শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
রমেনের ছোট্ট বিছানা আর টিনের সুটকেস পড়ে আছে। পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষই জিনিসপত্র রেখে গেলে ফিরে আসার সম্ভাবনাও রেখে যায়। কিন্তু রমেনের বেলায় এ-নিয়ম খাটবে কি? ও দুটো তুচ্ছ জিনিস রমেনকে ফিরিয়ে আনবে, এ-কথা ভাবতে ললিতের ভরসা হয় না।
তবু নিজের অজান্তে রমেনের জন্য অপেক্ষা করে ললিত। রমেন যত দিন তার কাছে ছিল, তারা পাশাপাশি শুত, তখন প্রায়ই ললিত টের পেত, সারা রাত জেগে আছে রমেন। মাঝরাতে কি ভোর রাতে মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে অসহায় ললিত মৃদু অস্পষ্ট গলায় ডাকত, রমেন। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর পেত, কী রে! ললিত জিজ্ঞেস করত, জেগে আছিস? উত্তর পেত, আছি। তাই আবার নিশ্চিন্তে ঘুমোত ললিত। রমেনের এই নিরন্তর জেগে থাকা দেখে ললিত বড় অবাক হয়েছে প্রতি রাত্রে। ললিত ডাকবে, ডেকে পাছে সাড়া না পায়, সেইজন্যই কি জেগে থাকত রমেন? তুই কী রে রমেন? আমার জন্য কই কেউ তো কখনও এ-রকম জাগিয়ে রাখেনি নিজেকে!
কত কথা মনে পড়ে ললিতের। অপর্ণার মোটর গাড়িটা তার হাতে এক বিকেলে ছেড়ে দিয়েছিল রমেন, তারা ঘুরপাক খেয়েছিল ময়দানের নির্জন রাস্তায়। বহুকাল বাদে সেইদিন প্রথম নিজের ওপর কিছুক্ষণের জন্য একটা গভীর বিশ্বাস ফিরে পেয়েছিল সে। কিংবা মনে পড়ে, শ্মশানের সেই ঘটনার কথা, তাকে টেনে নিয়ে গিয়ে ভয় ভেঙে দিয়েছিল রমেন। কিংবা মনে পড়ে, কীর্তনের মধ্যে তাকে টেনে নিয়েছিল, অলৌকিক জয়ধ্বনি বের করেছিল তার অবিশ্বাসী কণ্ঠ থেকে।
এখনও মাঝে মাঝে রাতে ঘুম ভেঙে গেলে অদুরে রমেন আছে ভেবে ঘুম-গলায় ললিত ডাকে, রমেন! উত্তর পায় না। মাঝরাতে তাই হঠাৎ এক শূন্যতা ভূতের মতো শিয়রের জানালা জুড়ে দাঁড়ায়।
রমেনের সঙ্গে আর দেখা হবে কি তার? সময়মতো রমেন যদি না ফেরে? মরার সময়ে রমেন যদি কাছে থাকে তবে বোধ হয় ললিতের তেমন কষ্ট হবে না।
বিজয়া দশমীর দশ দিন বাদে একদিন শাশ্বতী এল মাকে বিজয়ার প্রণাম করতে।
প্রণাম করে উঠে হাসিমুখে বলল, বড় দেরি করে এলাম।
সতেজ, সুন্দর হাসিটি। ঝকঝকে দাঁতে সকালের রোদ আর পেয়ারাপাতার সবুজ আভা চিকমিক করে গেল।
ললিতকে ইচ্ছে করেই একটু উপেক্ষার ভান করে শাশ্বতী। ‘কেমন আছেন! শরীর ভাল তো!’ এ রকম দুটি-একটি মামুলি প্রশ্ন করে সোজা চলে গেল রান্নাঘরের দরজায়। মা’র সঙ্গে বসে গল্প করল অনেকক্ষণ।
চলে যাওয়ার সময়ে ললিত তাকে এগিয়ে দিতে সঙ্গ নেয়। আর তখন দু’জনেরই বড় লজ্জা করতে থাকে। শাশ্বতী রমেনকে বলেছিল, সে যেন ললিতকে বলে যে, শাশ্বতী তাকে ভালবাসে। রমেন সে কথা বলে গেছে। তাই তারা বড় লজ্জা পায়। রমেন বলে গেছে, কিন্তু তারা কেউ পরস্পর পরস্পরকে সে-কথা বলে না।
শাশ্বতী মুখ তুলে প্রশ্ন করে, আপনার সেই সন্ন্যাসী বন্ধু—তিনি কোথায়?
কী জানি!
রমেন বলেছিল, ক্যান্সারের ওষুধ জানে। সে-কথা বিশ্বাস হয় শাশ্বতীর। ক্যান্সারের ওষুধ এখনও বাজারে বেরোয়নি। তা বলে কি নেই? কেউ না কেউ ঠিক জানে। লুকিয়ে রেখেছে। বলছে না। শাশ্বতী এও জানে যে, রমেনই সেই লোক। ঈশ্বর তাকে পাঠিয়েছেন। সময় হলে ঠিক মুহূর্তে সে এসে দেখা দেবে আবার। ভোজবিদ্যার মতো আরোগ্য দান করবে ললিতকে। এ-কথা মুখে বলে না শাশ্বতী। কিন্তু অন্তরের গভীরে সে বিশ্বাস করে। ভীষণ বিশ্বাস করে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন