সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
''এইবার বলুন, আপনাকে কত টাকা দিতে হবে? আমাদের পরিবার তো দেখলেন। অ্যাডাল্ট তিন জন, দুটো বাচ্চা।''
''দু-বেলা রাঁখতে হবে?''
''হ্যাঁ, দু-বেলা।''
''দেড় হাজার দেবেন। পুজোর সময় এক মাসের মাইনে বোনাস। কাপড় তো দেবেনই, বলার কিছু নেই। শীতের চাদর। রাত্তিরে ভাত না রুটি?''
''দুজনের ভাত, বাকি সবাই রুটি।''
''ক'খানা রুটি?''
''ধরুন কুড়ি খানা।''
''বাবা তিনজনে কুড়িখানা!''
''তিনজনে অ্যাভারেজে বারো খানা।''
''বাকি আটখানা?''
''বলছি। ওই যে ছোট মেয়েটা খুচখাচ কাজ করে, ও রাতে আটটার সময় বাড়ি চলে যায়। আটখানা রুটি আর তরকারি ওকে দিতে হয়।''
''তা হলে বড় তিনজন নয়, চারজন। সকালেও তো খাবে?''
''সকালে তো ভাত খাবে।''
''বা:, ভাতের হাঁড়ির ওজন তো বেড়ে যাবে। আনাজ বেশি কাটতে হবে। রুটির আটা মেয়েটা মেখে দেবে?''
''না। শুধু ফাইফরমাস। সেইরকমই চুক্তি।''
''লুচি, পরটার বায়নাক্কা আছে নাকি?''
''মাঝেমধ্যে।''
''তাহলে তো ছোলার ডালও আছে। ধোঁকার বাতিক?''
''রেয়ার। মাসে একবার কী দুবার।''
''মোচা। এঁচোড়, থোড়?''
''আছে।''
''বাবা, তেরোস্পর্শ! মাছ, চারা না কাটা পোনা?''
''বাচ্চাদের জন্য কাটা পোনা বাঁধা, পাশাপাশি বাটা, পারসে, পাবদা, ট্যাংরা, মৌরলা, পুঁটি, চিংড়ি, কাজরি।''
''অত খান কেন? সঞ্চয় করুন, সঞ্চয় করুন। গুচ্ছের খাওয়া একটা বদ অব্যাস। চা কি আমাকে করতে হবে?''
''সকালের চা টা তো করতেই হবে।''
''জলখাবার?''
''সকালের জলখাবার।''
''ফিরিস্তি বেড়েই চলেছে। আত্মীয়স্বজনদের আসার হিড়িক আছে?''
''তা তো আছেই।''
''মাসে ক'বার?''
''ওই দুবার, গরমের ছুটি, পুজোর ছুটি।''
''ক'জন?''
''চার-পাঁচ জন। আর মাঝে মাঝে মেয়ে আসতে পারে শ্বশুরবাড়ি থেকে।''
''ক'টা মাথা?''
''বড় মাথা একটা, ছোট মাথা দুটো।''
''তা হলে দু'হাজার।''
''দু'হাজার?''
''শুনুন সকালে আমি তিন বাড়িতে রাঁধি। ভোর পাঁচটায় যে বাড়িতে ঢুকি, স্বামী-স্ত্রী দু'জনেই কাজ করে আর একটা বুড়ি।''
''বুড়ি মানে?''
''বুড়ি মানে ছেলের মা। সে বিশেষ কিছু খায় না, খালি ওষুধ খায়। রান্নার মধ্যে এক তরকারি, ডাল, ভাত। ঝপাঝপ দু'বেলার রান্না শেষ করে বেরিয়ে এসেই দ্বিতীয় বাড়ি। এই বাড়িটা ছেড়ে দেব। ভীষণ খিটখিটে। ছেলের বউটা খাণ্ডারনি। একমাস হল এসেছে। শ্বশুরবাড়ি থেকে একটা কুকুর এনেছে, আমাকে দেখলেই গ-ড়-ড়, গ-ড়-ড়। বউ বলে, কুকুর বুঝতে পারে কার কেমন চরিত্তির। ওই বাড়িটার জায়গায় এই বাড়িটায় ঢুকব।''
''ক'টায় ঢুকবেন?''
''সাতটায়।''
''বেরোবেন ক'টায়?''
''সাড়ে আটটায়।''
''দেড় ঘণ্টায় সব হয়ে যাবে?''
''সব আবার কী! এসেই এক ফ্লাস্ক লিকার করে এক পাশে ঠেলে রেখে দেব। যে খায় খাবে। তারপর দুটো গ্যাস চড়া করে জ্বেলে, ঝপাঝপ একটায় ভাত, একটায় ডাল। তারপর ছ্যাঁক-ছোঁক মাঝের ঝাল। আউট। বাকি সব ভিরকুটির রান্না নিজেরা করে নেবেন। সারাটা দিন পড়ে আছে।''
''একটুও প্রেম নেই?''
''আমি তো প্রেম করতে আসিনি। রাঁধতে এসেছি। আজকাল বিয়ে করা বউতেই প্রেম থাকে না, স্বামীগুলোও সব মাকাল ফল।''
''এক হাজারে হয় না!''
''তা হলে দু'হাজার পড়ে যাবে।''
''কী রকম।''
''পনেরো দিন আসব, পনেরো দিন আসব না। ইনকিলাব জিন্দাবাদ!''
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন