সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
''ভীষণ দুশ্চিন্তা!''
''একালের সব চিন্তাই তো দুশ্চিন্তা!''
''তা ঠিক! ঘুম থেকে ওঠা মানেই দুশ্চিন্তার ঢাকনা খোলা। এখানকার সংসার বিদিগিচ্ছিরি রকমের আনমেথডিক্যাল, মানে এলোমেলো। আমার মেয়েটা যখন নার্সারিতে পড়ত, এবিসিডি তখন দুলে দুলে, নেচে নেচে, গেয়ে গেয়ে বলত, এলোমেলো পি। আমাদের খুব মজা লাগত। এখন মানেটা খুঁজে পেয়েছি। এলোমেলো পি মানে প্রেজেনস। এলোমেলো অস্তিত্ব। দুধ আছে তো চা নেই, চা আছে তো দুধ নেই। দুটোই আছে তো চিনি নেই। চা হল, সুখের সংসারের প্রতীক সিম্বল!''
''কী রকম? ব্যাখ্যাটা শুনি।''
''পিতা, মাতা এবং সন্তানের সুষম মিলন। পিতা হল রাগী লিকার। লালচে, কষা। চায়ের প্রধান উপাদান। এক কাপ। তাইতো দু'চামচে দুধ, মায়ের স্নেহ। এরপর দু'চামচে চিনি। জীবনের লিকারে চিনি হল সন্তান। দুটি সুন্দর সন্তান, মানে দু'চামচে চিনি।''
''একালে তো লিকার খাওয়াটাই স্টাইল। বলে আঁতেল চা।''
''আঁতেল বাপও বলতে পার। পিতা বসে বসে পিতারই নির্যাস পান করছেন। সঙ্গে স্ত্রীও নেই, পুত্রও নেই। আঁতেল-এর সংজ্ঞা হল, যে-আধারে যাবতীয় ধান্দার সমাবেশ। ভ্রুকুটির আড়ালে নিজেকে আড়াল করে রাখা। বিপরীত জ্ঞানে জ্ঞানী। সবাই যা বিশ্বাস করে তার উলটোটা বলা। অর্থাৎ ঢিল ছোড়া।''
''এতো তোমার কিসের দুশ্চিন্তা?''
''আরে ভাই ছেলেটাকে কী করে অমানুষ করব।''
''সে আবার কী? বলো মানুষ করব।''
''আজ্ঞে না, মানুষ করলে আর করে খেতে হবে না। যে ছেলে বাপের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে তার কী হবে!''
''অ্যাঁ, ছি ছি ছি! পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে! ভূতে ধরেছে! ওঝা ডাকিয়ে ঝাড়া!''
''কার ভূত?''
''পুরাণের কোনও ঋষি বালকের ভূত। তপোবনে থাকত। গোধনপালন করত। অরণ্যে সমিধ আহরণে যেত। ঊষাকালে হোম ও বেদপাঠ। গুরুর আদেশে ওঠ-বোস। যাবতীয় দুনম্বরি কাজ।''
''ঠিক বলেছিস। ছেলেটাকে ভূতেই ধরেছে। আমাকে যখন প্রণাম করে আমার ভীষণ অস্বস্তি হয়।''
''কেন? অস্বস্তি কেন?''
''আরে প্রণাম মানে তো শ্রদ্ধেয়কে শ্রদ্ধা। মনে মনে হয়তো বলে, পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম!''
''না, ও মন্ত্র পিতার শ্রাদ্ধে বলে। দেখছিল না, স্বর্গ শব্দটা রয়েছে। পিতারা মরলেই স্বর্গে যায়। যে ভাবেই হোক পিতা হতে পারলেই, স্বর্গের সার্কিট হাউসে ঘর বুক। তবে একটাই কথা, তোমাকে বিয়ে করতে হবে। একস্ট্রা কারিকুলার সন্তানে নরকবাস। নরকের একেবারে লোয়ার ডেপথে সারা জীবন পচে মরবে?''
''জীবন পাচ্ছিস কোথায়। মরে গিয়েছি তো!''
''সরি, সরি, সারা মরণ পচে মরবি। কৃতজ্ঞতার খাতিরে সেই বিতর্কিত সন্তান যদি শ্রদ্ধা করে তাহলে এই মন্ত্র পড়বে, পিতা নরক, পিতা অধর্ম, পিতা হি অপরমংতপ, অর্থাৎ সব নেগেটিভ। স্বর্গের নেগেটিভ হল নরক। পৃথিবীটা নিউট্রাল।''
''পিতা যদি ডিভোর্স করে?''
''না। স্বর্গের আশা করো না। তুমি আরও গোটাকতক বিয়ে করো, নো অবজেকশান। রাজা দশরথের তিন বউ। স্বয়ং কৃষ্ণের এক হাজার বউ। অর্জুন তো যেখানেই গেছেন সেখানেই বিয়ে। ওয়ান ফিফথ দ্রৌপদীও তাঁর বউ!''
''এই হিসেবটা?''
''ভেরি ইজি! দ্রৌপদীর পাঁচ স্বামী। এক কে পাঁচ দিয়ে ভাগ করো। দশমিকে অর্জুনের ভাগে পয়েন্ট টু দ্রৌপদী। সে যাই হোক, ছেলে প্রণাম করলে অস্বস্তি হবে কেন?'' ''আমি যে ঘুষখোর, মিথ্যেবাদী! চরিত্র একেবারে খলখলে।'' ''ঘাবড়াস না। মৃত্যু একটা ড্রপসিন। পর্দার আড়ালে যাচ্ছি কোথায় কেউ দেখতে পাবে না!''
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন