কোনওদিন শুনেছ, চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

সেকালটাই ছিল মজার কাল। সবেতেই মজা। বাড়িতে চোর পড়লেও মজা। চোরেরাও ছিল অন্যরকম। প্রকৃতই অভাবী মানুষ। পেটের দায়ে চোর। ছিঁচকে চোর। ঘটি, বাটি, গামছা, জামা, লোহার বালতি, তোলা উনুন, কেরোসিন তেলের বোতল, হাতের কাছে যা পাওয়া যায় তাইতেই সন্তুষ্ট। কোনওক্রমে রান্নাঘরে ঢুকতে পারলে সেই মাঝরাতেই হাপুস হুপুস করে খানিক পায়েস খেয়ে নিলে। কোনও ইজ্জত ছিল না তাদের। চরিত্রে আত্মসম্মান বোধটাই অনুপস্থিত। সেকালের চোর ধরা পড়লে গণপিটুনিতে মরত না। ভোর হওয়ার আগেই চড়-চাপড় দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হত। সে ছিল শান্তির কাল।

একদিন মাঝরাতে চোর এসেছে জ্যাঠামশাইয়ের ঘরে। খাটের কাছে গিয়ে ঝুঁকে পড়ে দেখছে, ঘুম কতটা গভীর। জ্যাঠামশাইয়ের ভরাট মুখে অসাধারণ একজোড়া গোঁফ ছিল, ইংরেজিতে যাকে বলে হ্যান্ডলবার মুস্ট্যাশ। গোঁফ জোড়া দেখে চোর মুগ্ধ। আলতো করে টেনেছে।

জ্যাঠামশাই ঘুমোতে ঘুমোতেই বলছেন, ''আসল, আসল। বিরক্ত না করে ডিবেতে কাশীর জর্দা দেওয়া পান আছে, দুটো খিলি মুখে পুরে চলে যা।''

চোর বললে, ''কত্তা, রাতে খাওয়াই জোটেনি। শুধু শুধু পান খেয়ে কী করব!''

খুব রেগে গিয়ে জ্যাঠামশাই বলছেন, ''হতচ্ছাড়া! রাতের খাবারটাও জোটাতে পারিস না, চুরি করতে এসেছিস।''

বালিশের তলা থেকে একটা পাঁচ টাকার নোট বের করে চোরকে দিয়ে বললেন, 'নে ধর।'' পুরো ব্যাপারটাই হচ্ছে চোখ বুজিয়ে।

চোর বললে, ''কত্তা, মাথাটা একটু তুলুন না, দেখি বালিশের তলায় আর কী আছে!''

জ্যাঠামশাই বললেন, ''সমান দু'ভাগ করেছি। বউয়ের তবিল থেকে দশ ঝেড়েছিলুম, তোর পাঁচ আমার পাঁচ। একেবারে ন্যায় বিচার। ওই পাঁচও দিতে পারি যদি আমার পা দুটো একটু টিপে দিস।''

''সে আমি দিচ্ছি খন, তোমার ঘরে খাবারদাবার কিচ্ছু নেই?''

''গাছপাকা দুটো আতা আছে তাকে। খবরদার, ঘরের মেঝেতে বিচি ফেলবি না।''

রাত আড়াইটার সময় আতা খেয়ে চোর পা টিপতে বসল। আবার জিজ্ঞেস করল, ''কাল কি এই টাইমে আসব?''

দু:খ মেশানো গলায় জ্যাঠামশাই বললেন, ''সুখের দিনের আজই শেষ রাত্তির, কাল সকালেই ফিরে আসছেন বাপের বাড়ি থেকে। তুই বরং একটা কাজ করতে পারিস, এক ফাঁকে এসে বলে যেতে পারিস, টাকা দশটা তুই নিয়েছিস।''

চোর বললে, ''মাপ করো কত্তা। মাঠাকুরুনকে আমরা খুব চিনি। টাকা তুমি ফিরিয়ে নাও।''

''আর আতা!''

''কত্তা, সে তো খেয়ে ফেলেছি। এই লাইটারটা কাল চুরি করেছিলুম। তুমি রাখো। যা হয় কোরো।''

আর একদিন, চোর মাঠের উপর দিয়ে দৌড়চ্ছে, পিছন পিছন আমার বলশালী কাকাবাবু ছুটছেন, ব্যায়ামবীর। তার পিছনে আমরা। ওপাশে চোর মুখ ঘুরিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে, এ-পাশে আমার কাকাবাবু। মাঝখানের ব্যবধান হাত পঞ্চাশ। এতক্ষণ হচ্ছিল দৌড়ের ওলিম্পিক। এবার রেস্টলিং।

দু'জনেই দু'জনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ছে।

চোর বলছে, ''কী হল! হিম্মত থাকে তো এসে ধরো।''

কাকাবাবু বললেন, ''হিম্মত থাকে তো তুই আয় না।''

চোর বললে, ''কোনওদিন শুনেছ, চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে! চোর সবসময় পালায়, আর চোর পালালে তোমাদের বুদ্ধি বাড়ে।''

''তা পালা, থামলি কেন হঠাৎ! চোর আর ছুঁচো এই দুটোকে আমি ধরি না। আমার ঘেন্না করে। নে, নে, ছোট ছোট।''

''আর কত ছুটব! প্রায় এক মাইল হল। সেই গজার মোড় থেকে দৌড় শুরু হয়েছে।''

কাকাবাবু বললেন, ''তুই তো ব্যাটা আচ্ছা অধার্মিক। চোরের ধর্মই হল পালানো।''

''এতক্ষণে এটা তো বুঝেছ, আমি তোমার চেয়ে জোরে দৌড়ই। ইচ্ছে করলে পালাতে পারি।''

''তা পালাচ্ছিস না কেন?''

''কী করে পালাব? তোমাদের বাগানে কৃষ্ণকলির ঝোপে আমার মাল পড়ে আছে যে!''

''তোর চোরাই মাল আমাদের বাগানে। নিয়ে যা, নিয়ে যা।''

চোর আর কাকাবাবু দু'জনে গল্প করতে করতে ফিরে এলেন, যেন গলায় গলায় বন্ধু। দাওয়ায় বসে কাকাবাবু বললেন, ''আয় বোস, একটু জিরিয়ে নেওয়া যাক। দৌড়টা বেশ ভালোই হল, কী বল? তামাক সাজতে পারিস?''

''তা আর পারি না?''

''যা, ওই ধারে সব আছে। টিকে, দেশলাই, দুটো হুঁকো, অম্বুরি তামাক। ভালো করে সেজে আন।''

দু'জনে আয়েস করে তামাক খেতে লাগলেন। ওদিকে ভোর হতে শুরু করেছে। এই চোর কিছুদিনের মধ্যে কাকাবাবুর ব্যবসায়ে কাকাবাবুর ডান হাত হয়ে গেলেন।

আরামবাগে কাকাবাবুর বিরাট কাপড়ের আড়ত। কালীবাবু বিশ্বাসী ম্যানেজার। ভীষণ খাটিয়ে।

বেশ কিছুদিন পরে কাকাবাবু বললেন, ''কালু এইবার একটা ভালো মেয়ে দেখে তোর বিয়ে দেব।''

কালু বললে, ''আবার? ওই চক্করে আর পা দিচ্ছি না।''

''সে কী রে! বিয়ে করেছিলিস? তা বউ কোথায়?''

''চুরি হয়ে গেছে।''

এখন তাই ভাবি, এই হাইটেক যুগে এইরকম সৎ চোর আর দেখতে পাওয়া যাবে না। আর রসিক গৃহস্থ! আমার দাদু, চোরের কাঁঠাল কাঁধে করে চোরের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসছেন।

সকল অধ্যায়
১.
টক ঝাল মিষ্টি
২.
ঘোরকলি
৩.
কেমন আছেন?
৪.
জীবন একটা বেয়াড়া ভাল্লুক
৫.
হতেছে পাগলের মেলা
৬.
সকাল
৭.
আশার কথা
৮.
আর বোলো না ভাই!
৯.
'পৃথিবীতে যত বেটা সব বেটা গোরু'
১০.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১১.
হাঁদা গঙ্গারাম
১২.
কে পরাবে সিঁদুর
১৩.
জীবনের জাতীয় সংগীত
১৪.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫.
বাস-মিনিবাসের লাইনে ঘোষ, বোস, মিত্তির
১৬.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৭.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৮.
বাঁদর
১৯.
কোরা কাগজ
২০.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
২১.
শান্তির সহজপাঠ
২২.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
২৩.
অনুসন্ধান
২৪.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
২৫.
প্রেমের শিকল
২৬.
বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
২৭.
ছদ্মবেশী
২৮.
প্রেম বাড়ছে
২৯.
হনুমান টুপি
৩০.
বারমুডা ট্র্যাঙ্গল
৩১.
আড়ং ধোলাই
৩২.
হেমন্তের সকাল
৩৩.
হাতপাখা
৩৪.
খেলা
৩৫.
সন্দেহ
৩৬.
পেটে খেলে পিঠে সয়
৩৭.
শেয়াল পণ্ডিতের পাঠশালা
৩৮.
আমার আছে তোমার নেই
৩৯.
ধ্যাততেরিকা সংসার
৪০.
মায়ার খেলা, মায়ের খেলা
৪১.
যে ট্রেনের কোনো ইস্টিশন নেই
৪২.
সুখের লাগিয়া
৪৩.
টেকনিক
৪৪.
বাপের চা
৪৫.
অনশন
৪৬.
এ চোর সে চোর নয়
৪৭.
পরনিন্দা পরচর্চা
৪৮.
অমর বাঙালি
৪৯.
পথের শেষ কোথায়!
৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
৫১.
পুজোর পাঁচালি
৫২.
আকাশ যখন ছবির মতো নীল
৫৩.
সংসার, শূন্য এক ছায়াবাজি
৫৪.
মারডালো
৫৫.
বড় সাধ ছিল
৫৬.
খোলকত্তাল
৫৭.
হিরের টুকরো
৫৮.
কোনওদিন শুনেছ, চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৫৯.
অধিকার করে অধিকারী হতে হয়
৬০.
কোথায় কী
৬১.
জীবন ও সাহিত্য
৬২.
শামা হর রঙ্গ মেঁ
৬৩.
যা ছিল, একদিন নেই হবে, যা ছিল না,তা একদিন আছে হবে, শেষ হবে না কিছুই
৬৪.
উলটোপাক
৬৫.
যুবক
৬৬.
কাজের সময় কাজি
৬৭.
সকাল সকাল ভোট দিন
৬৮.
শুভানুধ্যায়ী
৬৯.
ছাতা আর গামছার মাল্টিপারপাস ব্যবহার
৭০.
জোকার
৭১.
আসরটা যে করলে মাটি
৭২.
কাঠুরিয়া
৭৩.
মানুষ হয়ে মরতে চাই
৭৪.
উতলা দখিন বাতাসে
৭৫.
ভাঙলে কিছু গড়তে তো হবে
৭৬.
আতঙ্ক
৭৭.
নিগ্রহ
৭৮.
ছুটির সকাল
৭৯.
স্বপ্ন
৮০.
আয় কাটাকাটি করি
৮১.
কলকাতা—৩০০
৮২.
আপনি কার পেশেন্ট
৮৩.
শরৎকাল
৮৪.
পকেটমারি
৮৫.
দুর্বলের সংসার সবলের সন্ন্যাস
৮৬.
আমি ক্ষুদ্র প্রাণ এক
৮৭.
মন পাখিরে কৃষ্ণকথা বল
৮৮.
জন্ম যার কোলে মৃত্যুও তারই কোলে
৮৯.
কেউ যায় বাজারে পচা মাছ কিনতে,কেউ যায় এভারেস্টে উঠতে
৯০.
উঠে বোসো শালগ্রাম
৯১.
এইবার যাই কোথায়!
৯২.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
৯৩.
এসেছি কেঁদে, যাই যেন হেসে
৯৪.
নির্জনতায় আমরা ভয় পাই, সজনতায় বিরক্ত হই
৯৫.
নদী ডাকে, আয় চলে আয়
৯৬.
কেউ ঘুমোয় কেউ জাগে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%