কোথায় কী

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

বনেদি মানুষের বনেদি ব্যাপার। ক্যালেন্ডারে মাস যেই শেষের পাতায় এসে কদম সাতেক এগিয়েছে, অমনি তাঁর শরীরে চেপে বসল নিভাঁজ গরম কোট। ফ্রেশ গরম ট্রাউজার। ইংলিশ ডিজাইনের শার্ট। বুকের কাছে দোল খাচ্ছে সিল্কের চওড়া নেকটাই। ঝকঝকে টাইপিন। কোটের বুকপকেট থেকে উঁকি মারছে দামি রুমালের লাজুক লেজ। পায়ে ঝকঝকে অকসফোর্ড শু। সংখ্যায় এঁরা কমে এলেও হঠাৎ হঠাৎ বেরিয়ে পড়ল কলকাতার রাস্তায়। কোথায় শীত তার ঠিক নেই। লোকে তালপাতার হাতপাখা নিয়ে ঘুরছে। গ্রে সার্জের সুট পরে কলকাতার খানাখন্দ টপকে চলেছেন এক কেতাবি মানুষ। পায়ে ডার্কট্যান ঝকঝকে অল-লেদার অকসফোর্ড শু। এইসব মানুষ অতীতে বসবাস করেন এবং আন্তরিকভাবেই করেন।

ভীষণ উতলা হয়ে খুঁজতে থাকেন, কোথায় কমলালেবু। কোথায় কমলালেবু। নাগপুর টাগপুর হলে কমলা চলবে না, দার্জিলিং-এর কুয়াশামাখা পাতলা খোসার চাই। যার ত্বকের অসংখ্য বিঁদ থেকে তেলের আভাস বেরিয়ে আসছে। শীত, শিশির সোনালি রোদ, কমলালেবু, ইডেনে টেস্ট-ক্রিকেট। শীতের এরাই হল সভাসদ। কোথায় কমলালেবু? দার্জিলিং-এর রাজনীতিতে পাহাড়ের উপহার সমতলে আর নামতে পারে না। দেশের চেয়ে এখন রাজনীতি বড়, ভালোবাসার চেয়ে ঘৃণা। সত্যেন দত্ত বাংলার রূপ বর্ণনায় লিখেছিলেন, মাথায় যাহার কমলার ফুল। সেই সিলেট কেটে বেরিয়ে গেছে! দেশ বিভাগের তরোয়ালে কাটা পড়েছে আরও অনেক জেলা। বিক্রেতা বললে, 'সায়েব, এই তো কমলা।' সায়েবটা অবশ্য সে শ্রদ্ধায় বলেনি, বলেছে ব্যঙ্গে। স্বাধীন ভারত একটি জিনিসকে চিরতরে হত্যা করেছে, সেটি হল বনেদিয়ানা। বনেদি কালচার। নব্বুই কোটির দেশে ওসব চলবে না। বনেদি সায়েবি মানুষটি অবাক হয়ে তাকালেন। যাকে পাতিলেবু ভেবেছিলেন, সেই জিনিস হল কমলালেবু। গত চল্লিশ বছরে সবকিছুর আকার-আকৃতি কমেছে। বেড়েছে শুধু বাড়ির আকার। তল থেকে বহুতল। আর বেড়েছে কালো টাকার পরিমাণ।

বনেদি মানুষটি এইবার উতলা হয়ে উঠলেন, 'চিড়িয়াখানা'। বড়দিনের মুখোমুখি একটা দিন সপরিবারে চিড়িয়াখানায় নয় 'জু'-তে যেতে হবে। বনেদি মানুষরা এখনও 'জু'-ই বলেন। কোথায় সেই চল্লিশের চিড়িয়াখানা। কোথায় সেই মায়াবী ময়দান। উত্তর থেকে একটি কালো সেডানবডি গাড়ি আসছে। যে গাড়িতে হাতপা ছড়িয়ে স্বচ্ছন্দে ছ-সাত জন বসতে পারেন। গাড়ির চালক আমার এই বনেদি মানুষটি। বয়েসে তরুণ। সামনে সিঁথি। দু'ভাগ করা চুল। পমেড দিয়ে পাঠ করা। হালকা হেয়ার ব্রাশে চকচকে। যেন রুডলফ ভ্যালেন্টিনো। ঠোঁটে লম্বা সিগারেট! পরনে থ্রি পিস সুট। গাড়ির অন্যান্য যাত্রীদের দিকে তাকালে মনে হবে একগাড়ি সুখ ও শৌখিনতা চলেছে। ফুলোফুলো, তুলতুলে চেহারার একজোড়া শিশু। পশমের সোয়েটারে কাবুলি বেড়ালের মতো নরম। মেয়েরা যেন সব সেযুগের কাননদেবী। গাড়ির পেছনে চলেছে ফলের টুকরি। সদ্য-তৈরি খাবার ঘি আর মশলার গন্ধে গাড়ির গন্ধকে চাপা দিয়ে দিয়েছে। মেয়েদের খোঁপায় একটি করে সাদা গোলাপ। গাড়ির কালো ভেলভেটের আসনে ধবধবে সরু সরু আঙুল। কোনো আঙুলে লাল রুবি, কোনো আঙুলে হিরে। বুকের কাছে দুলছে পেনডান্ট। কখনও হাসি, কখনও এককলি গান, নিচু সুরে। বাচ্চারা মাঝে মাঝে লজেনস ফেলছে মুখে। মেয়েরা মুখে দিচ্ছে বড় এলাচের দানা। দাঁতে কাটছে কেউ লবঙ্গ।

উত্তর থেকে গাড়ি আসছে হয় চিৎপুর ধরে, না হয় কলেজ স্ট্রিট অথবা সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ। চিৎপুরে লেগে থাকত বাবু-কালচারের শ্যাওলা! বনেদি বাড়ির গাড়িবারান্দা। ঢালাই-করা গ্রিল। নেপাল হালুইকরের সাইনবোর্ড। নবীন ময়রার রসগোল্লা। কাঠের ব্লক তৈরি করছে গরানহাটার মিস্ত্রিরা। রাজস্থানি মারবেলের দোকানে পাথরে ছেনি ঠুকছে যোধপুরি শিল্পী। ওরিয়েন্টাল সেমিনারি দেখিয়ে মেয়েরা ছেলেদের বলছে রবিঠাকুরের স্কুল। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির ছাদে রবিশূন্য শীতের নীলচে মন-কেমন-করা আকাশ। নাখোদার মিনারে ঝকঝকে মোজেকের কাজ। তলায় লখনউয়ের আতরঅলা ছোট ছোট তুলো জড়ানো কাঠি নিয়ে বসে আছে। শালের আঁচলে কাশ্মীরি কাজ। শীতের গন্ধ মাস্ক, রোজ, জিরানিয়াম। রয়ালের তাওয়ায় কাবাবের গুলি চনমন করছে।

কলেজ স্ট্রিট ধরে গাড়ি এল। ভালো ভালো দোকান। শাড়ি। পশম। গন্ধদ্রব্য। সিনেমার মাথায় সেযুগের নায়ক-নায়িকা। নামকরা থিয়েটার রংমহল, শ্রীরঙ্গম। সাদামাটা থিয়েটারের পোস্টারে বাঘাবাঘা নাম। বিখ্যাত সব নাট্যকারের সাড়া-জাগানো পালা। হেদুয়ার ডানপাশে বিখ্যাত সন্দেশ পাড়া। বাঁ পাশে স্কটিশ। স্বনামধন্যদের উদ্ভব কেন্দ্র। এসে গেল সেনেট। বিশাল বিশাল থামের মাথায় রোমান ধাঁচের ছাঁদ। শীতের পায়রায় চেকনাই খোলো। থাম আর ছাদের খাঁজ থেকে নধর পায়রারা বেরিয়ে এসে গলা ফুলিয়ে দুলে দুলে বলতে চাইছে, বিশ্ববিদ্যালয় শান্তির স্থান। মেডিকেল কলেজের বিশাল গেট, বিপুল ফয়ার, রোমক সেনেটের ধরনের সোপানশ্রেণী, শীতে খানিক মৃত্যুর শীতলতা মিশিয়ে, মনে খানিক প্রিয়জন হারানোর বেদনা জাগিয়ে, পেছনে সরে গেল। গাড়ি চলে এল ডক্টর বিধান রায়ের বাড়ির সামনে। সাঙ্গুভ্যালি। কমলালয়। বাঁয়ে বেঁকে বিখ্যাত মেট্রো। সায়েবপাড়া এসে গেছে। লনচ্যানি হোর্ডিংএ। ডেবোরা কার। হোয়াইটওয়ে।

ময়দান যত এগিয়ে আসছে সবুজ-সবুজ গন্ধ। আরও শীত। আরও নীল বাতাস। মনুমেন্ট আকাশে নীল খুঁজছে। অবশেষে জু। সেই বিচিত্র বিলিতি গেট। জেব্রা রঙের সোয়েটার পরে বাচ্চাদের আর তর সাইছে না। লন্ডন জু-এর মতো টিকিট কাউন্টার। গেট পেরিয়ে ভেতরে—ভিন্ন এক জগৎ। আরও আলো। আরও রোদ। বাঘের গন্ধ। পাখির গন্ধ। ফর্সা মেয়েদের আরও ফর্সা দেখাচ্ছে। এর কোথাও আফ্রিকা, কোথাও সুন্দরবন, পেরু, নিউগিনি, অস্ট্রেলিয়া, পাপুয়া। ডাকছে পাখি। হাঁক দিচ্ছে বাঘ। লেকে নেমেছে সাইবেরিয়ার শত শত পাখি। হায়! কোথায় সেইসব।

বনেদি মানুষটির সুট আছে। সে জেল্লা নেই। অকসফোর্ড জুতোর পালিশে আর মুখ দেখা যায় না। কোটের কাঁধ ভেঙে গেছে। সেডানবডি চোরবাজারে। তবু মাস শেষ পাতায় এলে তিনি হ্যাঙার থেকে সুট নামান। মনে মনে খোঁজেন কমলালেবু আর ফ্যামিলি অ্যালবামে তাকান, সেই সুন্দরীদের খোঁজেন। যারা ছিল সেদিনের সঙ্গী।

সকল অধ্যায়
১.
টক ঝাল মিষ্টি
২.
ঘোরকলি
৩.
কেমন আছেন?
৪.
জীবন একটা বেয়াড়া ভাল্লুক
৫.
হতেছে পাগলের মেলা
৬.
সকাল
৭.
আশার কথা
৮.
আর বোলো না ভাই!
৯.
'পৃথিবীতে যত বেটা সব বেটা গোরু'
১০.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১১.
হাঁদা গঙ্গারাম
১২.
কে পরাবে সিঁদুর
১৩.
জীবনের জাতীয় সংগীত
১৪.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫.
বাস-মিনিবাসের লাইনে ঘোষ, বোস, মিত্তির
১৬.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৭.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৮.
বাঁদর
১৯.
কোরা কাগজ
২০.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
২১.
শান্তির সহজপাঠ
২২.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
২৩.
অনুসন্ধান
২৪.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
২৫.
প্রেমের শিকল
২৬.
বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
২৭.
ছদ্মবেশী
২৮.
প্রেম বাড়ছে
২৯.
হনুমান টুপি
৩০.
বারমুডা ট্র্যাঙ্গল
৩১.
আড়ং ধোলাই
৩২.
হেমন্তের সকাল
৩৩.
হাতপাখা
৩৪.
খেলা
৩৫.
সন্দেহ
৩৬.
পেটে খেলে পিঠে সয়
৩৭.
শেয়াল পণ্ডিতের পাঠশালা
৩৮.
আমার আছে তোমার নেই
৩৯.
ধ্যাততেরিকা সংসার
৪০.
মায়ার খেলা, মায়ের খেলা
৪১.
যে ট্রেনের কোনো ইস্টিশন নেই
৪২.
সুখের লাগিয়া
৪৩.
টেকনিক
৪৪.
বাপের চা
৪৫.
অনশন
৪৬.
এ চোর সে চোর নয়
৪৭.
পরনিন্দা পরচর্চা
৪৮.
অমর বাঙালি
৪৯.
পথের শেষ কোথায়!
৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
৫১.
পুজোর পাঁচালি
৫২.
আকাশ যখন ছবির মতো নীল
৫৩.
সংসার, শূন্য এক ছায়াবাজি
৫৪.
মারডালো
৫৫.
বড় সাধ ছিল
৫৬.
খোলকত্তাল
৫৭.
হিরের টুকরো
৫৮.
কোনওদিন শুনেছ, চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৫৯.
অধিকার করে অধিকারী হতে হয়
৬০.
কোথায় কী
৬১.
জীবন ও সাহিত্য
৬২.
শামা হর রঙ্গ মেঁ
৬৩.
যা ছিল, একদিন নেই হবে, যা ছিল না,তা একদিন আছে হবে, শেষ হবে না কিছুই
৬৪.
উলটোপাক
৬৫.
যুবক
৬৬.
কাজের সময় কাজি
৬৭.
সকাল সকাল ভোট দিন
৬৮.
শুভানুধ্যায়ী
৬৯.
ছাতা আর গামছার মাল্টিপারপাস ব্যবহার
৭০.
জোকার
৭১.
আসরটা যে করলে মাটি
৭২.
কাঠুরিয়া
৭৩.
মানুষ হয়ে মরতে চাই
৭৪.
উতলা দখিন বাতাসে
৭৫.
ভাঙলে কিছু গড়তে তো হবে
৭৬.
আতঙ্ক
৭৭.
নিগ্রহ
৭৮.
ছুটির সকাল
৭৯.
স্বপ্ন
৮০.
আয় কাটাকাটি করি
৮১.
কলকাতা—৩০০
৮২.
আপনি কার পেশেন্ট
৮৩.
শরৎকাল
৮৪.
পকেটমারি
৮৫.
দুর্বলের সংসার সবলের সন্ন্যাস
৮৬.
আমি ক্ষুদ্র প্রাণ এক
৮৭.
মন পাখিরে কৃষ্ণকথা বল
৮৮.
জন্ম যার কোলে মৃত্যুও তারই কোলে
৮৯.
কেউ যায় বাজারে পচা মাছ কিনতে,কেউ যায় এভারেস্টে উঠতে
৯০.
উঠে বোসো শালগ্রাম
৯১.
এইবার যাই কোথায়!
৯২.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
৯৩.
এসেছি কেঁদে, যাই যেন হেসে
৯৪.
নির্জনতায় আমরা ভয় পাই, সজনতায় বিরক্ত হই
৯৫.
নদী ডাকে, আয় চলে আয়
৯৬.
কেউ ঘুমোয় কেউ জাগে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%