সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
''ভোর তিনটের সময় লাইন দেব।''
''তিনটের সময় লাইন পাচ্ছ কোথায়? তুমি একাই দাঁড়াবে?''
''আস্তে আস্তে আমার পিছনে লাইন তৈরি হবে। একটু একটু করে আলো ফুটবে। ভোরের প্রথম কাক 'কা' করে উঠবে।''
''অর্থাৎ নির্বাচন শুরু। কা-কা কাকে দেবে, কাকে দেবে? কোন বোতামটা টিপবে প্যাঁট করে? ভোরের প্রথম কাক সোচ্চারে বলতে চাইবে—গণতন্ত্রের শাবকরা শোনো বলি সার কথা, কাকস্য পরিবেদনা, বেল পাকিলে কাকের কী?''
''আপনি সিনিক। ভোট দিতে দিতে বুড়ো হয়ে গেছেন। এই বছরে আমি প্রথম ভোট দেব। গণতন্ত্রের মেশিনে আঙুল ঠেকাব। অতএব বুঝতেই পারছেন আমার কী উত্তেজনা!''
কথা হচ্ছে কলেজে পড়া এক ষোড়শীর সঙ্গে। এই বছরে সে প্রথম ভোট দেবে। বলিয়ে-কইয়ে মেয়ে। আবার কবিতা লেখে।
''তিনটের সময় বুথে যাবে? একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না?''
''আজ্ঞে না। শোনেন নি, নেপোয় মারে দই। নেপোদের টেক্কা দিতে চাই। গণতন্ত্রের মন্দিরে মঙ্গল আরতির সময়েই হাজির হব। ফার্স্ট ভোটারেস।''
''ভোটারেস মানে?''
''গ্রামার পড়েন নি! অ্যাক্টর, অ্যাকট্রেস, গড, গডেস। আমি তো স্ত্রী-লিঙ্গ!''
''এবারের নির্বাচনে অ্যাক্টর, অ্যাকট্রেসের ছড়াছড়ি। তারকাখচিত গণতন্ত্র। সব 'কমিনে-কুত্তেকে' চুন চুন করকে যমের 'সাউথ ডোর' দেখিয়ে দেবে। তা তুমি অত ভোরে না গিয়ে চা খেয়ে ছ'টা নাগাদ গেলেই তো পার!''
''কী বলছেন, গণতন্ত্রের মন্দিরে গণদেবতাকে পুজো না চড়িয়ে চা খাব? মুহূর্তটা একবার ভাবুন! পুব আকাশে ছ্যাঁক!''
''ছ্যাঁক মানে?''
''ছ্যাঁক করে সূর্য উঠল। পোলিং বুথের দরজা খুললেন প্রিসাইডিং অফিসার। এক হাতে ঘণ্টা, আর এক হাতে একগোছা ধুপ-ধোঁয়া ছাড়ছে। তিনি প্রধান পুরোহিত। ভিতরে নৈবেদ্য সাজিয়ে বসে আছেন সহকারী পুরোহিতগণ। প্রত্যেকের কপালে দগদগে লাল ফোঁটা। প্রধান পুরোহিত টিংটিং করে ঘণ্টা বাজিয়ে, ধুপ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে একটু আরতি করলেন।''
''কার আরতি?''
''মঙ্গলচণ্ডী আর রণচণ্ডীর!''
''চণ্ডী কেন?''
''হায় ভগবান! কিছুই জানেন না। মা দুর্গা হলেন 'রিপাবলিক'। নিজেই বলছেন 'অহং রাষ্ট্রী সংগমনী বসূনাং', রাষ্ট্রের অধিশ্বরী আমি। যুগে যুগে অসুররা 'রিপাবলিককে' চিৎপাত করে দিতে চাইবে। পুরাকালে ক্যাঁচা আর খাঁড়া দিয়ে ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে দিতেন মা নিজে, আধুনিককালে 'ব্যালটই' 'বুলেট'। একজন বেঁচে উঠবে যন্ত্র-বাক্সে, বাকি সবাই, বল হরি, হরি বোল। ''প্রিসাইডিং অফিসার প্রথমেই আমাকে দেখবেন সুপ্রভাত, সুপ্রভাত!''
বিয়ের সময় সিঁথিতে সিঁদুর। ভোটের সময় আঙুলে ফোঁটা। তারপর 'টয়লেটে' প্রবেশ। ''টয়লেট? টয়লেট কোথা থেকে আসবে?''
''ঘরের একপাশে চট ঝোলানো একটা জায়গা, গোপন স্থান। সেইখানে ঢুকে ভোট করতে হয়। সকলের সামনে করা যায় না। গণতন্ত্র হল গোপন তন্ত্র। গোপনে মালাবদলের মতো। বরমালা পরাই তোমার গলে।''
''তারপর? এই প্যারডিটা পড়েছ? ''ওগো মা!/ভোটের দালাল চলি গেল মোর/ ঘরের সমুখ পথে/ প্রতিশ্রুতির ফুলকি ঝরিল/ মাইকশিখর রথে!''
''শুনুন ওসব পড়ার দরকার নেই, ভোটদান করে গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হবে, তা না হলে শুকিয়ে মরে যাবে। টাকার মতো ভোটও দান করতে হয়। হিন্দি বলয়ে বলা হয় মতদান। ওই একটা দিন আমরা দাতা। আমাদের দানে রাজনীতির গর্ভ থেকে ত্রাতারা বেরিয়ে আসবেন। স্বামীজি পড়েছেন?''
''সামান্য, সামান্য।''
''শুনুন তা হলে, দাতাকে কী বলছেন,
দাও আর ফিরে নাহি চাও, থাকে যদি হৃদয়ে সম্বল/অনন্তের তুমি অধিকারী, প্রেমসিন্ধু হৃদে বিদ্যমান,/'দাও-দাও'- যেবা ফিরে চায়, তার সিন্ধু বিন্দু হয়ে যান।
ভোট দান করে বেরিয়ে আসুন, আর ফিরে তাকাবেন না।''
''কালকের একটি ইংরেজি কাগজের 'হেডলাইন' দেখেছ? “Statutory Warning : Voting can kill you. Laloo’s constituency trembled as motorcycle gangs shot the defient.”
''পড়েছি। মরতে তো একদিন হবেই। ক্যানসারে মরার চেয়ে ভোটদান করে গণতন্ত্রের কোলে ডেডবডি ফেলে যাওয়া অনেক গৌরবের। আকাশবাণীতে দরখাস্ত দিয়েছি, ভোটের ভোরে চণ্ডীপাঠ। ভোটও তো দুর্গাপূজা। দুর্গ দখলের লড়াই। ভোরে ভোটারদের ঘুম না ভাঙালে সকাল সকাল ভোট দেবেন কী করে!''
''সারাটা দিন যখন পড়ে আছে, তখন এত সকাল সকাল করছ কেন?''
''আমার ভোটটা আমিই দিতে চাই। উপকারী বন্ধুরা বাইক বাহনে রিভলবার শোভিত হয়ে আসার আগেই সরে পড়তে চাই।''
''কাকে দেবে?''
''বলতে নেই। 'সিক্রেট অ্যাফেয়ার', আমি জানব আর যন্ত্র জানবে। তবে জেনে রাখুন, যে সব চেয়ে সুন্দর তাকেই দেব। গোদামুখো, গুন্ডা-গুন্ডা লোক, খিটখিটে শাশুড়ি শাশুড়ি চেহারার মেয়েদের আমি সহ্য করতে পারি না।''
''নির্বাচন তো ফ্যাশন প্যারেড নয়। ভারিক্কি চেহারার, খিটখিটে চেহারার মানুষ চাই। ডাকাত রানি, গুন্ডাসর্দার, এরাই পার্লামেন্ট আলো করে থাকবেন। তোমার কেন্দ্রে একজন অভিনেত্রী আছেন।''
''তাঁকে ভোট দেবেন পুরুষরা।''
''তুমি তা হলে?''
''একজন আছেন। খুব সুন্দর। যে-কোনো দিন অভিনেতা হয়ে যাবেন।''
''নির্বাচন কি স্বয়ংবর সভা? আমি ভাবছি, ভোটের সকালে প্রভাতফেরি বের করব, জাগো, জাগো পুরবাসী/গুটি গুটি যাও সব মতদান কেন্দ্রে/ সকলকে দিও কিঞ্চিত/ না করে বঞ্চিত। গণতন্ত্র আঙুরগুচ্ছ। দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে এস ভাই/ করো না তুচ্ছ/ জাগো জাগো পুরবাসী/ হ্যাং পার্লামেন্ট অবশ্যম্ভাবী।''
''আমি আপনাদের কালের কবি, হাসি রাশি দেবীর এই গানটি গাইব, এসো, এ বিধান-মহা-সভা তলে,/ হও মনোনীত যত ছলে বলে।।/ শুধু বলে রাখি মনে রেখো, প্রিয়/ তোমার ছলনা বুঝিতে না দিয়ো।।''
''শোনো কন্যা, আমাদের যৌবনকালে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের ম্যাচের আগের দিন রাতে ময়দানে লাইন দিয়ে পড়ে থাকতুম। তারপর কাউন্টার খুললেই টিকিটের জন্য দাঙ্গা। নির্বাচনও রাজনীতির ফুটবল। মাঠও নেই, বলও নেই, খেলাটা আছে। রাজনীতির মারাদোনারা হাত দিয়েও গোলে বল ঠেলতে পারেন। হ্যান্ড অফ গড!''
''পার্লামেন্টের গলায় দড়ি, না গলায় দড়ি পার্লামেন্ট! কী বলব?''
''যা ইচ্ছে বলুন। ভোট দেবেন সাত সকালে। এইটাই প্রাত:কৃত্য।''
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন