এ চোর সে চোর নয়

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

সেকালের রাজপুত্ররা বন্দিনী রাজকন্যাকে উদ্ধার করে আসতেন। সে তো অপহরণ নয়। অনেকের বইয়ের আলমারিতে ভালো ভালো বই যেন বন্দিনী রাজকন্যা। বছরের পর বছর কাচের ঘেরাটোপে অবরুদ্ধ। যাঁরা বই কেনেন শুধুমাত্র ড্রয়িংরুম সাজাবার জন্যে, তাঁদের হাত থেকে বই উদ্ধার করে আনা চুরি নয়, পবিত্র এক কর্তব্য। ছলে, বলে, কৌশলে ঝেঁপে নিয়ে এসো। কথাতেই আছে, বোকারা বই কেনে আর পড়ে বুদ্ধিমানে।

সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হল, বই চেয়ে নিয়ে ফেরত দিতে ভুলে যাওয়া। ইচ্ছাকৃত ভুল। এর মধ্যে একটু কৌশল আছে। বইপাগলের কাছ থেকে বই নিলে তাগাদা মেরে জীবন অতিষ্ঠ করে তুলবেন। আগে মালিক চিনতে হবে। শৌখিন মালিক হলে, তাঁর আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে, পছন্দমতো বইখানি বের করে নিয়ে, অন্য বইগুলো সরিয়ে সরিয়ে ফাঁকটা ভরাট করে দিতে হবে, তারপর বলতে হবে, এই বইটা আমি একটু পড়তে নিচ্ছি। সেই সঙ্গে একটু তোল্লাই মতো এমন কালেকশান আমি খুব কমই দেখেছি। এরপর, দিন যাবে, সাত দিন, এক মাস, এক বছর। আর ওমুখো নয়। ফাঁকটা ভরিয়ে আসার কারণ, যাতে ফাঁক দেখে বইটার কথা না মনে পড়ে যায়। এইভাবে ধীরে ধীরে কায়দা করে বই সরাতে হয়। না বলিয়া পরের দ্রব্য লওয়াকে বলা হয় চুরি। এ তো বলে নেওয়া, অতএব চুরি নয়। এর নাম বন্দিমুক্তি। ভার লাঘব করা। পোকায় কাটার চেয়ে অন্যে নিয়ে কেটে পড়ুক। সবাই জানেন মার্ক টোয়েনের সেই উক্তি, বই পড়ে আছে ডাঁই হয়ে। প্রশ্নকারীকে বললেন, বই যেভাবে এসেছে, সেভাবে তো বুকশেলফ আসবে না। বই চুরি করা যায়, বইয়ের শেলফ তো চুরি করা যায় না। আমাদের দেশেই এমন অনেক নামী মানুষ ছিলেন, যাঁরা গ্রন্থাগার থেকে বই লুকিয়ে নিয়ে চলে আসতেন। নাম করব না। তাঁদের এই কর্মকাণ্ডের মরশুম ছিল শীতকাল। গায়ে একটি শাল চড়িয়ে, এ-র‌্যাক, ও-র‌্যাক, সে-র‌্যাকের সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন। নামী, বিদগ্ধ মানুষ। গ্রন্থাগারে পদার্পণ মানে ধন্য হয়ে যাওয়া। যখন বেড়িয়ে গেলেন শালমুড়ি দিয়ে কিছু বইও সঙ্গের সঙ্গী হল। গ্রন্থাগারিকরা এঁদের চিনতেন, এখনও চেনেন, কিছু বলতে পারেন না। বলাটা অভদ্রতা। বইয়ের দোকান থেকে যাঁরা বই তোলেন, তাঁদের আমরা বলি, বুক-লিফটার। শপ-লিফটারদের মতোই সমান অপরাধী। কিন্তু এঁদের মধ্যে এমন অনেকে আছেন, যাঁরা এই চোরাই বই বিক্রি করেন না। অপ্রতিরোধ্য আকষর্ণে সামলাতে পারেন না নিজেকে। একজন মানুষকে যদি তাঁর সব ভালোবাসার বই কিনতে হয়, তাহলে তিনি দেউলে হয়ে যাবেন। অতএব সহজ উপায় মোহিত হয়ে তুলে নেওয়া, তারপর যা হয় দেখা যাবে। জ্ঞান যিনি চুরি করেন তিনি জ্ঞানের মর্ম বোঝেন। তিনিও জ্ঞানী।

একটি ঘটনা আমি জীবনে ভুলব না। এক সাধকের জীবনী জানার খুব প্রয়োজন হয়েছিল আমার। এক গবেষক পণ্ডিত আমাকে বললেন, জাতীয় গ্রন্থাগারে যাও, সেখানে একটি পাণ্ডুলিপি পাবে। যথারীতি গ্রন্থাগারে গিয়ে অনুরোধ জানাতে, আমাকে বললেন, বসুন। বসে আছি। হঠাৎ দেখি আমাকে ঘিরে অনেকে এসে দাঁড়িয়েছেন। প্রথমে ভাবলুম, পাণ্ডুলিপি চাওয়ায়, সবাই বোধহয় আমাকে মহাজ্ঞানী ভেবেছেন, তাই দর্শন করতে এসেছেন। আমার ভুল ভাঙতে দেরি হল না। একজন রুক্ষভাবে জিজ্ঞেস করলেন, 'এখানে যে পাণ্ডুলিপিটা আছে আপনি জানলেন কী করে?' অন্য সবাই কোরাসে বললেন, 'বলুন, বলুন।' বেশ ভয় পেয়ে গেলুম। ব্যাপার সুবিধের নয়। কেঁউ কেঁউ করে বললুম, 'কেন বলুন তো!' 'পাণ্ডুলিপি চুরি হয়ে গেছে আমাদের কালেকশান থেকে। যে আপনাকে পাঠিয়েছে সে-ই চোর। আপনাকে পাঠিয়েছে থেফট ডিটেকটেড হয়েছে কি না জানতে। নামটা আমরা জানতে চাই।' ভদ্রলোক থানার বড় দারোগার মতো এক ধমক দিলেন, 'কাম আউট উইথ দি নেম।'

জীবনে এমত অপদস্থ কখনও হইনি। ভদ্রলোকের নাম বলতে পারছি না। বলতে চাইছি না, আর কর্তৃপক্ষও ছাড়বেন না। সে প্রায় দাগি আসামিকে লালবাজার লক আপে কনফেশন আদায় করার মতো কেস। দুর্লভ পাণ্ডুলিপি কালেকশান থেকে চলে গেছে, সহজে ছাড়া পাই! শেষে নাম বলতেই হল। নাম শুনে তাঁরা হাঁ হয়ে গেলেন। তিনি যে ভীষণ নামী মানুষ! তাঁর বিরুদ্ধে কিছুই করার নেই। সত্য মিথ্যা জানি না, সেই নামী মানুষটিকে অকারণে সন্দেহ করা হয়েছিল কি না তাও বলতে পারব না। তবে পাণ্ডুলিপিটি কালেকশান থেকে উধাও হয়েছিল, এটা সত্য। আর সেই সত্য হল, ছলে-বলে-কৌশলে, নিজের সঞ্চয়কে সমৃদ্ধ করো। প্রেমে আর রণে যেমন কোনো নীতি থাকে না, পরের বইকে নিজের করার ব্যাপারেও কোনো নীতি নেই। সুভদ্রাহরণ পালার মতো। ভালো লেগেছে মেরে দিয়েছি। বাংলায় আর একটি কথা আছে—বই আর বউ হাতছাড়া করেছ কী মরেছ।

আমার নিজের কথা বলি, বইয়ের ব্যাপারে আমার চরিত্র তেমন বিশ্বাসযোগ্য নয়। পরের বইকে আমি নিজের মতো করেই দেখি। আত্মবৎ পরদ্রব্যেষু। লোষ্ট্রবৎ নয়। বই আমার কাছে, ওয়ান ওয়ে ট্র্যাফিক। আসবে কিন্তু ফিরবে না। অতিথি কি আশ্রিতাকে ফেরাতে নেই। আমার এক বন্ধুর বাড়ির আলমারি থেকে কয়েকখানা ছেঁড়া ছেঁড়া বই উদ্ধার করে আনলুম। অর্থাৎ পড়ার জন্যে চেয়ে আনলুম। পড়েই ফেরত দেব, ভাববেন না কিছু। তারপর আমার যা টেকনিক, 'লাই লো'। বেশ কিছুদিন ঘাপটি মেরে থাকো। দেখা যাক মালিকের তাগাদার বহরটা কেমন। তিন মাস পার হয়ে গেল। তখন বইগুলোকে বেশ খরচ করে বাঁধিয়ে, সোনার জলে নিজের নাম লিখিয়ে শেলফজাত করে ফেললুম। সাত বছর পরে হঠাৎ একদিন আমার সেই বন্ধু আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এলেন। দু'জনেরই বয়স সাত বছর বেড়েছে। ছাত্র থেকে চাকুরে। বইগুলোর কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছি। বন্ধু আমার আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে বই দেখছে। এটা টানছে, ওটা টানছে। হঠাৎ সে তিনখানা বই বের করে এনে বললে, 'আশা করি তোমার পড়া হয়ে গেছে এতদিনে! এইবার আমি নিয়ে যেতে পারি নিশ্চয়!'

আমি হাঁ হয়ে গেলুম। এত খরচ করে বইগুলো বাঁধালুম। চামড়ার বাইন্ডিং। সোনার জলে লেখা। একেবারে ভোল পালটে দিয়েছিলুম। প্লাস্টিক সার্জারি। একেবারে চেহারা বদলে দেওয়া। সেই ইনভেস্টমেন্ট এইভাবে বিফলে গেল। আমারি বঁধুয়া আনবাড়ি যায় আমারি আঙিনা দিয়া, এ যেন সেই ব্যাপার। বউ ডিভোর্স করে চলে যাচ্ছে, এইরকম একটা অনুভূতি।

আমার সেই মহা ধড়িবাজ বন্ধু বললে, 'বুঝলে, একটু ধৈর্য, আর পরিশ্রম। বইগুলো কিছুকালের জন্যে হাতছাড়া হয়ে যায় ঠিকই, একটু হাঁটাহাঁটিও করতে হয়, কিন্তু অধিকাংশই ফিরে আসে নতুন করে। এই যেমন এল। বুঝলে, বই হল জ্ঞান। সেইজন্যেই বলে, যতই করিবে দান তত যাবে বেড়ে। এতে ভুল করে তুমি তোমার নামটা লিখে ফেলেছ, তা, টু আর ইজ হিউম্যান, টু ফরগিভ ডিভাইন। কিছুই না, স্পিরিট দিয়ে নামটা মুছে ফেলব।' সেই আমার শিক্ষা হয়েছিল, দাদারও দাদা আছে।

সকল অধ্যায়
১.
টক ঝাল মিষ্টি
২.
ঘোরকলি
৩.
কেমন আছেন?
৪.
জীবন একটা বেয়াড়া ভাল্লুক
৫.
হতেছে পাগলের মেলা
৬.
সকাল
৭.
আশার কথা
৮.
আর বোলো না ভাই!
৯.
'পৃথিবীতে যত বেটা সব বেটা গোরু'
১০.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১১.
হাঁদা গঙ্গারাম
১২.
কে পরাবে সিঁদুর
১৩.
জীবনের জাতীয় সংগীত
১৪.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫.
বাস-মিনিবাসের লাইনে ঘোষ, বোস, মিত্তির
১৬.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৭.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৮.
বাঁদর
১৯.
কোরা কাগজ
২০.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
২১.
শান্তির সহজপাঠ
২২.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
২৩.
অনুসন্ধান
২৪.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
২৫.
প্রেমের শিকল
২৬.
বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
২৭.
ছদ্মবেশী
২৮.
প্রেম বাড়ছে
২৯.
হনুমান টুপি
৩০.
বারমুডা ট্র্যাঙ্গল
৩১.
আড়ং ধোলাই
৩২.
হেমন্তের সকাল
৩৩.
হাতপাখা
৩৪.
খেলা
৩৫.
সন্দেহ
৩৬.
পেটে খেলে পিঠে সয়
৩৭.
শেয়াল পণ্ডিতের পাঠশালা
৩৮.
আমার আছে তোমার নেই
৩৯.
ধ্যাততেরিকা সংসার
৪০.
মায়ার খেলা, মায়ের খেলা
৪১.
যে ট্রেনের কোনো ইস্টিশন নেই
৪২.
সুখের লাগিয়া
৪৩.
টেকনিক
৪৪.
বাপের চা
৪৫.
অনশন
৪৬.
এ চোর সে চোর নয়
৪৭.
পরনিন্দা পরচর্চা
৪৮.
অমর বাঙালি
৪৯.
পথের শেষ কোথায়!
৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
৫১.
পুজোর পাঁচালি
৫২.
আকাশ যখন ছবির মতো নীল
৫৩.
সংসার, শূন্য এক ছায়াবাজি
৫৪.
মারডালো
৫৫.
বড় সাধ ছিল
৫৬.
খোলকত্তাল
৫৭.
হিরের টুকরো
৫৮.
কোনওদিন শুনেছ, চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৫৯.
অধিকার করে অধিকারী হতে হয়
৬০.
কোথায় কী
৬১.
জীবন ও সাহিত্য
৬২.
শামা হর রঙ্গ মেঁ
৬৩.
যা ছিল, একদিন নেই হবে, যা ছিল না,তা একদিন আছে হবে, শেষ হবে না কিছুই
৬৪.
উলটোপাক
৬৫.
যুবক
৬৬.
কাজের সময় কাজি
৬৭.
সকাল সকাল ভোট দিন
৬৮.
শুভানুধ্যায়ী
৬৯.
ছাতা আর গামছার মাল্টিপারপাস ব্যবহার
৭০.
জোকার
৭১.
আসরটা যে করলে মাটি
৭২.
কাঠুরিয়া
৭৩.
মানুষ হয়ে মরতে চাই
৭৪.
উতলা দখিন বাতাসে
৭৫.
ভাঙলে কিছু গড়তে তো হবে
৭৬.
আতঙ্ক
৭৭.
নিগ্রহ
৭৮.
ছুটির সকাল
৭৯.
স্বপ্ন
৮০.
আয় কাটাকাটি করি
৮১.
কলকাতা—৩০০
৮২.
আপনি কার পেশেন্ট
৮৩.
শরৎকাল
৮৪.
পকেটমারি
৮৫.
দুর্বলের সংসার সবলের সন্ন্যাস
৮৬.
আমি ক্ষুদ্র প্রাণ এক
৮৭.
মন পাখিরে কৃষ্ণকথা বল
৮৮.
জন্ম যার কোলে মৃত্যুও তারই কোলে
৮৯.
কেউ যায় বাজারে পচা মাছ কিনতে,কেউ যায় এভারেস্টে উঠতে
৯০.
উঠে বোসো শালগ্রাম
৯১.
এইবার যাই কোথায়!
৯২.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
৯৩.
এসেছি কেঁদে, যাই যেন হেসে
৯৪.
নির্জনতায় আমরা ভয় পাই, সজনতায় বিরক্ত হই
৯৫.
নদী ডাকে, আয় চলে আয়
৯৬.
কেউ ঘুমোয় কেউ জাগে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%