সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
এই ভাদ্র মাস এলেই আজও আকাশে বাতাসে খুঁজতে থাকি, শরৎ তুমি কোথায়! আকাশ ধুয়ে গাঢ় নীল কি বের করেছ! ভাসিয়েছ কি সাদা মেঘের ভেলা! ছেলেবেলাটা ফিরে আসে। আমাদের সময় মানুষের একটা নিষ্পাপ ছেলেবেলা ছিল। একালে সেটা নেই। সকাল থেকে সন্ধে—ক্যারিয়ার বানাও ভাই, ক্যারিয়ার বানাও। সব মানুষ হঠাৎ এমন বিষয়ী হয়ে গেল কেন? কোথায় গেল বাঙালির মন।
ঘাসে ঢাকা সবুজ মাঠে পা রাখার আনন্দ। অন্তরালে রয়েছে ধরা বিদায়ী বর্ষার জল। সে যেন আধেক ঘুমে নয়ন চুমে। তলা থেকে উঠছে। ঈষৎ উষ্ণ, শীতল অদ্ভুত এক অনুভূতি। আকাশে নেমে এসেছে কিনারায় কিনারায়। হাতির মতো মাথা তুলছে ফাঁপা, সাদা মেঘ। পরীক্ষা, পড়া, প্রতিযোগিতা ও যা হবার তা হবে। ভবিষ্যতে খেতে পাবো কি না দেখা যাবে। গুরুজনদের তিরস্কার কাগজের গুলি। আইসিএস, আইএএস হলে কী হয়! শরতের মেঘের মতো এমন নির্ভার শৈশব পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে গাওয়া যায়,
আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা রে ভাই, লুকোচুরি খেলা-
নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা রে ভাই-লুকোচুরি খেলা।।
অক্ষরের জগতের বাইরে কি অসাধারণ এক নিরক্ষর জগৎ ছড়িয়ে রয়েছে।
ইট বের করা পাঁচিল। জায়গায় জায়গায় খাবলা। লাল সুরকি ঝরে আছে। ঝুলে আছে মাধবীলতা। ঝুমকো ঝুমকো সরল পাপড়ির থোকা থোকা ফুল। হলুদ গোঁফ লাগানো নিরেট ভ্রমরের মধু আহরণের উন্মত্ততা। হাঁ করে তাকিয়ে আছে বালক। কালো এক টুকরো পাথর ছোট্ট দুটো ডানার জোরে কি চঞ্চল! এ কে! কোথায় থাকে! কার সৃষ্টি! বালকের প্রশ্ন। উত্তর সে চায় না। প্রশ্নের বিস্ময়টাই থাক। সমাধানে ঘোর কেটে যায়।
পাঁচিলের অন্তরালে, খাড়াখাড়া দেবদারু, ঢ্যাঙা মাথাভারী বটল পাম। নতুন পাতার সোনালি পতাকা। বাতাসে দুলছে। একটি বাড়ি। একদা খুব সম্পন্ন ছিল, সে হয় তো ওই শতাব্দীতে। বালকের সে ইতিহাসে প্রয়োজন নেই। ইতিহাস বড় বিষয়ী। ছিল অথচ নেই এই মন কেমন করা ভাবটা ইতিহাসের চেয়েও দামি।
বিশাল লোহার গেট। একটা পাটি ভেঙে, হেলে আছে, ধরাশায়ী হয়নি। লাল সুরকির পথ। দু'ধারের কেয়ারি নেই। নানা আগাছা। নানা রঙের মিচকে প্রজাপতি হোমিওপ্যাথিক ওষুধের পুরিয়ার মতো উড়ছে। ডানপাশে পড়ে আছে ঘোড়ার গাড়ির একটা ভাঙা খাঁচা। আস্তাবলে ডাঁই হয়ে আছে ঘোড়ার বদলে গুচ্ছের ভাঙাচোরা জিনিস। ঘোড়ার সাজটা একপাশে। ছাতা ধরে গেছে। সামনে বর্ষা সবুজ ঘাসে ঢাকা জমি। ঘন নীল আকাশ। ঝকঝকে রোদ। তারই একটা আভা কৌতূহলী বালকের মতো আস্তাবলের ভেতর উঁকি মারার চেষ্টা করছে। একটা ইজেল, গোটাকতক বিধ্বস্ত ক্যানভাস। এক সময় এই বাগান বাড়িতে বড় এক শিল্পী বাস করতেন। শৈশবে আমরা তাঁকে দেখেছি। বড় বড় চুল। টানা টানা চোখ, সরু সরু আঙুল। লম্বা লম্বা তুলি দিয়ে তেল রঙে ছবি আঁকতেন। কাটা ঘুড়ির পেছনে ছুটতে ছুটতে কখনো এই বাগানে ঢুকে পড়লে থমকে যেতে হত। কাটা ঘুড়ির কথা স্মরণে থাকত না। গাছের তলায় নীল ছায়ায় ঘাসের ওপর সাদা তোয়ালে। তার ওপর নানা মাপের তুলি, রঙের টিউব, প্যালেট। ইজেলে ক্যানভাস। ছবি ফুটছে। তিনি আমাদের চকোলেট দিতেন। বলতেন আর্টিস্ট হবি!
এইকাল সেইকালের ওপর প্রতিশোধ নিয়েছে। বাস্তবের পাথর ছুড়ে কল্পনার কাচের ঘর চুরমার করে দিয়েছে! এখন, একটি জরাজীর্ণ ইমারত। চাবিবন্ধ ঘরের পর ঘর। টানা লম্বা বারান্দায় বেতের চেয়ার, সোফার কঙ্কাল। পুরু ধুলো, ঝরা পাতা। এক জোড়া ছেঁড়া পাদুকা। একজন বিরাট খাঁচার বৃদ্ধ শেষ বাসিন্দা। যেন রাজা ক্যানিউট। গলায় তাঁর রুদ্রাক্ষের মালা। পুড়ে যাওয়া ফর্সা রঙ। সময়ের শেষ প্রহরী।
শরৎকে খুঁজতে এই দীপ্র ভাদ্রে অতীতের আকর্ষণে এখানে আসি। অতীত সেই প্রেমিকা যে, 'চমকে বেড়ায়, দৃষ্টি এড়ায়, যায় না তারে বাঁধা/সে-যে নাগাল পেলে পালায় ঠেলে, লাগায় চোখে ধাঁধা'/তবু আমি, 'ছুটব পিছে মিছে মিছে পাই বা নাহি পাই/আমি আপন-মনে মাঠে বনে উধাও হয়ে ধাই।।' খুঁজতে গিয়ে দেখি সব হারিয়ে গেছে। বাল্যের সঙ্গীরা নেই কেউ। নেই সেই কলরোল। শ্যাওলাধরা কিছু প্রাচীন গাছ। গুঁড়িতে বেড় দিয়ে উঠেছে মানিপ্ল্যান্ট। বিশাল বিশাল পাতা। সপসপে জমি। ঝরাপাতার পচা স্তূপ। শামুকের দঙ্গল। অসুস্থ জবা আর কাঞ্চন। আকন্দ, ধুতরো। পেছনের জীর্ণ মন্দিরে দেবতা নেই। বেদিটা আছে। চূড়ার ধ্বজা ভেঙে পড়ে আছে। এই বাড়ি থেকে এক সময় রথ বেরতো। চাকা দুটো পড়ে আছে একপাশে।
নির্জন বিষণ্ণ ছায়ায় বসে স্কুল শিক্ষকের মতো রোলকল করি—আশুতোষ সাহা! উত্তর আসে মহাকালের ক্লাসরুম থেকে। চির অনুপস্থিত স্যার! প্রবাল বসু, চির অনুপস্থিত স্যার! কুঞ্জ, বিধান, নগেন, নরেন, শৈবাল, সুরেন! কেউ আসেনি স্যার! আসবেও না কোনোদিন। সবাই গেছে চলে, একটি মাধবী শুধু ...।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়! কৈশোর থেকে যৌবনে পা রাখার সেই রোমান্টিক বয়সে তিনি ছিলেন আমাদের গানের রাজা। শরতের দ্বিপ্রহরে প্রাণ যখন অকারণে আনচান, বান্ধবী একজন, একটি গোলাপ, হৃদয়ের হৃদয় উপহার, মিলন ছাড়াই বিরহের উত্তাপ, ছিল না কেউ, তবু মনে হওয়া, ছিল কিন্তু নেই, তখন সেই ভরাট আর দরাজ গলার ভাদ্রের নীল, ভাদ্রের রোদ, ভাদ্রের আর্দ্রতামাখা গান, কতদিন পরে এলে একটু বোসো।
গানের রাজা নেই। কণ্ঠ ধরা আছে যন্ত্রে। যেই বাজে ফিরে যাই যৌবনে। গিয়ে দেখি, ভাবনা সব পড়ে আছে, কল্পনার মৃতস্তূপ, আয়ুর ঝরাপাতা, স্বপ্নের ছাই, প্রিয়জনের নির্বাপিত চিতা। ছোট্ট ফোকর দিয়ে অনুসন্ধানী সরীসৃপের মতো ফেলে আসা অন্তরালের সেই অঙ্গনে বসে শুনি, আর এক রাজা রবীন্দ্রনাথ গাইছেন,
আঁধার রাতে একলা পাগল যায় কেঁদে।
বলে শুধু বুঝিয়ে দে, বুঝিয়ে দে, বুঝিয়ে দে।।
দেবব্রত গাইছেন, আকাশ ভরা সূর্যতারা। ময়দানের সবুজ ঘাসে আমাদের দল। কলেজের ছাত্র তখন। পৃথিবীটাকে উলটো চাকায় ঘুরিয়ে দিতে পারি এমন আত্মবিশ্বাস। শীত শীত সন্ধ্যা। আমাদের সম্রাট মঞ্চে। দরাজ দৃপ্ত গলায়, বিশ্বভরা প্রাণ, তাহারি মাঝখানে আমাদের পুলকিত অবস্থান। বাস্তবের পাথরে হোঁচট খেয়ে স্বপ্ন তখনো ভাঙেনি। বন্ধুর মতো মানুষ, প্রেমিকার মতো নারী, মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী পথপ্রদর্শক। কেন ল্যাং মারবে, কেন টেনে ধরবে, কেন প্রবঞ্চনা করবে, কেন বাড়াভাতে ছাই দেবে। গৃহে পাতা আছে শয্যা। আছে স্নেহের সরোবর। কোথাও কোনও অলিন্দে আছে আমারই ধ্যানে মগ্ন প্রেমিকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরোলেই চাকরি। তারপরে মালা, সানাই। তারপরে, 'উড়াব ঊর্র্ধ্বে প্রেমের নিশান দুর্গমপথমাঝে/দুর্দম বেগে দু:সহতম কাজে/রুক্ষ দিনের দু:খ পাই তো পাব/চাই না শান্তি, সান্ত্বনা নাহি চাব/পাড়ি দিতে নদী হল ভাঙে যদি, ছিন্ন পালের কাছি, মৃত্যুর মুখে দাঁড়ায়ে জানিব তুমি আছ আমি আছি।।''
সব শেষ হয়ে যাবার পর, দিনের শেষে বোঝা গেছে, রবীন্দ্রনাথের এই তুমি কোনো মানুষ নয়। এই তুমি হলেন তিনি। তিনি আছেন। আছেন কোথায়! আমার আমিতে। তুমি আছ আমি আছি নয়, আমি আছি আমি আছি। আর কেউ নেই।
মা যেমন বলতেন, কোথায় গেলি? আমি বলি, কোথায় গেলি খোকা! আয়! ভাদ্র এসেছে। ভরা নদী মেঘের পাল তুলে ভেসে চলেছে। কাশের চামর উড়িয়ে। আয়! বিশ্বকর্মা। ঘুড়ি। গুঁড়ো কাচ, লাগা মাঞ্জা। লাটাইটা বের কর খুঁজে।
রান্নাঘরের ফোকরে থাকত লাটাই। খাটের তলায় ঘুড়ি থাক থাক। গুঁড়ি মেরে খোঁজার চেষ্টা করতে গিয়ে হাসি, পাগল! আকাশ আছে, বাতাস আছে, ঘুড়ি আছে, নেই সেই বালক। সেই দরজা খুলে বেরিয়ে গেছে। হাঁটতে হাঁটতে, হাঁটতে হাঁটতে যুবক। পাকতে পাকতে প্রৌঢ়।
কোই হ্যায়!
কেউ নেই। ভিড় আছে, চিৎকার আছে, কথা আছে, অভিনয় আছে, ধাপ্পা আছে, বুজরুকি আছে। একটা মানুষের একটা ছায়া নেই। ভিড় থেকে আলাদা, যে এসে পাশে বসবে, বলবে, জগতের জন্য নয় তোমার জন্য আমি। সেই আপনজন!
এই আপনজনের 'মিথটা' কোনোদিন ভাঙতে নেই। এইটাই কবিতা, এইটাই রূপকথা। শিশুর কাছে সবাই আপন, তাই তার জগৎ সুন্দর। প্রৌঢ়ের যোগ বিয়োগ গুণ ভাগে সবাই পর, তাই তার জগৎ বিষণ্ণ। শিশু তাই শতদল, প্রৌঢ় একটা শুকনো ফুল। বৃদ্ধ নাট্যাচার্য শিশিরবাবুকে বন্ধু জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছে! তিনি বসেছিলেন, ঊরুতে হাতের তাল দিয়ে বললেন, 'এখন শুধু ঝরতে বাকি, মরতে বাকি।'
শিশুকে সাবধানে লালন করো। ধন, জন, অর্থ নয়, কর্কশ পৃথিবীর সমস্ত ঘর্ষণ থেকে তাকে রক্ষা করো। বেঁচে থাকার বিস্ময়টা যেন শেষপর্যন্ত থাকে। আকাশভরা সূর্যতারার বিস্ময়! বিশ্বভরা প্রাণের বিস্ময়! 'ঘাসে ঘাসে পা ফেলেছি বনের পথে যেতে,/ফুলের গন্ধে চমক লেগে উঠেছে মন মেতে, /ছড়িয়ে আছে আনন্দেরই দান,/ বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান।'
'কী খুঁজছ! তুমি?' সামনের রকে দীর্ঘদেহী রাজা ক্যানিউট, 'কী খুঁজছ গাঁদালপাতা!'
'আজ্ঞে না, একটা শিউলি গাছ ছিল। সাতচল্লিশ সালে আমরা ভোরবেলা ফুল কুড়োতে আসতুম।'
'পঞ্চাশ বছর আগে! আছে। গাছটা আছে এখনো। পেছন দিকে চলে যাও।'
গাছ এখন প্রায় বৃক্ষ। গুঁড়ি আর কাণ্ডে সময় আর ঋতুর ক্ষতচিহ্ন। ক্ষুদ্র প্রাণীদের অফুরন্ত অনাচারের সহনশীলতা। গাছ কাঁদে না, ছুটে পালায় না। সহ্য করে। সহ্যই ফুল হয়, ফোটার আনন্দই সুবাসে ছড়ায়, সাধনার বিভূতিই রেণু, পরাগ। গায়ে হাত রেখে মৃদু গলায় বললুম, 'কি গো দিদি!'
গাছ বললে, 'আর সব কোথায়! সেই যে তারা!'
'সন্ধান নেই। ঝরে গেছে নয় তো হারিয়ে গেছে। ফুল যে দেখি ফুটিয়েছ। বিছিয়েছ?'
'ফোটাব না! শরতের কথা ফেলি কেমন করে। সে যে একা আসে না, মাকে নিয়ে আসে!'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন