সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
না সংসার আমাদের হরেকরকম সমস্যা আর অশান্তি ছাড়া আর কিছু দেবে না। পালাবারও পথ নেই। এসেছি যখন কোর্স কমপ্লিট করে যেতে হবে। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ প্রেমিক মানুষ, মানবদরদি। তিনি বলেছেন, 'উট কাঁটা ঘাস বড় ভালোবাসে। কিন্তু যত খায় মুখ দিয়ে রক্ত দরদর করে পড়ে; তবুও সেই কাঁটা ঘাসই খাবে, ছাড়বে না। সংসারী লোক এত শোক-তাপ পায়, তবু কিছুদিনের পর যেমন তেমনি স্ত্রী মরে গেল, কি অসতী হল, তবু আবার বিয়ে করবে। ছেলে মরে গেল কত শোক পেল, কিছুদিন পরেই আবার সব ভুলে গেল। সেই ছেলের মা, যে শোকে অধীর হয়েছিল, আবার কিছুদিন পরে চুল বাঁধল, গয়না পরল। এরকম লোক মেয়ের বিয়েতে সর্বস্বান্ত হয়, আবার বছরে বছরে তাদের মেয়ে ছেলেও হয়। মোকদ্দমা করে সর্বস্বান্ত হয়, আবার মোকদ্দমা করে! যা ছেলে হয়েছে তাদেরই খাওয়াতে পারে না, পরাতে পারে না, ভালো ঘরে রাখতে পারে না, আবার বছরে বছরে ছেলে হয়!
'আবার কখনও কখনও যেন সাপে ছুঁচো গেলা হয়। গিলতেও পারে না, আবার উগরাতেও পারে না। বদ্ধজীব হয়তো বুঝেছে যে, সংসারে কিছুই সার নাই; আমড়ার কেবল আঁটি আর চামড়া। খেলে হয় অম্লশূল।'
সংসারে সুখ? কোথায় সুখ? কিন্তু সংসার ছাড়া মানুষ থাকবে কোথায়! মানুষ হল পরিবারবদ্ধ জীব। পৃথিবীতে প্রবেশের প্রক্রিয়াটি হল—একজন পিতা ও একজন মাতার আন্তরিক প্রয়াস। আনন্দের পথ ধরে দু:খের পৃথিবীতে প্রবেশ। এই প্রবেশ আর প্রস্থানের ওপর আমাদের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই।
এরপর বাঁচার লড়াইটা একেবারে নিজস্ব। নিজেকে খাওয়াতে হবে, পরাতে হবে। মরে যেতে ভয় করবে। কেবলই মনে হবে আরও বাঁচি। এইরকম একটি লোক-কাহিনি আছে—এক কাঠুরিয়া তার মাথার বোঝা নামিয়ে একটা গাছতলায় বসেছে ক্লান্ত, শ্রান্ত, বিধ্বস্ত। জীবনের ওপর বীতশ্রদ্ধ। হঠাৎ বলে ফেলেছে—ভগবান কবে নেবে! সঙ্গে সঙ্গে যমদূত এসে হাজির। 'বলো কী জন্য ডেকেছ।'
কাঠুরিয়া বললে, 'প্রভু! তুমি এই বোঝাটা আমার মাথায় তুলে দাও।'
কবি লিখলেন, 'মরিতে চাহি না এই সুন্দর ভুবনে!' মানবের মাঝে কবি বাঁচতে চান। সুখে বাঁচব, আনন্দে বাঁচব, শান্তিতে বাঁচব। সুখে বাঁচতে হলে অর্থ চাই। ভোগ ছাড়া সুখ হবে না। আনন্দ মিলবে না। টাকায় সুখ, টাকায় আনন্দ। সঙ্গে সঙ্গে একটি প্রবাদে হোঁচট —অর্থই অনর্থের মূল। গুচ্ছের টাকা, বিষয় সম্পত্তি এক মহা ঝকমারি ব্যাপার। মামলা মোকদ্দমা। কত্তার টাকায় পরিবার পরিজন ফুর ফুর করে উড়বে। কত্তা কামাবেন, তেনারা ওড়াবেন। চার ছেলে, দুই মেয়ে, দুই জামাই দখলি যুদ্ধে মাথা ফাটাফাটি করবে। কত্তা শেষশয্যায় শুয়ে মরা চোখে মজা দেখবেন। সে সব গল্প অনেক আছে। বিষয় বিষ? না বিষয় মধু? বহুত সংশয়। থাকলে জ্বালা, না থাকলেও জ্বালা।
আদি এবং অকৃত্রিম সমস্যা হল, স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক। মধুর হলে কেয়াবাত। শর্ট সার্কিট হয়ে গেলেই সর্বনাশ। সুখী গৃহকোণে বাজে প্রেমের গ্রামোফোন। অসুখী গৃহমণ্ডলে কাড়ানাকাড়া। ওই ছড়াটাকে একটু মুচড়ে নিই,
বাজতে বাজতে চলল ডুলি/ডুলি যাবে সেই শ্মশানপুরী
চিতায় চড়লেই কেয় শান্তি!
ব্যাট আছে বল নেই/কথা আছে উত্তর নেই
চারিদিক শুনশান/ হাওয়া বয় শনশন।
স্বামীকে 'অ্যাডজাস্ট' করতে হবে। নেচে নেচে বিয়ে তিনিই করতে যান। তিনি 'ক্যামেরা', স্ত্রী হলেন 'র-স্টক', ফিল্ম। সেই ফিতেতে ফটাফট ছবি উঠবে। শাটার ঝিলিক মারবে।
পরিবার কী কী কারণে রাগেন? মনে রাখতে হবে, স্ত্রী প্রভুর সমান। সব স্বামীই 'অন হার ম্যাজেস্টিস সার্ভিসে' বেঁচেবর্তে থাকে। এ বড় মধুর দাসত্ব। অতএব কাজে ফাঁকি দিলে, অবাধ্য হলে, 'মধুর বাক্যবাণে জর্জরিত হবে তুমি স্বামী'। স্ত্রীর তূণে কী কী বাক্যবাণ থাকতে পারে!
১। দ্যাখো, দেখে শেখো। অরুণার স্বামী সব কাজ করে। আর তুমি? এক গেলাস জল গড়িয়ে খাওয়ারও মুরোদ নেই।
২। তোমার মতো অপদার্থ দুনিয়ায় দুটো নেই। অমন একটা চান্স ছেড়ে দিলে?
৩। কুম্ভকর্ণের দ্বিতীয় এডিশন। ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই জীবন শেষ।
৪। আর কবে বুঝবে নিজের আখের? নিজের গায়ে তেল না ডলে, মিত্তির সাহেবের পায়ে কয়েক ফোঁটা লাগাও। সবাইয়ের সব কিছু হয়ে গেল, ইনি শুধু বাণী দিয়েই জীবন কাটালেন। বচনের ঝুড়ি। মুখেন মারিতং জগৎ।
৫। মাথা-মোটার বংশ।
৬। কাজের মধ্যে দুই—খাই আর শুই।
৭। থাক আমার কথা দয়া করে তোমাকে আর ভাবতে হবে না। স্বার্থপরের বংশ। ছেলে স্বার্থপর, বাপ স্বার্থপর, মা স্বার্থপর, চোদ্দোপুরুষ স্বার্থপর, যেটা এসেছে সেটাও স্বার্থপর। এই বাড়ির ইট, কাঠ, পাথর। ঝ্যাঁটা-জুতো সব স্বার্থপর।
৮। বেইমানের ঝাড়।
৯। আমার জন্য তুমি কী করেছ? কী ঘোড়ার ডিম তুমি করেছ? সারাটা জীবন কেবল ধামসেছ। পড়তে অন্য কোনো মেয়ের পাল্লায় বাপের নাম ভুলিয়ে দিত।
১০। অশান্তি ছাড়া তুমি আর কী করতে শিখেছ? আর কী শেখানো হয়েছে?
১১। আমার বাপের বাড়ি? তাদের নখের যুগ্যি হতে পারবে কোনো দিন!
১২। তুমি ভালো তো আমি ভালো। জগৎ হল আয়নার মুখে দেখা।
নির্দেশ
নীরবতা। স্পিকটি নট। যে চোটপাট উত্তর না দিয়ে গুম মেরে থাকে সেই জ্ঞানী। বিচক্ষণ মানুষ রাগেন না। রাগলেই পয়েন্ট কাটা যায়। গৃহসুখ, গৃহশান্তির প্রথম পাঠ হল,
স্ত্রী'র মুখে মুখে তর্ক না করা। দাঁতে দাঁত চেপে নিজের রাগকে সংযত রাখা। কথা আর রাগ হল কুরুক্ষেত্রের মশলা। ধনে, জিরে, পাঁচফোড়ন। বলেছ কি মরেছ।
ইংরেজের ইংরেজি উপদেশ, যে দেশে বিয়ে করে বউ নিয়ে বাড়ি ফেরার পরেই ডিভোর্স। ভাঙচুর যাতে না হয় তারজন্য উপদেষ্টার চেতোয়ানি,
He who spares his words has true wisdom
And he who holds his temper is a man of Sense.
যে সহনশীল, যার সহ্যশক্তি বেশি, সে যে-কোনো যোদ্ধার চেয়ে শক্তিশালী। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ গৃহীদের দিকে এই মোক্ষম উপদেশটি ছুঁড়ে দিয়েছেন—শ, ষ, স, সহ্য কর, সহ্য, সহ্য কর। যে সয় সে রয়, সে না সয় সে নাশ হয়।
'গৃহিণী গৃহমুচ্যতে'—এই যখন কথা, তখন তাঁর মর্জিতেই কর্তাদের লেফট-রাইট। ওই যেমন আছে—হোতা হায় ওহি যো মঞ্জুরে খোদা। সেই রকম যো মঞ্জুরে ওয়াইফ। ইংরেজিতে আছে—কিপ হার ইন গুড হিউমার। দেবীর সংসারে পুরুষ, তুমি এক নিষ্ঠাবান সেবক মাত্র। মৌচাক টেকনিক। কুইন বি আর ওয়ার্কার বি। কর্তব্য আর কর্ম।
১। সকালে যথাসময়ে বাজার। ফর্দ তাঁর, পয়সা তোমার।
২। চাহিদা মতন ফুয়েলের জোগান, গ্যাস ও কেরোসিন।
৩। এতটুকু বিরক্ত না হয়ে, হাসিমুখে ফাইফরমাশ খাটা—ফরমাইয়ে জি!
৪। যখন যেখানে যেতে বলবেন বিনা প্রতিবাদে যাওয়া এবং নিয়ে যাওয়া।
৫। বারে বারে চা না চাওয়া। চায়ের কাপেই শান্তি, অশান্তি। স্টর্ম ইন এ টি কাপ। খুবই শোনা কথা। ভোরের প্রথম কাপ হাসিমুখে তাঁর ঠোঁটের ডগায় নিজে হাতে ধরে দিতে পারলে কেয়া বাত! যেন ভোরের মিষ্ট রোদ এক চিলতে জানলা গলে গড়িয়ে এল জীবনে। রথের মেলার পাতলা কুড়মুড়ে পাঁপড় ভাজা। জীবনের কদম গাছে প্রথম কদম ফুল। দেখতে হবে, সাবধান হতে হবে, প্রথম প্রেম যেন শুকিয়ে না যায়!
৬। মাঝে মাঝে বাপের বাড়ি নিয়ে যাওয়া উচিত, সে যত দূরেই হোক। স্ত্রীর পক্ষে এটি হবে 'ব্রেদার'। জন্মকালীন পরিবেশে ফিরে এসে শৈশবকে ফিরে পাওয়া। শুধু তাই নয়, তিনি বুঝতেও পারবেন, বিয়ের পর বাপের বাড়িতে মেয়েদের অবস্থান ভাসমান। সব ভ্রমণই শিক্ষামূলক।
৭। রাতে বিছানা করা, মশারি টাঙানো, সকালে পরিপাটি করে তোলা। এটি একটি সেবামূলক কাজ। দেবীজ্ঞানে স্ত্রীসেবা।
৮। কাজের লোক না এলে বাসন মাজা, ঘরদোর পরিষ্কার করা। একে বলে 'কমরেডশিপ'।
৯। রাতে শুতে যাওয়ার আগে দরজা বন্ধ করা, সব আলো নেভানো আর ভোরে কাজের লোককে দরজা খুলে দেওয়া।
১০। স্ত্রীর দিকে সদাসর্বদা একটি হাসি হাসি মুখ তুলে ধরে রাখা।
এই হল, 'গৃহ-শান্তি'র টেন কম্যান্ডমেন্টস।
বেলা পড়ে এল। জীবনের বেলা। 'আয়ুসূর্য বসিতেছে পাটে'। আর কি, 'এখন আমার সময় হল, যাবার দুয়ার খোলা।' এই পড়ন্ত বেলায় মনে হতে পারে কয়েকটা বছর মহানন্দে কাটাই না কেন। ভোরে বেড়াতে যাব ছড়ি হাতে। সাদা পোশাক, স্নেহময়ী মমতাময়ী পুত্রবধূ বুনে দিয়েছে নরম কার্ডিগান। বেরোবার আগে সুন্দর ফিনফিনে কাপে চা। ফিরে এসে আবার এক কাপ সুখ সুখ চা। চোখের সামনে মেলে ধরা খবরের কাগজ। মাঝে মাঝে বলা, না দেশটা উচ্ছন্নে গেছে। টিভি খুলে ধর্মকথা শোনা। পৃথিবীতে কত কথাই যে আছে। পুত্রবধূ এসে বলবে, 'স্নানে যাওয়ার আগে বলবেন পিঠটায় একটু তেল মাখিয়ে দোবো।'
একেবারেই না, এইসব স্বপ্ন, দু:খের কারণ। শীতল বার্ধক্য। ধূসর দৃষ্টি। কোই হ্যায়? কোই নেহি হ্যায়। বহুদূরে কেউ আসছে। ধীরে, মৃদু চরণে। অতি, অতি প্রাচীন কেউ। জানি কে আসছে। তা হলে? তাহলে শেষ পাঠ—ভিজে তোয়ালের মতো দিনের তারে ঝুলে থাক। জেনে রাখো, কেউ মুখ মুছবে, কেউ মুছবে পা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন