শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
রাস্তায় পায়চারি করতে করতে ললিত দেখল তার মাথার ওপর মশার ঝাঁক। মুখ তুলে ‘উম্-ম-ম্-ম্’ শব্দ করছিল সে, মশার বৃত্তটা আস্তে আস্তে নেমে আসছিল, মাথার ওপর নাকে কানে চোখে পিড়পিড় করছিল।
ফরসা প্রকাণ্ড চেহারার বুড়ো লোকটি রায়বাবু, বারান্দার ইজিচেয়ারে আধশোয়া, ডান হাতে বই, মলাটের ওপর দিয়ে দেখা যায় তাঁর চশমাজোড়া, হাতের বইটি সরিয়ে ললিতকে লক্ষ করলেন, কী ললিত?
ললিত হাসে, মশা।
হ্যাঁ, বড্ড মশা। আমার বাঁ দিকটায় কামড়ায়। খুব চালাক মশা।
বাঁ হাত নড়ে না, বাঁ পা নড়ে না, বাঁ চোখের পাতা পড়ে না, লোকটার বাঁ দিকটা জড়। করোনারির দুটো আক্রমণ গেছে, এখন তৃতীয়টার অপেক্ষা। দুপুরে খাওয়া ছেঁচাপানের রস বাঁ দিকের কষ বেয়ে ফতুয়াটার বুক ভাসিয়েছে। ছোরা-খাওয়া কিংবা গুলিবিদ্ধ একজন মানুষ যেন। হাতের বইয়ের মলাটে ছবিটা দেখে ললিত বড় অবাক হল। অবিকল একই রকম একটা ছবি— জাহাজের ডেক-এর ওপর গুলি খেয়ে এই রকম রক্তাক্ত বুকে মরে যাচ্ছে একটা লোক, অদূরে রিভলভার হাতে মুখোশ-টুপি-ওভারকোট পরা একজন। বারান্দার রেলিঙের ও-পাশে রায়বাবুর তখন অবিকল গুলি-খাওয়া লোকটার চেহারা।
কী বই ওটা?
রায়বাবু মলাটটা উলটে দেখে নিয়ে বললেন, দস্যু ওয়াং ও ঐতিহাসিক হীরা।
ললিত হাসে।
তুমি আমাকে বই এনে দিয়ে ললিত।
দেব।
দিয়ো, এখন আর কেউ বই এনে দেয় না।
গল্প মনে থাকে না, খেই হারিয়ে যায়।
একবারের দেওয়া বই দু’বার-তিনবার দিয়ে দেখেছে ললিত, লোকটা নির্বিচারে আবার পড়ে যায়। রায়বাবুকে বই দেওয়া সোজা।
তুমি কেমন?
ভাল।
অসুখটা কী যেন?
ওই পেটের একটা ব্যাপার।
পেট! রায়বাবু চিন্তিতভাবে তাকিয়ে রইলেন।
ক্লাবঘরটা বন্ধ। জলের কলে অনেক লোক আর মেয়েছেলে। শম্ভুদের ছাড়া জমিটায় লাটাইয়ে হাত্তা দিতে দিতে পিছিয়ে যাচ্ছে একটি ছেলে। ক্লাবঘরের দরজা পর্যন্ত যার ললিত, আবার ফেরে। মিত্রদের দোতলার জানালা খোলা— একটা পালঙ্কের কোণ, স্ট্যান্ডে টাঙানো মশারি আর দেয়ালে ছবি দেখা যায়। গণেশের দোকানে ক্যালেন্ডারে এক দুর্দান্ত যুবতী হাওয়ায় নড়ছে, তার পরনে নিকারবোকারই হবে বোধ হয়। রায়বাবুর মাথার ওপরকার বারান্দায় দাঁড়িয়ে চিরুনি থেকে ছাড়ানো চুলের দলা থুথু দিয়ে বাইরে ছুড়ে ঘরে গেল নমিতা। এই সব ছবি ভেঙেচুরে অলক্ষে একটা জাহাজ চলছে। জাহাজ ঢেউ খায়। জাহাজ দোলে। দস্যু ফেরারি ওয়াং তার সামুদ্রিক দূরবিন তুলে চেয়ে থাকে। বিশাল সমুদ্র, মহান আকাশ। দস্যু ওয়াং ফিরেও দেখে না। কোথায় কোন মুলুকে কার কাছে গচ্ছিত রয়েছে সেই ঐতিহাসিক হীরা! পাপী ওয়াং সমুদ্র পার হয়, দ্রুতগামী মোটরে চলে যায়, দড়ির সিঁড়ি বেয়ে ওঠে, নিরপরাধ লোককে খুন করে, বিদেশি বন্দরে রহস্যময় রেস্তরাঁয় চিহ্নিত লোকের সঙ্গে সাংকেতিক কথাবার্তা বলে। জমজম করে তার জীবন।
গল্পটা জানে না ললিত। দরকারও নেই। তবু টের পায় জাহাজ চলেছে। জাহাজ ঢেউ খায়। জাহাজ দোলে। দস্যু ফেরারি ওয়াং তার সামুদ্রিক দূরবিন তুলে চেয়ে থাকে। রায়বাবুর ডান দিকটা বই পড়ে উত্তেজিত হয়, বাঁ দিকটা স্থির থাকে। সংসারী মানুষের মতোই।
ললিত হাসে।
ওই যাচ্ছে অবিনাশ। পরনে ময়লা পায়জামা আর শার্ট, হাতে কাগজ-ঠাসা ডায়েরি, রোগা ছোট্ট চেহারা। উদ্ভ্রান্ত মুখচোখ।
ললিত অবিনাশকে ডাকে।
আরে ললিত! কী খবর?
কোথায় চলেছ অবিনাশ?
সাড়ে ছ’টায় একটা মিটিং আছে। দেরি হয়ে গেছে। চলি।
ললিত হাসে। বরাবর অবিনাশের মিটিং থাকে রোজ। দেখা হলেই সেই এক কথা, একটা মিটিং আছে। দেরি হয়ে গেল। চলি ভাই! অবিনাশের চাকরি নেই, বাইরে থেকে অনেকগুলো কারখানার ট্রেড-ইউনিয়ন চালায়, পার্টি থেকে পায় পঁচাত্তর টাকা। উদ্ভ্রান্ত দেখায় তাকে। তার পার্টি কী বলতে বা করতে চায়, তা বোধহয় সঠিক জানে না অবিনাশ। ভাসাভাসা যেটুকু জানে সেটুকুকেই সে প্রাণ দিয়ে ভালবাসে। মিটিঙে যায়, কিন্তু সেখানে সকলের সব কথা ঠিকঠাক বুঝতে পারে না! তবু উত্তেজিত হয়ে ফিরে আসে। কী চাও অবিনাশ? মানুষের মুক্তি। কী ভাবে মুক্তি আসবে? সমাজতন্ত্র। সমাজতন্ত্র কাকে বলে? অবিনাশ থতিয়ে যায়— সমাজতন্ত্র! হ্যাঁ, সমাজতন্ত্র…তার মানে সকলের জন্য সকলের হয়ে ওঠা, ক্ষুধা থেকে মুক্তি, অভাব থেকে মুক্তি, শ্ৰেণীবৈষম্য থেকে মুক্তি, এইরকম কত কী বলে যায় অবিনাশ। মোটা সব বই নিয়ে নাড়াচাড়া করে, হাতে নিয়ে বসে থাকে, কিন্তু সঠিক বুঝতে পারে না। তবু মনে হয়, এর মধ্যে একটা কিছু আছে। একটা কিছু, যা এইসব বই কিংবা মিটিঙের মতো নীরস নয়। কিংবা কে জানে সত্যিই মিটিংগুলো অবিনাশের কাছে নীরস কি না। কোনও দিনই কেউ অবিনাশকে পাত্তা দেয়নি, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছে তাকে। আশৈশব ওই রোগা চেহারা, আর বুদ্ধির অভাব তাকে মূল্যবান হতে বাধা দিয়েছে। কিন্তু ওইসব মিটিংগুলোতে সে কথা বলার সুযোগ পায়, তার দলের নেতাদের কাছাকাছি যেতে পারে, একটা ধর্মঘটের কারণ হয়ে ওঠে সে, একটা মিছিলের সবার আগের লোকটি হয়ে এগিয়ে যেতে পারে। তখন নিজের মহত্ত্বকে টের পায় অবিনাশ। হ্যাঁ, বোধহয় সমাজতন্ত্রের মানে, নিজেকে তুচ্ছ ভাবার হাত থেকে মুক্তি।
সন্ধের মুখে বাসায় ঢুকে ললিত দেখল, মরা-মরা তুলসী গাছটার গোড়ায় প্রদীপ জ্বেলে মা প্রাণপণে শঙ্খে আওয়াজ তুলবার চেষ্টা করছে গাল ফুলিয়ে, কিন্তু ফ্যাঁস ফ্যাঁস করে দম বেরিয়ে যাচ্ছে। শাঁখের শব্দ হচ্ছে না। তাকে দেখে মা বলল, দেখ তো, একটু ফুঁ দিয়ে, পারিস কি না। আমার আর আজকাল হয় না।
মায়ের এঁটো শাঁখটা মুখে তুলল ললিত। দু’-তিনবার চেষ্টা করল সে, পেটের সেই জায়গাটায় শক্ত একটা ডেলা পাকিয়ে উঠল। তবু ছাড়ল না, খুব কষ্ট করে তিন-তিনবার ভোঁ বাজিয়ে দিল সে।
কত দিন পর শাঁখ বাজল এ-বাসায়। বলে মা শাঁখ ধুয়ে ঘরে নিয়ে গেল।
সন্ধেবেলা শম্ভুদের ছাদে উঠল ললিত। উঠতে কষ্ট হচ্ছিল খুব। কিন্তু ছাদে সুন্দর হাওয়া দিচ্ছিল। ফুটফুটে জ্যোৎস্না ছিল। কয়েক মুহূর্তেই জুড়িয়ে গেল শরীর। একটা চাদর নিয়ে গিয়েছিল ললিত। সেইটে পেতে কিছুক্ষণ শুয়ে নিঝুম আকাশের দিকে চেয়ে রইল। আজকের আকাশে সপ্তর্ষি ছিল, ছায়াপথ ছিল না। ছায়াপথই ললিতের বেশি প্রিয়। ধুলারাশির মতো আকীর্ণ নক্ষত্রপুঞ্জ বিপুল একটি অনির্দিষ্ট পথের মতো পড়ে থাকে, ওখানে রোজ ঝড় ওঠে, ঝড়ো হাওয়ায় নক্ষত্রের গুঁড়ো উড়ে সমস্ত আকাশ ছড়ায়। আজ ছায়াপথ ছিল না। ললিত সপ্তর্ষি দেখছিল। সপ্তর্ষির চেহারা শান্ত। প্রশ্নচিহ্নের মতো। ব্যক্ত ও অব্যক্ত জগতের সীমায় বসে আছেন সাতজন শান্ত-সমাহিত ঋষি। কিন্তু এর চেয়ে বিছের উপমাটাই বোধ হয় ভাল। সপ্তর্ষিকে আসলে একটা বিছের মতোই দেখায়। ললিতের মনে পড়ল, তার রাশি বৃশ্চিক। বৃশ্চিকের শেষ জীবন খুব সুখের হয় না। শেষ জীবন পর্যন্ত অবশ্য পৌঁছনো গেল না। ললিত চেয়ে রইল। টের পেল সপ্তর্ষির আলো এসে তার গায়ে পড়েছে, স্নেহে লেহন করছে তাকে। তার রাশিচক্র বলছে, এইসব গ্রহ-নক্ষত্রের সঙ্গে, চাঁদ কিংবা সূর্যের সঙ্গে তার রহস্যময় যোগাযোগ রয়েছে। তার বিশ্বাস হয় না। বরাবরই সে এ-সব বিশ্বাসের বিরোধী ছিল। এখনও সে চায় না মৃত্যুর পরে কোনও চেতনাকে, কিংবা চায় না আরও একবার জন্ম নিতে। কেবল ইচ্ছে করে চার পাশে নক্ষত্রপুঞ্জের মাঝখানে আকাশ জুড়ে শুয়ে থাকতে। মহান একটি ঘুম, তার বেশি কিছু না। ছেলেবেলায় খেলার শেষে ফাঁকা মাঠে শুয়ে থেকে কত দিন আকাশ দেখেছে সে। দেখতে দেখতে কোন শূন্যতায় সে পৌঁছে যেত। পার্থিব কোনও কিছুই আর মনে থাকত না, বিপুল আকাশ-চেতনা আচ্ছন্ন করে রাখত তাকে, শূন্যের বিষণ্ণতায় ডুবে থাকত। সে-কথা মনে করে আজ একটু হাসল ললিত। তখন আকাশে থাকতেন দেবতারা, মানুষের ইচ্ছা পূরণ করতেন। আজ তাঁরা কেউ নেই— না মনে, না আকাশে তবু আজও কিছুক্ষণ সপ্তর্ষির অদৃশ্য আলো সে তার শরীর আর চেতনায় অনুভব করল। আকাশ থেকে মহৎ এক বিষণ্ণতা হনহন করে হেঁটে আসছে তার দিকে, টের পেল। কিন্তু আচ্ছন্ন হল না। আজ তার চারপাশের বিষণ্ণতা বয়স-হওয়া ললিতকে শক্ত মুঠিতে ধরেছে, আকাশের বিষণ্ণতা আজ আর তেমন একটা কিছু নয়।
উঠে পড়ল ললিত। ছাদের রেলিঙের ধার ঘেঁষে বেড়াতে লাগল।
দেখতে পেল বড় রাস্তার দিক থেকে ছোট্ট সাদা একটা মোটর গাড়ি আস্তে আস্তে এসে তাদের গলির মুখে থামল। আবার পিছন ফিরে মুখ ঘোরাল, আবার পিছিয়ে এসে থামল। মুখ ঝুঁকিয়ে ললিত দেখল গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভারের সিট থেকে সঞ্জয় নামছে। সঞ্জয়ের গাড়ি দেখে একটু অবাক হল ললিত, এত তাড়াতাড়ি ওর গাড়ি হয়ে গেল!
ললিত ছাদ থেকেই উঁচু গলায় বলল, সঞ্জয়, ঘরে যা। আমি আসছি।
সঞ্জয়, ওপর দিকে তাকাল, রাস্তার আলো থেকে হাতে চোখ আড়াল করে ললিতকে দেখার চেষ্টা করে বলল, তুই ওপরে? আমিও আসব?
ছাদটা শম্ভুদের। এখানে বাইরের লোক সঞ্জয়কে আনা ঠিক হবে না। তাই ললিত বলল, না, তুই ভিতরে যা।
ললিত নীচে এসে দেখল, সঞ্জয় তখনও গলির মুখে দাঁড়িয়ে, চেন-এ বাঁধা গাড়ির চাবিটা বোঁ বোঁ করে ঘোরাচ্ছে। তাকে দেখে হাসে সঞ্জয়, ক’ দিনের নোটিস রে! নাকি জামিনে খালাস আছিস, সময় ফুরোলে ধরে নিয়ে যাবে।
ললিত হাসে, শালা, পাষণ্ড!
বাহবা! টেলিফোনে তোর গলা শুনে ভেবেছিলুম যে, এসে শুনব তুই বিছানায় পড়ে চিনচিন করে ‘বিদায় দে মা’ গাইছিস। তা তো নয়, এই তো দিব্যি মুখ ফুটছে।
চোখের ইঙ্গিতে গাড়িটা দেখিয়ে ললিত বলল, তোর?
পোষা কুকুরের গায়ে লোকে যেমন আদরের থাপ্পড় দেয়, তেমনই গারিটার গায়ে একটা থাপ্পড় দিয়ে সঞ্জয় বলে, না রে। এখনও আমার নয়, তবে মনে হচ্ছে আমার হয়ে যাবে।
কী রকম!
এক মাড়োয়ারি পার্টির গাড়ি। নতুন, মাত্র হাজার ছয়েক মাইল চলেছে। পাঁচ হাজার টাকায় দিয়ে দেবে। আজ বিকেলে এসে কয়েক দিন ট্রায়ালে রাখতে দিয়ে গেল।
জলের দর।
তুই বুঝবি না রে, অন্য দিকে পুষিয়ে না নিলে জলের দরে দেয়! পুষিয়ে নিচ্ছে। কেনা-বেচার ব্যাপার তুই কী বুঝবি বে?
তুই উন্নতি করে ফেললি।
সঞ্জয় হাসে, উন্নতির এখনই কী দেখলি? রচনা বইতে পড়েছিলুম, ‘এক কোটি টাকা পাইলে আমি সব ভাত গুড় দিয়া খাইব।’ এখনও গুড় দিয়ে সব ভাত খাওয়া হয়নি। গাড়ি হয়েছে, বাড়ি হবে, মেয়েমানুষ পুষব, গ্রীষ্ম কাটাতে যাব সুইজারল্যান্ড। দেখিস, গরিবের রোগেও আমি মরব না। আমাশা, শোথ, উদুরি— দূর দূর। মরতে হয় তো মরব ক্যান্সার কিংবা সেরিব্র্যাল স্ট্রোকে— ভিয়েনা কি আমেরিকার নার্সিং হোমে। শম্ভুনাথ, নীলরতনের জেনারেল বেডে নয়। বুঝলি বে!
তোর শেষ দেখতে বড় ইচ্ছে হচ্ছে।
দেখে যা কাইন্ডলি, তোর মাস্টারির চাকরির কাজে লাগবে। ছাত্রদের দৃষ্টান্ত দিয়ে বোঝাতে পারবি, অধ্যবসায়ের পরিণাম।
জুতো ছেড়ে ঘরে ঢোকার কথা সঞ্জয় এখনও ভোলেনি। ললিত দেখল ঘরে ঢোকার আগে এক পায়ে দাঁড়িয়ে কুঁজো হয়ে সঞ্জয় জুতো ছাড়ছে।
ললিত বলে, জুতো নিয়েই আয় না!
দূর! মাসিমার ঠাকুর দেবতারা ঘর ছেড়ে পালাবে না?
ঘরে ঢুকেই সঞ্জয় চেঁচাল, মাসিমা, ও মাসিমা!
রান্নাঘর থেকে মা’র ক্ষীণ গলা শোনা গেল, কে রে! সঞ্জয়! কতকাল আসিস না!
সঞ্জয় ঘরে বসল না, সোজা চলে গেল মোজা-পায়ে রান্নাঘরের দরজায়। ললিত শুনল, সঞ্জয় চেঁচিয়ে বলছে, আপনি একটুও বুড়ো হননি তো মাসিমা। তারপর নিচু গলায় গুনগুন করে কথা বলতে লাগল মা’র সঙ্গে।
ছাদের সিঁড়ি দিয়ে বড় তাড়াতাড়ি নেমেছে ললিত। শরীর অবশ লাগছে। বিছানায় বসে আধশোয়া হল সে।
সঞ্জয় রান্নাঘর থেকে এসে চৌকিতে বসে বলল, তুলসী-মড়াটা কোথায়! সেটারও তো আজ আসার কথা। আর, আদিত্য?
আদিত্য আসবে না। ওর কাজ আছে। তুলসী আসবে ঠিক।
হেগে মরুক গে আদিত্য। তুলসীটা আসুক, আজ ওকে রগড়াব।
কেন?
ও মড়াটা দিন দিন আরও মরে যাচ্ছে। কী একটা বউ যে হয়েছে ওর ত্রি-ভুবনসুন্দরী, বুকের মধ্যে সেই বউয়ের দোলমঞ্চ নিয়ে ব্যাটা ঘুরে বেড়ায়। কিছুদিন আগে মাস্টারদের অবস্থান ধর্মঘটে গিয়েছিল এসপ্ল্যানেড ইস্টে, সেখান থেকে এসেছিল আমার অফিসে। যতক্ষণ ছিল, ততক্ষণ কোথায় পুরনো দিনের পাইজ্যামি বদমাইশির কথা বলব, তা না কেবল বউয়ের কথা, শালা এমন বেহায়া, বলে কিনা বিয়ে করে অনাস্বাদিতপূর্ব সুখে ডুবে আছি, বউ বড় সুখী করেছে আমাকে, ঠিক ওই রকম বইয়ের ভাষাতেই বলেছিল। অফিস না হলে পাছায় একটা লাথ কষাতুম। এদিকে দেখ, বলছে সুখে আছে অথচ চোখে মুখে মরকুটে ভাব, কাঠ-কাঠ হাসি, চোখ ম্যাট ম্যাট করছে। অনেক ধানাই পানাই করে বলল, সঞ্জয়, তোর হাতে ভাল গুন্ডা আছে? চমকে উঠে বললুম, কেন রে! বললে, একটা লোককে একটু ঢিট করতে হবে। জিজ্ঞেস করলুম, কে! কিছুতেই বলে না। বললুম, গুন্ডাই যদি লাগাবি, তবে আমাকে লাগা, জানিস তো আমি কেমন হারমাদ ছিলুম, এখনও ওটা আমার সাইড-বিজনেস। শুনে এলোমেলো কী-সব বলল, বুঝলাম না। চা-চা খেয়ে বিরস মুখে চলে গেল। মাইরি, ও শালাকে আজ আমি রগড়াব, তুই দেখিস। ওর উইক পয়েন্ট আমি বের করেছি।
ললিত হাসছিল, কী সেটা!
ওর বউ।
হবেও বা। ললিত ঠিক জানে না। নিজের ব্যথা-বেদনা-ব্যাধি নিয়ে এত ব্যস্ত ছিল যে, কাউকেই এ ক’দিন ভাল করে লক্ষ করা হয়নি। হঠাৎ মনে পড়ল, তুলসীর বউকে এখনও দেখাই হয়নি। এককালে পরস্পরে বিয়ে নিয়ে কত জল্পনাকল্পনা ছিল তাদের। ঠিক ছিল তুলসীর বিয়ে হবে খুব দূরে কোথাও, নাগপুর কানপুর বা ও-রকম দুরে, তারা দল বেঁধে বরযাত্রী যাবে। আর ললিতের বিয়ে হবে এমন জায়গায়, যেখানে যেতে নৌকো লাগে। সঞ্জয়েরটা ঠিক ছিল বিলেতে, মেমসাহেবের দিকেই বরাবর ঝোঁক সঞ্জয়ের, তাই ওর বিয়েতে এরোপ্লেনের বন্দোবস্তই ঠিক হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তুলসীর বিয়েতে যাওয়াই হল না, হারামজাদা বিচ্ছিরি একটা সময় বেছে বিয়ে করল।
সঞ্জয় বলল, আদিত্য এলে আজ তুলসীর পেছনে লাগাতুম। জিরাফের মতো লম্বা গলা উঁচু-নিচু করে, চোখ বুজে দু’ হাতের কাচকলা নেড়ে গাইত ‘তুলসী গাছেতে, কুকুর মোতে-তে-এ।’ শালাটা এল না কেন? কী এনগেজমেন্ট ওর?
বলতেই যাচ্ছিল ললিত। ইতস্তত করে সতর্ক হয়ে গেল; শাশ্বতীর কথাটা মুখে এল না। বোঝা যাচ্ছে আদিত্য আর শাশ্বতীর ব্যাপারটা এখনও সঞ্জয় জানে না। তাই, ওই নরম সুন্দর শ্যামলা মেয়েটিকে সঞ্জয়ের পালিশ-করা মুখের সামনে এগিয়ে দিতে মায়া হল তার। বললেই সঞ্জয়ের মুখ ছুটবে।
বলল, কী জানি!
জানিস না?
না।
সাড়ে সাতটায় বিষণ্ণ মুখে তুলসী এল। ঘরে ঢুকতে-না-ঢুকতেই সঞ্জয় ওর পিছনে লাগল, আয় তুলসী, আমরা বউ বদল করে ফেলি। আমারটা আমার কাছে পুরনো হয়ে গেছে, তোরটা তোর কাছে। পালটে ফেলি।
তুলসী মৃদু হাসে, আমারটা পুরনো হয়নি। কোনও দিন হবেও না।
সঞ্জয় ললিতের দিকে তাকায়, শুনছিস ললিত?
তারপর গলা নামিয়ে বলে, পুরনো না হলেই বা, তোরটা তো কুচ্ছিত! আমার মতো সুন্দর বউ? একে সুন্দর, তার ওপর যা সাজগোজ করে থাকে না। বলতে বলতে হঠাৎ জিভ কাটল সঞ্জয়, যাঃ মাইরি, একদম ভুল হয়ে গেছে।
ললিত বলে, কী?
সাজগোজের কথায় মনে পড়ল, রিনি লিপস্টিক নিয়ে যেতে বলেছিল। গোলাপি স্বপ্ন না কী যেন নাম! ইয়াঃ, রোজি ড্রিম। ভুল হয়ে গেল রে! বলতে বলতে ঘড়ি দেখল সঞ্জয়, নাঃ, সাড়ে সাতটা বেজে গেছে, বেরোতে বেরোতে আটটা হয়ে যাবে। দোকান খোলা পাব না।
তুলসী বলে, তুই কেটে পড় না।
আমি কেটে পড়লে খুব সুবিধে, না? পিছনে লাগার কেউ থাকবে না, তুমি ললিতের মুখোমুখি দাবা-খেলুড়ির মতো মুখ নিয়ে বসে থাকবে! তা ছাড়া, বউয়ের লিপস্টিকের অজুহাতে কেটে পড়লে তোরা আমার নিন্দে করবি না? বলবি, দেখ, ওই সঞ্জয়টা লেখাপড়া শেখেনি, চায়ের দোকানে বয়গিরি করত, আর এখন শালা বউয়ের লিপস্টিক কেনার জন্য অসুস্থ বন্ধুকে ছেড়ে চলে গেল। শালা আদেখলা, চালবাজ। বলবি না?
বললেই বা! তুই কার তোয়াক্কা করিস! তুলসী বলে।
ঠিক। আমি কারও তোয়াক্কা করি না। একমাত্র বয়স ছাড়া। সঞ্জয় বলে, বয়স! বুঝলি! এই যে লিপস্টিকের কথা ভুল হয়ে গেল, এই গেঁতো অলস আরামপ্রিয় হয়ে যাচ্ছি, চুরিটুরি করছি, টাকাপয়সা ভাল লাগছে, এ-সবের মূলে ওই বয়স। বাইরে গলির মুখে একটা সাদা গাড়ি দেখে এলি না তুলসী? ওটা আমার। হিংসে হচ্ছে না?
দূর। তুলসী ঠোঁট ওলটায়।
হলে ভাল লাগত, বুঝলি! আজকাল লোকে হিংসে করলে ভাল লাগে। আরও দেখ, এখন আর অনিশ্চয়তা নেই, ছোটাছুটি নেই, বসে বসে টাকা এসে যায়। আমার স্পিড কমে যাচ্ছে। জবুথবু হয়ে যাচ্ছি। শরীরে চর্বি ঠেকাতে পারছি না। কেবল মনে হয় বয়স হয়ে যাচ্ছে।
আর কী, এবার বুড়ি বেশ্যার মতো কপালে ফোঁটা কাটো, আর হরিনাম নাও। তুলসী বলে, ব্যাটা পাপিষ্ঠ!
সঞ্জয় হাসে, তুই বুঝবি না রে, তুই হচ্ছিস প্রলেটারিয়েট— ল্যাংটা মানুষ, বউকে একখানা গয়না দিতে তোর কোমর বেঁকে যায়। আমি তোর চেয়ে একটু বেশি দেখি।
তোর চেয়ে আমি মহৎ। তুই তো কোম্পানিকে ফাঁক করছিস।
সঞ্জয় হেসে তুলসীর পিঠে হাত বোলায়, ঠিক রে ল্যাংটাভোলা, ঠিক। তুই সুখী মহৎ, কারণ তোর অভাব তো এইটুকু, না? ঠিক, তুই মহৎ। কারণ, তুই ক’টা ভাল বাড়িতে ঢুকেছিস? ক’টা ভাল আসবাবপত্র দেখেছিস! সত্যিকারের দামি গাড়িতে চড়েছিল কোনও দিন? না, দেখেছিস তেমন সুন্দরী মেয়েছেলে? ভাল খাবার কী খেয়েছিস আজ পর্যন্ত, বাঙালি-বিয়ের নেমন্তন্ন ছাড়া?
তুলসী চিড়বিড়িয়ে ওঠে, তাতে কী?
তাতেই তুই মহৎ! কারণ, তুই বেশি দেখিসনি। আমি দেখি। শালা কত টাকা, কত খাবার, কত সুন্দরী মেয়েছেলে দুনিয়াভর, কত গাড়ি-বাড়ি,— এত ভোগ করার ক্ষমতাই নেই আমার। এই তো মাত্র পঞ্চাশ ষাট সত্তর বছরের আয়ু, এতে কী হয়? কিছু না। দুনিয়া ফিনিশ করতে হলে লাখবার জন্মাতে হবে। বুঝলি রে ল্যাংটা মানুষ, কেন বয়সের কথা ভাবি!
ললিত হাসছিল। সঞ্জয় তার দিকে ফিরে বলল, তুলসীকে খ্যাপানোর জন্য বলছি বটে, কিন্তু আমার মধ্যে সত্যিই কী একটা হচ্ছে। আজ সকালে হঠাৎ রমেনের কথা মনে পড়ে গেল। সেই যে বউ পালানোর পর সব ছেড়েছুড়ে চলে গেল রমেন, আর ফিরলই না। এত কীসের দুঃখ হয়েছিল ওর? এত ভোগসুখে ছিল, দু’ হাতে টাকা ওড়াত, বউয়ের জায়গায় দশটা মেয়েমানুষ পুষতে পারত, তবে সব ছেড়েছুড়ে সন্ন্যাসী হওয়ার মানে কী? আজ সারাদিন রমেনের কথা ভাবছি আর নার্ভাস লাগছে। সারা জীবন কষ্ট করে আমি সদ্য একটু সুখের মুখ দেখেছি, এখন শালা এখন যদি কোথা থেকে হঠাৎ ভুতুড়ে কোনও দুঃখ এসে কাঁধে চেপে বসে, আর অত কষ্টের তৈরি করা সবকিছু যদি হঠাৎ বিস্বাদ লাগে! যদি সব ছেড়েছুড়ে আমিও লম্বা দিই? ভাবতেই ভয় করে যে। দুপুরে তোর ফোন পেলাম, তোর অসুখের কথা জানতাম, তবু কেন ভয়ংকর চমকে উঠলাম বল তো! ফোন রেখে দেওয়ার পর দেখি হাত দুটো কাঁপছে।
তুলসী আর ললিত দু’জনেই নিবিষ্টভাবে চেয়ে ছিল তার দিকে। সঞ্জয় হঠাৎ লজ্জা পেল। তুলসীকে বলল, আজ তোর বউয়ের কাছে তোর প্রেস্টিজ খুব বেড়ে যাবে। আজ তোকে আমার গাড়িতে একটা লিফট দেব।
ললিত মাকে দেখতে পেল, ভিতরের দরজায় এসে দাঁড়িয়ে আঁচলে হাত মুছছে। ফোকলা মুখে একটু হাসি।
মা বলল, ও সঞ্জয়, আমার ললিতকে একটা ভাল চাকরি দে। তোর হাতে এখন কত ক্ষমতা!
ললিত ধমক দেয়, আঃ মা!
মা হাসে, তাতে কী! সঞ্জয় আমার ছেলের মতো।
ঠিকই তো! বলে সঞ্জয় উঠে গিয়ে মা’র হাত ধরে নিয়ে আসে, সকলের মাঝখানে বিছানায় বসায়, বসুন মাসিমা।
মা তুলসীকে বলে, ও তুলসী! আমাকে তোর বউ দেখালি না?
ললিত হাত ছুড়ে বলে, ইস মা, তোমার যে কত ডিমান্ড!
সেদিকে খেয়াল না করে বুড়ি আবার সঞ্জয়কে বলে, তোর গাড়িতে একদিন দক্ষিণেশ্বরে নিয়ে যাবি, একদিন তারকেশ্বর। নিবি না?
বলে মা ফোকলা মুখে হাসে। দুটো ঠোঁট কাঁপতে থাকে।
মা’র জন্য অস্বস্তি বোধ করে ললিত, বলে, তুমি যাও না, মা। ওদের জন্য কিছু করে দাও।
দিই। চায়ের জল চড়িয়ে এসেছি, চিঁড়ে আর পাঁপড় ভেজে দেব।
আঁচলে নাক মুছে মা উঠে দাঁড়ায়।
মা চলে গেলে আবার সহজ লাগে তাদের।
সঞ্জয় হঠাৎ ঝুঁকে ললিতের বুকে আঙুলের দুটো টোকা দিয়ে বলে, তোর মনোবল চমৎকার আছে। এইজন্য তোকে আমি হিংসে করি।
বাচ্চা ছেলের মতো লজ্জায় হাসল ললিত। এতদিন কথাটা তাকে কেউ বলেনি। সকলেই তাকে ভোলাবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তার দরকার ছিল না। তার মন চাইছিল কেউ এ-রকম একটা কিছু বলুক যে, সে সাহসের সঙ্গেই মুখোমুখি হচ্ছে সবকিছুর। ললিত তাই লজ্জায় হাসল।
সঞ্জয় বলে, আমি একগুঁয়ে, জেদি, কোনও কিছুর শেষ না দেখে ছাড়ি না। তবু দেখ শেষ পর্যন্ত আমি দুর্বল। একটা ঘটনার কথা বলি শোন। কিছুদিন আগে আমি একটা পাখা কিনেছিলাম। সিলিং ফ্যান। কিনে এনে নিজেই সেটাকে টেবিলের ওপর চেয়ার তুলে ফিট করলাম। তারপর রাত্রে পাখাটার ঠিক নীচে মেঝেয় মাদুর পেতে রিনিকে নিয়ে শুলাম। এভাবে তিন-চারদিন কেটে গেল, পাখার নীচে শুই, হাওয়া খাই, রিনিকে ভালবাসার কথা বলি; তারপর একদিন অফিসের শেষে এক পার্টির সঙ্গে রেস্তরাঁয় গেছি। বিজনেসের নানা রকম কথা হচ্ছে, তারই এক ফাঁকে আমি সিলিং ফ্যানটার দিকে তাকালাম। একই কোম্পানির পাখা। চোখটা একটু আটকে গেল। তারপর কথা বলি আর বারবার পাখাটার দিকে চেয়ে দেখি। যতবার তাকাই ততবারই একটা অস্বস্তি হতে থাকে। ওইভাবে বারবার দেখতে দেখতে হঠাৎ আমার চোখ আটকে গেল একটা ছোট স্ক্রু-র ওপর। পাখাটা যে-রড়টায় ঝোলানো থাকে, সেই রড আর পাখার জয়েন্টে একটা ছোট্ট স্ক্রু লাগানো। স্ক্রুটা দেখতে দেখতে আমি বিজনেসের কথা বলছি, আর মনে মনে বুঝতে চেষ্টা করছি ওই স্ক্রুটা আমি দেখছি কেন! পাখাটা যাতে রডের প্যাঁচ কেটে পড়ে না যায় তার জন্যই ওই স্ক্রুটা লাগানো, এ তো আমি জানি! তবে দেখছি কেন! ঠিক এই সময়ে আমি একটা শব্দ শুনলাম। হয়তো রাস্তায় গাড়ির ব্রেক কষার শব্দ, কিংবা পেয়ালা পিরিচের ভেঙে যাওয়ার শব্দ, কীসের শব্দ তা আমি বলতে পারব না। কিন্তু ওই শব্দটাই আমার মাথার মধ্যেকার ধোঁয়া কাটিয়ে দিল। হঠাৎ মনে পড়ল আমার পাখাটার ওই স্ক্রু লাগানো হয়নি! সঙ্গে সঙ্গে আমি লাফিয়ে উঠলাম, দৌড়ে বেরোলাম দোকান থেকে। রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম, ভিড়। আমি পাগলের মতো রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটা ট্যাক্সি থামালাম। সে-ট্যাক্সিতে সোয়ারি ছিল, আমি তার প্রায় পায়ের ওপর পড়ে বললাম, বড় বিপদ, আমাকে বালিগঞ্জে পৌঁছে দিন। প্লিজ। ট্যাক্সিতে বসে আমি উন্মাদের মতো অস্থির ছিলাম। সারা দুপুর-বিকেল ঠিক পাখাটার তলায় মাদুর পেতে রিনি ঘুমোয়, ওর বুকের কাছে থাকে পিকলু। চার-পাঁচ দিন ঘুরেছে পাখাটা, ওই স্ক্রু ছাড়া। আলগা প্যাঁচের ওপর রডের সঙ্গে লাগানো! ভাবাই যায় না— ওইভাবে ওই পাখা আমিই লাগিয়েছি। আমি— যে-আমি ছিলাম মেকানিক, কতজনের বাসায় পাখা ফিট করে দিয়ে এসেছি! পাখা লাগানোর সব কিছুই আমি জানি। এ আমার অধীত বিদ্যা। তবু ভুল! ছোট্ট একটা মারাত্মক স্ক্রু আমি লক্ষই করলাম না! কে জানে বাসায় গিয়ে দেখব, ভাঙাচোরা রিনি আর থ্যাঁতলানো পিকলুর ওপর জগদ্দল পাখাটা মুখ থুবড়ে আছে। ট্যাক্সির লোকটা জিজ্ঞেস করল, আপনার কী বিপদ? আমি কেবল বললাম, একটা স্ক্রু, একটা স্ক্রু! লোকটা না বুঝে ভয় পেয়ে চুপ করে গেল। বাসার সামনে নেমে আমি এক দৌড়ে ভিতরে গিয়ে দেখলাম— সঞ্জয় হাসে, কী দেখলাম বল তো?
তুলসী রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করে, কী?
পাখাটা চলছে, আর তাতে স্ক্রু লাগানো আছে ঠিকমতোই। ভুল হয়নি।
তুলসী হাসল, ট্রাজি-কমেডি!
কিন্তু মাইরি, তারপর থেকেই আমি বুঝে গেছি যে, নিজেকে আর বিশ্বাস করা যায় না। শালা, কোথায় নাট-বল্টুর ভুল করে রেখে দিয়েছি কে জানে! একদিন নিজের ফিট করা সংসার-টংসার হুড়মুড় করে নেমে যাবে। আর নয়তো ফুর্তি করতে করতে হঠাৎ বেমক্কা লাফিয়ে উঠে একটা স্ক্রু একটা স্ক্রু বলে ছুট লাগাব। নিজের ওপর আর কিছুতেই নির্ভর করা যাবে না! মাইরি, ললিত, তোর চেয়ে আমি অনেক দুর্বল। কেবলই মনে হয়, কোথায় কোন গোলমাল করে রেখেছি, সব ভেঙেচুরে যাবে।
ললিত হাসে।
সঞ্জয় বলে, আমার মনে হয় রমেনটারও এ-রকমই একটা কিছু হয়েছিল। ছোট্ট একটা ভুল ছিল কোথাও, হঠাৎ ধরতে পেরেছিল রমেন। নইলে ওর হঠাৎ সব ছেড়েছুড়ে যাওয়ার মানে কী? অ্যাঁ! দু’জনে একসঙ্গে কত বদমাইশি করেছি বল তো! ট্রাফিক পুলিশের মাথা থেকে টুপি তুলে নিয়ে ছুট লাগিয়েছি, দোকানে খেয়ে পয়সা দিইনি, বদলে আফ্রিকান নাচ দেখিয়ে ছাড়া পেয়েছি, সিনেমা হল-এ মারপিট করে নতুন বইয়ের প্রথম শো দেখেছি— কী স্পিড ছিল রমেনের! তবু ওর হল কী? আজ সারাদিন আমার রমেনটার কথা মনে পড়ছে।
রমেন! ললিত তার ডান দিকে তাকটার দিকে তাকাল। ওখানে অনেক ধুলো-পড়া পুরনো কাগজপত্র। ওর মধ্যে খুঁজলে রমেনের কয়েকটা চিঠি পাওয়া যাবে। আর, ঠিকানা। বড় সুন্দর ছেলে ছিল রমেন, ময়মনসিংহের সেই জমিদারের ছেলেটা। কখনও-সখনও নাম সই করত, রায় রমেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী।
ললিত বলল, আমার কাছে রমেনের ঠিকানা আছে। নিবি?
না। মাথা নাড়ল সঞ্জয়, থাকগে। যে যার মনে থাকুক। বলে খুব চালাক-হাসি হাসল সঞ্জয়, বললে, ও শালা আমার কাছে হাজার দুয়েক টাকা পায়! সেটা আমার ব্যবসায় ডুবেছে।
তুলসী বলে, পাপিষ্ঠ।
সাড়ে আটটা নাগাদ সঞ্জয় আর তুলসী উঠল। দরজা থেকে তুলসী হঠাৎ বলল, আজ আদিত্যকে দেখলাম।
সঞ্জয় বলে, কোথায়!
গড়িয়াহাটায়। ডবল ডেকারের দোতলা থেকে দেখলাম আদিত্য চিনেবাদাম খেতে খেতে দক্ষিণমুখো চলেছে। সঙ্গে একটা কালোমতো মোটাসোটা মেয়েছেলে।
শুনে সঞ্জয় চেঁচিয়ে হাসল। আর, ললিত চমকে উঠল।
ললিতের মনটা খারাপ হয়ে গেল হঠাৎ। অমন সুন্দর, শ্যামলা মেয়েটি— শাশ্বতী আদিত্যর ও-পাশ থেকে ঝুঁকে বার বার ব্যাকুল হয়ে বলছিল, আমার পিসেমশাই এই রোগ থেকে সেরে উঠেছেন। দেখবেন, আপনারও সেরে যাবে। তুলসীটার রুচি নেই, চোখও না। কালোমতে, মোটাসোটা মেয়েছেলে! কেমন বিশ্রীভাবে বলল! তুলসী ওকে ঠিকমতো দেখেইনি।
গলির মুখে দাঁড়িয়ে ললিত অন্যমনস্কভাবে শুনল, সঞ্জয় তুলসীকে বলছে, শালা গাঁইয়া, এখনও গাড়ির দরজা ঠিকমতো বন্ধ করতে শিখিসনি!
গাড়ির মধ্যে অন্ধকারে ওরা দু’জন ঝুঁকে একসঙ্গে সিগারেট ধরিয়ে নেয়। পিছন থেকে মা চেঁচিয়ে বলে, বউকে নিয়ে একদিন আসিস সঞ্জয়। তোর ছেলেটাকে দেখিনি। আর, আমাকে নিয়ে যাস তোর গাড়িতে। তুলসী, তোর বউ আনিস।
আসব… আসব… ওরা চেঁচিয়ে বলে, চলি রে, ললিত।
ললিত মাথা নাড়ে।
পিছন ফিরে গলির অন্ধকারের মুখোমুখি হঠাৎ থমকে দাঁড়ায় ললিত। মেয়েটি, ওই শ্যামলা সুন্দর শাশ্বতী, আজ রাতে হয়তো তার কথাই ভাবছে।
হঠাৎ তীব্র একটা আনন্দ বোধ করে ললিত। পরমুহূর্তেই মনে হয়, এটা গর্হিত আনন্দ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন