বাঁচতে ইচ্ছে করে না

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আমার আর একদিনও বাঁচতে ইচ্ছে করে না। তোমার? একই অবস্থা। রোজ সকাল হলেই ভাবি, এইরে আবার একটা দিন এল। সেই একই ঘ্যাচোর ম্যাচোর। লোকে গুঁতোচ্ছে, অটোম্যাটিক অটো তেড়ে আসছে। ছাত্রছাত্রীরা কৃত্রিম উচ্ছ্বাসে ভবিষ্যৎ শূন্য-বাণিজ্যিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে চলেছে। স্যান্ডো গেঞ্জি পরে সেই একই লোক কাটাপোনা বিক্রি করছে। সেই একই মেজাজে গৃহিণী স্বামীকে দম দিচ্ছে। সেই একই কায়দায় কলতলায় কাজের মহিলা থালাবাটি শাসন করছে। আধবোজা চোখে পাড়ার নেতা ফুলো-ফুলো মুখে একই কথা বলে চলেছে। পুলিশ একই কায়দায় লরির সঙ্গে লড়ছে। ড্রাইভার উঁচুতে বসে একই কায়দায় থুতু ফেলছে। শামলা পরা উকিল একই মামলা লড়ে যাচ্ছে। প্রেমিক একইরকমের চিঠি ভুল বানানে লিখে চলেছে—পেয়াসী, জীবন পেপসির বুজকুড়ি কমে আসছে তোমার পেমের কার্বন ডাই অক্সাইড ছাড়া। পাসও করব না, চাকরিও পাব না, বিয়েও হবে না। তোমার মাদারকে বল, সময় চলিয়া যায়, নদীর স্রোতের প্রায়, আমাকে যেন ঘরজামাই করে। তা না হলে মেট্রোয় বডি ফেলে দিয়ে, ইলেকট্রিক ভূত হয়ে রোজ লোডশেডিং করে দেব।

অফিসে রোজই সেই এক হুমদো মুখ। মহিলা কর্মীদের সঙ্গে সে কী গদগদ গদাগদি। প্যান্টুলুন বুঝি হড়কে যায়। মুখে আলুভাতে পুরে কথা বললে যেমন শোনায়, গোবরের গাদায় থপথপে ব্যাং, সেইরকম গলায়, ''অমৃতা, অমৃতা, তুমি আমায় একটুও দেখছ না। নটি গার্ল। তুমি কি চাও আমি আত্মহত্যা করি।''

অমৃতা ঘোড়েল মেয়ে, বিয়ের আগেই তিনবার 'ডিভোর্স।'

''বিয়ের আগে ডিভোর্স।''

''আরে এ বাংলা বিয়ে নয় ইংরিজি B.A.। মাধ্যমিকের প্রেমিক মাধ্যমিকেই পড়ে রইল। উচ্চমাধ্যমিকে আর এক পতঙ্গ এল। ওড়াউড়ি। ডানা ভেঙে কাত। বি এতে আর একটি এল। তাকেও হালুয়া করে দিল। যেন রুমালি রুটির কারখানা। ফাড়াক, ফাড়াক করে বাতাসে বার কয়েক ঘুরিয়েই তাওয়ায় ফেলে দাও। রোটি বন যাও। আসলে একটা ঘড়িয়াল। ফরকায়তি, চমকায়তি ইন আওয়ার কোম্পানি। তিনি বললেন, ''বাড়িতে তো আপনার একটা জলজ্যান্ত বউ আছে।''

''সো হোয়াট অমৃতা! সি ইজ এ ব্যাগেজ। ইও আর মাই লাভ।''

''এই হুমদো কখনও বাঘ, কখনও বেড়াল। কখনও 'স্লাই ফক্স'। স্লাই ফক্স-এর বাংলা হল সেলাই করা খ্যাঁকশিয়াল।''

''বলছ, বাঁচার ইচ্ছে নেই, কিন্তু বেঁচে তো আছ!''

''আরে আর একজন মরতে বসেছে। আমার বউয়ের ক্যানসার ধরা পড়েছে। তাকে টেনে রাখার জন্য বেঁচে আছি। সে যখন হাত দুটো চেপে ধরে বলে, 'আমি চলে যাওয়ার পর তোমাকে কে দেখবে!' তখন কী মনে হয় জানো! দুটো হাই টেনশান লাইন—একটা পজেটিভ, একটা নেগেটিভ! পজেটিভ লাইনে একজোড়া পাখি। ন্যাজটা 'বাইচানস' নেগেটিভে ঠেকলেই 'ফ্ল্যাশ অ্যান্ড মরে কাঠ।' এখন আমার 'ডিপ্রেসান' নেই। বাঁচতে বেশ ভালো লাগছে।''

''সে কী?''

''হ্যাঁ জীবনের শেষটা দেখব। আমি পালার দর্শক। 'ট্র্যাজিডি' হয় কি 'কমেডি'! আমি এখন যোদ্ধা। নিজের কিংডম সামলাচ্ছি। মোটরবাইক বেচে দিয়েছি। ফিকসড ডিপোজিট ভেঙে ফেলেছি। তেমন হলে ফ্ল্যাটটা বেচে দেব। স্বার্থপর কৃত্রিম বড়লোক হওয়ার থেকে অকৃত্রিম ভিখিরি হওয়া ভালো। নদীর তীরে বসে দেখছি, জোড়া হাঁসের একটা হাঁস জোড় ভেঙে ভেসে যেতে চাইছে অন্ধকার আকাশের দিকে। ফেরাতে না পারি আলো তো দেখাতে পারি। বুঝলে ভায়া—ডিপ্রেসানের আর এক নাম স্বার্থপরতা। অন্যের বাঁচার অংশীদার হতে না পারলে জীবনকে মৃত্যুর ছায়া থেকে টেনে বের করা যাবে না। আচ্ছা ভাই চলি। আজ থেকে 'কেমো' স্টার্ট হবে।''

সকল অধ্যায়
১.
টক ঝাল মিষ্টি
২.
ঘোরকলি
৩.
কেমন আছেন?
৪.
জীবন একটা বেয়াড়া ভাল্লুক
৫.
হতেছে পাগলের মেলা
৬.
সকাল
৭.
আশার কথা
৮.
আর বোলো না ভাই!
৯.
'পৃথিবীতে যত বেটা সব বেটা গোরু'
১০.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১১.
হাঁদা গঙ্গারাম
১২.
কে পরাবে সিঁদুর
১৩.
জীবনের জাতীয় সংগীত
১৪.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫.
বাস-মিনিবাসের লাইনে ঘোষ, বোস, মিত্তির
১৬.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৭.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৮.
বাঁদর
১৯.
কোরা কাগজ
২০.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
২১.
শান্তির সহজপাঠ
২২.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
২৩.
অনুসন্ধান
২৪.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
২৫.
প্রেমের শিকল
২৬.
বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
২৭.
ছদ্মবেশী
২৮.
প্রেম বাড়ছে
২৯.
হনুমান টুপি
৩০.
বারমুডা ট্র্যাঙ্গল
৩১.
আড়ং ধোলাই
৩২.
হেমন্তের সকাল
৩৩.
হাতপাখা
৩৪.
খেলা
৩৫.
সন্দেহ
৩৬.
পেটে খেলে পিঠে সয়
৩৭.
শেয়াল পণ্ডিতের পাঠশালা
৩৮.
আমার আছে তোমার নেই
৩৯.
ধ্যাততেরিকা সংসার
৪০.
মায়ার খেলা, মায়ের খেলা
৪১.
যে ট্রেনের কোনো ইস্টিশন নেই
৪২.
সুখের লাগিয়া
৪৩.
টেকনিক
৪৪.
বাপের চা
৪৫.
অনশন
৪৬.
এ চোর সে চোর নয়
৪৭.
পরনিন্দা পরচর্চা
৪৮.
অমর বাঙালি
৪৯.
পথের শেষ কোথায়!
৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
৫১.
পুজোর পাঁচালি
৫২.
আকাশ যখন ছবির মতো নীল
৫৩.
সংসার, শূন্য এক ছায়াবাজি
৫৪.
মারডালো
৫৫.
বড় সাধ ছিল
৫৬.
খোলকত্তাল
৫৭.
হিরের টুকরো
৫৮.
কোনওদিন শুনেছ, চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৫৯.
অধিকার করে অধিকারী হতে হয়
৬০.
কোথায় কী
৬১.
জীবন ও সাহিত্য
৬২.
শামা হর রঙ্গ মেঁ
৬৩.
যা ছিল, একদিন নেই হবে, যা ছিল না,তা একদিন আছে হবে, শেষ হবে না কিছুই
৬৪.
উলটোপাক
৬৫.
যুবক
৬৬.
কাজের সময় কাজি
৬৭.
সকাল সকাল ভোট দিন
৬৮.
শুভানুধ্যায়ী
৬৯.
ছাতা আর গামছার মাল্টিপারপাস ব্যবহার
৭০.
জোকার
৭১.
আসরটা যে করলে মাটি
৭২.
কাঠুরিয়া
৭৩.
মানুষ হয়ে মরতে চাই
৭৪.
উতলা দখিন বাতাসে
৭৫.
ভাঙলে কিছু গড়তে তো হবে
৭৬.
আতঙ্ক
৭৭.
নিগ্রহ
৭৮.
ছুটির সকাল
৭৯.
স্বপ্ন
৮০.
আয় কাটাকাটি করি
৮১.
কলকাতা—৩০০
৮২.
আপনি কার পেশেন্ট
৮৩.
শরৎকাল
৮৪.
পকেটমারি
৮৫.
দুর্বলের সংসার সবলের সন্ন্যাস
৮৬.
আমি ক্ষুদ্র প্রাণ এক
৮৭.
মন পাখিরে কৃষ্ণকথা বল
৮৮.
জন্ম যার কোলে মৃত্যুও তারই কোলে
৮৯.
কেউ যায় বাজারে পচা মাছ কিনতে,কেউ যায় এভারেস্টে উঠতে
৯০.
উঠে বোসো শালগ্রাম
৯১.
এইবার যাই কোথায়!
৯২.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
৯৩.
এসেছি কেঁদে, যাই যেন হেসে
৯৪.
নির্জনতায় আমরা ভয় পাই, সজনতায় বিরক্ত হই
৯৫.
নদী ডাকে, আয় চলে আয়
৯৬.
কেউ ঘুমোয় কেউ জাগে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%