ষোড়শ অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

ষোলো

নিজের এই দুর্বলতা অসহায়ভাবে লক্ষ করল ললিত। আশ্চর্য হয়ে গেল। কোথা থেকে এই দুর্বলতা আসছে? সে তো শাশ্বতীর প্রেমিক নয়! একবার মাত্র কয়েক মিনিট দেখা হয়েছিল তাদের, আর আজ একটু পরেই আদিত্যর সঙ্গে তার বিয়ে হয়ে যাবে। বয়ঃসন্ধি পেরিয়ে এসেছে ললিত, এখন সে আর অল্পবয়সি যুবা নয়, যখন মিতুকে দেখলে কেঁপে উঠত বুক; তখন কাঁপা আঙুল থেকে সিগারেট পড়ে যাওয়াও বিচিত্র ছিল না। এখন কি আর সে-রকম কিছু হয়? সে নিজের অস্থিরতার জন্য, দুর্বলতার জন্য অসহায় বোধ করে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। পায়ের কাছেই জ্বলন্ত সিগারেটটা পড়ে ছিল। চটি দিয়ে ঘষে ঘষে সেটার নাড়িভুঁড়ি বের করে ফুটপাথে মিশিয়ে দিল সে। এবড়োখেবড়ো বকুল গাছটার গায়ে জোরে চেপে ধরে রইল হাত।

অনেক দিন আগে তাদের বাসার ছোট্ট উঠোনটায় সে বাবার সঙ্গে ক্রিকেট খেলছিল একদিন সকালবেলায়। বাবা লুঙ্গি পরে তুলসীগাছের বেদিটাকে স্ট্যাম্প করে ব্যাট করছিল, ললিত করছিল বল। অসমান উঠোনে ডিউজ বলটা লাফিয়ে উঠছিল বারবার, ললিত বাহাদুরির জন্য প্রাণপণ জোরে বল ছুড়ছিল। সেটা কোনও এক সময়ে বাবার পায়ের হাঁটুর নীচে হাড়ে লেগেছিল, ললিত টের পায়নি। খেলার শেষে সে ঘরে এসে দেখল বাবার পায়ে হাড়ের ওপর থ্যাঁতলানো চামড়া ফেটে হাঁ হয়ে ফুলে কালশিটে পড়ে আছে, মা হাঁটুগেড়ে আইওডিন লাগাতে লাগাতে তাকে বলল, দ্যাখ, কী করেছিস! ললিত আশ্চর্য হয়েছিল। অত জোরে বল লাগাতেও বাবা একটুও চেঁচিয়ে ওঠেনি, ‘উঃ আঃ’ করেনি, শান্তভাবে খেলা শেষ করে ঘরে এসেছে, তাকে বুঝতেও দেয়নি। ছোট্ট ঘটনা, কিন্তু ললিতের মনে ছবিটা আঁকা হয়ে আছে। পরবর্তীকালে যত বার ব্যথাবেদনা পেয়েছে ললিত তত বারই চেঁচিয়ে উঠতে গিয়ে বাবার সেই ঘটনাটুকুর কথা মনে পড়ে গেছে। অমনি ললিত ব্যথার বা ক্ষতের স্থান চেপে ধরে সহ্য করেছে। ক্রমে এইটেই অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল তার। ছেলেবেলা থেকেই। তার বন্ধুরা বলত, ললিতের ব্যথা লাগে না। ললিত জানত সে অনেকের চেয়ে বেশি সহ্য করতে পারে। নিজেকে পরীক্ষা করার জন্য সে অনেক বার সিগারেটের আগুনে তার চামড়া পুড়িয়ে দাঁত টিপে সহ্য করেছে। শরীর থেকে সে শুরু করেছিল, তারপর ক্রমে ক্রমে নিজের চেষ্টায় সে মনের দুঃখগুলিকেও গোপন করতে থাকে। শরীর আর মন তো খুব দূরের সম্পর্ক নয়। সবাই জানে ললিত কাউকে তার দুঃখ দুর্দশার গল্প বলে না, তার নাকি-কান্না নেই। নিজের দুর্বলতাগুলিকে ঢেকে রাখতে জানে ললিত। একমাত্র মিতুর ঘটনাটা ছড়িয়ে পড়েছিল, কিন্তু তাতেও ললিতের দোষ ছিল না, মায়ের চোখ তাকে ধরে ফেলেছিল। সেইটে ছাড়া ললিতের দুর্বলতার আর কোনও অখ্যাতি নেই। হাসপাতালে গিয়ে সে যখন প্রথম বুঝতে পারল তার ক্যান্সার হয়েছে, তখন প্রথমটায় ভেঙে পড়েছিল ললিত। কিন্তু তাকে সামলে দিল তুলসীর চোখ। বায়োপসির ফলাফল জানার পর তুলসী তার মুখের দিকে চেয়ে ছিল। সামলে গেল ললিত, এক ঢোঁকে কান্না গিলে ফেলে হেসেছিল। মনে মনে ঠিক করা ছিল তার, এই শেষ যন্ত্রণাটুক সে শান্তভাবে সহ্য করবে। তার চেনা লোকেরা তাদের জীবনে উদাহরণ করে নেবে ললিতের সহনশীলতা। সে সেই কারণেই প্রাণপণে সহ্য করে যাচ্ছে। সে ডাক্তারের হাত জড়িয়ে ধরে চেঁচিয়ে বলেনি ‘আমাকে বাঁচান’, সে বন্ধুদের জড়ো করে বলেনি ‘আমার মাকে দেখিস—আমি চললাম’, এমনকী এখনও তার ঈশ্বরে অবিশ্বাস অটল রয়েছে, সেই অবিশ্বাস ভেঙে সে তারকেশ্বর কিংবা কালীঘাটে মানত করতে ছোটেনি। সেদিন শাশ্বতী যখন তার মেসোমশাইয়ের ঘটনা তাকে বলেছিল, তখনও ললিত তাকে ঘুর কথায় বুঝিয়ে দিয়েছিল তার কোনও উদাহরণের দরকার নেই। ঠিক আছে, সব ঠিক আছে। সে বরং মাঝে মাঝে ভেবে দেখেছে বাঁচার চেয়ে মরাটাই বরং তার বেশি দরকার। যারা তার বিপক্ষে, যারা তার শত্রু, কিংবা যারা তাকে ভালবাসেনি তারা সবাই দেখুক ললিত কত শান্তভাবে মরে যেতে পারে।

তাই এখন এই রহস্যময় দুর্বলতার দেখা পেয়ে বড় অসহায় বোধ করে ললিত। সে স্তম্ভিত হয়ে যায়। এতক্ষণ সে তো ঠিক ছিল। একটু আগে সে আদিত্যকে বিয়ে করতে রাজি করিয়েছে। সব ঠিক আছে। তবে এটা কী? এটা কেন? সে তার হাত থেকে খসে-পড়া সিগারেটটার ছিন্ন-ভিন্ন অংশটা চেয়ে দেখল। তারপর মনে মনে গাল দিল নিজেকে, ইডিয়ট!

ঘণ্টা পড়ার একটুক্ষণের মধ্যেই তার চারপাশের রাস্তা রং-বেরঙের মেয়েতে ছেয়ে গেল। প্রথমটায় একটি দিশেহারা বোধ করল ললিত। কোনও দিকে তাকাতে তার লজ্জা করছিল। সে কেবল আবছা ভাবে দেখতে পাচ্ছিল তার চার পাশে ভিড় করে গুনগুন কথা বলতে বলতে ঘুরছে মেয়েরা। মাঝখানে সে বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছে। কি বলবে এর মধ্যে তার আধচেনা, একবার দেখা শাশ্বতী কোন জন।

চারজন মেসে চানাচুরওয়ালার কাছে হেঁটে এল। তাদের মধ্যে একজন আকাশি-নীল শাড়ি পরা। আসতে আসতে ও থেমে গেল হঠাৎ। একটু দূর থেকে ললিতের দিকে চেয়ে বলল, আপনি?

ললিত দেখল, শাশ্বতী।

হঠাৎ খুব নির্জন হয়ে গেল চারপাশের পৃথিবী। যেন একটা কাচের ঘরের মধ্যে তারা দু’জন মাত্র দাঁড়িয়ে আছে।

কয়েক মুহুর্তের জন্য মাত্র। তারপরেই ললিত কাচের ঘর ভেঙে দিল। হাত জোড় করে স্বাভাবিক গলায় বলল, আপনার সঙ্গে একটু কথা আছে। জরুরি।

ললিত জানল না, সেই মুহূর্তে কী ভীষণ বুক কাঁপল শাশ্বতীর। থর থর করে কেঁপে উঠল তার অস্তিত্ব। মুখে ঝাঁপিয়ে এল রক্তস্রোত। তবু, বাইরে স্বাভাবিকই থাকল সে। যেন আগে থেকেই জানত শাশ্বতী এমনভাবে মাথা নেড়ে বলল, চলুন। তার তিন বন্ধু একটু অবাক চোখে তাদের দেখছিল। শাশ্বতী বন্ধুদের বলল, দাঁড়া আসছি।

একটু দূরে আর একটা গাছের ছায়ায় এসে দাঁড়াল দু’জন। ললিত বেশি ভূমিকা করল না। বলল, আদিত্য সকাল থেকে পাগলামি করছে। ওর সন্দেহ আপনি ওকে আর পছন্দ করেন না।

শাশ্বতী ভ্ৰূ কুঁচকে শুনল। তারপর মুখ নামিয়ে বলল, জানি। ওর মাথায় পোকা ঢুকেছে। কিন্তু আমি কী করব?

ললিত মৃদু বিষণ্ণতার হাসি হাসে, আদিত্যর খ্যাপামি উঠলে অনেক দূর গড়ায়। আর, খুব সামান্য ব্যাপারেই ওর খ্যাপামি দেখা যায়। নইলে ও সত্যিই ভাল মানুষ। খুব ভাল।

ললিতকে নস্যাৎ করে দিয়ে শাশ্বতী ঠান্ডা গলায় বলে, আমি ওকে জানি।

ললিত লজ্জা পায়। তারপর সামলে নিয়ে আস্তে করে বলে, ও আমার সঙ্গে এসেছে। মোড়ে ট্যাক্সিতে বসে আছে। আপনি একটু ওর কাছে চলুন। তারপর আপনাকে আমাদের সঙ্গে একটু এক জায়গায় যেতে হবে। খুব দূরে নয়। সন্ধের আগেই আপনাকে আমরা বাসায় পৌঁছে দেব।

কোথায়?

ট্যাক্সিতে বলব।

শাশ্বতী তার শাড়ির আচল তুলে একটা কোণ দাঁতে চাপে, খুব অন্যমনস্ক দেখায় তাকে। বলে, বলবেন না কেন? কোথায় যাচ্ছি তা আমার জানা দরকার।

ললিত বিপদের গন্ধ পেয়ে যায়। মুখখানাকে করুণ করে তোলার একটু চেষ্টা করে সে। বলে, সঙ্গে আদিত্য থাকবে। আপনার ভয় কী?

শাশ্বতী পরিষ্কারভাবে হাসে, ও অদ্ভুত সব কাণ্ড করে। আমার ভাল লাগে না। ভয় করে।

ললিত মৃদু হাসে, এখন ভয় নেই। ও খুব অনুতপ্ত। আপনার সঙ্গে ভাব করতে চায়।

আড়ি তো হয়নি!

ললিত কপাল তুলে বলে, হয়নি? আশ্চর্য! ও যা বলছিল তাতে মনে হয় ওর সঙ্গে আপনার খুব ঝগড়া হয়ে গেছে।

শাশ্বতী মাথা নেড়ে জানায়, না।

তবে? ললিত জিজ্ঞেস করে।

শাশ্বতী বয়ঃসন্ধির লাজুক মেয়ের মতো হাসে, সেটা একটা ভুতুড়ে কাণ্ড। কোনও মানে নেই।

কী?

আপনাকে বলা যায় না। এটা আমাদের—আমাদের একটা ব্যাপার।

ব্যাপারটা জানতে ললিতের লোভ হচ্ছিল। এখন একটু পরেই শাশ্বতী আদিত্যর গিন্নি হয়ে যাবে, তখন আর গতকাল কী হয়েছিল তা জানার চেষ্টাও করা যাবে না। কিন্তু তার আগেই এই কয়েকটা মুহূর্ত, যতক্ষণ কুমারী আছে শাশ্বতী, যতক্ষণ সে আইনত কারও নয়, ততক্ষণ সেই অল্প একটু সময়ে গতকালের কথা জেনে নিলে হত!

কিন্তু ললিত নিজেকে সংযত করে দিল।

সে শাশ্বতীকে বলল, চলুন প্লিজ।

ট্যাক্সির জানালা দিয়ে জিরাফের মতো গলা বের করে ছিল আদিত্য। তাদের দেখেই ভিতরের আবছায়ায় সরে গেল। ললিত শাশ্বতীকে নিয়ে এসে ট্যাক্সির দরজা খুলে ধরল। বলল, দেখুন, কেমন বর সেজে বসে আছে আদিত্য। সুন্দর দেখাচ্ছে না!

শাশ্বতী বোকার মতো অবুঝ চোখে একবার ললিতের দিকে তাকাল। ট্যাক্সিতে উঠল না, দাঁড়িয়ে রইল।

ললিত তাড়া দিল, উঠুন। তাড়াতাড়ি, লোকে আপনাকে দেখছে। ভাববে ভুলিয়ে-ভালিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।

স্পষ্টই অস্বস্তি বোধ করল শাশ্বতী। ইতস্তত করে তারপর উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ঝপ্ করে দরজা বন্ধ করে দেয় ললিত। সামনে ড্রাইভারের পাশে সে আর বিমান পাশাপাশি বসে। নতুন গোল্ডফ্লেকের প্যাকেট কেনা আছে আদিত্যর পকেটে! ললিত ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাইটা দে। আর, তোরা কথা বল।

আমি কী বলব! আদিত্য মৃদু গলায় বলে।

ললিত মৃদু হাসে। একপলকে দেখে শাশ্বতী গাড়ির সিটের ওপর রাখা খবরের কাগজে জড়ানো রজনীগন্ধার গুচ্ছ আর লাল-সাদা গোলাপের তোড়া অবাক চোখে দেখছে। সিটের পিছনে শাড়ির মোড়কটা আর আদিত্যের ছাড়া জামা-কাপড় নতুন কেনা পাঞ্জাবি আর ধুতির খালি প্যাকেটে ভরে রাখা। আদিত্যকে ললিত বলল, শাড়িটা ওর হাতে দে। আদিত্য বাঁ হাত বাড়িয়ে সেটা নিয়ে শাশ্বতীর দিকে বাড়িতে ধরল। শাশ্বতী চেয়ে রইল, হাত বাড়াল না। আদিত্য ঝুপ করে ওর কোলে ফেলে দিল মোড়কটা।

এইটুকু দেখেই চোখ ফিরিয়ে নিল ললিত। অনেকটা নিশ্চিন্ত লাগছে এখন। শাশ্বতীকে কলেজে পাওয়া না গেলে মুশকিল হত। এখন কাজটা আধাআধি মিটেই গেছে। আর একটু বাকি। কয়েকটা স্বাক্ষর মাত্র। সিগারেট ধরিয়ে সে নিচু গলায় বিমানকে বলল, শরৎকাল, তবু দেখে, এখনও গরম গেল না। নাও, সিগারেট। বলে প্যাকেটটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিল। আচমকা বিমান বলল, তুমি কি খুব উত্তেজিত?

কেন? অবাক হয়ে ললিত জিজ্ঞেস করে।

ভদ্রমহিলার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দাওনি।

ওঃ হো! বলে ললিত আর-একবার মুখ ঘোরায়। আদিত্য বাইরের দিকে চেয়ে আছে, শাশ্বতী কিছুই না বুঝতে পেরে স্তম্ভিতভাবে বসে৷ ললিত মৃদু হেসে বলল, এ হচ্ছে বিমান রক্ষিত আমাদের বহু পুরনো বন্ধু, আর বিমান, এই হচ্ছে শাশ্বতী…

শাশ্বতী এ-সব কথা শুনতেই পেল না। সে প্রবল উত্তেজনা চেপে কষ্টে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, আমরা কোথায় যাচ্ছি?

ওর গলার স্বর শুনে মায়া হয়। যেন বাচ্চা মেয়ে ভয় পেয়ে কথা বলছে।

বিমান তার ব্যান্ডেজ-বাঁধা মাথাটা কষ্টে পিছন দিকে একটু ঘোরাল। বলল, কেন, আপনি জানেন না?

শাশ্বতী শ্বাসরোধ করে মাথা নাড়ে, না।

এরা কেউ জানে না, অনেক দিন আগে, শাশ্বতী যখন ছোট, তখন তার দিদি লীলাবতীকে কেউ বা কারা কলেজের রাস্তা থেকে এইরকম ভাবেই হয়তো ট্যাক্সিতে তুলে নিয়েছিল। কোথায় কোন অচেনা জায়গায় যে তারা নিয়ে গিয়েছিল লীলাবতীকে। না, এরা কেউ শাশ্বতীর অচেনা নয়, তার পাশেই বসে আছে আদিত্য, হাত বাড়িয়ে তাকে ছোঁয়া যায়। আদিত্যকে ভালবাসে শাশ্বতী। ভালবাসে। কিন্তু এরা কেউ জানে না যে এখন, এই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছে, এরা তিন জন অচেনা পুরুষ তাকে ভুলিয়ে নিয়ে এসে ট্যাক্সিতে তুলেছে। নিয়ে যাচ্ছে অচেনা এক রহস্যময় জায়গায়। এরা তার ধর্ম কেড়ে নেবে, নষ্ট হয়ে যাবে তার আজন্মের প্রিয় এক পবিত্রতা। একবার তার ইচ্ছে হল ট্যাক্সিওয়ালার কাঁধে টোকা দিয়ে বলে, ভাই ট্যাক্সিওয়ালা, আমি এদের কাউকে চিনি না, এরা আমাকে জোর করে নিয়ে যাচ্ছে। পায়ে পড়ি, তুমি গাড়ি ঘোরাও, আমাকে বাসায় পৌঁছে দাও। আমি অবুঝ মেয়ে, এখনও পবিত্র আমি, দয়া করো।

কিন্তু ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেছে তার হাত-পা। গলায় স্বর ফুটছে না। তার পাশে ফুল, কোলের ওপর কাগজের প্যাকেট থেকে উঁকি মেরে আছে খুব ঝলমলে একখানা শাড়ি। সে এর অর্থ খানিকটা বুঝতে পারল, আর খানিকটা বুঝতে চাইল না।

এরা কেউ জানে না যে, শাশ্বতীর বড় ভয় করছে। রজনীগন্ধার উগ্র গন্ধ গোলাপের সঙ্গে মিশে গিয়ে বাতাস বিষিয়ে গেছে এখন। তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। … না, সে এদের কাউকেই চেনে না, কাউকেই না…এরা তিন জন অচেনা পুরুষ, আর সে একজন পবিত্র অবুঝ সরল মেয়ে—এরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তাকে? শাশ্বতীর বড় ভয় করছে।

বিমান তার মাথার ব্যান্ডেজের তলা দিয়ে আঙুল ঢুকিয়ে মাথা চুলকোয়। ব্যথায় মুখ বিকৃত করে। খুব অন্যমনস্ক দেখায় তাকে। সে হঠাৎ গলা নামিয়ে ললিতকে বলে, কাজটা ঠিক হচ্ছে না।

কী?

এটা?

কেন?

অনেকক্ষণ গম্ভীরভাবে চিন্তা করে বিমান। তারপর সিগারেট ধরানোর অছিলায় মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলে, মেয়েটা আদিত্যকে ভালবাসে না।

শুনে ট্যাক্সিওয়ালা চকিতে একবার তাদের দিকে তাকায়।

দাঁতে দাঁত চেপে চুপ করে থাকে ললিত। ট্যাক্সি পার্ক সার্কাসের ছ’কোনা চত্বরে এসে হু হু করে ঘুরে গেল বাঁয়ে। ধরল পার্ক স্ট্রিট। সোজা সুন্দর রাস্তা। বড় সুন্দর কতগুলি জায়গা ছিল পৃথিবীতে পার্ক স্ট্রিটের মতো! সুন্দর জায়গা ছিল পৃথিবী! বেঁচে থাকা কী রকম ভাল। পার্ক স্ট্রিট ধরে যেতে হঠাৎ গুমরে মুচড়ে ওঠে মন ললিতের। কত সুন্দর রোমাঞ্চকর সব ঘটনা ঘটতে পারত জীবনে, আরও বহুদিন বেঁচে থাকলে!

ললিত! আদিত্য শুকনো গলায় ডাকে।

ললিত ফিরে দেখে, আদিত্যর মুখ অল্প লাল। কিছু একটা বলার চেষ্টা করে আদিত্য, কিন্তু উত্তেজনায় প্রথম চেষ্টায় সেটা বলতে পারে না। ললিত লক্ষ করে ওর গায়ের নতুন পাঞ্জাবির বুকে এখনও দাম লেখা টিকিটটা লাগানো, এতক্ষণ তারা কেউ লক্ষ করেনি। সে হাত বাড়িয়ে বলে, বুকের টিকিটটা ছিঁড়ে ফ্যাল!

কীসের টিকিট! বলে আদিত্য নিজের বুকের দিকে চেয়ে টিকিটটা দেখে, আরও ঘাবড়ে যায়। এক হাতে টিকিটটা খুঁটে তুলতে চেষ্টা করে সে, তারপর গলা ঝেড়ে আস্তে বলে, ওকে বলে দে।

কী?

আমরা কোথায় যাচ্ছি।

শাশ্বতী স্মৃতিহীন বোকার মতো চেয়ে থাকে। ‘ফিট’-এর পর প্রথম জ্ঞান ফিরলে যেমন মুখ-চোখের ভাব হয়, তেমনি।

ললিত হঠাৎ খুব স্বাভাবিক গলায় শাশ্বতীকে বলে, এত ঘাবড়ে যাওয়ার কী আছে? আপনাদের তো একদিন না একদিন বিয়ে হতই। আজ শুধু আইনের দিকটা সেরে রাখা।

তবু শাশ্বতী বুঝতে পারে না। আইনের দিক! কীসের আইন! কার সঙ্গে তার একদিন না একদিন বিয়ে হওয়ার কথা ছিল?

আপনারা কথা বলুন। তাড়াতাড়ি কথা বলে নিন। সামনেই আমার এক বন্ধুর অফিস, আমি আর বিমান নেমে যাব। অল্প সময়। তার মধ্যেই আপনারা কথা বলে নিন। ললিত বলল।

কথা! শাশ্বতী ভেবেই পায় না কী কথা, কার সঙ্গে কথা।

আদিত্য যদি তার অচেনা পুরুষ হত তবে শাশ্বতী চেঁচিয়ে বলতে পারত, আমাকে নামিয়ে দাও, পায়ে পড়ি। সে বাইরের লোকজনকে উদ্দেশ করে গলা বাড়িয়ে ডাকতে পারত, এরা আমাকে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। বাঁচাও। কিন্তু তা তো নয়! তার মনে পড়ে সে হৈমন্তীকে বলেছিল যে একদিন খুব শিগগিরই তারা রেজিষ্ট্রি বিয়ে করবে। কিন্তু ভুল, বড় ভুল বলেছিল শাশ্বতী। কেন ভুল? না, শাশ্বতী তা জানে না। সে কেবল আবছাভাবে এইটুকু জানে যে, সকলেই সকলের জন্য নয়। কেউ কেউ কারও জন্য থেকে যায় এক জন্ম। সকলেই সকলের জন্য নয়। তবু ভুল লোক দরজায় টোকা দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে। সামলানোর সময় পাওয়া যায় না। ভুল ঠিকানায় চলে যায় ভালবাসার চিঠি। আর ফেরত আসে না।

এক রাতে অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখেছিল শাশ্বতী। একটা লোক লণ্ঠন হাতে মাঠঘাট ভেঙে খুব দূরে কোথাও চলে যাচ্ছে। তার মুখ দেখা যায় না, কেবল পা দু’খানায় পড়েছে লণ্ঠনের আলো। তবু মনে হয়েছিল সে বড় প্রিয়জন শাশ্বতীর, সে এক উদাসী মানুষ। দূরগামী। আজ জেগে থেকে সে সেই দৃশ্যটা প্রত্যক্ষ করল। যেন, তার একান্ত প্রিয়জন কেউ তাকে ছেড়ে দূরে চলে যাচ্ছে।

সে একবার উদ্ভ্রান্তের মতো আদিত্যর দিকে তাকায়। সেই লোক, সেই লোক কি আদিত্য? না, স্পষ্টই বোঝা যায় সে আদিত্য নয়। নতুন পাঞ্জাবি-পরা আদিত্য জড়সড় হয়ে বসে আছে। বাইরের দিকে মুখ, সদ্য কামানো গালে আলো চকচক করছে, কানের কাছে সেলুনের সাবানের শুকনো সাদা দাগ। এ স্বপ্নের কোনও মানুষ নয়। আশ্চর্য এই যে, একে, এই নিতান্ত সাদামাটা আদিত্যকে কত ভালবাসার কথা বলেছে শাশ্বতী, সব দিতে চেয়েছে তাকে! কিন্তু ভুল লোক, একেবারে ভুল লোক, আদিত্য তার স্বপ্নের কেউ না। শাশ্বতী ভালবাসে খুব দূরের যাত্রা একজন মানুষকে, যে সঙ্গীহীন একা একা খুব বড় প্রকান্ড এক ধু-ধু মাঠ রাতের অন্ধকারে পার হচ্ছে। চেনা আদিত্যকে এখন আর চেনে না শাশ্বতী। সেই অচেনাকে চেনে। সেই অচেনা কি ওই ললিত! হবেও বা। শাশ্বতী সঠিক জানে না কিছুই।

পার্ক স্ট্রিট। অচেনা জায়গা শাশ্বতীর। ট্যাক্সি হঠাৎ থেমে আসে। চমকে ওঠে সে। ট্যাক্সি বাঁক নেয়। ধীর হয়ে আসে। থেমে যায়।

ললিত মুখ ফিরিয়ে হাসল আপনি এখনও রেগে আছেন! এবার কথা বলুন। ও বেচারা খুব মনমরা হয়ে আছে।

লালিত বিমানকে নিয়ে নেমে গেল। জানালা দিয়ে ঝুঁকে বলল, আমরা মিনিট পনেরোর জন্য যাচ্ছি। আপনারা বোঝাপড়া করে নিন।

শাশ্বতী হঠাৎ ব্যাকুল হয়ে বলে, আমি নামব।

কেন?

শাশ্বতী উদ্ভ্রান্তের মতো চেয়ে থেকে বলল, আমি যাব না।

মুহূর্তেই চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে ললিতের। সে নিঃসংকোচ স্থির দৃষ্টিতে শাশ্বতীর অদ্ভুত ফ্যাকাসে মুখখানা দেখে। গোলমালটা কোথায় তা সে এখনও জানে না। কিন্তু জানার দরকারও নেই। অনেক দিন আগে সে ছিল অল্পবয়সি এক অসহায় ছেলে, যখন মিতুর জন্য সে রাস্তায়-ঘাটে যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকত হাঁ করে। মিতু ফিরেও তাকায়নি। মিতু তাকে গোপনে বড় অবহেলা করে গেছে। এখন আর মিতুর জন্য কিছুই অবশিষ্ট নেই তার, কেবল সেই তখনকার কমবয়েসি ললিতের জন্য তার এক মায়া আছে। পুরুষের অপমান কিংবা দুঃখ সে বোঝে। বোঝে প্রতিশোধ। মনে মনে কঠিন হয়ে গেল ললিত। আদিত্য নামে এক বন্ধুর জন্য নয়, কেবলমাত্র একজন পুরুষের জন্য একটা কিছু সৎ কাজ তার করে যাওয়া দরকার। একটু আগেও হয়তো শাশ্বতীর জন্য মায়া হচ্ছিল তার। কিন্তু এখন হঠাৎ তার ভিতরে এক আহত পুরুষ বাঘের মতো গর্জন করে উঠল।

মুখে মিষ্টি হাসল ললিত। বলল, সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখবেন। কোনও ভাবনা নেই। আমরা আজ রাতে আদিত্যর পয়সায় মুরগি খাব, আপনি কি তা চান না?

কিছুই বুঝতে পারল না শাশ্বতী। পাগলা বোকা চোখে চেয়ে রইল।

শীততাপ নিয়ন্ত্রিত প্রকাণ্ড একটা হলঘর। তার ভিতরেই পার্টিশান দেওয়া খোপে সঞ্জয়ের অফিস। তারা ঢুকতেই ব্যস্ত সঞ্জয় মুখ তুলে বলল, কী ব্যাপার?

একটা ঝামেলা ঘাড়ে করে এনেছি। তোকে যেতে হবে।

কোথায়? সঞ্জয় সই করতে করতে বলে।

সাক্ষী দিতে। আজ আদিত্যর বিয়ে, ওরা নীচে ট্যাক্সিতে বসে আছে। খুব দ্রুত বলে ললিত। তার হাঁফ ধরে যায়।

জানতাম! সঞ্জয় শ্বাস ফেলে বলে, আমার যে ক’টা বন্ধু আছে, এক শালারও মাথার ঠিক নেই।

ললিত দম ফেলার সময় দেয় না। হাত বাড়িয়ে বলে, টেলিফোন ডিরেক্টরি শিগগির—

তারপর বসে মোটা বইখানা টেনে তাড়াতাড়ি পাতা ওলটাতে থাকে ললিত। আপনমনে বলতে থাকে, ডাক্তার বাগচী… ডাক্তার বাগচী… ম্যারেজ রেজিস্ট্রার…

সঞ্জয়ের উলটো দিকের চেয়ারে কালো মোটামতো একটা লোক বসে ছিল। ললিত তাড়াহুড়োয় তাকে লক্ষ করেনি। সেই লোকটা হঠাৎ ললিতের কানের কাছে মুখ এনে বলল, আমার হাতে একজন ম্যারেজ রেজিস্ট্রার আছে। যাবেন?

ললিত চমকে উঠে চেয়ে প্রথমে চিনতে পারে না লোকটাকে, তারপর বলে, আরে! লক্ষ্মীকান্ত!

লক্ষ্মীকান্ত হাসে, ম্যারেজ পার্টির জন্য ভাল ঘরও আছে আমার হাতে। নিরিবিলি। বর বউ রাত কাটাতে পারে স্বচ্ছন্দে। ফুলটুল দিয়ে সাজিয়ে দেব। কম ভাড়া।

ললিত তাকে হাত ধরে টেনে তোলে, চলো, তোমার চেনা রেজিস্ট্রারের কাছে। কিন্তু নোটিস দেওয়া নেই, আর মেয়েটা আপত্তি করতে পারে। কান্নাকাটিও করবে হয়তো, কান দিলে চলবে না। পারবে?

লক্ষ্মীকান্ত মিটমিট করে হেসে বলে, মেয়েরা সহজে রাজি হয় না, এ তো জানা কথা। পারব।

ব্যান্ডেজের তলায় আঙুল চালিয়ে আর-একবার কপাল চুলকোনোর চেষ্টা করছিল বিমান। ললিতের কানের কাছে মুখ নামিয়ে বলল, তোমাকে ভীষণ অস্থির দেখাচ্ছে। তোমার হাত কাঁপছে।

ললিত চমকে ওঠে হঠাৎ। ঠিক, তার হাত কাঁপছে। গুরগুর করছে বুকের ভিতরটা। দুপুরে সামান্যই খেয়েছে ললিত, কিন্তু হজম হয়নি। কলকল করে তার পেট ডাকছে। নিজের ব্যস্ততা আর অস্থিরতা লক্ষ করে লজ্জা পায় ললিত। বলে, সময় বেশি নেই। ব্যাপারটা আজকেই করতে হবে।

লক্ষ্মীকান্ত বলে, মোটে সোয়া তিনটে। অনেক সময় আছে। দরকার হলে রাত দশটায় করে দেব।

সঞ্জয় মুখ তুলে বলে, একটু বোস। আমি কাজ ক’টা সেরে নিই। সাক্ষী-ফাক্ষী দিয়ে আর অফিস ফিরব না কেটে পড়ব তোদের সঙ্গে।

ললিত অস্থির মন নিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। একবার উঠে জানালার কাছে যায়। ট্যাক্সিটা দাঁড়িয়ে আছে অচল হয়ে। ট্যাক্সির জানালার কাচের ওপর ছোট্ট শ্যামলা হাতের আঙুল, কবজি, আর হাতঘড়িটা দেখা যাচ্ছে। শাশ্বতী। আবার ফিরে আসে ললিত। অস্থির বোধ করে। সময় নেই। আর সত্যিই খুব একটা সময় নেই। তার নিজের সময় ফুরিয়ে আসছে।

চেয়ারের পিছনে মাথা হেলিয়ে সে চুপ করে বসে থাকে। চোখ বোজে। ওরা সত্যিই কথা বলছে কি? কে জানে! সে ওদের পনেরো মিনিট সময় দিয়ে এসেছে। সময় আছে। নিজের হাতঘড়ি দেখে ললিত। এখনও অনেক সময় আছে। সে চোখ বুজে থাকে। শুনতে পায় লক্ষ্মীকান্ত নিজে থেকেই বিমানের সঙ্গে পরিচয় করে নিচ্ছে, খুব বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করছে বিমানের জীবন-বিমা করা আছে কি না! ললিত মৃদু একটু হাসে। কত ধান্ধায় ঘুরে বেড়াচ্ছে লোক। ওইভাবে বেঁচে থাকতে হঠাৎ তার শরীর শিরশির করে ওঠে। বেঁচে থাকা কী রকম ভাল। কত ভাল।

মিনিট কুড়ি বাদে সঞ্জয় উঠল। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সঞ্জয় বিমানকে বলল, আপনাকে কোথায় দেখেছি বলুন তো! ললিতের খেয়াল হল অস্থিরতায় সে দু’জনের চেনা করিয়ে দেয়নি। বিমান তার সুন্দর গলায় উত্তর দিল, রমেনের বাড়িতে। রমেন গান গাইত, চোখ বন্ধ করে হাঁটত, চোখ বেঁধে দিলেও বলে দিত ঘরের কে কোনখানে বসে আছে। আমি সেখানে যেতাম। সঞ্জয় বলে, ওঃ হো, হ্যাঁ হ্যাঁ আপনিই, আপনার নাম বিমান না?

ললিত আর কোনও কথা শুনতে পেল না। সে ওদের চেয়ে কয়েক পা এগিয়ে নামতে লাগল।

শাশ্বতী অবিকল সেইভাবেই বসে ছিল যেভাবে ললিত তাকে দেখে গেছে। যেন গত কুড়ি মিনিটে সে একটুও হাত-পা নাড়েনি। নিশ্বাসও নেয়নি। সঞ্জয় আর লক্ষ্মীকান্তর সঙ্গে পরিচয় করানোর সময়ে একটুও হাসল না শাশ্বতী। কথা বলল না। হাত দুটো জড়ো করল কেবল। বুকের কাছে তুলে ছেড়ে দিল, হাত দু’খানা কাঠের টুকরোর মতো পড়ে গেল।

বোঝা গেল আদিত্য অনেক সিগারেট খেয়েছে। ট্যাক্সির ভিতরটা ধোঁয়ায় অন্ধকার।

সঞ্জয়ের গাড়িতে উঠল লক্ষ্মীকান্ত আর বিমান। ট্যাক্সির সামনের সিটে পুরনো জায়গায় বসল ললিত। সঞ্জয়ের সাদা গাড়িটা পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল আগে আগে।

ললিত একবার মুখ ফিরিয়ে শাশ্বতীকে বলল, আপনারা কথা বলেননি?

শাশ্বতী বেভুল তাকিয়ে রইল শুধু।

হাসল ললিত, আপনমনে বলল, সব ঠিক হয়ে যাবে।

আর তখন শাশ্বতী দেখছিল এক অচেনা শহরের অদ্ভুত রাস্তাঘাটের ভিতর দিয়ে কয়েকজন ধর্মনষ্টকারী অচেনা পুরুষ তাকে এক রহস্যময় জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে। যেমন অনেক বছর আগে নিয়ে গিয়েছিল তার দিদি লীলাবতীকে।

আর তখন সঞ্জয়ের গাড়িতে পিছনের সিট থেকে হাত বাড়িয়ে বিমান সঞ্জয়ের পিঠে টোকা দিল। বলল, ওই মেয়েটা আদিত্যকে ভালবাসে না।

বাসে না? সঞ্জয় বিস্মিত হয়।

না। মাথা নাড়ে বিমান, বিড়বিড় করে বলে, আমি জানি।

তা হলে? সঞ্জয় জিজ্ঞেস করে।

বিমান একটু ভাবে, তারপর তার ধীর গম্ভীর গলায় বলে, কিন্তু ললিতের ইচ্ছে বিয়েটা হোক।

তারপর একটু ভেবে বলে, কিন্তু আমি জানি, সকলের সঙ্গে সকলের বিয়ে হয় না। বিয়ের একটা নিয়ম আছে। বিয়েটা খুব পবিত্র জিনিস। ভুল বিয়ে দুঃখী, অলস, অকর্মণ্য এবং বিশ্বাসঘাতক মানুষকে পৃথিবীতে নিয়ে আসে। এবং তার জন্য, ভুল বিয়ে যারা করে তারা সমাজের কাছে দায়ী থাকে। তাদের বিচার হওয়া উচিত।

লক্ষ্মীকান্ত মাথা নেড়ে বলে, ঠিক!

সঞ্জয় মৃদু হাসে। বিমানটা পাগল।

ভিতর থেকে লক্ষ্মীকান্ত বুড়ো ম্যারেজ রেজিস্টারের সঙ্গে তার গোপন কথাবার্তা বলে বেরিয়ে আসে।

পাশাপাশি তিনটে আরামদায়ক বড় সোফার একটিতে আদিত্য আর শাশ্বত খুব ফাঁক হয়ে বসেছে। অনাটাতে ললিত আর সঞ্জয়। তৃতীয়টায় বিমান, তার পাশে লক্ষ্মীকান্ত এসে বসল।

শাশ্বতীর এখনও কোনও সাড়া নেই। সে খুব বিস্মিতভাবে চারধারে চেয়ে দেখছে। আদিত্য মাথা হেলিয়ে চোখ বুজে আছে।

সঞ্জয় দু’-একবার হাসিঠাট্টা করার চেষ্টা করে চুপ করে ছিল। ললিত হঠাৎ একসময়ে বলল, সব শেষ! বাঃ!

রেজিস্ট্রার তার মোটা চশমার কাচের ভিতর দিয়ে তাদের দিকে চেয়ে দেখল। প্রকাণ্ড খাতা খুলল, বের করল কর্ম। নিঃশব্দে লিখতে লাগল।

নিস্তব্ধ ঘর।

হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে ম্যারেজ-রেজিস্ট্রার তার ঘড়ঘড়ে গলায় জিজ্ঞেস করল, দু’জনের নাম?

ললিত বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু বলা হল না। মৃদু একটু শব্দ করে খুব আস্তে শাশ্বতী কেঁদে উঠল। অনেকক্ষণ তার সংবিৎ ছিল না। কিন্তু এখন সে হঠাৎ বুঝতে পারছে। তাকে কোথায় কেন এনেছে ওরা।

চমকে সোজা হয়ে বসে আদিত্য। সঞ্জয় উঠে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। ললিত চেয়ে থাকে।

আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল বিমান। সামান্য খোঁড়াতে খোঁড়াতে গিয়ে ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের টেবিলের ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে বলল, ভদ্রমহিলা কাঁদছেন। উনি বিয়ে করতে রাজি নন।

লক্ষ্মীকান্ত শাশ্বতীর সামনে মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে হাতজোড় করে বলতে থাকে, দিদি, আমারও বউ রাজি ছিল না। এই দেখুন, আমার কালো মোটা চেহারা, বিচ্ছিরি। কিন্তু এখন আমার ছ’-ছ’টা বাচ্চা, বউ কত খোঁটা দেয়, তবু আমরা সুখে আছি… দিদি, রাজি হয়ে যান, সব ঠিক হয়ে যাবে…সব ঠিক হয়ে যাবে…

বুড়ো ম্যারেজ-রেজিস্ট্রার তার প্রকাণ্ড খোলা খাতাখানার দিকে অসহায় চোখে চেয়ে থাকে।

বিমান খোঁড়াতে খোঁড়াতে ললিতের কাছে এসে গলা নিচু করে বলে, আমি ওকে নিয়ে যাচ্ছি। রাজি করিয়ে আনব। তোমরা অপেক্ষা করো।

ললিত কথা বলে না। চেয়ে দেখে বিমান খোঁড়াতে খোঁড়াতে বেরিয়ে যাচ্ছে। পিছনে জড়সড় ভিতু শাশ্বতী।

তারা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল। কিন্তু বিমান আর শাশ্বতী ফিরল না।

গভীর ক্লান্তির সঙ্গে ললিতের চোখ বুজে আসে। বদহজমের টক ঢেঁকুরে হঠাৎ তার গলা বুক জ্বলে যায়। মুখে জল আসে। হাসপাতালে ওষুধপত্রের যত গন্ধ পেয়েছিল ললিত, হঠাৎ সেইসব গন্ধ তার নাকে আসতে থাকে। হিক্কার মতো একটা শব্দ করে সে। মুখ চেপে ধরে রাখে। তারপর কোনওক্রমে জিজ্ঞেস করে, বাথরুমটা—বাথরুমটা কোন দিকে?

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%