সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
পর্দা সরিয়ে প্রবীণা, প্রিজাইডিং অফিসারকে ডাকলেন,
'স্যার! একবার আসবেন?'
ভোটার আইডেন্টিটি মেলানো হয়ে গেছে। ছবির সঙ্গে চেহারা মিলে গেছে। নখে ফুটকি পরানো হয়ে গেছে। নিরীহ চেহারার ভদ্রমহিলাকে বলা হয়েছিল, 'যান লাগিয়ে আসুন।'
তিনি পর্দার আড়ালে চলে গেলেন। পাঁচ দশমিনিট হয়ে গেল। বেরোচ্ছেন না। হলটা কী? লাইন বড় হয়ে যাচ্ছে। পরবর্তীরা উতলা হচ্ছেন। চড়া রোদ। গুমোট গরম। গুমোট চেহারার কয়েকজন বন্দুকধারী। বিচ্ছিরি চেহারার একটা ঘর। এটা একটা কম দামি স্কুল। কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, ভি আর এস পাওয়া মানুষদের ছেলেমেয়েদের এখানে মানুষ করা হয়। তেমন চেকনাইয়ের দরকার হয় না। পলেস্তারা খসা, নোনাধরা ঘর থেকে বেরবে বিবর্ণ ভবিষ্যৎ। যে ভবিষ্যতকে ঠেলতে হবে স্লোগান দিয়ে।
রংচটা, দাগরাজি কয়েকটা টেবিল। তাল তোবড়ানো চেয়ার। ব্যাজারমুখো, রাতজাগা একদল ভোটকর্মী। পেট আটকানোর ট্যাবলেট খেয়েছেন প্রত্যেকেই। কারণ, যদি হঠাৎ পায়, রক্ষা নাই। গতরাতে প্রাণ ভরে যা খেয়েছেন, মশার কামড়। তারা রাত্তিরবেলা কাতারে কাতারে এসে অকাতরে ভোট দিয়ে গেছে। এই ঘরেই বছরে দুবার অবিরত দেশাত্মবোধক গান বাজিয়ে রক্তদান শিবির হয়। বড়, ছোট বক্তৃতা হয়। সেই ঘরেই আজ মতদান। গণতন্ত্রের মেশিন বসেছে। চটের পর্দা ঝুলছে। বন্দুকধারীরা সজাগ। দ্বিমত যেন না হয়। অনেক সময় বহুমূত্রের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
নিষিদ্ধ এলাকার বাইরে বিভিন্ন চরিত্রের মানুষের থমথমে জটলা। সজাগ দৃষ্টি, শক্ত চোয়াল। এরা সব গণতন্ত্রের গোলা। মুখ পুড়ে গেছে। স্বভাব বদলে গেছে। মানুষের এক ভিন্ন সংস্করণ। এরা দেখছে এই কথা ভাবলেই মতের স্বাধীনতা উধাও। হঠাৎ, হঠাৎ এক একটা জিপ লোহার প্রজাপতির মতো উড়ে উড়ে চলে যাচ্ছে। দূর আকাশে ফড়িং-এর মতো একটা হেলিকপ্টার। দূরবীক্ষণে এলাকা পর্যবেক্ষণ করছে। নানা রকমের তালি মারা একটা জামা পরে এক পাগল এলাকায় ঢুকে পড়েছিল। শুধু ঢোকেনি, গানও গাইছিল, মা আমার সাধ না মিটিল আশা না পুরিল। একজন বললেন, হাইলি সাসপিসাস। হাউ এ পাগল ক্যান এন্টার দা সিন।
একজন খুব রসিকতা করছেন, এই ভাবে বললেন, 'এ আগের বার ইন্ডিপেন্ডেন্ট ক্যান্ডিডেট ছিল।'
সঙ্গে সঙ্গে আর একজনের মন্তব্য, 'আজ্ঞে না। উঠে যাওয়া কারখানার জেনারেল ম্যানেজার।'
'ধুর মশাই, ও হল ছদ্মবেশী কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক। আমি এতবছর ভোট দিচ্ছি, সেই ছেলেবেলা থেকে। ভোটকেন্দ্রে কোনো বার এই রকম মাল্টিকালারড পাগল দেখিনি।'
'আমি একবার ষাঁড় দেখেছিলুম। তখন ব্যাপারটা এত আঁটসাঁট ছিল না। গুঁতিয়ে ঢুকে পড়ল। এক গোছা ব্যালট পেপার চিবিয়ে ঢেঁকুর তুলে বেরিয়ে গেল। কাউন্টিং-এর সময় ষাঁড়টাকে হাজির করা হয়েছিল।'
'কেন?'
'তার দেহটা তো লিভিং ব্যালট বক্স।'
'আরে কি হল মশাই, লাইন কেন এগোচ্ছে না?' পেছন থেকে অধৈর্য কণ্ঠস্বর।
সামনের দিক থেকে খবর এল, 'ভোটের এনক্লোজারে এক মহিলা ঢুকে আর বেরোচ্ছে না।'
'বেরোচ্ছে না! মামার বাড়ি! বের করবার ব্যবস্থা করুন।'
'অভিনব কায়দায় বুথ জ্যাম। বিরোধীদের কারসাজি।'
একজনের গায়ে লাগল, 'বিরোধী মানে? হোয়াট ডু ইউ মিন বাই বিরোধী।'
'আপনি। তা না হলে গায়ে লাগবে কেন?'
এক প্রবীণ বললেন, 'পার্লামেন্টারী ডেমক্রেসিতে দুটো দিক, ক্ষমতাসীন দল আর বিরোধী দল। বুঝলেন? ক্ষমতায় আসার জন্য অনেক সিট দখল করতে হয়। সেই সংখ্যাকে বলা হয় ম্যাজিক নাম্বার।'
'ধ্যার মশাই। রোদে মাথার চাঁদি ফেটে যাচ্ছে, ইনি ম্যাজিক নাম্বার বোঝাচ্ছেন।'
একজন ঐতিহাসিক এইবার মুখ খুললেন, 'গতবারে কোনো একটা বুথে এক ভদ্রলোক ভোট দিতে ঢুকলেন। ঢুকলেন তো ঢুকলেন। আর বেরোচ্ছেন না। শেষে দেখা গেল, তিনি হার্ট অ্যাটাকে মরে পড়ে আছেন। ওই বুথে ভোট বন্ধ হয়ে গেল।'
'এখানেও কি তাই হল?'
'আমার সন্দেহ, এখানে কেসটা অন্যরকম, ভদ্রমহিলা গলায় দড়ি দিয়েছেন।'
'সে আবার কী? গলায় দড়ি তো লোকে বাড়িতে দেয়। এখানে কী করতে দেবে?'
'নিউজ হবে বলে। নতুন কিছু হল। ইতিহাস।'
'তা পুলিশ কী করছে?'
'ধীরে ধীরে করবে। মাথা গরম করলে তো চলবে না।'
এদিকে প্রিজাইডিং অফিসার বাধ্য হয়ে ঘেরাটোপের মধ্যে ঢুকলেন। মেজাজ স্বভাবতই চড়া। ভোটের ডিউটি তিনি করতে চান না। প্রত্যেকবার জোর করে নাম পাঠিয়ে দেয় অফিস থেকে। মানুষ বিনা পয়সায় মানুষকে বিপদে ফেলতে পারলে ভীষণ আনন্দ পায়। জগতের নিয়ম। ভদ্রলোকের স্ত্রী কিন্তু বেজায় খুশি। এতকাল পোলিং অফিসার হতেন, এবার প্রিজাইডিং। কারণ অফিসে অনেক বছর পরে প্রাোমোশান হয়েছে। স্ত্রী হাটে, ঘাটে, মাঠে, বাজারে সব্বাইকে ডেকে ডেকে বলছেন, 'কি কাণ্ড! কম ক্ষমতা! গুলিও চালিয়ে দিতে পারে।'
অফিসার বিরক্তি মেশানো গলায় জিজ্ঞেস করলেন, 'কী সমস্যা?'
ভদ্রমহিলা শান্ত শীতল গলায় বললেন, 'বাবা! এই যে চিহ্নটা, এরাই এ রাজ্যের সব চেয়ে বড় দল। খুব পাওয়ার। এই বোতামটা যদি টিপি, তাহলে পুলিশ কি অমিতাভকে যারা খুন করেছিল, তাদের কি এবার ধরবে? তুমি জান না বুঝি—অমিতাভ আমার একমাত্র ছেলে। ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ফাইন্যাল ইয়ারের ব্রিলিয়েন্ট ছাত্র ছিল। দুপুরবেলা রেল প্ল্যাটফর্মে একগাদা লোকের মাঝখানে গুলি করে মেরে ফেলল। নাম সই করার পর লোকে যে-ভাবে পকেটে কলম গুঁজে চলে যায়, সেই ভাবে রিভালবারটা পকেটে পুরে খুনিরা চলে গেল। তিন বছর হয়ে গেল। কোনো কিনারা হল না খুনের। বাবা! তুমি বল, কোন বোতামটা টিপব? এইটা, এইটা, না এইটা?'
অফিসার বললেন, 'এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যাকে ইছে ভোট দিন। এটা ভোটের জায়গা। আগে থেকে ভেবে এসে ভোট দিতে হয়। পুলিশ ডাকতে বাধ্য করবেন না।'
'পুলিশ ডাকবে? তা ডাক। অমিতাভর খুনিকে যারা ধরতে পারল না, তারা আমাকেই ধরুক।'
বাইরে একটা সোরগোল। বড় দলের প্রার্থী এসেছেন। ঘরে ঢুকে তাঁর এজেন্টকে জিজ্ঞেস করলেন, 'সব ঠিক চলছে?'
'এতক্ষণ চলছিল। কোথা থেকে এক মহিলা এসে বুথ জ্যাম করে দিয়েছে।'
'দূর করে বাইরে ফেলে দে না।'
মহিলা সামনে চলে এসেছেন। প্রশ্ন করলেন, 'বাবা! তোমার মা আছে?'
'আছে বোধ হয়।'
'আচ্ছা! এইবার বল, কতকগুলো গুণ্ডা যদি তোমাকে খুন করে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তোমার মা কী করবেন!' ভদ্রমহিলার গলা এইবার সপ্তমে চড়ল, 'জবাব দাও। তোমার মা কী করবেন? দূর করে বাইরে ফেলে দেবে? তোমার পার্টির ছেলেরা, এই রাজ্যের যত গুন্ডা, আকাশ থেকে পড়েনি। প্রত্যেকেই তার মায়ের পেটে দশ মাস ছিল। জবাব দাও।'
বন্দুকধারী দুজন পুলিশ ছুটে এসেছেন। ভদ্রমহিলা আঙুল উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমাদের মা আছেন?'
উত্তর নেই। প্রার্থী বললেন, 'আপনি বাইরে চলুন।'
'কেন, বাইরে যাব কেন?'
'আমি আপনাকে ব্যাপারটা বোঝাই।'
'আজ তিন বছর ধরে আমাকে বোঝানো হচ্ছে।'
'আপনি ভুল করছেন। এটা আদালতের ব্যাপার। ভোটের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।'
'স্বরাজের কারখানায় ঝাণ্ডা উড়ল। না খেতে পেয়ে স্বরাজ সপরিবারে আত্মহত্যা করল। এর সঙ্গে ভোটের কোনো সম্পর্ক আছে? মল্লিকাকে গণধর্ষণ করার পর মেয়েটা পুড়ে মরল, এর সঙ্গে ভোটের কোনো সম্পর্ক আছে?'
'না, নেই।'
প্রার্থীর সঙ্গে তাঁর দলবল। সকলেরই উগ্র চেহারা। কারো ডাবের মতো মুখ, কারো মুখ নারকোলের মতো। গভীর রাতে গেরস্থবাড়ির জানলার গরাদ ধরে দাঁড়ালে কোলের ছেলে কঁকিয়ে উঠবে। সব মৃত্যুর পরোয়ানা। থান-কাপড়, ন্যাকড়ায় বাঁধা লোহার চাবি বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেয়। প্রীতি উপহার। উঠতি বয়সের মেয়েরা জলের মাছ। জাল ছেঁকে কাকে কখন তুলবে কেউ জানে না।
এঁদেরই একজন বললেন, 'কী ফালতু বকছে। চলুন, চলুন। এখনো পঞ্চাশটা বুথে চমকাতে হবে।'
মহিলাকে হাতের ঠেলায় প্রায় উলটে ফেলে দিয়ে জনগণমন অধিনায়করা চলে গেলেন। দুটো গাড়ি রাজসমারোহে প্রবল শব্দে, দক্ষিণে ছুটল। মহিলা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। বড় অসহায় সেই ছবি।
তিনি চিৎকার করে বললেন, 'ফালতু, ফালতু, সব ফালতু। সব ঝুট হ্যায়।' বয়েস হয়েছে। যৌবনে যথেষ্ট সুন্দরী ছিলেন। সামনে একটু ঝুঁকে হাঁটেন। বাতসর্বস্ব বঙ্গভূমি। হয় মুখে বাত, না হয় হাঁটুতে।
একজন ভোটার হঠাৎ যেন কিছু আবিষ্কার করে ফেলেছেন, সেই উল্লাসে বললেন, 'আরে, আরে এই তো সেই অমিতাভর মা, স্কুলশিক্ষিকা।'
'কোন অমিতাভ?'
