কেউ যায় বাজারে পচা মাছ কিনতে,কেউ যায় এভারেস্টে উঠতে

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

মানুষ বৃদ্ধ না হইলে সুন্দর হয় না, বলেছিলেন সঞ্জীবচন্দ্র। আয়নার সামনে দাঁড়ালেই বুঝতে পারি, একেবারে সেন্ট পারসেন্ট খাঁটি সত্য। প্রথমে চমকে উঠি, কে রে এটা! ঝুলঝাড়ুর ক্ষুদ্র সংস্করণ না কি! বেঁটেখাটো। চুলের কী অবস্থা। কোলে করে সিলিং-এর দিকে ঠেলে তুলে দিলেই হয়। এক লট ঝুল নিয়ে নেমে আসবে। কোথায় গেল আমার চাঁচর চিকুর! ঘাড়ের কাছে সেতারির বাবরি। ওই যে দেয়ালে কেতরে আছে যৌবনের ছবি। বুকের কাছে লেপটে আছে যুবতী স্ত্রী। কপালে এতখানি একটা টিপ সাঁটা। টলটলে মুখ। দু চোখে টইটম্বুর প্রেম। বিয়ের কয়েকমাসের মধ্যেই স্টুডিয়োয় গিয়ে পোজ মেরে তোলা। নেই। যৌবন লিক করে বেরিয়ে গিয়েছে। সংসারের থার্ড ডিগ্রিতে গাল ভেঙে গিয়েছে। গালটা গোহাড়গিলের মতো। চাষের খেতে পাঞ্জাবি পরে দু-হাত তুলে দাঁড়ালে মনে হবে কাকতাড়ুয়া। যৌবনের গান ছিল, তুমি আর আমি শুধু জীবনের খেলাঘর হাসি আর গানে ভরে তুলব। বৃদ্ধের গান, আসার আসা ভবে আসা, আসা মাত্র হল সার। চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে বলতে ইচ্ছে করে, কে রে তুই! মরা কাতলা না কি! দৃষ্টি আছে প্রাণ নেই। কামনা, বাসনা গেল কোথায়! কোথায় গেল চকচকে লোভ! গনগনে অহঙ্কার! আহত, ভীত, পশুর চোখ! আয়নার মানুষটাকে দেখলে মনে হয়, দীন, হীন এক ভিখিরি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কৃপাপ্রার্থীর মতো। মনে হয়, আমার পিতা দাঁড়িয়ে আছেন। বলতে ইচ্ছে করে, কী হয়েছে তোমার, কেউ মেরেছে, বকেছে কেউ। এসো তোমাকে ভালো করে তেল মাখিয়ে চান করাই। খুব করুণা হয়। মনে হয়, আমার যা আছে সব দান করে দি ওই লোকটাকে। কত দিন ধরে দূর থেকে হাঁটতে হাঁটতে আসছে। কত অপমান সহ্য করেছে, ভাগ্যের সঙ্গে জুয়া খেলতে গিয়ে সর্বস্ব খুইয়েছে। হেরে যাওয়া একটা লোক। কী করলে সারা জীবন। ধমক লাগাই। আয়নার লোকটা কথা বলে না। ঠোঁট দুটো নড়ে ওঠে। মুখটা করুণ হয় আরও। লেখাপড়াটা আরও ভালো করে করলে না কেন? তোমাকে কে বলেছিল, সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে মাততে! কে বলেছিল, ল্যাং ল্যাং করে প্রেম করতে। জানতে না, বিয়ে করলে সংসার হয়। সংসার হলে টাকা রোজগার করতে হয়, দাসত্ব করতে হয়। ঝাঁটা, জুতো, লাথি খেতে হয়। তিলে তিলে মরতে থাকে প্রেমিক, দুমড়ে যেতে থাকে আদর্শবাদী, জীবনের সরলতা ক্রমশ জট পাকাতে পাকাতে হয়ে যায় শয়তানি, দ্বিপদ মানুষ সামনে ঝুঁকতে ঝুঁকতে ক্রমশ হয়ে যায় চতুষ্পদ উল্লুক। জানো না তুমি, মানুষের শেষটা কত ভয়ংকর!

জ্যান্ত ঝুলঝাড়ুটা ইডিয়টের মতো তাকিয়ে থাকে। ষাটটা বছরের সমস্ত ঐশ্বর্য কোথায় ঘুচিয়ে এসে অপরাধী বালকের মতো আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি অত্যন্ত রুষ্ট হয়ে বলি, 'গাধা, বলতে পারছিস না, who berathes, must suffer, and who thinks must mourn/And he alone is blessed, who never was born. যখন উচ্চাকাঙ্ক্ষা ভিতরে ছটফট করত চেনে বাঁধা বাঁদরের মতো, তখন মনে হত, কেন এই করলুম না, কেন ওই করলুম না। এখন আর করে না। এখন বুঝেছি, যে এভারেস্টে উঠবে সে এভারেস্টে উঠবেই। যে পাতিপুকুরের বাজারে রোজ সকালে পচা মাছ কিনবে, সে কিনবেই। আমি এভারেস্টে ওঠার চেষ্টা করলে বেস ক্যাম্পেই হেঁচকি তুলে মারা যেতুম। কলেজে যখন পড়ি তখন শেক্সপিয়র হওয়ার ইচ্ছে হয়েছিল। তিনপাতা পড়ে শোনার পর প্রাণের বন্ধু বললে, আর চেষ্টা করিসনি হেপাটাইটিস হয়ে যাবে। জীবনের পথ ধরে এতটা হেঁটে আসার পর সার বুঝেছি, আমার যা হওয়ার তাই হয়েছে। চালকুমড়ো চালে, ভুঁইকুমড়ো ভুঁয়ে! নিম তেতো, তেঁতুল ঠক। দু:খ করিস না ভাই। জীবনের পার্সেলটাকে ইনট্যাক্ট মৃত্যুর মহালয়ে বিশ্বাসী ডাকহরকরার মতো পৌঁছে দাও।'

সকল অধ্যায়
১.
টক ঝাল মিষ্টি
২.
ঘোরকলি
৩.
কেমন আছেন?
৪.
জীবন একটা বেয়াড়া ভাল্লুক
৫.
হতেছে পাগলের মেলা
৬.
সকাল
৭.
আশার কথা
৮.
আর বোলো না ভাই!
৯.
'পৃথিবীতে যত বেটা সব বেটা গোরু'
১০.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১১.
হাঁদা গঙ্গারাম
১২.
কে পরাবে সিঁদুর
১৩.
জীবনের জাতীয় সংগীত
১৪.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫.
বাস-মিনিবাসের লাইনে ঘোষ, বোস, মিত্তির
১৬.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৭.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৮.
বাঁদর
১৯.
কোরা কাগজ
২০.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
২১.
শান্তির সহজপাঠ
২২.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
২৩.
অনুসন্ধান
২৪.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
২৫.
প্রেমের শিকল
২৬.
বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
২৭.
ছদ্মবেশী
২৮.
প্রেম বাড়ছে
২৯.
হনুমান টুপি
৩০.
বারমুডা ট্র্যাঙ্গল
৩১.
আড়ং ধোলাই
৩২.
হেমন্তের সকাল
৩৩.
হাতপাখা
৩৪.
খেলা
৩৫.
সন্দেহ
৩৬.
পেটে খেলে পিঠে সয়
৩৭.
শেয়াল পণ্ডিতের পাঠশালা
৩৮.
আমার আছে তোমার নেই
৩৯.
ধ্যাততেরিকা সংসার
৪০.
মায়ার খেলা, মায়ের খেলা
৪১.
যে ট্রেনের কোনো ইস্টিশন নেই
৪২.
সুখের লাগিয়া
৪৩.
টেকনিক
৪৪.
বাপের চা
৪৫.
অনশন
৪৬.
এ চোর সে চোর নয়
৪৭.
পরনিন্দা পরচর্চা
৪৮.
অমর বাঙালি
৪৯.
পথের শেষ কোথায়!
৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
৫১.
পুজোর পাঁচালি
৫২.
আকাশ যখন ছবির মতো নীল
৫৩.
সংসার, শূন্য এক ছায়াবাজি
৫৪.
মারডালো
৫৫.
বড় সাধ ছিল
৫৬.
খোলকত্তাল
৫৭.
হিরের টুকরো
৫৮.
কোনওদিন শুনেছ, চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৫৯.
অধিকার করে অধিকারী হতে হয়
৬০.
কোথায় কী
৬১.
জীবন ও সাহিত্য
৬২.
শামা হর রঙ্গ মেঁ
৬৩.
যা ছিল, একদিন নেই হবে, যা ছিল না,তা একদিন আছে হবে, শেষ হবে না কিছুই
৬৪.
উলটোপাক
৬৫.
যুবক
৬৬.
কাজের সময় কাজি
৬৭.
সকাল সকাল ভোট দিন
৬৮.
শুভানুধ্যায়ী
৬৯.
ছাতা আর গামছার মাল্টিপারপাস ব্যবহার
৭০.
জোকার
৭১.
আসরটা যে করলে মাটি
৭২.
কাঠুরিয়া
৭৩.
মানুষ হয়ে মরতে চাই
৭৪.
উতলা দখিন বাতাসে
৭৫.
ভাঙলে কিছু গড়তে তো হবে
৭৬.
আতঙ্ক
৭৭.
নিগ্রহ
৭৮.
ছুটির সকাল
৭৯.
স্বপ্ন
৮০.
আয় কাটাকাটি করি
৮১.
কলকাতা—৩০০
৮২.
আপনি কার পেশেন্ট
৮৩.
শরৎকাল
৮৪.
পকেটমারি
৮৫.
দুর্বলের সংসার সবলের সন্ন্যাস
৮৬.
আমি ক্ষুদ্র প্রাণ এক
৮৭.
মন পাখিরে কৃষ্ণকথা বল
৮৮.
জন্ম যার কোলে মৃত্যুও তারই কোলে
৮৯.
কেউ যায় বাজারে পচা মাছ কিনতে,কেউ যায় এভারেস্টে উঠতে
৯০.
উঠে বোসো শালগ্রাম
৯১.
এইবার যাই কোথায়!
৯২.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
৯৩.
এসেছি কেঁদে, যাই যেন হেসে
৯৪.
নির্জনতায় আমরা ভয় পাই, সজনতায় বিরক্ত হই
৯৫.
নদী ডাকে, আয় চলে আয়
৯৬.
কেউ ঘুমোয় কেউ জাগে

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%