সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
'তুমি কেমন মানুষ?'
'বিশ্বাসযোগ্য নই। কেউ আমাকে বিশ্বাস করলে ঠকবে।'
'বিশ্বাস করে টাকা গচ্ছিত রাখলে মেরে দেবে?'
'না, তা করব না, তবে খরচ করে ফেলব। চাইলে বলব, কয়েক দিন অপেক্ষা করো ভাই। বিপদে পড়ে খরচ করে ফেলেছি। এই ঋণ শোধ হতেও পারে, নাও পারে। অর্থ আর নারী এই দুটো ব্যাপারে এখনও স্বাবলম্বী হতে পারিনি। কিঞ্চিৎ টলমলে আছি।'
'অন্যদিকে?'
'যদি কেউ মনে করে থাকেন বিপদে তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়াব, তা হলে খুব ভুল করবেন। এই সব ব্যাপারে আমি আমার বউয়ের নির্দেশে চলি। এই পৃথিবীর হিসেব-নিকেশ সে যেমন বোঝে আমি তা কিছুই বুঝি না। ভীষণ প্র্যাকটিক্যাল। হবেই তো! উকিলের মেয়ে। লোকে বলে, গাঁটে গাঁটে বুদ্ধি, ওর ব্লাডে ব্লাডে বুদ্ধি।'
'দু-একটা উদাহরণ?'
'যেমন ধরো আমার মায়ের ক্যানসার হল। মা বলে কথা, আমার গর্ভধারিণী। বিবেক। ঢালাও চিকিৎসা। বউ বললে, হচ্ছেটা কী? লোককে দেখাতে চাইছ— মাতৃভক্ত ছেলে। তোমার দুটো ছেলে, ছেলের মা না খেয়ে মরুক, সেই ব্যবস্থাই করতে চাইছ?'
আমি বললুম, 'তার মানে?'
'মানে অতি সহজ। তুমি কত টাকার মালিক?'
'টাকার ভয়ে পেছিয়ে যাব?'
'মায়ের বয়েস কত?'
'সত্তর।'
'আমাদের বড়টার বয়স?'
'সাত।'
'সত্তরকে আরও কয়েক বছর টানার জন্য সাতটাকে জলে ফেলে দেবে?'
'তা হলে কী করব?'
'হোমিয়োপ্যাথি। যন্ত্রণা কমাবার ওষুধ আছে। অনেক বছর বেঁচেছেন। যথেষ্ট হয়েছে, আর বাঁচার দরকার নেই। শরীরটা পালটে আসতে দাও।'
'মর্যাল সাপোর্ট পাচ্ছি না!'
'পাইয়ে দিচ্ছি। আমার মা আমার বাবার মাকে বৃন্দাবন ছাড়া করিয়েছিলেন। খুব কায়দা করে। যাও মা, শেষ বয়সে তীর্থ করে এসো। যাওয়ার সময় ঠাম্মা আমার মায়ের গাল টিপে আদর করলেন, আহা! এমন বউমা ক'জনের হয় গো!'
'তারপর?'
'ঠাম্মার 'নো ট্রেস'। রটিয়ে দেওয়া হল, তিনি সাধিকা হয়ে গিয়েছেন। সবাই এসে আমাকে বাবাকে ঢিসঢিস প্রণাম—কত বড় সাধিকার ছেলে আপনি। আমার বাবার বাবা তাঁর মাকে কাশীর বাঙালিটোলার গলিতে বেড়াল ছাড়ার মতো ছেড়ে দিয়ে এসেছিলেন।'
'তা, তুমি তোমার বউয়ের কথা শুনলে?'
'অবশ্যই! সে বললে, এই ইতিহাস মুছে দিতে হবে। যত টাকাই খরচ হোক আমাদের মায়ের চিকিৎসা হবে। নাতি দুটো বড় হবে। তিনি দেখবেন। খাটে শুয়ে গল্প বলবেন। বউমা বলে আমাকে ডাকবেন। মা বলে তুমি কোলে ঝাঁপিয়ে পড়বে। গন্ডায় গন্ডায় বউ পাওয়া যায়, মা সেই একটা।'
'শেষপর্যন্ত কী হল?'
'আজ দশ বছর হয়ে গেল, মাকে আমরা টেনে ধরে রেখেছি। এই তো আমরা সবাই মিলে পুরী ঘুরে এলুম। সাগরের আনন্দ নিয়ে ফিরে এলুম।'
'তা হলে অমন সাসপেন্স তৈরি করলে কেন?'
'আমার বউ আমাকে চেনে। আমার চিন্তাটাই আমার দিকে ছুড়ে দিয়েছিল প্রথমে। আমি সাতদিন ধরে ওইরকমই ভাবছিলুম। অনেক বিশেষজ্ঞের সঙ্গে, ভুক্তভোগীর সঙ্গে আলোচনা করে খুব আশান্বিত হয়েছিলুম। মৃত্যু অবধারিত। আমাদের ফ্যামিলিও মজার ফ্যামিলি। বড়দা কেরিয়ারে যত রাইজ করতে লাগল, মনের দিক থেকে ততই ছোট হতে লাগল। ঝকঝকে নতুন বাড়ি করে বউকে নিয়ে আলাদা হয়ে গেল। বাবার চিকিৎসায় একটা টাকাও ঠেকালে না। শ্রাদ্ধেও এল না। সপরিবারে ইউরোপ ভ্রমণে চলে গেল।'
'তোমার কোনো পরিবর্তন হল?'
'বোধ হয় হল। ভিতরের জট খুলে গেল। মাকে সেবা করতে করতে অন্ধকার ঘরে আলো জ্বলল। আমার জামাইবাবু বড় প্রতিষ্ঠানে বড় পোস্টে ছিলেন। সেটি উঠে গেল। শুরু হল অভাব। ভাগ্নেটা আমাদের কাছে মানুষ হচ্ছে। তিনটে নাতিকে নিয়ে মা এখন মহা খুশি।
'এখন তোমার কেমন লাগছে?'
'একটা আলো বাতাসঅলা বড় ঘরে ঢুকে পড়লে যেমন লাগে সেইরকম লাগছে। ধূপের গন্ধ, আরতির বাদ্য, প্রার্থনার মন্ত্র। বেঁচে থাকার বিশ্রি ভয়টা কেটে গিয়েছে। শুধু মায়ের ক্যানসার নয় আমার ক্যানসারও সেরে গেল।'
'আপনারে যবে করিয়া কৃপণ কোণে পড়ে থাকে দীনহীন মন। দুয়ার খুলিয়া, হে উদারনাথ, রাজসমারোহে এসো।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন