শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
আজকাল সঞ্জয়ের গাঢ় একরকমের ঘুম হয় রাতে, কিন্তু তৃপ্তি হয় না। মাঝে মধ্যে উঠে দেখে সাতটা সাড়ে-সাতটা বেজে গেছে। খুব আশ্চর্য হয়ে যায় সে। এ-রকম তো কখনও হত না! ছ’টার মধ্যে তার ঘুম ভাঙবেই। সে নিয়মের অনুশাসন মেনে চলা মানুষ।
বিরক্ত হয়ে সে রিনিকে জিজ্ঞেস করে, সকালে ডেকে দাওনি কেন?
কত ডেকেছি! তুমি কেবল উঁ-উঁ করে এ-পাশ ও-পাশ ফিরলে।
শরীরটা বুড়িয়ে গেছে বোধহয়। পায়ে পায়ে জড়তা আর আলসেমির ভাব। বিছানা ছাড়ার পর কোনও দিনই ঘুমের জড়তা থাকে না তার। কিন্তু আজকাল শরীর পালটাচ্ছে।
অফিসে বেরিয়ে মোড়ের মাথায় পানের দোকানের সামনে গাড়ি দাঁড় করাল সঞ্জয়, জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে একটা পাঁচ টাকার নোট ধরে রইল। দোকানদারই দৌড়ে এল এক প্যাকেট সিগারেট হাতে।
গাড়ি আবার ছেড়ে বড় রাস্তায় এসে দেখল বাস-স্টপে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখ-চেনা মেয়ে, একসময়ে একই এক্সপ্রেস বাসে অফিসে গেছে। গাড়িটা দিয়ে তাকে প্রায় ঢেকে ফেলল সঞ্জয়। চোখে চোখ পড়তেই হাসল, চলুন, পৌঁছে দিচ্ছি।
মেয়েটি একটু অবাক হয়। এই প্রথম আলাপ। কিন্তু একসময়ে বাসে অফিস-যাওয়ার একঘেয়ে দূরত্বটুকু সঞ্জয় পার হত এই মেয়েটার দিকে চেয়ে থেকে। মেয়েটা প্রথম-প্রথম চোখ সরিয়ে নিত। তারপর মাথা নিচু করে লজ্জার ভান করেছিল কিছুদিন। তারপর একদিন— কবে থেকে যেন— চোখে চোখ রাখতে শুরু করল। চমৎকার সময় কেটে যেত। খেলা-খেলা একটা ব্যাপার—প্রেমের মতোই—অথচ প্রেম নয়—এরকমই একটা ব্যাপার।
বহুদিন হয় সঞ্জয়কে আর খুঁজে পায়নি মেয়েটা। আজ গাড়িসুদ্ধু দেখে খুব অবাক হল। ভদ্রলোক কোনও দিন কথা বলতে সাহস করেনি তার সঙ্গে, কিন্তু এখন গাড়ি হওয়াতেই বোধহয় সাহস বেড়েছে। মেয়েটি ইতস্তত করে বলল, বাসেই যেতে পারব।
দুর! আসুন না।
বাঁ হাতে সামনের দরজাটা খুলে ধরে সঞ্জয়। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হাসে।
শরৎকালের মতো ঋতু নেই। এমন উজ্জ্বল রোদ! সেই আলোতে মেয়েটি বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে। সুডৌল সুন্দর মুখখানা, নাকে একটা পাথর বসানো নাকছাবি ঝিকিয়ে উঠেছে। ডান হাতে সাদা ব্যাগ, বাঁ হাতে ভাজ করা রোদ-চশমা। ভাগ্যিস চশমাটা পরেনি! অমন সুন্দর চোখ দু’খানা, তাতে ভয়, সংশয় আর ইচ্ছার যে খেলাগুলো দেখা যাচ্ছে সেগুলো দেখাই যেত না।
মেয়েটি উঠে এল। গাড়ি ছেড়ে দিল সঞ্জয়।
নিঃশব্দে বসে থাকে মেয়েটি, অস্বস্তি বোধ করে বোধ হয়। সঞ্জয় সেদিকে তাকালই না, আলতো হাতে স্টিয়ারিং ধরে অলস ভঙ্গিতে আস্তে আস্তে গতি বাড়িয়ে দিচ্ছিল সে। মেয়েটি একপলক তাকে দেখল নিঃশব্দে। এতকাল কোথায় ছিলে তুমি? তোমাকে কত খুঁজেছি!
ট্রাফিক জংশনে লাল আলো দেখে সঞ্জয় গাড়ি থামায়। সিগারেটের প্যাকেট খুলতে খুলতে মেয়েটির দিকে তাকায়। না, মেয়েটির শরীর কিংবা মুখ দেখে না। কেবল সিঁথিটা লক্ষ করে। সিঁদুরের চিহ্ন নেই। লুকোয়নি তো! ঠোঁটে আবছা লিপস্টিক, কপালে টিপ নেই। কিছুই বুঝতে পারে না সঞ্জয়। আজকাল বাঙালি মেয়েরা জনসাধারণকে ফঁকি দিতে শিখেছে! সঞ্জয় জিজ্ঞেস করে, কোথায় আপনার অফিস?
নিউ সেক্রেটারিয়েটের কাছে, ম্যাককারিয়ন।
ঝামেলা। এখন আবার সেই নিউ সেক্রেটারিয়েট পর্যন্ত গিয়ে তারপর পার্ক স্ট্রিটে ঘুরে আসতে হবে। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। সঞ্জয় ঘড়ি দেখল। এখন মিনিট পনেরো সময় আছে, কিন্তু তাতে হবে না। এখন পর্যন্ত এই অফিসে তার একদিনও দেরি হয়নি! যদি হয়, আজই প্রথম হবে। এই মেয়েটির জন্যই। তা ছাড়া আজ সকাল সাতটায় উঠেছে সে। সময় ছিল না বলে দাঁত ঠিক মতো ব্রাশ করা হয়নি, গালে ক্ষুর পড়েনি ঠিকমতো, হাত দিলে খরখর করছে। অগোছালো হয়ে আছে সে। খামোখা জিজ্ঞেস করল, চাকরি করেন?
হুঁ।
কোন ডিপার্টমেন্ট!
পাবলিসিটি।
তাকে কথা শেষ করতে দেয় না সঞ্জয়। বলে, আমাকে আপনার মনে আছে?
বাজে কথা ছেড়ে চট করে কাজের কথায় চলে আসে।
মেয়েটা লজ্জা পায় বোধ হয়। উত্তর দেয় না।
হাজরার মোড় পেরিয়ে সঞ্জয় গাড়ি ছোটায়। গতি বাড়াতে থাকে। যদি সময়টাকে বাঁচানো যায়!
মেয়েটা বলল, গাড়ি কিনলেন!
ওই একরকম কেনাই।
খুব সুবিধে এখন, না? বাসে যা ভিড় বাড়ছে দিন দিন।
সঞ্জয় মৃদু হাসল। বলল, যখন গাড়ি ছিল না তখন একদিনও লেট হয়নি। আজই প্রথম লেট হবে বোধ হয়।
গাড়ি কি অনেক দিন কিনেছেন? বহু কাল আপনাকে দেখি না তো! বোধ হয় বছর খানেক—
না। গাড়ি তো সদ্য হল। মাঝখানে কিছু দিন ট্যাক্সিতে যেতাম।
মেয়েটা বলে, বেশ গাড়িটা। ছোটখাটো, কোজি—
ঘুরেফিরে গাড়ির প্রসঙ্গ। সঞ্জয়ের বিরক্তি লাগে। আমাকে দেখছ না কেন সেই আগের মতো? তখন একশো জনের চোখের সামনে বিহ্বল হয়ে দেখতে, এখন একা গাড়িতে আমরা দু’জন, তুমি কেবল গাড়িতে মনোযোগ রেখেছ। গাড়িটা কি আমার চেয়েও বেশি।
সঞ্জয় জিজ্ঞেস করে, কোথায় থাকেন?
পণ্ডিতিয়া। আপনি?
হিন্দুস্থান পার্ক।
মেয়েটা একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করে, একা?
সঞ্জয় মিটমিটে ডানের মতো হাসে। মাথা নেড়ে বলে, না, আমার লোকজন আছে।
মেয়েটা ঠিক বুঝতে পারে না লোকজন কথাটার মানে কী। মেয়েটাকে ভাবতে দেয় সঞ্জয়, নিজের থেকে সে বলবে না যে তার রিনি আর পিকলু আছে। মেয়েটা সারা দিন ভেবে যাক। কেন আমি বলব? তোমরা কেন আজকাল সিঁদুর লুকোও। কেন জনসাধারণকে ফাঁকি দাও? এই যে আমি তোমার সাদা সিঁথে দেখেও কিছুতেই সিওর হতে পারছি না, যেমন আজকাল রিনিকে দেখেও বাইরের লোকজন বুঝতে পারে না—এই যন্ত্রণা কেন দাও?
ঘড়ি দেখে সঞ্জয়। মেয়েটাকে গাড়িতে তোলা ভুল হয়েছে। একদম ভুল। চৌরঙ্গি দিয়ে যাচ্ছে গাড়ি, সে এই মাত্র সার্কুলার রোডের ক্রসিং পেরোল। ঘড়িতে আছে আর মাত্র ন’-দশ মিনিট সময়। সে কেন গাড়িতে তুলে নিল মেয়েটাকে! হ্যাঁ, কেন তুলেছিল? কী উদ্দেশ্য তার? বুঝলে অচেনা মহিলা, মেয়েদের আমরা মাত্র একটিই ব্যবহার জানি। মাত্র একটিই। তোমাকে আমার গাড়িতে কেন তুলেছি তা চোখ বুজে একটু ভাবলেই দেখা যায়, দূর ভবিষ্যৎ পর্যন্ত দেখা যায়। আমি রোজ ওই বাস-স্টপে গাড়ি থামাব, তুলে নেব তোমাকে। তারপর আস্তে আস্তে...। আমি অতদূর চরিত্রহীন। বুঝলে! কিন্তু একটা সময়ে আমার গোটাকয় জিনিস ছিল— সততা, নিষ্ঠা, কর্মক্ষমতা। আমি শূন্য থেকে বোস অ্যান্ড কোম্পানি তৈরি করেছিলাম। আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে ভিখিরির মতো ঘুরেছি, ঝুলিতে ছিল ওই তিনটে জিনিস। ওই তিনটে জিনিসই আমাকে সব দিয়েছে, তারপর তারা ঝরে গেছে আস্তে আস্তে। শেষটা ছিল কর্মক্ষমতা। কাল পর্যন্তও ছিল সেটা। আজ সকাল সাতটায় ভেঙেছে ঘুম, দেরিতে যাচ্ছি অফিসে, শরীর ছেড়ে দিচ্ছে আলসেমিতে। শেষ গুণটাও ছেড়ে যাচ্ছে আমাকে। আর কী চাই! হুর রে!
এসে গেছি। ম্যাককারিয়নের অফিস এই তো দেখা যাচ্ছে। কাল আবার দেখা হবে কী বলো? জানি তো, একদিন অসময়ে গার্ড নিশান উড়িয়ে গাড়ি ছেড়ে দেবে, প্ল্যাটফর্মে পড়ে থাকবে গাঁটরি, খামোখা ভেবে কী হবে বলো! তার চেয়ে আমাদের ঘন ঘন দেখা করা ভাল।
দুপুরে ফোন করেছিল সঞ্জয় ম্যাককারিয়নের মুখার্জিকে। অনেক কালের চেনা লোক।
আরে মশাই, আপনাদের পাবলিসিটিতে একটা মেয়ে আছে না! নাকে নাকছাবি?
ওঃ, মিস দাশগুপ্ত!
মিস। আর ইউ সিওর যে মেয়েটা মিস?
মুখার্জি হাসে, কী ব্যাপার?
কিছু না। শুধু জানতে চাইছিলাম যে মেয়েটা সত্যিই মিস কি না, আজকাল তো বোঝাই যায় না…
জেনেই বা লাভ কী? মিস হলে সুবিধেটা কোথায়? ওর অনেক ভক্ত।
আমার এক শালা সদ্য বিলেত থেকে ফিরেছে— ইঞ্জিনিয়ার, ভাবছিলাম তার সঙ্গে সম্বন্ধ করলে কেমন হয়! ভক্তের কথা কী যেন বলছিলেন?
মুখার্জি গলার ঠাট্টার ভাবটা পালটে বলে, না, ও কিছু না। মেয়েটা সত্যিই ভাল। কাউকে পাত্তা দেয় না। দেখতে পারেন। আমি পরশু-টরশু আরও খোঁজ নিয়ে জানাব।
পরশু কেন? কাল— কালকেই জানাবেন।
কাল বাংলা বন্ধ্। মনে নেই!
ওঃ হোঃ। ঠিক আছে, তবে পরশুই—
ফোন রেখে দেয় সঞ্জয়।
আর কিছু না, মেয়েটাকে এর পরদিন তার নাম ধরে ডাকবে সঞ্জয়, মুখার্জি আর যা যা জানাবে সব বলে দেবে মেয়েটাকে। ভীষণ অবাক হয়ে যাবে মেয়েটা। খুশি হবে। ভাববে সে কত ইম্পর্ট্যান্ট সঞ্জয়ের কাছে। একটা মেয়েকে নষ্ট করা কত সোজা!
আজ যেন কেমন কাজ করতে ইচ্ছে করছে না। দুটো লোক পরশু থেকে পেমেন্টের জন্য ঘুর ঘুর করছে। দুই-একটা সইয়ের ব্যাপার। কিন্তু তাও করল না সঞ্জয়। বলল, পরশু নেবেন।
কলমটা চোখের সামনে আড়াআড়ি তুলে ধরে অন্যমনে চেয়ে রইল অনেকক্ষণ। একটা প্রোডাকশন দেখতে যাওয়ার কথা ছিল হাওড়ায়। ওপরওয়ালাকে ইন্টারকম টেলিফোনে বলল, পরশু যাবে। সব পরশুর জন্য ফেলে রাখছিল সঞ্জয়। বহুকাল পর আজ তার দুপুরে একটু ঘুমোতে ইচ্ছে করছে।
নাকে নাকছাবি পরা একখানা মুখ হঠাৎ লক্ষ মানুষের ভিড় থেকে তাকে গেঁথে তুলছে। মেয়েদের মধ্যে একটা কিছু আছে, একটা রহস্যময় কিছু। অন্তর্বাস খোলার পর যা দেখা যায়, বা স্পর্শে টের পাওয়া যায় সেটুকুই সব নয়। হলে কারও জন্যই কারও এত স্পৃহা থাকত না। রিনি কি কিছু কম দিতে পারে? তবু কেন যে মনে হয় রিনির যা পেয়েছে তার অনেক বেশি রিনির আছে— যা তাকে দেয়নি। মাঝে মাঝে দেখা যায় রিনি বাবু হয়ে বসে পিকলুকে কোলে নিয়ে ঝুঁকে ওর মুখ দেখছে, পিকলু হাত পা ছুড়ে প্রবল ঔ-ঔ শব্দ করছে। তখন সমস্ত শরীর জুড়ে যে নম্র এক মা ফুটে ওঠে রিনির—ওটা, ওটুকুই কি মেয়েদের রহস্য? বোধ হয় চিরকাল প্রকৃতির সঙ্গে মেয়েরা গোপন ষড়যন্ত্র করে আসছে, ঠকাচ্ছে পুরুষদের! তাদের যেটুকু দেওয়ার—সেইটুকু, সেই তুচ্ছ শরীরটুকু সামনে ছুড়ে দিয়ে গোপন করছে মূল্যবান কিছু। পুরুষেরাও এর বেশি মেয়েদের বোঝে না। কিন্তু সে কেবল অতৃপ্ত থেকে যায়। যেমন রিনির কাছে না-পেয়ে সঞ্জয় এখন অফিসের কাজ ভুলে নাকছাবি পরা একটা মেয়ের মুখ ভাবে। কিন্তু পাবে কি সঞ্জয়! পাবে না। আরও পাগল-পাগল লাগবে, আরও খুঁজে দেখতে ইচ্ছে করবে। বারবার অন্তর্বাস ছিঁড়ে ফেলে সেই একই অতৃপ্তি। না হে, এখানে নেই। এইরকম অতৃপ্ত থেকে যায়, মানুষ বলে— আমি ঠিক এ-জিনিস চাইনি, আরও কিছু—আরও কিছু যেন ছিল পাওয়ার। কী সেটা? ধরি ধরি করেও ধরা যায় না। যেমন রমেন। কী দরকার ছিল ওর সন্ন্যাসী হওয়ার? ইরা এমন কী মেয়ে ছিল? কিছু না। তবু বোধ হয় রমেনের মনে হয়েছিল, তাকে ঠকিয়ে কী যেন নিয়ে গেল ইরা, হয়তো তাকে দিল না, অন্য পুরুষকে দিল। এই আক্ষেপ, এই ক্ষোভ পুরুষকে পাগল করে দিতে পারে। রমেন তো পাগলই হয়ে গিয়েছিল। সঞ্জয় কতবার রিনিকে ঠাট্টা করে জিজ্ঞেস করেছে, তোমার স্বরূপ কী? রিনি ঘুমকাতুরে গলায় সাজিয়ে বানিয়ে বলেছে, তুমি। সঞ্জয়ের হাসি পেয়েছে, তুমি আর আমি কি এক!
কে জানে এখন রিনির গিটার শেখার মাস্টার এসেছে কি না! কী করছে এখন রিনি? সঞ্জয়ের মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে সে-ই গিটারের মাস্টার হয়ে রিনির কাছে যায়, কিংবা পিকলু হয়ে দেখে নেয় রিনির স্বরূপ। কী ভাবে যে দেখা যাবে কে জানে!
নাকছাবি পরা ওই মেয়েটা, ওর কী আছে? ওকে নিয়েই বা কী করবে সঞ্জয়? তবু ওকে ফাঁদে ফেলার অনেক উপায় আছে সঞ্জয়ের হাতে। ম্যাককারিয়নের অবস্থা ভাল না, যে-কোনও সময়ে উঠে যেতে পারে কোম্পানি. ওখানকার কর্মচারীরা কেউ স্বস্তিতে নেই। সঞ্জয় জানে। ওই রন্ধ্রপথে ঢোকা যায়। না, কিছুই করবে না সঞ্জয়, কেবল এই আলসেমিটুকু কাটানোর জন্য, এই একঘেয়ে টাকা-রোজগার থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য একটু টিজ করবে—
কিংবা তাই কি? সে কি একটি মেয়েকে নিয়ে আজ খুব বেশি ভাবছে না?
ঘরে একা ছিল সঞ্জয়। হঠাৎ দুটো আঙুল গোল করে জিবের তলায় দিয়ে তীব্র সিটি দিয়ে উঠল। একবার দু’বার তিনবার। শরীরে ঝাঁকি লাগে। মনে ঝাঁকি লাগে। সে গাছের মতো ঝড়ের হাওয়ায় দোলে।
বেয়ারাটা হঠাৎ ফ্লাশ ডোর ঠেলে ঘরে ঢোকে। স্লিপ রেখে দাঁড়ায়। সঞ্জয় দেখে স্লিপের ওপর সুন্দর বাংলা হরফে লেখা— রমেন।
কে রমেন! কোন রমেন!
আর-কিছু মনে পড়ার আগে তার কেবল মনে পড়ে যে রমেন তার কাছে টাকা পায়। দু’ হাজার টাকা।
মনে পড়তেই একটু চমকে ওঠে সঞ্জয়। যেদিন আদিত্যর লাথিটা লেগেছিল তলপেটে সেদিনও তার মৃত্যুর মুখোমুখি চার হাজার টাকার কথা মনে পড়েছিল। আশ্চর্য, আজকাল কেবল এইসব মনে পড়ে তার।
লোকটা ঘরে এলে সে অবাক হয়ে দেখে, সেই ভীষণ সুন্দর চেহারা, যার পাঞ্জায় বাঘের জোর ছিল, হরিণের মতো দৌড়ত একদিন যে ছেলেটা, সে এখন এমন একজন—যার গায়ে ফতুয়া, পরনে ধুতি, মিটিমিটি একটু হাসি লেগে আছে মুখে।
সঞ্জয় উঠে দু’হাত তুলে বলে, প্রজাপালক শ্ৰীমন্মাহারাজ রায় রমেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী ভূপ বাহাদুরের জয় হোক।
রমেন হাসে। শান্ত চোখে চেয়ে থাকে।
সঞ্জয় ঝুঁকে বলে, মরিসনি! তুই মরিসনি তা হলে! দেখছি পৃথিবীতে আমার পাওনাদারদেরই আয়ু সবচেয়ে বেশি! হাসে সঞ্জয়। বলে, হোক। তবু আয় রমেন, আয়…
টেবিলটা ঘুরে গিয়ে সে দু’হাতে রমেনকে জড়িয়ে ধরে। হাসতে গিয়ে চোখে জল এসে যায় একটু। হারানো মানুষ ফিরে এলে পৃথিবীকে ভাল লাগে বড়।
একটু শ্বাস ছেড়ে সঞ্জয় বলে, আর এখানে না। চল কেটে পড়ি। আজ অফিস ভাল লাগছিল না একটুও। চল, রিনিকে দেখবি…পিকলুকে…
তাড়াহুড়ো করে গোটা দুই টেলিফোন করল সঞ্জয়। তারপর রমেনের হাত ধরে টানতে টানতে টপাটপ সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামল। চাবি দিয়ে গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে বলল, চালাবি? চালা না!
রমেন স্মিতমুখে মাথা নাড়ে, আমার লাইসেন্স নেই যে!
কী করেছিস?
কোথায় হারিয়ে গেছে। দশ-বারো বছর গাড়ি চালাইনি।
কী জোর গাড়ি চালাত রমেন! হাওয়ায় উড়ত লম্বা চুল, ফরসা কপাল ঢেকে যেত চুলে, আর সুন্দর মুখে টেপা হাসি হেসে মাঝে মাঝে মুখ ফিরিয়ে সঙ্গীদের দেখত, কে কতটা ভয় পেয়েছে। দেখতে লজ্ঝরে ছিল রমেনের গাড়িটা কিন্তু ইঞ্জিনকে রুপোর মতো ঝকঝকে রাখত রমেন। সে-সব গাড়িও আর নেই। সঞ্জয় এই ছোট গাড়িখানা নিয়েই কত ঝামেলায় আছে! রোজ একটা না একটা কিছু বদলাতে হচ্ছে, সারাতে হচ্ছে।
গাড়িটা বেচে দিয়েছিস? সঞ্জয় গাড়ি চালাতে চালাতে বলে।
না। রমেন মৃদুস্বরে বলে, কিছুই বেচিনি। সব পড়ে ছিল। পড়ে থেকে থেকেই বোধহয় ধুলো হয়ে গেছে।
খুব নিস্পৃহ গলা রমেনের। সেই নিস্পৃহতা সঞ্জয়কে আঘাত করে। সে শুনেছে কাশীপুরে রমেনদের বাড়িটা দখল করেছে উদ্বাস্তুরা। এ-সব ভাবলে কেমন বুকের ভিতরটা খামচে ওঠে। কত কষ্ট করে মানুষকে বাড়ি গাড়ি জিনিসপত্র করতে হয়! কত পরিশ্রম, কত ত্যাগস্বীকার, কত ব্যক্তিগত গুণের পরিবর্তে! কেউ সেগুলোকে ধুলোমাটি করে দিয়ে গেছে শুনলে মনটা গুড়গুড় করে। একেই কি সন্ন্যাস বলে? গাড়ি চালাতে চালাতে মুখ ফিরিয়ে একঝলক রমেনের মুখখানা দেখে সঞ্জয়। এই কি সন্ন্যাসী? খেলার মাঝখানে খেলা ছেড়ে চলে গেছে বলেই সন্ন্যাসী! রমেনের মুখে কিছুই দেখে না সঞ্জয়। কেবল দেখে একটু তৃপ্তি, শান্ত ভাব একটু, হয়তো বা একটু উদাসীনতা। তুই কি ঠকে যাসনি রমেন! বিনা কষ্টে সব পেয়েছিলি, আর আমাকে দ্যাখ—কত লাথিগুঁতো খেয়ে কতটুকু করেছি। আর তার জন্য দিয়ে দিয়েছি ঐশ্বর্যের মতো সব ব্যক্তিগত গুণগুলি! এটুকু সুখের জন্য মানুষ কত দেয়! আর তুই অনায়াসে সব পেয়ে ঠকে যাসনি তো রমেন! ঠিক জানিস তো!
হঠাৎ ফিস ফিস করে সঞ্জয় বলল, কী পেলি?
রমেন অন্যমনস্ক মুখ ফিরিয়ে বলল, অ্যাঁ!
কিছু না রে।
চুপচাপ কিছুক্ষণ গাড়ি চালায় সঞ্জয়। তারপর বলে, আমার কাছে কিছুদিন থাকবি রমেন!
কেন রে!
সঞ্জয় ক্লিষ্ট হেসে বলে, তোর কাছে কতগুলো জিনিস শিখে নিতাম।
কী?
চোখ বুজে তোর সেই হাঁটা, কতবার ইচ্ছে হয়েছে ও-রকম হাঁটি। পারিনি। কিংবা প্রজাদের ওপর তোর ওই ইনফ্লুয়েন্স, কী মারাত্মক হিংসে করতুম আমরা! কিংবা তোর সেই আশি-নব্বুই মাইল স্পিড়ে গাড়ি চালানো, তোর দৌড়, তোর সাঁতার—সব শিখে নিতুম। আর শিখতুম, কী করে হঠাৎ সব ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে হয়!
রমেন! নামটা শুনে রিনি খুব অবাক হয়। সঞ্জয়ের কাছে সে অনেকবার শুনেছে এই নাম। তবে এই সেই রমেন! বউ পালিয়ে গিয়েছিল বলে যে সন্ন্যাসী হয়ে যায়! এই শান্ত, অসম্ভব সুন্দর, শক্তিমান স্বামীটিকে ছেড়ে কে এমন বউ আছে যে পালিয়ে যায়! বড় বোকা মেয়ে সে। বড় বোকা।
একটু হতভম্বের মতো রমেনকে দেখল রিনি। তারপর সংবিৎ পেয়ে বলল, আমি ওঁর কাছে শুনেছিলাম যে, আপনি আর কোনও দিন ফিরে আসবেন না। কিন্তু আপনার কথা শুনে আমার খুব ইচ্ছে করত আপনাকে দেখতে। মনে মনে চাইতাম, আবার আপনি ফিরে আসুন, আবার ঘরসংসার হোক আপনার—
হো-হো করে সঞ্জয় হাসে, দেখেছিস, দুধকলা দিয়ে সাপ পুষছি। ঘর করছে একজনের, আর ভাবছে আর-একজনের কথা।
রিনি লাল হয়ে ধমক দেয়, তোমার মুখের আটক নেই।
সঞ্জয় পিকলুকে নিয়ে আসে।
এই দ্যাখ পিকলু মহারাজ। ব্যাটা আমাকে মহা অপছন্দ করে। সুযোগ পেলেই গায়ে মুতে দেয়। তারপর বুকে চেপে ধরে সঞ্জয় পিকলুকে বলে, কেন রে বাটা, আমি তোর তুলসীগাছ?
শুনছেন? রিনি রমেনের দিকে চেয়ে অসহায় ভাবে বলে, একটামাত্র ছেলে আমাদের, তাকেও দিনরাত কুকুর বাঁদর বলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। অথচ ছেলেটা কী লক্ষ্মী দেখুন, একটুও কাঁদে না!
রমেনের কোলে এসে হৌ-হৌ করতে থাকে পিকলু। রমেন ওকে বুকের মধ্যে নিয়ে নেয়।
ঘুরে ঘুরে ঘরদোর দেখাল রিনি আর সঞ্জয়। সিঁড়ির দিকটায় দেড়তলায় একখানা একটেরে ঘর রয়েছে আলাদা। সেটা দেখিয়ে সঞ্জয় বলে, ওই ঘরটা ক’দিন আগে ভাড়া নিয়েছিলাম একটা স্টাডি করব বলে। আলমারি-টালমারির অর্ডারও দিয়েছিলাম। পরে একদিন ভেবে দেখলাম, আমি স্টাডি বানিয়েছি শুনলে বন্ধুরা হাসবে। তাই শেষ পর্যন্ত করলাম না। ঘরটা পড়ে আছে। তুই যদি থাকিস খুব আরামে থাকবি। দক্ষিণে জানালা আছে। যতদিন খুশি থাক। যতদিন খুশি। ঘরটা ছেড়ে দিলাম তোকে। থাকবি রমেন?
থাকুন না। রিনি মিনতি করে।
রমেন মৃদু হেসে মুখ নামিয়ে নেয়।
রিনি লুচি ভাজল, প্লেট ভরে সাজিয়ে দিল মিষ্টি, যত্নে তৈরি করে দিল ঘোলের শরবত। রমেন একটুখানি খেল মাত্র। বলল, ভাল খাবার না খেয়ে খেয়ে পেটে চড়া পড়ে গেছে। এখন এ-সব সহ্য হবে না।
শুনে রিনির চোখ ছলছল করে। বলে, আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?
রমেন মিটিমিটি হাসে। বলে, একজন ডেকেছিল।
কে?
রমেন হঠাৎ চুপ করে চেয়ে থাকে। তার দৃষ্টি দূরে চলে যায়। অন্যমনে আস্তে আস্তে বলে, সে এমন একজন—এমন একজন—যে পৃথিবীকে খুব ভালবেসেছিল। ভালবেসে গলে গিয়েছিল। গলে গিয়েছিল মানুষের দুঃখ দেখে।
বলতে বলতে একটু আত্মবিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল সে। তাই থমকে গেল হঠাৎ। এখনও সময় হয়নি। এখনও ঠিক সময় নয়!
সঞ্জয়ের মুখে একটু বিদ্রূপ আর অবিশ্বাসের হাসি ফুটে উঠেছিল মাত্র, সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল রমেন। আর বলল না।
রিনি কিন্তু চনমন করে ওঠে, বলুন না, বলুন না।
রমেন কেবল মিটি মিটি হাসে। প্রসন্নমুখে।
তার কোলেই ঘুমিয়ে পড়েছিল পিকলু। পিকলুকে নেওয়ার সময়ে রিনি বলল, আপনি ওকে ভাল করে আশীর্বাদ করুন। আমাদের ওই একটিমাত্র। যেন বেঁচে থাকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন