জীবন একটা বেয়াড়া ভাল্লুক

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

একটি চিঠি

'আশা করি কুশলে আছেন।

আপনার স্ত্রী বিয়োগের খবর অত্যন্ত মর্মান্তিক। এই বয়সে আবার বিবাহ করা অশোভন। পুত্র আর পুত্রবধূর ওপর নির্ভর করে যতদিন চলে। একালের ছেলেমেয়েদের ওপর অধিক আস্থা না রাখাই ভালো। তাদের ঘাড়ে একটা বোঝার মতো পড়ে থাকা খুব লজ্জার, অস্বস্তির। তাড়াতাড়ি বিদায় হওয়ার চেষ্টা করাই ভালো। এই পৃথিবীর কাছ থেকে দামি দামি নানারকম ওষুধ ছাড়া আর কোনও প্রত্যাশা নেই। 'সুগার' ছাড়া আপনার আর কোনও উৎপাদন ক্ষমতা নেই। সত্য কথা বলতে কি, আপনি এখন বোঝা। ইংরেজি শব্দটা অতি অসম্মানজনক—'বার্ডন'।

প্রথম প্রথম কিঞ্চিৎ মুহ্যমান থাকবেন। অনেক স্মৃতি মনে ভিড় করবে। উলটে পালটে দেখতে গিয়ে লজ্জিতই হবেন। স্ত্রীর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা হয়নি। অকারণ হম্বি-তম্বি। চোখের জল। প্রেম দিতে পারেননি। ছড়ি ঘুরিয়ে স্বামীর দাবি আদায় করেছেন। এইবার বুঝবেন। জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধুর চলে যাওয়ার খাঁ খাঁ শূন্যতা।

সংসারে এইবার আপনার অবস্থা হবে লেজনাড়া কুকুরের মতো। তবু আপনি বেঁচে থাকার চেষ্টা করবেন। জীবন একটা বিশ্রী রকমের চ্যাটচেটে, স্টিকি পদার্থ। শোক বেশিদিন স্থায়ী থাকে না। সাবানের ফ্যানার মতো। জীবন-সমুদ্রের ঢেউ শোকের পদচিহ্ন নিমেষে মুছে দেবে।

তুমি কুশলে থাকার চেষ্টা করো। দাঁত নিশ্চয় ভোগাচ্ছে। এইবার একে একে যাবে। অনেক মুরগি, ছাগল চিবিয়েছ। নিজের ভবিষ্যতও চিবিয়েছ। অত:পর ক্ষান্তি দাও। এখন আলুভাতে আর ভাত। সাদা তরল, যাকে দুধ বলা হয়, এক কাপ যদি জোটে, পান করতে পার। চোখে ছানি যদি না এসে থাকে, আসবে, প্রস্তুত থাক। হাঁটুর জোর কমবে। মুখের বাত নেমে আসবে হাঁটুতে। টাক তো পড়বেই। দুপুরের রোদে ছাদে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে কাক তোমাকে কাকতাড়ুয়া ভাববে।

রাগ দেখাবার মানুষটি চলে গেছেন, এখন তোমাকে অভিমান নিয়েই থাকতে হবে। অভিমান হল ভড়ভড়ে ডোবা। সবাই পাশ কাটিয়ে চলে যাবে। মান-অভিমান একজনের সঙ্গেই চলে, তিনি হলেন স্ত্রী। কত যন্ত্রণাই না তাঁকে দিয়েছ। তিনি মরে বেঁচেছেন। এখন তোমার ছানি পড়া চোখে চোখের জল দেখতে তিনি আসবেন না। বুঝেছিস গাধা! স্ত্রীকে কষ্ট দেওয়াটা যেন স্বামীদের 'বার্থ রাইট'। এইবার ঠ্যাল বোঝ। সংসারের তারে তোয়ালের মতো ঝুলে থাক। কেউ মুখ মুছবে, কেউ মুছবে পা।

লোভ বাড়বে। নিজের পেট না বুঝে এটা-ওটা খেতে ইচ্ছে করবে। তারপরে বাথরুম-বাস। শুনতে পাবে সবাই বলছে, 'বুড়ো ব্যাটা গিলে মরেছে।' ব্রংকিয়াল ট্রাবল আসবে। ভোরবেলা ঘুম ভাঙবে কাশতে কাশতে। একালের যুবকরা আটটার আগে বিছানা ছাড়ে না। তুমি তোমার কাশির ফাঁকে ফাঁকে পরিষ্কার শুনবে, 'ওই শুরু হল অ্যালার্ম বেল। কত ভাগ্য করলে এমন হয়, কাশী না গিয়েই কাশি-বাস!' আরও শুনবে, 'ওয়াশ-বেসিনটার বারোটা বাজল।'

এক সময় কর্তা ছিলে, সে কুসংস্কার তো যাওয়ার নয়। সেই বশে মাঝেমধ্যে আদেশ, উপদেশ করার চেষ্টা করবে। খুব লাগবে, দেয়ালে মাথা ঠুকে গেলে যেরকম লাগবে, ঠিক সেইরকম। দেখবে শ্রোতারা প্রথমে শুনতেই পাবে না। মানে শুনেও শুনবে না। তারপর মুখ বাঁকাবে। তারপর অত্যন্ত তুচ্ছ বিষয় গুরুতর ভাবে আলোচনা করতে থাকবে। নমুনা : বুঝলে শিবানী, কাল খাটের তলায় একটা আরশোলা ঘুরছিল। বেশ বড়ো গো!

ম্যা গো! আমি আজই বাপের বাড়ি চলে যাব। খিটখিটে শ্বশুর, ঘিনঘিনে শাশুড়ি আর তেল চুকচুকে আরশোলা, তিনটেই আমার অসহ্য।

এইবার একটি সংস্কৃত শ্লোক শোনো : মূর্খো দ্বিজাতি: স্থবিরো গৃহস্থ:/ কামী দরিদ্রো ধনবাংস্তপস্বী/ বেশ্যা কুরূপা নৃপতি: কদর্যো / লোকে ষড়েতালি বিড়ম্বিতানি// শাস্ত্রজ্ঞানহীন ব্রাহ্মণ, বার্ধক্যজর্জরিত গৃহস্থ, কামাসক্ত দরিদ্র, ধনবান সন্ন্যাসী, কুশ্রী বেশ্যা, আর কদর্য রাজা, এদের জীবন হল বিড়ম্বনা!

ভাই! তোমার ভেতরে বসেই তোমাকে এই চিঠি লিখছি। তাই পোস্ট করার প্রয়োজন হল না।

সকল অধ্যায়
১.
টক ঝাল মিষ্টি
২.
ঘোরকলি
৩.
কেমন আছেন?
৪.
জীবন একটা বেয়াড়া ভাল্লুক
৫.
হতেছে পাগলের মেলা
৬.
সকাল
৭.
আশার কথা
৮.
আর বোলো না ভাই!
৯.
'পৃথিবীতে যত বেটা সব বেটা গোরু'
১০.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১১.
হাঁদা গঙ্গারাম
১২.
কে পরাবে সিঁদুর
১৩.
জীবনের জাতীয় সংগীত
১৪.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫.
বাস-মিনিবাসের লাইনে ঘোষ, বোস, মিত্তির
১৬.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৭.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৮.
বাঁদর
১৯.
কোরা কাগজ
২০.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
২১.
শান্তির সহজপাঠ
২২.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
২৩.
অনুসন্ধান
২৪.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
২৫.
প্রেমের শিকল
২৬.
বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
২৭.
ছদ্মবেশী
২৮.
প্রেম বাড়ছে
২৯.
হনুমান টুপি
৩০.
বারমুডা ট্র্যাঙ্গল
৩১.
আড়ং ধোলাই
৩২.
হেমন্তের সকাল
৩৩.
হাতপাখা
৩৪.
খেলা
৩৫.
সন্দেহ
৩৬.
পেটে খেলে পিঠে সয়
৩৭.
শেয়াল পণ্ডিতের পাঠশালা
৩৮.
আমার আছে তোমার নেই
৩৯.
ধ্যাততেরিকা সংসার
৪০.
মায়ার খেলা, মায়ের খেলা
৪১.
যে ট্রেনের কোনো ইস্টিশন নেই
৪২.
সুখের লাগিয়া
৪৩.
টেকনিক
৪৪.
বাপের চা
৪৫.
অনশন
৪৬.
এ চোর সে চোর নয়
৪৭.
পরনিন্দা পরচর্চা
৪৮.
অমর বাঙালি
৪৯.
পথের শেষ কোথায়!
৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
৫১.
পুজোর পাঁচালি
৫২.
আকাশ যখন ছবির মতো নীল
৫৩.
সংসার, শূন্য এক ছায়াবাজি
৫৪.
মারডালো
৫৫.
বড় সাধ ছিল
৫৬.
খোলকত্তাল
৫৭.
হিরের টুকরো
৫৮.
কোনওদিন শুনেছ, চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৫৯.
অধিকার করে অধিকারী হতে হয়
৬০.
কোথায় কী
৬১.
জীবন ও সাহিত্য
৬২.
শামা হর রঙ্গ মেঁ
৬৩.
যা ছিল, একদিন নেই হবে, যা ছিল না,তা একদিন আছে হবে, শেষ হবে না কিছুই
৬৪.
উলটোপাক
৬৫.
যুবক
৬৬.
কাজের সময় কাজি
৬৭.
সকাল সকাল ভোট দিন
৬৮.
শুভানুধ্যায়ী
৬৯.
ছাতা আর গামছার মাল্টিপারপাস ব্যবহার
৭০.
জোকার
৭১.
আসরটা যে করলে মাটি
৭২.
কাঠুরিয়া
৭৩.
মানুষ হয়ে মরতে চাই
৭৪.
উতলা দখিন বাতাসে
৭৫.
ভাঙলে কিছু গড়তে তো হবে
৭৬.
আতঙ্ক
৭৭.
নিগ্রহ
৭৮.
ছুটির সকাল
৭৯.
স্বপ্ন
৮০.
আয় কাটাকাটি করি
৮১.
কলকাতা—৩০০
৮২.
আপনি কার পেশেন্ট
৮৩.
শরৎকাল
৮৪.
পকেটমারি
৮৫.
দুর্বলের সংসার সবলের সন্ন্যাস
৮৬.
আমি ক্ষুদ্র প্রাণ এক
৮৭.
মন পাখিরে কৃষ্ণকথা বল
৮৮.
জন্ম যার কোলে মৃত্যুও তারই কোলে
৮৯.
কেউ যায় বাজারে পচা মাছ কিনতে,কেউ যায় এভারেস্টে উঠতে
৯০.
উঠে বোসো শালগ্রাম
৯১.
এইবার যাই কোথায়!
৯২.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
৯৩.
এসেছি কেঁদে, যাই যেন হেসে
৯৪.
নির্জনতায় আমরা ভয় পাই, সজনতায় বিরক্ত হই
৯৫.
নদী ডাকে, আয় চলে আয়
৯৬.
কেউ ঘুমোয় কেউ জাগে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%