শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
বাবার যে পুরনো ছবিটা দেয়ালে টাঙানো আছে তার পিছন থেকে দেয়াল বেয়ে পেট-মোটা একটা টিকটিকি ললিতের মুখোমুখি নেমে এল। গত কয়েক দিন ধরেই ললিত লক্ষ করেছে, মাঝে মাঝে টিকটিকিটা দেয়াল থেকে ধুপধাপ টেবিলের ওপর, মেঝের ওপর পড়ে যায়, আবার দেয়াল বেয়ে ওঠে, বাবার ছবিটার আড়ালে চলে যায়। সেই পুরনো টিকটির্কিটাই কি, যেটা মায়ের সব কথায় সায় দিয়ে বরাবর ডেকে উঠত, টিকটিক টিকটিক? সে-কথাগুলো প্রায় সময়েই ছিল তার বিয়ে করার ঘর-সংসার করার কথা, কিংবা বাড়ি তৈরির জন্য তাগাদা। বরাবর টিকটিকিটা সায় দিয়ে গেছে। ও পরিষ্কার মায়ের দলে। মা কথা শেষ করে টিকটিকির ডাক শুনে মেঝেয় টোকা দিয়ে বলেছে, ওই শোন, তিন সত্যি। ললিত উত্তর দিতে গিয়ে কান পেতে থেকেছে, টিকটিকিটা ডাকেনি। সেই পুরনো টিকটিকিটাই কি না তা লক্ষ করার জন্য টেবিল ল্যাম্পের আলোটা ঘুরিয়ে ওর গায়ে ফেলে ললিত। লক্ষ করে টিকটিকিটার পেট বেঢপ মোটা। প্রায় কাচের মতো স্বচ্ছ সেই পেটের মধ্যে কালচে মতো কী যেন দেখা যাচ্ছে। আরও একটু কাছে চোখ নিয়ে সে দেখল পিছনের পায়ের কাছাকাছি পেটের মধ্যে দু’ ধারে নিখুঁত গোল দুটি ডিম। এত স্পষ্ট যে, ললিত চমকে ওঠে। ডিম দুটো ঢাকা দেওয়ার কোনও বন্দোবস্ত নেই ওর শরীরে। খুব অল্প যন্ত্রপাতি দিয়েই ওর শরীর তৈরি হয়েছে, ওইটুকু স্বচ্ছ শরীরের মধ্যেই ওর বুদ্ধি, হজমশক্তি, ভয় এবং সন্তান। বরাবরই ও ললিতের বিপক্ষে ছিল, মায়ের দলে। ললিত এখন দেখল, ও মাথা তুলে কালো জ্বলজ্বলে দু’খানা পুঁতির মতো চোখ দিয়ে তাকে দেখছে। বুঝি বা ললিতকে জানাচ্ছে গর্ভধারণের কষ্ট। কেন যে এটা বরাবর মায়ের সঙ্গে তার বিপক্ষে জোট বেঁধেছে তা এখন ললিত বুঝতে পেরে হাসে। ছাদ পর্যন্ত মসৃণ সাদা দেয়ালটার কোথায় ও ডিম পাড়বে! নিখুঁত গোল দু’টি ডিমকে গড়িয়ে পড়া থেকে কী করে বাঁচাবে ও? চিন্তিতভাবে টিকটিকিটার চোখে চোখ রেখে ভাবছিল ললিত। আপন মনে বলল, তোমার বেশ বিপদ, বুঝলে টিকটিকি-মা! তারপর সে ভেবে দেখল কখনও টিকটিকির ডিম মেঝেয় পড়ে ভাঙতে দেখেনি সে। ওরা ঠিক কোথাও-না-কোথাও এক আধটা খাঁজ খুঁজে পায়। প্রত্যেকের জন্যই এক-একটা বন্দোবস্ত আছে পৃথিবীতে। বাবার ছবিটার দিকে চেয়ে সে একটু হাসল। ছবিটার পিছনেই বোধ হয় টিকটিকিটার বাসা। ছবিতে মোক্তারের পোশাক পরা লোকটা এককালে পুববাংলায় দাপটে ফুটবল খেলোয়াড় ছিল। ঢোলা প্যান্ট পরে খালি পায়ে সাহেবদের বুট-পরা পায়ের সঙ্গে টক্কর দিয়েছে। সাহেব-রেফারিরা যে-সব গোল নাকচ করেছিল সেগুলো ধরলে সে-আমলে শ’ দেড়েক গোল দিয়েছিল লোকটা। প্রতিটি গোলেরই আলাদা আলাদা গল্প ছিল। রোমাঞ্চকর সে-সব গল্প। উইয়ে খাওয়া একটা ফটোগ্রাফ ছবির ফ্রেম থেকে খুলে মা সযত্নে ট্রাঙ্কে রেখে দিয়েছে। ছবিটায় আছে প্রকাণ্ড একটা শিল্ডকে ঘিরে একটা পুরনো আমলের ফুটবল টিম। শিল্ডটার বাঁ বারে মাটিতে বসে বাবা— সামনে দু’খানা পা পরস্পরের সঙ্গে আড়াআড়ি করে রাখ, নাকের নীচে মোটা গোঁফ, মাথার মাঝখানে সিঁথি, মোটাসোটা নাদুসনুদুস শরীর, গায়ে জার্সি না থাকলে খেলোয়াড় বলে মনেই হত না। লোকটার বরাবর গর্ব ছিল, আমরা ‘হায়ারে’ খেলতাম। মাকে ছেলেবেলায় বলতে শুনেছে ললিত বে, ফুটবলের ডিমে তা দিয়েই লোকটা অর্ধেক জীবন কাটিয়ে দিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার উৎসবের সময়ে গ্রামে নবীনদের সঙ্গে প্রবীণদের একটা খেলা হয়েছিল। সেই শেষবার প্রবীণদের দলে বাবাকে খেলতে দেখেছিল ললিত। অফসাইডের জন্য বাবার দেওয়া একটা গোল নাকচ হল। ললিত কাঁদো-কাঁদো হয়েছিল ক্ষোভে, আক্রোশে। সান্ত্বনার মধ্যে রেফারিটা ছিল চশমা চোখে। সেই বিকেলেই হল ‘কেদার রায়’ নাটকের অভিনয়। শেষ দৃশ্য: কার্ভালো বুকে পিস্তল দেগে আ…আ…গু-উ-ড বাই বে-ন্-গো-ও-ল’ বলে ঢলে পড়ছে। চোখের জল শার্টের ঝুলে মুছে উত্তেজনায় উঠে দাঁড়িয়েছিল ললিত, চেঁচিয়ে সবাইকে ডেক বলতে ইচ্ছে হয়েছিল, ওই লোকটা, ওই কার্ভালো তার বাবা! তার বাবা! পিছনের দুটো লোক চেঁচিয়ে বলেছিল, বসে পড়ো খোকা, তোমার বাবা সত্যিই মরে নাই।
মোক্তারের পোশাক পরা লোকটার ছবির দিকে চেয়ে একটু হাসল ললিত, মনে মনে বলে, টিকটিকির ডিমে তা দিচ্ছো, বাবা? তারপর গম্ভীর হয়ে আবার হাসল, দাও। হায়ারেই খেলছ কিন্তু এখনও!
টেবিলের ওপর ছড়ানো কাগজপত্র, পুরনো চিঠি। সেগুলো ধুলো-টুলো ঝেড়ে দেখছিল ললিত। তাকে চিঠি লেখার লোক কম। তাই চিঠি বেশি জমেনি। কিছু চিঠি হারিয়ে গেছে, কিছু বা উনুন ধরানোর কাজে লাগিয়েছে মা। তবু এর মধ্যেই রমেনের কয়েকখানা চিঠি পাওয়া গেল। অনেক দিন আগে লেখা। রমেনের সঙ্গে চিঠি চালাচালি বন্ধ হয়ে গেছে বহুদিন। তার কথা ভুলেই গিয়েছিল ললিত। সঞ্জয় আজ না বললে মনেই পড়ত না, মনে পড়ে ভাল হয়েছে। তিন-চার শ’ টাকা দেনা আছে রমেনের কাছে। সেটা শোধ দেওয়া দরকার। টাকাটার কথা হয়তো রমেনের মনেও নেই। কত লোকের কাছে রমেনের কত টাকা পড়ে আছে। জড়ো করলে কয়েক হাজার হবে। তার হিসেব রমেন রাখত না। রমেনের কাছ থেকে যারা টাকা নিয়েছে, তারা কোনও দিনই বোধ হয় সেটা শোধ দেওয়ার কথা ভাবেনি, রমেন নিজেই ভাবতে দেয়নি। তারপর এখন রমেন বোধ হয় সন্ন্যাসী-টন্ন্যাসিই কিছু হয়ে গেছে, বিহারের ছোট শহরে এক আশ্রমে বাস করছে। সেই আশ্রমের ব্যাপার-স্যাপার ললিত জানে না। তবে মনে হয় তারা এতদিনে রমেনকে গেরুয়া-টেরুয়া পরিয়ে, মাথা কামিয়ে একটা আধ্যাত্মিক চেহারা দিয়েছে। সে হয়তো এখন আর টাকা-ফাকা ছোঁয় না, যে-কোনও মেয়েছেলেকে মা বলে ডাকে, কীর্তন-টীর্তন করে। এখন আর তার টাকা শোধ দেওয়ার মানেই হয় না। তবু একবার চেষ্টা করে দেখতে চায় ললিত। রমেনের কথা মনে না পড়লে টাকাটার কথাও মনে পড়ত না, কিন্তু দৈবক্রমে যখন মনে পড়েই গেছে তখন শোধ করে দেওয়াটাই ঠিক হবে। কোনও দিন যদি রমেনের স্বার্থবুদ্ধি ফিরে আসে, তখন যেন ললিতের প্রতি তার কোনও আক্রোশ না থাকে। মরার পরও যদি ললিত কিছুদিন তার চেনা লোকজন, আত্মীয় বা বন্ধুবান্ধবের স্মৃতিতে থেকে যায় তবে সে-থাকাটা যেন ঋণমুক্ত, হিংসা-দ্বেষহীন এবং ভারশূন্য হয়।
রমেনের ঠিকানাটা পাওয়া গেল সহজেই। সোজা ঠিকানা। শুধু নাম, আর পোস্ট-অফিস। এতেই চিঠি চলে যায়। চিঠির কাগজে কেবল ‘ভাই রমেন’ এটি পাঠটুকু লিখে ললিত এর পরে কী লিখবে তা ভাবছিল, এমন সময়ে শম্ভু এসে ডাকল, ললিতদা।
কী রে!
একটু বাইরে আসুন।
একটু দরকার আছে।
ললিত বাইরে এসে দেখল গলির মুখে পাড়ার কয়েকজন ছেলে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে চাপা গলায় কথা বলছে। তাকে দেখে সিগারেট লুকোল। শম্ভু গলির মধ্যে তাকে এনে বলল, আপনি বিমান রক্ষিত নামে কাউকে চিনতেন?
ললিত একটু ভেবে বলল, কেমন চেহারা বল তো! কোথায় থাকে?
শম্ভু বলল, এ-পাড়ারই লোক। নতুন এসেছে। ফরসা রোগা চেহারা, দেখলে মনে হয় অসুখবিসুখ আছে, ভাসা-ভাসা চোখ…
ললিতের মনে পড়ল না। বলল, উঁহু। দেখলে হয়তো চিনব। কিন্তু কী ব্যাপার?
শম্ভু তার দলের একটা ছেলেকে ডাকল। সুবল। সুবল এগিয়ে এসে বলল, লোকটা এ-পাড়ায় নতুন। পশ্চিমের বস্তিবাড়ির কাছেই একটা খোলার ঘরে থাকে। কয়েক দিন আগে রাত্রিবেলা কিছু লোক এসে লোকটাকে খুব মেরে-ধরে গেছে। আমরা কিছু জানতাম না। পরদিন সকালে খবর পেয়ে আমরাই ভাক্তার-টাক্তার দেখিয়েছি। কিন্তু মার খাওয়ার পর থেকেই লোকটা কেমন পাগল-পাগল হয়ে গেছে। একা একা কান্নাকাটি করে। বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না। গতকাল থেকে সে আপনার নাম বলছে। বলছে যে, আপনার সঙ্গে নাকি কলেজে এক ক্লাসে পড়ত। আমরা ভদ্রলোকের মার-খাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে খোঁজখবর করছি, কিন্তু কিছুই বের করা যাচ্ছে না। পুলিশেও খবর দেবে না, হাসপাতালেও যাবে না। লোকটা রোগা, কিন্তু ভীষণ গোঁয়ার। আমরা খুব চাপাচাপি করায় গতকাল হঠাৎ বলল, ঠিক আছে, এ-পাড়ায় ললিত ভট্টাচার্য থাকে, সে আমার কলেজের ক্লাস-মেট, তাকে ডেকে দিন, তার কাছে বলব। আপনার অসুখ বলে আপনাকে আমরা প্রথমে খবর দিইনি, কিন্তু এখন দেখছি আপনাকে না হলে ব্যাপারটা কিছুই জানা যাবে না।
শম্ভুর দলবলের অধিকাংশ ছেলেই বেকার। তাদের সময় কাটতে চায় না। পাড়ায় কোনও ঝামেলা-ঝঞ্জাট হলে খুশি হয়, সেইটে নিয়ে কিছু দিন মেতে থাকে। অচেনা একটা লোক রহস্যময় কারণে বেপাড়ার কিছু লোকের হাতে মার খেয়েছে, এর গুপ্ত রহস্য ভেদ না করলে শান্তি নেই।
কিন্তু ললিত কিছুতেই মনে করতে পারল না। যে-কলেজে সে পড়ত সেটা কলকাতার একটা বড় কলেজ। আসলে সেটা ছিল গোয়ালঘর। এক ঘরে আড়াই শ’ ছেলে গাদাগাদি করে বসে তারা জেনারেল ক্লাস করত। প্রায় সবসময়েই রোল কলের পর পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে বাইরের করিডোরে সিগারেট ফুঁকত, কিংবা চায়ের দোকানে আড্ডা জমাত। সেই আড়াই শ’ ছেলের মধ্যে কে যে রোগা ফরসা চেহারার ভাসা-ভাসা চোখের বিমান রক্ষিত তা কে বলবে! সে, রমেন আর আদিত্য পড়ত এক ক্লাসে, তুলসী পড়ত এক ইয়ার নীচে। এরা ছাড়া আর যারা ক্লাসের বন্ধু ছিল তাদের মধ্যে কাউকেই বিমান রক্ষিত বলে মনে হল না তার। সে মাথা নাড়ল, না রে সুবল, মনে পড়ছে না। চল, একবার দেখেই আসি ছেলেটাকে।
ঘরে গিয়ে জামা নিয়ে বেরিয়ে এল ললিত। চেঁচিয়ে মাকে সদর বন্ধ করতে বলল, তারপর আর মায়ের উত্তর শোনার জন্য অপেক্ষা করল না।
পশ্চিমের বস্তি খুব দূরে নয়। মিনিট তিনেক যেতে হয়। পাড়ার রাস্তা থেকে একটা শ্যাওলা-পড়া কাঁচা মেটে রাস্তা গিয়ে বস্তিতে শেষ হয়েছে। বস্তি থেকে একটু আলগা ঘরখানা। ওপরে খোলার চাল, কিন্তু দেয়াল আর মেঝে পাকা। ঘরে ইলেকট্রিক বাতিও রয়েছে। সুবল বলল, এই ঘর। ভদ্রলোক বাইরের ঘরে থাকেন, ভিতর দিকটা বাড়িওলার।
সুবল এগিয়ে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আশেপাশের লোকজন উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করল। খালি গায়ে লুঙ্গিপরা একটা লোক এসে তাদের গা ঘেঁষে দাঁড়াল। লোকটা বিমান রক্ষিতের বাড়িওয়ালা। রাস্তার আলোয় তার মুখে যথেষ্ট দুশ্চিন্তা দেখতে পেল ললিত। লোকটা তাকে চেনে। এ-পাড়ায় এখনও ললিতের খানিকটা দাপট আছে। লোকটা তাকে দেখে নমস্কার করল; বলল, একটা কিছু সমাধান করে যান দাদা। শুনেছি আপনার বন্ধু, ঘরখানা ছেড়ে দিতে বলেন। বড় অশান্তি হচ্ছে।
দরজায় অনেকক্ষণ ধাক্কা দেওয়ার পর দরজা খুলল। দরজায় দাঁড়িয়ে মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা একটা লোক। রাস্তার ম্লান আলোতেও হঠাৎ লোকটার দুটো চোখ ধকধক করে জ্বলে উঠল। লোকটা বলল, কী ব্যাপার?
অসম্ভব সুন্দর ভরাট গলা লোকটার। একবার শুনলেই মন আকৃষ্ট হয়। পরনে পায়জামা, ওপর-গায়ে একটা তোয়ালে জড়ানো।
সুবল বলল, ললিতদাকে নিয়ে এসেছি।
শুনে লোকটা তাদের কয়েকজনের দিকে একটু অনির্দিষ্টভাবে চেয়ে থেকে বলল, আসুন।
ঘরে পঁচিশ কি চল্লিশ পাওয়ারের একটা আলো জ্বলছে। সেই অস্পষ্ট আলোয় ঘরের ভিতরটা দেখল ললিত, চারদিকে কেবল বই আর বই। নোংরা বিছানা, ময়লা মশারি নিচু করে টাঙানো, ঘরের এধার-ওধার জুড়ে টাঙানো দড়িতে রাজ্যের জামাকাপড়। বিমান রক্ষিত যে জামা-কাপড় ধোপাবাড়ি দেয় না তা একনজরেই বোঝা যায়। দড়ি থেকে গামছা ঝুলছে, পায়জামা শুকোচ্ছে। এক উদাসীনতা ছাড়া ঘরটার আর কোনও চরিত্র নেই। এই হতদরিদ্র ঘরে চকচকে নতুন দামি মলাটের ইংরিজি বইগুলি খুবই বেমানান লাগছিল।
দরজা খুলে দিয়েই লোকটা আবার বিছানায় গিয়ে বালিশে পিঠ দিয়ে আধশোয়া হয়েছে। তাকে দেখে বলল, এসো ললিত, বিছানায় বোসো।
কাছ থেকে ললিত মুখখানা দেখল। ব্যান্ডেজের তলায় কপাল ঢাকা পড়েছে, নাকটা ফুলে লাল হয়ে আছে, বাঁ চোখ থেকে ডান দিকের থুতনি অবধি একটা প্রকাণ্ড কালশিরার দাগ, ঠোঁট ফাটা, তাতে রক্ত জমে আছে। গা তোয়ালে দিয়ে ঢাকা, তাই সেখানকার ক্ষতগুলো দেখা গেল না। স্বাভাবিক মুখখানা হয়তো বা চিনতে পারত ললিত। কিন্তু এখন এই ফোলা-কাটা-ফাটা মুখখানা কিছুতেই চেনা গেল না। তার দিকে অপ্রতিভ তাকিয়ে লোকটা একটু হাসবার চেষ্টা করল, সঙ্গে সঙ্গে ফাটা ঠোঁট দিয়ে রক্ত ফুটে বেরোল। ‘আপনি’ না ‘তুমি’ কী বলবে ঠিক করতে না পেরে একটু অস্বস্তি বোধ করছিল ললিত। হঠাৎ খেয়াল হল লোকটা একটু আগেই তাকে ‘তুমি’ বলেছে। সে বলল, কথা বোলো না, তোমার ঠোঁট দিয়ে রক্ত পড়ছে।
তোয়ালে দিয়ে ঠোঁটটা একটু চেপে ধরে লোকটা সেই ভরাট সুন্দর গলায় বলল, আমি তোমাকে চিনি। তোমার বোধহয় আমাকে মনে পড়ছে না!
ললিত একটু হাসল।
শম্ভুরা ঘরের মধ্যে এসে ভিড় করে দাঁড়িয়েছে, জানালা দরজা দিয়ে উঁকি মারছে কৌতূহলী লোক। লোকটা এই ভিড়ের দিকে তাকিয়ে অপ্রতিভ মুখে চুপ করে রইল। চোখে-মুখে খানিকটা ঘাবড়ে যাওয়া ভাব।
ললিত শম্ভুর দিকে তাকিয়ে বলল, তোরা এখন যা, আমি একটু কথা বলি।
শম্ভু মাথা নেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পিছনে গেল ওর দলবল। ললিত উঠে দরজাটা বন্ধ করতে গিয়ে দেখল ওরা দরজার বাইরে জটলা করছে। সুবল গলা বাড়িয়ে চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করল, চিনতে পারছেন তো? না কি শালা চারশ’ বিশ!
ললিত বলল, চিনেছি। তোরা চলে যা। কাল সকালে দেখা করিস।
দরজা বন্ধ করল ললিত, জানালা ভেজিয়ে দিল। তারপর সিগারেটের প্যাকেট মাঝখানে রেখে লোকটার মুখোমুখি বিছানায় বসল।
বোঝা যায় ভাসা-ভাসা দুটো চোখের তলায় অনেক কথা জমা হয়ে আছে। লোকটা ভ্রূ জড়ো করে তার দিকে একটু তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে বলল, তুমি সত্যিই আমাকে চিনতে পারছ?
ললিত একটু দ্বিধা করে বলল, ঠিক মনে পড়ছে না।
লোকটা চোখ খুলল, আমাকে খুব কম ছেলেই চিনত। আমি কারও সঙ্গেই মিশতে পারতাম না।
বলে একটু থেমে বলল, কলেজ-জীবনে তুমি ছিলে আমার হিরো। তোমাকে আমার খুব মনে আছে। তুমি ছাত্র ইউনিয়ন করতে। চমৎকার বক্তৃতা দিতে পারতে, অনেক ভোটে জিতে তুমি হয়েছিলে কলেজ-ইউনিয়নের জেনারেল সেক্রেটারি। সব ঠিক বলছি তো?
ললিত মাথা নাড়ল, ঠিক।
লোকটা আবার বলল, তুমি ছিলে ছাত্রমহলে ভীষণ পপুলার। যে-কেউ মুশকিলে পড়লে তোমার কাছে ছুটে যেত। তুমি কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অনেক লড়াই জিতেছিলে। প্রায়ই দেখতাম ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে তোমাকে ঘিরে জটলা হচ্ছে। ছেলেরা তোমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। কখনও করিডরে, কখনও কলেজের সামনে রাস্তায়, কখনও চায়ের দোকানে। তুমি কড়া মেজাজের প্রিন্সিপালের ঘরে অনায়াসে ঢুকে যেতে পারতে, ভাইস-প্রিন্সিপালকে মেজাজ দেখিয়ে আসতে পারতে, প্রফেসররা তোমাকে ভয় পেত। তুমি ছাত্রদের অনেক ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা করেছ। ঠিক বলছি না?
ললিত মাথা নাড়ে, ঠিক।
আমার খুব হিংসে হত ভাই! বলে লোকটা আবার হাসল। তার ফাটা ঠোঁট দিয়ে রক্তবিন্দু ক্রমান্বয়ে গড়িয়ে আসছে, আর সে তোয়ালে দিয়ে চেপে চেপে মুছে কথা বলছে, আমি ভেবেই পেতাম না ছেলেরা তোমার সঙ্গে এত কী কথা বলে! তাদের সঙ্গে তোমারই বা কী এত কথা থাকতে পারে! কথার অভাবে আমার কোনওকালে তেমন বন্ধু জোটেনি। দু’-চারটে কথার পরই আমার কথা ফুরিয়ে যায়, বলার মতো কিছুই আমি আর খুঁজে পাই না, অসহায়ভাবে আমি চুপ করে থাকি। ছেলেবেলা থেকেই এইরকম আমার কপাল। যতবার বন্ধু পাতাতে গেছি ততবারই টের পেয়েছি আমার বলার মতো তেমন কিছু নেই। অথচ চিরকাল দেখেছি আমার সমবয়সি বন্ধুরা ক্লাসের পিছনের বেঞ্চে বসে নিচু স্বরে কথা বলছে, খেলতে খেলতে কথা বলছে, খেলার শেষে কথা বলছে, স্কুলে যেতে যেতে, স্কুল থেকে ফিরতে ফিরতে দল বেঁধে, জোট বেঁধে কথা বলছে। আমার ইচ্ছে হত আড়াল থেকে আড়ি পেতে ওদের কথাগুলো মুখস্থ করে রাখি, তারপর সেই কথাগুলোই আমার কথা করে তুলি। কিন্তু শুনতে গিয়ে দেখেছি সেই কথাগুলো একেবারেই তুচ্ছ সামান্য সব কথা, যার তেমন কোনও মানে নেই। তবু সবাই ওইরকম আজেবাজে কথা দিয়েই পরস্পরের মধ্যে সম্পর্ক বজায় রাখছে। আমি ও-রকম আজেবাজে কথা বলার চেষ্টাও করে দেখেছি, আমার হয় না। বন্ধুরা বরাবর আমাকে এড়িয়ে গেছে। তাই ক্রমে ক্রমে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আমার কথাবার্তা খুব কমে যেতে লাগল। নিজের কথার অভাব সম্বন্ধে আমি এত সচেতন হয়ে উঠছিলাম যে, মানুষের সঙ্গে আমার যোগাযোগ খুব কমে যেতে লাগল। সকলের মধ্যেই ঘুরি ফিরি, কিন্তু কারও সঙ্গেই সাহস করে কথা বলি না। এটা আমার এমন একটা রোগের মতো হয়ে দাঁড়াল যে, আমার উপস্থিত-বুদ্ধি পর্যন্ত কমে যাচ্ছিল। রাস্তার অচেনা লোক কোনও ঠিকানা বা রাস্তার খোঁজ করলে আমি খুব ঘাবড়ে যেতাম, ঘড়িতে ক’টা বাজে জিজ্ঞেস করলে দিশেহারা হয়ে নিজে হাতঘড়ির দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থেকেও সঠিক সময়টা বুঝতে পারতাম না। প্রায়ই আমি লোককে ভুল ঠিকানা কিংবা ভুল সময় বলে দিয়েছি। আমাদের বাড়িতে কোনও আত্মীয়-স্বজন এলে, কিংবা কেউ বেড়াতে এলে আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতাম। আমি অন্য কারও বাড়িতে পারতপক্ষে যেতাম না। ট্রামে-বাসে কেউ আমার পা মাড়িয়ে দিলে আমি বলতে পারতাম না, পা-টা সরিয়ে নিন মশাই, দোকানদার ভুল পয়সা ফেরত দিলে বলতে পারতাম না যে, পয়সা ভুল হয়েছে, ওজনে কম দিলে বলতে পারতাম না, তোমার দাঁড়িপাল্লার ফেরটা একটু দেখি হে! এক বার বাসে আমার চোখের সামনে দেখলাম, একটা ছোকরা পকেটমার এক বুড়ো লোকের পকেট থেকে ব্যাগ তুলে নিল। আমি চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম। এক বার ক্রিকেট খেলা দেখতে গিয়ে গ্যালারির ওপর থেকে আমি সিগারেটের জ্বলন্ত শেষ অংশটুকু ফেলে দিয়ে লক্ষ করলাম সেটা গ্যালারির কাঠের ফাঁক দিয়ে নীচে পড়ল। সেখানে একটা লোক উবু হয়ে বসে পেচ্ছাব করছিল, তার ঘাড়ের শার্টের কলারে গিয়ে আটকে গেল টুকরোটা! লোকটা টের পায়নি, ওদিকে তার শার্টের পিছন দিকটা ধরে গিয়ে ধোঁয়া উঠছিল। আমি একদৃষ্টে সভয়ে সে-দৃশ্যটা দেখলাম, কিন্তু লোকটাকে ডেকে ব্যাপারটা বলতেই পারলাম না।
আবার ঠোঁটে তোয়ালে চাপা দিল লোকটা। বলল, তুমি এটা ঠিক বুঝবে না। কারণ, তোমার কখনও কথার অভাব হয়নি। তুমি বরাবর অনায়াসে কথা বলেছ। শুনে তোমার একটু অদ্ভুত লাগছে না?
হাসল ললিত। বলল, বলো, থেমো না।
তোমার একটা সিগারেট খাই। বলে লোকটা সিগারেট ধরাল। খুব কষ্টে ফাটা ঠোঁটে সিগারেট আটকে অল্পস্বল্প টান দিল। তারপর বলল, স্কুলে বা কলেজে যে-সব ছাত্র জনপ্রিয় ছিল, তাদের সবাই ছিল আমার হিরো। তুমিও ছিলে। তোমাকে খুব লক্ষ করতাম আমি। ছিপছিপে ফরসা শরীর, চোখা নাক, চাপা গাল, তুমি চুপ করে থাকলেও তোমার ধারালো মুখখানা কিন্তু নীরবে কথা বলত। তুমি কখনও কাউকে অগ্রাহ্য করতে না, এবং নিজের জনপ্রিয়তা সম্বন্ধে তুমি সচেতন ছিলে। আমার ধারণা হত যে, একদিন তুমি দেশের নেতা-টেতা গোছের কিছু হয়ে উঠবে। কলেজের ফাংশনে একবার তোমাকে দেখেছিলাম কলকাতার মেয়রের সঙ্গে কথা বলতে, আর-এক বার দেখেছিলাম এক সুন্দরী বিখ্যাত গায়িকার সঙ্গে। আমার বিশ্বাস ছিল তোমার ক্ষমতা এত বেশি যে, তুমি হয়তো একদিন ওই বিখ্যাত গায়িকাকে বিয়ে পর্যন্ত করতে পারবে। তোমাকে তার সঙ্গে কিছুক্ষণ বড় চমৎকার মানিয়েছিল। তোমাকে আমি হিংসে করতাম, কিন্তু মনে মনে সবসময় চাইতাম তুমি যেন অপরাজেয় হয়ে থাকো, সামনের ইউনিয়ন ইলেকশনে কেউ যেন তোমাকে হারাতে না পারে, কলেজ কর্তৃপক্ষ যেন কখনও তোমাকে উপেক্ষা না করে, তোমার সম্ভাব্য বিয়ের প্রস্তাব যেন কখনও প্রত্যাখ্যান না করে সেই বিখ্যাত সুন্দরী গায়িকা। দেখো, তোমাকে আমি কতটা মনে রেখেছি।
হাসল লোকটা, রক্তের ফোঁটা ফুটে উঠল ঠোঁটে, তোয়ালে চাপা দিয়ে বলল, কিন্তু আসলে আমার দুর্বলতা থেকে তোমাকে আমি যতটা বড় মনে করতাম তুমি হয়তো ঠিক ততটা বড় নও। তুমি যা, তার চেয়ে তোমাকে আমি বহু গুণ বাড়িয়ে দেখেছিলাম। না?
ললিত মৃদু হেসে মাথা নাড়ল, ঠিক।
আমি যে সত্যিই তোমার সঙ্গে পড়তাম তার আরও একটা প্রমাণ দিই। সে সময়ে তুমি কলেজের ম্যাগাজিনে একটা প্রবন্ধে লিখেছিলে, ‘ভারতে সাম্যবাদ এবং কয়েকটি অসুবিধা’— ঠিক বলছি না? সেই প্রবন্ধে তুমি লিখেছিলে যে, ভারতবর্ষে ধর্মই হচ্ছে সাম্যবাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। অথচ এ-ধর্মের বিরুদ্ধে লড়াই দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। কারণ, ধর্মই ভারতবর্ষের সভ্যতাকে তৈরি করেছে, ধর্মই চিরকাল ধরে নিয়ন্ত্রণ করেছে এ দেশের ইতিহাস। একটা পুরো জাতি ধর্মে শৃঙ্খলিত। সাম্যবাদের প্রথম আঘাতটি যখন এর ওপর এসে পড়ে তখন ঠিক অনুরূপ একটি প্রত্যাঘাতও লাভ করে। কারণ, এ দেশের লোক ধর্মের নামেই পারত্রিক দুঃখগুলি ক্লেশে বহন করে, কর্মফল স্বীকার করে বাস্তব পৃথিবীর আঘাতগুলি অনায়াসে গ্রহণ করে। তুমি আরও লিখেছিলে: আর আশ্চর্যের বিষয় যে, এখনও কোনও কোনও মন্দির বা দেবস্থানে হত্যা দিয়ে বা মানসিক করে লোকের কিছু কিছু মনস্কামনা পূরণ হয়। কোনও ধর্মগুরু বা যাজক এখনও লোককে কিছু কিছু অলৌকিক ক্রিয়াকলাপ প্রত্যক্ষ করান, যার ফলে মানুষের ধর্মবিশ্বাস ভাঙনের মুখে এসেও আবার জোড়া লেগে যায়। তোমার প্রবন্ধটা এ-রকমই ছিল, না?
ললিত মাথা নাড়ে, ঠিক।
তুমি এই সাম্যবাদ এবং ধর্মের একটা সমাধান দিয়েছিলে। তুমি লিখেছিলে: এ দেশে ধর্মের অসারতা প্রমাণ করতে হলে সাম্যবাদের প্রতিটি প্রচারককেই হাতেকলমে ধর্মের প্রতিটি বিধি এবং আচারকে মানতে হবে। মনুর অনুশাসনকে শিরোধার্য করে নিয়ে লোকের সামনে সমস্ত বিধিগুলি পূর্ণ করে দিয়ে দেখতে হবে যে, এগুলো আসলে ধোঁকাবাজি ছাড়া কিছুই নয়। এদেশে ধর্মকে হাতেকলমে অপ্রমাণ না করতে পারলে এর ভিত নড়ানো যাবে না।
সিগারেটটা শেষ করে ঘরের একধারে না দেখে ছুড়ে ফেলল লোকটা, বলল, তোমার সমাধানটা আমার অদ্ভুত লেগেছিল।
বলতে বলতে হঠাৎ হো-হো করে হাসল লোকটা, খুব অদ্ভুত। ধর্মকে অস্বীকার করার জন্য সাম্যবাদীরা ফোঁটা তিলক কেটে বোষ্টম হচ্ছে, কাপালিক হয়ে শ্মশানকালীর পুজো করছে, কিংবা সাধু হয়ে চলে যাচ্ছে হিমালয়ে, কীর্তন করে ফিরছে সারা দেশ—ভাবাই যায় না।
লজ্জায় ললিত একটু লাল হল। বাস্তবিক ও-রকমই একটা অস্বাভাবিক প্রস্তাব সে করেছিল সেই প্রবন্ধটায়। ঠিক।
লোকটা একটু স্থির হয়ে, রক্তাক্ত হাসিমুখে তার দিকে চেয়ে বলল, তুমি কি এখনও সেই প্রস্তাবে বিশ্বাস করো?
ললিত মাথা নাড়ল, না।
কেন করো না?
ললিত চুপ করে রইল।
লোকটা হঠাৎ বলল, আমি বিশ্বাস করি। তুমি ঠিকই লিখেছিলে।
টিকটিক করে একটা টিকটিকি ডেকে উঠল। লোকটা লক্ষ করল না, কিন্তু ললিত শুনল।
বেশ কষ্ট এবং কসরত করে লোকটা উঠে বসল। জিজ্ঞেস করল, চা খাবে?
ললিত বলল, না।
আমি একটু খাব।
বলে লোকটা উঠল। ঘরের একধারে রান্নার জন্য কিছু অ্যালুমিনিয়মের বাসনপত্র আর কেরোসিন স্টোভ ছিল। লোকটা স্টোভ জ্বেলে কেটলি চাপিয়ে আবার এসে চৌকিতে বসে একটু হাঁফাল। তোয়ালেটা গা থেকে বেখেয়ালে সরে যেতেই লোকটার খুব রোগা শরীর দেখা গেল। বুকের খাঁচাটা সরু একটা নলের মতো গোল। ললিত স্থির চোখে লোকটাকে দেখছিল। সুবলের সন্দেহ, মার খেয়ে লোকটা পাগল-পাগল হয়ে গেছে। তাই হবে।
লোকটা বলল, এ-পাড়ায় এসে আমি তোমাকে দূর থেকে দেখেই চিনেছিলাম। না, তোমার চেহারা সেই আগেকার মতো ধারালো নেই, একটু ভোঁতা হয়ে গেছে। আমি তোমার সঙ্গে আলাপ করলাম না। কারণ, আমি জানতাম তুমি আমাকে ঠিক চিনবে না। আমাকে খানিকটা চিনত তোমার বন্ধু রমেন।
রমেন?
লোকটা মাথা নাড়ল। বলল, তোমাকে এ-পাড়ায় দেখে খুব হতাশ হলাম। দেখলাম, আমি যা ভেবেছিলাম তুমি তার কিছুই হওনি। অলস সময় কাটিয়ে দিচ্ছ। তারপর শুনলাম, তোমার অসুখ। তারপর আর তোমার সম্বন্ধে কোনও কৌতূহল হয়নি।
ললিত মৃদু একটু হেসে বলল, আমার কথা বাদ দাও। আমার নিজেরও আর কৌতূহল নেই। তুমি নিজের কথা বলো।
লোকটার মাথায় বা কোথাও কোনও যন্ত্রণা হচ্ছিল। খানিকক্ষণ মুখখানা বিকৃত করে যন্ত্রণাটা সহ্য করল। তারপর একটু ঝিম মেরে রইল। বলল, আমি কি খুব এলোমেলো কথা বলছি?
না তো!
ঠিকঠাক গুছিয়ে বলতে পারছি?
নিশ্চয়ই।
লোকটার ঘোলাটে চোখ চিকমিক করে উঠল। তেমনই ধীর ভরাট গলায় বলল, আমার বাবা উকিল ছিল, বাবার ইচ্ছে ছিল আমিও উকিল হই। কিন্তু আমার রকমসকম দেখে বাবা সে-আশা ছেড়ে দিল। আমি যা ইচ্ছে পড়তে লাগলুম। প্রথমে বিজ্ঞানে ইন্টারমিডিয়েট, তারপর বি কম, মাঝপথে বি কম ছেড়ে দর্শনে অনার্স নিয়ে বি এ অনার্সের ক্লাসে তোমার বন্ধু রমেনের সঙ্গে আলাপ।
আলাপ?
লোকটা হাসল, আলাপ শুনে হাসছ? বাস্তবিক আলাপটা হঠাৎ হয়নি। রমেনকে তুমি বোধ হয় খানিকটা চেনো, সে খুব কৌতুহলী ছেলে। কোনও বিষয়ে একবার সে কৌতূহলী হলে তাকে ঠকানো মুশকিল। আমার চুপচাপ অসহায় ভাব লক্ষ করে সে আস্তে আস্তে আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে চেষ্টা করে। আমার কথা আসতই না, দু’-একটা কথা বলেই আমি থেমে যেতাম। কিন্তু রমেন আমার শেষ দেখবে বলে প্রতিজ্ঞা করেছিল।
লোকটা হঠাৎ মুখ বিকৃত করে বলল, যাক গে, সে বিস্তর কথা। বি এ পাস করে আমি দর্শনের এম এ-তে ভরতি হলাম, তুমি পড়তে ইংরিজি নিয়ে। তখনও তোমাকে আমি দেখেছি। শেষ পর্যন্ত আমার আর পড়া হয়নি।
কেন?
লোকটা হাসল। তারপর অকপটে বলল, আমি কিছু দিনের জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলাম।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন