উঠে বোসো শালগ্রাম

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

'একটা ভীষণ সুন্দর, স্বর্গের মতো দেশ তৈরি করার প্রবল ইচ্ছে হয়েছে।'

'স্বর্গ কেন বললেন স্যার! আমরা স্বর্গ মানি না, নরকও মানি না।'

'তাহলে আমেরিকার মতো।'

'ছি ছি ছি, আমেরিকা একটা সাম্রাজ্যবাদী দেশ। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের চির সংগ্রাম। সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক।'

'আচ্ছা মুশকিল তো! তাহলে আমরা কীসের মতো দেশ করব?'

'আমরা আমাদের মতো করব।'

'বেশ! কিন্তু, ভীষণ ভীষণ সুন্দর। সুন্দর সুন্দর রাস্তা, বাড়ি, পার্ক। জলপথ, স্থলপথ। ঝকঝকে হাসপাতাল, তকতকে স্কুল, পরিচ্ছন্ন বাজার। কোটরচোখো, গাল তোবড়ানো কোনো লোক থাকবে না, থাকা চলবে না। চারিদিকে সুন্দরী, সুন্দরী মেয়ে, গাবলুগুবলু শিশু। ফিটফাট, ঝকঝকে, চকচকে যুবক। ভোঁ ভোঁ কলের বাঁশি। কারখানার গেট দিয়ে গলগল করে শ্রমিকরা বেরিয়ে আসছে। বাহুতে বল, মুখে হাসি, চোখে স্বপ্ন, বুকভরা ভালোবাসা। মাছ কিনছে, মাংস কিনছে, মুলো কিনছে, গাজর কিনছে, গাজরের হালুয়া কিনছে, লাল লাল আপেল, মোটা মোটা কলা, বউয়ের জন্যে রাঙা শাড়ি। খেতে খেতে চাষিরা গান গাইছে—কাটি ধান আয়রে। আকাশে থালার মতো পূর্ণিমার চাঁদ। দাওয়ায়, দাওয়ায় বৃদ্ধ আর বৃদ্ধারা মলিদার চাদর গায়ে দিয়ে বসে আছে। সুখী সুখী মুখ। প্রত্যেকটা বাড়িতে বিদ্যুতের আলো। ছেলেমেয়েরা দুলে দুলে পড়া মুখস্থ করছে। যত মশা, মাছি সব মেরে ফেলেছি। মশারি জালের কাজ করছে। ভোরবেলা সূর্য সবে উঠেছে। ছোট্ট নদীর কুলুকুলু জলে বিশ্বনাথ মশারি ফেলেছে। এক ঝাঁক রুপোলি মাছ, খলবল, খলবল। মৌরলা, পুঁটি, চাঁদা। কৃষকের কুটিরে আর দারিদ্র্য নেই। সামন্তর ছেলেটি এক গেলাস খাঁটি দুধ খেয়েছে। কচিকচি ঠোঁটের ওপর সরের গোঁফ। নিবারণ ফলের রস খাচ্ছে। সনাতন খটাস খটাস করে তাঁত চালাচ্ছিল। খবর এল তার ছেলে আই.এ.এস. হয়েছে। মসৃণ একটা পিচের রাস্তা লম্বা হয়ে চলে গেছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। মাঠে মাঠে হৃষ্টপুষ্ট ধবলী গাই। মশমশ করে নেপিয়ার ঘাস খাচ্ছে। সবকটার স্তন দুধে টসটস করছে।

নতুন, নতুন পাকা প্রাইমারি স্কুল। ঠং ঠং ঘণ্টা। হৃষ্টপুষ্ট শিশুরা মাছের ঝোল, ভাত খেয়ে বই বগলে ছুটছে। ঘণ্টা পড়ে গেছে ঘণ্টা। তাদের সঙ্গে সঙ্গে আনন্দে ছাগল ছানারাও ছুটছে। কোথাও একটা ঘেয়ো লেড়ি কুত্তা নেই। কান্ট্রিলিকার শপে ডাবের জল আর শরবত বিক্রি হচ্ছে। ডাকাতরা ছোরা, ছুরি, লাঠি, বল্লম সব বিসর্জন দিয়েছে কাজলা দিঘির জলে। যত বদমাশ আর ফেরেববাজ চাকরিবাকরি করছে। সংসারী হয়েছে। একটাও বেকার নেই দেশে।

লরিচালক আর খালাসিরা মদ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। বোতলে কলের জল। তেষ্টা পেলেই গলায় ঢালছে। হাইওয়েতে আর দুর্ঘটনা ঘটছে না। মদ নেই মাতালও নেই। অথবা মাতাল নেই তাই মদও নেই। বউ পেটানোও বন্ধ। স্বামী স্ত্রী সম্পর্ক সর্বত্র দোতারার মতো। কোর্ট কাছারিতে আর একটাও ডিভোর্স মামলা নেই। জল না পেলে গাছ যেমন শুকিয়ে যায়, ডিভোর্স আদালতও শুকিয়ে গেছে। পারিবারিক অশান্তি, দাম্পত্য কলহ সব টিভিতে ঢুকে গেছে। দর্শকরা দেখে আর হাসে।

ঘুষ আর ঘুষি দুটোই উঠে গেছে। দেশে অপরাধ নেই। পুলিশদের ভি. আর. এসে ফেলা হচ্ছে। দু-চারজন যারা আছেন তাঁরা সিনেমায় অভিনয় করছেন। প্রাচীন বড়োবাবুরা আত্মজীবনী লিখছেন। জেল হাজতে নতুন আর কেউ আসছে না। খাঁচায় মুরগির চাষ হচ্ছে। সুপাররা কবিতা লিখছেন।

দুম।

'কী হল?'

'টায়ার ফেটে গেল স্যার। রাস্তার যা অবস্থা।'

'পঞ্চাশ লক্ষ টাকা দেওয়া হল। এই কি তার নমুনা!'

'হাফ তো পকেটে গেছে।'

'কেন গেছে?'

'আপনি দেখেননি স্যার? কাজের বাড়িতে হালুইকররা সবার আগে উনুনে ঘি ঢালে। অগ্নিকে সন্তুষ্ট করার জন্যে। রাস্তা তৈরি কঠিন কাজ। পঁচিশ লাখ ভূতায় স্বাহা।'

'দশ গজের মধ্যে কটা গর্ত?'

'পুরোটাই স্যার।'

'ঠিক আছে। উলটো রাস্তা কর। যেখানে গর্ত নেই সেখানেও গর্ত করে দাও। পৃথিবীর সব দেশে রাস্তা ওপর দিকে ওঠে, হাইওয়ে, আমাদের এখানে হবে লো ওয়ে। ক্রমশ নামো, নীচে আর নীচে। বিনীত পথ।'

সকল অধ্যায়
১.
টক ঝাল মিষ্টি
২.
ঘোরকলি
৩.
কেমন আছেন?
৪.
জীবন একটা বেয়াড়া ভাল্লুক
৫.
হতেছে পাগলের মেলা
৬.
সকাল
৭.
আশার কথা
৮.
আর বোলো না ভাই!
৯.
'পৃথিবীতে যত বেটা সব বেটা গোরু'
১০.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১১.
হাঁদা গঙ্গারাম
১২.
কে পরাবে সিঁদুর
১৩.
জীবনের জাতীয় সংগীত
১৪.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫.
বাস-মিনিবাসের লাইনে ঘোষ, বোস, মিত্তির
১৬.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৭.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৮.
বাঁদর
১৯.
কোরা কাগজ
২০.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
২১.
শান্তির সহজপাঠ
২২.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
২৩.
অনুসন্ধান
২৪.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
২৫.
প্রেমের শিকল
২৬.
বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
২৭.
ছদ্মবেশী
২৮.
প্রেম বাড়ছে
২৯.
হনুমান টুপি
৩০.
বারমুডা ট্র্যাঙ্গল
৩১.
আড়ং ধোলাই
৩২.
হেমন্তের সকাল
৩৩.
হাতপাখা
৩৪.
খেলা
৩৫.
সন্দেহ
৩৬.
পেটে খেলে পিঠে সয়
৩৭.
শেয়াল পণ্ডিতের পাঠশালা
৩৮.
আমার আছে তোমার নেই
৩৯.
ধ্যাততেরিকা সংসার
৪০.
মায়ার খেলা, মায়ের খেলা
৪১.
যে ট্রেনের কোনো ইস্টিশন নেই
৪২.
সুখের লাগিয়া
৪৩.
টেকনিক
৪৪.
বাপের চা
৪৫.
অনশন
৪৬.
এ চোর সে চোর নয়
৪৭.
পরনিন্দা পরচর্চা
৪৮.
অমর বাঙালি
৪৯.
পথের শেষ কোথায়!
৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
৫১.
পুজোর পাঁচালি
৫২.
আকাশ যখন ছবির মতো নীল
৫৩.
সংসার, শূন্য এক ছায়াবাজি
৫৪.
মারডালো
৫৫.
বড় সাধ ছিল
৫৬.
খোলকত্তাল
৫৭.
হিরের টুকরো
৫৮.
কোনওদিন শুনেছ, চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৫৯.
অধিকার করে অধিকারী হতে হয়
৬০.
কোথায় কী
৬১.
জীবন ও সাহিত্য
৬২.
শামা হর রঙ্গ মেঁ
৬৩.
যা ছিল, একদিন নেই হবে, যা ছিল না,তা একদিন আছে হবে, শেষ হবে না কিছুই
৬৪.
উলটোপাক
৬৫.
যুবক
৬৬.
কাজের সময় কাজি
৬৭.
সকাল সকাল ভোট দিন
৬৮.
শুভানুধ্যায়ী
৬৯.
ছাতা আর গামছার মাল্টিপারপাস ব্যবহার
৭০.
জোকার
৭১.
আসরটা যে করলে মাটি
৭২.
কাঠুরিয়া
৭৩.
মানুষ হয়ে মরতে চাই
৭৪.
উতলা দখিন বাতাসে
৭৫.
ভাঙলে কিছু গড়তে তো হবে
৭৬.
আতঙ্ক
৭৭.
নিগ্রহ
৭৮.
ছুটির সকাল
৭৯.
স্বপ্ন
৮০.
আয় কাটাকাটি করি
৮১.
কলকাতা—৩০০
৮২.
আপনি কার পেশেন্ট
৮৩.
শরৎকাল
৮৪.
পকেটমারি
৮৫.
দুর্বলের সংসার সবলের সন্ন্যাস
৮৬.
আমি ক্ষুদ্র প্রাণ এক
৮৭.
মন পাখিরে কৃষ্ণকথা বল
৮৮.
জন্ম যার কোলে মৃত্যুও তারই কোলে
৮৯.
কেউ যায় বাজারে পচা মাছ কিনতে,কেউ যায় এভারেস্টে উঠতে
৯০.
উঠে বোসো শালগ্রাম
৯১.
এইবার যাই কোথায়!
৯২.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
৯৩.
এসেছি কেঁদে, যাই যেন হেসে
৯৪.
নির্জনতায় আমরা ভয় পাই, সজনতায় বিরক্ত হই
৯৫.
নদী ডাকে, আয় চলে আয়
৯৬.
কেউ ঘুমোয় কেউ জাগে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%