সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
দুটো আশার কথা বলো তো, সে তোমার গল্পের মতো শোনালেও আপত্তি নেই। যত নিরাশার কথা শুনতে শুনতে কেমন যেন একটা অবসাদ এসে যাচ্ছে।
বেশ, তবে তাই হোক। আমার প্রতিবেশী সমীরবাবু একজন সংগীত শিক্ষক। অত্যন্ত ভালো মানুষ। নিরীহ সজ্জন। মেয়ের বিয়ে দেবেন, ব্যাংক থেকে মোটা টাকা, জীবনের সব সঞ্চয় তুলে এনে বাড়িতে রাখলেন। সেই রাতেই সব চুরি হয়ে গেল। যথাসর্বস্ব।
পাশেই থানা। গেলেন। অফিসার ইনচার্জ সব শুনে বললেন, 'সমীরবাবু, কোনও চিন্তা নেই। মেয়ের বিয়ে যে কত বড়ো একটা ব্যাপার তা আমি জানি। মাসখানেক আগে আমার বড়োমেয়ের বিয়ে দিয়েছি, আরও দুটোর দিতে হবে। নিন চা-টা খান। বাড়ি গিয়ে আরাম করুন, কাল সকালেই টাকা ফেরত পাবেন। গ্যারান্টি।'
সমীরবাবু বললেন, 'স্যার, ক্যাশ ছাড়াও অর্নামেন্টস ছিল। সে-সবও নিয়ে গেছে।'
'স্যার স্যার করবেন না তো। আপনি আমার শ্রদ্ধেয় দাদা। গুণী মানুষ। জেনে রাখুন, কান টানব মাথা চলে আসবে। ক্যাশের সঙ্গে সঙ্গে অর্নামেন্টস। আপনার কোনও চিন্তা নেই, চোরের কাজ চোর করেছে, এইবার পুলিশের কাজ পুলিশ করবে।'
পরের দিন সকাল দশটার সময় সেকেন্ড অফিসার সসম্মানে সব ফেরত দিয়ে গেলেন। বললেন, 'মিলিয়ে নিন, কম বেশি হলে জানাবেন।'
মেলাতে গিয়ে দেখা গেল, ক্যাশ তিনশো টাকার মতো কম, কিন্তু প্রায় দশ ভরির মতো একটা সোনার হার বেশি চলে এসেছে। সমীরবাবু সঙ্গে সঙ্গে দৌড়লেন থানায়। ওসি বললেন, 'ওটা আপনার মেয়েকে আমাদের উপহার।'
সমীরবাবুর চোখে জল। খারাপ আর ভালোয় মিশিয়ে পৃথিবীটা কত সুন্দর! অমন ভালো একটা ছেলে, বলে কি না বিয়েতে একটা পয়সাও নেবে না। মনের মতো মেয়েকে সহধর্মিণী করছে, এ তো ব্যাবসা নয়।
ছেলের বাবারও কী চমৎকার কথা—'বেয়াই মশাই এতদিন মেয়ে ছিল আপনার এইবার হবে আমার। মাকে যেন সুখে রাখতে পারি!'
(আসলে এসব কিছুই হয়নি। সমীর থানায় গিয়ে দামড়ানি খেয়ে ফিরে এসেছিলেন, ধ্যার মশাই! চোর ধরার সময় আমাদের আছে! ব্যাংক-ডাকাত ধরতেই হিমসিম অবস্থা। এক লাখ টাকা আবার টাকা! এক কোটি হলে দেখা যেত। ওটা আপনার সৎপথের উপার্জন ছিল না। ইনকাম ট্যাক্স দিয়েছিলেন? যান যান, বাড়ি যান। বেশি খোঁচাখুঁচি করলে নিজেই বিপদে পড়ে যাবেন।
ছেলের বাবাকে বলতে গিয়েছিলেন, এইরকম একটা সর্বনাশ হয়ে গেছে, নগদটা যদি একটু কনসিডার করেন! পঞ্চাশ বলেছিলেন, যদি পঁচিশ হয়।
হিমশীতল হেসে ভদ্রলোক বলেছিলেন, ছেলে আমার ইঞ্জিনিয়ার। আজকাল প্রেমের বিয়েতেও নগদ লাগে। আমি তো অনেক কম বলছি।)
পরিণতি, নিজের বসতবাড়ি বিক্রি করে মেয়ের বিয়ে দিয়ে সমীর এখন সপরিবারে ভেসে বেড়াচ্ছেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন