বাঁদর

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

বাঁদর সাম্রাজ্যের দলপতি দুটি বাঁদরকে শহরে পাঠালেন, 'দেখে আয় তো, মানুষ নাকি আমাদের চেয়ে বেশি বাঁদর হয়ে গেছে। কে তাদের গুরু? তিন মাসের মধ্যে আমি একটা রিপোর্ট চাই। বারাণসী, বৃন্দাবন, অযোধ্যা থেকে আমাদের ভায়েরা মাথা হেঁট করে, ল্যাজ গুটিয়ে চলে আসছে। হোয়াই?'

দুই বাঁদর লাফাতে লাফাতে শহরে চলে এল। বিরাট শহর। চওড়া চওড়া রাস্তা। বিশাল বিশাল বাড়ি। প্যাঁ পোঁ গাড়ির পর গাড়ি। চতুর্দিকে ফুটকড়াইয়ের মতো মানুষ। শব্দ, ধোঁয়া। সব বাঁদরকেই একরকম দেখতে তাই দলপতি দুজনকে চেনার জন্য একজনের ল্যাজ কেটে ছোটো করে দিয়েছেন। তার ফলে একজনের নাম হল 'ফুলটেল', আর একজনের নাম হল 'হাফটেল'। ডাক নাম হল 'ফুলু' আর 'হাপু'।

দুজনে বিরাট একটা বাড়ির কার্নিসে বসে আছে। ফুলু বললে, 'হাপু, খাওয়া-দাওয়ার কি হবে রে! সবই তো ইট, কাঠ, পাথর! ফল, মূল, কলা কিছুই তো নেই।'

'ভেবেছিলুম, এত বড় একটা ছাত, বড়িটড়ি দিয়ে রাখবে, গপাগপ খাব। জলের ট্যাঙ্ক আর লোহার পাইপ ছাড়া কিছুই নেই।'

'প্যান্ট পরা বউরা বড়ি দেয় না! চল, কোথাও মন্দির আছে কিনা দেখি। আমাদের ভরসা ভক্ত আর ভগবান!'

মন্দির মানে বিরাট মন্দির! কী কারুকার্য! মার্বেল পাথরে মোড়া। বন্দুকধারীরা মন্দিরটাকে ঘিরে রেখেছে। ভক্তরা ভয়ে ভয়ে গুটি গুটি ঢুকছে। তাদের হাত খালি। একজন পুজো সাজিয়ে এনেছিল। একজন প্রহরী কেড়ে নিল। খুব কাজিয়া হচ্ছে। ফুলু আর হাপু কথা কাটাকাটি থেকে যে-টুকু বুঝল, টেররিস্টরা যে-কোনো সময় 'ভক্তবোমা' পাঠাতে পারে। কোটি টাকা দামের মন্দির ধ্বংস হয়ে যাবে।

ভক্তদের জন্য একটা কাউন্টার খোলা হয়েছে, সেখানে একশো, পাঁচশো, হাজার, যা পার জমা দাও। একটা পেতলের চাকতি ধরিয়ে দেবে। তারপর জামা-কাপড় ধরে টানাটানি। মেটাল ডিটেক্টারের বিপ বিপ। তারপর একটা হলে ঢোকো। দরজায় বন্দুকধারী। সামনে একটা স্ক্রিন। সেই স্ক্রিনে ফুটে উঠবে দেবতার মূর্তি। ভজন হচ্ছে। প্রেম লাগাও, ভক্তি লাগাও, জ্ঞান দে দে ভগোয়ান।

হাপু বললে, 'ফুলু, এ কি রে ভাই! সব ভগবানের ছায়া দেখে বাড়ি ফিরছে।'

'আরে ভাই ভগবানকে কে কবে দেখেছে! ভগবান তো ছায়াই। বল, ছায়ার ছায়া দেখে বাড়ি ফিরছে। আমাদের পূর্বপুরুষ রামচন্দ্রজীর সঙ্গে বসে কলা খেয়েছে। আমাদের বরাতে কলাও নেই, রামও নেই।'

'চল তাহলে নদীর ধারে যাই। ঠান্ডা পানি খাই।'

নদীর ধারে যেতেই একটা লোক খুব খাতির করলে। এক ছড়া কলা দেখালে। সেই কলার লোভে এগোতেই দুজনে জলে পড়ে গেল। জল থেকে খাঁচায়। তারপর দেখলে তারা জাহাজে চেপেছে। শুনল জাহাজ যাচ্ছে আমেরিকায়। হাপু বললে, 'আহা! বাবা বেঁচে থাকলে কত খুশি হত! ছেলে আমেরিকায় যাচ্ছে।'

ফুলু বললে, 'কেন যাচ্ছি বল তো! আমরা তো ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ার নই।'

আমেরিকায় নিয়ে গিয়ে দুজনকে বিশাল একটা খাঁচা ঘরে রাখা হল। একজন বললে, দুটোকে ডজন ডজন মেক্সিকান কলা খাওয়া। ভারতের বাঁদর তো, আমেরিকার সাইজে আনতে হবে। সাতদিনের মধ্যেই ফুলু আর হাপু বেশ মোটা-সোটা হয়ে গেল। একজন দর্জি এসে মাপ নিয়ে গেল। তিন দিনের দিন প্যান্ট, কোট, টাই, টুপি চশমা পরে দুজনে পাক্কা সাহেব। ফুলু হাপুকে বললে, 'তোকে ঠিক প্রফেসারের মতো দেখাচ্ছে।'

হাপু বললে, 'তুই যেন ইংরিজি সিনেমার হিরো। কি ভাগ্য আমাদের! দেশের বাঁদরগুলো আর মানুষ হল না! কে এক সায়েব বলেছিল, বাঁদর থেকে মানুষ হয়।'

'কিস্যু জানে না। আমাদের দেশের পণ্ডিতরাই ঠিক! তাঁরা বলেন, গাধা পিটিয়ে ঘোড়া করা যায় না।'

'গাধাদের জন্য আমার ভীষণ দু:খ হয় রে। এত বছর হয়ে গেল কিছুতেই খাড়া হয়ে দাঁড়াতে শিখলে না। মুখটা দেখেছিস, একেবারে বোকা গাধার মতো। আর গলার স্বর! ওই গলায় ইংরিজি গানও হবে না।'

'ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিক্যাল, ধ্রুপদ, ধামার। গলায় বেশ জোয়াড়ি আছে।'

'সে থাক না। সুর নেই, স্কেল নেই। গাধাদের নিয়ে মহা সমস্যা। ইন্ডিয়া গাধা যদি আমেরিকায় আসে সেই একই গাধা। তফাত এই, ইন্ডিয়ায় জুটত ইন্ডিয়ান লাথি, আমেরিকায় এসে আমেরিকান লাথি। খাওয়া ফিরবে বরাত ফিরবে না।'

কথা থেমে গেল। কোথা থেকে দুটো সায়েব এল অনেক যন্ত্রপাতি নিয়ে। দুজনের মাথা ফুটো করে বোতামের মতো দুটো বস্তু ঢুকিয়ে দিল। মাথায় ফিট করে দিল দুটো টুপি। কোমরে বেঁধে দিল চওড়া বেল্ট। তারপর পরিয়ে দিল কোট-প্যান্ট। চোখে বেঁধে দিল চশমা। একজন বললে, 'ডিভাইসটা চেক করো।'

আর একজন কি করলে, দুজনে নাচতে লাগল। আবার কি করলে, দুজনে খাঁচার লোহা বেয়ে উঠতে লাগল। আর একটা কি করলে, দুজনে শুয়ে পড়ল। পরীক্ষক বললে, 'ব্রেন আন্ডার কন্ট্রোল। লেটস গো!'

একজন সন্দেহ প্রকাশ করলে, 'ব্রেন কন্ট্রোল করলেই হবে? মাইন্ডের কী হবে?'

'ব্রেনের কন্ট্রোলে মাইন্ড। মাইন্ডে একটা চিপস ঢুকিয়ে দিয়েছি। এইবার কম্যান্ড। ওরা হয়ে গেছে নাকি কম্যান্ডার।'

'অপারেশন স্টার্টস।'

হাপু আর ফুলু দুজনে দুটো দেড়শোতলা বাড়ির ছাতে গিয়ে উঠেছে। লাল টুপিতে লেখা 'এমার্জেনসি সার্ভিস', ব্যস্তসময়। গাড়ি, মানুষ সব ছুটছে। ফুলুর চোখের সামনে হাপু দ্রাম করে ফেটে গেল। বিপুল বিস্ফোরণ। ধাপে ধাপে সব ভেঙে ভেঙে পড়ছে। মিডিয়া প্রচার করছে—বাঁদর বোমা এক্সপ্লোডস।

সকল অধ্যায়
১.
টক ঝাল মিষ্টি
২.
ঘোরকলি
৩.
কেমন আছেন?
৪.
জীবন একটা বেয়াড়া ভাল্লুক
৫.
হতেছে পাগলের মেলা
৬.
সকাল
৭.
আশার কথা
৮.
আর বোলো না ভাই!
৯.
'পৃথিবীতে যত বেটা সব বেটা গোরু'
১০.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১১.
হাঁদা গঙ্গারাম
১২.
কে পরাবে সিঁদুর
১৩.
জীবনের জাতীয় সংগীত
১৪.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫.
বাস-মিনিবাসের লাইনে ঘোষ, বোস, মিত্তির
১৬.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৭.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৮.
বাঁদর
১৯.
কোরা কাগজ
২০.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
২১.
শান্তির সহজপাঠ
২২.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
২৩.
অনুসন্ধান
২৪.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
২৫.
প্রেমের শিকল
২৬.
বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
২৭.
ছদ্মবেশী
২৮.
প্রেম বাড়ছে
২৯.
হনুমান টুপি
৩০.
বারমুডা ট্র্যাঙ্গল
৩১.
আড়ং ধোলাই
৩২.
হেমন্তের সকাল
৩৩.
হাতপাখা
৩৪.
খেলা
৩৫.
সন্দেহ
৩৬.
পেটে খেলে পিঠে সয়
৩৭.
শেয়াল পণ্ডিতের পাঠশালা
৩৮.
আমার আছে তোমার নেই
৩৯.
ধ্যাততেরিকা সংসার
৪০.
মায়ার খেলা, মায়ের খেলা
৪১.
যে ট্রেনের কোনো ইস্টিশন নেই
৪২.
সুখের লাগিয়া
৪৩.
টেকনিক
৪৪.
বাপের চা
৪৫.
অনশন
৪৬.
এ চোর সে চোর নয়
৪৭.
পরনিন্দা পরচর্চা
৪৮.
অমর বাঙালি
৪৯.
পথের শেষ কোথায়!
৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
৫১.
পুজোর পাঁচালি
৫২.
আকাশ যখন ছবির মতো নীল
৫৩.
সংসার, শূন্য এক ছায়াবাজি
৫৪.
মারডালো
৫৫.
বড় সাধ ছিল
৫৬.
খোলকত্তাল
৫৭.
হিরের টুকরো
৫৮.
কোনওদিন শুনেছ, চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৫৯.
অধিকার করে অধিকারী হতে হয়
৬০.
কোথায় কী
৬১.
জীবন ও সাহিত্য
৬২.
শামা হর রঙ্গ মেঁ
৬৩.
যা ছিল, একদিন নেই হবে, যা ছিল না,তা একদিন আছে হবে, শেষ হবে না কিছুই
৬৪.
উলটোপাক
৬৫.
যুবক
৬৬.
কাজের সময় কাজি
৬৭.
সকাল সকাল ভোট দিন
৬৮.
শুভানুধ্যায়ী
৬৯.
ছাতা আর গামছার মাল্টিপারপাস ব্যবহার
৭০.
জোকার
৭১.
আসরটা যে করলে মাটি
৭২.
কাঠুরিয়া
৭৩.
মানুষ হয়ে মরতে চাই
৭৪.
উতলা দখিন বাতাসে
৭৫.
ভাঙলে কিছু গড়তে তো হবে
৭৬.
আতঙ্ক
৭৭.
নিগ্রহ
৭৮.
ছুটির সকাল
৭৯.
স্বপ্ন
৮০.
আয় কাটাকাটি করি
৮১.
কলকাতা—৩০০
৮২.
আপনি কার পেশেন্ট
৮৩.
শরৎকাল
৮৪.
পকেটমারি
৮৫.
দুর্বলের সংসার সবলের সন্ন্যাস
৮৬.
আমি ক্ষুদ্র প্রাণ এক
৮৭.
মন পাখিরে কৃষ্ণকথা বল
৮৮.
জন্ম যার কোলে মৃত্যুও তারই কোলে
৮৯.
কেউ যায় বাজারে পচা মাছ কিনতে,কেউ যায় এভারেস্টে উঠতে
৯০.
উঠে বোসো শালগ্রাম
৯১.
এইবার যাই কোথায়!
৯২.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
৯৩.
এসেছি কেঁদে, যাই যেন হেসে
৯৪.
নির্জনতায় আমরা ভয় পাই, সজনতায় বিরক্ত হই
৯৫.
নদী ডাকে, আয় চলে আয়
৯৬.
কেউ ঘুমোয় কেউ জাগে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%