ঊনত্রিংশ অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

উনত্রিশ

যে-রমেন চলে গিয়েছিল, ললিত জানে, সে-রমেন ফিরে আসেনি। এ অনেক দূরের একজন মানুষ। কোন রহস্যময় অচেনা জগৎ থেকে এসেছে। এ হয়তো এমন কিছু জানে যা ললিতের এতকাল জানা ছিল না। যে রমেন গাড়ি চালাত, সাঁতার দিত, ফুটবল খেলত কিংবা পিয়ানো বাজিয়ে গাইত পুব বাংলার মাঝিদের গান, সে এ নয়।

উঠোনের এক কোণে আধো-অন্ধকারে যখন কুঁজো হয়ে রমেন হাত-মুখ ধুচ্ছে, তখন ললিত দরজায় দাঁড়িয়ে সেই আবছায়া দীর্ঘ মূর্তিটিকে দেখছিল। বড় অচেনা লাগে। বড় দূরের। এর সঙ্গে হয়তো আর আড্ডা জমবে না।

রমেন আলোতে এলে তার সুন্দর মুখে নিস্পৃহতা লক্ষ করে ললিত। শান্ত ভাব। আত্মস্থ। হয়তো এ-রকমই ছিল বুদ্ধের মুখ। না কি এ-মুখ নির্বোধের? যে যা নেই তাকেই বিশ্বাস করে বৃথা আয়ুক্ষয় করে! যে প্রজাদের বর্ণাশ্রম মানতে শেখায়! শেখায় বিবাহ-সংস্কার! ঈশ্বরের প্রতিনিধি সেজে মানুষকে তার সংগ্রামের ইতিহাস থেকে প্রান্তর-প্রান্তর দূরে নিয়ে যায়!

রমেন ললিতের মুখের দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসে। বলে, তোর চিঠি পেয়ে এলাম। টাকা শোধ দিতে ডেকেছিস!

ললিত লজ্জা পায়। বলে, না রে। টাকা তো মানিঅর্ডার করেও পাঠাতে পারতাম।

তবে!

ললিত ইতস্তত করে বলে, তোকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছিল। কেমন আছিস রমেন?

রমেন মিটিমিটি হাসে।

ক্যান্সারের কথা রমেনকে লিখেছিল ললিত। কিন্তু রমেন তার ব্যাধির কথা জিজ্ঞেসও করল না। বলল না, কেমন আছিস!

মা এলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তাকে প্রণাম করে রমেন। এ-রকম প্রণাম ললিত আর দেখেনি। তার বন্ধুরা বিজয়ার পর ছাড়া বড় একটা প্রণাম করে না মাকে। তাও দায়সারা, পা ছুঁয়ে মাথায় ঠেকানো।

চিনতে পারছেন?

মা চিনতে পারল না।

ললিত বলল, ও অনেক বার এসেছে আমাদের বাসায়। রমেনকে তুমি কত দেখেছ!

মা বলে, তখন হয়তো ছোট ছিল। এখন অনেক বড় হয়ে গেছে।

রাতে পাশাপাশি বালিশে মুখোমুখি শুয়ে অনেক কথা বলল তারা। কত কথা জমে ছিল ললিতের। বলতে বলতে বহুবার উঠে সিগারেট ধরাল ললিত, উত্তেজিত হয়ে উঠল, ক্লান্ত হল। অবশেষে ঘুমে জড়িয়ে এল চোখ। তখন একসময়ে ক্লান্তস্বরে জিজ্ঞেস করল, আমার অসুখের কথা জিজ্ঞেস করলি না, রমেন?

সে-কথার উত্তর দিল না রমেন। তার একখানা হাত অন্ধকারে ললিতের কাঁধে এসে পড়ল। রমেন বলল, আয় ললিত, আগের মতো আবার আমরা একটা কমিউন তৈরি করতে চেষ্টা করি।

কমিউন! ভীষণ অবাক হয় ললিত। কমিউন! একটা অতীত স্বপ্নের ছায়া তার চোখের ওপর দিয়ে ভেসে যায়। একপলক পরে সে সচেতন হয়ে বলে, ঠাট্টা করছিস?

রমেন ধীর গলায় বলে, না রে।

ললিত মৃদু হেসে বলে, তবে, সে কি হবে ধর্মীয় কমিউন! সেখানে কি গরিবকে বলা হবে, তোমরা এই জাগতিক দুঃখ হাসিমুখে বহন করো, পরকালে স্বর্গলাভ করবে! আর ধনীকে বলা হবে, তোমাদের সঞ্চিত সম্পদ কিছু কিছু দান করো, তোমরাও স্বর্গের অধিকারী হবে! এইভাবেই ধর্ম সাম্য আনার চেষ্টা করেছে, আমরাও তাই করব?

রমেন আস্তে করে বলে, তা নয়।

ললিত হাসে। বলে, তুই কর। আমাকে ছেড়ে দে। লাতন হয়ে পড়ে আছি। দুম করে একদিন রওনা দেব।

রমেন হাসে। বলে, যতই তোকে আয়ু দেওয়া যাক, ততই তুই আরও আড্ডা দিবি, চা খাবি, দায়সারা চাকরি করবি— কিন্তু তারপরও তো একদিন মরতেই হত! আয়ু দিয়ে কী করবি ললিত?

ললিত ঘুমচোখে হাসে। বলে, কী করব… কী করব… অনেককিছু করব রে! বিকেলে আমাদের উঠোনে একটা অদ্ভুত আলো এসে পড়ে, কোনও দিন লক্ষ করিনি, সেই আলোটুকু রোজ চুপ করে বসে দেখব একা-একা।…ঠিক দুপুরবেলা, মা যখন একা থাকে, সেই সময়ে ওই জানালার পাশে চৌকিতে বসে লুডো খেলব মায়ের সঙ্গে, পেয়ারা গাছের ফাঁক দিয়ে একটু রোদ এসে পড়বে মায়ের মুখে। …একটা প্রেম করব, বুঝলি? সন্ধের পর কলকাতার রাস্তায় দোকানের যে আলো পড়ে, সেই আলোয় তার পাশে পাশে হাঁটব...বিয়ে করব। …প্রথমে একটা মেয়ে হবে। তার শিশুমুখের গন্ধ নেব বুক ভরে।…তারপর আস্তে আস্তে বুড়ো হব…অসুখ হবে…মরে যাব…

রমেন, আস্তে হাসল। বলল, তার চেয়ে এই তো ভাল।

কী ভাল?

মৃত্যুর সময়টা জানা থাকা ভাল। এটা তো একরকমের সৌভাগ্য, যখন মানুষ জানতে পারে আর ঠিক ক’টা দিন তার হাতে আছে।

তাতে কী হয়?

আয়ু ফুরিয়ে আসছে জানলে মানুষ খুব চনমনে হয়ে ওঠে। সচেতন হয়। তখন চেষ্টা করলে সে সাত দিনে একশো বছরের জ্ঞান লাভ করে চলে যায়।

ললিত অলসভাবে হাসে। বলে, কে চায় জ্ঞানলাভ করতে?

রমেন হঠাৎ একটা উদ্ধৃতি উচ্চারণ করে, কারও কারও মৃত্যু পালকের মতো হালকা। কারও কারও মৃত্যু পাহাড়ের মতো ভারী।

ললিতকে কথাটা চাবুকের মতো স্পর্শ করে। সে চুপ করে থাকে। এটা কার উদ্ধৃতি তা তার মনে পড়ে যায়।

রমেন ধীর স্বরে বলে, মৃত্যুটা দুঃখের নয়। ও তো আছেই। দুঃখের সেটা যখন মানুষ কর্তব্য না করে চলে যায়। সে যে-খাদ্য খেয়েছিল, যে-পোশাক পরেছিল, পেয়েছিল যত ভাল ব্যবহার, তার সবকিছুর ঋণ রেখে চলে যায়। …ললিত, মনে পড়ে?

ললিত চুপ করে থাকে।

রমেন বলে, অকৃতজ্ঞ মানুষই সভ্যতার সব ফসল ভোগ করে নির্লজ্জের মতো, বদলে সভ্যতাকে কিছুই দেয় না।

ললিত হাসে ঘুমচোখে। তারপর মাথাটা এগিয়ে দেয় রমেনের বুকের কাছে। রমেন একখানা হাত রাখে ললিতের মাথা স্পর্শ করে। বলে, ঘুমো।

ললিত ঘুমোয়। কিন্তু মাঝে মাঝে ঘুমের মধ্যেই বিদ্যুতের মতো কী যেন স্পর্শ করে তাকে। অন্ধকারে পাশ ফেরার সময়ে সে অস্ফুট গলায় ডাকে, রমেন!

সঙ্গে সঙ্গে শান্ত ধীর গলায় উত্তর পায়, এই তো আমি। জেগে আছি। তুই ঘুমো।

ললিত ঘুমোয়। কিন্তু সারা রাত ধরে সে মাঝে মাঝে জেগে ওঠে। অজান্তে রমেনকে খোঁজে। সাড়া পেয়ে আবার নিশ্চিন্তে ঘুমোয়।

সকালবেলা সে রমেনকে জিজ্ঞেস করে, তুই কাল রাতে ঘুমোসনি?

রমেন মিটিমিটি হাসে। বলে, কেমন যেন মনে হয়েছিল রাত্রিবেলা ঘুম ভেঙে গেলে তুই আমাকে খুঁজবি।

ললিত লজ্জা পেয়ে বলে, তার জন্য ঘুমোসনি? তুই কী রে শালা! অত দূর ঘুরেটুরে এলি, তোর টায়ার্ড লাগছিল না?

রমেন মাথা নাড়ে, আমি কম ঘুমোই। তাই আমার দিন তোর দিনের চাইতে অনেক বড়!

কাল রাত থেকেই ললিতের মায়ের মনে একটা সন্দেহ ঢুকেছে। এই যে রমেন নামে ছেলেটা এসেছে ললিতের কাছে, এর রকমটা কী? সাজেগোজে দীনদরিদ্র, কিন্তু মুখখানা দেখে মনে হয় বড়ঘরের ছেলে। বড় সুন্দর মুখখানা। চেনা-চেনা লাগছিল। ললিত বলছিল বটে, রমেন এ-বাসাতে অনেক এসেছে মা! ওকে তুমি কত বার দেখেছ। কিন্তু আজকাল চোখে একটা ঘোলা-ঘোলা ভাব, কোনও কিছুই ঠিকমতো নজরে আসে না। তা ছাড়া কত দিন আগে দেখা, অত কি মনে থাকে?

সে যাই হোক, কিন্তু ললিত বলছিল, ছেলেটা নাকি সন্ন্যাসী। কোন আশ্রমে থাকে। এটা শোনার পর থেকেই মনটা কেমন খচখচ করছে। ওই সন্ন্যাসী ছেলেটা ললিতের কাছে কেন এসেছে! কী দরকার! বড় ভয় করে ললিতের মায়ের। এ-ছেলেটা আবার তুক করে যাবে না তো ললিতকে! একেই তো ললিত উদাসী ছেলে! আধা-সন্ন্যাসী হয়েই আছে তো।

কাল রাতে এক বিছানায় শুয়ে ওরা দু’জন অনেক রাত পর্যন্ত জেগে কথা বলছিল। কী যে অত কথা ওদের। ললিতের মা অনেক চেষ্টা করেছে শুনতে। কিন্তু গুনগুন শব্দ, দেশলাই জ্বালবার খস ছাড়া কিছুই কানে আসেনি। সারা রাত জেগে ওই ছেলেটা কী যেন বুঝিয়েছে ললিতকে। বিবাগী ছেলেদের বড় ভয় ললিতের মায়ের। কী কথা হয়েছিল ওদের কাল রাতে? একেই বুড়ি নাচুনি, তার ওপর আবার ঢাকের বাদ্যি।

সকালে ললিত বাথরুমে গিয়েছিল, সে সময়ে রমেনকে একা পেয়ে ললিতের মা এসে বলল, বুঝলে বাবা, ললিতের তো সংসারে মতি নেই, তুমি ওকে একটু বুঝিয়ে যেয়ো তো! দেখো, যেন ওর আর-একটু সংসারে ঝোঁক হয়, টাকাকড়ির দিকে মন দেয়। আর দেখো, ও মেয়ে দেখলে কানা হয়, চোখ তুলে তাকায় না, কিন্তু এ-বয়সে ও-রকম স্বভাব কি ভাল? তরতাজা বয়স, এ-বয়সে বয়সের গুণ থাকবে না? তুমি ওকে একটু দেখো তো—

দেখব।

দেখো। ওর যেন সংসারে মন হয়। আমি ওর জন্য মেয়ে দেখে রেখেছি। বেশ মেয়েটি। বড় লক্ষ্মীমন্ত।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%