সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
স্বামীদের মতো 'ট্রাবলসাম' প্রাণী পৃথিবীতে আর দুটো নেই। যতক্ষণ বাড়ির বাইরে থাকে ততক্ষণই শান্তি। তাঁবুতে ফিরে এলেই দক্ষযজ্ঞ। ঘরে ঘরে স্বামীদের উৎপাতে স্ত্রীরা জেরবার। সদাসর্বদা তাঁদের নাকের উপর কপালে পার্মানেন্ট তিনটে ভাঁজ। মেজাজ তোলা উনুন, কণ্ঠস্বর ফাটা কাঁসি। বিবাহের আগে যাঁর চলন ছিল কথাকলি, বিয়ের বছর না ঘুরতেই ক্যাঙারু। যাঁর স্পর্শে একদা ছিল কুসুমের কোমলতা, বছর না ঘুরতেই খ্যাংরার কর্কশতা। অতীতে যিনি চাকভাঙা মধু মাখানো গলায় উত্তর দিতেন, যা আ আই (নি-তে স্বরলিপি এইরকম গ ম প নি) বর্তমানে সাতডাকের পর উত্তপ্ত রাগিণী, কি হল কী (স্বরলিপি স ধা নি স)। 'কি হল কী'র অর্থ, আবার ফ্যাঁচাং বের করলে?
স্বামী মানেই ফ্যাচাং। কনসেনট্রেটেড অশান্তি। কতভাবে যে গৃহশান্তি নষ্ট করা যায়, এঁদের কাছে শিখতে হয়। আর ফ্লোর ক্রসিং-এ এক্সপার্ট। দলবাজিতে তুলনাহীন। এই মায়ের দিকে তো পরমুহূর্তে বউয়ের দিকে। আবার পান থেকে চুন খসামাত্রই প্রেমের তাজমহল ভেস্তে গেল, ''তোমাকে দেখলে আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত রি রি করে।'' ডেরা পালটে গেল, মায়ের ঘরে ক্ষণ অবস্থান। আবোলতাবোল স্তোকবাক্য বৃদ্ধাকে, ''বুঝলে মা, এইবার ভাবছি তোমাকে নিয়ে তীর্থে যাব। সংসারে কী আছে বলো? কে কার। মা আর সন্তান, আহা কী স্বর্গীয় সম্পর্ক। মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে ঝরে। বলো মা! মা আর ছেলের মতো দ্বিতীয় সম্পর্ক আর আছে! জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী।''
একটু মুচকি হাসি। আজ তোমার বোধোদয়, কাল তোমার বোধাস্ত। তিনদিন ধরে ঠুসঠাস চলছে, কাল মাঝরাতে তুমুল হয়েছে, আজ জ্ঞান নয়ন খুলেছে। মা এখন স্বর্গাদপি, কাল সেই পটপরিবর্তন হবে সোহাগের রেড়ির তেল সম্পর্ক হড়হড়ে হবে, তখন ফিস ফিস করে অন্তরালে বলব ষাট পেরিয়ে গেল এখনও স্বর্গেই যেতে পারলে না তো স্বর্গাদপি।
''তোমার ঘরটা এইবার রঙ করাতে হবে মা, সেই বাবা থাকতে একবার হয়েছিল। বেশ হালকা গোলাপি রঙে।''
''আমি যাই তারপর করাস। করাতে তো হবেই। কী অসুখে যাব কেউ তো জানে না।''
''তুমি ওইরকম সেন্টিমেন্টাল কথা বোলো না তো, আমার চোখে জল এসে যায়। তুমি ছাড়া আমার কে আছে? তুমি তোমার নাতির বিয়ে দেখে যাবে। তোমাকে আমি চন্দন কাঠের চিতায় শোয়াব, ওই পঞ্চান্ন মিনিটের উনুনে নয় তোমার শ্রাদ্ধে আমি সানাই বাজাব, গাওয়া ঘিয়ের লুচি খাওয়াব।''
''দাঁড়া, আগে মরি।''
''আহা জন্মেছ যখন তখন মরতে তোমাকে হবেই। শাজাহানও মরেছে, রাজকাপুরও মরেছে, বল্লভভাই প্যাটেলও মরেছে। জন্মিলে মরিতে হবে অমর কে কোথা কবে।''
''ধর যদি ক্যান্সারে মরি, তা হলে শ্রাদ্ধের খরচ কি থাকবে, চিকিৎসাতেই দেউলে।''
''তুমি আমাকে কী ভাবো। বোকার মতো প্রেমে পড়ে হাবিলদারের মতো একটা হুমদো মেয়েকে বিয়ে করেছি বলে, সত্যিই কি আমি মাথামোটা! জানো তো, প্রেম হল থ্রম্বোসিস। সেরিব্রাল অ্যাটাকে টেম্পোরারি প্যারালিসিস। ফিজিওথেরাপিতে আবার ঠিক হয়ে যায়।''
''হয়, তবে আগের মতো হয় না। মুখটা বেঁকে থাকে। পা টেনে টেনে চলে। বিয়ের আগে ছেলে আর বিয়ের পরের ছেলেতে অনেক তফাত।''
''তুমি যা বলতে চাইছ, আমি ধরেছি ঠিক, তবে তুমি বলার আগেই আমি নিজেকে নিজেই ধরে ফেলেছি। আর তোমার সুবোধ জরু কা গোলাম নেই। বেরিয়ে এসেছি। এখন কী গান গাইছি জানো, রামপ্রসাদ সেন, যার জন্য মরো ভেবে, সে কি তোমার সঙ্গে যাবে/সেই প্রেয়সী দেবে ছড়া অমঙ্গল হবে বলে, মা, মা-ই সব।''
''ধর যদি হয়।''
''কী হয়।''
''গলায় ক্যান্সার।''
''কোন দু:খে গলায় ক্যান্সার হবে। তুমি কি আমার সেই মা, যে গলায় ক্যান্সার ধরিয়ে আমাকে পথে বসাবে! শাস্ত্র কী বলছেন মা, কুপুত্র যদি বা হয় কুমাতা কখনও নয়। তোমার ওই হলে আমার ভবিষ্যৎটা কী হবে ভেবে দেখেছ! বাড়ি যাবে, গয়না যাবে, তুমিও যাবে, গাছতলা।''
''আমার হবে কী, হয়ে বসে আছে।''
''যা:, কে বলেছে, ভয় দেখাচ্ছ।''
''ডাক্তার বলেছেন।''
''কিস্যু জানে না, হাতুড়ে। বায়পসি না করে ক্যান্সার বোঝা যায়!''
''সেটাও হয়ে গিয়েছে।''
''কে করালে?''
''বউমা।''
''আমি থাকতে বউমা কেন?''
''তুই তো থেকেও নেই। তুই তো না বউয়ের না মায়ের।''
''আমি তা হলে কার?''
''তুই বাছা এখন ইউনিয়নের, পার্টির।''
''তোমার ব্যবস্থা তা হলে কী হবে?''
''কিচ্ছু না। যদ্দিন গিলতে পারি গিলব, তারপর উপোস, তারপর বলো হরি।''
''ওয়াইজ ডিসিশান। মরার জন্য বেমক্কা খরচের কোনো মানে হয় না। কেমো, রে, চুল উঠে যাবে, চোখ ঢুকে যাবে, গলা শুকিয়ে যাবে, রক্ত ভেঙে যাবে, সোনাবর্ণ কালো হবে। আমি জানি, তুমি হিরো, বাবা মারা যাওয়ার পর যেভাবে সংসারের হাল ধরেছিলে, আমাদের মানুষ করেছিলে, তুমি হিরো।''
''অবশ্যই! তা না হলে, এমন হিরের টুকরো জন্মায়!''
''মনে আছে, ছেলেবেলায় তুমি আমাদের বলতে, জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য। আমি জানি, তুমি মরতে ভয় পাবে না, যথেষ্ট বেঁচ্ছে। আর বেঁচে কী হবে, সেই একই দিন, একই রাত! সেই একই আলু, পটল, কচু, ঘেঁচু, মুলো নতুন তো আর কিছু হওয়ার নেই। বরং একটা নতুন শরীর হলে কত ভালো। আবার আমি তোমার মতো 'জনম দুখিনী' মায়ের 'হিরের টুকরো' ছেলে হব।''
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন