আড়ং ধোলাই

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

এখান থেকে যখন ফিরে যাব তখন ঈশ্বর আমাকে নিশ্চয় জিজ্ঞেস করবেন, বাপু হে, অভিজ্ঞতাটা কেমন হল? তখন আমাকে বলতেই হবে, 'পিতা, সে এক জবরদস্ত ব্যাপার।' আড়ং ধোলাই জিনিসটা কি তা তাঁতের কাপড়ই জানে; তবে আমারও কিছু জানা হল। পাটপাট কাপড়। সেই কাপড়ে মাড় দিয়ে কাঠের মুগুর দিয়ে পেটানো। যত পেটায় তত জেল্লা খোলে সুতোর। পরতে পরতে মাড় ঢুকে যায়। শুকোবার পর টাইট এক পিস কার্ডবোর্ড। এইবার সেই কাপড় যিনি পরবেন, তিনি বুঝবেন কী জিনিস! এক এক পরত খুলতে জীবন বেরিয়ে যাবে। তাড়াহুড়ো করলেই ছিঁড়ে ফর্দাফাই। সেই কাপড় পরার পর পেখম মেলা ময়ূরের মতো দেখাবে। আগে চলে কোঁচা পিছে চলে নর। কোঁচার খোঁচায় চোখ চলে যেতে পারে। সংসারে আমার এই অভিজ্ঞতা হল। জীবন নামক বসনে দু:খসুখের মাড় তারপর নানা হাতের পেটাই। তারপর আড়ষ্ঠ একখণ্ড কাঠ। হাতপা ছেতরে গেল। চোখে একটা ভ্যালভ্যালে ফ্যালফ্যালে দৃষ্টি। দেহের জেল্লা বাড়ল না বটে, মনের জেল্লা নিশ্চয়ই বাড়ল। কারণ মরার সময় মনেই হল না যে, চির বিদায়!

পড়ে রইল আমার আম কাঠের জাম্বোজি খাট। সেই খাটে পেতে ছিলাম বোনাসের টাকায় তৈরি ছোবড়ার গদি। এ-বস্তু একমাত্র ভারতেই ভাবা যায়। ভেতরে আড়াই মণ ছোবাড়ার পাউডার। কত বড় দর্শন, নীরবে পড়ে থাকে আমাদের দেহের তলায়। একদিন তুমি যা হবে, এ বস্তু হল তাই। সংসার তোমার শাঁস আর জলটি খেয়ে নেবে, তারপর সবাই মিলে তোমার আঁশ ছাড়াবে, তারপর তুমি শুকনো মালাটি হয়ে স্বর্গারোহণ করবে। পড়ে থাকবে তোমার ওই লীলাভূমি। টিকিনের খোল। বেরিয়ে আছে ছোবড়ার হুল জায়গায় জায়গায়। তার ওপর একটি তোশক। তুলো আর ফুলো নেই, দেহের চাপে চাটুর মতো হয়ে গেছে। তপ্ত কটাহ একেই বলে। জীবন রঙ্গ-মঞ্চও বলা চলে। ফুলশয্যা থেকে মৃত্যুশয্যা।

এই ছোবড়ার গদি তৈরি এক শীতের দুপুরে। তখনই বোঝা গিয়েছিল নতুন একটা সংসারের পত্তন হচ্ছে। বত্রিশ নম্বর বাড়িতে। যদিদং হৃদয়ং হয়ে গেছে। ওঁ প্রজাপতয়ে নম: নিয়ে শুরু হয়েছে। মাঝে মাঝে এক একটা হিন্দিগান এত অর্থবহ হয়ে ওঠে। দৃশ্যও। ফাঁকা মাঠ। এপাশে একটা বাঁশ, ওপাশে একটা বাঁশ। টানটান দড়ি দিয়ে বাঁধা। দড়ির ওপর হেমা মালিনী ব্যালেন্স করে আছেন, নীচে ধর্মেন্দ্র নেচে নেচে গাইছেন—আহা, আহা খেল, শুরু হো গিয়া, আহা আহা, খেল শুরু হো গিয়া।

কী, কী অবিচ্ছেদ্য। হাঁড়ি ও সরা। জুতো ও শুকতলা। গোলাপ ও কাটা। গাড়ি ও চাকা। চাল আর কাঁকর। নেতা ও বক্তৃতা। শিল্প ও ধর্মঘট। বাংলা ও বাংলাবন্ধ। হনুমান ও লেজ। কুকুর ও ঘেউ। ম্যাও আর মিউ। স্ত্রী ও তিরস্কার। গাড়ি ও হর্ন। বিদ্যুৎ ও অন্ধকার। মন্দির ও পাণ্ডা। পুজো আর চাঁদা। উৎসব ও মাইক। মাংস আর পেঁয়াজ। মাথা আর মাথাধরা। আকাশ ও তারা। আঙুল আর নখ। স্বামী আর স্ত্রী। খাট আর ছোবড়ার গদি।

একটা জবরদস্ত কম্বিনেশান। একেবারে মাপে মাপে খাটে চাপিয়ে দেওয়া হল তিন মনী এক কৈলাস। ধুনুরি লাঠি দিয়ে পেটাতে পেটাতে বলে গেল, 'এ বাবু শুতে শুতে সমান হয়ে যাবে। মোটা কেউ নেই? এক জোড়া শুইয়ে রাখবেন এক মাস। একেবারে প্লেন, ফাসক্লাস।' মোটা আর পাই কোথায়। নিজেই চেষ্টা করলুম মোটা হবার। হাজার পাঁচেক গলে গেল অকারণে। এক আউন্স ফ্যাট লাগল না শরীরে। নিউট্রিশান স্পেসালিস্ট বললেন, 'আপনার আড়াটাই ওইরকম। বংশগতির ধারা। আপনার পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ সকলেই মনে হয় খেতে পেতেন না। এ হল গিয়ে না-খাওয়ার, মানে না-খেতে পাওয়ার ট্রাডিশান।' জবরদস্ত চেহারা আসে জবরদস্ত অতীত থেকে। একজন বললেন, ডন বৈঠক মারো আর আলো চালের ফ্যান খাও, এক চিমটে বিট নুন আর লেবু দিয়ে। তাড়াতাড়ি মোটা হবার জন্যে কোঁত পেড়ে পেড়ে পঁচিশটা ডন, পঞ্চাশটা বৈঠক। এক জামবাটি আলোচালের ফ্যান। তিন দিনেই স্কেলিট্যান। পেট ছেড়ে পটল তোলার জোগাড়। শুনলুম বিয়ার খেলে মোটা হয়। হয়ে গেল জন্ডিস। জবরদস্ত আর হাওয়া গেল না। জবরদস্ত আমকাঠের খাটে, জবরদস্ত ছোবড়ার ড্যালা পাকানো গদিতে কেটে গেল জীবন। ট্রাম, বাস, আর ট্রেন থেকে ছারপোকার বাচ্চা এনে ছেড়ে ছিলুম। বেশ ভালোই চাষ হয়েছিল। মানুষের কথায় হুল আর ছারপোকার হুল। একটা মনে আর একটা দেহে। এমন 'ডাবল আকুপাংচার' চিনারাও দিতে পারবে না।

হোল ফ্যামিলির হাতে জবরদস্ত পেটাই হয়ে মনে প্রাণে মোক্ষলাভ করে, এখন চলেছি মহাপ্রস্থানে। পৃথিবীটা যে ঈশ্বরের ডাইং-ক্লিনিং তা জানা হয়ে গেল। ওপরে মনে হয় এইভাবেই বলাবলি চলে, 'ওরে ডেট হয়ে গেছে। ডেলিভারি নিয়ে আয়। আড়ং ধোলাই হয়ে গেছে।'

সকল অধ্যায়
১.
টক ঝাল মিষ্টি
২.
ঘোরকলি
৩.
কেমন আছেন?
৪.
জীবন একটা বেয়াড়া ভাল্লুক
৫.
হতেছে পাগলের মেলা
৬.
সকাল
৭.
আশার কথা
৮.
আর বোলো না ভাই!
৯.
'পৃথিবীতে যত বেটা সব বেটা গোরু'
১০.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১১.
হাঁদা গঙ্গারাম
১২.
কে পরাবে সিঁদুর
১৩.
জীবনের জাতীয় সংগীত
১৪.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫.
বাস-মিনিবাসের লাইনে ঘোষ, বোস, মিত্তির
১৬.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৭.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৮.
বাঁদর
১৯.
কোরা কাগজ
২০.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
২১.
শান্তির সহজপাঠ
২২.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
২৩.
অনুসন্ধান
২৪.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
২৫.
প্রেমের শিকল
২৬.
বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
২৭.
ছদ্মবেশী
২৮.
প্রেম বাড়ছে
২৯.
হনুমান টুপি
৩০.
বারমুডা ট্র্যাঙ্গল
৩১.
আড়ং ধোলাই
৩২.
হেমন্তের সকাল
৩৩.
হাতপাখা
৩৪.
খেলা
৩৫.
সন্দেহ
৩৬.
পেটে খেলে পিঠে সয়
৩৭.
শেয়াল পণ্ডিতের পাঠশালা
৩৮.
আমার আছে তোমার নেই
৩৯.
ধ্যাততেরিকা সংসার
৪০.
মায়ার খেলা, মায়ের খেলা
৪১.
যে ট্রেনের কোনো ইস্টিশন নেই
৪২.
সুখের লাগিয়া
৪৩.
টেকনিক
৪৪.
বাপের চা
৪৫.
অনশন
৪৬.
এ চোর সে চোর নয়
৪৭.
পরনিন্দা পরচর্চা
৪৮.
অমর বাঙালি
৪৯.
পথের শেষ কোথায়!
৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
৫১.
পুজোর পাঁচালি
৫২.
আকাশ যখন ছবির মতো নীল
৫৩.
সংসার, শূন্য এক ছায়াবাজি
৫৪.
মারডালো
৫৫.
বড় সাধ ছিল
৫৬.
খোলকত্তাল
৫৭.
হিরের টুকরো
৫৮.
কোনওদিন শুনেছ, চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৫৯.
অধিকার করে অধিকারী হতে হয়
৬০.
কোথায় কী
৬১.
জীবন ও সাহিত্য
৬২.
শামা হর রঙ্গ মেঁ
৬৩.
যা ছিল, একদিন নেই হবে, যা ছিল না,তা একদিন আছে হবে, শেষ হবে না কিছুই
৬৪.
উলটোপাক
৬৫.
যুবক
৬৬.
কাজের সময় কাজি
৬৭.
সকাল সকাল ভোট দিন
৬৮.
শুভানুধ্যায়ী
৬৯.
ছাতা আর গামছার মাল্টিপারপাস ব্যবহার
৭০.
জোকার
৭১.
আসরটা যে করলে মাটি
৭২.
কাঠুরিয়া
৭৩.
মানুষ হয়ে মরতে চাই
৭৪.
উতলা দখিন বাতাসে
৭৫.
ভাঙলে কিছু গড়তে তো হবে
৭৬.
আতঙ্ক
৭৭.
নিগ্রহ
৭৮.
ছুটির সকাল
৭৯.
স্বপ্ন
৮০.
আয় কাটাকাটি করি
৮১.
কলকাতা—৩০০
৮২.
আপনি কার পেশেন্ট
৮৩.
শরৎকাল
৮৪.
পকেটমারি
৮৫.
দুর্বলের সংসার সবলের সন্ন্যাস
৮৬.
আমি ক্ষুদ্র প্রাণ এক
৮৭.
মন পাখিরে কৃষ্ণকথা বল
৮৮.
জন্ম যার কোলে মৃত্যুও তারই কোলে
৮৯.
কেউ যায় বাজারে পচা মাছ কিনতে,কেউ যায় এভারেস্টে উঠতে
৯০.
উঠে বোসো শালগ্রাম
৯১.
এইবার যাই কোথায়!
৯২.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
৯৩.
এসেছি কেঁদে, যাই যেন হেসে
৯৪.
নির্জনতায় আমরা ভয় পাই, সজনতায় বিরক্ত হই
৯৫.
নদী ডাকে, আয় চলে আয়
৯৬.
কেউ ঘুমোয় কেউ জাগে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%