ছদ্মবেশী

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

তখন আমি কিশোর। স্কুলেও ভরতি হইনি। বাড়িতেই চলছে শিক্ষার তালিম। সেকালের নিয়ম ছিল, বাড়িতে ভিতটা একটু শক্ত করে স্কুলে পাঠানো। সেই কারণে আমাদের জীবনে মাঠ ছিল, দুপুর ছিল, রোদে পোড়া আকাশ ছিল, ফড়ফড়ে ঘুড়ি ছিল। দুপুরে বড়দের বিশ্রামের অবকাশে কুলুঙ্গি থেকে বয়াম খুলে আচার চুরির উত্তেজক আনন্দ ছিল।

আমাদের বাড়িটা ছিল পুরনো। বলা হত ডাচদের কুঠি বাড়ি। কেউ কেউ বলত ভূতের বাড়ি। মোটা মোটা দেয়াল। মেঝে থেকে ছাত পর্যন্ত লম্বা লম্বা গরাদ বসানো জানলা। চারপাশে গাছপালা ঝোপঝাড়। রাত্তিরবেলা হারিকেনের আলোয় এ মহল থেকে ও মহলে যেতে, ভয়ে গা শিরশির করত। মাঝরাতে ছাতে নানারকম শব্দ হত। পেঁচা ডাকত প্রহরে প্রহরে।

সে বেশ মজার কাল ছিল। ভয় আর কল্পনা জড়ানো সরল শৈশব। একদিন দুপুরে দেখি জানলার বেদিতে এক মুঠো খুচরো পয়সা পড়ে আছে। যোগ, বিয়োগ, গুণভাগ করতে করতে নজর হঠাৎ সেই দিকে চলে গেল।

পয়সা!

পয়সা মানে, গুলি, লাট্টু, লেত্তি, ঘুড়ি, লজেন্স, মোড়ের মাথার তেলেভাজার দোকানের কচুরি আর শালপাতার ঠোঙায় ঘুগনি।

কার পয়সা! কে রেখেছে ওইখানে!

দুষ্টু মনকে সরিয়ে যোগে বসালুম। হোমটাস্ক। ঠিকঠাক না হলে রাতটা ভীষণ হবে। মন আবার পয়সার দিকে চলে গেল।

পয়সা মানে শাঁক সন্দেশ, লটারি, চাকা ঘুরিয়ে আচারের প্যাকেট, লাড্ডু। পয়সা মানে রবারের বল, জলছবির পাতা। হঠাৎ মনে পড়ল, বইতে লেখা আছে, 'না বলিয়া পরের দ্রব্য লওয়াকে চুরি বলে।'

মনকে সরিয়ে এনে ভাগে বসালুম। বাইরে বিরাট দুপুর। ঝকঝকে গাছের পাতা। ডুমো ডুমো কালো ভোমরা, ভীমরুলের ভোঁ ভোঁ। পাশের মাঠে কালো গোরু মশমশ করে ঘাস খাচ্ছে। পেয়ারা গাছে বড় বড় টিয়ার ঝাঁক পেয়ারা ঠোকরাচ্ছে। একটু পরেই মাঠে ফুটবল পড়বে। দুরন্ত খেলা। বলে শট মারার ঢিসঢাস শব্দ। বড়দের খেলায় আমাদের স্থান নেই। আমাদের প্রিয় খেলা হুসহুস। সারা গ্রাম দাপিয়ে। পুকুর পাড় দিয়ে, আঁস্তাকুড় টপকে, ভাঙা পাঁচিলের ফোকর গলে। হুসহুস ছিল চোরচোরেরই বৃহৎ সংস্করণ। যে চোর হবে তাকে প্রথমেই সংগ্রহ করতে হবে, নির্দেশিত গাছের পাতা, যেমন, হুসহুস জামপাতা। একটা জামপাতা হাতে নিয়ে সে এবার খুঁজতে বেরোবে অন্যদের। এইভাবে চেনা হয়ে যেত গাছ। চেনা হয়ে যেত পল্লির অলিগলি, প্রতিটি মানুষ।

ভাগের পর গুণ। আবার পয়সার দিকে মন। বসেবসেই সেই দিকে সরে গেলুম। কেউ দেখছে না আমাকে। নিস্তব্ধ, নির্জন বাড়ি। বড়রা অফিসে। মায়েরা দিবানিদ্রায়। গুণে গেঁথে দেখলুম, একটাকা চোদ্দো আনা।

এক আনায় ফুলো ফুলো গরম দুটো কচুরি, সঙ্গে এক হাতা গোটা গোটা ঘুগনি।

এক আনায় দশটা গুলি লজেন্স। এক আনায় একটা ডাকিয়াল লাট্টু। ভয়ংকর লোভে ভেতরটা আচ্ছন্ন হয়ে গেল। কার পয়সা! বড়দেরই কারো। তাহলে পরের কেন হবে! এ পয়সা আমারই। তাহলে পয়সা, তোমরা পকেটে যাও। বেদি খালি। ওদিকে আর তাকাবার দরকার নেই। টপাটপ অঙ্ক হয়ে গেল।

সেইকালে একটাকা চোদ্দো আনা মানে বিরাট ব্যাপার।

ঘুড়ি, লাটাই, সুতো সব হয়েও লাট্টু আর গুলি কেনার পয়সা বাঁচবে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলুম খেলার সাজে। পাশ পকেটে ঝমঝম করছে পয়সা। নিজেকে যেন বাবা, বাবা, কাকা, কাকা লাগছে। কেনাকাটায় নেমে পড়লেই হয়।

সেই ঠেলা গাড়িটা আসছে। বরফ কুরে কুরে ছোট্ট একটা খুরিতে চাপ তৈরি করে ওপরে লাল সিরাপ ঢেলে দেয়। মাত্র দু পয়সা। গাড়ি দাঁড় করিয়ে সেই একটা কিনে ফেললুম। রবিদের রকে বসে বেশ তারিয়ে, তারিয়ে, সুৎসাৎ আওয়াজ করে খাওয়া গেল। আত্মার অসীম শান্তি। এরপরে কী খাওয়া যায়।

তখন এক ধরনের আচার বেরিয়েছিল। প্যাকেটের মধ্যে ছোট্ট শালপাতার মোড়ক। প্রত্যেকটায় একটা না একটা পুরস্কার থাকত, হয় চুলের কাঁটা, না হয় সেফটি পিন, না হয় কলমের নিব, অথবা কাগজের টুকরো, দোকানে দেখালে জলছবি কিংবা চাবির রিং পাওয়া যেত। খেতেও সুস্বাদু। টকটক, মিষ্টি মিষ্টি।

গোটা কুড়ি গুলি লজেন্স কিনে গঙ্গার ধারে গিয়ে বসলুম। সঙ্গীরা সব জড় হল। সূর্যাস্তের আগেই লজেন্স শেষ। এসে গেল লম্ভ জ্বালানো চাপ থালা ঘুগনি। গোটা গোটা কাঁচা লংকা গোঁজা। সেই খাওয়া হল। সকল ইচ্ছাপূরণের দেবতা তো পকেটে ঝমঝম করছে।

দিবাবসানে লক্ষ্মী ছেলে ঘরে এল। বন্ধুবান্ধব বিদায়। একা খাড়া, ঢোকার দরজার সামনে। সব আনন্দ শেষ। অপরাধের বোঝা কাঁধে। এটা কী করলি। কার পয়সা উড়িয়ে এলি! একটা ভয়, একটা আতঙ্ক।

বাড়ির সবাই অফিস থেকে ফিরে এলেন।

হঠাৎ জ্যাঠামশাই বললেন, 'এখানে সকালে কিছু খুচরো পয়সা রেখেছিলুম, কেউ কি তুলেছে!'

সকলকেই পর্যায়ক্রমে জিজ্ঞেস করা হল! শেষে আমাকে।

অম্লানবদনে মিথ্যা কথা, 'কই না তো!'

উত্তরটা দিয়ে জোরে জোরে পড়া শুরু করে দিলুম।

বাবা বললেন, 'যদি নিয়ে থাক, সত্য কথা বল। আমরা কেউ কিছু বলব না।'

আমি তখনও স্বীকার করলুম না। সকলেই তখন বললেন, 'ও নেবার ছেলে নয়।'

'তা হলে কার কাজ। ডাকো সুবোধকে।'

সুবোধ আমারই বয়সী। কাজের ছেলে। বিশ্বাসী। সকলেরই প্রিয়। তবু সন্দেহ।

সে বললে, 'মেজোবাবু সকাল থেকে আমি এ ঘরেই আসিনি।'

'তা হলে গেল কোথায়। আমাদের লক্ষ্মীর মা এত বছর কাজ করছে, কোনোদিন কিছু নেয়নি, সে তো নেবে না।'

তখন সিদ্ধান্ত হল চালপড়া করা হবে, অপরাধী সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়ে যাবে।

'ডাকো মণিকে।'

পাশেই মন্দিরে থাকেন। ঝাড়ফুঁক, তুকতাকে ওস্তাদ।

মণিদার কথা শুনে ভয় পেয়ে স্বীকার করলুম, 'আমি নিয়েছি।'

'তুমি?' বাবা গর্জন করে উঠলেন। ভীষণ রাগী মানুষ। 'তুমি চোর!'

সঙ্গে সঙ্গে সুবোধ বললে, 'ছোটবাবু, আমিই নিয়েছি।'

'কোথায় সেই পয়সা!'

'খেয়ে ফেলেছি।'

সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল বেধড়ক মার।

রাতে সুবোধের জ্বর এসে গেল। চোরের কথা আর কারো মনে রইল না। রাত হল। সবাই ঘুমে। আমার আর ঘুম আসে না। আমি চোর। বাবুর ছেলে তাই কেউ বিশ্বাস করল না। বরং কত প্রশংসা, সুবোধকে বাঁচাবার জন্য নিজের ঘাড়ে দোষ টেনে নিচ্ছে। কী হৃদয়! এরকম ছেলে লাখে একটা পাওয়া যায়!

অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে সুবোধ যেখানে শুয়ে আছে সেইখানে গেলুম।

জেগেই আছে। ফিস ফিস করে বললুম, 'সুবোধ!'

'বলো।'

'খুব লেগেছে!'

'না।'

'এমন করলি কেন?'

'তোমাকে সবাই ভালো ছেলে বলে জানে। চাকর তো চুরি করবেই। যাও চলে যাও।'

ফিরে এলুম। নিদ্রিত পৃথিবী। সত্য জেগে আছে। জেগে আছে নিভৃতে, অন্তরালে। দৃশ্য সত্যের আড়ালে অদৃশ্য সত্য। অ্যাপারেন্ট ট্রুথ অ্যান্ড রিয়েল ট্রুথ।

সেই সুবোধ মানুষ হিসেবে আমাকে মেরে বেরিয়ে গেছে। মোটর মেকানিক থেকে গ্যারেজের মালিক। শুধু গ্যারেজের মালিক নয় নিজেরও মালিক। একশো ভাগ সৎ, চরিত্রবান, দাতা, দয়ালু। যার দু:খ সে যত না কাঁদে, সুবোধ তার চেয়ে বেশি কাঁদে। থেকে থেকে বলে, 'যাই চান করিয়ে আনি।'

'কাকে রে?'

'মনটাকে।'

সাধুসঙ্গ হল মনের স্নান। আক্ষেপ করে, গ্যারেজে কত ইঞ্জিনের টিউনিং করি, এমন কোনো গ্যারেজ নেই যেখানে মানুষের টিউনিং করা যায়। আমার গ্যারেজ ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ। যেই দেখি তেল বেশি খাচ্ছি, মাইলেজ কম দিচ্ছি, সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে গ্যারেজ করে দি দিন দুইয়ের জন্য। সেখানে বসে আছেন তিনজন পাকা মেকানিক, শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামীজি আর মা সারদা। ঠাকুর টিউন করেন, স্বামীজি ব্যাটারি আর ডায়নামো চার্জ করেন আর মা সারদা গ্রিজ মেরে দেন। তিন মেকানিকের বিরাট গ্যারেজ।

এই সুবোধ মিস্ত্রি একদিন সত্যটা ফাঁস করে দিয়েছিল।

পয়সাটা যে আমিই সরিয়েছিলুম সেটা আমার বাবা, সুবোধের ছোটবাবু তখনই জেনে ফেলেছিলেন, আমাকে শেখাবার জন্যই সুবোধকে বেদম প্রহার। আর অন্তর্ভেদী চিৎকার, তুই চোর, ছি ছি, তুই চোর। সেই রাতে আমি যাবার আগেই বাবা সুবোধের কাছে গিয়ে বেলেডোনা খাইয়েছিলেন, আর কান্নাজড়ানো গলায় বলেছিলেন, 'সুবোধ! আমি তোকে চিনেছি, তুই ছদ্মবেশী। তুই নকল মানুষ নয় প্রকৃত একজন মানুষ হবি।'

সুবোধ যখন বলে, 'আমার জন্মজন্মান্তরের বাবা ছোটবাবু, তিনি প্রভু আমি দাস— তখন আমি লজ্জায় মাথা হেঁট করি। আমি একটা ক্রিচার সুবোধ একজন ম্যান।'

সকল অধ্যায়
১.
টক ঝাল মিষ্টি
২.
ঘোরকলি
৩.
কেমন আছেন?
৪.
জীবন একটা বেয়াড়া ভাল্লুক
৫.
হতেছে পাগলের মেলা
৬.
সকাল
৭.
আশার কথা
৮.
আর বোলো না ভাই!
৯.
'পৃথিবীতে যত বেটা সব বেটা গোরু'
১০.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১১.
হাঁদা গঙ্গারাম
১২.
কে পরাবে সিঁদুর
১৩.
জীবনের জাতীয় সংগীত
১৪.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫.
বাস-মিনিবাসের লাইনে ঘোষ, বোস, মিত্তির
১৬.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৭.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৮.
বাঁদর
১৯.
কোরা কাগজ
২০.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
২১.
শান্তির সহজপাঠ
২২.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
২৩.
অনুসন্ধান
২৪.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
২৫.
প্রেমের শিকল
২৬.
বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
২৭.
ছদ্মবেশী
২৮.
প্রেম বাড়ছে
২৯.
হনুমান টুপি
৩০.
বারমুডা ট্র্যাঙ্গল
৩১.
আড়ং ধোলাই
৩২.
হেমন্তের সকাল
৩৩.
হাতপাখা
৩৪.
খেলা
৩৫.
সন্দেহ
৩৬.
পেটে খেলে পিঠে সয়
৩৭.
শেয়াল পণ্ডিতের পাঠশালা
৩৮.
আমার আছে তোমার নেই
৩৯.
ধ্যাততেরিকা সংসার
৪০.
মায়ার খেলা, মায়ের খেলা
৪১.
যে ট্রেনের কোনো ইস্টিশন নেই
৪২.
সুখের লাগিয়া
৪৩.
টেকনিক
৪৪.
বাপের চা
৪৫.
অনশন
৪৬.
এ চোর সে চোর নয়
৪৭.
পরনিন্দা পরচর্চা
৪৮.
অমর বাঙালি
৪৯.
পথের শেষ কোথায়!
৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
৫১.
পুজোর পাঁচালি
৫২.
আকাশ যখন ছবির মতো নীল
৫৩.
সংসার, শূন্য এক ছায়াবাজি
৫৪.
মারডালো
৫৫.
বড় সাধ ছিল
৫৬.
খোলকত্তাল
৫৭.
হিরের টুকরো
৫৮.
কোনওদিন শুনেছ, চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৫৯.
অধিকার করে অধিকারী হতে হয়
৬০.
কোথায় কী
৬১.
জীবন ও সাহিত্য
৬২.
শামা হর রঙ্গ মেঁ
৬৩.
যা ছিল, একদিন নেই হবে, যা ছিল না,তা একদিন আছে হবে, শেষ হবে না কিছুই
৬৪.
উলটোপাক
৬৫.
যুবক
৬৬.
কাজের সময় কাজি
৬৭.
সকাল সকাল ভোট দিন
৬৮.
শুভানুধ্যায়ী
৬৯.
ছাতা আর গামছার মাল্টিপারপাস ব্যবহার
৭০.
জোকার
৭১.
আসরটা যে করলে মাটি
৭২.
কাঠুরিয়া
৭৩.
মানুষ হয়ে মরতে চাই
৭৪.
উতলা দখিন বাতাসে
৭৫.
ভাঙলে কিছু গড়তে তো হবে
৭৬.
আতঙ্ক
৭৭.
নিগ্রহ
৭৮.
ছুটির সকাল
৭৯.
স্বপ্ন
৮০.
আয় কাটাকাটি করি
৮১.
কলকাতা—৩০০
৮২.
আপনি কার পেশেন্ট
৮৩.
শরৎকাল
৮৪.
পকেটমারি
৮৫.
দুর্বলের সংসার সবলের সন্ন্যাস
৮৬.
আমি ক্ষুদ্র প্রাণ এক
৮৭.
মন পাখিরে কৃষ্ণকথা বল
৮৮.
জন্ম যার কোলে মৃত্যুও তারই কোলে
৮৯.
কেউ যায় বাজারে পচা মাছ কিনতে,কেউ যায় এভারেস্টে উঠতে
৯০.
উঠে বোসো শালগ্রাম
৯১.
এইবার যাই কোথায়!
৯২.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
৯৩.
এসেছি কেঁদে, যাই যেন হেসে
৯৪.
নির্জনতায় আমরা ভয় পাই, সজনতায় বিরক্ত হই
৯৫.
নদী ডাকে, আয় চলে আয়
৯৬.
কেউ ঘুমোয় কেউ জাগে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%