'কাগজে পড়েন নি? পর পর তিন দিন বিরাট নিউজ। টিভিতেও দেখিয়েছিল। ক্রাউডেড প্ল্যাটফর্মে শট ডেড।'
'কারণ?'
'অকারণ।'
'কারণ ছাড়া কিছু হয় না মশাই। ডেফিনিটলি দেয়ার ইজ কারণ। মে বি এ মেয়ে। একালের ছেলেরা পটাপট মরবে দুটো কারণে, পলিটিক্স আর প্রেম। নায়ক আর নায়িকা দেশটাকে শেষ করে দিলে। নিউজ না হয় হল, তারপর কি হল?'
'সংবাদ মাধ্যমে দিনকতক লাফালাফি হল, তারপর সংবাদ মরে গেল।'
'সংবাদও মরে যায়?'
'বা: মরবে না? কত দিন বাঁচবে? কেশপুর, বীজপুর, সবই মরল।'
'ইয়েস, দেয়ার ইজ এ বিগ ধামা। পড়ে গেল ধামা চাপা। আমাদের দুটো অ্যাসেট— মামা আর ধামা।'
'গ্রামের লোক গান গায়, মামা ধামা বাজাব, মামা শাউড়ি নাচাব।'
'এ সব গান শুনলে বাংলা ব্যান্ড লুফে নেবে।'
ভদ্রলোক গানের লাইনে উৎসাহ পেয়ে একটু আগের কথা ভুলে গেলেন।
'আমার কালেকশানে এই রকম আরো আছে,
যার নাকেতে নাকফুল, দুহাত মাপা চুল,
তার সঙ্গে পাতাব আমি সজনাফুল।
বড় সাধ আছে মনে—
সজনা ফুল পাতার শাউড়ি তোর সনে।'
পাঁজাকোলা করে নব্বই বছরের এক গণতান্ত্রিক মানুষকে আনা হল। 'ফসিল' ভোট দেবেন। বয়েসকালে সখের থিয়েটারে সখী সাজতেন। একটাও দাঁত নেই। কোল থেকে নেমেই বললেন, 'কই, ছবি তোলো ছবি।'
সন্তানহারা মহিলা হাঁটতে হাঁটতে স্টেশানে এলেন। সেই স্টেশান। এক দুপুরে সেখান থেকে তাঁর ছেলের শেষ ট্রেন ছেড়ে গিয়েছিল। রোজ আসেন। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকেন সেই জায়গাটির দিকে। অমিতাভ উপুড় হয়ে পড়েছিল। ব্যস্ত, ব্যস্ত পা মাড়িয়ে মাড়িয়ে চলে যায়। প্রথম প্রথম আতঙ্কের গলায় বলে উঠতেন, 'না, না, মাড়িও না, মাড়িও না।' কেউ শুনতেই পেত না। কলরবে কে কার কথা শোনে!
একটা মেল ট্রেন তীব্র বেগে চলে গেল। গার্ডের কামরাটা একটা লণ্ঠনের মতো ছিটকে চলে গেল। নি:সঙ্গ একটা মানুষ সেখানে দাঁড়িয়ে। পতাকা নাড়ছেন। মহিলা আচমকা ডেকে উঠলেন, 'অমিতাভ'। তারপর বললেন, 'জীবনের রং সবুজ, লাল নয়, লাল নয়!'
সেই কিশোরটি এল। কাঁধে চটের ঝোলা। কাগজ কুড়োয়। মহিলার সঙ্গে নিবিড় একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ছেলেটি 'মা' বলে ডাকে। মা ডাকটা জীবন থেকে হারিয়ে যায় নি।
মহিলা বললেন, 'কাল এলি না কেন?'
'কাল ভোটের কাগজের মালা ঝোলাচ্ছিলুম যে।'
'তোরই লাভ, কত কাগজ পাবি কাল। আয়, আয়, সন্দেশ খা। এই কাগজে কি হয় রে?'
লেখা-টেখা সব মুছে যায়। কল থেকে বেরিয়ে আসে থান থান সাদা কাগজ।
'বুঝলে মা, সব ফালতু।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন