হাতপাখা

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

এক একটা জিনিস কী ভাবে যেন কালের হাত এড়িয়ে চলে আসে সেকাল থেকে একালে। জানালার গ্রিলে গোঁজা রয়েছে তালপাতার একটি হাতপাখা। পাখাটি আর পাখা নেই—একটি ইতিহাস। কবে এ তল্লাটে বিদ্যুৎ এসে গেছে। কয়লার উনানের জায়গায় এসে গেছে গ্যাস। সব কাজ থেকে ছুটি মিলে গেছে পাখাটির। রিটায়ার্ড হাতপাখা বয়স্ক এক বৃদ্ধের মতো তার নির্বাসিত জায়গাটি থেকে তাকিয়ে আছে গোটা পরিবারের দিকে। তা বয়স হল প্রায় ষাট। ফলে দিলেই হত; কিন্তু ফেলা হয়নি। পাখাটি ইতিহাস হয়ে গেছে।

রথের মেলা থেকে মা কিনেছিলেন সাধারণ দর্শন এই পাখাটি। তারপর পাশে লাল কাপড়ের ঝালর লাগিয়ে দর্শনীয় করে তুলেছিলেন; সেই ঝালর এখনও আছে, তবে রঙের আর সেই জেল্লা নেই। তবু আছে। ষাট বছর আগে এ-তল্লাটে বিদ্যুৎ ছিল না। পাখাটি ছিল আমার মায়ের খুব আদরের। সাজগোজ দেখলে এখনও তাই মনে হয়। ব্যবহারে-ব্যবহারে হাতলটি বেশ তেলা। নানা হাতের ঘর্ষণে পালিশ ধরে গেছে। বহুকাল হল, মা চলে গেছেন। আমার বয়স তখন মাত্র চার। শুনেছি, শিশু আমিটিকে গরমে বাতাস দেবার জন্যে মা পাখাটিকে কিনেছিলেন। কিনে লাল ভেলভেটের ঝালর লাগিয়ে নিজের খাসপাখা করে রেখেছিলেন। বড় শৌখিন ছিলেন তিনি। খসখসের আতর মাখিয়ে বাতাস করতেন। সেই বাতাসের ভাগ পেতেন আমার কর্মক্লান্ত পিতা। পাখাটি আমাদের বিশাল বিছানায় ফেরে রেখে মা চলে গেলেন। পিতা সেটিকে তুলে নিলেন সংগ্রহশালায় স্মৃতি করে। হাতলে লেগে আছে মায়ের হাতের চাঁপার কলির মতো আঙুলের স্পর্শ। অনামিকায় ছিল সাপের চোখের মতো লাল চুনী-বসানো একটি আংটি। আমার মা ছিলেন সুন্দরী। প্রবীণারা এখনও তাঁর রূপের, তাঁর গুণের বর্ণনা করেন। শুনে শুনে আমার মনে একটা ধারণাই তৈরি হয়ে গেছে—আমার মা ছিলেন রূপের আর গুণের শেষ কথা। মায়ের গুণে মনে বাসা বেঁধে আছে চাপা একটা গর্ব।

কিছুকাল পরে আমার পিতাও চলে গেলেন। সেই সময় চিকিৎসা-বিজ্ঞান একালের মতো উন্নত হয়নি। মানুষের বেঁচে থাকাটা ছিল বড় অনিশ্চিত। তাছাড়া কিছু মানুষ ছিলেন প্রকৃত প্রেমিক। লম্বা চুল আর পাউডার-ঘষা মুখ নিয়ে, আই লাভ ইউ বলে বছরখানেক নৃত্য করেই 'আই ডিভোর্স ইউ' বলে উকিলের কাছে ছুটতেন না। স্বামী-স্ত্রীর বন্ধনে একটা 'থান্ডার লক' তৈরি হত। স্ত্রী-বিয়োগে সে যুগে বহু পুরুষই ভীষণ কাবু হয়ে পড়তেন। সংসার-বিরাগী সন্ন্যাসীও হতেন কেউ কেউ। কেউ গুমরে থেকে থেকে মৃত্যুকে এগিয়ে আনতেন কাছে।

আমি যখন সম্পূর্ণ অনাথ তখন এই হাতপাখাটিই হল আমার পিতা-মাতা। চলে না গেলে বোঝা যায় না, পিতা-মাতা ছাড়া মানুষের আপনজন আর কেউ নেই। আর সবাই একটা ভাসা-ভাসা বাইরের সম্পর্ক। কী, কেমন আছ? ভালো, আপনি কেমন? ছটি শব্দে জগৎ ঘুরছে। মরুভূমির মতো জীবনে লাল ঝালর লাগানো সামান্য একটি হাতপাখাই যেন আমার মরূদ্যান। মসৃণ হাতলে আমার মায়ের হাতের স্পর্শ। যে হাত- দুটি চিরতরে হারিয়ে গেছে। পুনর্জন্ম থাকলেও, এ জীবনের সম্পর্ক আর পরের জীবনে ফিরে পাওয়া যাবে না। একবার। মানুষের যা-কিছু তা মাত্র একবারের জন্যেই। পাখার তালপাতা-অংশে গোল গোল, লাল লাল, আলতার ফোঁটা। মা লাগিয়েছিলেন সরু আঙুলের ডগা দিয়ে। সেই দাগ আজও আছে। নির্জন, নিরালা দুপুরে, রোদে যখন মাঠঘাট ঝলসাতে থাকে, কাক শুকনো গলায় অতি কষ্টে একটি ক্লান্ত কা বের করে, তখন আমি সাবধানে পাখাটি দোলাই। মনে হয় গায়ে আমার মায়ের নি:শ্বাস লাগল। ব্যস্ত, বাস্তব পৃথিবী বলবে, বুড়োটার আদিখ্যেতা দেখে বাঁচি না। মা নেই, তাই এত স্মৃতিবিলাস। থাকলে বুড়িকে বাতাসা খাইয়ে ফেলে রাখত। হয়তো তাই। জীবন আর মৃত্যুর মাঝের এই ভীষণ উপত্যকায় সত্য কী আজও বোঝা গেল না। যা কিছু ঘটাটাই হয়তো সত্য।

পিতার মৃত্যুশয্যায় মাথার কাছে বসে এই পাখাটি মৃদুমন্দ নেড়ে যখন বাতাস করতুম, অপলকে তিনি পাখিটির দিকে তাকিয়ে থাকতেন। আচ্ছন্ন, ঘোর-লাগা চোখ। মাঝে মাঝে কপাল কুঁচকে উঠত। বুঝতে পারতুম, তিনি কানখাড়া করে শোনার চেষ্টা করছেন, হাত নাড়ার তালে তালে চুড়ি আর রুলির শব্দ। দেখার চেষ্টা করছেন গোল ফর্সা একটি হাত। পরক্ষণেই ঠোঁটে খেলে যাচ্ছে মৃদু একটি হাসি। বুঝতে পেরেছেন, চলে যাওয়ার মতো নিষ্ঠুর সত্য আর কিছু নেই। এ যাওয়ার আর আসা নেই। পাখাটি নিয়ে যেতে মাঝপথ থেকে তিনি আর ঘুরে আসবেন না। 'আচ্ছা, এক গেলাস জল দে, খেয়ে যাই', বলে খাটের একধারে পা ঝুলিয়ে আর বসবেন না। যা রয়ে গেল তা রয়েই গেল।

অকারণে পাখিটি নাড়ি আর ভেসে আসে অতীত। পিতা আহারে বসেছেন, পাতে ল্যাংড়া আম। ভনভন করছে ডুমো মাছি। মা বাতাস করছেন জোরে জোরে। পিতা বলছেন, অত জোরে নয়, অত জোরে নয়, তোমার কাঁধে ব্যথা হয়ে যাবে। দৃশ্য ফুটে ওঠে, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। কপালে জলপটি লাগিয়ে পিতা বাতাস করছেন আমাকে। মধ্য রাত। থমথমে চারপাশ। তিনি অস্ফুটে বলছেন, 'দেখো প্রভু, যাবার আগে আমার কাছে রেখে গেছে ভরসা করে, ভালো করে দাও মা।' ভালোই আছি। আজও আছি: তবে বড়ই একা। পাখাটিই আমার একমাত্র আপনজন।

সকল অধ্যায়
১.
টক ঝাল মিষ্টি
২.
ঘোরকলি
৩.
কেমন আছেন?
৪.
জীবন একটা বেয়াড়া ভাল্লুক
৫.
হতেছে পাগলের মেলা
৬.
সকাল
৭.
আশার কথা
৮.
আর বোলো না ভাই!
৯.
'পৃথিবীতে যত বেটা সব বেটা গোরু'
১০.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১১.
হাঁদা গঙ্গারাম
১২.
কে পরাবে সিঁদুর
১৩.
জীবনের জাতীয় সংগীত
১৪.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫.
বাস-মিনিবাসের লাইনে ঘোষ, বোস, মিত্তির
১৬.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৭.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৮.
বাঁদর
১৯.
কোরা কাগজ
২০.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
২১.
শান্তির সহজপাঠ
২২.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
২৩.
অনুসন্ধান
২৪.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
২৫.
প্রেমের শিকল
২৬.
বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
২৭.
ছদ্মবেশী
২৮.
প্রেম বাড়ছে
২৯.
হনুমান টুপি
৩০.
বারমুডা ট্র্যাঙ্গল
৩১.
আড়ং ধোলাই
৩২.
হেমন্তের সকাল
৩৩.
হাতপাখা
৩৪.
খেলা
৩৫.
সন্দেহ
৩৬.
পেটে খেলে পিঠে সয়
৩৭.
শেয়াল পণ্ডিতের পাঠশালা
৩৮.
আমার আছে তোমার নেই
৩৯.
ধ্যাততেরিকা সংসার
৪০.
মায়ার খেলা, মায়ের খেলা
৪১.
যে ট্রেনের কোনো ইস্টিশন নেই
৪২.
সুখের লাগিয়া
৪৩.
টেকনিক
৪৪.
বাপের চা
৪৫.
অনশন
৪৬.
এ চোর সে চোর নয়
৪৭.
পরনিন্দা পরচর্চা
৪৮.
অমর বাঙালি
৪৯.
পথের শেষ কোথায়!
৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
৫১.
পুজোর পাঁচালি
৫২.
আকাশ যখন ছবির মতো নীল
৫৩.
সংসার, শূন্য এক ছায়াবাজি
৫৪.
মারডালো
৫৫.
বড় সাধ ছিল
৫৬.
খোলকত্তাল
৫৭.
হিরের টুকরো
৫৮.
কোনওদিন শুনেছ, চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৫৯.
অধিকার করে অধিকারী হতে হয়
৬০.
কোথায় কী
৬১.
জীবন ও সাহিত্য
৬২.
শামা হর রঙ্গ মেঁ
৬৩.
যা ছিল, একদিন নেই হবে, যা ছিল না,তা একদিন আছে হবে, শেষ হবে না কিছুই
৬৪.
উলটোপাক
৬৫.
যুবক
৬৬.
কাজের সময় কাজি
৬৭.
সকাল সকাল ভোট দিন
৬৮.
শুভানুধ্যায়ী
৬৯.
ছাতা আর গামছার মাল্টিপারপাস ব্যবহার
৭০.
জোকার
৭১.
আসরটা যে করলে মাটি
৭২.
কাঠুরিয়া
৭৩.
মানুষ হয়ে মরতে চাই
৭৪.
উতলা দখিন বাতাসে
৭৫.
ভাঙলে কিছু গড়তে তো হবে
৭৬.
আতঙ্ক
৭৭.
নিগ্রহ
৭৮.
ছুটির সকাল
৭৯.
স্বপ্ন
৮০.
আয় কাটাকাটি করি
৮১.
কলকাতা—৩০০
৮২.
আপনি কার পেশেন্ট
৮৩.
শরৎকাল
৮৪.
পকেটমারি
৮৫.
দুর্বলের সংসার সবলের সন্ন্যাস
৮৬.
আমি ক্ষুদ্র প্রাণ এক
৮৭.
মন পাখিরে কৃষ্ণকথা বল
৮৮.
জন্ম যার কোলে মৃত্যুও তারই কোলে
৮৯.
কেউ যায় বাজারে পচা মাছ কিনতে,কেউ যায় এভারেস্টে উঠতে
৯০.
উঠে বোসো শালগ্রাম
৯১.
এইবার যাই কোথায়!
৯২.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
৯৩.
এসেছি কেঁদে, যাই যেন হেসে
৯৪.
নির্জনতায় আমরা ভয় পাই, সজনতায় বিরক্ত হই
৯৫.
নদী ডাকে, আয় চলে আয়
৯৬.
কেউ ঘুমোয় কেউ জাগে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%