সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
মৃত্যুর পরে কোথায় যাব জানি না, তবে প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে যদি স্বর্গে যাই, তাহলে ঈশ্বরের সঙ্গে অবশ্যই দেখা হবে একবার। অবশ্যই তিনি শতকাজে ব্যস্ত থাকবেন, তবু একবার কি দর্শন দেবেন না! জীবনে বসে স্বর্গ সম্পর্কে ক্ষুদ্র বুদ্ধির অনুমান এই রকম, জায়গাটা অনেকটা থানার মতোই হবে। ভগবান হলেন অফিসার ইনচার্জের মতো। টেলিফোন, ওয়্যারলেস ইত্যাদি নিয়ে বসে আছেন। পৃথিবীর নানা আউটপোস্ট থেকে অনবরত খবর আসছে, অভিযোগ আসছে। তিনি তাঁর অদৃশ্য ফৌজ পাঠাচ্ছেন। কেউ বিচার পাচ্ছে কেউ পাচ্ছে না। চোরের টাকা বাড়ছে, সাধু অনাহারে মরছে। পাপী নৃত্য করছে, নিরপরাধী জেলে মেয়াদ খাটছে। পৃথিবীর জ্ঞানীরা বলছেন, ভগবানের কাজের বিচার কোরো না। মানুষের সীমিত জ্ঞান ও বোধে সেই বিরাটকে বোঝা সম্ভব নয়। তিনি যা করেন সবই মঙ্গলের জন্য। হি ইজ ডিসপেনসিং জাস্টিস।
তিনি সাপ হয়ে তোমাকে ছোবল মারলেন, তুমি মারা গেলে। এতে মঙ্গলটা কোথায়! আরে, তিন বছর পরে তুমি ক্যানসারে তিনমাস অকথ্য যন্ত্রণা ভোগ করে মারা যেতে, ঈশ্বর সর্প হয়ে তোমাকে এক ছোবলে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন। তুমি আগেই মরে গেলে তাই বুঝতে পারলে না তিনমাস পরে তোমার জন্য কী অপেক্ষা করে ছিল। আগেই মারা পড়ে কী বাঁচাটাই তুমি বেঁচে গেলে।
হঠাৎ সি টি সি-র বাস তোমার ঘাড়ে চেপে বসল। তুমি চিরকাল চাপবে? মামার বাড়ির আবদার! বাস তোমাতে চাপল। তুমি ছাতার মতো ছেতরে গেলে। কী মঙ্গল হল। অবশ্যই হল। পাওনাদারদের হাত থেকে বাঁচালে। নিত্য দশটা পাঁচটার হাত থেকে মুক্তি পেলে। শত দুশ্চিন্তার হাত থেকে উদ্ধার পেলে। মেয়ের বিয়ে, ছেলের এড়ুকেশান, স্ত্রীর অম্বল, নিজের বাত, মুখের এবং গাঁটের।
ভগবানের সঙ্গে দেখা হলে নিশ্চয় কুশলাদি জিজ্ঞেস করবেন। প্রথমেই প্রশ্ন করবেন,
'কিসে করে এলে?'
'আজ্ঞে ক্যানসারে চেপে এলুম। হেপাটাইটিসেই আসছিলুম। ভেঙে গেল। মাঝপথেই কয়েক বছর ঝুলে থেকে সিওর রুট ক্যানসারেই উঠে পড়লুম। মাস তিনেক লাগল আপনার কাছে আসতে।'
'তা বেশ! খুব কষ্ট হল।'
'না তেমন আর কী। কলকাতার বাস, ট্রেন, মিনি, মেট্রো চাপার অভ্যাস আছে তো। তারই একটু উনিশ-বিশ। তবে ভাড়াটা একটু বেশি লেগে গেল। ওই পুবের জানলা খুলে দেখুন, আমার পাথেয় জোগাতে পরিবার-পরিজন ভিটে মাটি চাঁটি করে গাছতলায় বসে আছে। যে খরচ হয়েছে তাতে বার দুই বিশ্বপরিক্রমা হয়ে যেত।'
'ক্যানসার জিনিসটা কী! আজকাল অনেকেই ওইতে করে আসছে!'
'এই খেয়েছে। আমরা কেউই জানি না, এখন দেখছি আপনিও জানেন না।'
'আরে আমি জানলে তো তোমরাও জানতে! যাক, কেমন ছিল?'
'আজ্ঞে প্রথমে ছিলুম কংগ্রেসে, তারপরে এলুম সিপিএম-এ, শেষে বিজেপিতে যেতে গিয়ে আটকে গেলুম, চলে গেলুম স্ত্রীতে। দেখলুম স্ত্রীর বশীভূত হওয়াই ভালো স্যার! তালের ফোঁপলের মতো চুলে ঢাকা অতটুকু মাথা; কিন্তু মশাই, কী বুদ্ধি।'
'কী রকম, কী রকম!'
'আমাকে বললে, দ্যাখো, এ হল কলিকাল, কলিতে টাকাটাই সব, টাকা ছাড়া মানুষ শব। যেমন করে পারো দুহাতে টাকা কামাও।'
'সে কী! আমার নির্দেশ তো অন্যরকম, আমি বলেছি, হরের্নাম হরের্নাম হরের্নামৈব কেবলম। কলৌ নাস্ত্ব্যেব নাস্তোব গতিরন্যথা।। হরের্নাম তিনবার নাস্ত্ব্যেব-ও তিনবার। তিনবার তিনবার কেন? খণ্ডন হচ্ছে একটা একটা করে। সত্যযুগের মানুষের ধ্যানই ধর্ম ছিল। কলির মানুষ ছটফটে। ধ্যান পারবে না তাই নাস্ত্ব্যেব। হরের্নামৈব কেবলম। ত্রেতায় ছিল যজ্ঞ ধর্ম। কলির মানুষ যজ্ঞ পারবে না, তাই খণ্ডন করে দিলুম, নাস্ত্ব্যেব। দ্বাপরে ছিল অর্চনা। কলির মানুষের নাস্ত্ব্যেব, হরের্নামৈব কেবলম। শ্রী হরির নাম করো, উদ্ধার হয়ে যাবে। তোমার বউ আমার বিধান খণ্ডন করে দিলে! কোথায় সেই মহিলা!'
'আজ্ঞে গ্রাউন্ড ফ্লোরে। আমার ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে ব্যাঙ্কে গেছে। শুনুন, সে যা বলেছে খাঁটি কথা। পৃথিবীটা তো আপনার, খালি ট্যাঁকে একবার সেখানে গিয়ে দেখুন না, কী হাল হয়! ছোট্ট এক ভাঁড় গাছতলার চায়ের দাম দু টাকা। থ্রিস্টার হোটেলে সাতাশ টাকা, ফাইভস্টারে একশো কুড়ি টাকা। চায়ের সঙ্গে একটা কাটলেট, আরও সত্তর টাকা, প্লাস ট্যাক্স। যদি লাঞ্চ করেন হাজার টাকা। অফিসপাড়ায় ঝাল মুড়ি খাবেন? দশ টাকায় এই এতটুকু এক ঠোঁয়া। দুশো স্কোয়ার ফুটের ফ্ল্যাট কিনবেন, আজে বাজে পাড়ায় সাড়ে সাত লাখ। হরের্নামৈব কেবলম!'
'টাকা কাকে বলে?'
'হায় ভগবান! টাকা কাকে বলে জানেন না। ট্যাঁকশালে জন্ম আমার, টাকা নাম ধরি, পৃথিবীর সকল সুখের একমাত্র চাবি কাঠি। টাকা যার দুনিয়া তার। মানি মানি মানি সুইটার দ্যান হনি। প্রপার ক্যালকাটায় আপনার পৃথিবীর এককাঠা জমির দাম এক কোটি টাকা। আকাশে আছেন মজায় আছেন, জমিতে একবার ল্যান্ড করে দেখুন না! একবার মানুষ হয়ে নিচে নেমে দেখুন না জেল্লাটা কেমন খোলে! সংসার কাকে বলে! কোনো দিন পরীক্ষায় বসেছেন? ষোলোটা পরীক্ষায় পাশ করতে হবে লেটার নিয়ে, তারপর সত্তর জায়গায় ইন্টারভিউ। তারপর একটা চাকরি। কলেজে পড়ার সময়েই শালোয়ার কামিজ পরা একটি মেয়ের সঙ্গে আপনার প্রেম হবে। হবেই হবে। নিজে ভগবান হয়েও নিজেকে তো ভুলবেনই, বাপ মাকেও ভুলে যাবেন। গান গাইবেন চলো লীনা ক্যাসুরিনা। আপনি শেষ যাঁকে অবতার হিসেবে আপনার তালুকে পাঠিয়েছিলেন, শ্রীরামকৃষ্ণ, তিনি এসে কোনো রিপোর্ট করেন নি!'
'কই না তো!'
''তা হলে আমার কাছে শুনুন। দক্ষিণেশ্বরে পঞ্চবটীর তলায় ভক্তরা সব বসে আছেন, ঠাকুর মানুষের বন্ধনের কারণ বিশ্লেষণ করছেন। বলছেন, বন্ধনের কারণ কামিনী-কাঞ্চন। কামিনী-কাঞ্চনই সংসার। কামিনী-কাঞ্চনই ঈশ্বরকে দেখতে দেয় না।''
'বলো কী!'
'আজ্ঞে হ্যাঁ। মানুষের সামনে তিনটে জিনিস রাখুন, যুবতী রমণী, তিন সুটকেসে তিন কোটি টাকা, আর আপনি নিজে। দেখুন কী হয়!'
'আমার এই জ্যোতির্ময় রূপ!'
''ওর কি দাম আছে! একটা হ্যালোজেনের জ্যোতি আপনার চেয়ে ঢের বেশি। আমার এক বন্ধু আপনার জ্যোতি দর্শন করেছে বলে খুব লাফাচ্ছিল, জটা, দাড়ি সব বের করে ফেললে। শেষে চক্ষুচিকিৎসক এসে বললেন, আরে এ জ্যোতি, সে জ্যোতি নয়, রেটিন্যাল ডিট্যাচমেন্ট। আসন তুলে ফেল, সব কামিয়ে ফেল। ঠাকুর নিজের গামছাটা সামনে আবরণের মতো মেলে ধরে ভক্তদের বলছেন, 'আর আমায় তোমরা দেখতে পাচ্চ? এই আবরণ! এই কামিনী-কাঞ্চন আবরণ গেলেই চিদানন্দ লাভ।''
'ঠিকই তো। সার কথা বলে এসেছে।'
''অত:পর শুনুন, আপনার সৃষ্টিতে সেই অবতার পুরুষের দর্শন, তিনি বলছেন, 'মার্গ সুখ যে ত্যাগ করেছে, সে জগৎসুখ ত্যাগ করেছে। এই কামিনী-কাঞ্চনই আবরণ! তোমাদের তো এত বড় বড় গোঁফ, তবু তোমরা ওইতেই রয়েছ! বল! মনে মনে বিবেচনা করে দেখ!''
'ভক্তরা কী বললে?'
''তাঁরা বললেন, 'আজ্ঞে, তা সত্য বটে।''
'অ্যাঁ, বলো কী! আমার অবতারের সান্ন্যিধ্যে এসেও কামিনী-কাঞ্চনে মন?'
''ওই তো বলছি, ছিড়িক করে ভ্রূমধ্যে সামান্য একটু জ্যোতি ছাড়া আর তো আপনার কিছুই নেই প্রভু! না আছে আপনার মাধুরী দীক্ষিত, না আছে সুখরামের সুটকেস! শুধু আত্মারামে জীবের আর জিভের তৃষ্ণা যায়! যদি মদের বোতল হতেন, যদি ডলার হতেন, তাহলে দেখতেন, জগতের মানুষ দুহাত তুলে আপনার নামে নৃত্য করছে। শ্রীরামকৃষ্ণ দেখেশুনেই বললেন, 'সকলকেই দেখি, মেয়েমানুষের বশ। কাপ্তেনের (বিশ্বনাথ উপাধ্যায়, নেপালী গৃহীশিষ্য। নৈষ্ঠিক শাস্ত্রজ্ঞ, সুপণ্ডিত কর্মযোগী ব্রাহ্মণে) বাড়ি গিছলাম;—তার বাড়ি হয়ে রামের বাড়ি যাব। তাই কাপ্তেনকে বললাম, গাড়িভাড়া দাও। কাপ্তেন তার মাগকে বললে! সে মাগও তেমনি—ক্যা হুয়া ক্যা হুয়া করতে লাগল। শেষে কাপ্তেন বললে যে, ওরাই (রামেরা) দেবে! গীতা, ভাগবত, বেদান্ত সব ওর ভিতরে। টাকাকড়ি সর্বস্ব সব মাগের হাতে। আবার বলা হয়, আমি দুটো টাকাও আমার কাছে রাখতে পারি না—কেমন আমার স্বভাব। বড়বাবুর হাতে অনেক কর্ম, কিন্তু করে দিচ্চে না। একজন বললে, গোলাপীকে ধর, তবে কর্ম হবে। গোলাপী বড়বাবুর রাঁড়। যাকে জিজ্ঞেস করি, সেই বলে আজ্ঞে হাঁ, আমার স্ত্রীটি ভাল। একজনেরও স্ত্রী মন্দ নয়।''
'তা হলে উপায়!'
'কোনো উপায় নেই। নিজেকেই নিজে বিতাড়িত করে বসে আছেন। হিন্দি সিনেমাও চালাবেন, হরি নামও চালাবেন, তা কি হয়। পৃথিবীর প্যাটার্নটা পালটে দিন। আপনাকে সবাই ভগবান বলে, আসলে আপনি শয়তানের চেয়েও শয়তান! তাকে চেনা যায়, আপনাকে চেনে কার বাপের সাধ্যি। আর সেইটাই না কী আপনার মহিমা! আপনারই আর এক ভক্ত তুলসীদাস কী বলে এসেছেন জানেন!
তুলসী ইয়ে সংসারমে, কাঁহাসে ভক্তি ভেট।
তিন বাতসে লটপাট হেয়, দামড়ি চামড়ি পেট।।
তিনটে জিনিস নিয়ে মানুষ লেবড়ে জেবড়ে আছে, ধন, শিশ্ন আর জঠর।'
''তা হলে হরিনাম হচ্ছে না!''
''কেন হবে না, মাইক বাজিয়ে, কানের পোকা বার করে অষ্টপ্রহর হচ্ছে। আবার হিন্দি ছবির গানের সুর বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাহলে শ্রীরামকৃষ্ণের আর একটি দর্শন শুনুন,—একটি স্যাকরার দোকান ছিল। বড় ভক্ত, পরম বৈষ্ণব—গলায় মালা, কপালে তিলক, হস্তে হরিনামের মালা। সকলে বিশ্বাস করে ওই দোকানেই আসে, ভাবে এরা পরমভক্ত, কখনও ঠকাতে যাবে না। একজন খদ্দের এলে দেখত কোনও কারিগর বলছে, 'কেশব! কেশব!' আর একজন কারিগর খানিক পরে নাম করছে, 'গোপাল! গোপাল!' আবার খানিকক্ষণ পরে একজন কারিগর বলছে, 'হরি, হরি' তারপর কেউ বলছে, 'হর, হর!' কাজ কাজেই এত ভগবানের নাম দেখে খরিদ্দারেরা সহজেই মনে করত, এ-স্যাকরা অতি উত্তম লোক। কিন্তু ব্যাপারটা কি জানো? যে বললে, 'কেশব, কেশব!' তার মনের ভাব, এ-সব খদ্দের কে? যে বললে, 'গোপাল! গোপাল!' তার অর্থ এই যে আমি এদের চেয়ে চেয়ে দেখলুম, এরা গরুর পাল। যে বললে, 'হরি হরি'—তার অর্থ এই যে, যদি গরুর পাল, তবে হরি অর্থাৎ হরণ করি। যে বললে, 'হর হর'—তার মানে এই তো হলে হরণ কর। এরা তো গোরুর পাল! বুঝতে পারলেন, হরের্নামৈব কাকে বলে!'
'তা হলে তোমার রিপোর্ট!'
'আজ্ঞে! বুদ্ধুকা দেশ মে ধুর্তুকা রাজ! সব এখন তিহার তীর্থে!'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন