শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
বর্ধমানের কয়েক স্টেশন আগে ডাউন লাইনের ধারে এক নিরালা জায়গায় সোঁদাল গাঁয়ের একজন লোক কলকাতার গাড়ির জন্য দাঁড়িয়ে ছিল। দুঃখী লোকটা। পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে সে বেঁচে আছে, পৃথিবীতে, আজ তার শেষ দিন। রেল লাইন বাঁক নিয়ে চলে গেছে পশ্চিমের দিকে উদোম মাঠের ভিতর দিয়ে। নিস্ফলা মাঠের ও-পাশে প্রকাণ্ড সূর্য ডুবে যাচ্ছে। পূবে বহু দূর থেকে হরেন সাঁইয়ের ধানকলের শব্দ আসছে ঝকঝক। নাবাল জমিতে এখনও জমে আছে গত বর্ষার জল, ব্যাঙ ডাকছে। একটু আগে হালকা একটা মেঘ বৃষ্টি দিয়ে গেল। বেশ বিকেলটি, জলে-ভেজা মাঠঘাটে পড়ন্ত রোদ পাকা ফসলের মতো দেখায়। দুঃখী লোকটা দেখে। কাঁধের গামছাখানা দিয়ে চোখের জল মুছে নেয়। শেষ বিকেলটা বড় সুন্দর। যদি এমন সুন্দর হত জীবন, এমন ভর-ভরন্ত নিস্তব্ধ বিকেলটির মতো! কিন্তু তা তো হয়নি। বাবার ঋণ ছিল অনেক, জমি চলে গেল মহাজনের ঘরে। ভাগচাষে চলছিল দিন, কিন্তু পর পর দু’ বছর অজন্মা। ধানের দর পড়ে গেল। হরেন সাঁইয়ের কলে ঝাড়াই হচ্ছে তারই রোয়া-কাটা ধান। এখন আর তার কোনও দুঃখ নেই, এক্ষুনি রেলগাড়ি চলে আসবে, বাড়বাড়ন্ত হোক সাঁইমশাইয়ের। ঝাড়া হাত-পা তার, কাঁদবার কেউ নেই, এক যদি বারুইপুরে মেয়েটার কাছে খবর যায়। তা সে-খবরও যাবে দুলকি চালে৷ পৌঁছতে পৌঁছতে মাসখানেক। তত দিনে হাওয়া-বাতাসে জলে-মাটিতে মিশে কোথায় চলে যাবে সে! তার খানিকটা চলে যাবে আকাশে, মেঘ হয়ে চোখের জল ফেলবে, তার আর খানিকটা মাটিতে মিশে বুকে করে নেবে সেই জল, তার আর খানিকটা হু-হু বাতাসের সঙ্গে ছুটে এসে ধানের আগা ছুঁয়ে চলে যাবে কোথায়! দুঃখী লোকটা তার চারধারে অলৌকিক বিকেলটা দেখে নেয়। ফলিডল কেনারও পয়সা ছিল না বলে সে আড়াই মাইল হেঁটে এসেছে রেলরাস্তা পর্যন্ত। উঁচু জমিতে দাঁড়াতেই ফুরফুরে হাওয়া লাগছে। বাতাসে এখন বড় আদর। সেই আদুরে বাতাসটাই একটা শব্দ নিয়ে আসে। গুরুগুরু শব্দ। দুরে রেলব্রিজে উঠে এল গাড়ি। তারপর পায়ের নীচে মাটি চড়াইয়ের বুকের মতো কাঁপে। মাইলখানেক দূরে বাঁকের মুখে পিঁপড়ের মতো কালো ট্রেনখানা উদোম মাঠের উপর দিয়ে চলে আসছে। ড্রাইভার সাহেব দেখে ফেলবে। লোকটা দু’কদম নেমে যায় ঢালু বেয়ে। উবু হয়ে বসে একটা বিড়ি ধরায়। খুব জোরে টানতে থাকে। বাঁকের ওপর দিয়ে পাক মেরে আসছে গাড়িখানা। বিড়ি ফেলে লোকটা উঠে দাঁড়ায়। গামছাখানা জড়িয়ে নেয় মুখে, তারপর দুই লাফে উঠে আসে ঢালু বেয়ে। গামছার আবছায়ার ভিতর থেকে এক বার কালো ট্রেনখানা দেখে, মার মার ঝোড়ো শব্দের মধ্যে চেঁচিয়ে মেয়ের নাম ধরে ডেকে বলে, ব-কু-ল, যা-আ-ই! বাতাসের একটা ধাক্কা লাগে জোর।
অনেক হিজিবিজি দেখতে পায় লোকটা। দেখে কোমরের ওপর দাঁড়িয়ে আস্ত একটা রেলগাড়ির কামরা। কিন্তু খুব ভার লাগে না। তার শরীরের ভিতর দিয়ে কুলকুল করে একটা নদী বয়ে যাচ্ছে, ভিজে যাচ্ছে ঘাস মাটি। সে জলের জন্য একবার হাঁ করে। দু’বার তিন বার। মুখে কথা ফোটে না। ঘাড়টা কাত হয়ে যায়। অনেক মানুষের পা বৃষ্টির মতো মাটিতে পড়ছে। অনেক লোক—অনেক লোক—কথা বলছে। কিন্তু সে কেবল অঝোরে নদীর শব্দটা শোনে। তার শরীরের ভিতর থেকে কুলকুল করে বয়ে যাচ্ছে। সে জলের জন্য হাঁ করে। কেউ তার কথা বুঝতে পারে না। আস্তে আস্তে বৃষ্টির জলে যেন ধুয়ে যাচ্ছে মুখগুলো! সে ভয়ে চেঁচায়, জল! কিন্তু কেউ বুঝতে পারে না। হঠাৎ আবছায়ার মধ্যে কোথা থেকে সুন্দর একখানা মুখ তার মুখের ওপর নেমে আসে। বড় সুন্দর মুখ, দয়াল দু’টি জলভরা চোখ। লোকটা অবাক হয়ে চেয়ে থাকে। এইরকম, এইরকম একজন মানুষকেই সে তো সারা জীবন নিজের অজান্তে খুঁজছে! কখনও আলপথে লণ্ঠন হাতে যেতে যেতে, কিংবা যখন বর্ষার একবুক জলে নেমে ট্যাঁটায় গাঁথা বস্তুটি শোলমাছ না কেউটে না জেনে হাত ডুবিয়েছে জলে, কিংবা কখনও দিকশূন্য বৈশাখী দুপুরের ধু-ধু মাঠ আর অনন্ত আকাশের দিকে চেয়ে পৃথিবী ও আকাশের প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারেনি, কিংবা কখনও যখন বাইরের দাওয়ায় মাঝরাতে ঘুম ভেঙে ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় হঠাৎ অস্পষ্টভাবে নিজের পূর্বজন্মের কথা মনে পড়ি-পড়ি করেও পড়েনি, তখন সেইসব সময়ে সে তো আবছাভাবে একেই খুঁজে বেড়িয়েছে এত দিন! এই দয়ালু মুখখানা—আহা, যা পরের জন্য কাঁদে, সময়ে দেখা হল না গো, এ ঠিক নিয়ে যেত তাকে সেইখানে যেখানে ঈশ্বর আছেন। কচু পাতায় জল মুখ ভরে ঢেলে দিচ্ছে মানুষটা, চোখে-মুখে পড়ছে জলের ছিটে। লোকটা অবাক হয়ে চেয়ে থাকে, তুমি কি অচেনা মানুষ! না গো। দুঃখী মানুষ তোমাকে দেখলেই চিনে নেবে। অন্ধকার নেমে আসে। সূর্যের মুখ ঢেকে দয়ালু মুখখানা তার দিকে চেয়ে থাকে। এই একজন মানুষ, যে তার জন্য কাঁদছে। লোকটা নিশ্চিন্তে চোখ বোজে।
আস্তে আস্তে তার মাথাটা কোল থেকে মাটির ওপর নামিয়ে দেয় রমেন। তারপর উঠে দাঁড়ায়। ঢালু বেয়ে আস্তে আস্তে নেমে আসে নাবাল জমিতে যেখানে জল জমে আছে। হাতের রক্ত ধোয়, ধুতিটা ভিজিয়ে নেয়, মুখে জলের ছিটা দেয়। উঠে আসবার সময়ে দেখে লোকটার কাটা ডান হাতখানা পড়ে আছে। যত্নে তুলে নেয় সেটা, ভিড় ঠেলে মৃতদেহের কাছে রেখে দেয়। তারপর একটু দূরে এসে দাঁড়ায়। দিগন্তে নীল মেঘের রঙের একটা আস্তরণ, সূর্য দু’-আধখানা হয়ে অস্ত যাচ্ছে। রমেন নিঃশব্দে হেঁটে এসে নিজের কামরায় ওঠে।
কামরার ভিতরে ভিড়ের মানুষেরা তাকে রাস্তা করে দেয়। অন্যমনে সে এসে দাঁড়ায় তার পুরনো জায়গায় দুই বেঞ্চের মাঝখানে। শান্তভাবে।
সভয়ে তার কাছ থেকে সরে দোল একজন লোক, বলল, আপনার কাপড়ে এখনও রক্ত!
বেঞ্চ জুড়ে হোল্ড-অলের বিছানা পেতে বসে আছে একজন খিটখিটে চেহারার লোক। সঙ্গে তিনটে বাচ্চা আর গোলগাল বউ। রমেন প্রথম গাড়িতে উঠতে এই লোকটা তাকে জায়গা দিতে চায়নি, বলেছে, দেখছেন তো কাচ্চা-বাচ্চা নিয়ে যাচ্ছি, এর মধ্যে কোথায় বসবেন! সেই লোকটা এখন রমেনকে জিজ্ঞেস করল, লোকটা মরে গেছে?
রমেন মাথা হেলায়।
ইস। লোকটা বলে, তারপর হোল্ড-অলের একটা অংশ উলটান দিয়ে জায়গা করে দিয়ে বলে, আপনি বসুন।
আমি…মানে… আমার কোলেই লোকটা মারা গেছে। আপনার বিছানাপত্র ছোঁয়া যাবে।
তাতে কী? বৃহৎ কাষ্ঠাসনে দোষ নেই
রমেন বসল না।
দুর্গাপুর থেকে গাড়ি ছাড়ার শেষ সময়ে একটা পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের ছেলে দৌড়ে এসে গাড়িতে উঠেছিল। ওর দৌড় দেখে বোঝা গিয়েছিল যে, ছেলেটা দৌড়তে জানে। তার গায়ে হ্যান্ডলুমের চমৎকার একটা চেক শার্ট পরনে কর্ডের প্যান্ট পায়ে হান্টিং বুট, কাঁধ থেকে একটা মাঝারি কিট ব্যাগ ঝুলছে। গায়ের রং ফরসা, একটু নিষ্ঠুর চৌকো ধরনের মুখ, চোখ দু’টি স্থির। স্থির কিন্তু শান্ত নয়। বরং একরোখা। একটি কিংবা দু’টি খুন করার পর মানুষের চোখ ও রকম স্থির হয়ে আসে। তখন চোখের পাতার একটা গাঢ় ছায়া পড়ে চোখের মণিতে। আর সেখানে, চোখের গভীরে ধিক ধিক করে একটা চোরা আলো।
ছেলেটা গাড়িতে ওঠার পর থেকেই হোল্ড-অলওলা লোকটার সঙ্গে তার ঝগড়া হচ্ছে। ছেলেটা বসার জায়গা চাইতেই লোকটার বউ বলল, কী করে জায়গা হবে? আমাদের বাচ্চা-কাচ্চা… এত জিনিসপত্র… ওঁর শরীর খারাপ। ছেলেটা মুখ বিকৃত করে ঘেন্নার চোখে, লোকটা তার বউ আর তিনটে বাচ্চাকে দেখেছিল একটু, কিছু বলেনি। ট্রেন ঘণ্টাখানেক লেট চলছিল, তাই হোল্ড-অলওলা লোকটা এক বার রমেনকে বলেছিল, গেরো দেখেছেন? পৌঁছতে প্রায় রাত হয়ে যাবে। আমি আবার থাকি বাঘাযতীনে, এলাকাটা ভাল নয়। অত রাতে ছিনতাই-ফিনতাই, তা ছাড়া ট্যাক্সিওয়ালাকেই বিশ্বাস কী? তখন দুর্গাপুরের ছেলেটি একটু আত্মপ্রত্যয়ের হাসি হেসে বলল, আমিও ওই দিকেই যাব। আমাকে সঙ্গে নেবেন? আমি সঙ্গে থাকলে ভয় নেই। লোকটা বিব্রত চোখে ছেলেটাকে একটু দেখে মাথা নেড়ে বলল, না, না, তার দরকার নেই। ছেলেটা ঠাট্টার গলায় বলল, কেন, বিশ্বাস হচ্ছে না? লোকটা বলল, না, তা নয়। ভগবান দেখবেন। ঠিক পৌঁছে যাব। ছেলেটা একটু হাসল, ভগবান তো একটু আগেও ছিলেন, যখন আপনি ভয়ের কথা বলছিলেন! লোকটা সে-কথার উত্তর দেয়নি, রমেনের দিকে তাকিয়ে অন্য প্রসঙ্গ আনবার চেষ্টা করে বলেছে, আজ আমার আসার কথা ছিল না, জানেন! ঠিক ছিল পরশুদিন আসব। কিন্তু পঞ্জিকায় দেখেছি অমৃতযোগ ছিল আজ… যাত্রার সময়ে। তারপর একটু স্মান হেসে বলল, কাশীতে সেবার ভৃগুবিচার করালাম— দুর্ঘটনায় মৃত্যুর যোগ। তাই পঞ্জিকা না দেখে বেরোই না বড় একটা…। দুর্গাপুরের ছেলেটা দু’দিকে ব্যাঙ্কে দু’খানা লম্বা কেঠো হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, একটু ঝিলিক দিল তার হাসি। বলল, কেটে পড়ুন দাদা, কেটে পড়ুন। পৃথিবীতে জায়গা বড় কমে যাচ্ছে। ছ’জনের জায়গা দখল করে বসে আছেন, কুড়িজনের খাবার টেনে নিচ্ছেন…
ঠিক সেই সময়ে ইঞ্জিন থেকে তীব্র বাঁশি বেজে ধীরে ধীরে থেমে আসছিল গাড়ি।
সেই ছেলেটা এখন রমেনের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। একটু অন্যমনস্ক ছিল রমেন, ছেলেটা তার কানের কাছে মুখ এনে বলল, কেমন দেখলেন?
কী।
লোকটা যে মরে গেল! কোনও কষ্ট পেল না। ইনস্ট্যান্ট।
রমেন উত্তর দিতে পারল না। তার ঠোঁট একটু কেঁপে গেল মাত্র।
ছেলেটা নিচু গলায় বলল, আপনি খুব শক্ড্? প্রথম প্রথম ও-রকম হয়। কলকাতায় নেমে একটা বড় ব্র্যান্ডি খেয়ে নেবেন। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি মানুষকে মরতে অনেক দেখেছি।
খুব ধীর চাপা গলায় রমেন বলল, জানি।
ছেলেটা খুব সামান্য একটু চমকে উঠল।
রমেন সরে এসে গাড়ির খোলা দরজার সামনে দাঁড়ায়। দরজায় মুখে ভিড়ে। দুটো লোক একে অন্যের বিড়ি থেকে আগুন ধরিয়ে নিচ্ছে, তাদের দু’জনের মুখের ঠিক মাঝখান দিয়ে ডুবে যাচ্ছে সূর্য।
মেঝেতে উবু হয়ে বসেছিল বেঁটে মতো একটা লোক। এত বেঁটে যে, আর দু’-এক ইঞ্চি ছোট হলেই বামনবীর হয়ে যেত। পরনে ময়লা হাফশার্ট আর ধুতি। সে ভিড়ের মধ্যে একটা ফাঁক দিয়ে রমেনকে দেখছিল। হ্যাঁ, ওই তো সেই লোক, যে ট্রেনে কাটা-পড়া মানুষটার মাথা কোলে করে বসে ছিল, অচিন মানুষের জন্য কেঁদেছিল, ওই তো সেই লোক! লম্বা লোকটা, ফরসা, গায়ে হাফ-হাতা পাঞ্জাবি—হ্যাঁ, ওই লোকটা। মরন্ত মানুষটা ওই মুখখানার দিকে চেয়ে মরে গেল। মরন্ত মানুষ লোক চেনে, ভুল হয় না। এ লোকটাকে দুঃখের কথা বলা যায়, এ বুঝবে ঠিক। সে একে বলবে গতবার তার কোলের ছেলেটা কীভারে মারা গেল। মিঠিপুর তার গাঁ, চব্বিশ পরগনায়। গতবার বান ডাকল রাত দুটোয়। ঘরে সে, তার বউ আর দেড় বছরের ছেলে। জলের শব্দে ঘুম ভেঙে দেখে ঘরের মেঝেয় হাজার সাপের মতো জলের খেলা। মুহুর্মুহু জল বেড়ে ওঠে, সে বউকে ডাকে, সামাল! গরিব মানুষ, জিনিসপত্র তেমন কিছু। ছিল না, যায় তো সেগুলো যাক, কিন্তু মানুষগুলো বড় আপন। বউকে বলল, আমার কোমর প্যাচায়ে ধর। বউ ধরল। ছেলে কোলে করে জলে নামল সে। ঘরে তখন তার কোমর-জল, বাইরে নামতেই গলা পর্যন্ত। তখন মাঠঘাট কিছু ঠাহর হয় না, অন্ধকার, অঝোর বৃষ্টি, বাতাস ডাকে, উথালপাথাল গাঁই-গাঁই জলের ডাক। লোকটা জলের মধ্যে টালমাটাল ছুটছিল, সঙ্গে কোমর-ধরা বউ, বুকে ছেলে। পশ্চিম দিকে বুড়ো বটের তলায় মহাবীরের থান, সেই জায়গাটাই সবচেয়ে উঁচু, সেখানে বাঁধানো বেদি আছে। শতখানেক গজ দূর। এই এক শ’ গজ রাস্তা তার বুকে ধরা ছিল ছেলেটা, জলের তলায়। গলা-জল ভেঙে যখন গিয়ে উঠল বাবার থানে তখন খেয়াল করে দেখে, আরে, এ আমি করেছি কী? আঁ! বুকের মধ্যে জোরে চেপে ধরেছি ছেলে, দেখি তার মুখ ডুবে রয়েছে জলের মধ্যে! ছেলে শ্বাস নেয় নাই। অ্যাঁ?
লোকটা আপনমনে বিড়বিড় করল, এরে কবো? হ্যাঁ, এরে কওয়া যায়।
লোকটা হাত বাড়িয়ে রমেনের পা ছুঁয়ে ডাকে, ও কর্তা।
রমেন নিচু হয়ে লোকটাকে দেখে। গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, জল-টসটসে চোখ। একে দেখেছে রমেন। যখন ট্রেনে কাটা-পড়া লোকটা রমেনের কোলে মাথা রেখে মরে যাচ্ছে তখন এ-লোকটাই দৌড়ে গিয়ে কচু পাতায় জল এনে দিয়েছিল, রমেনের কানের কাছে বিড়বিড় করে বলেছিল, বাঁচিয়ে দিন, কর্তা, বাঁচিয়ে দিন। আপনি পারেন। হে ঠাকুর—
রমেন নরম গলায় বলে, কী?
লোকটা একটা বিড়ি বাড়িয়ে ধরে। তার আর কিছুই দেওয়ার নেই।
রমেন বিড়িটা নেয়। লোকটার মুখোমুখি উবু হয়ে বসে বিড়িটা ধরায়। লোকটা গলে যায় এই সোহাগে। বিড়বিড় করে তার দুঃখের কথা বলে। তারপর আস্তে আস্তে রমেনের বুকের কাছে ঝুঁকে আসে লোকটার মাথা, তীব্র, ফিসফিসানির সুরে লোকটা বলে, বলেন কর্তা, কেন বুদ্ধি নষ্ট হয়ে গেল! কী হয়েছিল আমার! কাঁধে তুলে নিলেই ছেলেটা বেঁচে যেত, কিন্তু কেন বুদ্ধি হয় নাই?
হাতে কচলে চোখের জল মোছে লোকটা। রমেনের সুন্দর মুখ স্তব্ধ হয়ে দেখে। তারপর বলে, তারপর থেকেই আমি বন্ধকি কারবার ছেড়ে দিলাম, ধর্মে-কর্মে মন দিয়েছি, তীর্থে যাই মাঝে মাঝে, ভিখিরিরে ভিক্ষে দিই, মানুষের বিপদ দেখলে মন কেমন করে, ছুটে যাই। কিন্তু আর লাভ কী? বুদ্ধিনাশে ছেলেটা মরে গেল। তার ওপর দেখেন আমি ঈশ্বরেচ্ছায় বামনবীর, আপনার মতো লম্বা হলে পর—কিন্তু ভগবান চান নাই—
মনে মনে মৃদু হাসে রমেন। লোকটা জানে না বামনবীরের মতো তার চেহারায় রূপ ঝরে পড়ছে। সত্য বটে, কখনও-সখনও আমাদের প্রিয়জন চলে যায়, তার শূন্যস্থানে অন্তরে চলে আসে দয়া, মায়া, কিংবা বিস্তার। লোকটা এখনও টের পায়নি। ছেলে না থাকায় দুঃখই ছেলে হয়ে তার কাছে আছে।
রমেন তার কাঁধে হাত রেখে চুপ করে বসে।
লোকটা বিড়বিড় করে, আপনার বড় দয়ামায়া। মরন্ত মানুষটার ভুল হয় নাই।
গাড়ির গতি কমে আসে। অনেক লাইনের জটিল ইয়ার্ডের ওপর দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে। হোন্ড-অলওলা লোকটা গলা বাড়িয়ে ডাকল, ও দাদা।
রমেন তাকাতেই হাতের প্লাস্টিকের জলের বোতলটা বাড়িয়ে দিয়ে ম্লান মুখে বলল, বারবার আপনাকে কষ্ট দিচ্ছি। সামনেই বর্ধমান, একটু জল এনে দেবেন দাদা, কাইন্ডলি! আপনি ইয়ংম্যান, ছুটে গিয়ে আনতে পারবেন, আমার সায়াটিকা—
আসানসোলে একে একবার জল এনে দিয়েছিল রমেন।
অভ্যাসবশত বোতলটার জন্য হাত বাড়িয়েছিল রমেন, কিন্তু হাতটা ফেরত নিল। দুর্গাপুরের ছেলেটা শিথিল চোখে তাকে দেখছিল। রমেন ছেলেটাকে দেখিয়ে লোকটাকে বলল, এঁকে দিন। ইনি এনে দেবেন। আমি মড়া ছুঁয়েছি।
লোকটা ইতস্তত করে। হঠাৎ ঘেন্নায় ছেলেটার মুখ বেঁকে যায়। রমেনের চোখে স্থির চোখ রাখে ছেলেটা। মৃদু একটু হাসল রমেন, বন্ধুত্বের হাসি। ছেলেটা হাসিটুকু ফেরত দিল না। রমেন মনে মনে বলল, আমি তোমার শত্রু নই।
ছেলেটা চোখ সরিয়ে নিয়ে লোকটার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, দিন। এনে দিচ্ছি।
গাড়ি বর্ধমান পার হয়ে গেল। দুর্গাপুরের ছেলেটা জল এনে হোন্ড-অলওলার বেঞ্চে জায়গা পেয়ে গেছে।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রমেন দেখে অপরাহ্নের আলোয় প্রকাণ্ড একখানা আদি-অন্তহীন মাঠ দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছে তাদের রেলগাড়ি। চষা জমির ছায়ার মতো আকাশে ফুটে আছে কোদালে মেঘ।
জানালার ধারে একটেরে সিটটিতে বসে ছিল বুড়ো একটা লোক। সে রমেনের ধুতিতে রক্তের ছোপ দেখছিল, লক্ষ করল রমেনের বিষন্ন মুখ। তারপর বলল, লোকটা বাঁচল না, না?।
রমেন মাথা নাড়ল।
লোকটা একটু চুপ করে থেকে বলল, চার দিকেই লোক মরে যাচ্ছে খুব। খাদ্যসমমা। এই বাজারে মানুষ বাঁচে?… আপনি কোথায় যাবেন?
কলকাতায়।
কলকাতায় কোথায়?
ঠিক নেই।
ঠিক নেই। সে কী? বাড়ি-বাসা নেই সেখানে?
রমেন একটু ইতস্তত করে বলে, ছিল, কাশীপুরে গঙ্গার ধারে আমাদের একখানা বাড়ি ছিল। শুনেছি সেটা উদ্বাস্তুরা দখল করে নিয়েছে। আমি কোনও বন্ধুর বাসায় উঠব।
ইস, বাড়িটা বেদখলে চলে গেল! আপনি এতকাল করছিলেন কী? আজকাল কি একটা বাড়ি করা সহজ! গঙ্গার ধারে ওই জায়গায় এখন বিশ-ত্রিশ হাজার টাকা কাঠা!
লোকটা উদ্বিগ্ন হয় খুব। বলে, আদি বাড়ি ওইটাই?
না, রমেন বলে, আদি বাড়ি ময়মনসিং।
ময়মনসিং! লোকটা নড়ে-চড়ে বসে। ময়মনসিঙের কোথায়?
কালীবাড়ির কাছে।
কার বাড়ি?
রায় হরেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী।
লোকটা সোজা হয়ে বসে, তিনি আপনার কে হন?
দাদু।
লোকটা অনেকক্ষণ অবিশ্বাসের চোখে চেয়ে দেখে। স্থির চোখে। তারপর হঠাৎ ফিসফিস করে বলে, ছোটকর্তা! আপনি আমাদের ছোটকর্তা না?
বুড়ো লোকটার খোলা চোখে জল চলে আসে সে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায়, বসেন, বসেন—
রমেন তার কাঁধে হাত রাখে। লোকটা বিহুলভাবে বসে পড়ে। সে বুঝতে পারে না এর মানে কী! ছোটকর্তার ময়লা ধুতিতে রক্তের ছোপ, একটু আগে কাটা-পড়া লোকটাকে বুকে করে ধুলোয় বসে ছিল! গালে না-কামানো দাড়ি! মেঝেয় বসে একটা ভিখিরি মানুষের সঙ্গে বিড়ি খেল? কী করে হয়! সে ছোটকর্তাকে ঘোড়ায় চড়তে দেখেছে, বন্দুক চালাতে দেখেছে, সে দেখেছে ছোটকর্তা তেরো বছর বয়সে একা মোটর গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যায়। সেই বাড়ির দেউড়ির ওপর সিংহের মূর্তি, মাঠে পেখম-ধৱা ময়ূর, বড় কর্তা বারান্দায় দূরবিন হাতে বসে আছে, ছোটকর্তা বুট পরে চামড়ার বল মারছে দেয়ালে। কী করে হয়!
আয় হায় রে, এ আপনার কী চেহারা ছোটকর্তা! জমি নাই—বাড়ি বে-দখল—আয় হায় রে—
রমেন তার পাশ ঘেঁষে দাঁড়ায়, কী বলবে ভেবে পায় না রমেন। কেবল তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
লোকটা কত বার সেই বাড়িতে ছুটে গেছে দায়ে দফায়! মুশকিল-আসান ছিল সেই বাড়ি। পাকিস্তানের পর যখন খালি হয়ে গেল বাড়িটা, লুট পড়ে গেল, তখন কত দিন তার বুক ব্যখিয়ে উঠেছে। কলকাতায় এসে কত বার অভাবে দুঃখে তার মনে পড়েছে ময়মনসিঙের সেই বড় বাড়ির কথা। ইচ্ছে হয়েছে, কাশীপুরে এক বার ছোটকর্তার কাছে যায়। আপনারাই চিরকাল আমাদের দেখেছেন, আমরা আর কোথায় যাব? কিন্তু আয় হায় রে— ছোটকর্তার এখন আর কিছু নাই। কেমন শূন্য লাগে তার, নিঃস্ব ভিখিরির মতো লাগে নিজেকে। কাশীপুরে ছোটকর্তা আছেন, এই বিশ্বাস নিয়েই সে এতকাল অনেক দুঃখে সান্ত্বনা পেয়েছে। কিন্তু এখন সে কী ভেবে সান্ত্বনা পাবে!
আমি মুকুন্দ ঘানিওয়ালা। মনে নাই? রমেন মাথা নাড়ে, মনে আছে।
সৎ জমিদার পিতার মতো। শাসনে রাখেন, সোহাগও করেন। নিষ্কর জমি দিয়ে দেন, বসত করান, ধর্মে-কর্মে মতি আনেন মানুষের। কী মানুষ ছিল সব, মাথা নুয়ে আসত আপনা থেকেই। তার চেয়ে কি এখনকার বি ডি ও-রা ভাল! না কি সরকারি লোকেরা! অনেক হয়রানির পর মুকুন্দ বুঝে গেছে, সব জোচ্চোর, ঠক। এখন আর সেইসব স্বপ্নের মানুষেরা জন্মায় না, যাদের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেই দুঃখের কথা নিঃশব্দে বলা হয়ে যেত।
নীরবে রমেনের হাতে বে-খেয়ালে হাত বুলোয় মুকুন্দ। বলে, সব চলে গেল, ছোটকর্তা! আমরা তবে কার কাছে গিয়ে দাঁড়াব?
রমেন ঠিক বলতে পারে না। কিন্তু বলতে ইচ্ছে করে, মুশকিলে পড়লে আমি আছি। আমার কাছে এসো।
কিন্তু সে বড় অহংকারের কথা। রমেনের মুখ ফুটে বেরোয় না। সে কেবল মুকুন্দের হাতে হাত রেখে ছোট্ট জায়গাটিতে ঘেঁষাঘেঁষি করে ওর পাশে বসে থাকে।
মাঝে মাঝে একটা বুড়ো ময়ূর, আর একটা পুরনো মোটর গাড়ির কথা রমেনের মনে পড়ে। কচ্ছপের পিঠের মতো ঢালু, সবুজ মাঠে ধূসর রঙের ময়ূরটা এক বোঝা পেখম টেনে আস্তে আস্তে চরে বেড়াচ্ছে, এই দৃশ্য মনে পড়ে। কিংবা লজঝড়ে পুরনো, ক্যাম্বিসের হুডওয়ালা তাদের গাড়িটা বৃষ্টির দিনে পাম গাছের তলায় দাঁড়িয়ে ভিজছে।
কখনও বা মনে একটি-দু’টি ভিন্ন ছবি ভেসে ওঠে। প্রকাণ্ড একটা ভাঙা পিয়ানোর ওপর ধুলোর আস্তরণ, তার ওপর আঙুল দিয়ে রমেন তার নাম লিখছে, রায় রমেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী। কিংবা মনে পড়ে প্রকাণ্ড দেউড়ির ওপর পুরনো জং-ধরা লোহার আর্চ, তাতে একটা চৌকো কাচের বাতি ঝুলছে, আর লোহার ফ্রেম বেয়ে লতিয়ে উঠেছে মাধবীলতা। কিংবা সেই নোনা-ধরা, শ্যাওলায় সবুজ দেয়ালগুলি, যা তাদের বাড়ির সীমানা ছিল, যার ওপর দিয়ে দু’ হাত দু’ দিকে পাখনার মতো ছড়িয়ে টাল খেতে খেতে চোখ বুজে কত দিন হেঁটেছে রমেন! কিংবা মনে পড়ে তাদের ভূতগ্রস্তু, প্রকাণ্ড বাড়িটার পশ্চিমের ভিতের কাছে একটা আতসকাচ হাতে দাদু বসে আছে।
এখন সেই বৃষ্টির দিন, আর পাম গাছের তলায় দাঁড়ানো তাদের সেই বুড়ো ভাঙা গাড়িটার ভিজে যাওয়ার কথা মনে পড়ল। তারপর আস্তে আস্তে সেই বুড়ো ময়ূরটার পেখমের বোঝা টেনে টেনে সতর্ক চলা, গ্র্যান্ড পিয়ানোর গায়ে লেখা তার পুরনো নাম, আর আতসকাচ হাতে বাড়ির পশ্চিমের ভিতের কাছে দাদুর বসে থাকার দৃশ্য মনে পড়ে গেল। তার চারধারে এখন একবার তাকিয়ে দেখলে কিছুতেই মনে হয় না যে, সে-সব সত্যিই একদিন ছিল, সেই ময়ুর, পুরনো গাড়ি, সেই গ্র্যান্ড পিয়ানো, কিংবা সেই দাদু। যেমন, মনে হয় না ছেলেবেলায় সত্যিই তাকে ওইভাবে তার নাম লিখতে বা বলতে শেখানো হয়েছিল, রায় রমেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন