প্রেমের শিকল

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

ঢুকে যখন পড়েছি নাটক শেষ না হওয়া পর্যন্ত যে ভাবেই হোক বেঁচে থাকতে হবে। জীবনের কারগারে অসহায় বন্দি। এরই মধ্যে কেউ 'এ' ক্লাস প্রিজনার, কেউ অর্ডিনারি। বন্দির ছেলে বন্দি। মুক্ত কে! যে এখনও জন্মায়নি। লাইফ ইজ এ কেজ। কেউ সোনার খাঁচায় ডিম পাড়ে, কেউ লোহার খাঁচায়। সে সোনাই হোক, আর লোহাই হোক—খাঁচা ইজ খাঁচা।

ঢুকেছ কি মরেছ। কিছুকাল বোঝা যাবে না, তখন আমাদের পৌগণ্ড অবস্থা। জ্ঞানগম্মি হয়নি। কোথায় এসেছি, কার কাছে এসেছি, ইমারত, আটচালায়, না ফুটপাতে তাও জানি না। চুকচুক করে দুধ খাই, ঘুমোই, কাঁদি, শুয়ে শুয়েই বড় হই। হাত-পা মোটা মোটা হয়, অবশ্য যদি খেতে পাই, তা না হলে কাঠি কাঠি। তৃতীয় বিশ্বের মানুষ অবশ্য গায়ে গতরে তেমন বাড়ে না। কারণ প্রাোটিনের অভাব। মাথাটাই বড় হয়, কাজ বাড়ে না। আইনস্টাইন, রাসেল, ফেনম্যান, হকিং, টাইসন, হোলিফিলড, সব প্রথম বিশ্বের। ওদিকে সব ছ'ফুটের এপাশে-ওপাশে আমাদের বিশ্বে সব পাঁচের পর যত সারই পাক আর বড় জোর ইঞ্চি চারেক। ইউরোপের প্রমাণ মাপের মানুষের পাশে আমরা বামন।

একটাই সান্ত্বনা, বড় লংকার ঝাল কম, ধানি লংকার ঝাল বেশি। আমাদের ঝালের ঠেলায় প্রতিবেশীরা অস্থির। আমাদের রাগের ঠেলায় পরিবার কেটে যায়, বন্ধুরা ছিটকে পালায়, সংসার ভেঙে যায়। ঈর্ষায় ফসফস করে মাথার চুল উঠে যায়। অবশেষে চিতল মাছের পেটের মতো নির্বান্ধব একটি টাক। আরাপ কৌশলের শেষ নেই। কায়দা করে পিছনের চুল টেনে এনে টাক ঢাকার কসরত, যেন শাক দিয়ে মাছ ঢাকা। মজা এই, গোঁফ আর দাড়ি পড়তে জানে না। বিশ্বজোড়া টাক, এদিকে বাদুড়ঝোলা গোঁফ। ঠোঁটের দোতলা থেকে একতলার ওপর ঝাড়ু বোলায়। পাকা চুলে কলপ মেরে পঞ্চাশের পরেও প্রেমিকা খুঁজি।

সমস্ত সর্বনাশের মূলে এই প্রেম। প্রেমই শিকল পরায়, সংসারে ঢোকায়। মেয়েদের সর্বনাশা মুখ, অতল চোখের আহ্বান, কপালের টিপ, সরু সরু আঙুল, ঘাড়ের পরে আলগা খোঁপা, সুরে ভরা গলা, এমন এক ফাঁদ, যৌবনের চৌকাঠ থেকে পা বাড়ালেই অনিবার্য পতন, হাবুডুবু। ভালো সাঁতারু না হলে ঢোকে ঢোকে জল গিলে জীবন সরোবরের তীরে চিৎপাত।

প্রেম এক জিনিস, সংসার আর-এক জিনিস। প্রেম হল স্বপ্ন, সংসার হল দু:স্বপ্ন। দুই হবে তিন, তিন হবে চার। তখন টাকা টাকা। তখন প্রেমিকার অন্য রূপ, সপ্তমে ঝংকার —মুরোদ যদি না-ই ছিল মরদ, তা হলে কেন করেছিলে সংসার। পৃথিবীতে এমন কোনও প্রেমিকা নেই যে দরিদ্র স্বামীকে বলবে, ব্যাগ ফাঁকা তো কী হয়েছে ডারলিং, মন তো ফাঁকা হয়ে যায় নি। এসো না চাঁদের আলোয় দু'জনে হাতে হাত রেখে লায়লা-মজনু, হিররনঝার কথা বলি, পৃথিবীতে একমাত্র জিনিস, যা ফ্রি পাওয়া যায় তাই ঢুকুঢুকু খাই, অর্থাৎ পানি। পানির চেয়ে উত্তম পানীয় আর কী আছে প্রিয়তম। পিঠ আর পেট পিচবোট হয়ে যাক। আমরা হাসতে হাসতে প্রেমের জয়গান গাইতে গাইতে মরে যাই। আহা মরে যাই! এটা কী তোমার মামার বাড়ি!

প্রথমে ছিল চুনকাম করা দেয়াল। যেই দুটো পয়সা হল চড়িয়ে দিলে ইমালসান পেন্ট। আরও হল। পাখার পক্ষসাতন করে দেয়াল কেটে বসিয়ে দিলে ঠান্ডা বাক্স। বুকে বাসা বাঁধল শ্লেষ্মা, কণ্ঠস্বর ভারী হল। গাঁটে গাঁটে অবস্থান ধর্মঘটীদের মতো বসে পড়ল বাত। মুখেও বাত, গাঁটেও বাত। ছিল সাইকেল হল মোটর সাইকেল। বর্ষার রাস্তায় একদিন কুমড়োর ফালির মতো সড়াক। তিন মাস ট্র্যাকশান। নিজেকে আর একটু খেলিয়ে মোটর গাড়ি। হুস করে বেরিয়ে যায়, বাবু পেছনের আসনে গম্ভীর মুখ। মোটর মুখও বলা চলে। পরিচিতজনেরা হেসে কথা বলতে গিয়ে বাবুর রং দেখে চুপ মেরে যায়। আত্মীয়স্বজন ঘনিষ্ঠ হতে গিয়েও হয় না। গাড়ির বন্ধু পা-গাড়ি হতে পারে না।

বাবু চা ছেড়ে বোতল খান, গাড়ি খায় পেটরোল। বাবুর মধ্যপ্রদেশ ফুলতে থাকে। কোমরবন্ধনীর ফুটো কমতে থাকে। চোখ দুটো ক্রমশই স্বাভাবিক থেকে অস্বাভাবিক হতে থাকে, মৃত কাতলার মতো। বাবু আর আগের মতো হাসে না, ফিক করে। বাবুর বিচরণক্ষেত্র আলাদা হয় যায়। বাবুর দু-চোখের তলায় দুটো পুঁটলি। বাবুর রক্তে চিনি দেখা দেয়। বাবুর হৃদয় থেকে থেকে হাঁসফাঁস করে, হৃদয়মাপা যন্ত্রে ঢেউ খেলানো লাইন। ডাক্তার বলবেন, 'কত্তা, ভোগের দুর্ভোগ বাড়িয়ে বসেছ। ওজন বেড়ে গেছে। তুমি আর মানুষ নেই। ভারবাহী পশু হয়ে গেছ। নিজের দেহভার বইতে গিয়ে নিজের হৃদয়টিকে তার ক্ষমতার বেশি খাটিয়ে ফেলেছ। রক্তে চর্বি ঢুকিয়ে বসে আছ। ঘনত্ব বেড়ে গেছে। নিজেকে এইবার একটু খাটাও। হাঁটাচলা করো। বড়লোক হলেও প্রাণের দায়ে নিজেকে গরিব ভাব। গরিবের খাদ্য খাও। তিন কদম হাঁটতে হলদঘর্ম হলেও হাঁটো।'

একদিন দেখা গেল, বাবু গাড়ি ঠেলছেন। জনে জনে প্রশ্ন, কী হল সায়েব!'

জানলা দিয়ে মুখ বের করে জবাব দিলেন, 'একে বলে সেলফকে হেল্প করা, সেলফ হেল্প। গাড়ির সেলফ ফেঁসে গেছে, এখন ওনার ঘামের সঙ্গে মেদ ঝরছে। তিরিশ কেজি ওজন না কমালে বিপদ আছে।' স্বামীকে বললেন, 'ঠ্যালো ঠ্যালো, ফুর্তিসে ঠ্যালো। গাড়ি এখন আর হর্সপাওয়ারে চলবে না, ম্যানপাওয়ারে চলবে।'

সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে বাবু তখন জেগে বসে থাকেন। দেখেন নিশ্চিন্ত মানুষ কেমন অকাতরে ঘুমোয়। তাঁর কেন ঘুম আসে না। ধাপে ধাপে অনেকটা উঠে পড়েছেন। জীবনযাত্রার মানের মই। এ ওঠা বড় মজার। শেষে কোনও ছাত নেই। ধাপে ধারে শুধুই ওঠা। ঝুলে থাকা। মুঠো আলগা হলেই খসে পড়া। এ এমন এক খেলা, সাফল্যে হাততালি নেই, পতনেই হাততালি।

'কী গো, এখনও ঘুমোওনি, আমার তোফা এক রাউন্ড হয়ে গেল। তোমার কীসের এত দুশ্চিন্তা!'

'তুমি আর বুঝবে কী! তোমরা তো আরোহী। ঠেলছি আমি। গাড়ির ব্যাটারি পালটানো যায়, মানুষের ব্যাটারি ভোলটেজ মেরে একবারই ছাড়া হয় ওয়ার্কশপ থেকে। তারপর ডাউন, ডাউন, ডাউন, নিল ডাউন, ডাউন টু আর্থ। ধুলো শরীর ধুলাতেই মিশায়। ঘুম কেন আসে না। মুঠো আলগা হয়ে আসছে। ভয়। ভীষণ আতঙ্ক, মরার আগেই যদি মই থেকে পড়ে যাই। ধরিত্রী ছাড়া কে আর কোল দেবে!'

সকল অধ্যায়
১.
টক ঝাল মিষ্টি
২.
ঘোরকলি
৩.
কেমন আছেন?
৪.
জীবন একটা বেয়াড়া ভাল্লুক
৫.
হতেছে পাগলের মেলা
৬.
সকাল
৭.
আশার কথা
৮.
আর বোলো না ভাই!
৯.
'পৃথিবীতে যত বেটা সব বেটা গোরু'
১০.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১১.
হাঁদা গঙ্গারাম
১২.
কে পরাবে সিঁদুর
১৩.
জীবনের জাতীয় সংগীত
১৪.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫.
বাস-মিনিবাসের লাইনে ঘোষ, বোস, মিত্তির
১৬.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৭.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৮.
বাঁদর
১৯.
কোরা কাগজ
২০.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
২১.
শান্তির সহজপাঠ
২২.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
২৩.
অনুসন্ধান
২৪.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
২৫.
প্রেমের শিকল
২৬.
বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
২৭.
ছদ্মবেশী
২৮.
প্রেম বাড়ছে
২৯.
হনুমান টুপি
৩০.
বারমুডা ট্র্যাঙ্গল
৩১.
আড়ং ধোলাই
৩২.
হেমন্তের সকাল
৩৩.
হাতপাখা
৩৪.
খেলা
৩৫.
সন্দেহ
৩৬.
পেটে খেলে পিঠে সয়
৩৭.
শেয়াল পণ্ডিতের পাঠশালা
৩৮.
আমার আছে তোমার নেই
৩৯.
ধ্যাততেরিকা সংসার
৪০.
মায়ার খেলা, মায়ের খেলা
৪১.
যে ট্রেনের কোনো ইস্টিশন নেই
৪২.
সুখের লাগিয়া
৪৩.
টেকনিক
৪৪.
বাপের চা
৪৫.
অনশন
৪৬.
এ চোর সে চোর নয়
৪৭.
পরনিন্দা পরচর্চা
৪৮.
অমর বাঙালি
৪৯.
পথের শেষ কোথায়!
৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
৫১.
পুজোর পাঁচালি
৫২.
আকাশ যখন ছবির মতো নীল
৫৩.
সংসার, শূন্য এক ছায়াবাজি
৫৪.
মারডালো
৫৫.
বড় সাধ ছিল
৫৬.
খোলকত্তাল
৫৭.
হিরের টুকরো
৫৮.
কোনওদিন শুনেছ, চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৫৯.
অধিকার করে অধিকারী হতে হয়
৬০.
কোথায় কী
৬১.
জীবন ও সাহিত্য
৬২.
শামা হর রঙ্গ মেঁ
৬৩.
যা ছিল, একদিন নেই হবে, যা ছিল না,তা একদিন আছে হবে, শেষ হবে না কিছুই
৬৪.
উলটোপাক
৬৫.
যুবক
৬৬.
কাজের সময় কাজি
৬৭.
সকাল সকাল ভোট দিন
৬৮.
শুভানুধ্যায়ী
৬৯.
ছাতা আর গামছার মাল্টিপারপাস ব্যবহার
৭০.
জোকার
৭১.
আসরটা যে করলে মাটি
৭২.
কাঠুরিয়া
৭৩.
মানুষ হয়ে মরতে চাই
৭৪.
উতলা দখিন বাতাসে
৭৫.
ভাঙলে কিছু গড়তে তো হবে
৭৬.
আতঙ্ক
৭৭.
নিগ্রহ
৭৮.
ছুটির সকাল
৭৯.
স্বপ্ন
৮০.
আয় কাটাকাটি করি
৮১.
কলকাতা—৩০০
৮২.
আপনি কার পেশেন্ট
৮৩.
শরৎকাল
৮৪.
পকেটমারি
৮৫.
দুর্বলের সংসার সবলের সন্ন্যাস
৮৬.
আমি ক্ষুদ্র প্রাণ এক
৮৭.
মন পাখিরে কৃষ্ণকথা বল
৮৮.
জন্ম যার কোলে মৃত্যুও তারই কোলে
৮৯.
কেউ যায় বাজারে পচা মাছ কিনতে,কেউ যায় এভারেস্টে উঠতে
৯০.
উঠে বোসো শালগ্রাম
৯১.
এইবার যাই কোথায়!
৯২.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
৯৩.
এসেছি কেঁদে, যাই যেন হেসে
৯৪.
নির্জনতায় আমরা ভয় পাই, সজনতায় বিরক্ত হই
৯৫.
নদী ডাকে, আয় চলে আয়
৯৬.
কেউ ঘুমোয় কেউ জাগে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%