সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
''এই তো, শরীর ঠিক আছে?''
''খারাপ হওয়ার তো কোনও কারণ নেই।''
''সে কী, কাল রাতে ওই অখাদ্য খাওয়ার পর তুমি সুস্থ আছ? ওটা ফিশ রোল, না ডেডবডি রোল, স্যালাডের বদলে এক চিমটে ব্লিচিং পাউডার দিলেই হত। যাক কেপ্পনের ছেলের বিয়েতে যা হওয়ার তাই হয়েছে। রতনের পুত্রবধূটিকে কেমন দেখলে?''
''এক নজরে যা দেখলুম, বেশ সুন্দরী। এ পাড়ায় ওরকম সুন্দরী বোধ হয় নেই।''
''সুন্দরী বলতে তুমি কি বোঝ!''
''চোখা নাক, টানা টানা চোখ, চাঁদের মতো মুখ, ছিপছিপে গড়ন, বেঁটেও নয় লম্বাও নয়, দুধে আলতা রং।''
''এই দেখলে? পায়ের দিকে তাকিয়েছিলে?''
''পায়ের দিকে তাকাতে যাব কোন দু:খে, আমার কি জুতোর ব্যাবসা!''
''মেয়েদের সৌন্দর্যের এইটট্টি পার্সেন্ট পায়ে। পা বলে দেবে লক্ষ্মী হবে না অলক্ষ্মী। পা দিয়ে বিচার হবে বিধবা হবে, না সধবা থাকবে। দজ্জাল হবে না বাধ্য হবে।''
''আমি মশাই মুখটা সামনে ছিল, সেইটাই দেখেছি, পায়ে পড়িনি, মানে পা পড়িনি। আপনি কীভাবে দেখলেন?''
''আমি পায়ের দিক থেকে মাথার দিকে উঠলুম।''
''কী পেলেন?''
''ভবিষ্যৎ পেয়ে গেলুম। বাইশ শো বাইশ খড়ম পা, ছ্যাতরানো বুড়ো আঙুল!''
''কী হবে!''
''সংসার জ্বালিয়ে দেবে, বিধবা হবে, কুলটাও হয়ে যেতে পারে।''
''যদি চব্বিশ ঘণ্টা মোজা পরিয়ে রাখে!''
''তাতে কী হবে, তাতে কী হবে! মোজার ভেতর পা-টা তো রয়েই গেল।''
''যদি অ্যামপুট করিয়ে দেয়।''
''তুমি সিরিয়াসলি নিচ্ছ না। দেখলে না, রতনের ছেলেটা এই আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে কী রকম ভেড়া হয়ে গেছে! আরে নেমন্তন্ন করেছিস, ঘরের বাইরে আয়, তা না খামের গায়ে ডাকটিকিটের মতো সেঁটেই রইল। আজকালকার ছেলেগুলো সব ভেড়ুয়া, নিন কম পুপ। কণ্ঠস্বর শুনলেন?''
''না। আমি শাড়িটা ধরালুম, সোজা ছাতে। ঝপাঝপ খেয়ে, বাড়ি, বিছানা। হ্যাঁ, ডবল অ্যান্টাসিড।''
''আহা কী গলা, যেন কচি কাক।''
''পিনপিনে, প্যানপেনে গলার চেয়ে ওইরকম একটু ব্যক্তিত্বসম্পন্ন গলা অনেক ভালো। ইলা অরুণের গান শোনেননি?''
''আমি ভাই আখতারি বাঈয়ের ভক্ত, কোয়েলিয়া বলে যেখানে হাঁক মেরেছেন, মনে হচ্ছে সব কোকিল সাইলেন্ট। সে সব গলার আলাদা দাপট, আলাদা জোয়াড়ি। আর একটু বড় হয়ে মাসতিনেক পরে এ যখন রতনকে বাবা বলে ডাকবে, মনে হবে তারে বসে দাঁড়কাক ডাকছে। আরে ছ্যাঁ, কোথা থেকে পয়সা খরচ করে একটা মেয়ে হাবিলদার ধরে নিয়ে এল। এ পাড়ায় আর একটা অমন আছে।''
''কে?''
''আমাদের শোভনের বউ। সেদিন দোতলার বারান্দা থেকে রাস্তায় দাঁড়ানো শোভনকে বলছে, অ্যায় শুনছ, ধনেপাতা আনতে ভুলো না। আমার হাত থেকে দুধের ক্যান পড়ে গেল। তিনি আবার সব সময় ম্যাকসি পরে থাকেন। এয়ারি। দেখলে মনে হবে, বাতাস লাগা পালের মাথায় একটা মুন্ডু গজিয়েছে।''
''এঁরা যদি গজল, কী দাদরা, কী কাওয়ালির ধরনে সুরে কথা বলেন, তা হলে তো এই জায়গাটা মশাই বেনারসের ডাল কা মান্ডি হয়ে যাবে।''
''তোমার যেমন কথা, দাঁড়কাক গলা সাধলে কোকিল হবে! এই যে বিমলের মেয়ে রোজ সকালে গলা সেধে আমাদের পাড়া ছাড়া করার দাখিল, ওটা কি গলা! ও গলায় গান হবে! পাঁঠা কাটা গলা। সারা সকাল ব্যা ব্যা করছে, বললে ভৈরবী সাধছি। রসুলান বাঈয়ের ঘরানা। ভাবছি, একদিন গিয়ে কাঁঠালপাতা উপহার দিয়ে আসব, খাও মা, খেয়ে কিছুক্ষণ শান্ত থাকার চেষ্টা করো।''
''এ পাড়ার সুপ্রিয় যাই বলুন বেশ গাইছে, ওই একটা ছেলে উঠবে।''
''কোন আক্কেলে বললে?''
''ভরাট গলা, জমাট সুর, তেমনি সুন্দর চেহারা।''
''দাঁড়াও, দাঁড়াও, কী বললে, ভরাট গলা! ভরাট নয়, শ্লেষ্মা জড়ানো। ক্রনিক ব্রংকাইটিসে তোমার গলাও ওই রকম হবে। আর সুর! হাঁপানির টান। গলার কোনও রেঞ্জ আছে! সা টু সা। তারপরে যেন চড়াই পথে ঠেলা ঠেলছে, আউর থোড়া হেঁইও, বয়লার ফাটে হেঁইও। চড়ার রে, মনে হচ্ছে বাবারে, সুরের রে নয়। চড়ার মা যেন মৃত্যুযন্ত্রণা, আয় মা সাধন সমরে। আর রূপ! যেন হোয়াইট ওয়াশ করা কংস!''
''ওর গান আমার খুব ভালো লাগে। আমার রেকর্ড কোম্পানি থাকলে ক্যাসেট বের করতুম।''
''কোম্পানির তো দরকার নেই, বিশ হাজার টাকা আর ওকে নিয়ে সাউন্ড স্টুডিওতে চলে যাও। আজকাল সবাই যেমন করছে। ওই তো মঞ্জুলার ক্যাসেট বেরিয়েছে, মডার্ন সং। মনে হচ্ছে ভূতে গান গাইছে।''
''ও ছাড়ুন। সুপ্রিয়র নতুন কম্পোজিশনটা শুনলে আপনি মুগ্ধ হয়ে যাবেন :
গোলাপ যদি চাও/এই নাও
কাঁটা যদি চাও/এই নাও
গোলাপ আর কাঁটা পাশাপাশি
সাজাও, সাজাও/দুজনে বেশ আছি/
একটু রাগ, একটু অনুরাগ, একটু র্যাপ, মিলেমিশে ফ্যান্টাসটিক।''
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন