সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
'বড় মেয়েটার বিয়ে দিলুম প্রচুর খরচ করে এক বড় জুয়েলারের সঙ্গে। তার নার্সিং হোম আছে। পরের মেয়েটার বিয়ে দিলুম এক ডাক্তারের সঙ্গে। তার পরের মেয়েটার বিয়ে দিলুম এক পুলিশ অফিসারের সঙ্গে। তার পরের মেয়েটার বিয়ে হল ক্যাটারার ও বিয়েবাড়ির মালিকের বড় ছেলের সঙ্গে। তার পরেরটার বিয়ে হল এক পুরুতের সঙ্গে। শেষেরটার সঙ্গে এক ট্রান্সপোর্ট ব্যাবসাদারের। মেয়ে ফুরিয়ে গেল। আর একটা মেয়ের খুব দরকার ছিল।'
'সে কী! তোমার এতগুলো মেয়ে, আমাদের হলে তো হাত-পা পেটের মধ্যে সিঁদিয়ে যেত।'
'তোমরা হিসেব জানো না, তোমাদের কোনও প্ল্যানিং নেই।'
'কীরকম?
'তা হলে শোনো, প্রথমেই এক জুয়েলারকে বাবাজীবন করে ফেললুম। পরের মেয়েগুলোর বিয়ে দিতে গেলে গয়না লাগবে। সেই সমস্যা খানিকটা হালকা হল। পুলিশের সঙ্গে আত্মীয়তা মস্ত বড় একটি সিকিউরিটি। এই বাজারে। বিয়ের তিনমাসের মধ্যে তেএঁটে ভাড়াটেটাকে উঠিয়ে দিলুম। তারপরে স্ট্যাটিসটিকস নিয়ে দেখ, নাইনটি পারসেন্ট বুড়োবুড়ি বাথরুমে পড়ে যায়। দিনচারেক হাসপাতালে বা নাসিংহোমে দাঁত ছিরকুটে পড়ে থেকে মারা যায়। এবার পোস্টমর্টেম। ডেডবডি আদায় করতে জীবন বেরিয়ে যায়। প্রথমে আমি পড়ব।'
'সেনসলেস হয়ে চলে যাব মেজ জামাইয়ের নার্সিংহোমে। শ্বশুরের জন্য ফি নিতে পারবে না। সেজ জামাই মোটামুটি টাটকা লাশ বের করে দেবে। এইবার পুরুত জামাই ফ্রি শ্রাদ্ধ করে দেবে। ক্যাটারিং ও বিয়েবাড়ি ভাড়া করেই শ্রাদ্ধের ভূতভোজন হবে। খাওয়া খরচ ও ভাড়া লাগবে না কারণ এটাও এক জামাইয়ের বিয়ে। কেউ বলতে পারবে না বুড়ো মরে গিয়ে মেরে গিয়েছে। আর একটা মেয়ের প্রয়োজন ছিল, তা হলে বস্ত্র ব্যবসায়ীর সঙ্গে বিয়ে দিতুম, জামাই ষষ্ঠী ও পুজোর তত্ব নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকত না। এরপর দেখ, আমার এক ছেলে।'
'একটা ছেলে, সে এনে দিয়েছে একটা ডটার ইন ল। কিন্তু আমার ছ'টা মেয়ে এনে দিয়েছে ছ'টা তরতাজা ছেলে। তা হলে দেখ মেয়েতে লাভ বেশি। ব্যাবসা যখন করবে, সবার আগে লাভ-লোকসান খতিয়ে নেবে।'
'সংসার আর ব্যাবসা এক হল?'
'সংসারের চেয়ে বড় ব্যাবসা কি আছে? যে ব্যাবসার মূলধন হল জীবন। কোই জিতা, কোই হারা। টাকা আগে পৃথিবীতে ঢুকেছিল না মানুষ! মানুষ মানুষকে ভাঙিয়েই বড় হয়, বড়লোক হয়। শোনো সংসার হল ব্যাবসা।'
'শুনি যুক্তিটা কী?'
'বিয়ে করলে। স্ত্রী এলেন। এ ডাকছে বউমা, ও ডাকছে বউদি, তুমি ডাকছ শুনছ। আসলে তিনি কে? বেশ ভালোই চেন, তবু ছলনা করো। তিনি কুক-কাম-হাউসমেড। তারপর টিচার। তিনি এলআইসির ওল্ড এজ পেনসান স্কিম। মেধাবী ছেলের জন্ম দিলে হেভি পেনসান। মাটো ছেলের মডারেট পেনসান। মেয়ে জন্মালে উলটো পেনসান। তখন তুমি প্রিমিয়াম দেবে, পলিসি কিন্তু ম্যাচিওর করবে না। জামাই বাবাজীবন বোয়াল মাছ কপাত কপাত খাবে।'
'যা:, এই দৃষ্টিতে সংসারকে দেখা উচিত নয়। সংসার কত সুইট।'
'হ্যাঁ, একটু বেশি সুইট। সংসার হল স্যাকারিন। প্রথমে মিষ্টি, তারপরে তেতো। তারপরে উভয়ের স্টেটাস, একজন ঝি, আর একজন চাকর, বাড়িটা দাঁত বের করে হাসছে।'
'সংসারের নানা কাজ করাটা কি অন্যায়?'
'বেকার বুড়ো হলে বুঝতে পারবে। যখন তোমার সাধের লাউটি পিঠে গোঁত্তা মেরে বলবে, 'সকাল আটটা পর্যন্ত বিছানায় পড়ে আছ। তোমার কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই। খোকনকে আজ নটার আগেই বেরোতে হবে। বম্বে থেকে বড়সাহেব আসছেন। লোকে বাজারটা করে দিয়েও তো সংসারের উপকার করে। চিরকালের বেআক্কেলে।' দড়ি খুলে মশারিটা ঘাড়ের ওপর ফেলে দিয়ে চলে গেল। মশারির জালে পড়ে রইল বুড়ো ভোলা। সে এবার ঠেলেঠুলে বেরোবে।
চোখে ছানি, বুকে ব্রঙ্কাইটিস। অতীত এক লহমার জন্য র্উকি মেরে যাবে। বিয়ে হল, বউ ভোরে এসে, মুখের কাছে ঝুঁকে পড়ে বলছে, 'এই শুনছ। ওঠ। চা যে জুড়িয়ে জল হয়ে গেল! কী ঘুম বাবা! কুম্ভকর্ণকে হার মানায়। এইবার কিন্তু কাতুকুতু দেব।' মশারি নয় গোটা বউটাই ঘাড়ে এসে পড়ল। পরিবর্তনটা বুঝলে।'
'এ তো হবেই। বয়সও বসে থাকে না, প্রেমও থাকে না। দায়িত্ব, কর্তব্য, অভাব, স্বভাব, সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।'
'মশারি হল সিম্বল। প্রেম জ্যালজ্যালে, ফুটোফাটা হলেই মশারি।'
'আর মশকের সংগীতই জীবনের জাতীয় সংগীত।'
'আর দংশনই হল শেষ পাওনা।'
'আর পুত্র-কন্যা হল ম্যালেরিয়া।'
'আর জন্ডিস হল বাক্স থেকে হঠাৎ বেরিয়ে আসা হলদে হয়ে যাওয়া প্রেমপত্র।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন