বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

সেকালের ডাকাতদের কোনও তুলনা একালে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সকালে জমিদার, রাত্তিরে ডাকাত। আমার মেসোমশাই যথেষ্ট ধনী ছিলেন। হরেকরকম ব্যাবসা করে এত টাকা করে ফেললেন, যে ডাকাতদের লিস্টে নাম উঠে গেল। মাসিমা অনেকবার সাবধান করেছিলেন, আর যা-ই করো বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না।

মেসোমশাই করুণ গলায় বলেছিলেন, 'আমি কি ইচ্ছে করে হচ্ছি! জোয়ারের জলের মতো টাকা এলে আমি কী করব! টাকায় আমার অরুচি ধরে গেছে।' যাতে হাত দিচ্ছে সেটাই লেগে যাচ্ছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, 'ভাইরে! একেই বলে কপাল!' ডাকাতের চিঠি এল!

প্রিয় ব্রজবাবু আগামী বুধবার আমরা আপনার অতিথি হব। তা জনা-পঞ্চাশ। মায়ের পুজো সেরে বেরোতে বেরোতে মধ্য রাত হবে। এর আগে সাধারণত আমরা কোথাও যাই না। ফুলকো ফুলকো লুচি আর পাঁঠার মাংসের ব্যবস্থা রাখবেন। চার পাঁচ রকমের ভালো মিষ্টি অবশ্যই। মঙ্গলবার যে-কোনও সময় আমাদের একজন যাবে একটা সাইন বোর্ড নিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির বাইরে ঝুলিয়ে দেবেন। আপনার সম্মান বাড়বে। আমরা যেখানে সেখানে ডাকাতি করি না। আমাদের দল, এক নম্বর বনেদি দল। আমরা তিন পুরুষে ডাকাত। কোনও ভেজাল নেই। মায়ের দিকে তিন পুরুষ বাপের দিকেও তিন পুরুষ। একমাত্র আমাদের দলেই সাতটা 'মসার' পিস্তল। দশটা গাদা বন্দুক আছে। আমরা অন্য দলের মতো মরচে ধরা তরোয়াল, টিনের প্যাতপ্যাতে খাঁড়া, পাকা বাঁশের লাঠি, এসব ব্যবহার করি না। রণপা-র প্রয়োজন হয় না। ও-সব ভড়ং। সার্কাস। নিকৃষ্ট ডাকাতেরা ব্যবহার করে। আমরা রেজিস্টার্ড। পুলিশকে নিয়মিত চাঁদা দি। কমসে কম দুশো মেয়ের ভালো পাত্রে বিয়ে দিয়েছি নিজে বসে থেকে। হাজার বিধবাকে কাশী, বৃন্দাবনে পাঠিয়েছি। নিয়মিত মাসোহারা পায়। আমার পূর্বপুরুষেরা ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে নরবলি দিত। হিংসা আমি সহ্য করতে পারি না, তাই কুমড়ো বলি দি। আমার স্ত্রী পরে ছক্কা রেঁধে মহাপ্রসাদ হিসেবে বাড়ি-বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসে।

আমাদের বাড়িতে দোল-দুর্গোৎসব সবই হয়। নিত্য দরিদ্রনারায়ণ সেবা! ইতি বিনীত বিশ্বনাথবাবু।

চিঠিটা পাওয়ার পর পাড়াসুদ্ধ লোকের সে কী আনন্দ—ব্রজ, এতদিন তুমি একটা বড়লোকই ছিলে, আজ তুমি জাতে উঠলে। ব্রাহ্মণ সন্তানের যেমন পৈতে হয়।

প্রায় তিন বিঘে জমির উপর চক মেলানো বাড়ি। দু'খানা পুকুর। আম, জাম, লিচু, সবেদা, কাঁঠাল গাছ। অনেকটা ফাঁকা জায়গা। সেখানে ম্যারাপ বাঁধা হল। বিশ্বনাথবাবু বসবেন। কার্পেট ঢাকা মঞ্চ। রুপোর নল লাগানো ফর্সি। অম্বুরি তামাক। সাদা পাগড়ি মাথায়। মেসোমশাইয়ের কর্মচারীর দল। গোরা ব্যান্ড এসেছে। ভিয়েন বসেছে। বিরাট বিরাট সাইজের ডাকাতি লাড্ডু তৈরি হচ্ছে। যেন মেসোমশাইয়ের মেয়ের বিয়ে।

সকাল থেকেই উদ্বেগ। বিশ্বনাথ ডাকাতবাবুর সাইনবোর্ড তো এল না। সাইনবোর্ডে লেখা থাকবে, 'বিশ্বনাথবাবু কৃপা করেছেন'। এল না কেন! 'কৃপাবোর্ড' এল না কেন? সকলের মুখে মুখে একই উদ্বেগ। ডাকাতেরা যে আসছে, তার আবার সিগন্যাল ছিল। দূরে রাতের আকাশ ফুঁড়ে পর পর তিনটে তারাবাজি উঠে ফুল ছড়াবে। তিনখানা আগুনে-মালা আকাশ পথে দুলতে দুলতে যে বাড়িতে ডাকাতি হবে, সেই বাড়ির দিকে এগিয়ে আসবে।

সূর্য ডুবতে না ডুবতেই চারপাশ আলোয় আলো। সবাই উৎসবের সাজে সেজে উঠল। মেয়েদের মাথায় বড় বড় খোঁপা। গলায় চিকচিকে সোনার হার। রঙ-বেরঙের শাড়ি। মেসোমশাই পরেছেন চুনট করা ফরাসডাঙার ধুতি। গিলে করা আদ্দির পাঞ্জাবি। হাতে দুলছে মোষের শিঙের স্টিক। গোঁফে আতর। রাত আটটার সময় রব উঠল, আসছে, আসছে, ঘোড়া আসছে, কৃপা আসছে। এল একটা চিঠি। প্রিয় ব্রজবাবু, আমাদের ভুল হয়েছে। আপনারই গ্রামের স্বরূপ দামোদরবাবু আবেদন করেছেন, তিনি আপনার চেয়ে ঢের বড়লোক। তাঁর কাছে বাদশাহি মোহর আছে, যা আপনার নেই। আমি দু:খিত। ইতি,

মেসোমশাই হাত থেকে ছড়ি ছুড়ে ফেলে দিয়ে বললেন, 'আমি মামলা করব।' সব গল্পেই যেমন হয়, মধুরেণ সমাপয়েৎ। প্রবীণদের পরামর্শে মেসোর বড় মেয়ে চম্পার সঙ্গে দক্ষিণপাড়ার বিশ্বনাথের বিয়ে হল ওই রাতে। তিনি ডাক্তার, নাম-করা ডাকাতের বদলে ডাকতার এল ঘরে।

সকল অধ্যায়
১.
টক ঝাল মিষ্টি
২.
ঘোরকলি
৩.
কেমন আছেন?
৪.
জীবন একটা বেয়াড়া ভাল্লুক
৫.
হতেছে পাগলের মেলা
৬.
সকাল
৭.
আশার কথা
৮.
আর বোলো না ভাই!
৯.
'পৃথিবীতে যত বেটা সব বেটা গোরু'
১০.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১১.
হাঁদা গঙ্গারাম
১২.
কে পরাবে সিঁদুর
১৩.
জীবনের জাতীয় সংগীত
১৪.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫.
বাস-মিনিবাসের লাইনে ঘোষ, বোস, মিত্তির
১৬.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৭.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৮.
বাঁদর
১৯.
কোরা কাগজ
২০.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
২১.
শান্তির সহজপাঠ
২২.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
২৩.
অনুসন্ধান
২৪.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
২৫.
প্রেমের শিকল
২৬.
বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
২৭.
ছদ্মবেশী
২৮.
প্রেম বাড়ছে
২৯.
হনুমান টুপি
৩০.
বারমুডা ট্র্যাঙ্গল
৩১.
আড়ং ধোলাই
৩২.
হেমন্তের সকাল
৩৩.
হাতপাখা
৩৪.
খেলা
৩৫.
সন্দেহ
৩৬.
পেটে খেলে পিঠে সয়
৩৭.
শেয়াল পণ্ডিতের পাঠশালা
৩৮.
আমার আছে তোমার নেই
৩৯.
ধ্যাততেরিকা সংসার
৪০.
মায়ার খেলা, মায়ের খেলা
৪১.
যে ট্রেনের কোনো ইস্টিশন নেই
৪২.
সুখের লাগিয়া
৪৩.
টেকনিক
৪৪.
বাপের চা
৪৫.
অনশন
৪৬.
এ চোর সে চোর নয়
৪৭.
পরনিন্দা পরচর্চা
৪৮.
অমর বাঙালি
৪৯.
পথের শেষ কোথায়!
৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
৫১.
পুজোর পাঁচালি
৫২.
আকাশ যখন ছবির মতো নীল
৫৩.
সংসার, শূন্য এক ছায়াবাজি
৫৪.
মারডালো
৫৫.
বড় সাধ ছিল
৫৬.
খোলকত্তাল
৫৭.
হিরের টুকরো
৫৮.
কোনওদিন শুনেছ, চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৫৯.
অধিকার করে অধিকারী হতে হয়
৬০.
কোথায় কী
৬১.
জীবন ও সাহিত্য
৬২.
শামা হর রঙ্গ মেঁ
৬৩.
যা ছিল, একদিন নেই হবে, যা ছিল না,তা একদিন আছে হবে, শেষ হবে না কিছুই
৬৪.
উলটোপাক
৬৫.
যুবক
৬৬.
কাজের সময় কাজি
৬৭.
সকাল সকাল ভোট দিন
৬৮.
শুভানুধ্যায়ী
৬৯.
ছাতা আর গামছার মাল্টিপারপাস ব্যবহার
৭০.
জোকার
৭১.
আসরটা যে করলে মাটি
৭২.
কাঠুরিয়া
৭৩.
মানুষ হয়ে মরতে চাই
৭৪.
উতলা দখিন বাতাসে
৭৫.
ভাঙলে কিছু গড়তে তো হবে
৭৬.
আতঙ্ক
৭৭.
নিগ্রহ
৭৮.
ছুটির সকাল
৭৯.
স্বপ্ন
৮০.
আয় কাটাকাটি করি
৮১.
কলকাতা—৩০০
৮২.
আপনি কার পেশেন্ট
৮৩.
শরৎকাল
৮৪.
পকেটমারি
৮৫.
দুর্বলের সংসার সবলের সন্ন্যাস
৮৬.
আমি ক্ষুদ্র প্রাণ এক
৮৭.
মন পাখিরে কৃষ্ণকথা বল
৮৮.
জন্ম যার কোলে মৃত্যুও তারই কোলে
৮৯.
কেউ যায় বাজারে পচা মাছ কিনতে,কেউ যায় এভারেস্টে উঠতে
৯০.
উঠে বোসো শালগ্রাম
৯১.
এইবার যাই কোথায়!
৯২.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
৯৩.
এসেছি কেঁদে, যাই যেন হেসে
৯৪.
নির্জনতায় আমরা ভয় পাই, সজনতায় বিরক্ত হই
৯৫.
নদী ডাকে, আয় চলে আয়
৯৬.
কেউ ঘুমোয় কেউ জাগে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%