প্রথম অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

এক

হাসপাতাল থেকে ললিতকে নিয়ে যাওয়ার জন্য মাত্র দু’টি লোক এসেছিল। বাড়িওয়ালার ছেলে শম্ভু, আর বহুকালের অভিন্নহৃদয় সেই তুলসী। ইচ্ছে করেই আর কাউকে ছাড়া পাওয়ার তারিখটা জানায়নি ললিত, জানালে হয়তো আরও কেউ কেউ আসত। কিন্তু ললিত ভেবে দেখেছে, এ-সময়টায় খুব বেশি লোকের সঙ্গে দেখা হওয়া ভাল নয়। যদিও ডাক্তার তাকে কিছুই স্পষ্ট করে বলেনি, তবু সে জানে এটা ঠিক আরোগ্য নয়, খুবই সাময়িক এই ভাল হয়ে যাওয়া। এটা নিয়ে একটুও আনন্দ করার কিছু নেই।

পেটের ভিতরের পুরনো ব্যথাটা আর নেই, তবু বিছানা থেকে লিফট পর্যন্ত হেঁটে আসতে পেটের অপারেশনের কাটা জায়গাটায় টান লাগার একটা ব্যথা সে টের পাচ্ছিল। আসল ব্যথাটার তুলনায় এ-ব্যথাটা কিছুই নয়, তাই সে তুলসী কিংবা শম্ভুর কাঁধে ভর দিল না, আস্তে আস্তে একাই হেঁটে এল। লিফটে নেমে রাস্তা পর্যন্ত আসতে তার কষ্ট হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল পেটের মধ্যে একটা ফাঁকা জায়গায় একটা ছেঁড়া নাড়ি দোল খাচ্ছে, ওই নাড়িটায় বোধহয় তার শরীরের কোনও যন্ত্র ছিল, যেটা কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সে অনেকদিন ধরে ভেবে এসেছে যে, বাইরে এলে লোকজনের চলাচল, ট্রাম-বাস আর খোলা আলো-বাতাসের মধ্যে হঠাৎ খুব ভাল লাগবে। তার শরীর আর মন জুড়ে পুরনো চেনা কলকাতা ঝমঝম করে বাজনার মতো বেজে উঠবে।

বস্তুত সে-রকম কিছুই ঘটল না। পড়ন্ত বেলার সূর্যের আলো তার চোখে এসে লাগল। ট্রাম-বাস লোকজনের ভিড় নিয়ে কলকাতা বয়ে যাচ্ছে ঠিকই, এবং ঝমঝম বাজনার মতোই শব্দ হচ্ছে চার দিকে। কিন্তু সে অনুভব করল তার শরীর নিস্তব্ধ, মনেও কোনও চঞ্চলতা নেই। হাতে চোখ আড়াল করে সে দেখল রাস্তার ও-পারে বড় কলেজ-বাড়িটার গায়ে লাল কালিতে লেখা পোস্টার, টেলিফোনের তারে কাক বসে আছে, সেই পুরনো ময়লা ঘিঞ্জি কলকাতা।

তুলসী একটু এগিয়ে ফুটপাথের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে ট্যাক্সির জন্য, সামান্য হাঁফ ধরে গিয়েছিল, আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে কষ্টও হচ্ছিল বলে ললিত শম্ভুর কাঁধে একটু ভর দিয়ে হেলে দাঁড়াল। যদিও এখন শরৎকাল, তবু সে খুব ঘামছিল এখন। শম্ভু একটা হাত বাড়িয়ে পিঠের দিক দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। ললিতের মনেই হচ্ছিল না যে দু’ মাস সে ঘরে বন্দি ছিল, দু’ মাস সে এইসব রাস্তাঘাট দেখেনি; বরং তার মনে হচ্ছিল, আজ সকালেই সে এই রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেছে। এত চেনা সবকিছু, এত একঘেয়ে।

একমাত্র মায়ের জন্যই গত দু’ মাস যাবৎ একটা দুশ্চিন্তা ছিল ললিতের। দু’ মাসে মা মাত্র কয়েকবার দেখতে এসেছে তাকে। গত দু’ মাস সে তুলসী কিংবা শম্ভু আসামাত্রই মায়ের কথা জিজ্ঞেস করত। আজ ভুল হয়ে গেছে। আজকের দিনটা অন্য রকমের বলেই এই ভুল। তবু তুলসী যখন চলতি ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে দরজা খুলে বলল, আয় রে ললিত, তখন হঠাৎ সে খেয়াল করে শম্ভুকে প্রশ্ন করল, মা কেমন আছে রে?

শম্ভু হাসল, ভালই।

ভালই! ললিত ‘ভালই’ কথাটা নিয়ে মনে মনে সামান্য নাড়াচাড়া করতে করতে ট্যাক্সিতে উঠল। না, মা ভাল নেই, ভাল থাকার কথাও নয়। লাম্বাগো আর বাতে পঙ্গু মা ভাল করে হাঁটাচলাও করতে পারে না, প্রায় সময়েই হামাগুড়ি দিয়ে কাজকর্ম করে। মাকে ভাল রাখার চেষ্টা কোনও দিন তেমন করে করেওনি ললিত। একা একা মা’র সারাদিন কাটে, ললিত বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ায়। এখন ট্যাক্সির সিটে এলিয়ে পড়ে থেকে সে মনে মনে ভাবল এবার থেকে সে মায়ের কাছে কাছে বেশি করে থাকবে।

তুলসীর দিকে মুখ ফিরিয়ে ললিত বলল, তোর কাছে সিগারেট নেই রে?

আছে। বলে তুলসী পকেটে হাত দিল। তারপর থেমে বলল, খাবি?

দে না।

একটু ভাবল তুলসী, তারপর সস্তা সিগারেটের প্যাকেটটা আর দেশলাই এগিয়ে দিয়ে বলল, খা, কী আর হবে! সেরে যখন গেছিস…

শেষ কথাটা অনাবশ্যক। তাকে শুনিয়ে বলা। সিগারেট ধরাতে গিয়ে মৃদু একটু হাসল ললিত। মুখে কিছু বলল না সে, কিন্তু মনে মনে বলল, ক্যানসার সারে না রে তুলসী, ক’মাস পর হয়তো তোকে আমার খাটে কাঁধ দিতে হবে।

সিগারেটের স্বাদ ভুল হয়ে গেছে। ধোঁয়াটা কর্কশ আর গন্ধটা বিদ্‌ঘুটে লাগছিল ললিতের। সে দেখল সামনের সিটে শম্ভু বসে সোজা রাস্তায় তাকিয়ে আছে, তুলসীর মুখও বাইরের দিকে ফেরানো। দু’জনেই খুব গম্ভীর, চিন্তিত। এই গুমোটটা ভেঙে দেওয়ার জন্যই ললিত শম্ভুকে ডেকে বলল, হ্যাঁরে শম্ভু, তুই জিমনাশিয়ামে এখনও যাচ্ছিস? শ্ৰী-ফ্রি একটা কিছু পেলি?

শম্ভু মুখ ফিরিয়ে একটু হাসল, কিছু বলল না।

একাই কথা বলছিল ললিত। তুলসীকে ডেকে বলল, দেখ তুলসী, এই গরিব দেশে শম্ভুটা একাই চারজনের খোরাকি টেনে নিচ্ছে। সরকারের উচিত জিমনাশিয়ামগুলি বন্ধ করে দেওয়া। শম্ভুটা ফ্যানভাত, পালং সেদ্ধ, লাল আটার রুটি কত কিছু বায়নাক্কা যে শুরু করে সকাল থেকে রাত অবধি যে, ওর স্বাস্থ্যের ধাক্কায় বাড়িসুদ্ধ লোক রোগা হয়ে গেল। ওরে শম্ভু, মাসিমা এখনও তোর খাওয়া নিয়ে খিটখিট করে?

শম্ভু হাসিমুখ ফিরিয়ে বলল, এখন আর করছে না কিছুদিন। আমি সার্জেন্টের চাকরিতে সিলেক্টেড হয়ে আছি ক’দিন হল। এখন খাওয়াচ্ছে খুব।

হাসল ললিত। শম্ভু বেশ বুদ্ধি করে উত্তর দিয়েছে। কথা টেনে নিয়ে ললিত বলল, সার্জেন্ট! সেই লাল মোটর সাইকেল আর কোমরে পিস্তল! দূর, ওটা একটা চাকরিই নয়।

কেন?

কলকাতার সার্জেন্টগুলো কেবল রাস্তার মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক কন্ট্রোল করে বেড়ায়, আর কোনও কাজ নেই।

খোলা গলায় শম্ভু হাসছিল। আর তখন তুলসী একটা হাত বাড়িয়ে ললিতের হাতে রেখে চাপ দিয়ে বলল, তুই এত কথা বলিস না ললিত।

কেন?

তুলসী চুপ করে রইল। ওর মুখের রসকষহীন চিন্তার ভাবটুকু আড়চোখে দেখল ললিত। ডাক্তার সম্ভবত ওকে কিছু বলেছে! কী বলেছে তা ললিত ওর মুখের ভাবটুকু থেকে সহজেই আন্দাজ করতে পারছিল। আজকালকার বাচ্চা ছেলেরাও এ-রোগের পরিণাম জানে। তুলসী তাই অত গম্ভীর। এমনই দুশ্চিন্তা ওর যে, এখন যে ললিতকে ভুলিয়ে রাখা দরকার সে-কথাও ওর খেয়াল নেই, নইলে নিজের মুখে অন্তত নকল একটা খুশির ভাব ওর ফুটিয়ে তোলা উচিত ছিল।

রাসবিহারী অ্যাভেনিউয়ের মোড়ে ট্রাফিকের লাল আলোয় তাদের ট্যাক্সি থামাল। সামনে-পিছনে দুটো ডবলডেকার আর পাশে একটা লরি এসে দাঁড়ানোয় হঠাৎ ট্যাক্সিটাকে খুব ছোট্ট আর অসহায় বলে মনে হচ্ছিল ললিতের। চারপাশের গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে তাদের ট্যাক্সির ভিতরটাকে মুহূর্তের মধ্যে গুমোট করে দিল। ললিত মুখ বের করে ট্রাফিকের আলোর দিকে চেয়ে ছিল। বরাবর তার সবচেয়ে প্রিয় হল মাঝখানের ক্ষণস্থায়ী হলুদ বাতিটি, ঝলসে উঠলে নিজের শরীরের ভিতরে একটা গভীর অনুভূতি সে টের পায়। অনেকদিন সে বাতিটি দেখেনি ললিত।

শম্ভু পাঞ্জাবি ট্যাক্সিওয়ালাকে বলছিল সে যেন সামনের ডবলডেকারটাকে পার হয়ে সোজা রাস্তা ধরে। ললিত হঠাৎ ঝুঁকে পড়ে বলল, না রে শম্ভু, গাড়ি বাঁ দিকে ঘোরাতে বল।

কেন?

একটু ঘুরেফিরে যাই। অনেকদিন কলকাতা ভাল করে দেখা হয়নি। সর্দারজি, বাঁয়ে ঘোরে…

ট্যাক্সি বাঁ দিকে ঘুরল।

শম্ভু বলল, দূর। মিটার উঠবে।

তুলসী মুখ ফিরিয়ে বলল, উঠুক।

শম্ভুর দোষ নেই। শম্ভু বরাবর ট্যাক্সিকে সোজা পথেই নিয়ে যেতে শিখেছে। প্রয়োজনেই তাদের ট্যাক্সিতে চড়া, তাই চড়েও শান্তি থাকে না, উগ্র চোখে চেয়ে সতর্ক থাকতে হয় যাতে ড্রাইভার এতটুকু ঘুরপথে না নিয়ে যেতে পারে। তাই ললিত তুলসীর দিকে চেয়ে একটু হাসল।

তুলসী বুঝল কি না বলা যায় না। শুধু আস্তে করে জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাবি?

প্রশ্নটা ললিত শুনতেই পেল না। তুলসীর দিকে তাকিয়ে সে তুলসীর কথাই ভাবছিল। তার সন্দেহ হচ্ছিল যে তুলসী বোধহয় আর তার সমবয়স্ক বন্ধু নেই। গত দু’ মাসে সে হয়ে গেছে অন্য সম্পর্কের মানুষ। ললিতের বাপ-কাকার মতো কেউ যদি জীবিত থাকত তবে এখন এ-অবস্থায় তাদের মুখের ভাব বোধহয় অনেকটা তুলসীর মতোই হত। তার অজান্তে কখন যেন তুলসী তার অভিভাবক হয়ে গেছে, সন্দেহ হয়, পুরনো বন্ধুত্বের সহজ সম্পর্কটা আর কোনও দিন ফিরে আসবে কি না। তার ইচ্ছে হচ্ছিল সখেদে তুলসীকে ডেকে বলে, তুলসী, তোকে কী বলে ডাকব এখন বল তো! কাকু না জেঠু?

তুলসী কলকাতার বাইরে একটা স্কুলে চাকরি করে। রোজ যাতায়াত করতে হয়। তা ছাড়া ললিত হাসপাতালে থাকার সময়েই মাসখানেক আগে তুলসীর বিয়ে হয়ে গেল। এত সব ব্যস্ততা, বিয়ে, রোজ স্কুলে যাতায়াত সব সামলেও প্রায় রোজই তুলসী তার কাছে এসেছে। মাঝে মাঝে দেখাশোনা করেছে মায়ের। হাসপাতালে থাকার সময়ে তুলসীই ছিল তার সবচেয়ে বড় সহায়। সম্ভবত সেই সময়েই আস্তে আস্তে তাদের সম্পর্কটা পালটে গেছে। বস্তুত এখন তুলসীর মূখ দেখে, ওকে একবার ‘শালা’ বলে ডাকতে, কিংবা ওর বউ নিয়ে একটু রসিকতা করতে ইচ্ছে থাকলেও লজ্জা করছিল ললিতের।

কোথায় যাবি? তুলসী আবার জিজ্ঞেস করে।

বেশি দূর না। গড়িয়াহাটা হয়ে লেকের ধার ঘেঁষে সাদার্ন অ্যাভেনিউ ধরে ফিরে যাব।

শম্ভু মুখ ফিরিয়ে বলল, মাসিমা বসে আছে কিন্তু আপনার জন্যে। যত তাড়াতাড়ি পারি নিয়ে আসব বলে তাঁকে দরজায় বসিয়ে রেখে এসেছি। আপনি না গেলে মাসিমা দরজা ছেড়ে নড়বেন না।

শম্ভুর ভাঙাচোরা চৌকো শক্ত শিরা-ওঠা তেলতেলে মুখটার দিকে অলস চোখে চেয়ে হঠাৎ ললিতের ইচ্ছে করছিল বলে, মা আমার জন্য চিরকাল বসে আছে অপেক্ষায়, আমার জন্মেরও আগে থেকে। এই দেরিটুকু মা’র সইবে।

কিন্তু কথাটা খুব দার্শনিক হয়ে যাবে, শম্ভু মোটেই বুঝতে পারবে না বলে ললিত বলল না। কেবল ম্লান হাসল একটু। তারপর চোখ বুজল। তার ইচ্ছেমতো ট্যাক্সি চলতে লাগল।

মাঝে মাঝে চোখ খুলে ললিত দেখছিল ভিড়ের গড়িয়াহাটা ছাড়িয়ে গেল তার গাড়ি, লেক পার হল হু হু হাওয়ায় উড়ে, তারপর বাঁক নিল বাঁয়ে, মাথার ওপর দিয়ে টালিগঞ্জের রেলপোল চলে গেল, আনোয়ার শা রোড হয়ে এসে থামল তাদের সরু গলির মধ্যে বাসার সামনে।

তুলসী নেমে দরজা খুলে ধরে রইল। সামান্য অস্বস্তি বোধ করে ললিত। শালা তুলসীটা তাকে বাদের খাতায় ধরে নিয়েছে। দৃষ্টিকটু রকমের ভদ্রতা করে যাচ্ছে ও। তাই মাটিতে পা দিয়ে ললিত ইচ্ছে করেই খুব জোরে ঝপাং শব্দে ট্যাক্সির দরজাটা বন্ধ করল।

উলটো দিকের বাড়ির বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে-থাকা রায়বাবু মুখের সামনে থেকে বইটা নামিয়ে ঝুঁকে বললেন, আরে, ললিত!

ললিত হাসল।

উনি বললেন, তুমি তো একদম ভাল হয়ে গেছ। স্বাস্থ্য ফিরে গেছে তোমার।

ললিত আবার হাসল।

রায়বাবু মাথা নেড়ে বললেন, বাঃ! চমৎকার!

ট্যাক্সির দরজা বন্ধ করার শব্দে সামনের ঘরের দরজা খুলে গিয়েছিল। দরজায় দাঁড়িয়ে মৃদু একটু হাসলেন শম্ভুর মা, এলে ললিত?

ললিত হাসল। খোলা দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল সামনের ঘরটায় অনেকজন মেয়ে-বউ। আর সেই ভিড়ের মধ্যে মায়ের চশমার ঘোলা কাচ দুটো ঝকমক করে উঠল। পাড়া-পড়শিরা মাকে ঘিরে বসে আছে।

এখন সামান্য একটু লজ্জা করছিল ললিতের। সামনের ঘরটা শম্ভুদের। তাদের ঘরটা পিছনের দিকে। এখন এই অন্যের ঘরে একগাদা চেনা আধচেনা মেয়ে-বউয়ের সামনে মা তাকে পেয়ে কী যে করবে ভেবে পাচ্ছিল না ললিত। হয়তো জড়িয়ে ধরে কাঁদবে, হয়তো বিলাপ করবে।

খুবই সংকোচের সঙ্গে সে দরজায় উঠে দাঁড়িয়ে রইল। শম্ভুর মা ডাকলেন, ভিতরে এসো ললিত।

ললিত ঢুকল না। ঘরের ভিতরে বাস্তবিক জায়গা নেই। সামনেই ঘরের মাঝখানে একটা চেয়ারে মা বসে আছে। তার চারধারে মেঝেতে এবং চৌকিতে পাঁচ-সাতজন মা’র বয়সিই প্রবীণ মহিলা। এঁরা কেউ কেউ সধবা। ললিত জানে এঁরাই মা’র অবসরের সঙ্গী, নিঃসঙ্গতার সহায়। সে যখন বাড়িতে থাকে না তখন এঁরাই আসেন যেচে। ললিত তাই নিশ্চিন্ত থাকে। আজও এঁরা এসেছেন তাকে দেখতে। সে কেমন ভাল হয়ে ফিরে এল।

ললিত মাকে দেখল। এক পলকেই বোঝা যায় মা’র চেহারা অনেক পালটে গেছে। এমন নয় যে, মা আরও রোগা কিংবা বুড়ো হয়ে গেছে। তা নয়। কিন্তু হঠাৎ মনে হয় যেন মা আরও বোকা হয়ে গেছে। মুখটা সামান্য খোলা, ভ্যাবলা একটা বোধবুদ্ধিহীন দৃষ্টি তার চোখে। নীচের ঠোঁটটা আবেগে সামান্য কাঁপছে। মা তার দিকে একটুক্ষণ চেয়ে রইল। হঠাৎ ধক করে উঠল ললিতের বুক, মা কি কিছু বুঝতে পারছে!

রোগা দুটো হাতে চেয়ারের হাতলে ভর দিয়ে মা উঠবার জন্য চেষ্টা করছিল। একবার কোথাও বসলে মা আর সহজে দাঁড়াতে পারে না, কোমরে রস জমে যায়। শম্ভুর মা মা’র পাশে দাঁড়িয়ে একটু হেসে বললেন, দেখুন দিদি, ললিত কেমন সুন্দর চেহারা নিয়ে ফিরেছে!

সকলেই তাকে দেখছিল। ললিত অনুভব করে সকলের চোখেমুখেই একটা নিশ্চিন্ত ভাব। সন্দেহ হয় এরা কেউ ললিতের অসুখটার বিষয়ে ভাল করে কিছু জানে না। মাকেও জানানো হয়নি। জানালেও মা সঠিক বুঝতে পারত কি না কে জানে! মা শুধু জানে যে, তার গুরুতর একটা কোনও অসুখ করেছিল, এখন সেরে গেছে।

চশমা খুলে মা তার থানের আঁচল তুলে চোখের জল মুছছিল। দৃশ্যটা অনেকবার দেখা ললিতের। অনেক ছোটখাটো কারণেও মাকে অনেকবার কাঁদতে দেখেছে ললিত, কোনও দিনই সে মা’র কান্না দেখে খুব বিচলিত হয়নি। আজ কিন্তু সে তার বুকের মধ্যে গুরগুর শব্দে হৃৎপিণ্ডের ডেকে ওঠার শব্দ শুনল।

মায়ের কাছে যা ললিত। করুণাভরা গলায় এ-কথা বললেন মিতুর ঠাকুমা। মিতু— যার বিয়ে হয়ে গেছে বড় বাড়িতে, যাকে এক সময়ে ললিতের বড় পছন্দ ছিল। মিতুর ঠাকুমা থেকে আস্তে আস্তে চোখ ফিরিয়ে সবাইকে দেখছিল ললিত। এঁরা কেউ মিতুর ঠাকুমা, কেউ মুনুর পিসিমা, কেউ বীরুর মা। এ-সব সম্পর্কের ওপরেই এঁদের পরিচয় বেঁচে আছে, নাম ধরে ডাকার কেউ নেই। বেশির ভাগই বুড়ো অথর্ব অসহায়। এঁরা প্রাণভরে লোককে আশীর্বাদ করে, অভিশাপ দেয়। কোনওটাই শেষ পর্যন্ত ফলে না। এই অসহায়দের দলে মাকেই সবচেয়ে বেশি অসহায় বলে আজ মনে হচ্ছিল ললিতের। সে ছাড়া তার মায়ের আর কেউ নেই, তারও নেই মা ছাড়া আর কেউ। সে আজ মায়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে মনে মনে সামান্য অস্থির হয়ে পড়ল।

ঘরের ভিতরে ঢুকতে ইচ্ছে করছিল না ললিতের। ঘরের আবহাওয়াটা কেমন বুড়োটে, গুমোট হয়ে আছে। তা ছাড়া বাইরে তুলসী দাঁড়িয়ে আছে।

মায়ের কান্নাটা যে দুঃখের ছিল না এটা বুঝতে একটু সময় লাগল ললিতের। সুখে কখনও সে মাকে এর আগে কাঁদতে দেখেনি।

কষ্টেসৃষ্টে নড়বড়ে শরীরটা নিয়ে উঠে দাঁড়াল মা, ফোকলা তোবড়ানো মুখে অদ্ভুত একটু হেসে সকলের দিকে চেয়ে অনুমতি ভিক্ষে করল, ললিতকে ঘরে নিয়ে যাই?

ললিত বুঝল ওই চাওয়াটুকুর মধ্য দিয়েই সকলের কাছ থেকে ললিতের জন্য আশীর্বাদ ভিক্ষে করে নিল। সকলেই সহৃদয়ভাবে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল মাকে। মিতুর ঠাকুমা মুখ বাড়িয়ে বলল, এবার ললিতের একটা বিয়ে দাও গো, ললিতের মা!

ললিত মায়ের কাঠের মতো শুকনো দুর্বল একখানা হাত ধরে সিঁড়িটা সাবধানে নামিয়ে আনল। নামতে নামতে মা মুখ ঘুরিয়ে মিতুর ঠাকুমাকে বলল, তোমরা আশীর্বাদ করো বাছা। ছেলেকে তো তোমরা জানোই, আমি বুড়ো অথর্ব হয়ে গেছি, চোখে ভাল দেখি না, তোমরাই বেছেগুছে পছন্দ করে দাও।

সকলেই সমস্বরে কথা বলে উঠল। হ্যাঁ, তারা ললিতকে জানে, হ্যাঁ এমন ছেলে! তারা দেখবে ললিতের জন্য একটি মেয়ে। কোনও চিন্তা নেই। মিতুর ঠাকুমা গলা বাড়িয়ে বলল, ললিতের পছন্দের কেউ আছে কি না খোঁজ নিয়ে গো ললিতের মা!

ললিতের মন বলল, ছিল। মিতু। তার তো বিয়ে হয়ে গেছে।

তুলসীর দিকে একখানা হাত বাড়াল মা, আঃ তুলসী, ললিতকে ফিরিয়ে এনেছিস।

শম্ভুদের বাড়ির পিছন দিকে তাদের ঘর, সরু একটা গলির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ঘরের তালা খুলতে খুলতে মা বলল, দেখ তুলসী, সারাদিন ঘর ছেড়ে নড়বার উপায় নেই আমার। ললিতটা বাইরে বাইরে ঘোরে, আর এই লক্ষ্মীছাড়া ঘর আগলে আমার থাকা। কত কিছু আছে কলকাতায়, কালীঘাট, রামকৃষ্ণের মঠ, ভাগবত রামায়ণ পাঠ। সবাই যায়, কেবল আমারই কিছু হয় না। বসে থাকতে থাকতে দেখ আমায় বাতে ধরেছে। তারা মেয়ে দেখ, আমি ললিতের বিয়ে দিই…

শরীরে এত কষ্ট মা’র তবু তাদের ছোট ঘরখানা ঝকমক করে, ললিতের তক্তপোশে ধবধবে চাদর পাতা।

ললিত সামান্য হাঁপাচ্ছিল। বিছানায় বসতে-না-বসতেই সে গড়িয়ে পড়ল। বলল, মা, এক গ্লাস জল দাও।

দিই বলে মা তবু তুলসীর সঙ্গে কথা বলে, তুই রোজ এসে ওকে বোঝাবি। কেন, মাস্টাররা কি বিয়ে করে না? তুই করিসনি?

খোলা জানালার ওপর সতেজ একটা পেয়ারার ডাল এসে পড়েছে। সিলিঙে ঘুরছে কোন আদ্যিকালের পুরনো ফ্যানটা। দেয়ালে সেই সূর্যাস্ত আর তিনটে ডিঙি নৌকোর ছবিওলা ক্যালেন্ডার। আচ্ছন্নের মতো তাকিয়ে রইল ললিত।

আর মাস কয়েক পরে এই ঘরের এই বিছানায় শুয়ে তার মৃত্যু হতে পারে।

মায়ের কথাগুলো আর বুঝতে পারছিল না ললিত। কেবল তার একঘেয়ে গলার স্বর তার কানে আসছিল। অনেক অনেকদিন পরে আজ তার হঠাৎ মনে হল এই স্বর তার বড় প্রিয়। এই রকম আরও কত কী প্রিয় ছিল ললিতের। তার কোনওটা হয়তো বা ওই জানালার ওপর হেলে-পড়া পেয়ারার ডাল, কিংবা ওই সূর্যাস্তের ছবিটির মতোই তুচ্ছ।

কাত হয়ে শুয়ে সে মায়ের মুখখানা দেখছিল। দাঁত-পড়া, তোবড়ানো একখানা মুখ। বুড়ি। মাঝে মাঝে আঁচলে নাক মুছে নেওয়ার মুদ্রাদোষ। এই তার মা।

জল চেয়েছিল ললিত, মা জল দিতে ভুলে গেল। আর-একবার চাইতে ইচ্ছে হল না তার। কাত হয়ে শুয়ে শুয়ে সামান্য তন্দ্রা আর আচ্ছন্নতার মধ্যে ডুবে গেল সে।

মা তুলসীর সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছিল। একটানা, একই রকম স্বরে। সে-সব কথা আর ললিতের কানে ঢুকছিল না। চোখের পাতা ভারী হয়ে পরস্পর মিতুর ঠোঁটের মতো লেগে রইল। কিন্তু ভিতরে ভিতরে সমস্ত চেতনাই সজাগ ছিল তার। সে ভেবে দেখছিল আর কয়েকটা দিন একতলার এই ছোট্ট ঘরে, বুড়ো পঙ্গু অক্ষম মায়ের সঙ্গে তার কেমন কাটবে। সম্ভবত খুবই একা লাগবে তার। মাঝে মাঝে প্রবীণ মুখশ্রী নিয়ে চিন্তিত তুলসী আসবে অভিভাবকের মতো, ললিতের ঠাট্টার উত্তরে মৃদু ম্লান হাসবে, আড্ডা জমবে না। মা তুলসীকে টেনে নিয়ে যাবে রান্নাঘরের চৌকাঠ অবধি, পিঁড়ি পেতে বসিয়ে দুঃখ আর আক্ষেপের কথা বলে যাবে। একা লাগবে ললিতের। হয়তো সে মাঝে মাঝে বেরোবে পাড়ায়, দু-একটা বাড়ি থেকে মায়ের প্রবীণ সঙ্গিনীরা ললিতকে ডাকবে, এসো, ললিত। ঘরে বসিয়ে তাকে শোনাবে তারই মায়ের দুঃখের কথা। বলবে, এত বড় ফাঁড়াটা কেটে গেল, এবার দেরি করে বিয়ে করো ললিত, জীবনের সব কাজগুলোই করণীয়। কোনওটাই ফেলনা নয়। এ-সবই ললিত জানে। কিংবা হয়তো সে গলির নির্জন রাস্তায় দাঁড়িয়ে কয়েক পলক দেখবে বাচ্চা মেয়েরা রাস্তায় ছক কেটে এক্কা-দোক্কা খেলছে। তাদের কারও বেণি ধরে একটু টেনে দিয়ে ললিত বলবে, কেমন আছিস রে টগর? কিংবা পাড়ার ঘরোয়া চায়ের দোকানটাতে যাওয়া যেতে পারে, যেখানে তার বয়সি পাড়ার কয়েকজন আড্ডা দেয়। তারা কেউই ললিতের বন্ধু নয়, পরিচিত। তবু তাদের সঙ্গেও একটু সময় কেটে যাবে। স্কুল থেকে ছুটি নেওয়া আছে, তবু আর-একটু ভাল বোধ করলে সে স্কুলের কাজও শুরু করতে পারে। হয়তো আগের মতোই বিশ্রী লাগবে তার, তবু সময় কেটে যাবে। সময় তো এখন আর খুব বেশি নয়!

সে মা আর তুলসীর অস্পষ্ট গলার স্বর শুনতে পাচ্ছিল। চায়ের কাপে চামচ নাড়ার শব্দ। মা তুলসীকে চা করে খাওয়াচ্ছে। ললিত তাকাল না। তার চোখের দু’টি ভারী পাতা পরস্পরের সঙ্গে লেগে রইল। একথা ঠিক যে, দু’ মাস বাদে এই ফিরে আসার মধ্যে এতটুকু আনন্দ নেই। কিন্তু যদি মিতু তার বউ হত, তা হলে! ভাবতেই তার আনন্দের একটা স্রোত ললিতের শরীরকে নাড়া দিয়ে গেল। মিতু হলে— মিতু হলে— কিন্তু মিতু তো হল না ললিতের।

হওয়ার কথাও ছিল না। মিতুদের বড় বাড়ি, গেটের ওপর বোগেনভেলিয়ার ঝাড়, গ্যারেজে ছোট্ট একটা গাড়ি। বড় হতাশ লাগত ললিতের। মাঝে মাঝে মিতুর সঙ্গে দেখা হত স্কুলের রাস্তায়, আর ললিতের মনে হত সে এর জন্য সবকিছু করতে পারে। সবকিছু। দরকার হলে একটা-দুটো খুন, বোমা মেরে উড়িয়ে দিতে পারে এক-আধটা বাড়ি, হাজারটা মারমুখো লোকের মুখোমুখি পারে দাঁড়াতে। আশ্চর্য, কোনও দিনই মিতুর সঙ্গে তবু কথা বলা হয়নি। বড় ভাল ছেলে ছিল ললিত— ধীর, শান্ত, লাজুক আর ভিতু। মিতুর সঙ্গে কথা বলার মতো পাপ সে করেনি। কেবল মিতুকে দেখলে তার বুকের মধ্যে ধড়ফড় করে উঠত, মুখের জল যেত শুকিয়ে, আর সারাটা অবসর সময় সে মনে মনে মিতুর সঙ্গ ধরত, ডাকত, বউ, আমার বউ।

মা তখনও মাঝে মাঝে তার বিয়ের কথা বলত, সেই বছর সাতেক আগেও। সে উত্তর দিত না, অন্যমনস্কর মতো মিতুর কথা ভাবত। মিতু হলে— মিতু হলে—

সম্ভবত মা কিছু টের পেয়েছিল। কীভাবে পেয়েছিল তা ললিত জানে না। হয়তো কেউ মাকে বলেছিল সকাল সাড়ে দশটায় স্কুলে যাওয়ার পথে ললিত হাঁ করে বড় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। কিংবা এমনও হতে পারে যে, রাতে ঘুমের মধ্যে কোনও দিন সে মিতুর নাম ধরে ডেকেছিল, কিংবা বলেছিল যে, সে মিতুকে ভালবাসে। তখন জ্বরবিকারের মতো একটা অবস্থায় কী যে করেছিল ললিত কে জানে!

যেমন করেই হোক মা টের পেয়েছিল। মা ললিতকে কিছুই বলেনি। কিন্তু একদিন যখন ললিত ঘরে ছিল না তখন মা মিতুকে ডেকে এনেছিল ঘরে।

সেই ডেকে-আনার ফল ভাল হয়নি। যা ছিল তার মনের ব্যাপার, যা ছিল তার একার তা সমস্ত পাড়ায় বিশ্রীভাবে ছড়িয়ে গেল। মা মিতুকে কী বলেছিল, তা ললিত জানে না। শুধু এটুকু জানে যে, মিতু রাজি হয়নি।

বোধ হয় খুবই রেগে গিয়েছিল মিতু, মাকে অপমান করে বলেছিল, আমাকে এভাবে ডেকে আনা আপনার উচিত হয়নি। বাবা শুনলে খুব রেগে যাবে।

তার বোকা, ললিত-সর্বস্ব মা হয়তো বলেছিল, কিন্তু আমার ললিতকে দেখ, কেমন হয়ে যাচ্ছে আমার তরতাজা ছেলে। তুই রাজি হয়ে যা মিতু, আমি তোর বাবা-মাকে বুঝিয়ে বলব।

শুনে মিতু হয়তো খুব রেগে গিয়েছিল। কেননা, ছেলেবেলা থেকেই সে জানে যে, সে বড় বাড়ির মেয়ে, বড় বাড়িতেই তার বিয়ে হবে। তার সেই নিশ্চিত ভবিষ্যৎ থেকে এইভাবে তাকে চুরির চেষ্টা দেখে সে হয়তো মাটিতে পা ঠুকেছিল, এ আপনার অন্যায় মাসিমা, এটা খুব অন্যায়। আমার মা শুনলে ভয়ংকর বকবে যে, আপনি আমাকে বাড়িতে ডেকে এনে এইসব বিশ্রী কথা বলেছেন।

মা হয়তো তবু ভিখিরির মতো কাঙালপনা করেছিল, দেখিস মিতু, তোর সুখের সংসার হবে। ললিতের কুষ্ঠিতে আছে তিরিশের পর ওর ভোগসুখ, পয়সা হবে ওর দেখিস। তুই সুখে থাকবি, আমি তোদের সব দুঃখ টেনে নিয়ে চলে যাব। দেখিস, যাওয়ার সময় আমি একটুও দুঃখ রেখে যাব না। আমার আর বেশি দিন নেই রে!

কে জানে হয়তো এরপর মিতু কেঁদে ফেলেছিল। ডাইনি জটাইয়ের মতো এই বুড়িটা তাকে বশ করে ফেলছে এই ভয়ে হয়তো ককিয়ে উঠে বলেছিল, পায়ে পড়ি, আমাকে ছেড়ে দিন মাসিমা! কিংবা তেজি ঘোড়ার মতো ঘাড় বেঁকিয়ে বলেছিল, আপনি আমাদের সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখবেন না মাসিমা। বাবাকে বলে দিলে আপনি মুশকিলে পড়বেন। আর, ঠাকুমাকেও বলে দেব যেন আপনার কাছে আর না আসেন।

সেইদিন মিতু চলে যাওয়ার পর মা ভয় পেয়েছিল। ললিত যদি জানতে পারে! রাতে ঘরে ফিরে এসে ললিত দেখেছিল দারুণ গরমেও মা চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে।

কী হয়েছে মা?

আমার জ্বর হয়েছে ললিত। রান্না করা আছে, তুই নিয়ে থুয়ে খা।

গায়ে হাত দিয়ে ললিত বলল, কোথায় জ্বর!

হয়েছে রে। শরীরের মধ্যে কেমন কাঁপুনি। দুপুর থেকে পড়ে আছি।

সে-রাতে অনেক এলোমেলো কথা বলছিল মা, যার স্পষ্ট অর্থ ললিত ধরতে পারেনি। ললিত বকবে, এই ভাবনায় ভয়ে ভয়ে সে-রাতে মা’র সত্যিই জ্বর এসেছিল।

তন্দ্রা ভেঙে ললিত দেখল ঘরে কেউ নেই। তুলসী চলে গেছে।

আস্তে আস্তে উঠল ললিত। এখন শরীরটা অনেক ঝরঝরে লাগছে। একটু খিদে টের পাচ্ছিল সে। উঠে ললিত ভিতরের দরজায় গিয়ে দেখল পেয়ারাতলার ছোট্ট খুপরি রান্নাঘরটায় মা নিশ্চল হয়ে বসে আছে। একটু কুঁজো হয়ে কেমন ছেলেমানুষের মতো বসবার ভঙ্গি মা’র। যেন কোনও কিশোরীবেলার চিন্তায় বিভোর। আসলে এখন আর মাকে ললিতের পাকা মাথাওলা প্রবীণ মহিলা বলে মনে হয় না। সারাদিন কাটুকুড়ুনির মতো কুঁজো হয়ে হয়ে মা সারা ঘর ঘুরে বেড়ায়, খুঁজে খুঁজে ময়লা বের করে ঘর থেকে, বার বার সামান্য জিনিসগুলো গুছিয়ে রাখে, বিছানার চাদর টান করে অকারণে, তারই ফাঁকে ফাঁকে হঠাৎ শূন্য হয়ে যায় চোখ, শিশুর মতো বোকা হয়ে যায় তোবড়ানো মুখ। যেন চারদিকের এই ঘরবাড়ি, ছোটখাটো জিনিসপত্র, এই ছোট এক ঘরের সংসার— এর কোনও কিছুর অর্থই মা বুঝতে পারে না। মাঝে মাঝে ঘুমন্ত অবস্থায়ও মাকে লক্ষ করেছে। হাঁটু মুড়ে ছোটখাটো হয়ে গিয়ে মা ঘুমোয়, নিঃসাড় সেই ঘুম, আর মাঝে মাঝে সেই মুখে একটু একটু হাসি ফুটে উঠে মিলিয়ে যায়। তখন মনে হয় মা স্বপ্ন দেখছে— সেই কিশোরীবেলার স্বপ্ন। এক দূর গ কিংবা গাঁয়ের স্বপ্ন, যার সঙ্গে জেগে দেখা চারপাশের সঙ্গে লক্ষ লক্ষ মাইলের তফাত।

মা’র মন ভুলো হয়ে গেল। বিকেলে জল চেয়েছিল ললিত, মা’র জল দিতে ভুল হয়ে গেল। আর মাসকয়েক পর যদি ললিত মরে যায়, তবে তার এই শিশু মা’কে কে দেখবে!

মাকে ডাকল না ললিত। আবার ঘরের মধ্যে ফিরে এল। একা লাগছে। বড় বেশি একা।

অধ্যায় ১ / ৪১
সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%