ছাতা আর গামছার মাল্টিপারপাস ব্যবহার

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

রবিবারের বিকেলে মিত্তির ডাক্তারের বাড়িতে একটা আড্ডা বসে। আজকাল নতুন নিয়ম হয়েছে, রবিবার চেম্বার বন্ধ। রুগি দেখা হবে না। রবিবার যে খাবি খাবে, সোমবার সে ডেথ সার্টিফিকেট পাবে। নামি ডাক্তারবাবুরা শহরের বাইরে উদ্যানবাটী রচনা করেছেন। শনিবার বিকেলে শেষ রুগিকে বিদায় করে এ/সি গাড়িতে ফুড়ুড় ফুড়ূড়। বাগানে গাড়ি ঢোকামাত্রই জেনারেটর ভটভট। কুকুরও অক্সিজেন নিতে যায়।

সকালে স্বহস্তে পেঁপে গাছের পরিচর্যা। পুঁইশাকের পাতা চেক। করলাম ভারমাটাইটিস। লাল নটের অ্যানিমিয়া। লাউগাছের মিসক্যারেজ। ফুল হচ্ছে ফল হচ্ছে না, উদ্যানচর্চার পর সাহিত্যচর্চা। উগ্র প্রেমের লতানে কবিতা। একটা বই 'অলরেডি' বেরিয়ে গিয়েছে। বত্রিশ পাতার বই। তিন ইঞ্চি পুরু মোটা দুটো মলাট। দ্বিতীয়টি যন্ত্রস্থ। জীবন যন্ত্রণার কাব্যরূপ। একটি উদাহরণ,

প্রদাহের দাহ, ফুসফুসে ফাইমোসিস

হৃদয়ে এনজাইনাপেকটেরিস

ফুটো পাকস্থলী রক্তমুখী একডজন আলসার

অনুপম, খালি পেটে সাজাও অক্ষরের মালা

বিউটি পারলারে শুয়ে থাক অনুপমা।

মিত্তিরের এসব ব্যামো নেই। কলকাতার বাইরে প্রচুর সম্পত্তি ছিল। কেয়ারটেকারদের কেয়ারে চলে গিয়েছে। খেতে আর খাওয়াতে ভালোবাসে। ভুঁড়িতে বেল্ট বেঁধে বাইশটা ল্যাংড়া এক সিটিং-এ। মিত্তিরের থিওরি হল, বাড়তে না দিলেই বাড়বে না, যেমন ঝগড়া, তেমনই ভুঁড়ি। অনেকদিন পরে প্রমোদ এল। আমরা নাম রেখেছি, মিস্টার অ্যাংজাইটি। আশুকে জিজ্ঞেস করলে, ''কাল ওটা কী কিনলে? ঘি?''

''ঠিক দেখেছ। প্রথম পাতে গরম ভাতে দু-চামচে ঘি, সে যে কী স্বাদ!''

''কাট আর কাঠ দুটোরই ব্যবস্থা রাখ। যে-কোনো দিন যে-কোনো সময় থেমে যাবে।''

''কী থামবে?''

''হার্ট। এই বয়সে ঘি, তেল, নুন, ঝাল, টক, মিষ্টি খাবে না, স্পর্শ করবে না। তাকাবে না।''

''তা হলে খাব কী?''

''কত কী খাওয়ার আছে?''

''ভাই! গালাগাল ছাড়া কিছুই খাওয়ার নেই। ভালোবেসে যাকে বিয়ে করলুম, এনেছিলুম বাইশ কেজি, এখন সলিড বাহাত্তর কেজি। ডবল খাটে আগে হেসেখেলে একটা পাশবালিশ নিয়ে শুতে পারতুম। এখন তিনি শুয়েই বলেন, একটু সরে শোও। আমি সারারাত কার্নিসে ঝুলে থাকার মতো ঝুলে থাকি। পরের জন্মে সিওর রাজমিস্তিরি হব। হাত ধরে না তুললে উঠতে পারে না, আমাকে বলে বুড়ো ভাম।''

প্রমোদ কান্তিকে জিজ্ঞেস করলে, 'সেফটিপিন দিয়ে দাঁত খোঁটবার অভ্যাসটা কবে থেকে হল?'

''মানে! দাঁতই নেই তো দাঁত খোঁচানো। আমার তো ফলস টিথ।''

''তা হলে সেফটিপিন কিনলে কেন?''

''বাড়ির হুকুম।''

''রেডি থাক। সেপটিক হল বলে।''

''আজকাল তো টুথপিক বেরিয়ে গিয়েছে। তা হলে সেফটিপিন দিয়ে খোঁচাবে কেন?'' প্রমোদ মুখভঙ্গি করে বললে, ''মেয়েদের তুমি কতটুকু চেন? হাতের ঠ্যালা দিলেই তো একটা লোক ঘুম থেকে উঠতে পারে, তা হলে আমার বউ কেন লম্বা একটা ছাতার বাঁট দিয়ে পিঠে গ্যাঁত করে গোঁত্তা মারে? কেন মারে?''

আমাদের সকলেরই সমবেত প্রশ্ন, ''কেন মারেন?''

''পুরনো কালের লম্বা ছাতা, ওটা যাতে ব্যবহার থাকে। ওটার নতুন নাম হয়েছে, 'জাগরণ দণ্ড'। সেকালের পাওনাদারদের হাতে ওই ছাতারই নাম হত 'আকর্ষণ দণ্ড', দেনাদার পালাচ্ছে, পেছন দিক থেকে গলায় বাঁকানো হাতলটি ফিট করে দাও। তারপর হিন্দি ভাষায়, খিঁচকে চিৎপাত। ছাতা আর গামছার মাল্টিপারপাস ব্যবহার।''

গামছা নিজের গলায় দিয়ে ঝুলে পড়। গামছা তখন গুরু, ভবসাগর তারণ কারণ হে। গামছা অন্যের গলায় দিয়ে মারো টান। গামছা গলায় দিয়ে পাওনা আদায়। পুরোহিত মশাইয়ের সঙ্গে থাকে পুরোহিত দর্পণ ও একটি গামছা। গামছা ইজ মোর ইম্পর্ট্যান্ট দ্যান দর্পণ। সব হয়ে যাওয়ার পর ওই গামছায় বাঁধা হবে যাবতীয় চাল, কলা নৈবেদ্য। পুরোহিত মশাইকে জিজ্ঞেস করলুম, একটু আগে পা মুছলেন, সেই গামছায় এইসব বাঁধলেন? উত্তর হল, ''আরে এতো সব ভগবানের উচ্ছিষ্ট। সার ভাগ তো তিনি টেনে নিয়েছেন। এ হল ছিবড়ে।'' তুমি তোয়ালে কাঁধে পুরোহিত দেখতে পাবে না, পুজোয়, শ্রাদ্ধে তোয়ালে দিলে চলবে না। গামছা। সোনার ঘটেও ডাবের উপর ভাঁজ করা লাল গামছা। গামছা হল আধ্যাত্মিক বস্তু। স্বর্গের দেবতারা আর আমাদের পূর্বপুরুষেরা সব গামছা পরে ঘুরে বেড়ান। হিন্দিতে কথা বলেন, আর খইনি খেয়ে পিচ পিচ থুতু ফেলেন, সেই থুতুই হল বৃষ্টি। সেকালের কর্তাদের দেখেছি। গামছা দিয়ে নিজের পা মুছতে মুছতে সোহাগ করে ঘোমটা তুলে বউয়ের চোখ মোছাতে মোছাতে বলছে, ''ক্ষেমু কেঁদ না, কেঁদ না। বুড়িটাকে আমি পরের ডাকেই বেন্দাবন পাঠাচ্ছি।'' সেকালে সব নাম হত ক্ষেমঙ্করী, প্রলয়ঙ্করী, ভয়ঙ্করী। দেখ, দুটো পেটাই আছে, ঝাঁটা পেটা, ছাতা পেটা। আর জমিদারের জুতো পেটা। সে জুতোও নেই, সে ছাতাও নেই। এখন সব 'লিপস্টিক ছাতা'। 'ঠোঁটের রঙে রঙ মিলিয়ে ছাতার রঙ। শোনো, সেকালে মেয়েরা কাঁদতে আসত, একালে আসে কাঁদাতে।

সকল অধ্যায়
১.
টক ঝাল মিষ্টি
২.
ঘোরকলি
৩.
কেমন আছেন?
৪.
জীবন একটা বেয়াড়া ভাল্লুক
৫.
হতেছে পাগলের মেলা
৬.
সকাল
৭.
আশার কথা
৮.
আর বোলো না ভাই!
৯.
'পৃথিবীতে যত বেটা সব বেটা গোরু'
১০.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১১.
হাঁদা গঙ্গারাম
১২.
কে পরাবে সিঁদুর
১৩.
জীবনের জাতীয় সংগীত
১৪.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫.
বাস-মিনিবাসের লাইনে ঘোষ, বোস, মিত্তির
১৬.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৭.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৮.
বাঁদর
১৯.
কোরা কাগজ
২০.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
২১.
শান্তির সহজপাঠ
২২.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
২৩.
অনুসন্ধান
২৪.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
২৫.
প্রেমের শিকল
২৬.
বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
২৭.
ছদ্মবেশী
২৮.
প্রেম বাড়ছে
২৯.
হনুমান টুপি
৩০.
বারমুডা ট্র্যাঙ্গল
৩১.
আড়ং ধোলাই
৩২.
হেমন্তের সকাল
৩৩.
হাতপাখা
৩৪.
খেলা
৩৫.
সন্দেহ
৩৬.
পেটে খেলে পিঠে সয়
৩৭.
শেয়াল পণ্ডিতের পাঠশালা
৩৮.
আমার আছে তোমার নেই
৩৯.
ধ্যাততেরিকা সংসার
৪০.
মায়ার খেলা, মায়ের খেলা
৪১.
যে ট্রেনের কোনো ইস্টিশন নেই
৪২.
সুখের লাগিয়া
৪৩.
টেকনিক
৪৪.
বাপের চা
৪৫.
অনশন
৪৬.
এ চোর সে চোর নয়
৪৭.
পরনিন্দা পরচর্চা
৪৮.
অমর বাঙালি
৪৯.
পথের শেষ কোথায়!
৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
৫১.
পুজোর পাঁচালি
৫২.
আকাশ যখন ছবির মতো নীল
৫৩.
সংসার, শূন্য এক ছায়াবাজি
৫৪.
মারডালো
৫৫.
বড় সাধ ছিল
৫৬.
খোলকত্তাল
৫৭.
হিরের টুকরো
৫৮.
কোনওদিন শুনেছ, চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৫৯.
অধিকার করে অধিকারী হতে হয়
৬০.
কোথায় কী
৬১.
জীবন ও সাহিত্য
৬২.
শামা হর রঙ্গ মেঁ
৬৩.
যা ছিল, একদিন নেই হবে, যা ছিল না,তা একদিন আছে হবে, শেষ হবে না কিছুই
৬৪.
উলটোপাক
৬৫.
যুবক
৬৬.
কাজের সময় কাজি
৬৭.
সকাল সকাল ভোট দিন
৬৮.
শুভানুধ্যায়ী
৬৯.
ছাতা আর গামছার মাল্টিপারপাস ব্যবহার
৭০.
জোকার
৭১.
আসরটা যে করলে মাটি
৭২.
কাঠুরিয়া
৭৩.
মানুষ হয়ে মরতে চাই
৭৪.
উতলা দখিন বাতাসে
৭৫.
ভাঙলে কিছু গড়তে তো হবে
৭৬.
আতঙ্ক
৭৭.
নিগ্রহ
৭৮.
ছুটির সকাল
৭৯.
স্বপ্ন
৮০.
আয় কাটাকাটি করি
৮১.
কলকাতা—৩০০
৮২.
আপনি কার পেশেন্ট
৮৩.
শরৎকাল
৮৪.
পকেটমারি
৮৫.
দুর্বলের সংসার সবলের সন্ন্যাস
৮৬.
আমি ক্ষুদ্র প্রাণ এক
৮৭.
মন পাখিরে কৃষ্ণকথা বল
৮৮.
জন্ম যার কোলে মৃত্যুও তারই কোলে
৮৯.
কেউ যায় বাজারে পচা মাছ কিনতে,কেউ যায় এভারেস্টে উঠতে
৯০.
উঠে বোসো শালগ্রাম
৯১.
এইবার যাই কোথায়!
৯২.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
৯৩.
এসেছি কেঁদে, যাই যেন হেসে
৯৪.
নির্জনতায় আমরা ভয় পাই, সজনতায় বিরক্ত হই
৯৫.
নদী ডাকে, আয় চলে আয়
৯৬.
কেউ ঘুমোয় কেউ জাগে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%