওর নজর নেই৷ আলপথ পার হয়ে ধান খেতের পাশ দিয়ে ক্ষীণ মসৃণ একটি জলধারার মতো নেমে গেল সাপটা পিছনে শূন্য জমিটাকে ভীতিকর করে রেখে দিয়ে গেল। লোকটা সাপটার গতি নিরীক্ষণ করে বলল, শালা নদীর দিকে যাচ্ছে। নদী পার হয়ে গেলেই ফতে। রুগিকে বাঁচায় কে! ওর চলন আমি চিনি মশাই।… বলতে বলতে লোকটা উলটো দিকের খেতের মধ্যে নেমে পড়ল, মুখ ঘুরিয়ে চেঁচিয়ে বলল, আশপাশের গাঁয়ে কোথাও কেটে এসেছে শালা! যদি নগেন ওঝাকে সময়মতো ধরতে পারি…বলে দৌড়তে থাকল লোকটা। কচি ধান গাছের ওপর দিয়ে তার বেপরোয়া মাথাটা মাতালের মতো টলতে টলতে দূরে চলে যাচ্ছিল।
ওঁক করে একটা বমির ভাব উঠে এল তুলসীর পেট থেকে। গা পাকিয়ে উঠল, শিরশির করে ওঠে হাত-পা। গা ঘিনঘিন করে। সামনের দিকে ধুতির অংশটা হাতে তুলে প্রথমে কয়েক পা দৌড়য় তুলসী, তারপর জোরে জোরে হাঁটতে থাকে। সাপটা পশ্চিম বারে গেল। ও দিকে নদী মাইল দুই দূর। লোকটা বলছিল সাপ নদী পার হলে রুগি বাঁচবে না, সত্যি কি! সাপটা নদী পার হওয়ার আগে লোকটা ওঝাকে পাবে কি না কে জানে।
স্কুলের কমন-রুমে পৌঁছতে হাঁফ ধরে গেল তার। হাতের প্লাস্টিকের ফোলিও-ব্যাগটা টেবিলের ওপর ছুড়ে দিয়ে বলল, সাপ!
সবাই তার দিকে তাকাল, কোথায় সাপ?
তুলসী হাঁফাতে হাঁফাতেই সেই লোকটাকে নকল করে বলল, বিষধর সাপ মশাই, গোখরো। অপরাধী সাপ চেনেন কেউ?
হ্যাঁ, অনেকেই চেনে।
কোথায় দেখলেন। কাকে ঠুকে এল?
তুলসী ঘটনাটা বলতেই গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। সবাই চেনে নগেন ওঝাকে, তুলসী বুঝতে পারছিল। যে-লোকটা সাপটাকে দেখিয়েছিল সেও সকলেরই চেনা, রাজেন। তারপর যা হয়— আস্তে আস্তে সাপের গল্প শুরু হয়ে গেল। প্রতি পিরিয়ডের ফাঁকে ফাঁকে এসে তুলসী কমনরুমে সাপের গল্প শুনে যাচ্ছিল। বিচিত্র গল্প সব বিচিত্র সব সাপের। বেনাচিতি, কেউটে, গোখরো, দাঁড়াশ, লাউডগা, জিংলাপোড়া। থার্ড পিরিয়ডের লেজারে এসে সায়েন্স-এর মাস্টার আদ্যিকালের বি এস-সি বুড়ো হরনাথ ঘোষালের গল্পটা শুনল। ঘোষাল বিজ্ঞান পড়তে পড়তে প্রথম যৌবনে ধর্ম-টর্মের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল। সেই সময়ে তারা দুই বন্ধু একসঙ্গে পইতে পুড়িয়েছিল একটা পাঁজিতে আগুন জ্বেলে, সেই আগুনে। ঘোষালের বাড়িতে এটা নিয়ে বিরাট হইচই হল, তার গোঁড়া ধর্মবিশ্বাসী বাপ তাকে বেরও করে দিল ঘর থেকে, কিন্তু ঘোষাল পইতে নিতে রাজি হল না। এক বন্ধুর বাড়ির কাছারি বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিল ঘোষাল, সেখানেই থাকতে লাগল। বিজ্ঞান ছাড়া জগতের অন্য কোনও রহস্যকেই সে তখন স্বীকার করত না, প্রবল মনোবল ছিল তার, সে অটল রইল। সে সময়ে একদিন রাতে ঘুমের মধ্যে ঘোষাল টের পেল তার বুকের ওপর বেশ ভারী একটা ওজন, বাঁ কাঁধ থেকে বুক জুড়ে ডান দিকের কোমর পর্যন্ত পিছল, ঠান্ডা, ভারী কী এক বস্তু আস্তে আস্তে নেমে যাচ্ছে। তন্দ্রার ভাব ছুটে যেতেই লাফিয়ে উঠল ঘোষাল। সাপটা ততক্ষণে নেমে গেছে প্রায়। কেবল লেজের শেষ অংশটা তখন ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে তার কোমর থেকে। টর্চ জ্বেলে এই দৃশ্য দেখল সে, প্রকাণ্ড জাত-গোখরো তার শরীর সাপটে ছিল এতক্ষণ। যদিও সাপটা তখনও তার কোনও ক্ষতি করেনি, তবু ভয় পেয়ে চিৎকার করে সে অজ্ঞান হয়ে গেল। কাছারি-ঘরটায় লোক শুত অনেক। তারা উঠে বাতি-টাতি জ্বেলে মেরে ফেলল সাপটাকে। কিন্তু তারপর থেকেই— ঘোষাল বলল, আমার বাঁ কাঁধ থেকে কোমর পর্যন্ত কেবল একটা শিরশিরে ভাব— গা ঘিনঘিন্ করে, কিচ্ছু খেতে পারি না, উলটে চলে আসে প্রথম পোয়াতির মতো, রাতে ঘুম হয় না, নিজের গা থেকে নোংরা আঁশটে গন্ধ নাকে আসে। সবসময়ে ভয়-ভয় ভাব। আমার আত্মবিশ্বাস কমে যেতে লাগল। আমি বিজ্ঞানের ছাত্র, যুক্তিবাদী, তা ছাড়া আমি গাঁয়ের ছেলে, সাপের গতিবিধি আমি জানি। তব দেখুন দিনরাত আমার মনে হত নরক থেকে, নোংরা জঘন্য বিশ্বাসঘাতক হীন একটা প্রাণী এসে আমাকে ছুঁয়ে গেছে, শত স্নানেও নিজেকে পবিত্র লাগত না। আর মশাই, সারাদিন ধরে বাঁ কাঁধ থেকে কোমর পর্যন্ত এই যে জায়গাটা যেখান দিয়ে গিয়েছিল সেই জঘন্য জীব, সেই জায়গাটায় সারাদিন শিরশির ঝিরঝির একটা অবশ ভাব। ডাক্তার এসে মনের শক্তির জন্য ওষুধ দিল, কিছু হল না। আস্তে আস্তে পৃথিবীটা আমার কাছে নিরানন্দ বিষাদময় হয়ে যাচ্ছিল। ফ্যাল ফ্যাল করে চারদিকে চাই, লোকের কথা বুঝতে পারি না, কাউকে কিছু বোঝাতেও পারি না। ও গুণিনরা এসে ঝাড়ফুঁক করে গেল অনেক। কিছু হল না। তারপরই একদিন আমাদের কুলগুরুকে নিয়ে বাবা হাজির হলেন, আমাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনলেন, প্রায়শ্চিত্ত করিয়ে গলায় পইতে পরিয়ে দিলেন। তখন হঠাৎ খেয়াল হল পইতে যেখানে থাকে আমাদের, বুকের ওপর কাঁধ থেকে আড়াআড়ি, ঠিক সেই জায়গা দিয়েই গিয়েছিল সাপটা। ওই কথাটা মনে হতেই অসুখ অর্ধেকটা সেরে গেল। তারপর শুরু করলাম গায়ত্রী জপ। সারাদিন জপ করি। চোখ বুজে বিভোর হয়ে জপ করি। আস্তে আস্তে আবার স্বাভাবিক হয়ে এলাম আমি। অবিশ্বাস-টবিশ্বাস কোথায় উড়ে গেল আমার!
এটা কি সাপের গল্প হল? কে একজন বলল, এ তো পইতের মহিমা-কীর্তন! আর এর সাপটাও যে প্রতীক!
একজ্যাক্টলি, হরেনবাবু সামনের দিকে ঝুঁকে বললেন, একজ্যাক্টলি। পূর্বপুরুষদের বহুকালের তপস্যায় এবং আচরণে অর্জিত ধর্মীয় সংস্কারগুলিকে ত্যাগ করলে অবিশ্বাস, বঞ্চনা এবং মহাভীতি আমাদের আলিঙ্গন করে। তবু দেখুন আমি সত্যিই কিন্তু পঞ্জিকায় আগুন জ্বেলে পইতে পুড়িয়েছিলাম, আর আমার বুকের ওপর দিয়ে সাপও হেঁটেছিল, দুটোই সত্যি।
টিফিনেই খবর চলে এল, পুবপাড়ায় সত্যিই একজনকে সাপে কামড়েছে।
সিক্সথ পিরিয়ডে ক্লাস সেভেনে ক্লাস নিচ্ছিল তুলসী। ক্লাসের মাঝামাঝি সময়ে দেখতে পেল পিছনের বেঞ্চের ছেলেরা পাশের জানালা দিয়ে মাঠের দিকে চেয়ে আছে। ওদের মধ্যে খুব উত্তেজনা। কী রে? বলে হাঁক দিতেই একটা ছেলে বলল, স্যার নগেন ওঝা যাচ্ছে, কাউকে বোধ হয় সাপে কেটেছে। শুনে জানালার কাছে এসে দেখল তুলসী, মাঠের মধ্যে দু’-চারটে লোক আগে চলেছে, পিছনে খুব লম্বা, মিশমিশে কালো একটা লোক, পরনে লাল ডগভগে কাপড়, লাল ফতুয়া। লোকটা যেন অনেকটা স্বপ্নের ঘোরে হেঁটে চলেছে, এমনই ধ্যানমগ্ন তার ভঙ্গি। দেখলে মনে হয় একটা অপ্রাকৃত আবহাওয়া লোকটাকে ঘিরে আছে। নগেন ওঝার সঙ্গে খালি-গায়ে রাজেনকেও দেখতে পেল তুলসী। ওরা গেল পুবপাড়ার দিকে। নগেন ওঝাকে দেখার পর ক্লাস আর বাগে থাকছিল না। ছেলেরা গুনগুন শুরু করে দিল। পুবপাড়ার দিকে যে-বাড়িতে সাপে কামড়েছে সে-বাড়িতে গিয়ে এখন তুক করবে নগেন ওঝা, বাড়ি বাড়ি ঘুরে কুমারীদের হাত থেকে ভিক্ষে নেবে, সেই চালের ভাত রান্না করবে একজন কুমারী, সম্পূর্ণ বিবস্ত্রা হয়ে। নগেন ওঝার অনেক তুক। ছেলেরা তাই আর ক্লাসে থাকতে চাইছে না।
নগেন ওঝার জন্যেই কিনা কে জানে সিক্সথ পিরিয়ডের পর ছুটির ঘণ্টা বেজে গেল। পুবপাড়ার দিকে ছুটতে লাগল ছেলের পাল।
তুলসী কমন-রুমে এসে শুনল, তখনও সাপের গল্প হচ্ছে। হাতঘড়িতে দেখল সাড়ে তিনটে। তিনটে সাতচল্লিশের ট্রেনটা পাওয়া যেতে পারে। টেবিল থেকে প্লাস্টিকের পোর্টফোলিও ব্যাগটা তুলে নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল। ফেরার সময়ে আলপথ ধরল না সে, সুন্দর জাতীয় সড়ক দিয়ে ঘুরপথে গেল স্টেশনের দিকে। হঠাৎ তার খেয়াল হল, রাজেন বলেছিল সাপটা নদীর দিকে যাচ্ছে, নদী পেরোতে পারলেই ফতে। কে জানে সাপটা অবশেষে নদী পেরোতে পেরেছিল কি না!
না, নদী পেরোতে পারেনি সে। তখন ধানগাছের গোড়ায় গোড়ায় গত বর্ষার জল, সাপটা তাই উঁচু-নিচু আলপথের ওপর উঠে এল। একবার মুখ ঘুরিয়ে দেখল, অনেকটা পথ সে পার হয়ে এসেছে। সামনের দিকে চেয়ে, দেখল, অনেকটা পথ এখনও বাকি। কিন্তু সে কোথায় চলেছে তা তার সঠিক জানা ছিল না। খোলা জায়গার ওপর দিয়ে চলছিল সে। সামনেই আলপথের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছিল নিয়তি-নির্ভর কয়েকজন মানুষ, সাপটা ঘাসের মধ্যে শরীর নামিয়ে নিয়ে অপেক্ষা করল একটু। সামনেই অনেকটা পতিত জমি। মানুষগুলি সরে গেলে সাপটা আস্তে আস্তে নেমে এল জমিতে। খোঁটায় বাঁধা একটা গোরু চরছে। তার পিছনের পায়ের কাছ দিয়ে সে চলে যাচ্ছিল। গোরুটার পায়ে পোকা বসেছিল, পা নাড়তে গিয়ে সাপটাকে দেখল সে, স্থির হয়ে রইল। যেখান দিয়েই সে যাচ্ছিল সেখানেই স্থির হয়ে যাচ্ছিল ঘাস, তৃণ, থেমে যাচ্ছিল পোকামাকড় ব্যাঙের শব্দ। কোনও দিকেই তার মনোযোগ ছিল না। অনেক বয়স হয়ে গেছে তার, বুড়ো একটা সাপ সে৷ ক্লান্ত। তবু জাতীয় সড়কের পাশে ঢালু জমি বেয়ে সে ধীরে ধীরে উঠে এল ওপরে। রোদে চকচক করছে কালো চওড়া রাস্তা। লরি যাচ্ছে, সাইকেল চলেছে। তার চোখের খুব কাছ দিয়ে চলে গেল গোরুর গাড়ির চাকা। এখানে বিপদ, সে বুঝতে পারল। আবার মুখ ঘুরিয়ে নেমে এল নিচু নাবাল জমিতে। জাতীয় সড়কের সমান্তরাল অনেক দূর চলে গেল সে, তারপর কালভার্টের তলা দিয়ে ও পারে যাওয়ার পথ পেল। জলের পাশ দিয়ে আলগা পাথরগুলোর ওপর সে তার শরীরে ঢেউ তুলে পেরিয়ে গেল। একবার জলে জিভ ছুঁইয়ে নিল। নদীর ঠান্ডা সুগন্ধ বাতাস সে টের পায়। তবু নদী এখনও অনেকটাই দূরে। পিড়িক করে একটা শব্দ হয়। কে? তীব্র ফণা তলে সে ঘুরে দেখে। চড়ুই। আবার মাথা নামিয়ে নেয়, ক্লান্তভাবে চলে। বয়স হয়ে গেছে। পৃথিবীতে তার আয়ুষ্কাল কখনও খুব নিরাপদ ছিল না, বিনা বাধায় কোনও বাদ্য পায়নি সে, নির্ভয় হৃদয়ে কোথাও বাস করেনি, তার চলা মানে কেবলই পালানো। এবার তার দীর্ঘ শরীর আস্তে আস্তে অসাড় হয়ে আসছে। নদীর ধারে এসে সে থেমে যায়। মুখ তুলে দেখে— স্রোত, স্রোতের ওপারে আবার দীর্ঘ পথ। কোথায় পোঁছবে সে। জলের ধারে সে নেমে আসে, লম্বা ঘাসের বন হাওয়ায় দোল খাচ্ছে। সে সেইখানে আরামদায়ক কুণ্ডলী পাকিয়ে নেয়। ঘুমিয়ে পড়ে। শব্দ! সে চোখ খোলে। ব্যাঙ লাফিয়ে গেল। সে দিন দুয়েক কিছুই খায়নি। খিদে টের পায়। আবার শরীর খুলে নেয়। শরীর চলতে থাকে। ঘুরে ফিরে জাতীয় সড়কের কাছেই চলে আসে আবার। উঁচু ঢালু জমিটার ওপরে উঠে দেখে, কালো চওড়া রাস্তা, লরি যাচ্ছে। সে আবার নামতে থাকে। একটা ব্যাঙ লাফিয়ে গর্তের মধ্যে পিছনের অংশটা ঢুকিয়ে দিল, তারপর তাড়াতাড়ি ঢুকে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। তার মোটা শরীর, সহজে ঢুকছিল না। সকৌতুকে সাপটা এই দৃশ্য দেখল। বোকা ব্যাঙটা। সে তার শরীর বুক পর্যন্ত শূন্যে তুলে ঘুরিয়ে আনল। বোকা ব্যাঙটা প্রচণ্ড চেষ্টা করছিল ঢুকে যেতে, সাপটা আস্তে তার মাথার ওপর নেমে এল। মুখে তুলে নিল তাকে। ‘কঁ— ক্’ করে কেঁপে উঠল ব্যাঙটা। তার সমস্ত শরীরে ঝাঁকুনি লাগল। বুড়ো হয়ে গেছে সে, বড় ক্লান্ত। ঝাঁকুনিটা তার ভাল লাগল না। ‘কঁ— ক্’ আবার পা ছোড়ে ব্যাঙটা। ঝাঁকুনি লাগে। ক্লান্ত বোধ করে সে। ব্যাঙটার শরীর মোটা, থলথলে, তার সমস্ত মুখ ঠেসে বন্ধ করে রেখেছে। সে অপেক্ষা করে। ক্লান্তি লাগে বড়। ব্যাটা আবার কেঁপে ওঠে। তার শরীর অসাড় হয়ে আসে। সে দেখতে পায় জাতীয় সড়কের আড়ালে সূর্য ঢাকা পড়েছে। সে টের পেল তার বুকের নীচে দুর দুর করে কাঁপছে মাটি, লরি চলে যাচ্ছে পথ বেয়ে। সে অনেক পথ ঘুরেছে সারা জীবন। তার ক্লান্তি লাগে। চোখ বুজে আসে। ব্যাঙের প্রকাণ্ড শরীরটা চোয়ালে আর-একবার চেপে ধরতে চেষ্টা করে, পারে না। আলগা হয়ে আসে মুখ। দুর্বল লাগে। ব্যাঙটা চেপে বসে আছে তার মুখে। মোটা প্রকাণ্ড ব্যাঙটা। সে হাঁফিয়ে যায়। ঝাঁকুনি লাগে। আবার ঝাঁকুনি। না, আর কোনও চেষ্টাই করতে পারে না সে। আস্তে আস্তে তার স্থবির শরীর অসাড় হয়ে আসে, চোখ চেয়ে সে এবার তার দীর্ঘ জীবনের একটা অর্থ বুঝবার ক্ষীণ চেষ্টা করে। তারপরই হঠাৎ তার শ্বাস রোধ করে ব্যাঙটা ঠেলে আসে মুখের ভিতরে। চোখ অন্ধকার হয়ে যায় তার। তখনও মুখে তার আধমরা ব্যাঙ, তার মৃত শরীরটা ঢালু বেয়ে সামান্য গড়িয়ে যায়। তারপর একটা ছোট্ট পাথরে আটকে দড়ির মতো ঝুলতে থাকে।
জাতীয় সড়ক ধরে যেতে যেতে তুলসী শুনল সাপের ব্যাঙ ধরার আওয়াজ। সে খুব তাড়াতাড়ি জায়গাটা পেরিয়ে গেল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন